Saturday, September 27, 2014

আছায্য পাটীগণিত ০১: খন্দকার, ইকবাল, মতি

মশহুর মাসিক পত্রিকা কিশোর আলোর অনিয়মিত তারকা লেখক অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বিডিনিউজ২৪.কমে একটি কলাম প্রকাশ করেছেন, "ইতিহাসের ইতিহাস" শিরোনামে [সূত্র]। লেখাটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ (বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য এই পদটির কোনো বাংলা মনে হয় আর করা হয়নি, উপসেনানায়ক বলা যেতে পারে সম্ভবত) এয়ার ভাইস মার্শাল আবদুল করিম খন্দকারকে অপমান করা বিষয়ে। সম্প্রতি এ কে খন্দকার স্বনামধন্য কিশোর মাসিক কিশোর আলোর সহযোগী প্রতিষ্ঠান প্রথমা প্রকাশন থেকে একটি আত্মজৈবনিক গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন, তার শিরোনাম "১৯৭১: ভেতরে বাইরে"।
অধ্যাপক ইকবাল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তাঁর অনুরাগের প্রকৃতি ও ইতিহাস বর্ণনা করে মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়ক হিসেবে খন্দকারকে উপস্থাপন করে দুঃখ করে বলেছেন,
যখন আমি আবিষ্কার করেছি একটি বইয়ের বিষয়বস্তুর কারণে এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকারকে অপমান করার চেষ্টা করা হচ্ছে তখন বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে আহত করেছে।
এ কে খন্দকারকে কীভাবে কে কোথায় অপমান করার চেষ্টা করেছে, তার বিশদ বর্ণনায় অধ্যাপক ইকবাল যাননি, কেবল তার কারণটিকে সামনে এনেছেন। তিনি গভীর ক্ষোভ নিয়ে বলছেন,
আমরা আমাদের দেশে একজন মানুষকে তাঁর নিজের মত প্রকাশের জন্যে এভাবে অসম্মান করব আমি সেটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।
খন্দকারের লেখা বইটি আমি পুরোটা পড়িনি, বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে অধ্যাপক ইকবালও বিস্তারিত কিছু বলেননি, কিন্তু গুণী মানুষেরা কোনো কথা না বলেও অনেক কিছু বলে ফেলতে পারেন। রবি ঠাকুর এ ধরনের গুণীদের ওপর বিলা হয়ে লিখেছিলেন, তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মতো অধৈর্য হলে আমাদের চলবে না। একটু একটু করে পড়ে বুঝতে হবে, অধ্যাপক ইকবাল কী বলতে চেয়েছেন।
লেখার প্রারম্ভিক অংশ পড়ে বোঝা যায়, এ কে খন্দকার তাঁর বইতে এমন কিছু মত প্রকাশ করেছেন, যার প্রতিক্রিয়ায় কোনো এক রহস্যময় দুরুচ্চার্য মহল তাঁকে অপমান করার "চেষ্টা" করেছে। মানীর মান রক্ষার দায়িত্ব সকলেরই। কিন্তু মানীর মান রক্ষায় স্বয়ং মানীর কি কোনো দায় নেই?
এ কে খন্দকার মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়ক, তাঁকে কে সেধে সেধে বিনা কারণে অপমান করতে চাইবে? কিন্তু খন্দকার নিজে কি নিজের এই পরিচয়ের প্রতি সুবিচার করেছেন? যে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি জাফর ইকবাল তাঁর গভীর অনুরাগের কথা কয়েক প্যারা ধরে বিবৃত করেছেন, সে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিই কি খন্দকার সুবিচার করেছেন? কই, মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়ক এবং একটি স্বাধীন দেশের বিমানবাহিনী প্রধানের গর্বিত পরিচয় নিয়ে তিনি তো ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট ফৌজদারি অপরাধী খন্দকার মুশতাকের প্রতি অকম্পিত কণ্ঠে আনুগত্য প্রকাশে এতটুকু পিছপা হননি? তখন কি মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়ক পরিচয়টির গায়ে কাদার ছিটে লাগেনি?
