Friday, August 22, 2014

বৃষ্টিমান যন্ত্র

বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের ধরন নাকি বদলে যাচ্ছে।
পিচ্চিকালে বইতে পড়েছিলাম, বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। তখন মনে হতো, ওটাই স্বাভাবিক। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চার ঋতুর কথা পড়লে একটা চাপা গর্ব হতো, ভাবতাম আমাদের দুটো বাড়তি ঋতু আছে। পৃথিবী একদিকে হেলে থাকার কারণে বছরে চারটি ঋতু থাকাই যে স্বাভাবিক, সেটা ধরতে অনেক সময় লেগেছে। কিন্তু ততোদিনে বুঝে গেছি, বাংলাদেশ আর শৈশবের ষড়ঋতুর দেশ নেই। বর্ষাকাল এখন গ্রীষ্মের জন্য অনেকখানি জায়গা ছেড়ে দিয়ে শরতকে ঘরছাড়া করে ফেলেছে। এই কোনোমতে টিকে থাকা বর্ষাকালের পেছনেও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এখন আঙুল দিচ্ছে।
আমাদের দেশটাই গড়ে উঠেছে বর্ষার হাতে। হিমালয় থেকে কোটি কোটি টন পলি বর্ষাই বয়ে এনে একটু একটু করে বাংলাদেশের শরীরে মাংস যোগ করছে অনাদিকাল থেকে। আমাদের কৃষি আর যোগাযোগ এককালে সম্পূর্ণ বর্ষাকেন্দ্রিক ছিলো। ইংরেজের হাতে পড়ে নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা পেছনের সারিতে চলে গেলেও কৃষি এখনও বর্ষার ওপর পুরো এক মৌসুম ভরসা করে আছে। আমাদের দেশে যে ধান চাষ করা হয়, সে ধানও বিবর্তিত হয়েছে সুদীর্ঘ সময়ের নিয়মিত বর্ষার সাথে। এখন হঠাৎ যদি বর্ষার কিসিম পাল্টে যায়, তাহলে কৃষককে বর্ষা মৌসুমেও সেচের দিকে ঝুঁকে পড়তে হবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আবারও নতুন করে চাপের মুখে পড়বে।
কৃষি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্যে আমাদের এখনই বৃষ্টিপাতের ওপর নিখুঁত কিছু মডেল প্রণয়ন করা প্রয়োজন। কিন্তু এই মডেলের উপাত্তের জন্যে যে সাধারণ যন্ত্রটি প্রয়োজন হয়, সে বৃষ্টিমান যন্ত্র (রেইন গেজ) আমাদের আবহাওয়া বিভাগের হাতে নাকি পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই। ১৫ কিলোমিটার অনুবিভাজনে সারা দেশে বৃষ্টিমান যন্ত্রের প্রয়োজন হয় দেড় হাজারটি, আবহাওয়া বিভাগের কাছে নাকি একটিও নেই [সূত্র]। পত্রিকায় পড়লাম, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই বৃষ্টিমান যন্ত্র নষ্ট থাকায় বা তথ্য সংগ্রহে গাফিলতি থাকায় অনেক স্থানে বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থাও অচল হয়ে পড়ে আছে।
আমাদের তরুণ প্রকৌশলীরা কিন্তু একটি স্বয়ংক্রিয় বৃষ্টিমান যন্ত্র নকশায় এগিয়ে আসতে পারেন। ফ্লোট সেন্সর ব্যবহার করে প্রতিদিনের বৃষ্টিপাতের তথ্য একটি স্মৃতিকোষে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। মোবাইল পরিষেবার এই রমরমা যুগে এই তথ্য প্রতিদিন একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে পাঠানোও কোন কঠিন কাজ নয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো এখনও বৃষ্টিমান যন্ত্রের পাঠ নিতে একজন পাঠকর্মীকে এখানে ওখানে পাঠায়, ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি জনবলনির্ভর ও সে জনবলের সততা/দক্ষতানির্ভর হয়ে আছে। বৃষ্টিপাতের নিখুঁত তথ্য যেখানে সারা দেশে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার কৃষি, যোগাযোগ ও বন্যা-মোকাবেলা ব্যবস্থার ভিত্তি, সেখানে পুরো তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থাটিই আধুনিক ও তাৎক্ষণিক হওয়া বাঞ্ছনীয়।
আমাদের দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এখন ধীরে ধীরে উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। উদ্যোক্তা এবং সরকারের উচিত দেশের জন্য অপরিহার্য সকল ক্ষেত্রে কারিগরি উৎকর্ষ সাধন। সরকার যদি এই সামান্য স্বয়ংক্রিয় বৃষ্টিমান যন্ত্র উদ্ভাবন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য ব্যবস্থাপনার পেছনে বিনিয়োগ করেন, আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা একদিকে যেমন নতুন প্রযুক্তি প্রণয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের চর্চা বেগবান করতে পারবেন, সরকারও প্রযুক্তি খাতে দেশীয় উদ্যোগের পৃষ্ঠপোষকতা করে ব্যয় সাশ্রয় করতে পারবেন।
রোম একদিনে তৈরি হয়নি, আমরাও একদিনে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের শীর্ষে উঠে যেতে পারবো না। কিন্তু ছোটো ধাপগুলো যাতে পাড়ি দিতে পারি, সে সুযোগ সরকারকেই করে দিতে হবে।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।