Saturday, August 05, 2017

শব্দগল্পদ্রুম ০৫

১.
চিরুনি অর্থ কী, এ জিজ্ঞাসার মোকাবেলা বালক জগদীশচন্দ্র বসু করেছিলেন "ফাড়ুনি" দিয়ে। দেখা বা শোনা নয়, পড়া কথা। জগদীশচন্দ্রের এই বাল্যকালীন প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে বাংলা শব্দের মহাদ্রুমের বীজ খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু তার আগে জিজ্ঞাস্য, চিরুনি কি আদপেই ফাড়ুনি? চিরুনিকে ফাড়ুনি বললে কি লোকে চিনবে? যদি শব্দের কাজ হয় ভাবসেতু নির্মাণ, তাহলে ফাড়ুনিতে গিয়ে কি ভাবজট তৈরি হবে না? কিন্তু ফাড়ুনিতে কী নেই, যা চিরুনিতে আছে?
শ্রোতার অভ্যস্ততা।
নতুন শব্দের গ্রহণযোগ্যতা বিচার আমরা নিজেদের গণ্ডি দিয়ে বিচার করি, সেটাই স্বাভাবিক। চিরুনিকে জগদীশচন্দ্র ফাড়ুনি বললেও ফাড়ুনি ভাত পায়নি, আজও আমরা চিরুনি দিয়েই চুল আঁচড়াই। চিরুনির আরেকটা নাম আছে, কাঁকই (কঙ্কতি/কঙ্কতিকা থেকে এসেছে), সেটাও এখন আর খুব প্রচলিত কিছু নয়। তাছাড়া চিরুনি শব্দটার মধ্যে একটা দৃশ্যগুণ আছে; চুলের দুর্ভেদ্য ঝোপঝাড় কোনো এক যন্ত্রে চিরে দেওয়া হচ্ছে, এটা মনের চোখে ভেসে ওঠে। ফাড়ুনি বরং RAKE এর সাথে বেশি মানানসই।
কিন্তু কঙ্কতিকার মতো খটমটে শব্দটার মধ্যে কি এ ছবি অনুপস্থিত? কঙ্কত মানে মাছের ফুলকো (কানকো শব্দটা কঙ্কত থেকেই এসেছে, কিংবা কানকোর সংস্কারসাধন করেই হয়তো তাকে কঙ্কত করা হয়েছে)। মাছের ফুলকোর একটা ছবি বরং দেখি আমরা।
চিরুনি কেন কঙ্কতিকা, সেটা এ ছবিটা থেকে খানিক স্পষ্ট হয়। সময়ের সংঘর্ষে কঙ্কতিকার দাঁত ক্ষয়ে গিয়ে সেটা যখন কাঁকই হয়ে গেলো, কিংবা আমাদের জীবনেও যখন মাছের কানকো একটা আড়ালের বস্তু হয়ে গেলো, কিংবা কানকোর সাথে চিরুনির সাদৃশ্যটুকু যখন কালভারে চাপা পড়লো, তখন এ শব্দগুলোর দৃশ্যগুণ হারিয়ে গেলো। চিরুনি পেলো স্বর্ণপদক, কাঁকই রৌপ্য, ফাড়ুনি পেতল, কঙ্কতিকা সান্ত্বনা পুরস্কার।
এখানে একটা ছবি লুপ্ত হওয়া, বা গুপ্ত হওয়া, বা সুপ্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে গেছে। আমরা বুঝতে পারি, এমন একটা জনগোষ্ঠী ছিলো, যারা মাছের কানকো আর চুলের চিরুনির সাথে সমান পরিচিত ছিলো, এবং এ দুয়ের সাদৃশ্য তারা শব্দে ফুটিয়েছে। প্রকৃতি থেকে আহরণ করা কোনো কিছুর নামকে তারা একটি উদ্ভাবনে রোপণ করেছে। নতুনকে পুরনো বা আপন দিয়ে চেনার কাজটিতে তারা সফল। সময় এ ছবিটাকে মুছে দিয়েছে হয়তো, কিন্তু প্রক্রিয়াটা রয়ে গেছে। বালক জগদীশচন্দ্র "চিরুনির অর্থ" কী, সে প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করতে গিয়ে আরেকটি ছবিই মনের মাঝে খুঁজে পেয়েছিলেন, চিরুনি হচ্ছে এমন কোনো সাধিত্র, যা দিয়ে কোনো কিছু ফাড়া হয়। ফাড়ুনি বাংলা ভাষায় প্রচলন পায়নি, কিন্তু শব্দের মাঝে দৃশ্যসন্ধানের ইতিহাসে এটা টিকে আছে।
