Saturday, July 22, 2017

শব্দগল্পদ্রুম ০৪

শব্দের প্রথম ও প্রধান কাজ নতুনকে বেধ করা, যেভাবে শুক্রাণু বেধ করে ডিম্বাণুকে। এরপর শব্দ আর নতুন মিলেমিশে এক ভ্রুণ জন্ম দেয়, যাকে আমরা বলতে পারি, "ধারণা"।
নিল নদের তীরে হেরোডোটাস দেখেছিলেন, প্রকাণ্ড সব কুমির রোদ পোহাচ্ছে। গ্রিসে কুমির নেই, গ্রিক ভাষাতেও তখন কুমিরের প্রতিশব্দ থাকার কথা নয়। হেরোডোটাসের কুমিরদর্শনের আগ পর্যন্ত গ্রিক ভাষার ভাণ্ডারে অন্তত একটা শব্দ কম ছিলো। হেরোডোটাস মাতৃভাষায় কুমিরের নাম রাখেন "পাথরকৃমি"। গ্রিকে ক্রোকে মানে নুড়ি, দ্রিলোস মানে কৃমি, দুয়ে মিলে খানিক উচ্চারণ পাল্টে সেটা হয়ে যায় ক্রোকোদিলোস। আমরা যেমন ইংরেজি থেকে অকাতরে শব্দ নিয়ে তার নিচে চাপা পড়ে গেছি, ল্যাটিনও একই ভাবে গ্রিক থেকে শব্দ ধার করায় ক্রোকোডিলাস শব্দটা রোমান সম্প্রসারণের সাথে গোটা ইয়োরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ইয়োরোপের প্রায় সব ভাষায় এখন কুমিরকে ক্রোকোদিলোসের কোনো এক তদ্ভবে ডাকা হয়। হেরোডোটাস কুমিরের নতুনত্বকে বেধ করেন তৎপুরুষ সমাসে, নুড়ি আর কৃমি সম্বল করে, যার সাথে কুমিরের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। চুটকির সেই পাগলটার মতো ম্যাকগাইভার যেমন মেয়েদের অন্তর্বাসের স্থিতিস্থাপক ফিতা খুলে নিয়ে তার সাথে চুলের কাঁটা বা চুষনিকাঠি জুড়ে তুলকালাম ঘটিয়ে ছাড়ে, হেরোডোটাসও যেন সে কাণ্ডই করেছেন শব্দ নিয়ে। একবার যখন ক্রোকোদিলোস শব্দটা এই অদৃষ্টপূর্ব জানোয়ারকে গেঁথে ফেললো, কুমিরের ধারণাটা তখন গ্রিক ভাষার গর্ভে জন্ম নিলো, এবং ল্যাটিনভাষীদের গ্রিকমোহ আর সামরিক প্রতাপের কল্যাণে ছড়িয়ে পড়লো বিরাট এলাকা জুড়ে।
"আ সং অফ আইস অ্যান্ড ফায়ার"-এর বইগুলো যারা পড়েছেন, তারা লক্ষ করে থাকবেন, ওয়েস্টেরোসের নেক এলাকায় কুমিরের এই নতুনত্বকে মার্টিন বেধ করেছেন ভিন্ন দুটো উপাদানশব্দ দিয়ে, উপমিত কর্মধারয়ের চুলোয় গলিয়ে: লিজার্ড-লায়ন বা সর্পসিংহ। নতুনকে পুরনো দিয়ে চেনার প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক, যেমনটা চিনেছিলেন হেরোডোটাস। মার্টিন শুধু আরেকধাপ এগিয়ে কুমিরকে বিঁধেছেন মাতৃভাষার শব্দে। এই ধাপটা ছোটো, কিন্তু তাৎপর্য বিচারে গভীর, অনেকটা চাঁদের বুকে ঈগল থেকে নেমে আসা মইটার শেষ ধাপের মতো।
কয়েক বছর আগে চাকমা ভাষায় নির্মিত একটি চলচ্চিত্রের নাম দেখে চমৎকৃত হয়েছিলাম। "মর ঠ্যাংগাড়ি", ইংরেজি শিরোনাম ছিলো মাই বাইসাইকেল। আমরা বাইসাইকেলকে "সাইকেল" ডাকি, "দ্বিচক্রযান" শব্দটা সে তুলনায় বুলডোজারের মতো ভারি, ব্যবহার করতে গেলে বাইসেপ-অহম-যদিবলিলোকেহাসবে ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় টান পড়ে। বিমল মুখোপাধ্যায় তাঁর স্মৃতিকথা "দুচাকায় দুনিয়া"-র শিরোনামে বাইসাইকেলের একটা সহজ, অনায়াসোচ্চার্য বাংলা বাতলে দিয়েছিলেন, কিন্তু সাইকেলকে দুচাকা বলাটা ঠিক যেন ভেতর থেকে আসে না। চাকমাভাষী পরিচালক এ সংকোচ ঝেড়ে বাইসাইকেলকে ঠ্যাংগাড়ি ডেকে একে সিনেমার শিরোনাম করেছেন, তাঁকে সাধুবাদ জানাই। নতুনকে তিনি আপন পুরনো সম্বল দিয়ে চিনেছেন, আমরা পারিনি।
