Wednesday, July 12, 2017

শব্দগল্পদ্রুম ০৩

১.
ব্যাকরণ শিক্ষাকে "বাংলা দ্বিতীয় পত্র" করে রাখার ব্যাপারটা একটু "কেমন" না? গল্প-কবিতাকে প্রথম শ্রেণীর কামরায় তুলে ব্যাকরণকে যেন চড়তে বলা হচ্ছে দ্বিতীয় শ্রেণীর খটখটে আসনে। যাঁরা বিদ্যালয়ে শিক্ষার খুঁটিনাটি সাজান, তাঁদের অবচেতনেও হয়তো এমনই ভাবনা কাজ করেছে: এসব যেন ঠিক পাঙক্তেয় নয়। প্রয়োগের ক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে চাঁছাছোলা ব্যাকরণকে প্রবাদ-প্রবচন, ভাব সম্প্রসারণ, সারমর্ম, টাকা চাহিয়া পিতার কাছে পত্র, চিকনগুনিয়া রোগে ছুটি চাহিয়া প্রধান শিক্ষকের নিকট ছুটির দরখাস্ত, শ্রমের মর্যাদা বা অধ্যবসায় বা গরু রচনার সঙ্গে ঘুঁটে "বাংলা দ্বিতীয় পত্রে" পেয়েছি আমরা। প্রায়শই, অত্যন্ত বদমেজাজি শিক্ষকের হাতে। এর ফল কী পেলাম?
মাতৃভাষায় নতুন শব্দ নির্মাণে নিদারুণ নিরাগ্রহ মানুষের সারি। কাতারে কাতারে।
শব্দ তৈরির কারখানায় টুকিটাকি যন্ত্রপাতি, সমাস-প্রকৃতি-প্রত্যয়-উপসর্গ-অনুসর্গ, ব্যবহারে যখন কাঁচা রয়ে যাই আমরা, তখন বিকল্প বাংলা শব্দ তৈরির দিকে আগ্রহ, বা নতুন শব্দ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধির শক্তি, হারিয়ে ফেলাই স্বাভাবিক। ব্যাকরণশিক্ষকের ওপর জমে থাকা রাগটা তখন পড়ে অচেনা শব্দ ব্যবহারকারীর ওপর। দ্বিতীয়-তৃতীয় ভাষার মতো মাতৃভাষাও যে খেটে শিখতে হয়, সে বিবেচনাটা তখন আর কাজ করে না।
হয়তো বাংলাকে "মাতৃভাষা" হিসেবে দেখার মধ্যেও একটা গলদ আছে। আমাদের মায়েদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা কতোটুকু, যাচাই করে দেখার সময় এসেছে বোধহয়। আমরা কি আশা করি, আমাদের মা তাঁর নিজ ভাষায় আমাদের কণাবিজ্ঞান শেখাবেন, শেখাবেন নক্ষত্রের জন্মবৃত্তান্ত, রসায়নের রহস্য, গণিতের খুঁটিনাটি, বলবেন অণুজীবের জগতের কথা, শারীরবিদ্যার চমকপ্রদ সব তথ্য, উদ্ভিদ-ছত্রাক-পতঙ্গের জীবনচক্র? আমরা মায়ের কাছে "ঘুম থেকে ওঠ", "ভাত বেড়েছি খেতে আয়", "দুধটুকু খেয়ে নে বাবা", "এক চড়ে দাঁতগুলো ফেলে দেবো" শুনেই কি সন্তুষ্ট নই? চলচ্চিত্রে হোঁৎকা নায়ক সমবয়স্কা অভিনেত্রীকে মা ডেকে "আমি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছি" বলতে বলতে বুড়ো হয়ে যায়, কিন্তু কখনও দেখিনি, কোনো সিনেমার মা শাস্ত্রব্যাখ্যা করছেন সন্তানের কাছে। গড় মানুষের কথা মাথায় রেখেই চলচ্চিত্র বানানো হয় যখন, গড়পড়তায় আমাদের কাছে মা একটি পুষ্টি যোগানো ঘণ্টার মতো, থেকে থেকে সঙ্কেতসূচক শব্দ করেন কেবল, সে শব্দের দৌড় সীমিত। মায়ের কাছে ব্রহ্মাণ্ডের কোনো শাস্ত্রসম্মত ব্যাখ্যা শোনার আকাঙ্খা যদি আমাদের মাঝে না থাকে, মাতৃভাষাও কি জাগরণী ডাক, অন্নগ্রহণের তাড়া, দুধপানের অনুরোধ আর দংষ্ট্রাপাতনের হুমকির গণ্ডি টপকাতে পারবে?