সব শব্দেই কি এ দৃশ্যগুণ আছে, কিংবা থাকা জরুরি? হয়তো আছে, সে দৃশ্য খোঁজার প্রয়োজন বা আগ্রহ আমাদের নেই। এই অনাগ্রহই মূলত নতুন শব্দ নির্মাণের কাজে প্রাথমিক বাধা। বালকমনে এ বাধাটা কাজ করে না, কারণ অনেক কিছুই তার কাছে সমান নতুন, সমান আগ্রহোদ্দীপক। চিরুনি যন্ত্রটা জগদীশচন্দ্র আবিষ্কার করেননি, কিন্তু ফাড়ুনি শব্দটা উদ্ভাবন করে তিনি চিরুনির ধারণাটাকে নতুন করে, নিজের মতো করে আবিষ্কার করেছেন। এ স্পৃহাই নতুন নতুন শব্দের জমিন।
আর জগদীশচন্দ্রের "ফাড়ুনি"-ঘরানা কিন্তু বাংলায় যথেষ্ট প্রচলিত। ডালঘুঁটুনি, নারকেলকুড়ুনি, নিড়ানি, এসব আছেই। সঙ্গে পোট্যাটোপিলারকে ছিলুনি আর বটলওপেনারকে খুলুনি, চিজগ্রেটারকে গুঁড়ুনি, সাথে রুটি বেলার বেলনকেও আদর করে বেলুনি বলি হরদম।
২.
আমরা না দেখলেও, অনেক শব্দের পেছনেই একটা দৃশ্য আছে। ত্রিমাত্রিক সিনেমা দেখার জন্যে যেমন বিশেষ চশমা লাগে, সে ছবিটা দেখার জন্যে মনের চোখে একটা চশমা পরে নিতে হয়, কিংবা ইতিমধ্যে পরে থাকা কোনো চশমা খুলে নিতে হয়। যেমন, কন্দর। কন্দর মানে গুহা। দ্রবণরোধী পাথরের মাঝে যদি সহজদ্রব্য কোনো কিছু থাকে, কিংবা শক্ত পাথরের মাঝে নরম পাথর, সময়ের সাথে পানি সেটাকে ধুয়ে নিয়ে যায়, একটা শূন্যস্থান পড়ে থাকে, তাকেই আমরা বলি গুহা। এ দৃশ্যটা কন্দর শব্দের মধ্যে আছে। "কম" শব্দের অর্থ পানি। কম দীর্ণ করেছে যাকে, অর্থাৎ জল যাকে ভেদ করেছে, সে-ই কন্দর (বহুব্রীহি)। গুহার জন্মের লক্ষ বছরের দৃশ্যটা যেন দ্রুত চালিয়ে শব্দটার উচ্চারণকালের মধ্যে দেখানো আছে কন্দরে। আপনি-আমি কন্দর শব্দটা ব্যবহার করি না, তার মানে এ নয়, যে এ ছবিটার অস্তিত্ব নেই, কিংবা এ শব্দের উদ্ভাবনের পেছনে অতীত পর্বতচারী সমাজের সদস্যদের গভীর পর্যবেক্ষণ নেই। তাঁদের মতো করে দেখার চোখই হয়তো আমাদের গজায়নি এখনও। গুহার ভেতরে আমরা একটা শূন্যস্থান দেখছি, কন্দর শব্দের প্রণেতাসমাজ দেখেছে পানির দীর্ঘমেয়াদী বিদারণকর্ম।
কিংবা ধরুন, কপোত। কম-এর মতো ক-ও বেশ পুরনো শব্দ, এর বহু অর্থের একটি হচ্ছে বায়ু। ক যার পোত, অর্থাৎ বায়ু যার নৌকা, বহুব্রীহিতে পায়রা। শব্দটার মাঝে সূক্ষ্ম কল্পনা আছে, খোদ হাওয়াকেই নৌকা ভেবে পায়রাকে তার যাত্রী ভাবার মতো কবিসুলভ স্পর্ধা আছে। কপোত শব্দটার উদ্ভবের পেছনে ভিন্ন ব্যাখ্যাও আছে, আমি এ ব্যাখ্যাকে সামনে আনছি এর দৃশ্যগুণের জন্যে। এখানেই থেমে না থেকে একে আরো সামনে বাড়ানো যায়। কপোতের পালি, অর্থাৎ কপোত উপবেশনের স্থান হচ্ছে কপোতপালি, ইংরেজিতে যাকে বলে CORNICE (ইতালিয়ান কর্নিচে থেকে নেওয়া), অর্থাৎ কার্নিশ। কার্নিশকে কপোতপালি বললে তাতে বাড়ির কাঠামোর শুষ্কংকাষ্ঠং ভাবটা চলে গিয়ে তারচেয়ে বেশি কিছু ফুটে ওঠে। একটা সমাজের ছবি আমরা পাই, যেখানে লোকে ঘর গড়ার সময় কবুতরের জন্যেও একটা আশ্রয় গড়ে। এ ছবিটা কার্নিশে নেই।