অধ্যাপক ইকবাল তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, হয়তো ব্যাপারটা খেয়াল করার ফুরসত পাননি তখন।
জেনারেল জিয়াউর রহমান যখন সশস্ত্র বাহিনী থেকে মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা আর সৈনিকদের বিদ্রোহের অজুহাতে নামমাত্র বিচারে বা বিনা বিচারে ধরে ধরে ফাঁসি দিলেন, যে বিমানবাহিনীর প্রধান এ কে খন্দকার স্বয়ং কয়েক বছর আগেও ছিলেন, সে বিমানবাহিনীকে জিয়া যখন প্রায় মুক্তিযোদ্ধাশূন্য করে ফেললেন, তখন মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়ক কোথায় ছিলেন? জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদূত হিসেবেই কি তিনি দায়িত্ব পালন করছিলেন না তখন? মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়ক পরিচয়টি কি তখন আলমারিতে তুলে রাখা ছিলো?
অধ্যাপক ইকবাল তখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, হয়তো ব্যাপারটা খেয়াল করার ফুরসত পাননি তখন।
কামরুল হাসান যাকে বলেছিলেন "বিশ্ববেহায়া", সেই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, যিনি জেনারেল মঞ্জুরসহ আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের মৃত্যুর জন্যে দায়ী বলে নানা কৌতূহলোদ্দীপক বিবৃতি ও প্রতিবেদন আমরা পত্রিকায় পড়তে পাই, সেই এরশাদের কেবিনেটে যখন মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়ক এ কে খন্দকার পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে যোগ দিয়ে এরশাদের ধর্ম মন্ত্রী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দোসর রাজাকার মওলানা মান্নানের সহকর্মী হিসাবে কয়েক বছর দায়িত্ব পালন করে গেলেন, তখন পরিচয়টি কোথায় ছিলো? তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রী থাকার সময় যখন সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের পরিচয় মুছে ফেলা হলো, তখন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে অভীষ্ট ধরে সাধিত মহান মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়কের পরিচয়টি লজ্জায় বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলো কি?
অধ্যাপক ইকবাল তখন দেশের বাইরে, এসব খোঁজ রাখার ফুরসত পাননি বোধহয়।
মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়ক পরিচয়টির ওপর অতীতে অকাতরে ত্যাগ করা রহস্যময় হলদেটে তরলের দাগ এড়িয়ে অধ্যাপক ইকবালের কাছে এ কে খন্দকার কেবল সেক্টর কমাণ্ডারস ফোরামেরই প্রধান, যিনি অধ্যাপক ইকবালের সঙ্গে এক গাড়িতে পাশে বসে থেকে তাঁকে শিহরিত হওয়ার অমূল্য সুযোগ করে দেন। অধ্যাপক ইকবালের ভাষ্যে,
মনে আছে তিনি এবং তাঁর সহযোদ্ধারা একবার আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন এবং এয়ারপোর্ট থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পর্যন্ত পথটুকু আমি গাড়িতে তাঁর পাশে বসে এসেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের এ রকম একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের পাশে বসে আছি চিন্তা করেই আমি শিহরিত হয়েছিলাম।
অধ্যাপক ইকবাল হয়তো অনেক আগেই মার্কিন সিনেটর ড্যানিয়েল প্যাট্রিক ময়নিহানের নাম শুনে থাকবেন, আমি মোটে সেদিন শুনলাম। এই ভদ্রলোক বলেছিলেন, You are entitled to your opinion. But you are not entitled to your own facts. এই কথাটুকু একটু থেমে, মন দিয়ে পড়ে, হৃদয়ঙ্গম করে বাকি কথাগুলো শুনুন।