আমরা সতেরো কোটি মানুষের দেশে প্রাণপাত করে আধাখ্যাঁচড়া ইংরেজি শিখি, যেটা বর্তমান বিশ্বে জরুরি। কিন্তু সর্বকালে সর্বত্র সর্বজনের জন্যে আরো যে জরুরি ব্যাপার, আত্মশক্তির জাতিগত উপলব্ধি আর চর্চা, সেটায় খামতি রেখে ইংরেজি শেখার পেছনে বাংলাকে নিরামিষ ঘরে-চর্চার মাতৃভাষা হিসেবে দেখার প্রবণতাও কি বহুলাংশে দায়ী নয়? আমরা যদি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা, কার্যভাষা, শিক্ষাভাষা, জ্ঞানভাষা হিসেবে মন থেকে মেনে নিতে না পারি, শেষ পর্যন্ত বাংলার কাছে আমাদের চাওয়াও সীমিত হয়ে আসবে। বাংলাকে মাতৃভাষা বলে নাকে কাঁদার আগে আমাদেরই উদ্যোগ নিয়ে মায়ের হাতে মহাকাশের মীমাংসিত রহস্যের বিবরণ তুলে দিতে হবে ঝরঝরে বাংলায়, যন্ত্রশাস্ত্রের সূক্ষ্মতম দিকটিও প্রাঞ্জল করে লেখা থাকতে হবে বাংলায়, পরমাণু থেকে মহাদ্রুমের বৃত্তান্ত খোলাসা করে বলতে হবে মায়ের ভাষায়। যতোদিন আমরা সেটা করতে না পারবো, ততোদিন পর্যন্ত আমরা কেবল অপরের অভিজ্ঞতার খণ্ডিত অংশ হিসেবে নিজেদের চিনতে বাধ্য হবো। তাতে হয়তো সকলের মনে গ্লানি জাগবে না, কারণ নিরোধের অস্তিত্বের যাথার্থ্য অপরের শুক্র সংরক্ষণে, মুড়িয়ে গিয়ে ফুরিয়ে গেলে তাতেই তার আনন্দ। কিন্তু লেখক?
২.
নামটা ছিলো শৃঙ্গবের, অর্থাৎ শেকড়ে শিং যার, বহুব্রীহি সমাস। পালিতে সেটা রূপ নিলো সিংগবের-এ। গ্রিকদের কাছে সেটা হয়ে গেলো জিঙ্গিবেরিস, ল্যাটিনে তা হলো জিঞ্জিবের, আদি ফরাসিতে জ্যাঁজম্ভ, আদি ইংরেজিতে জিঞ্জিফার, আধুনিক ইংরেজিতে জিঞ্জার, অর্থাৎ আদা। পারস্য-আরব-তুর্ক-রুশসহ ইয়োরোপের প্রায় সকল ভাষায় আদার নাম এসেছে শৃঙ্গবেরের কোনো এক তদ্ভবরূপ থেকে। জার্মানরা বলে ইংভার, পারসিরা বলে জানজাবিল।
কিংবা খরগোশ। ফারসিতে বহুব্রীহি সমাসের আরেকটা উদাহরণ। খর (গাধা)-এর মতো গোশ (কান) যার, বহুব্রীহি সমাসে খরগোশ। ইংরেজিতেও আছে বহুব্রীহি সমাসের নানা উদাহরণ, পেইলফেইস বা রেডনেক বা ব্ল্যাকশার্ট।
বহুব্রীহি সমাস বিষয়ে বেত্রহস্ত রক্তচক্ষু শিক্ষকের বাজখাঁই প্রশ্নের উত্তাপে এর সরস অংশটুকু বাষ্পীভূত হয়ে যায় অকালেই। অথচ নতুন শব্দ নির্মাণে এর ভূমিকা প্রবল, বাংলা ছাড়া অপর ভাষাতেও। পাঠদানের সময় এক একটা সমস্ত পদ দিয়ে সেটাকে সমস্যমান পদসমূহে ভেঙে সমাস চিহ্নিত করতে বলা হতো আমাদের, ঠাঠা মুখস্থ করে কাজ চালানো যেতো শতভাগ। কিন্তু যদি উল্টো দিক দিয়ে শেখানোর চেষ্টা করা হতো? যদি প্রত্যেক ছাত্রকে দায়িত্ব দেওয়া হতো, বহুব্রীহির আওতায় একটা/দুটো/পাঁচটা/দশটা করে নতুন শব্দ বানিয়ে আনতে? লেখাপড়ায় নিতান্ত অমনোযোগী