Thursday, June 05, 2014

পাঠ্যক্রমে নতুন ঢঙে ইতিহাস পড়ানো হোক

সপ্তম শ্রেণীতে যখন পড়ি, ছোটোখাটো এক বিষণ্ণ চেহারার শিক্ষিকা এলেন আমাদের ক্লাসে। আমরা নতুন এই ম্যাডামকে খালি হাতে ক্লাসে ঢুকতে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম, একটু নিরাপদে বিটকেলপনা করা যাবে, এ-ই ভেবে। সেই ভুলজন্মা স্বস্তি মিনিট পাঁচেক স্থায়ী ছিলো। ম্যাডাম নিচু গলায় জানালেন, তাঁর নাম মিসেস ত্রিবেদী। তাঁর পূর্বপুরুষ তিনটি বেদ কণ্ঠস্থ করেছিলেন বলে তাঁদের এই পদবী। তারপর তিনি চেশায়ার বেড়ালের মতো হাসিমুখে আমাদের বললেন, আমার পূর্বপুরুষ যদি তিনটি বেদ মুখস্থ করতে পারেন, তোমরা সমাজ বিজ্ঞান বইয়ের এক পাতা মুখস্থ করতে পারবে না কেন? রোজ এক পাতা করে মুখস্থ করে আসবে বাড়ি থেকে। ক্লাসে আমি পড়া ধরবো। যে পারবে না তাকে বেতের বাড়ি খেতে হবে।
এরপর দপ্তরী দাঁত বের করে হাসতে হাসতে প্রকাণ্ড এক বেত নিয়ে আমাদের ক্লাসে ঢুকলো। সেই বেতের উচ্চতা মিসেস ত্রিবেদীর সমান, প্রস্থে আমাদের একেকজনের হাতের বুড়ো আঙুলের মতো। মিসেস ত্রিবেদী বেতটা নিয়ে বাতাসে সপাং করে একটা শব্দ করলেন, আমরা বহু কষ্টে প্যান্ট শুষ্ক রেখে ক্লাসটা কোনোমতে পার করলাম।
এরপর বছরভর সমাজ বিজ্ঞান বইয়ের এক এক পাতা করে আমাদের মুখস্থ করতে হয়েছে। আমি জীবনে একবারই ত্রিবেদী ম্যাডামের ধোলাই খেয়েছিলাম। তিনি দুঃখিত চিত্তে বলেছিলেন, তুমি তো অন্যদিন পারো, আজকে পারলে না কেন? আমি অন্যদিন পারি বলে সেদিন আমাকে ছাড় দেননি, লোকে যেভাবে অন্য লোকের গরুকে পিটিয়ে ক্ষেত থেকে তাড়ায়, সেভাবে পিটিয়েছিলেন। বাড়ি ফিরে গোসল করতে গিয়ে দেখি আমার বাহু আর কাঁধে বেতের চাকা চাকা দাগ হয়ে আছে।
ক্লাস সেভেনে সমাজ বিজ্ঞানের একটা বিরাট অংশ ছিলো ইতিহাস। বখতিয়ার খিলজির পর হোসেনশাহী, তারপর মোগল আমল, তারপর ইংরেজ আমল নিয়ে পাতার পর পাতা সাল আর নামে কণ্টকিত তখনকার আমার চোখে নিরর্থক সব কথাবার্তা দিয়ে বইটা বোঝাই ছিলো। আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পাতা মুখস্থ করার কয়েকদিন পর আবার ওয়ারেন হেস্টিংসের পাতা মুখস্থ করতে হতো, ততোদিনে আলাউদ্দিন হোসেন শাহের কিছুই আমার আর মনে নেই। সেটাও সমস্যা ছিলো না। কিন্তু সমাজ বিজ্ঞান বইয়ের ঐ নীরস, বিশুষ্ক তথ্যে ঠাসা লেখার ধরনের জন্যেই হোক, কিংবা মিসেস ত্রিবেদীর গরুপেটা ধোলাইয়ের কারণেই হোক, এই ইতিহাসের ওপর আমার মনে একটা মর্মান্তিক বিরাগ জন্মায়। আমাদের স্কুলে অন্যান্য ম্যাডামরাও ক্লাস সেভেনের পর বছরখানেক সমাজ বিজ্ঞান পড়িয়েছিলেন, তাঁরা অনেক স্নেহ নিয়ে পড়ালেও আমরা সাধারণত ঐ একটা ঘণ্টা হট্টগোল করে কাটিয়ে দিতাম।
