Sunday, February 16, 2014

টয় পাইলট

১.
তুহিন অনেকক্ষণ ধরে চোখ কুঁচকে আকাশ দেখে, তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মোটা লোকটাকে বলে, "বাবা, প্লেনটা তো আর দেখতে পাচ্ছি না। কোথায় গেলো?"
তুহিনের বাবা আড়চোখে ছেলেকে পরখ করে নিয়ে বলেন, "এই তো বাবা, প্লেনটা এখন অনেএএএএক ওপর দিয়ে উড়ছে। তাই তুমি দেখতে পাচ্ছো না।"
তুহিন গোমড়া মুখে আবার আকাশের দিকে তাকায়। বাবার সঙ্গে হাতিরঝিলে টয় প্লেন চালাতে আসাই ভুল হয়েছে তার, মনে মনে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় সে। বাবা সবসময় রিমোট কন্ট্রোলটা দখল করে বসে থাকে। আধঘণ্টা টয় প্লেন চালালে তার মাঝে পঁচিশ মিনিটই বাবা নিজে চালায়, তুহিনের ভাগ্যে হয়তো পাঁচ মিনিট জোটে। এরপর মায়ের সাথে আসতে হবে, মনে মনে সিদ্ধান্ত পাকা করে ফেলে সে।
তুহিনের বাবা উদ্বেগ গোপন করে রিমোট কন্ট্রোল নাড়াচাড়া করতে থাকেন। প্লেনটা সম্ভবত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। কিন্তু এ কথা তুহিনকে বললে সে কেঁদেকেটে একটা কাণ্ড না ঘটিয়ে ছাড়বে না। ছেলেটা এক বছর ধরে ঘ্যানর ঘ্যানর বায়না করার পর অবশেষে গত বছর সিঙ্গাপুরের মোস্তফা মল থেকে তুহিনের জন্যে টয় প্লেন কিনে এনেছেন তিনি। এরপর দেশে শুরু হলো মারপিট খুনাখুনি। বার পাঁচেক টয় প্লেন চালাতে এসেছে তুহিন। বাচ্চা ছেলে, প্লেন চালাতে গিয়ে হারিয়ে ফেলবে, এ কারণে বেশির ভাগ সময় তিনি নিজেই টয় প্লেনের পাইলটের ভার নিজের কাঁধে নিয়েছেন। আজ তুহিনের স্কুল ছুটি, সে গতকাল রাতেই ঘোষণা দিয়েছে আজ দুপুরভর সে হাতিরঝিলে টয় প্লেন চালাবে। এখন যদি এটা খোয়া যায়, ছেলেটা আবার মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করবে।
তুহিন আরো কিছুক্ষণ উসখুস করে বলে, "বাবা, প্লেনটাকে নিচে নামিয়ে আনো।"
তুহিনের বাবা ঢোঁক গিলে আবার চেষ্টা করতে থাকেন, রিমোট কন্ট্রোলের সব কয়টা বাটনই তার কাছে অচেনা মনে হতে থাকে। টয় প্লেন চালানো এতো কঠিন কেন?
