Sunday, December 28, 2014

বাংলাদেশ ক্রমশ শিশুদের জন্য বিপদজনক একটি দেশ হয়ে উঠছে।
খবরের কাগজে চোখ রাখলে প্রায় প্রতিদিনই কোনো দুর্ঘটনা বা অপরাধের কথা পড়ি, যেখানে ভিক্টিম এক বা একাধিক শিশু। ধর্ষণের পর শিশুদের হত্যা করার খবরটি মোটামুটি সাপ্তাহিক একটি ঘটনায় পরিণত হয়েছে, কিন্তু সেগুলো নিয়ে আমাদের খুব বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। ব্যাপারটাকে অনেকটা ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখার একটা প্রবণতা আমাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে। হয়তো মিডিয়া আমাদের এই ঘটনাগুলোর লাইভ কাভারেজ দেখাতে পারে না বলে আমরা বেশি সাড়াশব্দ করি না। তবে গতকাল ঢাকার শাহজাহানপুরে একটি গভীর কূপের ভেতরে চার বছর বয়সী একটি শিশুর উদ্ধার তৎপরতার বিজ্ঞাপনখচিত কাভারেজ মিডিয়া যেভাবে দেশবাসীকে উপহার দিয়েছে, একটি শিশুর ধর্ষণ ও হত্যার দৃশ্য সেভাবে দেখালে হয়তো আমরা চুপ করে গিয়ে নিজের কাজে মন দেওয়ার আগে অন্তত দুই তিনদিন চেঁচামেচি করার মতো একটা রগরগে ইস্যু খুঁজে পাবো।
অনলাইন খবরের কাগজে একটু পরপর নানা পরস্পরবিরোধী খবর পড়ে যা বুঝলাম, জিহাদ ঐ গভীর পাইপে পড়ার পর কান্নাকাটি করে, উদ্ধার করার জন্য নিজের মাকে ডাকে। এলাকার কয়েকজন লোক তাকে পাল্টা ডেকে সাড়া পায়। তারা টর্চ আর রশি ঝুলিয়ে বাচ্চাটাকে তুলে আনার চেষ্টা করে। দমকল বাহিনী এসে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে নিজেরা বাচ্চাটাকে উদ্ধারের জন‌্য দীর্ঘ সময় ধরে নানা কসরত করে। এ সময় টিভি সাংবাদিক নামের এক শ্রেণীর জীব এসে তাদের ঘিরে ধরে এবং জিহাদের এই প্রলম্বিত যন্ত্রণাটিকে তারা সাফল্যের সঙ্গে নিজেদের ব্যবসার পণ্য বানিয়ে ফেলে। টেলিভিশনে এই পুরো ব্যাপারটি সরাসরি সম্প্রচারের জন্য এক চ্যানেলের সাংবাদিক অন্য চ্যানেলের সাংবাদিকের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে দুর্ঘটনাস্থলটিকে মাছের বাজার বানিয়ে ফেলে। এই সরাসরি সম্প্রচারে তারা অনেক স্পনসর খুঁজে পায় অল্প সময়ের মধ্যেই, এবং জিহাদের খবরের ফাঁকে ফাঁকে স্পনসরদের বিজ্ঞাপনও প্রচারিত হতে থাকে। এক পর্যায়ে পাইপের ভেতরে ক‌্যামেরা নামিয়ে বেশ কিছুদূর খুঁজে কোনো শিশুর দেহের অস্তিত্ব খুঁজে না পেয়ে উদ্ধারকর্মী ও মিডিয়া একযোগে বলতে থাকে, পাইপের ভেতরে জিহাদ নেই। এই বক্তব্য দমকলপ্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, দু'জনেই পুনর্ব্যক্ত করেন। এরই জের ধরে জিহাদের বাবাকে পুলিশ ডেকে নিয়ে কড়া জিজ্ঞাসাবাদ করে। এরই মাঝে দমকলপ্রধান উদ্ধারাভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণা দেওয়ার কয়েক মিনিট পর এই উদ্ধারকাজে নবাগত তিন যুবক তাদের নিজস্ব উদ্ভাবিত যন্ত্র দিয়ে জিহাদের অসাড় দেহ পাইপের ভেতর থেকে তুলে আনেন। ডাক্তারি পরীক্ষার পর জানা যায়, জিহাদ মৃত।
পুরো ব্যাপারটি নিয়ে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরলাম।
