Sunday, August 14, 2016

রামপালে বামপাল: ০২

প্রথম পর্বের পর আবারো বামপালিদের গোড়ালিবন্দী প্যান্ট নিয়ে কথা বলতে ফিরে এলাম।
প্রথম পর্ব লেখার পর আমার পর্যবেক্ষণ, রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধিতা যারা করছেন (এদের সবাই বামপাল নন), তারা তর্কে খুব সক্রিয় হলেও রেফারেন্স যোগাতে উদাসীন/অপারগ। কেউ কেউ একটা স্টেটমেন্ট দিয়ে জরুরি কাজে বাইরে চলে যান, সেটার সপক্ষে কোনো তথ্যসূত্র হাজির করতে বললে সাড়া দেন না। কিংবা এমন কোনো তথ্যসূত্র দেন, যেটা তিনি নিজেও পড়ে দেখেন নি বলে টের পান না যে ভেতরে তার কথার সপক্ষে কোনো কিছু লেখা নেই, অথবা লেখা আছে তার কথার বিপক্ষে ব্যবহার করা যায়, এমন কিছু।
আমার উপলব্ধি, বেশিরভাগ মানুষ এখন আর তথ্যসূত্র যাচাই করার জন্যে পড়ে না। বামপালও এ কথা জানে, তাই তারা নিজেদের যুক্তি এমনভাবে উপস্থাপন করে, যেন কেউ আর কষ্ট করে সেগুলো যাচাই করে দেখতে না যায়। যদিও যাচাইয়ের অবারিত দুয়ার হিসেবে গুগল খোলা আছে। কিন্তু লোকে যতো বেশি পড়ে, ততো বেশি জানে, ততো কম মানে।
যারা কোনো কিছু না পড়ে "আমার খালু কৈছে" বলে তর্ক করতে চান, এই পোস্ট তাদের মুক্তোবনে উলুর মতো অপ্রাসঙ্গিক। আর মতলববাজদের জন্যে আগাম সতর্কবার্তা, রামপালে নির্মিতব্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের ক্ষতি করবে কি করবে না, সে ব্যাপারে আমার কোনো বক্তব্য নেই। আমি রামপালের বামপালদের প্রচারণার কয়েকটি ভুল এবং/অথবা অসত্য পয়েন্ট ব্যবচ্ছেদ করতে চাই কেবল। কেউ যদি সুন্দরবনের ওপর রামপালের কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে চান, কষ্ট করে তথ্যসূত্রসহ পোস্ট দিন। ধন্যবাদ।

রামপাল ঘোলাপানির প্রথম চাতুর্য হচ্ছে একে সুন্দরবনের মাঝখানে একটা বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে চালিয়ে দেওয়া। সুন্দরবনের প্রান্ত থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে, এই অবিসংবাদিত ফ্যাক্টটা যাতে লোকচ্যাতানোর পথে কাঁটা হয়ে না দাঁড়ায়, সেজন্যে একে প্রথমেই হাপিস করে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে ভিনভাষী পত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে, সবাই এখন জানে, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের মাঝে ফ্যাসিবাদী বনখোর সরকার এক গরানযজ্ঞের আয়োজন করছে।
