Saturday, January 04, 2014

সর্বোচ্চ দেশপ্রেম

ইস্কাটন থেকে পাক মোটর সামান্য পায়ে হাঁটা রাস্তা, তবুও আনিসুল হাইয়ের ভয় লাগে। যদি কিছু হয়?
জুন মাস নাগাদ এসে ছাত্রলীগের গুণ্ডাপাণ্ডারা সেনাবাহিনীর মার খেয়ে অবশ্য অনেকটাই ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, কদাচিৎ সীমান্তবর্তী এলাকায় কিছু দুমদাম ঠুশঠাশের উড়ো খবর কানে আসে কেবল। ঢাকায় দমবন্ধকরা পরিস্থিতি খুব মন্থর গতিতে আবার স্বাভাবিকের দিকে এগোচ্ছে।
পাক মোটরে আনিসুল হাইয়ের সামনে দিয়ে শোঁ-শোঁ করে চলে যায় জলপাই রঙের একটি সৈন্যবাহী ট্রাক। ভয়ে হাইয়ের হাত পা জমে আসে। যদি ট্রাকটা থামে? খাকি উর্দি পরা সেনারা নেমে এসে যদি তার দৈনিক কচুবনের ডাণ্ডি কার্ড দেখে সন্তুষ্ট না হয়? যদি ধরে নিয়ে যায় তাকে? বদি ভাইয়ের কাছ থেকে আনিসুল হাই শুনেছে, প্রায়ই নাকি রাস্তাঘাট থেকে যুবকদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।
তারা আর ফিরে আসে না।
ট্রাকটা এগিয়ে যায় ইন্টারকন্টিনেন্টালের দিকে, থামে না। আস্তিনে কপালের ঘাম মুছে আনিসুল হাই পা চালায়।
মেহফিলে মুনাওয়ারার ছায়া ঘেরা উঠানটা যতো কাছে আসে, হাইয়ের মনের চিমনিতে জমে থাকা দুর্ভাবনার কালিও আস্তে আস্তে মুছে যায়। কী যেন এক অদ্ভুত আকর্ষণ আছে এখানে, একটা প্রাণ জুড়িয়ে যাওয়া মধুর শীতলতা ছড়িয়ে আছে এর আমগাছের ছায়ায়, লাইব্রেরি ঘরের বারান্দায়, দরবার ঘরের সামনের উঠোনটায়। দেশজুড়ে আম্লীগের লোকেরা যে ভয়ানক অস্থিরতার আগুন ছড়িয়ে দিয়েছে, তার বিপরীতে এ যেন এক টুকরো স্নিগ্ধ মরূদ্যান। আনিসুল হাইয়ের মনে হয়, এই বুঝি একটি মরুর দুম্বা পানি পান করতে এসে দাঁড়াবে মেহফিলে মুনাওয়ারার উঠোনে।
এর কৃতিত্ব দিতে হবে আবদেল আবু সাঈদী হুজুরকেই। আনিসুল হাইয়ের মনে হয়, ভদ্রলোক জাদু জানেন। মাদ্রাসা শিক্ষক হয়েও দুনিয়ার হেন বিষয় নেই, যা নিয়ে তিনি কথা বলতে পারেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও তার সঙ্গে বাহাসে জড়াতে ভয় পায়, এই বুঝি জ্ঞানের পাতলা আস্তর খসে গিয়ে ভেতরের মূর্খতার ইঁটগুলো অট্টহাসি দিয়ে বেরিয়ে আসে! অতি পাষণ্ড নাস্তিকও তাঁর বয়ান শুনে ভক্ত আশেক বনে যেতে বাধ্য। আনিসুল হাই মেহফিলে মুনাওয়ারাতে প্রায়ই আসে আবদেল আবু সাঈদী হুজুরের বয়ান শুনতে। তার ভেতরের অস্থিরতার অপনোদনে আবু সাঈদী হুজুর কখনো ব্যর্থ হননি।
আবু সাঈদী লাইব্রেরি ঘরের বারান্দায় আরামকেদারায় শুয়ে একটি কিতাব পাঠ করছিলেন, আনিসুল হাইকে আসতে দেখে মিষ্টি তাবাসসুমে তার মুখ ভরে ওঠে। আনিসুল হাই ইস্কাটন থেকে পাক মোটরের বিপদজনক ঝুঁকিসঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে আসার ক্লেশ বিস্মৃত হয়, সে তসলিম জানিয়ে তৃপ্ত মুগ্ধ চিত্তে বলে, আসসালামু আলাইকুম হুজুর। কেমন আছেন?