এই প্রথম বিমানচালকদের ওপর একটা ক্ষীণ শ্রদ্ধা জন্মায় তার। কাজটা বেশ কঠিন, উপলব্ধি করেন তিনি। দেশী পাইলটদের বরাবরই তাচ্ছিল্য করে এসেছেন তিনি। কোনো পাইলট কখনো আশেপাশে ভাব নিতে এলে সবসময় দুটো কড়া কড়া বাঁকা কথা শুনিয়ে দিয়েছেন। একবার এক পাইলট এক বিয়ের অনুষ্ঠানে এসে খুব গম্ভীর মুখে বাকতাল্লা মারছিলো, কীভাবে ব্যাংকক থেকে ফেরার পথে হঠাৎ মুখোমুখি আরেকটা বিমান এসে পড়ে, কীভাবে তাৎক্ষণিক তৎপরতায় তিনি বিমানের মান আর জান রক্ষা করেন, কিন্তু কীভাবে কিসমতের ফেরে ধানক্ষেতে অবতরণে বাধ্য হন। বোরহানির গ্লাসে সুড়ুৎ করে এক চুমুক দিয়ে তিনি তারপর সেই পাইলটকে চিবি দিয়ে ধরেন। দীর্ঘ তিরিশ বছর ধরে তিনি বিতর্ক করে আসছেন, আর ঐ পাইলট তো ঠিকমতো কথাই বলতে পারে না। ফলে দাওয়াতে উপস্থিত সবাই মেনে নিলো যে এই পাইলট কোনো কাজেরই না, এই দেশে ভালো পাইলট পাওয়া যায় না, পাইলটের মতো পাইলট পাওয়া যায় কেবল সিঙ্গাপুরের মোস্তফা এয়ারলাইন্সে। তিনি তরুণ বয়সে আন্তর্জাতিক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে উত্তর কোরিয়ায় গিয়েছিলেন, তখন দেখেছিলেন, মোস্তফা এয়ারলাইন্সের পাইলটগুলো কী নিপুণ, কী দুর্ধর্ষ। বিমান চালু করার আগে তারা ভারি গলায় কী সুন্দর করে একটা ছোট্ট বক্তৃতা দেয়, বিমান অবতরণের পর সবাই কেমন আনন্দে আত্মহারা হয়ে সে পাইলটকে হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানায়, স্বল্প-কিন্তু-ভদ্রবসনা বিমানবালারা কেমন একটু পর পর আকুল হয়ে পাইলটের কেবিনে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা আটকে দেয়। সিঙ্গাপুরের মোস্তফা এয়ারলাইন্স অতুলনীয়।
পাইলটটা মুখ চুন করে বোরহানি না খেয়েই দাওয়াত থেকে কেটে পড়েছিলো। অচেনা লোকজন উদ্ভাসিত মুখে এসে তার দস্ত মর্দন করে বলেছিলো, আবদুন সাহেব, আপনার ফেসবুক ফলো করি। যা দিলেন ভাই, হেঁহেঁহেঁ ...।
তুহিনের চিৎকার শুনে সম্বিত ফিরে পান তিনি। "বাবা, প্লেনটা নিচে নামিয়ে আনো! এবার আমি চালাবো, আমি আমি আমি!"
রিমোট কন্ট্রোলের বোতামগুলো টিপতে টিপতে ছেলেকে সস্নেহ বকুনি দেন তিনি। "আহ তুহিন, কতোবার বলেছি, শুধু আমি আমিকরবে না। বাবাকে এখন একটু কনসেনট্রেট করতে দাও। প্লেন চালানো কঠিন কাজ বাবা।"
তুহিন কাঁদো কাঁদো মুখে বাবার মুখে দিকে তাকায়। তার মনে হয়, বাবা তাকে ধোঁকা দিচ্ছে। টয় প্লেন চালানো খুব কঠিন কাজ হলে বাবা কীভাবে চালায়?
তুহিনের বাবা আবারো আড়চোখে ছেলেকে দেখে নিয়ে তাড়াতাড়ি রিমোট কন্ট্রোলে থাপ্পড় মারতে থাকেন। মেশিনে থাপ্পড় দিলে অনেক সময় কাজ হয়। তুহিনের চোখমুখ লালচে হয়ে গেছে, সে ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ফেলছে, যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ছেলেটা বড় হয়ে যাচ্ছে, আগের মতো তাকে কোলে করে শান্ত করা যায় না, এখন হাত পা ছুঁড়তে থাকলে দুই-তিনজন লোক লাগবে তাকে শান্ত করতে।
"কাম ডাউন বাবা। এই যে নামিয়ে আনছি, সবুর করো।" প্রাণপণে রিমোট কন্ট্রোলে চাপ দিতে থাকেন তিনি।
তুহিন চিৎকার করার আগেই হুট করে একটা উটকো লোক এসে উদয় হয় কোত্থেকে যেন। "স্যার, আসসালামু আলাইকুম! আপনি এখানে?"