যারা এখনও জায়গা "ক" থেকে জায়গা "খ" এর দূরত্ব ঘরে বসে মাপতে জানেন না, তাদের সে কৌশলটি শেখাতে চাই। maps.google.com এ যান, গিয়ে প্রথম জায়গার ওপর মাউস রেখে ডান বাটনে ক্লিক করলে পপ-আপ মেনুতে একেবারে নিচে "Measure distance" অপশনটা পাবেন। এতে যে ফল পাবেন, সেটা এরিয়াল ডিসট্যান্স বা সরলরৈখিক দূরত্ব। যদি গাবতলি থেকে জাহাঙ্গীরনগরের দূরত্ব পরিমাপ করেন, দেখবেন সেটাও ১৪ কিলোমিটারের মতোই আসবে। জাহাঙ্গীরগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক শ্রদ্ধেয় আনু মোহাম্মদকে যদি এখন কেউ "গাবতলির মাস্টার" বলে, সেটা কি ন্যায্য হবে? ১৪ কিলোমিটার দূরত্বের পার্থক্য আর গুরুত্বটা ধরতে না পারলে, প্রয়োগে অনীহা দেখালে এমন ভুল এবং/অথবা অন্যায় হতে পারে, যেটা কাম্য নয়।
যারা যাচাই করে দেখতে ইচ্ছুক, তাদের জন্যে মাপটা ইমেজ আকারে জুড়ে দিলাম
ইদানীং অনেক রামপাল-সমর্থক বলছেন, সাভার এলাকায় শয়ে শয়ে ইটের ভাঁটা আছে, যেখানে কয়লা পোড়ানো হয়, কেন বামপালিরা ওগুলোর বিপক্ষে বিপ্লব করেন না? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ কিলোমিটারের আশেপাশে এমন ইটের ভাঁটার সংখ্যা নেহায়েত কম নয়, কিন্তু ওগুলোর হাত থেকে জাহাঙ্গীরনগরের অপূর্ব অমূল্য প্রাকৃতিক পরিবেশ বাঁচানোর ব্যাপারে কারোই (বিশেষ করে জাহাঙ্গীরনগরনিবাসী বামপাল নেতৃত্বের) তেমন মাথাব্যথা নেই, এমন কথাও বলছেন কেউ কেউ। কিন্তু আমি এসব ছেঁদো যুক্তি দেখাবো না, কারণ কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র আর ইটের ভাঁটাকে এক করে দেখানোও এক ধরনের বামপালিতা। তাছাড়া কে না জানে, বিপ্লব সব সময় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে করতে হয়? ইটের ভাঁটার মালিকের বিরুদ্ধে বিপ্লব করতে গেলে সে মাস্তান ডেকে প্রচণ্ড মার লাগাতে পারে, যে মারে রাজনৈতিক ডিভিডেন্ডের বদলে কেবলই ব্যথা মেলে। তাছাড়া ইটের ভাঁটার মালিক হয়তো কোনো বামপালি বিপ্লবীরই খালু (এ খালু সে খালু নয়")। মংলায় নির্বিঘ্নে কাজ করে যাওয়া বেসরকারি কারখানাগুলোর ব্যাপারেও বামপালিরা হয়তো এ কারণেই চুপ, কে জানে? কিন্তু এ নিয়ে পরের পর্বে নাহয় কথা বলা যাবে।
রামপাল সুন্দরবন থেকে ১৪ কিমি দূরে আর গাবতলি জাহাঙ্গীরনগর থেকে ১৪ কিমি দূরে হওয়ার পরও আমি বামপালিদের প্রিয় ধমক, "দুনিয়ার আর কোথায় ম্যানগ্রোভ বনের মইদ্যে কয়লার প্ল্যান্ট হান্দাইছে, কন দেহি!" নিয়ে দুটো কথা বলতে চাই।
রামপাল তর্কে ম্যানগ্রোভ শব্দটা বামপালি ভাইরা এতো ভক্তি ভরে এস্তেমাল করেন, যে অডিয়েন্স প্রথমেই ঘাবড়ে চুপ করে যায়। ম্যানগ্রোভ, সে তো কিশোরীর ভরসার মতো নাজুক, একটু এদিক-সেদিক হলেই সব চুরমার। কিন্তু বাস্তবেও কি তা-ই?