আমরা আরো সামনে বাড়তে পারি। একটা শব্দ উদ্ভাবন করতে পারি, কপোতপালিশূর, অর্থাৎ যার বীরত্বের ক্ষেত্র কার্নিশে, যোগরূঢ়ার্থে শহুরে বানর। পারি না? নিশ্চয়ই পারি। দু'লাইন ছড়াও লিখতে পারি, ছাদের ওপর মাদুর পেতে শুকাচ্ছি আমচুর, সবই খেলো মহল্লার ঐ কপোতপালিশূর।
কপোতপালিশূরের টুকরোগুলো যদি আমরা দেখি, পাবো হাওয়া, নৌকা, বসার স্থান, আর বীর। শহুরে বানর পর্যন্ত পৌঁছানোর কিছুই ওর মধ্যে নেই। গেছোদাদার মতো তাকেও রাণাঘাট-তিব্বত-গেছোবৌদিরান্নাকরছে টপকে খুঁজে পেতে হয়। শহুরে বানর বললে বরং তাকে সহজে চেনা যায়। কিন্তু সহজ কাজ তো শহুরে বানরও পারে, লেখকের কাজ কি আরেকটু কঠিন হওয়া উচিত নয়? তাঁর একটি কাজ দৃশ্যের জন্ম দেওয়া, শব্দে।
৩.
"কুসুমাকর" শব্দটার অর্থ বসন্ত। শব্দটা কখনও প্রয়োগ না করলেও আমাদের কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না। কিন্তু একটা ঋতুকে ফুলের খনি হিসেবে কল্পনা করার মাঝে মনুষ্যত্বের শক্তিটুকুও আঁকা আছে। বসন্তের গর্ভ থেকে কোনো এক অদৃশ্য কর্তা ফুল খুঁড়ে আনছে, এ দৃশ্যের পেছনে প্রাচীন কবির কৃতিত্ব আছে। আমরা এ দৃশ্যটুকু না দেখে পুরো জীবন কাটিয়ে দিতে পারতাম, তিনি একটি শব্দে এ ছবি আমাদের উপহার দিলেন। এ দৃশ্য দেখে আমাদের এক পয়সাও লাভ বাড়েনি, কিন্তু কল্পনার চরকায় তেল পড়েছে, যা পয়সা দিয়ে মেলে না, বা প্রচুর পয়সার বিনিময়ে মেলে।
রবীন্দ্রনাথ কেন বড় কবি? নোবেল পেয়েছিলেন বলে? আমার কাছে রবীন্দ্রনাথ বড় কবি তাঁর "তালগাছ" কবিতাটির জন্যে। ছড়া বলবো না, ওটা কবিতাই। তালগাছ আমার প্রিয় জিনিস, আমি সর্বদাই এর মালিকানাপ্রার্থী, সে কারণেও নয়। কবিতাটা মানুষের জীবনে এক উত্তরণপর্যায়ের দৃশ্য এঁকেছে। একটি শিশুর কল্পনা তাকে উচ্চাভিলাষী করে তুলেছে, তার মন ছুটছে উঁচুতে, বাইরে, দূরে, অগম্যের দিকে, হাওয়ার মতো সুলভ-নিত্য-প্রাপ্যের ভরসায়। যখন সে প্রণোদনা থেমে গেলো, শিশুটি মুখোমুখি হলো রূঢ় সত্যের, টের পেলো, অনেক সীমা তাকে বেঁধে রেখেছে। শিশু মনটি তখন প্রথম মুখোমুখি হলো প্রাপ্তবয়স্কতার প্রথম পাঠের, নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দেওয়ার, আত্মপ্রবোধের কঠিন দায়িত্বের। কাজটা সে হইচই-চিৎকার-অভিযোগে করলো না, করলো ভালোবাসা দিয়ে, সীমাকে সে মাতৃজ্ঞান করে নিজের স্থাবরতাকে মেনে নিলো। না বলা ছোট্ট একটা ইঙ্গিতও আছে কবিতায়, যদি নড়তে না পারো, উঁচু হও। মানবসমাজের অভিজ্ঞতার এ গোটা দৃশ্যটা রবীন্দ্রনাথ ফুটিয়েছেন একটা তালগাছের মধ্যে, শিশুপাঠ্য করে। একটা তালগাছের বুকে তিনি নক্ষত্রযাত্রার স্বপ্ন ফুটিয়েও তাকে মাটির সন্তান করে রাখলেন। পৃথিবীর শেষ তালগাছটা যতোদিন সারাদিন ঝরঝর থত্থর কাঁপে পাতা পত্তর করে টিকে থাকবে, রবীন্দ্রনাথ ততোদিন বড় কবি হিসেবে রয়ে যাবেন এ দৃশ্যের জন্যে।