নতুনকে নিজের মতো করে চিনে নেওয়ার অভ্যাসটা জরুরি, সেটা করতে না পারলে চিরকাল নতুনের নিষ্ক্রিয় ভোক্তা হিসেবে থেকে যেতে হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রেলব্যবস্থা একান্ত ইংরেজের উদ্ভাবন, প্রায় সকল উপনিবেশে তারা এটি রোপণ করেছে পণ্য ও সেনা স্থানান্তরের সুবিধার জন্যে। প্রতিযোগী ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোও রেলপ্রযুক্তি আত্মস্থ করেছে, নিজেদের উপনিবেশে ছড়িয়েছে, কিন্তু ইংরেজের দেওয়া নামটিকে তারা নেয়নি। ফরাসিরা বলে শ্যমাঁ দ্য ফেখ, স্পেনীয়রা বলে ফেরোকারিল, জার্মানরা বলে আইজেনবান, ইতালীয়রা বলে ফেরোভিয়া, রুশরা বলে ঝেলেজনাইয়া দারোগা, ফারসিতে বলে রাহি আহান, তুর্কিতে বলে দেমির ইয়োলু (মধ্য এশীয় তুর্কিঘেঁষা ভাষাগুলো, যেমন কাজাখ-কিরগিজ-উজবেকে বলে তেমির জল), ইন্দোনেশীয়/মালয় ভাষায় কেরেতা আপি, আমহারিকে ইয়েবাবুরি হাদিদি... মোট কথা, সবার ভাষায় এর অর্থ অভিন্ন: লৌহপথ। আমরা রেলব্যবস্থা পেয়েছি আমাদের খরচে, কিন্তু ইংরেজের মর্জিতে, এখনও সেটাই যেন আমরা মাথায় করে চলছি। আমি বলছি না যে "রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ" থেকে "সড়ক ও জনপথ" কিংবা "রেডিও বাংলাদেশ" থেকে "বাংলাদেশ বেতার" নাম রাখার মতো "বাংলাদেশ রেলওয়ে" নাম পাল্টে "বাংলাদেশ লৌহপথ" করলে রাতারাতি আমরা রেলব্যবস্থায় উন্নতি করে ফাটিয়ে ফেলবো, কিন্তু এটা সেই ঈগলের মইতে শেষ ধাপটার মতো, অচেনাকে নিজের মতো করে চেনার শুরু। ডাকাতের ফেলে যাওয়া ছেঁড়া চটি কপালে বেঁধে না ঘোরার মাঝে যতোটুকু উন্নতি আছে, ততোটুকুই বা করতে সমস্যা কোথায়?
স্টেশনকে ইস্টিশন, স্টিমারকে ইস্টিমার আর স্কুলকে ইস্কুল ডেকে শব্দগুলোকে বাঙালি রসনাবান্ধব করে শ'দেড়েক বছর আগে বাংলাভাষীরা ক্ষান্ত হয়েছিলেন, কারণ এমন কোনো পৃথিবী তাঁরা কল্পনা করতে সক্ষম হননি, যেখানে ইংরেজিভাষীর প্রাধান্য থাকবে না। ঠিক যেভাবে মোগল আমলে তাঁরা আইন-দলিল নিয়ে কাজ করার সময় ফারসিভাষীর-লাঠি-থেকে-মুক্ত পৃথিবী কল্পনা করতে অক্ষম ছিলেন। আজও আমাদের অবচেতনে ভবিষ্যৎকল্পনায় ইংরেজিরই রমরমা। যদি কোথাও কোনো পিঠা থাকে, সবাই সেটার ভাগ চায়। আমরা তাই কয়েকশ বছর ফারসি পিঠার টুকরার জন্য দৌড়েছি, তারপর দৌড়ে চলছি ইংরেজি পিঠার টুকরার পেছনে। নিজেরা যে একটা পিঠা সেঁকে নিতে পারি, এ উপলব্ধি আমাদের এখনও হয়নি। সামনের পৃথিবীতে যে হিন্দি কিংবা চীনা পিঠার টুকরার জন্যে ফ্যাফ্যা করে আমাদের ঘুরে বেড়াতে হবে না, সেটা কে বলতে পারে?
