Wednesday, December 03, 2014

পিএসসি আর জেএসসি পরীক্ষার কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে?

বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রের সাম্প্রতিক সংযোজন পিএসসি আর জেএসসি পরীক্ষা শিক্ষার মানোন্নয়নে কী ভূমিকা রাখছে, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত ছাত্র-অভিভাবকদের সামনে হাজির করেছেন কি না, আমার জানা নেই। কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখে একটু চিন্তা করলে মনে হয়, গুটিকয় বাটপার ছাড়া এই দুই পাবলিক পরীক্ষা বৃহত্তর জনসমাজের আর কোনো কাজে আসবে না।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিকের জন্যে ৫ বছর, মাধ্যমিকের জন্যে ৫ বছর আর উচ্চ মাধ্যমিকের জন্যে ২ বছর সময় বরাদ্দ করা আছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও কম বেশি একই স্তরে বিভক্ত। প্রাথমিক স্তরের একটি স্কুল থেকে মাধ্যমিক স্তরের আরেকটি স্কুলে যাওয়ার জন্যে ভর্তি পরীক্ষায় বসতেই হয়, প্রাথমিক স্তরের স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষার ফল তাতে খুব একটা কাজে আসে না। একইভাবে মাধ্যমিক স্তরের স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের কলেজে ভর্তি হতে গেলেও ভর্তি পরীক্ষায় বসতে হয়, উচ্চ মাধ্যমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে গেলেও ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয়। কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে এসএসসির ফল একটি মোটাদাগের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির ক্ষেত্রে এসএসসি আর এইচএসসি পরীক্ষার ফল সম্মিলিতভাবে মোটাদাগের নিয়ামকের কাজ করে। এই নিয়ামক দিয়ে কারা ভর্তি পরীক্ষায় বসার যোগ্য হবে, সেটি ঠিক করা হয় কেবল। বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে ভর্তি পরীক্ষার ফলের।
যদি নামী স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি পরীক্ষার জন্য পিএসসির ফলকে নিয়ামক হিসেবে গ্রহণ করার রেওয়াজ শুরু হয়, সেক্ষেত্রে এই পরীক্ষাকে যৌক্তিক বলে মনে করা যেতে পারে। কিন্তু জেএসসি পরীক্ষার যৌক্তিকতা কোথায়? মাধ্যমিক স্কুলে অষ্টম শ্রেণীর পর একই স্কুলের নবম শ্রেণীতে শিক্ষালাভের সুযোগ থাকে, আরেকটি ভিন্ন শিক্ষায়তনে ভর্তির জন্যে নিয়ামক হিসেবে এই পরীক্ষার ফল ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। এই পরীক্ষাটি তাহলে কেন নেওয়া হচ্ছে?
আরেকটু তলিয়ে দেখলে আমরা দেখবো, এক স্কুলের পঞ্চম শ্রেণী থেকে আরেকটি স্কুলের (অপেক্ষাকৃত "ভালো") ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তির জন্যে অভিভাবকদের প্রত্যাশাজতিন যে চাপ থাকে, তার সঙ্গে কোচিং ব্যবসার সরাসরি যোগ আছে। অভিভাবকদের এই আকুতিকে কাজে লাগিয়ে কোচিং সেন্টারগুলো ব্যবসা করে, এবং পঞ্চম শ্রেণী থেকে ষষ্ঠ শ্রেণীতে উত্তরণের জন্যে ভর্তি প্রক্রিয়াটিকেও বাণিজ্যিকীকরণের সুযোগ এই পিএসসির মাধ্যমে প্রশস্ত হচ্ছে।