কবিদের কাজটা হয়তো এ জন্যেই গল্পকার-ঔপন্যাসিকের চেয়ে অনেক কঠিন। তাঁরা আমাদের শব্দের খনি। যে কবি নতুন একটা শব্দ তাঁর সহভাষীদের জন্যে দিয়ে গেলেন না, তিনি নিজেকে খননও করলেন না, বোকাখোদা রয়ে গেলেন। আজকাল মাতৃদুগ্ধপান "টেকসই" করার ডাক যারা দেয়, তারা সমাজে যথার্থ যোগ্য কবির অভাব নির্দেশ করে কেবল। শব্দের মাঝে দৃশ্যগুণ সন্ধানের, বা রোপণের কাজ তো আমলোকের নয়, আমলারও নয়, সেটা কবির চারণক্ষেত্র। মহাকাল আমাদের এমন কবি দিক, যিনি শব্দের বসন্ত।
৪.
কৌশলের দুনিয়ায় পৃথিবীকে দু'ভাগ করেছে তাপগতিবিদ্যা। মোটা দাগে দুনিয়া প্রাকতাপগতিবিদ্যা আর উত্তরতাপগতিবিদ্যায় ভাগ করা যায়। মানুষ দীর্ঘদিন পেশীশক্তি (নিজের বা পশুর) অথবা প্রাকৃতিক শক্তির (জল আর হাওয়ার স্রোত) ওপর নির্ভরশীল ছিলো, তাপগতিবিদ্যা তাকে শেখালো, দহনকে চলনের কাজে লাগানো যায়। এ বিদ্যার সূক্ষ্ম দিকগুলো ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো আত্মস্থ করেছে, উপনিবিষ্ট মানুষেরা এর শিকার হয়েছে। তাপগতিবিদ্যার ফসল তারা পেয়েছে তৈরি পণ্য হিসেবে, যার উৎপাদনে তার ভূমিকা সীমিত, সে কেবল এর নিরুপায় ভোক্তা, কিংবা বড়জোর তোতাপাখি মিস্ত্রি। বস্তুর সরবরাহে তার নিয়ন্ত্রণ নগণ্য বলে শব্দের সরবরাহেও সে কুণ্ঠিত এবং আত্মশক্তিচর্চারহিত থাকে। জলখনিত কন্দরের মতো এক বিকট শূন্যস্থান নিয়ে সে পড়ে থাকে, "অন্য" এসে তাকে পূরণ করবে বলে। এ বিষচক্র কাটানো হয় না বলে আজও বহু যন্ত্র বা যন্ত্রাংশের জন্যে কোনো বাংলা শব্দ নেই।
এঞ্জিন বা মোটরের কথা বাদ দিয়ে খুব প্রাচীন কিছু যন্ত্র বা সাধিত্রের দিকে যাই। লিভার অ্যাকশনের সাথে আমরা বহুবছর ধরে পরিচিত, ঢেঁকি বা সেচযন্ত্র থেকে সেটা স্পষ্ট। কিন্তু লিভারের কোনো বাংলা নেই এখনও। যেমন নেই গিয়ার, লিফট বা ক্রেনের। নেই স্ক্রু, রেঞ্চ, স্প্যানার বা স্ক্রু-ড্রাইভারের। প্রাগতাপগতিবিদ্যা দুনিয়াতেও এগুলো ছিলো, কিন্তু আমাদের সচেতন ব্যবহারে শব্দগুলো এসেছে সরাসরি ইংরেজি থেকে। প্রাকতাপগতিবিদ্যা যুগের ফ্যান্টাসি গল্প হোক, বর্তমানের অ্যাডভেঞ্চার হোক, কিংবা ভবিষ্যতের কল্পবিজ্ঞান হোক, নিজভাষায় এ অতি সাধারণ যন্ত্রগুলো নিয়ে লেখার শক্তিও আমরা অর্জন করিনি এখন পর্যন্ত।
দরকারটা কী? এ প্রশ্নটা অনেকেই বিরক্ত হয়ে করেন। রেঞ্চের বাংলা দিয়ে কী হাতিঘোড়া হবে? রেঞ্চের বাংলা করলে আমরা কি রাতারাতি হাউই খাড়া করে মঙ্গলে চলে যাবো? রেঞ্চকে রেঞ্চ লিখলেই কি না খেয়ে মরবো? চেয়ার-টেবিল-স্টেশন-স্কুল-ব্যাট-বল দিয়ে কি কাজ চলছে না?