তুহিনের বাবা স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলেন। সেলিব্রিটি হওয়ার এই একটা সুবিধা, খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ালে স্যার বলে ডাক দেওয়ার লোক পাওয়া যায়। রিমোট কন্ট্রোলটা তুহিনের হাতে সস্নেহে তুলে দিয়ে তিনি বলেন, "নাও, তুমিই নামিয়ে আনো।" তারপর হাসিমুখে উটকো লোকটার সালামের জবাব দিয়ে তিনি বলেন, "এই তো, ছেলেটাকে নিয়ে একটু টয় প্লেন চালাতে এলাম।"
লোকটা তুহিনের বাবার সঙ্গে কথা বলতে থাকে, তুহিন রিমোট কন্ট্রোল হাতে অসহায়ের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের টয় প্লেনটাকে খুঁজতে থাকে। বাবা ওটাকে কোথায় পাঠিয়ে দিলো?
২.
কেন্টাকির নিরালা পাহাড়ি এলাকায় ক্রিচ এয়ার ফোর্স বেইসে কমিউনিকেশন রুমের দরজা খুলে ভূতের মতো নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকলো কর্নেল কোলম্যান। কানে হেডফোন গুঁজে বসে থাকা যোগাযোগ অফিসার সার্জেন্ট মেহিউ অস্পষ্ট গুনগুন শব্দ করছিলো, কোলম্যানের হুঙ্কার শুনে চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়ালো সে।
"বেইস ফ্যালকনহেডকে ধরো। তারা কোথায়?"
সার্জেন্ট মেহিউ আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে বললো, "তিরিশ সেকেণ্ডের মধ্যে বেইস ফ্যালকনহেড অনলাইনে আসবে, স্যার।"
কর্নেল কোলম্যান অসন্তুষ্ট গলায় ঘোঁৎ করে ওঠে। ক্ষেপণাস্ত্রবাহী একটা ড্রোন বিধ্বস্ত হয়েছে কান্দাহারের কাছে, ওপরমহলে এ নিয়ে নড়াচড়া শুরু হয়েছে। কর্নেল কোলম্যান ডিরেক্টর অব অপারেশনসের দায়িত্ব নেওয়ার পর ক্রিচ বেইস থেকে দূরযোগাযোগের মাধ্যমে এ পর্যন্ত সফলভাবে অনেকগুলো ড্রোন অপারেশন চালানো হয়েছে আফগানিস্তানে, নিজেদের পক্ষে কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া। এই প্রথম তার সাদা পাতায় লালদাগ পড়লো।
যোগাযোগ স্ক্রিনে ধূসর ছোপছোপ ইউনিফর্ম পরা এক সেনা কর্মকর্তার চেহারা ভেসে উঠলো। মাথা কামানো, রোদে পোড়া চেহারা, অভিব্যক্তিহীন নির্বিকার চেহারা।
"মেজর হ্যামন্ড রিপোর্ট করছি বেইস ফ্যালকনহেড থেকে।"
কর্নেল কোলম্যান ভুরু কুঁচকে ক্যামেরার দিকে তাকালো। "নেস্ট থেকে অপস ডিরেক্টর কোলম্যান বলছি। কী ঘটেছে মেজর?"