এখানেই প্রশ্নফাঁসের অর্থনীতি একটু খতিয়ে দেখতে হবে। এককালে টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন বিক্রি হতো, সে বাণিজ্যের অর্থনীতি নিষিদ্ধ মাদক বাণিজ্যের অর্থনীতির মতো। কিন্তু এখন প্রশ্ন চলে আসছে ফেসবুকের বিভিন্ন পেইজে, এবং সরাসরি শিক্ষামন্ত্রক থেকে এই ফাঁসের ব্যাপারটিকে হয় অস্বীকার করা হচ্ছে, নয়তো তাচ্ছিল্যের সাথে দেখা হচ্ছে। মোবাইল-ফেসবুক বন্ধ করে দেওয়ার মতো নির্বোধ আহাম্মকি কথাবার্তা বলে কর্তাব্যক্তিরা মানুষের মনোযোগকে অন্যদিকেও নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ফেসবুকে ফাঁস করা প্রশ্নের অর্থনীতিটা ভিন্ন, এখানে প্রশ্নটি আর টাকার বিনিময়ে ক্রয়যোগ্য পণ্য নেই, বরং আরেকটি ভিন্ন ও বৃহত্তর বাণিজ্যের দিকে এই ফাঁস-হওয়া-প্রশ্নের-ভোক্তাকে (অর্থাৎ অভিভাবক) ঠেলে দেওয়ার একটি মাধ্যমমাত্র।
সে আলোচনার আগে একটু চিন্তা করে দেখি, প্রশ্ন ফাঁস হলে কী হয়? একবার প্রশ্ন ফাঁস হয়ে গেলে এবং নাগালের ভেতরে থাকা উন্মুক্ত মাধ্যমে (যেমন ফেসবুকে) চলে এলে পরীক্ষার্থীর সামনে দুটি পথ থাকে, হয় প্রশ্নটি যোগাড় করে কাজে লাগানো (অসৎ পদ্ধতি), নয়তো প্রশ্নটি উপেক্ষা করে নিজের প্রস্তুতির ওপর ভরসা রাখা (সৎ পদ্ধতি)। এখন যদি দবীর আর কবীর নামের দু'জন "লেখাপড়ায় মোটামুটি ভালো" পরীক্ষার্থীর মধ্যে যদি তুলনা করে দেখি, তাদের গেম মেইট্রিক্স হবে এমন:
এখানে মনে রাখা ভালো, দবীর বা কবীর কেউ উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন ফাঁস করিয়ে আনছে না, তারা নিরীহ পরীক্ষার্থী, এবং প্রশ্ন ফাঁস তাদের উদ্যোগ ছাড়াই ঘটে যাচ্ছে। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কাজে না লাগালে দবীর বা কবীর বড়জোর এ মাইনাস পাবে, কিন্তু কাজে লাগালে তারা এ প্লাস পাবে। এরকম পরিস্থিতিতে দবীর আর কবীর, দু'জনের জন্যেই ডমিন্যান্ট স্ট্র্যাটেজি বা লাভজনক কৌশল হচ্ছে অসৎ হওয়া। এবং শেষ পর্যন্ত তারা দু'জনই অসৎ হবে, এটাই এই গেমের ন্যাশ ভারসাম্য। প্রশ্ন ফাঁসের গেমে যেসব "লেখাপড়ায় মোটামুটি ভালো"রা সৎ থাকবে, তারা পরীক্ষার ফলের বিচারে অন্যদের তুলনায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটা পিএসসি পরীক্ষার্থীরা ঠিকমতো না বুঝলেও তাদের অভিভাবকরা বোঝেন, এবং সোৎসাহে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন যোগাড় করে সন্তানকে দেন।
কাজেই প্রশ্ন ফাঁস করে উন্মুক্ত ডোমেইনে তুলে দিলে একটা জনগোষ্ঠীর বড় অংশ তাৎক্ষণিক লাভের আশায় অসৎ হয়ে পড়ে।
শিক্ষামন্ত্রক এই পরিস্থিতির জন্যে এককভাবে দায়ী। পরীক্ষার্থী বা অভিভাবকদের ঘাড়ে দোষ দেওয়া নিরর্থক, কারণ তারা প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার প্রক্রিয়াটি উদ্যোগ নিয়ে ঘটাচ্ছে না।
উন্মুক্ত ডোমেইনে প্রশ্ন ফাঁস করে দিলে প্রশ্নটির আর পণ্যমূল্য থাকে না, কিন্তু সেটি বাজারে ভালো ফলের একটি বাড়তি সরবরাহ তৈরি করে। যেসব পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে, সেসব পরীক্ষায় যারা এ প্লাস পাচ্ছে, তাদের মধ্যে কারা ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কাজে লাগিয়েছে, আর কারা লাগায়নি, তা বোঝার উপায় কারোই থাকে না। পরীক্ষা নেওয়ার অনেক উদ্দেশ্যের মধ্যে একটি হচ্ছে পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষার গুরুত্ব অনুধাবনে সমর্থ করে তুলে অনাগত জীবনের নানা পরীক্ষার জন্যে প্রস্তুত করা, আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি জনগোষ্ঠী থেকে যোগ্যতর একটি অংশকে সে জনগোষ্ঠীর জন্যে বিভিন্ন ভূমিকায় কাজে লাগানোর জন্য কম যোগ্যতরদের থেকে পৃথক করা। প্রশ্ন ফাঁস করলে এ দুটি উদ্দেশ্যই মার খায়। তাহলে কোন উদ্দেশ্য সাধিত হয়?
পিএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসকে যদি আমরা নমুনা আলোচ্য হিসেবে ধরি, তাহলে আমরা দেখবো, বাংলাদেশে যতো সংখ্যক ভালো মাধ্যমিক স্কুল আছে, ততো সংখ্যক ভালো প্রাথমিক স্কুল নেই। কাজেই প্রাথমিক স্কুলের ভালো ছাত্ররা যদি পিএসসি পরীক্ষায় ভালো করে, এবং প্রাথমিক স্কুলের মাঝারি ও খারাপ ছাত্ররা যদি পিএসসি পরীক্ষায় খারাপ করে, তাহলে মাধ্যমিক স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীতে কেবল পিএসসি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই তাদের ভর্তি করা সম্ভব হতো, কিংবা অন্তত পিএসসি পরীক্ষার ফলকে ষষ্ঠ শ্রেণীর ভর্তি পরীক্ষায় একটি জোরালো নিয়ামক হিসেবে ব্যবহার করা যেতো। এটিই স্বাভাবিক এবং আদর্শ পরিস্থিতি। কিন্তু এই পরিস্থিতি ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি প্রক্রিয়ায় কোচিং বাণিজ্যবান্ধব নয়। কোচিং ব্যবসা তখনই জমবে, যখন ভর্তি পরীক্ষার্থীদের জোরালো নিয়ামকের ভিত্তিতে আর ফিল্টার করা যাবে না। উন্মুক্ত ডোমেইনে প্রশ্ন ফাঁস করে দিলে এই ব্যাপারটিই ঘটে, মুড়ি-মুড়কি সব সমান দর হয়ে পড়ে। মাঝারি মাপের কবীর ও দবীর তখন ভালো মাপের সগীরের সঙ্গে এ প্লাস পেয়ে এক কাতারে চলে আসে। এবং যেহেতু নিজেদের মধ্যে আর পৃথক করার মাপকাঠি অবশিষ্ট থাকে না, কবীর-দবীর-সগীর তিনজনই তখন কোচিং বাণিজ্যের ভোক্তায় পরিণত হয়।
একই প্রক্রিয়া এসএসসি ও এইচএসসির ক্ষেত্রেও খাটে।
আমার বিবেচনায় জেএসসি সম্পূর্ণ নিরর্থক একটি পরীক্ষা, যেটি কোনো বাছাইয়ের কাজে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারবে না। যেহেতু এক ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উত্তরণের প্রশ্নও এক্ষেত্রে নেই (যে স্কুলে অষ্টম শ্রেণী আছে, সেখানে নবম ও দশম শ্রেণীও থাকে), এই পরীক্ষাটি কেন নেওয়া হচ্ছে, সে উদ্দেশ্যও স্পষ্ট নয়। কিন্তু পাবলিক পরীক্ষা মানেই প্রতিযোগিতা, এবং অভিভাবকদের পক্ষ থেকে সে পরীক্ষায় ভালো করার জন্য পরীক্ষার্থীর ওপর চাপ, কাজেই এ পরীক্ষাটিও কোচিং বাণিজ্যের উদরপূর্তির কাজে লাগছে কেবল।
পাবলিক পরীক্ষার সংখ্যা বাড়িয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেবল কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে সহযোগিতা করছে। এই সহযোগিতার পেছনে আর্থিক লেনদেন আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য সবাইকে আহ্বান জানাই।
শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য আপাতত প্রাথমিক করণীয় একটাই, শিক্ষকের মানোন্নয়ন। শিক্ষায়তনে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা-সুবিধা বাড়ানো হোক, শিক্ষকের পেশায় মেধাবীদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা হোক।
সবার আগে পিএসসি ও জেএসসি নামের এই নিরর্থক কোচিংতোষী দুটি পাবলিক পরীক্ষা বাতিল করা হোক।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।