Sunday, July 31, 2016

রামপালে বামপাল: ০১

২০১৬ সালের ১২ জুলাই বাংলাদেশ ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) সাথে ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যাল লিমিটেডের (বিএইচইএল) একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় []। এ চুক্তির আওতায় বাগেরহাটের রামপালে ৬৬০ মেগাওয়াটের দুটি কয়লাচালিত ইউনিটের মাধ্যমে মোট ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে চলনতৈরি অবস্থায় বিআইএফপিসিএলের কাছে হস্তান্তর করবে বিএইচইএল।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের উত্তর সীমান্ত থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায় দেশের অন্যতম বৃহৎ বনাঞ্চল এবং বহু বিপন্ন প্রজাতির একমাত্র আবাসভূমি সুন্দরবনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন বিভিন্ন মহল। সুন্দরবন নিয়ে দেশের নাগরিকদের উদ্বেগকে তাচ্ছিল্য করার কিংবা ক্ষতির সম্ভাবনাকে অস্বীকার করার কোনো অভিপ্রায় আমার নেই। সুন্দরবনের ওপর রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব বিশ্লেষণও এই লেখার আধেয় নয়। আমি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে একটি মহলের প্রচারণার পেছনে কয়েকটি ভুল ধারণা এবং/অথবা মিথ্যাকে ধরিয়ে দিতে চাই কেবল।
সুন্দরবন বাংলাদেশের অন্যতম সুরক্ষাপ্রাচীর। ঘূর্ণিঝড়প্রবণ বঙ্গোপসাগরে প্রতি বছর যে অমিত শক্তিশালী ঝড় ভূখণ্ডের দিকে ধেয়ে আসে, তার একটি বড় অংশ কাবু হয়ে পড়ে সুন্দরবনের কারণে। সুন্দরবনের ক্ষতি তাই কেবল এর একক জৈবমণ্ডলের জন্যেই নয়, বাংলাদেশের মানুষের জন্যেও এক বড় ও সরাসরি হুমকি। তাই সুন্দরবন প্রসঙ্গে কারোই শৈথিল্য প্রদর্শনের অবকাশ নেই। কোনো নাগরিক যদি সুন্দরবন নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, সরকারকে সে উদ্বেগ প্রশমনের জন্যে ব্যবস্থা নিতে হবে। রামপাল নিয়ে সরকারের তরফ থেকে নাগরিক উদ্বেগ প্রশমনের জন্যে কোনো সমন্বিত পদক্ষেপ দেখা যায় নি। নীতিনির্ধারক পর্যায়ে কিছু মৌখিক আশ্বাস দেওয়া হয়েছে কেবল, যা প্রমাণ করে, সরকারের সংশ্লিষ্ট অংশ তার নিজের দায়িত্ব পালনে উদাসীন বা অপারগ।
কিন্তু এর বিপরীতে জনমনে উদ্বেগ ছড়ানোর জন্যে প্রচুর লেখালেখি চলছে। সেগুলোর বেশির ভাগই যৌক্তিক। কিন্তু একটি অংশ সুন্দরবনের আশু ধ্বংসের চিত্র এঁকে যাচ্ছে ক্রমাগত, যার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে সুন্দরবন ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে নাগরিকদের অজ্ঞতা বা অস্বচ্ছ ধারণা, সেইসাথে কিছু অসত্য আর অপ্রযোজ্য যুক্তি। সেগুলোর খানিক ব্যবচ্ছেদ করাই আমার প্রয়াস।
সুন্দরবন নিয়ে আমরা প্রতিটি মুহূর্তে সজাগ আর উদ্বিগ্ন থাকতে চাই, কিন্তু ভুল বা মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে নয়।

সচলায়তনে প্রকাশিত একটি পোস্টে জনৈক অতিথি লেখক সুন্দরবনের ওপর রামপালের কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে গবেষণালব্ধ সূত্রসহ আলোচনা করেছেন []। পাঠকের আলোচনায় প্রসঙ্গটির কয়েকটি দিক আমাদের সামনে প্রসারিত হয়েছে।
এর মাঝে একটি আগ্রহোদ্দীপক দিক হচ্ছে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভারতীয় কোম্পানির সংশ্লিষ্টতা থাকায় জনমনে বিরূপ ধারণা। ভারতের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের একটি বড় অংশ বৈরী মনোভাব পোষণ করে, যার পেছনে সঙ্গত ও অসঙ্গত কারণ রয়েছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্যে দরপত্রে অংশ নেয় দুটি কনসোর্শিয়াম ও একটি কোম্পানি [], যথাক্রমে:
(১) জাপানের মারুবেনী করপোরেশন ও ভারতের লারসেন এন্ড টুবরো লিমিটেড কনসোর্টিয়াম,
(২) চীনের হারবিন ইলেক্ট্রিক ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি লিমিটেড ও ইটিইআরএন এবং ফ্রান্সের আলসটম কনসোর্টিয়াম
(৩) ভারতের কোম্পানি ভারত হেভি ইলেক্ট্রিক্যালস লিমিটেড (বিএইচইএল)।
দরপত্রের বিচারে চীনের হারবিনগোষ্ঠী ভারতের বিএইচইএলের কাছে হেরে যায়। রামপালে চীনের উদ্যোগে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে একটি মহলের তরফ থেকে সুন্দরবন নিয়ে এখন যে অ্যাপোক্যালিপ্সু প্রচার চালানো হচ্ছে, সেটা দেখা যেতো না বলেও অনেকে মনে করেন। চীনের প্রতি তাত্ত্বিক ও আর্থিক কারণে দুর্বল এই গোষ্ঠীটি কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের সম্ভাব্য ক্ষতির ওপর ভারতবিদ্বেষের প্রলেপটি সুচারুভাবে মাখিয়ে জনসমক্ষে উপস্থাপন করায় বয়স ও লিঙ্গ নির্বিশেষে জনমানসে সুন্দরবনকে ইতিমধ্যে খরচের খাতায় ধরে নেওয়ার একটি প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে।
সুন্দরবনের সাথে ভারতবিদ্বেষের সেতু হিসেবে একটি কথা এই গোষ্ঠীটি প্রবলভাবে প্রচার করছে। সেটি শুনতে অনেকটা এমন:
ভারতের আদালত (প্রচারান্তরে সুপ্রিম কোর্ট) তো সুন্দরবনে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে দেয় নি। তাহলে ভারত কেন বাংলাদেশের সুন্দরবনে এই কেন্দ্র বানাচ্ছে?
খোঁজ-না-রাখা শ্রোতা/পাঠকের কাছে এ প্রশ্নটির সাথে প্রশ্নের আড়ালে উত্তর আকারে থাকা এক গোপন গভীর ষড়যন্ত্রও উন্মোচিত হয়। নিশ্চয়ই ভারত বাংলাদেশের সুন্দরবন ছারখার করার জন্য এই কাজ করেছে, যেভাবে তারা সানি লিওনকে দিয়ে আমাদের তরুণ সমাজের বাম হাতের পেশী ছারখার করে যাচ্ছে। কারণ দুশ্চরিত্র ভারত তো সারাক্ষণ এগুলোই করে, তাই না? যদিও "সুন্দরবন ধ্বংস করার এই হীন চক্রান্তে" শামিল হওয়ার জন্য কেন "জাপান", "চীন" ও "ফ্রান্স"ও দরপত্রে অংশ নিয়েছিলো, সে ব্যাপারে (বিশেষ করে চীনের ব্যাপারে) মহলটি চুপ থাকে।
"সুন্দরবনে" কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানোর ব্যাপারে ভারতের আদালতের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারটি নিয়ে আরো খোঁজ করলে আমরা একটা সাধারণ, আটপৌরে গল্প জানতে পারবো। এই পোস্টের সেটিই উপজীব্য।
ইউনিভার্সাল ক্রিসেন্ট পাওয়ার প্রাইভেট লিমিটেড (ইউসিপিপিএল) নামে একটি বেসরকারি কোম্পানি, যেটি ইউনিভার্সাল সাকসেস এন্টারপ্রাইজ [] নামে একটি ব্যবসাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় হুগলি নদীব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হলদি নদীর মোহনায় অবস্থিত নয়াচর নামের একটি দ্বীপে ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি একটি কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্যে পরিবেশ ছাড়পত্র চেয়ে ভারত সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রকের কাছে ধর্ণা দেয়। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ক্রমান্বয়ে মোট ১০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্যে ইউসিপিপিএলের একটি বোঝাপড়া হয়, এটি তারই প্রথম ধাপ।