আমি আবারও শরণ নেবো গুগল ম্যাপের, কারণ রেফারেন্স দিলে তাতে দুর্গম ইংরেজি ভাষায় অনেক কথা লেখা থাকে, যা পড়ে বোঝার ধৈর্য বা সাধ্য অনেক রক্তগরম বিপ্লবীর না-ও থাকতে পারে। ছবি দিলে অনেকে সহজে বুঝতে পারেন, তাই ছবি-ই সই।
প্রথম যে উদাহরণটা দিচ্ছি, সেটা ফ্লোরিডার সাইট্রাস কাউন্টির ক্রিস্টাল রিভার এনার্জি কমপ্লেক্সের। ফ্লোরিডার সাইট্রাস কাউন্টি এর ক্রিস্টাল নদীর মোহনার উত্তরে ও দক্ষিণে গড়ে ওঠা ম্যানগ্রোভ বনের জন্যে বিখ্যাত। এই প্ল্যান্টটা একেবারে ম্যানগ্রোভ বনের মাঝখানে বানানো, এর চারপাশে ম্যানগ্রোভের বলয় আপনারা নিজেরাই দেখে নিতে পারবেন। এর উত্তরে রয়েছে ওয়াকাসাসা বে প্রিজার্ভ স্টেট পার্ক, দক্ষিণে সেন্ট মার্টিন মার্শ অ্যাকুয়াটিক প্রিজার্ভ আর ক্রিস্টাল রিভার প্রিজার্ভ স্টেট পার্ক। বামপালি ভাইয়েরা পার্ক নাম দেখে লাফিয়ে উঠে এটাকে শিশু পার্কের সমতুল্য কিছু বানিয়ে একটা মনকলা খেয়ে নিতে পারেন, কিন্তু প্রিজার্ভ স্টেট পার্ক মূলত সংরক্ষিত বন।
উইকিপিডিয়া বলছে [সূত্র ১] এই এনার্জি কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করা হয়েছিলো ১৯৬৬ সালে, ৩৭৩ মেগাওয়াট কয়লা ইউনিট দিয়ে। ১৯৬৯ সালে ৪৬৯ মেগাওয়াটের আরেকটি কয়লা ইউনিট এতে যোগ করা হয়। ১৯৭৭ সালে এখানে যোগ করা হয় ৮৪২ মেগাওয়াটের একটি নিউক্লিয়ার ইউনিট (চিন্তা করেন, ম্যানগ্রোভ বনের মাঝে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র! আরো চিন্তা করেন, ঐ আমলে বামপালি ভাইরা ফ্লোরিডায় থাকলে কত্তো বিপ্লব করতে পারতেন?), যেটা ৩৬ বছর চলার পর ২০১৩ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয় জনাব, ১৯৮২ আর ১৯৮৪তে এই পাষণ্ড বনখোরেরা ৭১৭ মেগাওয়াট করে আরো দুটো ইউনিট এতে যোগ করে। (সংযোজন: আজ অব্দি কয়লাচালিত ইউনিট চারটি চলছে।)
এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ১৯৬৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ৫০ বছর ধরে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চেয়ে দেড়গুণ বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লা ইউনিট, আবার গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো ৩৬ বছর ধরে ৮৪২ মেগাওয়াটের নিউক্লিয়ার ইউনিটের দুরমুজ সহ্য করে সাইট্রাস কাউন্টির এই ম্যানগ্রোভ বন, এই রিজার্ভ স্টেট পার্ক টিকে আছে কীভাবে? আর যেনতেন ভাবে আঙুলের ওপর ভর করেও এই বন টিকে নেই। এখানে ম্যানাটির অভয়ারণ্য আছে, পর্যটকদের জন্যে নিয়মিত ভ্রমণের বন্দোবস্ত আছে। বামপালি ভাইয়েরা সুন্দরবনের যে অ্যাপোক্যালিপ্সু ভবিষ্যৎ চিত্র আঁকেন, সেটা এই বনের বর্তমান চেহারার সাথে মেলে না কেন?
