Saturday, December 16, 2017

সময় গেলে সাধন হবে না

বিডিনিউজ২৪.কমে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন বিভিন্ন সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ ছাপা হচ্ছে। একটিতে সেদিন চোখ আটকে গেলো। একাদশ সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের বর্তমান মহাসচিব হারুন হাবীব বলেছেন,
“প্রচণ্ড গভীর কালো রাত ছিল সেদিন। এর মধ্য থেকেই দেখছিলাম, একদিকে বুলেট ট্রেসার উড়ছে, অন্যদিকে জোনাকিগুলি উড়ছে। এই কালোর মধ্যে এত সুন্দর লাগছিল, এগুলো আসলে ওই সময়ে মুহূর্তের মধ্যে জীবনের ব্যাপারটা চলে আসছিল...।”
বাংলা উইকিপিডিয়ার দ্বারস্থ হয়ে আবিষ্কার করলাম, একাত্তরে হারুন হাবীবের বয়স ছিলো ২৩ বছর। কয়েক সপ্তাহের প্রশিক্ষণ সম্বল করে তিনি ও তাঁর মতো অগণিত তরুণ একটি প্রশিক্ষিত ও সুসজ্জিত নিয়মিত বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছিলেন। ট্রেসার বুলেটের স্রোত ছাপিয়ে গভীর রাতে ক্ষণপ্রভ জোনাকির স্রোত যে তাঁর চোখ এড়ায়নি, এ দৃশ্যটুকুর মধ্যেই সে তরুণদের, এবং দেশে ও সারা বিশ্বে বর্তমানের তরুণদের, আত্মাটুকু ফুটে আছে। তাকাশি মিয়িকে পরিচালিত জাপানি চলচ্চিত্র 13 Assassins এ একটি চরিত্রের নির্বিকার সংলাপ আছে, উইথ ডেথ কামস গ্র্যাটিচ্যুড ফর লাইফ - মৃত্যুই জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা বয়ে আনে। হারুন হাবীবের এই স্মৃতিচারণে সে সত্যটুকু আরেকবার উপলব্ধি করলাম।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যখন কোনো কিছু করার কথা ওঠে, তখন ঘুরেফিরে পুরো ঘটনাটাকে এক কাঠামোতে ধারণের একটা চেষ্টা দেখা যায়। পঁচাত্তর মিলিয়ন মানুষের একটি জাতি তিন মিলিয়ন প্রাণ বিসর্জন দিয়ে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে, এমন বিপুল ঘটনাকে এক ফ্রেমে আনার যে চেষ্টা শিল্পীরা করেন, সেটি আমার মতে ভুল। কিন্তু যে নিযুত কোটি ছবি দিয়ে সমগ্র দৃশ্যটি তৈরি, তার অন্তত একটিকে সার্থকভাবে ধারণ করার, এবং প্রজন্মান্তরে বহন করার চেষ্টাটি অনেক বেশি সাফল্যের সম্ভাবনা রাখে।
একজন চিত্রশিল্পী কি এ রণদৃশ্যটি নিয়ে ছবি আঁকতে পারেন না? চারদিকে ধ্বংস, মৃত্যু আর অন্ধকারের মাঝে এক তরুণ যোদ্ধাকে ক্ষণিকের জন্যে জীবনের আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে একদল জোনাকি, এ দৃশ্যটি কোন বিচারে কম মহৎ? একটা গান কি হতে পারে না এ নিয়ে? একটা কবিতা? একটা অপেরা? এক প্রস্থ ব্ল্যাকলাইট থিয়েটার? একটি একাঙ্কিক ভরতনাট্যম? একটা বারবারশপ কোয়ার্টেট? আমাদের আলসেমির জন্যে, অমনোযোগের জন্যে, মহত্ব-যাচাইয়ের-অযোগ্যতার জন্যে, এমন একটা ছবি হারিয়ে যাবে?
জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা যদি কেবল মৃত্যুই বয়ে আনে, তাহলে সে জীবন যাপনও ক্লান্তিকর। জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জীবন থেকেই আসুক। আজ হারুন হাবীব বেঁচে আছেন বলে এ দৃশ্যটি আমরা কল্পনার চোখে দেখার সুযোগ পেলাম, যা হয়তো নিজের যাপিত জীবনে পাওয়া হতো না। মুক্তিযোদ্ধারা আর কয়েক বছর পর প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে আর আমাদের মাঝে থাকবেন না, কিংবা বেঁচে থাকলে তাঁদের স্মৃতি মলিন হয়ে আসবে। অথচ এখন একটি সাক্ষাৎকার ধারণ করা কতো সহজ হয়ে এসেছে, ভাবুন? আপনি যে মুক্তিযোদ্ধার গর্বিত উত্তরসূরী, তাঁর কাছ থেকে এখনই, আজই জেনে নিন এমন আরো দৃশ্যের কথা, ধারণ করে রাখুন, ছড়িয়ে দিন। এমন দৃশ্য আগামী ৪৬ বছরেও হয়তো আমরা আর পাবো না।
মুক্তিযুদ্ধ এমন অজস্র সুন্দর দৃশ্যেরও খনি, যা আমাদের জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে শেখায়। বেলা শেষে বিজয় হোক বিস্মরণের বিরুদ্ধে বিজয়। চলুন, মুক্তিযুদ্ধের এ টুকরো ছবিগুলো সংগ্রহ করি।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।