এ কে খন্দকার তাঁর বইতে মোটা দাগে অভিমত (opinion) দিতে গিয়ে কিছু ঘটনাকে বাস্তবতার (fact) রূপ দিতে চেয়েছেন। এ কে খন্দকারের অভিমত প্রকাশের অধিকার রয়েছে, কিন্তু সে অভিমতের সমর্থনে নিজের অভিলাষ অনুযায়ী বাস্তবতা উৎপাদনের অধিকার তাঁর নেই। শুধু তাঁর কেন, কারোই নেই। তিনি নিজের অভিমতের পক্ষে যায়, এমন একটি গুজব (যা কিনা সেই গুজবের প্রাথমিক ধারকেরা নিজেরাই ক্ষমা চেয়ে নাকচ করেছেন [সূত্র]) নিজের বইতে গুঁজে দিয়ে বলেছেন, শেখ মুজিব ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তাঁর ভাষণের শেষে জয় পাকিস্তান বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া নিয়েও খন্দকার তথ্যসূত্র সমর্থিত গ্রন্থনার বিপরীতে গিয়ে অভিমত দিয়েছেন। ইতিহাস নিয়ে অভিমত দিতে গেলে যে ডিউ ডিলিজেন্স ইতিহাস লেখকের কাছ থেকে পাঠক আশা করে, তার ব্যাপক ঘাটতি বইটিতে রয়েছে বলেই অনেক পাঠক অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
এ কে খন্দকার তাঁর পাঠককে প্রবঞ্চিত করেছেন এখানেই। বইটি তিনি লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়ক পরিচয়ে, কিন্তু সে পরিচয়টির প্রতি কোনো সুবিচার তিনি করেননি। মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়ক পরিচয়টির প্রাপ্য সম্মান না দিয়ে যেভাবে তিনি অতীতে ফৌজদারি অপরাধীর প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন, যেভাবে এ মহান পরিচয়টিকে তিনি ধরাশায়ী করে ক্ষমতা জবরদখলকারীর রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন, যেভাবে এ পরিচয়ের মুখে চুনকালি দিয়ে তিনি আরেক ক্ষমতা জবরদখলকারীর কেবিনেটে রাজাকারের সহকর্মী হয়েছিলেন, একই অবহেলায় তিনি মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়ক পরিচয়টির মান ডুবিয়ে অসত্যভাষণের মাধ্যমে পাঠককে ঠকিয়েছেন। তিনি যা বলেছেন, তা সত্য হিসাবে প্রমাণ করতে পারেননি, কেবলই এক বৃদ্ধের ব্যক্তিগত হিসাবনিকাশতাড়িত অসংলগ্ন অভিমত তিনি পাঠককে গছিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়কের এ ভীমরতি কি সহজে মেনে নেওয়া যায়? মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ফসল আজকের তরুণ পাঠকের কি ক্ষুব্ধ ও অপমানিত হওয়ার অবকাশ খন্দকার নিজেই করে দেননি?
কিন্তু আমপাঠকের মতো অধ্যাপক ইকবাল ক্ষুব্ধ বা অপমানিত কিছুই হননি। তিনি শুধু "মন খারাপ" করেছেন, তাও বেশি নয়, "একটু"।
আগেই বলেছি এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকারের বইটি পড়ে আমার একটু মন খারাপ হয়েছে।
এই তথ্যসূত্র-অসমর্থিত ও পরের-মুখে-ঝাল-খাওয়া বইটি লিখে খন্দকার মুক্তিযুদ্ধ ও নিজের মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়ক পরিচয়টিকে অপমান করেছেন, এটা বোঝার মতো পরিপক্কতা হয়তো অধ্যাপক ইকবালের এখনও আসেনি। সবার মান-অপমান বোধ একরকম নয়, আমরা বুঝতে পারি।
কিন্তু এরপর খুব বিস্মিত হয়ে দেখি, খন্দকার যে অসত্য কথাগুলো বইতে বলেছেন বলে জাফর ইকবাল ব্যবচ্ছেদ করে দেখিয়েছেন, সেই ব্যবচ্ছেদের পরও অধ্যাপক ইকবাল বলছেন,
