Monday, December 29, 2014

নৌমন্ত্রী বিষয়ক হড়ুড়ে গল্প

গভীর রাত।

চারদিকে কুয়াশা।

পদ্মার স্রোত নোঙর ফেলে রাখা ফেরিটিকে পাশ কাটিয়ে বয়ে যাচ্ছে দক্ষিণে। হিম বাতাস একটু পর পর ঘা দিচ্ছে ফেরির গায়ে।

পাজেরোর সিটে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছেন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। কুয়াশায় ফেরি চলাচল বন্ধ। সন্ধ্যার দিকে মাদারিপুর ছেড়ে কাওড়াকান্দির দিকে রওনা হয়েছিলো তার গাড়িবহর। ভেবেছিলেন ভালোয় ভালোয় শিমুলিয়া ঘাটে গিয়ে পৌঁছাতে পারলে হরতালের আগে ঢাকায় ফিরে সারাটা দিন টিভিতে হিন্দি সিনেমা দেখে কাটিয়ে দেবেন। টাটকা খেজুড়ের গুড়ের ভাঁপাপিঠা টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে দিয়েছে তার এক ভাবী। মিষ্টি হেসে বলেছে, ঢাকায় গিয়া খাইয়েন। মজা লাগলে আমার কথা মনে কইরেন গো ভাইজান।

শাজাহান খান পাজেরোতে মোচড়ামুচড়ি করে আবার জুতমতো শোওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু শোওয়া যায় না। শালারা গাড়ি বানিয়েছে কিন্তু শোওয়ার বন্দোবস্ত রাখে নাই। কেমন মিস্ত্রি এরা? এরা কি জানে না যে এই গাড়ি ফেরিতে উঠতে পারে, আর সেই ফেরি কাওড়াকান্দি ঘাট ছেড়ে যাওয়ার আধঘণ্টার মাথায় মাঝপদ্মায় কুয়াশার কারণে আটকা পড়তে পারে? যত্তোসব মুরুক্ষু। মনে হয় গরু-ছাগলের ছবিও চিনে না শালারা।

ধোঁয়া ওঠা ভাঁপাপিঠা আর টিফিন ক্যারিয়ার হাতে ভাবীর মিষ্টি হাসির কথা ভাবতে ভাবতে শাজাহান খানের চোখ ঘুমে বুঁজে আসে। তার ড্রাইভার মন্টুও ঘুমে ঢলে পড়েছিলো, কিন্তু সে অল্পতেই বেজায় নাক ডাকে বলে তাকে আরেক গাড়িতে গিয়ে বসতে বলেছেন শাজাহান। গাড়িতে আপাতত আর কেউ নেই।

কিছুদিন আগেই লঞ্চডুবি হয়েছে কাওড়াকান্দি ঘাটের কাছেই। কথাটা মনে পড়তেই শাজাহান খানের ঘুম ঘুম ভাবটা চটে গেলো। সন্ধ্যায় চায়ের সঙ্গে ভাঁপাপিঠা খেতে খেতে চাচাতো ভাইয়ের নাতি পিঙ্কুর সঙ্গে গল্প করছিলেন তিনি। ক্ষুদে পিঙ্কুকে তার মা রোজ ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ায়। পিঙ্কু এসে তাই তার মন্ত্রী দাদাকে জিজ্ঞাসা করছিলো, দাদাজান, পদ্মা নদীতে নাকি শীতের রাইতে ডুবা লঞ্চের পেসিঞ্জার সব উইঠ্যা আসে?

শাজাহান খান চোখ গোল করে বলেছিলেন, হ রে নাতি! উইঠ্যা টর্চ ফালাইয়া দেখে, দুষ্ট পুলাপান সব ঘুমাইছে কি না। যদি দেখে কুন পুলা জাগনা, আইসা কপ কইরা তারে ধইরা পদ্মার মধ্যে টাইন্যা লইয়া যায়!

পিঙ্কু ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে একটা ভাঁপাপিঠা তুলে নিয়ে মায়ের কাছে ছুটে চলে গিয়েছিলো।

কিন্তু গল্পটা এখন মনে পড়ে যাওয়ায় শাজাহান খানের গা একটু ছমছম করতে থাকে। কী ভয়ানক কথা! পদ্মা নদীতে যা ডুবেছে, তাতো গন কেস। তারা যদি আবার উঠে এসে টর্চ মেরে লোকজনের সন্ধান করা শুরু করে, তাহলে ক্যামনে কী?

শাজাহান খান দামি পশমিনা চাদর দিয়ে নিজেকে আরো এক প্রস্থ মুড়ে মাথা ঢেকে শুয়ে পড়লেন।

কতোক্ষণ তিনি এভাবে শুয়েছিলেন, শাজাহান খান জানেন না, কিন্তু হঠাৎ এক ঝলক আলো যেন গাড়ির জানালা দিয়ে তার মাথা বরাবর এসে পড়লো।

শাজাহান খান চাদরের ফাঁক দিয়ে আলগোছে মাথা বের করে দেখলেন, একটা ভূতুড়ে অবয়ব তার গাড়ির দরজা খোলার চেষ্টা করছে। তীব্র আলোয় ছেয়ে গেছে চারদিক।

শাজাহান খান ফুঁপিয়ে উঠলেন। ধড়মড়িয়ে উঠে বসতে বসতে বললেন, আমার কোনো দোষ নাই রে ভাইটু। পরিবহন শ্রমিক, গার্মেন্টস শ্রমিক, সুন্দরবনের ডলফিন, এগুলি নিয়া ব্যস্ত থাকি। নৌপরিবহন নিয়া মাথা ঘামানির সময় পামু কই রে ভাইটু? তোমরা আল্লাহর মাল, তোমাগের আল্লাহয় নিয়া গেছে। আবার ক্যান আইলা ভাইটু? আমি একজন মন্ত্রী, তোমাগের লগে ক্যামনে পদ্মার তলে যাই? রহম করো ভাইটু, রহম করো।

মন্টু দরজা খুলে মাথা ভেতরে ঢুকিয়ে মন্ত্রীর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে হাত বাড়িয়ে তার কাঁধ ধরে সন্তর্পণে একটা ঠ্যালা দিয়ে বললো, আরে ও স্যার, উডেন উডেন! শিমুলিয়া আইসা পড়লাম তো। চা-চু খাইবেন নি কিছু?

শাজাহান খান চোখ পিটপিট করে মন্টুকে কিছুক্ষণ দেখেন, তারপ চোখ ডলে আশেপাশে তাকান। টর্চের আলো নয়, ভোরের রোদে ভরে গেছে গাড়ির ভেতরটা। ডুবে যাওয়া লঞ্চের অতৃপ্ত আত্মারা নয়, মন্টুই তার গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকছিলো।

তার মানে কোনো সমস্যা নেই, ভাবলেন উল্লসিত শাজাহান। নিরাপদে ঢাকায় ফিরে যাবেন তিনি। আবারো আগের মতো নৌপরিবহন মন্ত্রকের হাল ধরবেন। আরো চার বছরের জন্য।

শাজাহান রিয়ার ভিউ মিররের দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসলেন শুধু।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।