Wednesday, March 05, 2014

সমর্থক

রুস্তম স্টেডিয়ামে বাঘ সেজে বাংলাদেশের খেলা দেখতে যায়।
কাজটা সহজ নয়। রুস্তমকে নিজের জামা খুলে সারা গায়ে প্রথমে হলুদ রং মেখে নিতে হয়। এর ওপর আঁকতে হয় কালো ডোরা। একটা কাপড়ের ডোরাকাটা লেজও সে বানিয়ে নিয়েছে, যেটা হাফপ্যান্টের সাথে সে গিঁট দিয়ে রাখে। রং মেখে বাঘ সাজার পর সে এর ওপর আবার জামা পরে স্টেডিয়ামের দিকে রওনা দেয়। কখনো বাসে, কখনো অটোরিকশায়, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পায়ে হেঁটে। বসন্তে আয়োজিত ম্যাচগুলোতে তার তেমন সমস্যা হয় না। তখন বাতাস থাকে শান্ত, ঈষদুষ্ণ। রুস্তম লেজটা পকেটে গুটিয়ে রেখে নাচতে নাচতে স্টেডিয়ামে ঢুকে পড়ে, আর ঢুকে পড়ে নাচতে থাকে।
স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ মানেই হরেক কোণে ওঁত পেতে বসে থাকা ক্যামেরা। তারা রুস্তমকে আজকাল খুঁজে খুঁজে বার করে দুই ওভারের ফাঁকে। ফিল্ডাররা যখন বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের বদলে ডানহাতি ব্যাটসম্যানের জন্যে ফিল্ডিং সজ্জা পাল্টানোর জন্যে অলস পায়ে ছুটতে থাকে, কোনো এক ক্যামেরা রুস্তমকে পাকড়াও করে কোটি কোটি মানুষের কাছে দেখায়। রুস্তম স্টেডিয়ামে ঢুকলে অন্য কোনো অচেনা দর্শক ঠিকই একটা ঢোল বাজাতে বাজাতে এসে তার পাশে এসে নাচতে থাকে, কিংবা পতাকা তুলে নাড়তে থাকে কেউ। রুস্তম বুক ফুলিয়ে লেজ দুলিয়ে বিকট লাফঝাঁপ দিয়ে অঙ্গভঙ্গি করে তাদের তালে তালে। বাঘ সাজলে কখনো একা হতে হয় না রুস্তমকে।
ধারাভাষ্যকারেরা মাঝে মাঝে রসিকতা করে রুস্তমকে নিয়ে। বিদঘুটে টানে ইংরেজিতে চিবিয়ে চিবিয়ে হর্ষ ভোগলে জিজ্ঞাসা করে আতাহার আলী খানকে, এই লোকটা খেলার পরে গা থেকে রং তোলে কীভাবে?
আতাহার আলী খান বিরস গলায় বলেন, পানি দিয়ে।
দিবারাত্রির ম্যাচ শেষে স্টেডিয়ামে অনেক আবছায়া নেমে আসে, অনেকের মুখের অন্ধকার যোগ হয়ে তাতে, সেই আবডালে ক্যামেরা সবসময় রুস্তমকে খুঁজে বের করতে পারে না। কিন্তু ক্যামেরার নাগালের বাইরে দাঁড়িয়ে প্রায়ই তার গালে দু'টি বাড়তি উলম্ব ডোরা যোগ হয়। আসর ভেঙে যাওয়ার পর রুস্তম ভাঙা বুক নিয়ে গুটি গুটি পায়ে স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে বাস খোঁজে, অটোরিকশা খোঁজে, চুপচাপ লেজ গুটিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরে যায়। কোনো ক্যামেরা তাকে তখন আর অনুসরণ করে না। রুস্তমকে পাশ কাটিয়ে স্টেডিয়ামের বাইরের অনুজ্জ্বল শহরে আরো অনেকে নানা সুরে নানা স্বরে নানা কথা বলতে বলতে বাড়ি ফেরে। সেই ভিড়ে ভাঙা বাঘ হয়ে রুস্তমের শুধু মনে হয়, রঙের দাগটা যেন খুব বেশি চড়চড় করছে, কাপড়ের লেজটা যেন অনেক বেশি বেখাপ্পা।
বাড়ি ফিরে রুস্তম চুপচাপ বালতি থেকে মগে পানি তুলে বাঘস্নান করে। চুপচাপ ঠাণ্ডা ভাত খেয়ে নেয় ঠাণ্ডা তরকারি দিয়ে। তারপরে সে ভ্রুণের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমায়। স্বপ্নে সে একটা হলুদ-কালো ডোরাকাটা ঘুড়ি হয়ে ক্রিকেটের মাঠে ঘুরপাক খায়, দেখে নিচের সবুজ থেকে তামিম, সাকিব, মুশফিক, জিয়ার হাতে ধরা ব্যাট থেকে শিমুলের পেঁজা তুলোর মতো তার দিকে আলগোছে উড়ে আসছে সাদা বলের স্রোত, তারপর আবার ফিরে যাচ্ছে মাটিতে, সীমানার বাইরে।