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলে একটা কথা আছে, মাওলানা আবুল কালাম আজাদও তাঁর মত প্রকাশ করার জন্য ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ নামে একটা বই লিখেছিলেন। সেই বই পড়ে বইয়ের সংক্ষিপ্ত একটা রূপ ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। পুরো বইটি পড়ে অনেকে মনে কষ্টে পেতে পারে বলে তিনি বলেছিলেন তাঁর মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর পরে যেন পুরো বইটি প্রকাশ করা হয়। তাঁর মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর পর আমরা সেই বইটি পড়ার সুযোগ পেয়েছি। কাজেই ইতিহাসে সত্য যুক্ত করার জন্যে সময় নেওয়ার উদাহরণ পৃথিবীতে আছে– একজন মানুষকে অসম্মান করা হবে জানলে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
এখানে এসে বিভ্রান্ত ও হতচকিত হয়ে যাই। লেখার এক অংশে যেখানে অধ্যাপক ইকবাল নিজেই খন্দকারের বইতে গ্রন্থিত অসত্যকে কাটাছেঁড়া করে পাঠককে দেখালেন, একটু পর তিনিই আবার বলছেন, ইতিহাসে "সত্য" যুক্ত করার জন্য সময় নেওয়ার উদাহরণ আছে। ব্যাপারটা কেমন আঁশটে হয়ে গেলো না? অধ্যাপক ইকবাল কি ঘুরিয়ে এটাই বললেন না, যে খন্দকারের বইটি ইতিহাসে সত্য যুক্ত করে? এ কেমন স্ববিরোধিতা? আর অধ্যাপক ইকবাল কি অভিমত আর সত্যের মধ্যে পার্থক্য বোঝেন? মাওলানা আজাদের বইতে যা লেখা আছে, সেটি মাওলানা আজাদের অভিমত, যা সত্য হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। আজ যদি কেউ একটা বইতে লেখে, অধ্যাপক ইকবালের হাত রোজ রাত একটার সময় লম্বা হতে হতে হতে হতে শোবার ঘর থেকে ডাইনিং রুমে এসে ফ্রিজ খুলে একটা প্যাটিস বের করে নিয়ে আবার ছোটো হতে হতে হতে হতে ডাইনিং রুম থেকে শোবার ঘরে চলে যায়, এটা কি পঞ্চাশ বছর পর প্রকাশ করলেই সত্য হিসাবে ধরে নিতে হবে?
বাস্তব উদাহরণ থেকে কিন্তু আমরা দেখতে পাই, ইতিহাসে মিথ্যা যুক্ত করার জন্য দীর্ঘ সময় নেওয়ার উদাহরণই বরং কিছু জোচ্চোর প্রকাশক আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে।
অধ্যাপক ইকবাল বই পড়ে যে "একটু" মন খারাপ করেছেন, সে ক্ষত তিনি সারাবার জন্যে ধর্ণা দিয়েছেন প্রথমা প্রকাশনের কাছে। এবং সে আলাপচারিতার বিবরণ থেকে আমরা জানতে পারি, বইটির কোনো পাণ্ডুলিপি নেই, বইটি লেখা হয়নি, বরং খন্দকারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বইটি "প্রস্তুত" করা হয়েছে। মনের সেই "একটু খারাপ" ভাবকে সারানোর ঔষধ হিসাবে "মনের সান্ত্বনা"র জন্যে অধ্যাপক ইকবাল প্রথমা প্রকাশনের কাছ থেকে এই প্রস্তুতির ওপর একটু পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রার্থনা করেছেন।
অধ্যাপক ইকবাল লেখার এ পর্যায়ে এসে তাঁর অনুরাগভাজন খন্দকারকে নিষ্কৃতি দেওয়ার একটি উপায়ও খুঁজে পেয়েছেন।
বইটি লেখার দায়ভার কি শুধু লেখকের? প্রকাশককেও কি খানিকটা দায়ভার নিতে হবে না? আপত্তিকর কিংবা বিতর্কিত কিছু লিখে একজন লেখক সমালোচনা আর অসম্মান সহ্য করবেন এবং সেই সমালোচনা আর অসম্মান বিক্রি করে প্রকাশক অর্থ উপার্জন করবেন সেটি কেমন কথা? আমরা কি কোনোভাবে প্রকাশককেও দায়ী করতে পারি?
এ ব্যাপারে অধ্যাপক ইকবালের সঙ্গে আমি সর্বাংশে সহমত পোষণ করি। এবং দেখতে পাই যে তিনি খন্দকারের বইটিকে "আপত্তিকর" হিসাবে উল্লেখ করছেন।
কিন্তু এই "আপত্তিকর" রচনাকে তিনি লেখার আরেক অংশে "মত প্রকাশের স্বাধীনতা" হিসাবেও উল্লেখ করছেন। অর্থাৎ, তাঁর দাবিটি হচ্ছে, যারা মানী লোক, তাদের মত আপত্তিকর হলেও আমরা পাঠকেরা, যাদের কেবল অপমানিত হওয়ার সুযোগ আছে, তারা কিছু বলতে পারবো না। বললে যদি মানী লোকটি অপমানিত হন?