[১] দমকল বাহিনী যে কাজটি পারেনি, তিনজন যুবক নিজস্ব উদ্ভাবন দিয়ে তা করে দেখিয়েছেন। এখন দমকল বাহিনীকে ব্যাখ্যা করতে হবে, তারা কোন কোন পদ্ধতিতে দীর্ঘ সময় ধরে জিহাদকে উদ্ধারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। সীমিত সম্পদ দিয়ে আমাদের দমকল বিভাগ অনেক দুর্যোগ মোকাবেলা করেন, তাই তাঁদের প্রতি পূর্ণ সহানুভূতি প্রকাশ করে বলছি, এই একটি ক্ষেত্রে তাঁরা শোচনীয়ভাবে অযোগ্য প্রমাণিত হয়েছেন। দমকল বাহিনীর প্রধান যখন উদ্ধারাভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণা করছেন, তখন তাঁর কয়েক গজ দূরে দাঁড়িয়ে জিহাদকে গভীর কূপ থেকে তোলার চেষ্টা করছিলেন অপেশাদার উদ্ধারকর্মীরা। যারা সফল হয়েছেন, তাদের কৌশলটি দমকল বিভাগ শিখে নিচ্ছে কি না, বা এ কৌশলটির আরো শাণিত প্রয়োগ নিয়ে দমকল বিভাগ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে কি না, তা সরল ভাষায় দেশের মানুষকে জানাতে হবে।
[২] উদ্ধারকারী শাহ মোহাম্মদ আব্দুল মুন ও আব্দুল মজিদ খুব সরল একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে জিহাদের দেহ উদ্ধার করেছেন। বুয়েটের প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র তানভীর আরাফাত ধ্রুবও কাছাকাছি নকশার একটি যন্ত্র নিয়ে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন। তাই এ কথা খুব স্পষ্ট যে মানুষের আইডিয়া এ ধরনের দুর্যোগে পেশাদার উদ্ধারকর্মীদের সহায়তা করতে পারে। তাই দমকল বাহিনীর কাছ থেকে আরো আধুনিক আচরণ প্রত্যাশা করি। দমকল বাহিনী খুব সহজেই একটি হেল্পলাইন স্থাপন করে উদ্ধারকাজে উৎসাহী মানুষদের বুদ্ধিবৃত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেন। দমকল বাহিনীর সদর দফতরে বসে একজন কর্মকর্তা দমকল বাহিনীর ফেসবুক পেজে একটি থ্রেড খুলে প্রকাশ্যে মানুষের মতামত নিতে পারেন, সদর দফতরে বসে সেগুলো যাচাই বাছাই করে দূরযোগাযোগের মাধ্যমে দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ তত্ত্বাবধায়কের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন।
[৩] যে কোনো দুর্ঘটনাস্থলে একটি নির্দিষ্ট পরিসীমা স্থাপন করে (ঢিলছোঁড়া দূরত্বের বাইরে) দমকল বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য দাঙ্গা পুলিশ বরাদ্দ করা অবশ্যকর্তব্য। হাজার হাজার উৎসুক প্রত্যক্ষদর্শনলোভী মানুষ যদি ঘিরে থাকে, শোরগোল করে, ঠাণ্ডা মাথায় উদ্ধার কাজ পরিচালনা করা খুবই দুরূহ একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এদের এবং মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে ব্যবসা করা টিভি সাংবাদিকদের ঘটনাস্থল থেকে ভদ্র ও সভ্য দূরত্বে দাঁড় করিয়ে এক ঘণ্টা পর পর উদ্ধারকাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো যেতে পারে (যদি তা আদৌ সম্ভব হয়)।
[৪] দুর্ঘটনা বা দুর্যোগের শিকার যারা, তাদের ও তাদের পরিজনদের প্রতি টিভি সাংবাদিকদের আরো সহানুভূতি ও সমানুভূতির প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এই জীবগুলো জানেই না একজন শোকার্ত মানুষের সাথে কীভাবে কথা বলতে হবে। হয়তো এরা মৌগলির মতো জঙ্গলে বড় হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর জামাকাপড় যোগাড় করে পরে লোকালয়ে এসেছে এবং সোজা টিভি চ্যানেলে গিয়ে চাকরি নিয়েছে। সভ্য জগতে কীভাবে দুর্গত মানুষের শোককে প্রচার করা হবে, এ নিয়ে তাদের অবিলম্বে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। নীতিপ্রণেতারা সম্প্রচার নীতিমালায় এ ব্যাপারে বিশদ নজর দেবেন, এমন আশা করছি।