ছক্কা! রুস্তম ঘুমের ঘোরেই হাত পা ছুঁড়ে চেঁচায়। পরদিন সে আবার ফিরে যায় নিজের কাজে।
কিন্তু মাঝে মাঝে বিশেষ এক খেলায় স্টেডিয়ামে গিয়ে রুস্তম দেখে, সে একা বাঘ নয়। স্টেডিয়ামের প্রবেশদ্বারের সারিতে তার মতো আরো অনেক বাঘ এসে দাঁড়িয়ে আছে। তবে তারা কেউ রুস্তমের মতো হতে পারেনি। তারা এখনও ফুলপ্যান্ট পরে থাকে, সানগ্লাস পরে থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, তাদের কোনো লেজ নেই। রুস্তম মনে মনে হাসে। বাঘ হওয়া এতো সোজা নাকি? হেহ। মুখ থেকে পেট পর্যন্ত রং করলেই যদি বাঘ হওয়া যেতো ... হাহাহা।
স্টেডিয়ামের ভেতরে যাওয়ার পর সেসব পার্থক্যও ঘুচে যায়। আন্তর্জাতিক মানের ক্যামেরাগুলো তাদের স্বচ্ছ আর নিরপেক্ষ লেন্স বাগিয়ে স্টেডিয়ামের সব বাঘকে ধরতে গিয়ে ট্রাইপডের বিয়ারিং ক্ষয় করে ফেলে। ডানে বাঘ, বামে বাঘ। কেউ লাফাচ্ছে, কেউ নাচছে, কেউ বসে বসে মোবাইলে কথা বলছে। অনেক বাঘের ভিড়ে তারা রুস্তমকে খোঁজে। রুস্তম হচ্ছে সেই বাঘ যে কখনো খেলা কামাই করে না। যেখানেই বাংলাদেশ, সেখানেই রুস্তম।
রুস্তম এক কোণে দাঁড়িয়ে নিষ্ঠাভরে চেঁচায় আর নাচে। সে জানে, রুস্তম-বাঘ না নাচলে রান উঠবে না বাংলাদেশের, না চেঁচালে উইকেটও পড়বে না বিশেষ খেলার অন্য দলটার। বৃষ্টি নামুক, বাজ পড়ুক, শিল পড়ুক বা শিশির পড়ুক, তাকে নাচতেই হবে।
রুস্তম নাচতে নাচতেই দেখে, স্টেডিয়ামে সবাই বাঘ সেজে আসে না। কেউ কেউ আসে শূকর সেজে। তাদের গালে সবুজ জমিনে সাদা চাঁদ-তারা আঁকা। অন্য দলটা মাশরাফির বলে চার হাঁকালে তারা আনন্দে ঝলমল করে ওঠে, অন্য দলটা স্পিনের মোচড়ে মুশফিককে আউট করে দিলে তারা শীৎকার করতে থাকে, অন্য দলের খেলোয়াড়রা যখন পানীয় বিরতির সময় ইতস্তত দাঁড়িয়ে থাকে, তখন তাদের নাম ধরে চিৎকার করে ডেকে ওঠে।
রুস্তম তখন ঢোলে জোরে বাড়ি দিতে বলে হুঙ্কার দিয়ে ওঠে। নিজের হুঙ্কারে সে এই শূকরদের ঘোঁৎঘোঁৎ চাপা দিতে চায়। শূকরেরা আড়চোখে তাকে দেখে চুপচাপ বসে যায় আবার।
বাংলাদেশ খেলার মাঠে হেরে যায় তবুও। রুস্তম ক্যামেরার গ্রহণবলয়ে দাঁড়িয়ে বুক উজাড় করে কাঁদে, তার গালে আবারও বাড়তি ডোরা যোগ হয়। শূকরের দল উৎফুল্ল মুখে মোবাইলে কথা বলতে বলতে স্টেডিয়াম ছাড়ে।
রুস্তম ভাঙা মন নিয়ে বেরিয়ে আসে স্টেডিয়াম ছেড়ে আবার। রাতে বাড়ি ফিরে সে নিদ্রার ঘোরে স্বপ্নে দেখে, বিশাল এক বাঘা ঘুড়ি হয়ে সে ভাসছে স্টেডিয়ামের আকাশে, তার চারপাশে বেলুন হয়ে ঘুরছে কতোগুলো হাসিমুখ দেঁতো চাঁদ-তারা শূকর। রুস্তম ছুটে ছুটে তাদের মুখে চুনকালি মাখাচ্ছে, আর নিচ থেকে একের পর এক সাদা বল এসে শূকরবেলুনগুলোর মুখ চূর্ণ করে দিচ্ছে।
রুস্তম ঘুমের ঘোরে হো হো করে হাসে আর পাক খায়।
শূকর জিতে গেলেও শূকরই রয়ে যায়। আর বাঘ হেরে গেলেও থেকে যায় বাঘ। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রুস্তম আবার কাজে বেরিয়ে যায়। শহরের মানুষ আর শূকর অবাক হয়ে দেখে, একটি গর্বিত বাঘ লেজ দুলিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ফুটপাথ ধরে, আর তার মাথার ওপর শনশন করে ছুটে যাচ্ছে একটা হলুদ-কালো ডোরাকাটা ঘুড়ি।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।