Wednesday, June 25, 2014

হার্ডওয়্যার আর সফটওয়্যার

নীড় সন্ধানীর সাম্প্রতিক পোস্টে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিয়ে দুর্ভোগের পেছনে নগরবাসীর আচরণ যে একটা সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, সে কথা উঠে এসেছে। এই পোস্টটা পড়ার আগে পৃথ্বী শামসের অনুবাদে নোম চমস্কির একটি সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম। আমার এই পোস্টে লেখা ভাবনা উসকে দিয়েছে মূলত এই দুটি পোস্টের আধেয়।
আসল প্যাচাল পাড়ার আগে চমস্কি কী বলছেন একটু পড়ি।
আমাদের মনে রাখা উচিত যে সমাজ বিশ্লেষণ এমন কোন কর্ম না যা বিশেষজ্ঞদের হাতে ন্যস্ত রেখে আমাদের নিশ্চিন্ত থাকতে হবে। বুদ্ধিজীবিরা আমাদের এটাই বিশ্বাস করাতে চায় যে তারা এমন এক কর্মে প্রবৃত্ত যা জনসাধারণের কাছে দুর্বোধ্য। কিন্তু সামাজিক বিজ্ঞান এবং সমসাময়িক ঘটনাবলি অধ্যায়ন আসলে মোটেই জটিল কিছু না, কারো এসব বিষয়ে আগ্রহ থাকলে সে নিজেই এগুলোতে সিদ্ধহস্ত হতে পারে। এসব বিষয়কে অযাচিতভাবে “জটিল” হিসেবে উপস্থাপন করে বুদ্ধিজীবিরা আসলে জনসাধারণকে ননির পুতুল বানিয়ে রাখতে চায় যাতে সাধারণ মানুষ এসব মধ্যস্থতাকারীদের সহায়তা ব্যতিরেকে সমাজকে উপলদ্ধি করতে নিজেদেরকে অক্ষম মনে করে। একারণে সমাজবিশ্লেষণকে বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমের সাথে তুলনা করার ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে, কারণ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আসলেই কোন কিছু বিশ্লেষণের পূর্বে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে একটি সুবিশেষ বৌদ্ধিক কাঠামো আয়ত্ত করতে হয়।
এই বাক্যগুলোতে যদি সমাজ বিশ্লেষণের জায়গায় নাগরিক জীবনের সমস্যা সমাধানের কথা বসাই, তাহলেও কি তা গ্রহণযোগ্য থাকবে? চট্টগ্রামের মতো পাহাড়ি শহর যে বর্ষার জলে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে, সে সমস্যার সমাধান কি ক্ষমতাবান কতিপয়তন্ত্রের মর্জিমাফিক আসবে, নাকি নাগরিকের এতে অংশগ্রহণের সুযোগ আছে? সমস্যাগুলো কি এতোই দুর্বোধ্য যে আমাদের নিজেদের সক্রিয় অংশগ্রহণে তার সমাধান সম্ভব নয়?