আবদেল আবু সাঈদী মেহমান এলে খুশি হন, আরো খুশি হন যদি মেহমানের হাতে কিছুমিছু থাকে। তাই আনিসুল হাইয়ের শূন্য হাত দুটিতে তার স্নিগ্ধ দুটি চক্ষুর দৃষ্টিপাত ঈষৎ দীর্ঘায়িত হয়। কিন্তু আমীর-ফকির সবার প্রতি তিনি সমান উদার, তাই বলেন, ওয়ালাইকুম সালাম আ্নিসুল হাই। কেমন আছো তুমি?
হাই মোড়া টেনে আবু সাঈদী হুজুরের পায়ের কাছটায় বসে পড়ে ধপ করে। এই একটি মানুষের কাছে এসে সে হৃদয়ের কথা উজাড় করে বলতে পারে, তার সব গ্লানি এই মানুষটির ছায়ায় এসে দূর হয়।
"ভালো নেই হুজুর। দেশের এই রাজনৈতিক হানাহানি, ক্ষমতার জন্য এই কুৎসিত মারামারি, আমাকে বড় তকলিফ দেয় হুজুর।" হাই কথা শেষ করতে গিয়ে একটু ফুঁপিয়ে ওঠে।
আবু সাঈদী হুজুর রেডিও পাকিস্তানে একসময় নিয়মিত ইসলামী ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান করতেন, তিনি সুললিত কণ্ঠে সামান্য সুর করে বলেন, "ভালো থাকা, আর না থাকা, সবই তো নির্ভর করে তোমার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। তুমি কী মনে করো যুবক, আল্লাহ তোমাকে খারাপ রাখতে চান? কখনোই না। তিনি চান তুমি ভালো থাকো। কিন্তু তুমি যদি তোমার নজরকে ঠিক জায়গা থেকে ঠিক জায়গায় ফেলতে শেখো, তাহলেই দেখবে আর খারাপ লাগছে না। আমাকে বাতাও, কী নিয়ে তোমার এতো তকলিফ?"
আনিসুল হাই মন খুলে বলে যায় তার কষ্টের কথা। সিরাজউদ্দৌলার মামাকে নিয়ে তার লেখা কিতাব "মামা" মানুষের মাঝে সমাদৃত হওয়ার পর দৈনিক কচুবনের সম্পাদক বদি ভাই রহমান তাকে আরেকটি উপন্যাস লিখতে বলেছিলেন, কিন্তু তার কলম দিয়ে লেখা আসছে না। দেশের রাজনৈতিক হানাহানি বড় বেশি দাম নিয়ে নিচ্ছে। মাঝে মাঝে বদি ভাই রহমান তাকে জিজ্ঞাসা করেন, নতুন উপন্যাস কতোদূর এগোচ্ছে, সে কোনো সাড়া দিতে পারে না।
আবু সাঈদী হুজুর মন দিয়ে শোনেন, তারপর শুধান, "তোমার নতুন উপন্যাস কী নিয়ে লিখছো?"
আনিসুল হাই মাথা নিচু করে বলে, "তিতু মীরের বাঁশের কেল্লা নিয়ে হুজুর।"
তৃপ্তির হাসিতে আবদেল আবু সাঈদী হুজুরের মুখ আলোকিত হয়ে যায়। তিনি বলেন, "য়্যায় নওজোয়ান, তুমি সহী রাহে অগ্রসর হচ্ছো। উপন্যাস লিখতে গেলে নজর দিতে হবে চারপাশের ডামাডোল থেকে নিরাপদ দূরত্বে। আনেওয়ালা কাল কেমন হবে, আমরা জানি না, তা নিয়ে কল্পনা বিলাসিতায় ওয়াক্ত বরবাদ করার কোনো মানে হয় না। আমাদের নজরের একলওতি গন্তব্য তাই গুজরা হুয়া জামানা। হিন্দুর ভাষায় যাকে বলে অতীত, ভূত। ওখানে কী হয়েছে, কী হয়নি, সবই আমাদের জানা। সেই কী হয়েছের সঙ্গে একটুখানি কল্পনার কী হয়নি মিশিয়ে আমাদের কিতাব রচতে হবে। বর্তমান নিয়ে লিখতে গেলেই গণ্ডগোল। তাতে তোমার আপন সংসারের মানুষ তোমাকে পর করে দিতে পারে। তোমার দোস্ত হয়ে উঠতে পারে তোমার দুশমন। তোমার পড়োসান হয়ে উঠতে পারে জালিম। আর সমাজ হয়ে উঠতে পারে বৈরী। ইয়াহিয়া সাহেবের কথা বাদই দিলাম। কখনো সাম্প্রতিক সময় নিয়ে লিখবে না, তাতে মুশকিল বাড়ে। লিখবে এমন সময় নিয়ে, যে সময় নিয়ে লিখলে কোনো সমস্যা নাই। সিরাজউদ্দৌলা, তিতু মীর, শায়েস্তা খাঁ, এদের নিয়ে সাহিত্য লিখবে। সিরাজউদ্দৌলার মামাকে নিয়ে তুমি যে কাহানি রচেছো, তা পাঠ করে আমার দিল রওশন হয়েছে। আহা, কী চমৎকার বয়ান। আমার সাধ্য থাকলে তা ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করতাম। তোমাকে আরো অনেক লিখতে হবে। ফেরদৌসীর শাহনামা, মীর মশাররফের বিষাদ সিন্ধু, কায়কোবাদের মহররম শরীফের মতো অজরামর রচনা সৃষ্টি করতে হবে। লেখকের পুঁজি অতীত ও সমকালের মানুষের আখলাক। তা দিয়েই সে তার আপন ভূবন রচে। তাই লেখক একই সাথে খালেকও বটে। তুমি নিশ্চিন্ত মনে বাঁশের কেল্লা রচনা করো। এই হানাহানি গোলাগুলি মারামারি নিয়ে বেচেয়ন হয়ো না। এগুলো সাময়িক। জ্যৈষ্ঠের ভ্যাপসা গরমের পরই আষাঢ়ের বরসাত নামে, বাগিচায় বেলি চামেলি গুল খিলে। তুমি ডানে বামে না তাকিয়ে শায়েরিতে মন দাও।"
এক অপূর্ব আশায় আনিসুল হাইয়ের বুক ভরে ওঠে। কিন্তু তার মনের কোনো জমা হওয়া কালি পুরোটা দূর হয় না। সে আবু সাঈদী হুজুরের একটি পা নিজের কোলে তুলে নিয়ে নীরবে টিপতে থাকে।
কিন্তু তার মনের কোণে পুঞ্জ পুঞ্জ ক্ষোভ অশ্রু হয়ে এক ফোঁটা তপ্ততায় আবু সাঈদী হুজুরকে সচকিত করে তোলে। তিনি আরাম কেদারায় সোজা হয়ে বসে বলেন, "কী হয়েছে বেটা? মরদ আদমির তো রোদন শোভা পায় না। কী নিয়ে দুঃখ তোমার?"
আনিসুল হাই অশ্রুগলিত কণ্ঠে আবু সাঈদী হুজুরের পা টিপতে টিপতে বলে, "হুজুর, চিলির শায়ের নিকানোর পারা বলেছিলেন, কাকে বলে শায়েরি, যদি ওয়াতন না টেকে?"
আবু সাঈদী হুজুর তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, "ও একটা কাফের। ও শায়েরির কী বোঝে? এসব চিলি চিচিঙ্গার নাস্তিকদের কথায় কান দিও না। আমি যা বললাম, তা-ই করো।"
তবুও আনিসুল হাইয়ের অন্তরে প্লাবন থামে না।
আবু সাঈদী হুজুর সমঝদারের হাসি হাসেন। বলেন, "নওজোয়ানের চোখে আঁসু আনতে পারে কেবল তিনটি জিনিস। মুলতানের পেঁয়াজ, দোস্তের রক্ত ও মাশুকার ভর্ৎসনা। তুমি তো লজিং থাকো, পেঁয়াজ কাটতে হয় না। তোমার দোস্তরাও নিরাপদে আছে। তা মাশুকাটি কে?"
আনিসুল হাই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলে, "বিলকিস!"