যেসব রক্তগরম বামপালি ভাই, এবং তাদের চিৎকারে বিভ্রান্ত সাধারণ ভাইয়েরা রক্তচক্ষু করে ধমক দেন, "ম্যানগ্রোভ বনের মইদ্যে কয়লা কই আছে দ্যাহান", তারা এই প্রশ্নের সদুত্তর খুঁজলে সবাই উপকৃত হবেন।
দ্বিতীয় যে উদাহরণটি দিতে চাই, সেটি মালয়েশিয়ার। স্থাপিত ক্ষমতার (installed capacity) বিচারে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমান বা বড় চারটি কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র মালয়েশিয়ায় রয়েছে: ১৪০০ মেগাওয়াটের জিমাহ পাওয়ার স্টেশন (ম্যাপ দেখুন), ২১০০ মেগাওয়াটের তানজুং বিন পাওয়ার স্টেশন (ম্যাপ দেখুন), ২৪২০ মেগাওয়াটের সুলতান সালাউদ্দিন আবদুল আজিজ শাহ পাওয়ার স্টেশন এবং ২২৯৫ মেগাওয়াটের মানজুং পাওয়ার স্টেশন। প্রথম তিনটি স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে ম্যানগ্রোভ বনের প্রান্তে। জিমাহ ও তানজুং বিন পাওয়ার স্টেশনের পাশেই ম্যানগ্রোভ বন দেখতে পাবেন। আমি পোস্টে এমবেড করছি সুলতান সালাউদ্দিন আবদুল আজিজ শাহ [সুসাআআশা] কেন্দ্রটির ম্যাপ।
সুসাআআশা কেন্দ্রটি থেকে যথাক্রমে ৬, ৯, ১৩ ও ২০ কিমি দূরত্বে চারটি দ্বীপ রয়েছে, যেটি নিরবচ্ছিন্ন ম্যানগ্রোভে আচ্ছাদিত। ১৯৮৭ সাল থেকে এই কেন্দ্রটি চলছে। আগের প্রশ্নটি বামপালি ভাইদের কাছে আবারো উত্থাপন করছি, এই চারটি দ্বীপে ম্যানগ্রোভ টিকে আছে কীভাবে?
"দুনিয়ার আর কোত্থাও ম্যানগ্রোভের মইদ্যে কয়লা দিয়া বিদ্যুৎ বানায়?" ধমকটা দিয়ে বামপালরা প্রথমেই অডিয়েন্সকে একটা হীনমন্যতার মাঝে ফেলে দেন। কারণ দুনিয়ার কোথায় কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র কীসের মাঝে কীভাবে চলে, তার বিস্তারিত আমাদের কারোই জানা নেই। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগ্রহ/সময়ও অনেকের নেই। তাই ধমকটাই কণ্ঠ থেকে কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হতে হতে এক সময় ফ্যাক্টয়েড হয়ে যায়।
কয়েক দশক ধরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর পরও ক্রিস্টাল রিভারের ম্যানগ্রোভ বন আর মালয়েশিয়ার চারটি দ্বীপবর্তী ম্যানগ্রোভ বন আজ পর্যন্ত অক্ষত থাকলে, সুন্দরবন থেকে ১৪ কিমি দূরে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র কীভাবে সুন্দরবনকে ধ্বংস করবে, সে প্রশ্নের জবাব সন্ধান প্রয়োজন (বামপালি ভাইদের জন্যে টিপস: "উহা প্রকৃত ম্যানগ্রোভ নহে", "উহা প্রকৃত কয়লা নহে", "উহা প্রকৃত ইয়ে নহে")
সুন্দরবন ধ্বংস হওয়ার ভৌত ও রাসায়নিক প্রক্রিয়াটি জানতে চাইলে বামপালি ভাইয়েরা নতুন কোনো ধমক হাজির করেন। ফ্যাক্ট আর উদাহরণসহ একটা প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা তাদের কাছ থেকে কাম্য। সেটা না করে হয় তারা ভারতজুজুর ভয় দেখান, নয়তো তহবন খুলে সুন্দরবনের শিশু বানর আর মা হরিণের অশ্রু মোছাতে লেগে পড়েন। সুন্দরবন ধ্বংস হওয়ার ব্যাপারটি যদি এতোই নিশ্চিত হয়, তাহলে তার ব্যাখ্যাটিও হওয়ার কথা স্পষ্ট ও যুক্তিসমর্থিত। ব্যাখ্যার বদলে যখন শিশু বানরের কান্নার আড়ালে দাঁড়াতে হয়, তখন তারা সুন্দরবনের ঢাল, নাকি সুন্দরবন তাদের ঢাল, সে সংশয় ক্রমশ জোরালো হতে থাকে।
আজ এ পর্যন্তই। লেখায় কোনো ভুল করে থাকলে ধরিয়ে দিন তথ্যসূত্রসহ। দয়া করে এমন তথ্যসূত্র দিন, যে সূত্র আপনি নিজে আদ্যোপান্ত পড়েছেন এবং বুঝেছেন। ধন্যবাদ।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।