মেজর হ্যামন্ড ভাবলেশহীন মুখে বললো, "বেইস থেকে পঞ্চান্ন মাইল রেডিয়াসে ডেরা সাক্কো গ্রামে সম্ভাব্য ইনসারজেন্সির রিপোর্ট পেয়ে আজ সকাল দশটা কুড়ি মিনিটে আমরা রেকি করতে একটা নিরস্ত্র ফ্যালকন ক্লাস ড্রোন পাঠাই, স্যার। বেইস থেকে উড়াল দেওয়ার তিরিশ সেকেণ্ড পর সেটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বেইসের কাছে একটা পাহাড়ে আছড়ে পড়ে। সার্জেন্ট গিলমোরের নেতৃত্বে একটা দল সেটাকে উদ্ধার করে আবার বেইসে ফিরিয়ে এনেছে, স্যার।"
কর্নেল কোলম্যান বলে, "নেস্টের ড্রোন অপারেটর মাজিনি বলছে সমস্যাটা ওখানকার, এখান থেকে নিয়ন্ত্রণ ঠিক ছিলো। এ ব্যাপারে তোমার কী মত, মেজর?"
মেজর হ্যামন্ড একঘেয়ে সুরে বলে, "সঠিক, কর্নেল। সার্জেন্ট গিলমোর দুর্ঘটনার স্পট থেকে আরেকটি বিধ্বস্ত ও নিরস্ত্র ড্রোন উদ্ধার করে এনেছে। এটি আমাদের বহরের ড্রোন নয়। ক্ষতির ধরন দেখে মনে হচ্ছে, বহিরাগত ড্রোনটি আমাদের ড্রোনের স্টারবোর্ড প্রান্তে এসে তার সম্মুখভাগ দিয়ে ধাক্কা মেরেছে। এর ফলে দুটি ড্রোনই ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আকাশে ভেসে থাকার ক্ষমতা হারিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে, স্যার।"
কর্নেল কোলম্যান সটান খাড়া হয়ে হুঙ্কার দিয়ে বলে, "মানে? আরেকটা ড্রোন কোত্থেকে এলো?"
মেজর হ্যামন্ড বললো, "এই বহিরাগত ড্রোনে আমরা কোনো ইনসিগনিয়া পাইনি, স্যার। এতে কোনো ধরনের অস্ত্র সংযোজনের ব্যবস্থাও নেই। এতে কোনো ধরনের রাডার কিংবা ক্যামেরাও নেই, নিয়ন্ত্রণের জন্য একটা দুর্বল একমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা আছে কেবল। আমার অভিমত, এটা খালি চোখে না দেখে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।"
কর্নেল কোলম্যান চোখ লাল করে বললো, "তার মানে তুমি বলতে চাও কোনো শত্রু আমাদের বেইসের কাছে বসে একটা ফালতু ড্রোন চালিয়ে আমাদের একটা মিলিয়ন ডলার দামের ড্রোনকে ঠুক্কি দিয়ে নিচে ফেলে দিয়েছে?"
মেজর হ্যামন্ড বললো, "সঠিক স্যার।"
কর্নেল কোলম্যান হুঙ্কার দিয়ে বললো, "বেইসের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে মেজর?"
মেজর হ্যামন্ড বললো, "আমরা ইতিমধ্যে বেইস ফ্ল্যামিঙ্গোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি স্যার। মেজর হ্যারিসের নেতৃত্বে একটি কোম্পানি আরো তিরিশ মিনিট পর এসে পৌঁছাবে। সন্ধ্যা থেকে আমরা আশেপাশের এলাকা পরিষ্কার করা শুরু করবো স্যার।"
কর্নেল কোলম্যান রাগে গরগর করতে করতে বললেন, "শত্রুপক্ষের ড্রোনটা ভালোমতো পরীক্ষা করা হয়েছে মেজর? এটা কাদের বানানো বলে তোমার ধারণা? চীন? ভারত? রাশিয়া?"
মেজর হ্যামন্ড বললো, "নিশ্চিতভাবেই চীন স্যার। এর ইলেকট্রনিক অংশগুলোতে পরিষ্কার চীনা হরফ ছাপানো আছে। ক্যাপ্টেন ও'ব্রায়েন ইতিমধ্যে নেস্টের অ্যানালিস্টদের কাছে সব ছবি পাঠিয়ে দিয়েছে, স্যার।"
রাগে কর্নেল কোলম্যানের মাথায় ছোটো ছোটো চুলগুলো দাঁড়িয়ে গেলো। চীনাদের এতো বড় সাহস, তারা আল কায়দার হাতে এখন ড্রোন তুলে দিচ্ছে?