আবু সাঈদী হুজুর এবার আরাম কেদারায় হেলান দিয়ে গড়গড়ার নল মুখে দিয়ে প্রসন্ন গুড়ুক গুড়ুক টান দেন তামাকে। মিষ্টি ইস্তাম্বুলী তামাকের গন্ধে বারান্দা মাতোয়ারা হয়ে ওঠে।
আনিসুল হাই নাক টেনে বলে, "সেদিন ইস্কাটনে পাশের বাড়ির আজাদদের বাসায় গিয়েছিলাম, সন্ধ্যাবেলা একটু গুফতাগু করার খায়েশে। গিয়ে দেখি বিলকিসও সেখানে বসে। জুয়েল আর বদি নামে দুটি বেয়াদব নাফরমানও সেখানে হাজির ছিলো। এ কথা সে কথার পর আজাদ বললো, দেশে যা হচ্ছে, তা ঠিক হচ্ছে না। এভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষ কতল করা অপরাধ। হুজুর, আপনি তো জানেন, আমি শান্তি চাই। আশার কথা লিখি। কারণ আশার কথা লিখলে দুটো রূপি লাভ হয়। দেশ নিয়ে আম্লীগের আচরণকে আমি সমর্থনও করি না। পাকিস্তান আমার অন্তরের কর্দমে ফুটে থাকা পদ্ম। আমি তাদের বুঝিয়ে বললাম, ক্ষমতার লোভে শেখ সাহেব কেমন উন্মাদ হয়ে গেছেন। এ সমস্ত হানাহানির দায় তাঁরই। সাধারণ মানুষ শান্তি চায় বলেই গ্রামে গ্রামে পাড়ায় মহল্লায় শান্তি কমিটি হয়েছে। ইউসুফ সাহেব গত মাসে নিরীহ শান্তিপ্রিয় জামায়াতে ইসলামী কর্মীদের নিয়ে রাজাকার বাহিনী গঠন করেছেন। গোলাম আজম সাহেব নেজামে ইসলামী আর মুসলিম লীগকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এ সময় এসব স্বাধীনতা স্বাধীনতা বলে জাতিকে বিভক্ত করার কোনো অর্থ হয় না। স্বাধীনতা বড় না গণতন্ত্র বড়? অবশ্যই গণতন্ত্র বড়। তখন ... তখন," আনিসুল হাই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে।
আবু সাঈদী হুজুর গড়গড়ায় নীরবে চুমুক দিতে দিতে বলেন, "বাতাও মেরে লাল। তখন?"
আনিসুল হাই রুমাল বার করে অশ্রুধারা মুছে বলে, "তখন ঐ বেয়াদব জুয়েল আর বদি আমাকে তিরস্কার করলো। বললো, আমি নাকি চামার। আর ... আর বিলকিস ... বিলকিসও তাদের সঙ্গে সায় দিলো!" তার গলা ধরে আসে।
আবু সাঈদী হুজুর নীরবে শুনে যান।
আনিসুল হাই বলে, "আমি তখন গত সপ্তাহে আপনার বয়ানে শোনা ট্রয়লাস ও ক্রেসিডার কাব্য থেকে তাদের বয়ান করলাম। বললাম, অনেক শোর মচানোর পর, অনেক খুন বহানোর পর শেষে বেহেস্তে যায় ট্রয়লাস। সেখানে গিয়ে বেহেস্তের একটি বাগিচায় বসে সে বহু নিচে পৃথিবীর পানে দিদার দেয়। তাকিয়ে সে চোখের সামনে দেখতে পায় এক নয়া দিগন্ত। তার মনে হয়, সংগ্রাম আর ইনকিলাবমুখর মানুষের এই দুনিয়া কত ছোটি সি বাত, কত ফিজুল এই হানাহানি। স্বাধীনতার মতো ছোটো স্বার্থ, গদিতে বসার ছোটো লোভ নিয়ে হানাহানি করে মরছে ইনসান। ট্রয়লাসের মতো আমরা যদি একটু দূরে গিয়ে পাকিস্তানের দিকে তাকাই, তবে আজকের এই এক দুই লক্ষ আম্লীগের মৃত্যুকে অত বড় মনে হবে না। আমরা যেন না ভুলি, ইতিহাসে আমাদের কোনো দিন নিজেদের দেশ ছিলো না। আমরা কোনো দিন স্বাধীন ছিলাম না। যেহেতু কোনোদিন স্বাধীন ছিলাম না, তাই আজ স্বাধীন হওয়ার কোশেশ করা ভুল। স্বাধীন হয়ে কী করতে কী করে ফেলবো, তার কোনো ঠিক আছে? ... তখন, তখন আজাদ আমাকে বললো, তুমি একটা ছাগল। হোসেনশাহী আমলের কথা তুমি ভুলে গেছো? আর ... আর ...," আনিসুল হাই আবার চোখে রুমাল চেপে ধরে, "বিলকিসও তাতে সায় দিলো!"