কোরবানির গরুর রক্তের চারপাশে মাছিও এভাবে ভিড় করে না
[৫] আমরা যারা ভদ্দরলোক, তাদের বাচ্চারা সাধারণত গভীর নলকূপের আশেপাশে খেলতে গিয়ে সেটাতে পড়ে যায় না, তাই আমরা এ ধরনের ব্যাপারগুলো "দর্শকের" চোখ দিয়ে দেখি। খেলতে গিয়ে বল ভেবে ককটেল কুড়িয়ে বিস্ফোরণে পঙ্গু বা নিহত শিশুরা, কিংবা ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশুরাও আমাদের দর্শকের চোখের শিকার। এই বাচ্চাগুলোর পরিণতি যে আমাদের বাচ্চাদেরও হতে পারে, এই আশঙ্কাটুকু আমাদের সবার মধ্যে সঞ্চারিত হওয়া প্রয়োজন। আমরা গ্যালারিতে ভূট্টার খৈ হাতে দর্শকের ভূমিকা থেকে নিজেদের যতদিন বিচ্যুত করতে না পারবো, এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্ত হতে থাকবে। জিহাদ আমাদের কারো না কারো খুঁড়ে রাখা পাইপে পড়েই মারা গেছে। আমরা যদি এই দোষী লোকগুলোকে চিহ্নিত না করি, তাকে শাস্তি না দিই, তার ও তার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় না করি, কয়েক মাস পর দেশের আরেক জায়গায় হয়তো একই পরিণতি বরণ করবে অন্য কোনো শিশু।
[৬] ভবিষ্যতে ঠিক একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে, এ কথা মাথায় রেখে দেশের তরুণ প্রযুক্তিবিদদের প্রতি একটি অনুরোধ। চাঁদে রোবট পাঠানো নিয়ে যেমন জমজমাট রোবোটিক্স প্রতিযোগিতা হয়, ঠিক তেমনি উৎসাহ নিয়ে গভীর কোনো কূপে আটকা পড়া মানুষকে উদ্ধারের জন্য রোবোটিক্স প্রতিযোগিতা হোক। দুর্গত মানুষটির কাছে আলো, পানি, অক্সিজেন ও যোগাযোগের মাধ্যম পৌঁছে দেবে একটি রোবোট, যেটি একই সাথে তাকে যান্ত্রিকভাবে নিরাপদে চেপে ধরবে এবং উদ্ধারকারীরা সে মানুষটিকে সাধারণ একটি উইঞ্চ দিয়ে তুলে আনবেন। চাঁদে রোবোট পাঠানো খুবই উদ্দীপক একটি প্রস্তাব, কিন্তু একজন মানুষের প্রাণ বাঁচানো এর চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গতকাল যারা জিহাদের দুর্ভোগের সম্প্রচারে স্পনসর করে ব্যবসা করেছেন, তারা এ ধরনের একটি উদ্যোগে স্পনসর করে দ্বিতীয় জিহাদের প্রাণরক্ষায় অগ্রিম অংশ নিন। আমাদের তরুণরা অফুরান প্রাণশক্তি আর আইডিয়া নিয়ে প্রতিদিন ছটফট করেন, তাদের অংশগ্রহণে এ ধরনের একটি প্রতিযোগিতা থেকে অনেক সহজসাধ্য সমাধান বেরিয়ে আসবে বলি বিশ্বাস করি।
[৭] চলতে চলতে যেখানেই শিশুদের জন্য বিপদজনক কোনোকিছু দেখবেন, সাথে সাথে সবার গোচরে আনুন। প্রয়োজনে ঐ সমস্যাটি সমাধান না করা পর্যন্ত সমাধানের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাটিকে সম্ভাব্য সকল বৈধ চাপের মুখে রাখুন। হয়তো আমাদেরই কোনো শিশু বড় হয়ে পুরো মানবজাতির উত্তরণের ভার নিতে পারে, সে যেন একটি ১৫ ইঞ্চি পাইপের কাছে আমাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে পরাজিত না হয়।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।