মেজর হ্যামন্ড বললো, "বহিরাগত ড্রোনের একটি ডানায় কালো কালিতে রোমান হরফে একটি বার্তা লেখা আছে, স্যার।"
কর্নেল কোলম্যান বললেন, "ড্রোনের ডানায় বার্তা? কী বার্তা?"
মেজর হ্যামন্ড বললো, "EAST OR WEST, MOSTOFA IS THE BEST, স্যার।"
কর্নেল কোলম্যান হুঙ্কার দিয়ে বললেন, "আগামীকাল ইস্টার্ন সময় সকাল আটটার মধ্যে লিখিত রিপোর্ট চাই মেজর হ্যামন্ড। আর কিছু জানাতে চাও এখন?"
মেজর হ্যামন্ড নির্লিপ্ত মুখে বললো, "আর কিছু জানাবার নেই, স্যার।"
কর্নেল কোলম্যান বললো, "ওভার অ্যান্ড আউট।"
স্ক্রিন থেকে মেজর হ্যামন্ডের চেহারাটা মুছে গেলো। কমিউনিকেশন রুমে অস্থির হয়ে পায়চারি করতে লাগলো কর্নেল কোলম্যান। কে এই মোস্তফা? তার এতো বড় সাহস, মার্কিন ড্রোনঘাঁটির বগলে বসে সে আকাশ থেকে মার্কিন ড্রোন গুতা মেরে ফেলে দেয়? এ কি তবে নতুন ওসামা?
কর্নেল কোলম্যান কমিউনিকেশন রুম ছেড়ে বেরিয়ে নিজের অফিসের দিকে যেতে যেতে টের পায়, পরিস্থিতি আবারো জটিল হচ্ছে। মার্কিন জাতির স্বাধীনতা লুটেপুটে খেতে এবার মাঠে নেমেছে আকাশসন্ত্রাসী মোস্তফা। ওয়াশিংটন অবশ্য ব্যাপারটাকে লুফে নেবে, এমন সুযোগ বার বার আসে না। দেশ ও জাতির জন্যে একটা জবরদস্তু জুজুর বন্দোবস্ত আপনা থেকেই হয়ে গেলে মন্দ কী? ওদিকে বেচারা হ্যামন্ড আর হ্যারিসরা কবে বাড়ি ফিরতে পারবে, কে জানে?
৩.
তুহিন সজল চোখে রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম টেপে, ঝকঝকে নীল আকাশে তার টয় প্লেনের নিশানা দেখা যায় না। দুয়েকটা চিল কেবল উড়ছে হাতিরঝিলের আকাশে।
তুহিন হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুঝে রাগে গনগনে মুখে বাবার দিকে তাকায়। বাবা তখনও একটা অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছে। তুহিন বাবার কথা কিছুই বোঝে না। "... দ্যাখেন, গত বছর আমি অনেক হুজ্জতের মধ্যে পড়েছি। আমি জানতাম এমন সমস্যা হবে। তারপরও কিন্তু আমি গেছিলাম। যাই নাই? এই বছর যদি যাই, আরো বড় হুজ্জত হবে। সেই হুজ্জত কে সামলাবে? আমি না আপনি? যদি আমারেই সামলাতে হয়, তার খরচ তো আমাকে পেতে হবে, নাকি?"