আবু সাঈদী হুজুর স্মিত মুখে গড়গড়া টানেন।
আনিসুল হাই ধরা গলায় বলে, "আমি তবুও আপনার বয়ান থেকে স্মরণ করে বললাম, দ্যাখো আজাদ, আমরা পুরোপুরি রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতাহীন জাতি। আমরা মোগলের চাবুক খেয়ে, ইংরেজের চাবুক খেয়ে, এই প্রথম রাষ্ট্র পেয়েছি। সবে বুঝতে শুরু করেছি একটি ইনসাফি বুনিয়াদে দাঁড়িয়ে থাকা আধুনিক রাষ্ট্র কী। কী করে তা সেনাবাহিনী দিয়ে চালাতে হয়। এ নিয়ে গোটা পাকিস্তানি জাতি কম চেষ্টা করছে না। তুমিই বলো, আজ তুমি আমি কি পাকিস্তান চালাতে পারবো? আমরা উচ্চশিক্ষিতরা একটা সাইকেল চালাতে গিয়ে বার বার কাত হয়ে পড়ে যাই, আর শেখ মুজিব কীভাবে দেশ চালাবেন? আর সব দেশই কোনো না কোনো সময় এ রকম সংকটের ভেতর দিয়ে যায়। বিলাতে বছরের পর বছর যুদ্ধ হয়েছে। আমেরিকায় বছরের পর বছর যুদ্ধ হয়েছে। সেখানে জনজীবন কীভাবে তছনছ হয়ে গেছে। সে তুলনায় আমরা কত দিকে ভালো আছি। বৈঠকখানায় বসে দু'দণ্ড গুফতাগু করছি। বেলা বিস্কুট দিয়ে চা খাচ্ছি। বিলকিসের সঙ্গে ছাদে বসে লুডু খেলছি। তখন ... তখন বিলকিস বললো, সে আর কখনো আমার সঙ্গে লুডু খেলবে না!" আনিসুল হাইয়ের বুক বিদীর্ণ করে কান্না উঠে আসে।
আবদেল আবু সাঈদী হুজুর একটি হাত রাখেন আনিসুল হাইয়ের মাথায়।
আনিসুল হাই ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, "আমি তারপরও তাদের বোঝানোর চেষ্টা করলাম, পাকিস্তানি জাতি আজ দাঁড়াতে চাচ্ছে, বড় হতে চাচ্ছে, জয় করতে চাচ্ছে। কিন্তু এই সমস্ত তালাশ ও আরমানের বুকের ওপর জল্লাদের মতো চেপে বসেছে আম্লীগের রাজনীতি। আজ এই শেখ সাহেবের দেখানো স্বাধীনতার দুঃস্বপ্নের ভুলভুলাইয়া থেকে আমাদের বেরোতে হবে। এই সব অপারেশন সার্চলাইট একটা সাময়িক ব্যাপার। যখন তুফান ওঠে, মনে হয় কোনো দিন এ বুঝি থামবে না। কিন্তু দেখা যায়, তুফান একসময় থেমে গেছে। তার পরে আসে এক লম্বি সি সুন্দর জামানা। আমাদের এখানেও তা আসবে আজাদ। গাছে গাছে গুল খিলবে, বাগিচায় শোনা যাবে কোয়েলের পুকার। আমি আর বিলকিস সেদিন ছেলেমেয়ে নিয়ে তোমার বাড়িতে বেড়াতে আসবো। তখন ... তখন বিলকিস বললো, সে মরে গেলেও কোনোদিন আমার মতো চামারকে শাদী করবে না!" আনিসুল হাই কাঁদতে কাঁদতে মোড়া ছেড়ে বারান্দার মেঝেতে গড়াগড়ি খায়।
আবু সাঈদী হুজুর সস্নেহে আনিসুল হাইকে ধরে আবার মোড়ায় উঠিয়ে বসান। মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, "বুঝলাম বেটা, তোমার দিলে এ কীসের কুন্দন। কেন তোমার আঁখেঁ দুটি এমন মাখমুর। তোমার সমস্ত হয়রানির শাবাব আমার নজরে সাফ সাফ ধরা পড়েছে। শোনো হাই, পরওয়ারদিগার এ দুনিয়ায় দুই কিসিমের জানোয়ার তৈরি করেছেন। একটি জানোয়ার খুনে গরম, আরেকটির খুন সর্দ। যে জানোয়ারের খুন সর্দ, যেমন ধরো সাপখোপ কুমীর কচ্ছপ, তার জিসমের তাপমাত্রা মহল্লার তাপমাত্রার সঙ্গে ওঠে আর নামে। সে বৈশাখ মাসে জেগে উঠে নড়েচড়ে, একে ওকে কাটে, আর মাঘমাসে সর্দ-নিদে মগ্ন হয়। কী বুঝলে?"