গ্লানিটা আসলে যে লোকটা রেঞ্চ দিয়ে কাজ করে, তার নয়। একান্তই লেখকের। কারণ তাঁর কাজ শব্দ নিয়ে। প্রতিবার রেঞ্চ শব্দটা লেখার সময় লেখককে নিজের গোত্রীয় অক্ষমতার মুখোমুখি হতে হয়। কেউ সেটাকে পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন, যেভাবে প্রতিদিন সহস্রবার আমরা যাচ্ছি। কেউ থেমে গিয়ে এ কাঁটার খোঁচা খেতে পারেন। যিনি খোঁচাটা খাবেন, তিনি একটা নতুন শব্দ নিয়ে আসবেন, তাঁর সহভাষীদের জন্যে উপহার হিসেবে। এ থেকে তাঁর একটা টাকাও বাড়তি লাভ হবে না, দুটো বাড়তি হাততালির শব্দ সাথে নিয়েও তিনি ঘুমাতে যাবেন না। নতুন শব্দগুলো কার্নিশের ওপর ফোটা একটা ছোট্ট নাম-না-রাখা ঘাসফুলের মতো (নাম-না-রাখা আবার কী? ডালিয়ার মতো এর নাম দিন কপোতপালিয়া), সেটা গজায় কারণ সেটা গজাতে পারে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিজের কানে ফিসফিস করে ষড়যন্ত্র করে যায় সেটা ফুটবে বলে।
বালক জগদীশচন্দ্রের স্পৃহা থেকে লিভারের বাংলা আমরা করতে পারি চাড়ুনি। লিভারের মূল ফরাসি ল্যভিয়ে-এর অর্থও তাই, যা দিয়ে চাড় দেওয়া হয়। দোলনার আদলে লিফটকে বলতে পারি তোলনা। ক্রেনের বাংলা করতে পারি ভারকল। গিয়ারের বাংলা করতে পারি দাঁতচাকা। শব্দগুলোর মধ্যে দৃশ্যগুণ আছে কি নেই, তার বিচারের ভার আমাদের সবার হাতে। বরং এরচেয়ে ভালো আরো কোনো শব্দ আসুক, আমাদের কারিগরি শিক্ষার বইগুলোতে এক একটা যন্ত্র কেবল ইংরেজি নামের বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ না হয়ে দৃশ্যগুণসম্পন্ন একেকটা নামে ভরে যাক।
সে দিন আসার আগ পর্যন্ত আমাদের গল্প লিখে যেতে হবে। ফ্যান্টাসি গল্পে একটা পাগলাটে মিস্ত্রির জন্যে জায়গা যদি রাখতে চাই, এসব টুকিটাকি যন্ত্রপাতির বাংলা তো লাগবেই। তোমার যন্ত্র যাহারে দিয়াছ, তারে (অন্তত বাংলা নাম ধরে) কহিবারে দ্যাও শকতি।

শুদ্ধিটীকা: মূল লেখায় "চাঁড়" লেখা হয়েছিলো। সাক্ষী সত্যানন্দ বানানভুল ধরিয়ে দেওয়ার পর পাল্টে "চাড়" লেখা হলো।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।