লোকটা বিগলিত মুখে বলে, "স্যার এই ফেসবুকে কে কী বলে এগুলিকে পাত্তা দিয়েন না। সোজা ব্লক করে দিবেন স্যার।"
তুহিনের বাবা অসহিষ্ণু হয়ে নিচু গলায় বলেন, "কয়জনরে ব্লক করবো? এরা ফেসবুকের সব চিপাচাপায় বসে আছে। পান থেকে চুন খসলেই গালি খাইতে হয়। না ভাই, বাজারে মুরগির দাম বাড়ছে, সক্রেটিসের মুরগির দামও এখন বাড়তি। গত বছর যা দিছেন, এইবার তার দ্বিগুণ দিতে হবে। নাহইলে আমি নাই।"
লোকটা তারপরও হাসিমুখে চাপাচাপি করে, বলে, "স্যার এমন করা কি ঠিক? আমাদের বেকায়দায় পেয়ে হাদিয়া বাড়িয়ে দিচ্ছেন?"
তুহিনের বাবা এবার একটু ক্ষেপেই ওঠেন, আড়চোখে একবার তুহিনকে দেখে নিয়ে গলার স্বর নিচে নামিয়ে ধমকে বলেন, "আপনাদের আবার কী বেকায়দা? আপনাদের গায়ে তো ফুলের টোকাও পড়ে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গিয়ে গ্রামেগঞ্জে আপনাদের ব্যাঙ্কের নতুন শাখার ফিতা কাটে। বেকায়দায় তো পড়বো আমি বেচারা আবদুন। সবাই মিলে ফেসবুকে আমারে গালি দিয়ে পচায়ে গন্ধ ছুটাবে। গতবার বহু কষ্টে একে ওকে মুরুব্বি ধরে, সাক্ষী মেনে, সক্রেটিসের মুরগি তত্ত্ব দিয়ে ইজ্জত বাঁচাইলাম। এক মুরগি কয়বার কাটবো? এইবার আপনারা হাদিয়া ডাবল করে না দিলে এতো খাটনির মধ্যে আমি নাই!"
তুহিন শুনতে পায়, অচেনা লোকটা হাসতে হাসতে বলছে, "স্যার, খাটনি কোথায়? মঞ্চে উঠে কয়েকটা নাম পড়বেন, বাস এই তো?"
তুহিনের বাবা আঁতকে উঠে ফিসফিস করে গর্জে ওঠেন, "মঞ্চে উঠবো মানে? মঞ্চে ওঠার কোনো কারবার আপনাদের সঙ্গে আমার নাই। আমি জাগরণমঞ্চের লোক। আপনাদের মঞ্চে আমি কোনোদিন উঠবো না। বড়জোর মঞ্চের পিছন থেকে পর্দার আড়ালে বসে একটু কণ্ঠমধু দিতে পারি। যদি আগেরবারের ডাবল হাদিয়া দিতে রাজি থাকেন। নাহলে আমি নাই। রাজা রিচার্ডের তাঁবুতে সালাদিন প্রথমবার সস্তায় গিয়ে কোনোমতে পোষাতে পারে, কিন্তু দ্বিতীয়বার যদি সালাদিনরে রিচার্ডের তাঁবুতে ঢুকাইতে চান, হাদিয়া ডাবল করতেই হবে। সস্তার কারবারে সালাদিন আর নাই।"
অচেনা লোকটা কী যেন চিন্তা করে কিছুক্ষণ, তারপর বলে, "আচ্ছা স্যার, আমি ব্যাঙ্কের আমীর সাহেবকে বলে দেখি। এখন তাহলে আসি। আল্লাহ হাফেজ।"
তুহিনের বাবা বিড়বিড় করে কী যেন বলতে বলতে তুহিনের কাছে এগিয়ে আসেন আবার।
তুহিন বহু কষ্টে কান্না চেপে রেখে বলে, "প্লেন কই?"
তুহিনের বাবা চোখ পাকিয়ে তুহিনের দিকে তাকিয়ে বলেন, "এ কী? তুমি প্লেন নিচে নামাওনি কেন? প্লেন কোথায়?"
তুহিন চেঁচিয়ে বলে, "তুমি প্লেন উপরে উঠিয়েছো! এখন আমি আর নামাতে পারি না! আমাকে প্লেন এনে দাও!"