আনিসুল হাইয়ের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে বলে, "হুজুর, আমি বুঝতে পেরেছি! আমাকে হতে হবে ঠাণ্ডা রক্তের জানোয়ার। যখন যেমন, তখন তেমন হতে হবে। যেদিকে বৃষ্টি, সেদিকে ছাতা ধরতে হবে। যখন আড্ডায় স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা উঠবে, তখন তাতে তাল মেলাতে হবে, আর আড্ডার বাইরে গিয়ে সেসব ভুলে যেতে হবে!"
আবু সাঈদী হুজুর একটু বিব্রত কেশে বলেন, "বেটা, হয়েছে কী, কথাটা আসলে অন্য রকম ...।"
আনিসুল হাই আবু সাঈদী হুজুরের হাত চেপে ধরে সোল্লাসে বলে, "আমি বুঝে গেছি হুজুর! যখন মহল্লা গরম, তখন আমিও গরম থাকবো, ৭ মার্চের ভাষণে যাবো, বিলকিসকে ছাদে ডেকে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বলবো, মহান জাতির মহান নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব! আজাদ জুয়েল বদিকে বলবো, তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা। আর যখন মহল্লা টিক্কা খানের আর্মির গোলাগুলিতে ঠাণ্ডা, তখন দৈনিক কচুবনে লিখবো, এ জাতি শান্তি চায়, রাজনীতি পচা। তাই না?"
আবু সাঈদী হুজুর মিষ্টি হেসে বলেন, "বেটা, আল্লামা প্লেটোর কিতাব রিপাবলিক পাঠ করেছো?"
আনিসুল হাই সলজ্জ মুখে বলে, "না হুজুর। উপন্যাসটা কার মামাকে নিয়ে?"
আবু সাঈদী হুজুর আবার একটু কেশে বলেন, "ইয়ে ... কী বলে ... ওখানে একটা কথা আছে। আল্লামা প্লেটোর উস্তাদ আল্লামা সক্রাটেসকে একদিন এক শখস এসে শুধায়, দেশপ্রেম কী? জবাবে আল্লামা সক্রাটেস বলেছিলেন, বলছি, আগে আমার জন্য একটি মুরগা কিনে আনো। তখন সে শখস সক্রাটেসের জন্য বাজার থেকে একটি হৃষ্টপুষ্ট মুরগা কিনে আনে। সেটি পাক করতে করতে সক্রাটেস বলেন, নিজের কাজ সর্বোত্তমভাবে করে যাওয়াই সর্বোচ্চ দেশপ্রেম। ... তুমি কি বুঝতে পারছো বেটা, আমি কী বলতে চাইছি?"
আনিসুল হাই বিব্রত মুখে হেসে বলে, "জ্বি হুজুর। আমি এক্ষণই কারওয়ানবাজারে যাচ্ছি, দেখি ভালো দেখে মুরগা পাই কি না।"
আবদেল আবু সাঈদী হুজুর তার মাথায় হাত বুলিয়ে দু'আ করে বলেন, "যাও জওয়ান, নিশ্চিন্ত মনে আগে বাড়ো। মুল্লুক তুমহারা সাথ হায়। ফি আমানিল্লাহ। "
আনিসুল হাই উৎফুল্ল মুখে বেরিয়ে আসে। তার বুক থেকে এক পাষাণভার নেমে যায়। এ শান্তির কাছে একটি মুরগার মূল্য নিতান্তই তুচ্ছ। আর বিলকিসের কাছে ছোটো হয়ে থাকবে না সে। দৈনিক কচুবনে এখন সে দিল উজাড় করে শান্তির সুনাম আর রাজনীতির বদনাম করে লিখবে। সেই সাথে আজ সন্ধ্যার আড্ডাতেই আজাদ, জুয়েল আর বদির কাছে তিন কপি "মামা" বিক্রি করবে সে। নিজের কাজ সর্বোত্তমভাবে করে যাওয়াই সর্বোচ্চ দেশপ্রেম। সে দেশপ্রেম আজাদের, জুয়েলের, বদির বা বিলকিসের দেশপ্রেম থেকে কোনো অংশে কম নয়।

1 comment:

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।