আরেকটু ভাবতে গিয়ে মনে হলো, আমাদের সামাজিক সমস্যাগুলোকে আমরা নাগরিকের সামষ্টিক অংশগ্রহণের সুযোগ নেই, এমন "হার্ডওয়্যার" দিয়ে সমাধানের ব্যাপারে খুব বেশি উৎসুক (যদিও এসব হার্ডওয়্যার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নাগরিকের সামষ্টিক ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়)। সে তুলনায় নাগরিকের অংশগ্রহণসাপেক্ষ "সফটওয়্যার" দিয়ে সমাধানের ব্যাপারে আমাদের সামষ্টিক আগ্রহ কম। এখানে হার্ডওয়্যার বলতে বোঝাচ্ছি অবকাঠামো বা বস্তুকেন্দ্রিক আয়োজন, আর সফটওয়্যার বলতে বোঝাচ্ছি আচরণ বা বিধি।
প্রসঙ্গ পাল্টাই। বনানীতে পথচারীরা রাস্তা পার হবেন, সেজন্যে বিপুল টাকা খরচ করে ফুটওভার ব্রিজে বিদ্যুৎচালিত সিঁড়ি বসানো হয়েছে। কিন্তু পথচারীরা আগের মতোই নির্বিকার চিত্তে রাস্তার ওপর দিয়েই পার হচ্ছেন, ফুটওভার ব্রিজ ছুঁয়েও দেখছেন না। দুর্ঘটনা এড়াতে আর যানজট কমাতে ঢাকা নগর কর্তৃপক্ষ এখানে বিপুল ব্যয় করে "হার্ডওয়্যার" দিয়ে একটি সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছেন। কিন্তু সেই হার্ডওয়্যারের সাথে মানানসই সফটওয়্যার নাগরিকের মাঝে অনুপস্থিত। মনে করুন আপনার ফোনে ক্যামেরা আছে, কিন্তু ছবি তোলার জন্যে কোনো প্রোগ্রাম নেই। তখন সেই ক্যামেরা বাহুল্য ছাড়া আর কিছু নয়। তখন হয় আপনাকে ছবি তোলার প্রোগ্রামসহ ফোন কিনতে হবে, নয়তো ক্যামেরায় ছবি তোলার লাগসই প্রোগ্রাম গুঁজে দিতে হবে। আমরা চাইলেই আমাদের নাগরিকসমষ্টিকে বদলে পৌরকাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন ভিন্ন নাগরিকসমষ্টি আমদানি করতে পারবো না। কাজেই নাগরিকের মধ্যে নগরজীবনের প্রাত্যহিক হার্ডওয়্যারগুলোর সাথে মানানসই "সফটওয়্যার" ইনস্টল করতে হবে।
এই কাজটা মূলত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের। আর ঐ সফটওয়্যারকে আমরা মোটাদাগে "শিক্ষা" বলে ডাকি।
এই উপলব্ধি খুব কঠিন কিছু নয় যে আমাদের সাম্প্রতিক জীবন আর আমাদের পাঠ্যক্রমের শিক্ষার মধ্যে বড়সড় দূরত্ব আছে। আমরা স্কুলকলেজে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও গণিত, ভাষা ও ইতিহাস, ভূগোল ও ধর্ম, হিসাব-কৃষি-গার্হস্থ্য বিষয়াদি নিয়ে কিছু পল্লবগ্রাহী কাজকর্ম করি, তারপর শিক্ষার জোর পরিমাপ করি কিছু প্রান্তিক পরীক্ষার ফল দিয়ে। সকল বিষয়ে এ প্লাস পাওয়া কোনো ছাত্র যদি ফুটপাথের ওপর থুথু ফেলে, কিংবা কোনো দেয়ালের সামনে জিপার খুলে পিশু করা শুরু করে, তখনই কেবল বোঝা যায়, আমাদের সফটওয়্যার আপডেট করা প্রয়োজন।
অন্যের বাড়ির দরজার সামনে ইঁট-বালু-রড স্তুপ করে নিজের বাড়ি বানানো, গলির মুখে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা, গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে ছাদে প্যাণ্ডেল টাঙিয়ে রাত তিনটা পর্যন্ত বীভৎস শোরগোল করা, রমজানে গায়ে পড়ে সেহরির সময় অচেনা লোককে বিনা অনুমতিতে ডেকে তোলা, এরকম আরো বহু প্রত্যক্ষ ভোগান্তির অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আমরা এখনও নগর ও অপর নাগরিকের সাথে সম্পূর্ণ "কম্প্যাটিবল" নই। একটা গোল গর্তে একটা চৌকোণা জিনিস গায়ের জোরে ঢোকানোই আমাদের প্রতিদিনের নাগরিক অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মাঝের ফাঁকগুলো আমরা "হার্ডওয়্যার" দিয়ে পূরণ করার চেষ্টা করছি, যেটা দেখিয়ে আমরা একে অন্যকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চাই। এই অযথা হার্ডওয়্যারের পেছনে যে টাকাগুলো নাগরিকের পকেট থেকেই বের হয়, সেগুলো ঘুরে ফিরে গদিঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের পকেটে ঢোকে, তাই হার্ডওয়্যারের অপ্রয়োজনীয়তা নিয়েও খুব বেশি কথা ওঠে না।
প্রান্তিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে কিছুদিন আগে যে শোরগোল হয়ে গেলো, সেখানে মুহম্মদ জাফর ইকবাল আর ড. আনোয়ার হোসেন ছাড়া কাউকে উচ্চগ্রামে কিছু বলতে দেখিনি। ষোলো কোটি মানুষের দেশে আমরা পনেরো কোটি নিরানব্বই লক্ষ নিরানব্বই হাজার নয়শো আটানব্বই জন মানুষ চুপ করে ছিলাম এই ভেবে, যে আমাদের সমস্যা নিয়ে কেবল এই দুটি লোক কথা বলবেন। এই দুজন মানুষই আমাদের গোল গর্তে ঢোকানো চারকোণা জিনিসটার চারপাশের ফাঁক বোঁজানোর জন্য চুনমশলা। এ থেকে বোঝা যায়, আমাদের হাতে যদি সফটওয়্যার থেকেও থাকে, সে সফটওয়্যার আমরা চালাচ্ছি না, অপর ব্যক্তি এসে আমাদের সমস্যার সমাধান করে দেবেন, সেই দুরাশায়। ঠিক যেমন করে আত্মীয়ের অসুখের সময় আমরা রক্ত খুঁজি, কিন্তু নিজেরা রক্ত দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসি না।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা যেমন শুধু গভীর নালা আর খাল খননের হার্ডওয়্যার দিয়ে সমাধান করা যাবে না, তেমনি বনানী মোড়েও বিদ্যুৎচালিত সিঁড়ির হার্ডওয়্যার দিয়ে পথচারী পারাপারের সমস্যা সমাধান করা যাবে না। কোটি টাকার নালা বোঁজানোর জন্য আড়াই টাকার চিপসের প্যাকেটই যথেষ্ট। হার্ডওয়্যারের সাথে আমাদের মানানসই "সফটওয়্যার" লাগবে। এই সফটওয়্যার হতে পারে নাগরিক আচরণবিধি, হতে পারে স্কুলে স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের জন্যে পৃথক "নাগরিক সচেতনতা" ক্লাসের শিক্ষা ও বাড়ির কাজ, হতে পারে উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম, কিন্তু তা কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে এসে করতে হবে। প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষের আওতাধীন সকল প্রতিষ্ঠানকে নিজ উদ্যোগে এ ধরনের "সফটওয়্যার আপডেট"-এর ব্যবস্থা করতে হবে। নাগরিক সমস্যা সমাধানের জন্যে স্কুলপড়ুয়াদের মধ্যেই চিন্তা ও কর্মে চর্চা চালু করতে হবে দ্রুততম সময়ে, যাতে তাদের প্রজন্ম আমাদের প্রজন্মের চেয়ে এগিয়ে থাকে। কেবল ইঁট-বালু-সুড়কি-রড-সিমেন্ট-ঠিকাদারি দিয়ে সমস্যার সমাধানে নাগরিককে বিচ্ছিন্ন রেখে নয়, নাগরিকের আচরণ দিয়ে নাগরিকের অংশগ্রহণে নাগরিক জীবনের সমস্যার সমাধান করা শিখতে আর শেখাতে হবে। এ ব্যাপারে যারা সামাজিক চাপ প্রয়োগ করার সামর্থ্য রাখেন, তারা মুখ খুলুন, অনেক বিলম্ব ঘটার আগেই।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।