ক্লাস সিক্সে বিজ্ঞান বইতে পড়েছিলাম, এনোফিলিস মশা ভূমির সাথে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণ করে বসে, আর কিউলেক্স মশা বসে ভূমির সাথে সমান্তরাল হয়ে। দুই যুগ আগে পড়া এই তথ্য এর পর একবারও পুনরাবৃত্ত হয়নি লেখাপড়ার কোনো কাজে, তারপরও, এখনও মনে আছে, কারণ অনেক বিস্ময় নিয়ে তখন ক্লাসে বসে ভাবছিলাম, যারা বই লেখে, তারা কীভাবে এই কোণটা মাপলো? মশাগুলো কি চুপচাপ বসে থেকে চাঁদা দিয়ে কোণ মাপা বরদাশত করেছিলো? মতিকণ্ঠের ভাষায় সংক্ষেপে বলতে গেলে, "কায়দাটা কী"? এই প্রশ্নের সম্ভাব্য সমাধান অনেক পরে ত্রিকোণমিতি শেখার পর নিজে ভেবে বের করেছিলাম, কিন্তু এখন চিন্তা করলে মনে হয়, কোণ কীভাবে মাপা হয়েছিলো, সেটা বলা না থাকলেও বইটা একটা কাজের কাজ করতে পেরেছিলো, আমার মনে কৌতূহলটা জাগিয়ে তুলতে পেরেছিলো, যেটা ঐ বয়সের ছাত্রছাত্রীদের জন্যে আবশ্যক।
অথচ সমাজ বিজ্ঞান বইতে পড়ার পর আরো বহুবার পড়েছি, কিন্তু আমার এখন মনে নেই, আলাউদ্দিন হোসেন শাহ কবে গদিতে বসেছিলো, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কবে হয়, কিংবা কোন লর্ডের পর কোন লর্ড ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় পদে সমাসীন ছিলো। এর পেছনে মিসেস ত্রিবেদীর লাঠ্যৌষধি পাঠদানের ভূমিকা থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু তারচেয়ে বহুগুণে আছে এই ব্যাপারগুলো কীভাবে আমাদের পড়তে দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু সেই ক্লাস সেভেনেরও আগে সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত কিশোর ক্লাসিকের নানা গল্প, যেগুলোতে মূলত ইতিহাসের গল্পই বলা হয়েছে, সেগুলো কিন্তু মনে গেঁথে ছিলো বহুদিন। থ্রি মাস্কেটিয়ার্স কিংবা আ টেল অব টু সিটিজ সাগ্রহে পড়ে গেছি, কিন্তু ওয়ারেন হেস্টিংসের শাসনামল নিয়ে পড়তে গিয়ে ভীষণ বিরক্ত লেগেছে। এমন কেন হয়েছিলো?
এমনকি গরুও ঘাসের সেলুলোজ একা একা হজম করতে পারে না। তার জন্যে তাকে নিজের পেটে জীবাণু পালতে হয়। সেই জীবাণুরা সেলুলোজ ভেঙে গরুকে বাঁচায়, আমরাও দুধ আইসক্রিম ইত্যাদি খাওয়ার সুযোগ পাই। আমাদের পাঠ্যক্রমের ইতিহাস বইগুলো এমনভাবে লেখা, যেন গরুর বদলে মানুষকে ঘাস খেতে দেওয়া হচ্ছে। এখন কী অবস্থা, আমি জানি না, কিন্তু এখনকার ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এতে খুব বেশি পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয়নি। আমাদের পাঠ্যবইগুলো যাঁরা লেখেন, তারা ছাত্রছাত্রীদের প্রতি কতোটা সদয়, এ নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।
ওয়ারেন হেস্টিংসীয় ইতিহাসের প্রতি আমার বিরাগমোচন (রাগমোচনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না) ঘটতে অনেক দেরি লেগেছিলো। সেটাও ঘটেছে গল্প উপন্যাসের হাত ধরে। বিনয়-বাদল-দীনেশের কাহিনী পড়ে দারুণ রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম, কিন্তু এঁদের গল্প আমাদের পাঠ্যবইতে আসেনি। আব্রাহাম ইরেইলির বইগুলো পড়ে ভারতবর্ষ বা মোগলদের ইতিহাস পড়ে যতোটা তৃপ্তি পাওয়া যায়, সমাজবিজ্ঞান বইতে তা পাইনি। কেন এমন হলো?