তুহিনের বাবা তুহিনের হাত থেকে রিমোট কন্ট্রোল কেড়ে নিয়ে কিছুক্ষণ বোতাম টিপে হতাশ গলায় বলেন, "যাহ! হারিয়ে গেলো! সিঙ্গাপুরের মোস্তফা মল থেকে তোমাকে একটা প্লেন কিনে এনে দিলাম, এভাবে দিনে দুপুরে হারিয়ে ফেললে?"
তুহিন ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে। তারপর মাটিতে গড়াগড়ি খায়।
তুহিনের বাবা বহু কষ্টে তুহিনকে জাপটে ধরে তুলে গাড়ির দিকে নিয়ে যান। তুহিন হাত পা ছুঁড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, "আমাকে আমার প্লেন এনে দাও! আমাকে আমার প্লেন এনে দাও!"
তুহিনের বাবা গাড়িতে তুহিনকে বসিয়ে সিট বেল্ট বেঁধে সাবধানে বাড়ির দিকের পথে গাড়ি ঘোরান।
তুহিন ফোঁপাতে ফোঁপাতে মোবাইল ফোন বের করে মাকে ফোন দিয়ে নালিশ করে, "আম্মু! বাবা আমার প্লেন হারিয়ে ফেলেছে! আমার প্লেন আকাশে উড়ছিলো, তারপর বাবা সেটাকে কই নিয়ে গেলো, এখন আর প্লেন নিচে নামছে না!" তুহিন ফোন ধরে কাঁদতে থাকে।
তুহিনের বাবা গলা চড়িয়ে বলেন, "ওর হাতে দশ মিনিটের জন্য রিমোট কন্ট্রোলটা দিলাম, বাস, প্লেন গায়েব। এই হারে খেলনা হারালে চলবে?"
তুহিন চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, "আমাকে প্লেন এনে দাও।"
তুহিনের বাবা তুহিনকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, "আচ্ছা, আরেকটা এনে দেবো। এই তো আগামী মাসেই একটা অনুষ্ঠান আছে। ওটা হলে বাবার হাতে টাকা আসবে, তখন বাবা সিঙ্গাপুর নিয়ে যাবে তোমাকে। এবার মোস্তফা মল থেকে আরো বড় একটা প্লেন কিনে আনবো আমরা, কেমন?"
তুহিন চোখ ডলতে ডলতে বললো, "তাহলে ঐটা আমি একা চালাবো। তুমি চালাতে পারবে না।"
তুহিনের বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, "আচ্ছা, ঠিকাছে। কিন্তু তুমি তো একা চালাতে গেলে প্লেন হারিয়ে ফেলো।"
তুহিন আবার চিৎকার করে বললো, "আমি প্লেন হারাইনি! তুমি প্লেন হারিয়েছো, তুমি তুমি তুমি!"
৪.
তুহিনের বাবা বাড়ি ফিরে ফিরে তুহিনের মায়ের ধমক খেলেন অনেকক্ষণ ধরে।
"এর আগে একটা স্পিডবোট কিনে আনলে তুহিনের জন্যে, সেটাও হারিয়ে গেলো। এবার প্লেন কিনে আনলে, সেটাও হারিয়ে গেলো। সমস্যা কী? এভাবে সব খোয়া যায় কেন?" তুহিনের মা ধমক শেষ করলেন এই জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দিয়ে।
তুহিনের বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "কী করবো তুহিনের মা? এই দেশটার আকাশেই সমস্যা। সিঙ্গাপুরের মোস্তফা পার্কের আকাশে যখন প্লেন ওড়ালাম, তখন কোনো সমস্যাই হয়নি। আসলে আমাদের গোটা দেশেই অসুখ। এর মূল অনেক গভীরে। এখন গালাগালি না করে চলো সুস্থভাবে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করি।"

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।