অধ্যাপক ইকবাল, যিনি খন্দকারের বইটি পড়ে অপমানিত হন না, মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়কের মুখে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসত্য অসংলগ্ন কথা শুনে ক্ষুব্ধ হন না, অতীতে তাঁর নিজের হাতে মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়ক পরিচয়টিকে ভূলুণ্ঠিত করার উদাহরণ গোপন রেখে কেবল সেক্টর কমাণ্ডারস ফোরামে তাঁর নেতৃত্বের কথাটুকুই বলেন, কায়দা করে চেপে গেলেন, স্বয়ং সেক্টর কমাণ্ডারস ফোরামের অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধনায়কেরা কী তীব্র ভাব ও ভাষায় খন্দকারের বইটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন [সূত্র]।
সেইসাথে অধ্যাপক ইকবাল এক আছায্য পাটীগণিতেরও সন্ধান দিয়েছেন আমাদের। তিনি আবিষ্কার করেছেন, এই "আপত্তিকর" বইটি লেখার দায়ভার যদি বইটির প্রকাশক মতি কিছুটা নেয়, তাহলে খন্দকার তাঁর সম্মান আবার ফেরত পাবেন। তাঁর কাছে সম্মান বিষয়টি বিস্কুটের মতো, আর অপমান সেই বিস্কুট কেড়ে নেওয়ার মতো। যদি কেউ কুকর্মের ভাগিদার হিসেবে হাজির হয়, তাহলে খন্দকার অর্ধেক বিস্কুট ফেরত পাবেন, এমনই মনে হয় তাঁর প্রস্তাব শুনলে।
আমার খুব ইচ্ছে আমাদের সবার কাছে সম্মানিত বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে খন্দকারের বক্তব্যের দায়ভার প্রকাশক খানিকটা হলেও গ্রহণ করে তাঁকে যেন তাঁর সম্মানটুকু ফিরিয়ে দেয়।
অধ্যাপক ইকবাল তুচ্ছ ব্লগ-ফ্লগ পড়ে সময় নষ্ট করবেন না জানি। তারপরও বিনয়ের সঙ্গে তাঁকে বলি, বইটি বিক্রি করে যে অর্থ প্রথমা প্রকাশন উপার্জন করছে, তার একটি নির্দিষ্ট শতাংশ কি খন্দকার রয়্যালটি হিসাবে পাচ্ছেন না? তাঁর অসম্মানের বিনিময়ে মতি প্রকাশক একলাই কামাচ্ছে, ওনাকে কি কিছুমিছু দিচ্ছে না?
দ্বিতীয়ত, এ কে খন্দকার তো হামাগুড়ি দেওয়া শিশু নন, যে ওনাকে ভুলিয়েভালিয়ে বই "প্রস্তুত" করে মতি ওনাকে অপমানের দিকে ঠেলে দেবে। উনি সবকিছু জেনে বুঝে যেমন খন্দকার মুশতাকের কাছে আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন, সবকিছু জেনেবুঝে যেমন জিয়ার রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন, সবকিছু জেনেবুঝেই যেমন এরশাদের মন্ত্রী আর মাওলানা মান্নানের সহকর্মী হয়েছিলেন, তেমনই এ বইটাও সবকিছু জেনেবুঝেই লিখেছেন (আসলে "প্রস্তুত" করতে সহায়তা করেছেন)। মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়ক পরিচয়টিকে বাংলাদেশে সবচেয়ে অপমান যদি কেউ করে থাকে, তিনি আবদুল করিম খন্দকার নিজেই।
এতো কথার পর মুখে চলে আসা থুতু গিলে ফেলে তৃতীয় অনুরোধটা বিনয়ের সঙ্গেই করি, মুক্তিযুদ্ধের উপসেনানায়কের অসম্মান বিক্রি করে পয়সা কামানো মতি প্রকাশকের পত্রিকা কিশোর আলোতে পরবর্তী লেখাটি কী নিয়ে লিখবেন স্যার?

2 comments:

  1. ভাই আর যাই হোক শিরোনামটা সত্যি দারুন হয়েছে। ভাল লাগল

    ReplyDelete
  2. khub bhalo hoeche apnar lekha ta.

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।