ফারসি বা ইংরেজির বিস্তারের আমলেও পৃথিবীতে নতুনের সরবরাহ ছিলো মন্থর। এখন সে গতি সহস্রগুণে বেড়েছে। নতুনের সরবরাহ কাদের হাতে, সে তালিকা খতিয়ে দেখলে নিজেদের খুঁজে পাবো না আমরা। কারণ নতুনকে বিদ্ধ করার শক্তিই আমাদের নেই। যা কিছু এ শক্তি যোগায়, তার মাঝে হাওয়ার মতো অদৃশ্য-কিন্তু-অপরিহার্য উপকরণ ভাষা। আর ভাষা বিস্তার পায় গল্পে, কবিতায়, গানে, সংবাদে, ইদানীং ব্লগ-ফেসবুকের স্বগত সংলাপে। আমরা যদি নিজেকে নিয়ে সারাক্ষণ কুণ্ঠিত থাকি, আর অন্যের দিকে চেয়ে এর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অনুমোদন খুঁজি, আমাদের জীবন কেটে যাবে অন্যের অনুমোদনের অপেক্ষায়। নতুনকে নিজের মতো করে চিনতে কেন অন্যের অনুমোদন লাগবে?
ফ্যান্টাসি গল্প শেষ পর্যন্ত পুরনোর মাঝে নতুনের সন্ধান, কিংবা নতুনের মাঝে পুরনোর। বাস্তবে আমরা যে ধাপটায় এসে থমকে গেছি, ফ্যান্টাসি গল্পে সেটা অনায়াসে টপকানো যায়। দেড়শ বছর আগে আমাদের উত্তরসূরীরা যে নতুনকে বিদ্ধ করতে পারেননি, ফ্যান্টাসি গল্পের নবীন চরিত্র গল্পের পাতায় সেটা পারে। ধরুন, একটি চরিত্রকে কোনো তৃণভূমিঘেরা নদীর বুকে নৌকায় বসিয়ে দিলাম; পাটাতনে বসে সে দেখতে পায়, তালগাছের মতো মস্ত গলার একটা হরিণ আকাশমণি গাছের পাতা চিবিয়ে খাচ্ছে, আর একগাদা সাদাকালো ডোরাকাটা ঘোড়ার মতো দেখতে জীব দুদ্দাড় ছুটে যাচ্ছে একদিকে। জিরাফ আর জেব্রা শব্দদুটো ঐ কাল্পনিক দুনিয়ায় অনুপস্থিত। হেরোডোটাসের মতো ঐ চরিত্রটিও তখন নতুনের মোকাবেলা করে নিজের চেনা জগতের শব্দ দিয়ে; যাত্রা শেষে ভিনদেশে পৌঁছে আরেক চরিত্রকে সে তালহরিণ আর ডোরাঘোড়ার একগাদা গল্প শোনায়। তালহরিণ আর ডোরাঘোড়া শেষ পর্যন্ত গল্পের গণ্ডি পেরিয়ে আর বাস্তবে পা রাখবে কি রাখবে না, সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায় ঐ চরিত্রটির নেই। অচেনাকে চেনার জন্যে আপনাকে চেনার কাজটা সে করছে শুধু, যাতে গল্পের কোনো অংশে পাঠকের-পৃথিবীতে-অনুপস্থিত, এমন কোনো আনকোরা নতুন জীবের সন্ধান পেয়ে তা নিয়ে কথা বলার সুযোগ তার থাকে।
দ্রিঘাংচু-ট্যাঁশগরু-কুমড়োপটাশ-স্বর্ণপর্ণীতে গিয়েই কি ফ্যান্টাসি পশুপাখিলতাপাতা নিয়ে বাংলায় গুলগল্পের সুযোগ ফুরিয়ে যাবে? উঁহু।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।