ছাত্রটিও কিন্তু ব্যাকরণের চৌকাঠ না মাড়িয়েই চশমাপরা সহপাঠীটিকে "চারব্যাটারি" ডেকে ক্ষ্যাপাতে জানে। চারব্যাটারির মতো চমৎকার বহুব্রীহি সমস্ত পদের উদাহরণ ছাত্রমহলে কমই থাকে। কিন্তু শেখানোর ভঙ্গি আর উদ্দেশ্যের পাকে পড়ে চারব্যাটারি শব্দটির প্রণেতা ভাষায় অবদান রাখার স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হয়, একঘেয়ে "বহুব্রীহি আছে যাহার = বহুব্রীহি, বহুব্রীহি সমাস" মুখস্থ করে প্রথমে সমাসকে, তারপর ব্যাকরণকে অপ্রয়োজনীয় জ্ঞান করে।
অথচ নতুন শব্দ নির্মাণের তাগিদ কিন্তু জীবনে রয়ে যায়। আমরা একে আলোহাওয়া দিতে শিখি না।
গ্রামের মানুষ গ্রেটার র‍্যাকেট-টেইল্ড ড্রঙ্গো (Dicrurus paradiseus) বা ভীমরাজের কথ্য নাম রেখেছে হোগায়নিশান। খুব শ্রুতিমধুর বা রুচিসম্মত, সে দাবি করবো না। কিন্তু বহুব্রীহি সমাসের একেবারে কড়কড়ে উদাহরণই শুধু নয়, বাংলায় যেসব পাখির নাম সুলভ নয়, তাদের নামকরণের একটা কৌশলও এই গ্রাম্য নামটায় নিহিত আছে। পাশাপাশি কারণে-অকারণে গাড়ির পেছনের কাঁচে যারা "সাংবাদিক" "মানবাধিকার" "উচ্চ ভাসুর" ইত্যাদি প্ল্যাকার্ড সেঁটে উল্টোপথে গাড়ি হাঁকান, তাদেরও আদর করে বাল্যকালের চারব্যাটারির প্রাপ্তবয়স্ক সংস্করণ হিসেবে হোগায়নিশান ডাকার একটা প্রেরণা মেলে।
এখন একটা পরিস্থিতি কল্পনা করুন। লেখক হিসেবে যদি একটা ফ্যান্টাসি গল্পে কোনো চরিত্রকে গভীর সাগরে পাঠাই, আর সে যদি জীবনে প্রথমবারের মতো অ্যালবাট্রসের দেখা পায়, আর আমি যদি এই অতুলনীয় পাখিটিকে বাংলায় কোনো নামে ডাকতে চাই, নামের সন্ধানে কার কাছে যাবো আমি? কোন পণ্ডিতের দরবারে, কোন গ্রন্থের পাঁজরার ভেতরে, কোথায় কোন ধুলোপড়া অভিলেখাগারের ছাতাপড়া দলিলে টোকা আছে অ্যালবাট্রসের বাংলা নাম? কোথাও নেই। কেউ রাখেননি। আমার সম্বল তখন ঠেকে, ঠোক্কর খেয়ে আধশেখা বাংলা ব্যাকরণ, যাকে আমি গিলেছি, কিন্তু হজম করিনি। আমার সম্বল তখন বহুব্রীহি সমাস, শৈশবের চারব্যাটারি, আধবুড়ো বয়সের হোগায়নিশান, আর পৃথিবীর যা কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, বাংলা গল্পের সাধারণ একজন চর্চাকারী হিসেবে তার সবকিছু বাংলায় চেনার আর চেনানোর সংকল্প। আমার গল্পের চরিত্রের ওপর দিয়ে তাই বিশাল অলস ডানা মেলে একটা "চাঁদোয়াডানা" উড়ে যায়। বাংলা ভাষার দীঘিতে শিশির হিসেবে এটা আমার এক ফোঁটা অবদান। আপনার পছন্দ না হলে আপনি অন্য কিছু রাখুন।
বরং পণ করুন, কিছুতেই যেন এ শব্দটা আপনার পছন্দ না হয়। দীঘিটা তাহলে বাড়বে।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।