ইতিহাস তো আসলে গল্পই। কিন্তু সে গল্প কাকে বলা হচ্ছে, সেটা গল্প বলার সময় মাথায় থাকতে হবে। এগারো বছরের বাচ্চাদের এতো শয়ে শয়ে নাম আর সাল গরুপেটা করে মুখস্থ করানোর নাম কেন শিক্ষাদান হবে? এটা তো নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে।
সমাজ বিজ্ঞানে লেখা ইতিহাস পড়ে খুব বেশি কৌতূহল জাগেনি মনে। মনে হয়েছিলো, ঐ লোকগুলো কেবল আমাদের নির্যাতন করার জন্যই প্রতি দশ বছর পর পর ১৪৫০, ১৬৮০, ১৭৭০, এরকম মুখস্থবান্ধব সালে ক্ষমতা না ছেড়ে মাঝামাঝি নানা বছরে গদি ছেড়েছে। আলাউদ্দিন হোসেন শাহ তার ছেলেকে ক্ষমতাই যখন দেবে, কেন তার নাম আমাদের কথা বিবেচনা করে সালাউদ্দিন হোসেন শাহ রাখেনি, সেটা নিয়েও একটু চাপা অনুযোগ ছিলো আমাদের মধ্যে। হেস্টিংস, ডালহৌসি, ক্যানিং, মিন্টো, রিপন, লিটন হাবিজাবি নামগুলোকে মনে হয়েছে এদের বাবামায়ের বিটকেলপনা। আর এতো নাম আর সাল মুখস্থ করে এসে নিজের দেশের নিকট ইতিহাস পড়তে গেলে আরো আটকে যেতে হতো, কারণ সেগুলোও অনেক একঘেয়েভাবে লেখা ছিলো। এখনকার ছাত্রছাত্রীরা অভিযোগ করে, ১৯৭১ এর পর কীভাবে কী হলো, সেটা তারা জানতে চায়, কিন্তু ভালো বই নেই।
ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা এক জিনিস, আর কিশোরপাঠ্য ইতিহাস লিখতে পারা আরেক জিনিস। আমাদের এতো শয়ে শয়ে নাম মুখস্থ না করিয়ে যদি কৌতূহলের চাবিটা তুলে দেওয়া হতো, তাহলে ইতিহাস মুখস্থ করার বদলে আমরা ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী হতে শিখতাম। হয়তো ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার কী কী ক্ষতি করে গেছে, নিজেরাই এ বই ও বই টুকে খোঁজ করার চেষ্টা করতাম, যদি শুধু আমাদের শিক্ষকেরা কৌতূহলী হতে শেখাতেন। এখনও তো বাচ্চাদের প্রকাণ্ড ভারি বোঝা নিয়ে স্কুলে-কোচিঙে-টিউটরের কাছে হানা দিয়ে অনেক কিছু গলাধকরণ করতে হয়, কিন্তু চিন্তা করে দেখুন, কোনটা জরুরি? এই তথ্যগুলো মুখস্থ করানো, নাকি তথ্যগুলো নিয়ে তাদের চমৎকৃত হতে শেখানো?
আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে জড়িত খুব চতুর কোনো লোক, কিংবা একাধিক লোক, আলগোছে একটা পুরো জাতিকে নিজেদের ইতিহাস নিয়ে নির্লিপ্ত, এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বীতশ্রদ্ধ বানানোর পথ খুঁজে পেয়েছে আমাদের দেশে। আমাদের ইংরেজি আর আরবি মাধ্যমের ছেলেমেয়েরা দেশের ইতিহাস কতোটুকু কীভাবে জানে, আমি জানি না। বাংলা মাধ্যমে আমি লেখাপড়া করে এসেছি, শুধু পাঠ্যবই দিয়ে ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ জাগানো আমার মতো বইপড়ুয়ার জন্যেও ছিলো না। এটা কি কেবল গ্রন্থরচয়িতাদের অবহেলায় হয়েছে, নাকি পরিকল্পিত ছকেই?