পরিবেশ ছাড়পত্রের প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড গণশুনানির আয়োজন করে ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রক বরাবর যাবতীয় তথ্য ও দলিল পাঠায়। সেখানে ২০১২ সালের ৫-৬ মার্চ বিশেষজ্ঞ কমিটি শুনানির তথ্য যাচাই বাছাই করে সিদ্ধান্তে আসেন, প্রস্তাবিত স্থানটি পরিবেশগত দিক থেকে সংবেদনশীল, তাই সরজমিন পরীক্ষা করে দেখতে হবে, নয়াচরে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা যাবে কি না। ২০১২ সালের ১০-১২ এপ্রিল তাঁরা নয়াচরে গিয়ে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন, যাতে বলা হয়, নয়াচর হুগলি নদীর মোহনায় গড়ে উঠেছে বলে এটি একাধারে মোহনার পরিবেশ ও হুগলি চ্যানেলের নাব্যতার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। এখানে কোনো ধরনের নির্মাণকাজ করলে হুগলির মোহনার পরিবেশ ও নাব্যতা দুটিই ব্যাহত হবে। সেই সাথে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্গমন এই নয়াচরে গড়ে ওঠা ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদবলয়ের ক্ষতি করলে নয়াচরের গাঠনিক ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে (পোস্টলেখকের নোট: যা আবার ঘুরে ফিরে হুগলি চ্যানেলের নাব্যতাকে প্রভাবিত করবে)।
মোদ্দা কথা, নয়াচরে বিদ্যুৎকেন্দ্র করলে কলকাতা বন্দরে জাহাজ ঢুকতে সমস্যা হবে।
ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রকের বিশেষজ্ঞ কমিটির এই প্রতিবেদনে নয়াচরের সাথে সুন্দরবনের কোনো সম্পর্ক নেই। মাতলা নদীকে সুন্দরবনের ভারতীয় অংশের পশ্চিম সীমান্ত ধরলে সেখান থেকে নয়াচর প্রায় ৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। পাঠকের জন্যে গুগল ম্যাপে নয়াচর ও সুন্দরবনের অবস্থান পরিবেশন করা হলো।
নয়াচরের সাথে সুন্দরবনের সম্পর্কের একটি (প্রথম) সূত্র এখানে প্রাসঙ্গিক। সেটি হচ্ছে ম্যানগ্রোভ। ম্যানগ্রোভ বা গরানজাতীয় উদ্ভিদ ক্রান্তীয় সকল উপকূলেই দেখা যায়। নয়াচরে যেমন ম্যানগ্রোভ রয়েছে, তেমনই রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে, তেমনই রয়েছে মহেশখালীতে। সাতক্ষীরা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যেসব ভূভাগ জোয়ারের পানিতে ডুবে যায় আর ভাটার পানিতে জেগে ওঠে, তার সবটুকুই ম্যানগ্রোভের দখলে। পাঠক, এই সূত্রটা একটু স্মরণে রাখুন।
এদিকে সরজমিন হন্তদন্ত তদন্ত শেষে ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রকের বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রতিবেদনের সিদ্ধান্তে জানালেন, মোহনায় গড়ে ওঠা চরে কোনো ধরনের ভারি শিল্প স্থাপন চলবে না। নয়াচর যেমন ছিলো তেমন রেখে দিতে হবে। এটাকে ম্যানগ্রোভের বিস্তার সম্পর্কে জানার জন্যে এক প্রাকৃতিক গবেষণাগার হিসেবে দেখতে হবে। বড়জোর এখানে পরিবেশপর্যটন করা যেতে পারে, নয়তো নোনাপানির ঘের।
সেইসাথে তারা উল্লেখ করেন, এই প্রকল্পের প্রস্তাবে কোথাও বলা নেই যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মোহনায় অবস্থিত এমন একটি চরে স্থাপন করা হবে। অর্থাৎ, ইউসিপিপিএল গোড়াতেই ব্যাপারটা চেপে রেখে কাগজপত্র জমা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞ কমিটি এই প্রতিবেদন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আমলাদের সামনে ইউসিপিপিএলের প্রতিনিধিদের কাছে উপস্থাপন করে বলেন, আপনারা এটা ভালোমতো পড়েশুনে আবার আমাদের কাছে আসবেন। ইউসিপিপিএলকে বিকল্প জায়গা খোঁজার পরামর্শও তারা দেন।
কিন্তু অচিরেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার একটি পাল্টা কমিটি গঠন করে ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রকের বিশেষজ্ঞ কমিটির এই প্রতিবেদনকে নাকচ করে দেন। পাল্টাকমিটি বলে, সবকিছু ঠিকাছে। নয়াচর মোটেও সিআরজেড বা উপকূলীয় নিয়ন্ত্রণ এলাকা নয়। আলবাত বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানো চলবে।
