Tuesday, August 05, 2014

আল্লাহর মাল

নিয়ম অনুসরণের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে একটা ঢিলেঢালা নিয়তিনির্ভর মনোভাব কাজ করে। এক বাক্যে প্রকাশ করতে গেলে, রাখে আল্লাহ মারে কে?
বাংলাদেশের অধিকাংশ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থায় নিরাপত্তার জন্য ইহলৌকিক কোনো ব্যবস্থা বা নিয়মের ধার না ধেরে সরাসরি আল্লাহর ঘাড়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়। যে সেতুতে ৫ টনের বেশি ভারবাহী যান চলা নিষেধ, চালকেরা অম্লানবদনে তাতে ১৫ টন নিয়ে উঠে পড়তে পারে। যে লঞ্চে নিরাপত্তার খাতিরে সর্বোচ্চ ৮৫ জন যাত্রী তোলা বৈধ, তাতে আড়াইশো জন যাত্রী আল্লাহর হাতে নাব্যতা ও প্লবতার দায়িত্ব সঁপে দিয়ে উঠে পড়ে। আবহাওয়া বৈরী হয়ে এলে যখন কোনো ক্যাটেগরির লঞ্চের যাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়, তখনও আল্লাহর হাতেই সবকিছু ছেড়ে দিয়ে পার্থিব টাকাপয়সার পেছনে লঞ্চ ছোটে।
দুর্ঘটনা যদি ঘটেই যায়, তখন আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে দোষারোপের উপায়ও থাকে না। কারণ, মারে আল্লাহ রাখে কে?
পাবলিকের জন্যে বরাদ্দ সবকিছুতে আল্লাহকে চিফ সিকিউরিটি অ্যান্ড সেফটি অফিসার হিসাবে নিয়োগই যদি দেওয়া হয়, তাহলে মন্ত্রী-এমপি-নেতারা কেন লটবহর নিয়ে নিরাপত্তা প্রোটোকলসহ চলাফেরা করে?
হয়তো, শুধু পাবলিকই আল্লাহর মাল।
মানুষ কয়েক হাজার বছর ধরে জলচর। কোনো নৌযান কখন পানিতে ভাসবে, কখন ডুবে যাবে, তা নির্ধারণের জন্যে প্রয়োজনীয় জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা এই কয়েক হাজার বছরে সঞ্চিত হয়ে গেছে। সারা দুনিয়াতে কোটি কোটি মানুষ কিছু সরল নিয়ম মেনে চলে নৌকাডুবি এড়িয়ে চলতে পারছে, আমরা পারছি না। কর্তৃপক্ষকে গালি দিতে দিতে মুখ ব্যথা হয়ে যাওয়ার পর টের পাচ্ছি, সমস্যাটা শুধু কর্তৃপক্ষেরই নয়। কর্তৃপক্ষ যেমন পাবলিককে আল্লাহর মাল হিসাবে বিবেচনা করে, যারা ভিকটিম, তারাও কর্তৃপক্ষের মতোই নিজেদের আল্লাহর মাল ভাবে। কপালের নিচে দুটো চোখ থাকলে যে লঞ্চে ৮৫ জন যাত্রী ওঠার কথা, তাতে ঠেসেঠুসে আড়াইশো জন ওঠার কথা নয়। ঐ আড়াইশো জন মানুষের মধ্যেও সবকিছু আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার প্রবণতা কাজ করেছে।
ডুবে যাওয়া লঞ্চ টেনে তোলা হয়, মানুষগুলো ফিরে আসে না। লঞ্চ মালিকেরও কয়েকটা খ্যাপের টাকা গচ্চা যায়, এরচেয়ে বেশি কিছু হয় না। বরং পাবলিকের কাছ থেকে আদায় করা রাজস্ব থেকে ছাগল কিনে মৃতদের পরিবারকে "ক্ষতিপূরণ" দেওয়া হয়।
কিছুদিন আগে একটি যুগান্তকারী রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। চালকের ভুলে দুর্ঘটনা ঘটলে মালিকের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা যাবে [সূত্র]। স্থলযানের ক্ষেত্রে এ রায় খাটলে, জলযানের ক্ষেত্রেও খাটার কথা। সাম্প্রতিক লঞ্চডুবিতে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে অন্তত একটি ক্ষতিপূরণ মামলা করে যদি লঞ্চের মালিকের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়, নৌপথে আল্লাহর ওপর নির্ভরতা কমে তুচ্ছ ইহলৌকিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে যেতে যদি পারেন, লঞ্চ মালিকদের পকেট থেকে টাকা নিয়ে সেই মালের উত্তরাধিকারীদের মাঝে কি আল্লাহ বণ্টন করে দিতে পারেন না?
একই সাথে সাংবাদিক ভাইদের কাছে আরেকটি নিবেদন। বিশ্বকাপের সময়, বা ভোটের সময় আপনারা বিভিন্ন দলের স্কোর রাখেন। একইভাবে যদি নৌপরিবহন মন্ত্রীদের হাস্যোজ্জ্বল ছবিসহ নিমজ্জনে মৃতদের সংখ্যা দিয়ে স্কোরবোর্ড তৈরি করে যে যার পত্রিকায় টাঙিয়ে রাখতে পারেন, তাহলে পাঠক ও ভোটারদের গুণতে সুবিধা হবে, কার আমলে কর্তৃপক্ষীয় অবহেলায় কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আল্লাহর মালের হিসাব আল্লাহ রাখেন জানি, আমরাও নাহয় রাখা শুরু করলাম?

1 comment:

  1. আপনার লেখাটা আমার ফেসবুক পেজে ব্যবহার করলাম।
    আপনার অনুমতি না নেওয়ার জন্য দুঃখিত।
    আপনার আপত্তি থাকলে মুছে দিব।

    https://www.facebook.com/pages/%E0%A6%B2%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0/182166641910363?ref=hl

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।