ইতিহাস জানতে হয় নিজেকে চিনে নেওয়ার জন্যে। আজ থেকে শয়ে শয়ে বছর আগে কোন রাজার পর কোন নবাব গদি দখল করেছিলো, সেই সাল আর নাম মুখস্থ করার চেয়েও বেশি জরুরি, আমাদের সমাজটা কীভাবে সেই রাজা-নবাবদের হাতে পড়ে নিজের চেহারা পাল্টেছে। কেন আলীবর্দি খাঁয়ের চেয়ে সিরাজউদ্দৌলার শাসন খারাপ ছিলো, ওয়ারেন হেস্টিংসের হাতে পড়ে সেটা আরো খারাপ কীভাবে হলো?
আমরা শৈশব-কৈশোরে, কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও, বর্তমানকে মানদণ্ড হিসেবে ধরে নিই। কিন্তু বর্তমান যে একটা দীর্ঘ প্রবাহের ফল, সেটা বুঝতে আমাদের অনেক সময় লেগে যায়। প্রবাহটাকে বুঝতে না পারলে জাতি হিসেবে আমাদের গন্তব্য কোথায়, সেটাও ধরতে আমাদের বেগ পেতে হয়। এই ধরতে পারাটা কেবল নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির কাজ নয়, এটা সামষ্টিকভাবে ধরতে শিখতে হবে, কারণ আমাদের গন্তব্যও কমবেশি সামষ্টিক।
আজ আমরা বুড়িগঙ্গার দূষণ দেখে নাক কোঁচকাই, কিন্তু যে কিশোরটি বুড়িগঙ্গার অদূষিত চেহারা দেখেনি, তাকে কীভাবে এই দূষণের খারাপ দিকগুলো বোঝাবো আমরা? বোঝাতে গেলে আমাদের ইতিহাস শিক্ষায় ফিরে যেতে হবে। শিক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ শাখাটিকে আমরা এমন তথ্যকণ্টকিত করে রেখেছি, যে ইতিহাস শেখানো মানে যে গল্প বলা, সেটাও আমরা বিস্মৃত হয়েছি।
ইতিহাস মানে অসংখ্য রোমাঞ্চকর গল্পেরও সমষ্টি। আমাদের কিশোর-কিশোরীদের কথা চিন্তা করে নতুন ঢঙে ইতিহাস পড়ানো শুরু হোক। তথ্যের কাঁটায় তাদের ঝাঁঝরা না করে, কৌতূহলের চাবিটা তাদের হাতে ধরিয়ে দিন। ক্লাস শেষে ইতিহাসের গল্প নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের লেখা নাটক মঞ্চায়িত হোক, ছাত্রছাত্রীরা নিজেরা বই ঘেঁটে নিজেদের পছন্দসই ঐতিহাসিক চরিত্রের ওপর প্রবন্ধ লিখতে শিখুক, ইতিহাসের পরিণতি কীভাবে ভিন্ন হতে পারতো, তা নিয়ে বিতর্ক হোক।
মিসেস ত্রিবেদী বেঁচে আছেন কি না জানি না। যদি তিনি বেঁচে থাকেন, আর এই লেখা তাঁর কাছে কোনোভাবে পৌঁছায়, তাহলে তাঁকে বলতে চাই, আমি নিশ্চিত, তিনি তাঁর নাতি-নাতনিদের ছুটির দুপুরে অনেক আদর করে পুরাণ আর ইতিহাসের নানা গল্প শোনান, তাদের গায়ে মারের দাগও নেই। আপনার বেতের বাড়ি আমার কোনো উপকারে আসেনি ম্যাডাম। এখন রজার ক্রাউলির লেখা ইতিহাসের ওপর চমৎকার একটা বই "সিটি অব ফরচুনস" পড়ছি, আর চিন্তা করছি, আপনার মতো আরো কতো শিক্ষক-শিক্ষিকা কতো ছেলেমেয়েকে ইতিহাস থেকে বেতিয়ে বিমুখ করেছেন। আপনি যে বইয়ের পাতা মুখস্থ করাতেন, সে বইয়ের লেখকদের সঙ্গে নিয়ে আপনার মতো মানুষগুলো অবসর নিয়ে শিক্ষাঙ্গন থেকে দূর হয়ে যাক। ভালো থাকবেন।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।