পাঠক, এখানে আলগোছে বলে রাখি, উপকূলীয় নিয়ন্ত্রণ এলাকা হচ্ছে ভারতের পরিবেশ (সুরক্ষা) আইন, ১৯৮৬তে বর্ণিত এলাকা, যা মূলত জোয়ারের সময় ডুবে যায়, আবার ভাটার সময় জেগে ওঠে [ এবং ]। জোয়ারসীমা থেকে দূরত্ব হিসাব করে এই এলাকাকে আবার চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রথম ভাগ সিআরজেড ১ সবচেয়ে নাজুক।
প্রিয় পাঠক, আপনারা যারা আমলাতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ গুতাগুতির সাথে সামান্য হলেও পরিচিত, তারা জানেন, সরকারের এক অংশের কমিটির সাথে সরকারের অন্য অংশের কমিটির লড়াইকে সংক্ষেপে "লালফিতা পর্ন" বলা যেতে পারে। তার ওপর ভারতে এ ঘটনায় লড়াই আবার কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে রাজ্য সরকারের। তাই একটা পর্যায়ে এসে ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রকের বিশেষজ্ঞ কমিটি বললো, সবই তো বুঝলাম, এইবার তিনমাসের মধ্যে আটখান দলিল দাখিল করেন দেখি। এই আট দলিলে তারা সাত ধরনের বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন আর মামলার বৃত্তান্ত চেয়ে বসেন।
এরপর দিন গেলো, মাস গেলো, কিন্তু প্রকল্পের প্রস্তাবকদের আর খুঁজে পাওয়া গেলো না। তারা বিবেকের মতো, ঈশ্বরের মতো, তথ্যসূত্রের দাবির মুখে বামাতি বিপ্লবী ভাইদের মতো নির্বাক, মৌন মেরে রইলো।
ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রক তিন মাসের মধ্যে জিনিসপাতি না পেয়ে এই প্রকল্পের প্রস্তাব তাদের নথি থেকে ডি-লিস্ট করে দেয়। যদিও তারা ২০১৪ সালের ১০ জানুয়ারিতে একটা চিঠি আর ২১ অগাস্ট একটা তাড়া দিয়ে প্রকল্পের বাপমাদের তাগাদা দিয়েছিলেন, কিন্তু ঐ আট দলিলের ঘায়ে ঘায়েল ইউসিপিপিএল আর সাড়াশব্দ করে নি।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য উপকূলীয় এলাকা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এসসিজেডএমএ) সেই ২০০৮ সালে ২৮ জানুয়ারি নয়াচরের কিসিম পাল্টে সিআরজেড-১ থেকে সিআরজেড-৩ করার প্রস্তাব করেছিলো, কিন্তু পরিবেশ ও বন মন্ত্রক সেখানেও দুটো খাটনি ধরিয়ে দেয়। বলা হয়, এসসিজেডএমএ তাহলে নতুন করে নয়াচরের জন্য উপকূলীয় এলাকা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করবে, আর নয়াচরে তীরসুরক্ষা কাঠামো নির্মাণ করতে গেলে তার জন্যে মন্ত্রকের অনুমোদন নিতে হবে।
এই হচ্ছে নয়াচর নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে ভারতের রাজ্য সরকারের (যারা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করাতে চেয়েছিলো) মধুর লালফিতা-পূর্বরাগ। এ একটা ফাইল দিয়ে মারে, তো ও আরেকটা ফাইল দিয়ে মারে।
এদিকে নয়াচরে যেসব জেলেরা মাছ ধরে খান, তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকেন নি। নয়াচরে তাদের লোনাপানির ঘের রয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়লে সেটা পয়মাল হবে। তাই তারা সোজা চলে গেছেন কলকাতা উচ্চ আদালতে, রিট ঠুকে দিয়েছেন।
পাঠক, ম্যানগ্রোভের পর নয়াচরের সাথে সুন্দরবনের দ্বিতীয় সম্পর্ক এই রিটে রয়েছে। রিটে এই জেলেরা বলেছিলেন, নয়াচরে বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়লে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। লক্ষ্য করুন, এটা রিটের ভাষ্য, আদালতের বক্তব্য নয়, বা কোনো বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদন নয়।
রিটের জের ধরে ভারতের জাতীয় পরিবেশ ট্রাইবুনাল নয়াচরের জেলে সমবায় সমিতির দাবি পূরণ করে রায় দেন এবং বলেন, যেহেতু নয়াচর নাজুক সিআরজেড ১ এলাকা হিসেবে শ্রেণিকৃত, কাজেই এখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চলবে না।
ঘটনা এতটুকুই []।
চীনের হারবিনগোষ্ঠী যখন রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো, দেশে ময়দানে নামলো বামপাল গোষ্ঠী। তারা গলা ফাটিয়ে বলে যেতে লাগলো, এবং এখনো বলে যাচ্ছে, ভারতের আদালত সুন্দরবনে বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে দেয় নাই আর ভারত আমাগো সুন্দরবনে আইসা বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাইতেছে, সুন্দরবনটারে জ্বালাইয়া কালা বানাইবো, আমি দ্যাশের মালিক আমি এইসব চাই না, হ্যানোত্যানো। তাদের কল্যাণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের গরু আদালতের গাছে উঠে যাচ্ছে প্রতিদিন। কেন সুন্দরবন জ্বালিয়ে কালো বানানোর জন্যে চীনা হারবিন দরপত্রে অংশ নিয়েছিলো, সে প্রশ্নটা আপাতত চাপা আছে।
ফ্যাক্ট হচ্ছে:
১. ভারতে কেউ "সুন্দরবনে" বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে চায় নি, করতে চেয়েছে নয়াচরে, যেটা সুন্দরবন থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে।
২. আমাদের দেশেও কেউ "সুন্দরবনে" বিদ্যুৎকেন্দ্র করছে না, করছে রামপালে, যেটা মংলা বন্দরেরও উত্তরে, সুন্দরবনের উত্তর সীমা থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে (ক্ষয়ক্ষতি হবে কি হবে না, সে ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের মত কাম্য)।
৩. নয়াচরে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল হয়েছে কলকাতা বন্দরের হুগলি চ্যানেলে নাব্যতা হারানোর আশঙ্কা থেকে, সুন্দরবনের ক্ষতির সম্ভাবনা থেকে নয়।
৪. সুন্দরবনের সাথে এই পরিবেশ ট্রাইবুনালের রায়ে নিষিদ্ধ নয়াচর বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটির সাথে কেবল দুটো সূত্র জড়িত, এক, "ম্যানগ্রোভ" শব্দটি, দুই, মামলার বাদী জেলেদের রিটে বর্ণিত আশঙ্কা (আমাদের দেশেও রিট ঘাঁটলে "তরুণ সমাজ ধ্বংস" হওয়ার কথা পাওয়া যায়)। আদালতের রায়ে বা বিশেষজ্ঞদের মতামতে নয়াচরের প্রকল্পের সাথে সুন্দরবনের কোনো সংযোগ নেই।
৫. নয়াচরের সাথে একই কষ্টিপাথরে রামপালকে যাচাই করলে দেখা যাবে, রামপাল কোনোভাবেই সিআরজেড ১ বা এমন নাজুক কোনো এলাকা নয়। রামপাল জোয়ারের সময় পানির নিচে তলায় না, ভাটার সময় জেগে ওঠে না।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে কি তাহলে সুন্দরবনে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হবে না? আমরা কি সুন্দরবন নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকবো না? পান থেকে চুন খসলেই কৈফিয়ত চাইবো না সরকারের কাছে?
নিশ্চয়ই আমরা উদ্বিগ্ন থাকবো, সরকারকে এই প্রসঙ্গে দৌড়ের ওপরে রাখবো, সুন্দরবনের ওপর রামপালের প্রভাব নিয়ে সরকারকে সম্ভাব্য সব রকমের বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করে মত জানাতে চাপ দেবো, সেগুলো নিয়ে নিত্য কথা বলবো, চিৎকার করবো, প্রয়োজনে রাস্তায় নামবো।
কিন্তু ধান্ধাবাজদের ছড়ানো অসত্যের ওপর ভিত্তি করে নয়। সুন্দরবনকে বাঁচানোর জন্যে মিথ্যুক বামপালের ছাতার নিচে আমাদের মাথা ঢোকাতে হবে কেন?
তথ্যসূত্র:

[১] বিডিনিউজ২৪.ডম: রামপালে মূল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে চুক্তি
[২] সচলায়তন.কম: আসেন সুন্দরবনকে ধ্বংস করি
[৩] দৈনিক ইত্তেফাক: রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ভেল-এর সাথে চুক্তি মার্চে
[৪] www.usel.biz
[৫] ভারতের পরিবেশ (সুরক্ষা) আইন, ১৯৮৬
[৬] উপকূলীয় নিয়ন্ত্রণ এলাকা প্রজ্ঞাপন, ১৯৯১
[৭] নয়াচরে বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প নিয়ে ভারতের জাতীয় পরিবেশ ট্রাইবুনালের পূর্ণাঙ্গ রায়

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।