Wednesday, January 01, 2014

খুবরগুড়ে


এইভাবে হতে থাকে ক্রমাগত
কেউ মারে কেউ মার খায়
ভিতরে সবাই খুব স্বাভাবিক কথা বলে
জ্ঞানদান করে
এই দিকে ওই দিকে তিন চার পাঁচ দিকে
টেনে নেয় গোপন আখড়ায়
কিছু বা গলির কোণে কিছু অ্যাসফল্ট রাজপথে
সোনার ছেলেরা ছারখার
অল্প দু চারজন বাকি থাকে যারা
তেল দেয় নিজের চরকায়
মাঝে মাঝে খড়খড়ি তুলে দেখে নেয়
বিপ্লব এসেছে কতদূর
এইভাবে, ক্রমাগত
এইভাবে, এইভাবে
ক্রমাগত।
(ক্রমাগত, শঙ্খ ঘোষ)
বিল্লালের সঙ্গে বিপ্লবের কোনোদিন দেখা হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো না। বিল্লাল নম্র স্বভাবের নিরীহ আরামপ্রিয় মানুষ। তার প্রতিবেশী আর সহপাঠীদের মধ্যে যারা বিভিন্ন সময়ে বিল্লালের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ রেখেছে, তাদের অনেকেই শহুরে জীবনের নানা মোলায়েম ঘাত প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে যাওয়ার ফলে "টাফ" হয়েছে, যেভাবে কাঁচা লোহা হাপরে চুল্লিতে আগুনে পানিতে গরম আর ঠাণ্ডা হয়ে পেকে ইস্পাত হয়। বিল্লাল তেমনটা পারেনি। তার রমণীকুশল বন্ধুদের সঙ্গে অনিয়মিত আড্ডায় আর মাঝে মাঝে দৈনিক কচুবনে নারীপুরুষ সিরিজে নারী ও পুরুষ সম্পর্কে নানা তাত্ত্বিক আলোচনায় নারীর কথা মাথায় রেখে পুরুষের টাফ হওয়ার প্রয়োজনের কথা ঘুরে ফিরে বার বার উঠে এলেও বিল্লাল সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত জীবনটায় অনুভব করেছে, টাফের মতো টাফ সে নয়। হয়তো জীবনে সে কখনো টাফ হতেও পারবে না। আর বিপ্লবের সঙ্গে দেখা হতে গেলে মানুষকে একটু টাফ তো হতেই হবে, এটা তো সহজেই অনুমেয়। পেলব লোকজন কি বিপ্লব করে কখনো?
কিন্তু পেলব বিল্লালের সঙ্গেই বিপ্লবের দেখা হয়ে যায় প্রকৃতির খসড়াখাতার মার্জিনে লেখা অমোঘ নিয়মে। বিপ্লব অবশ্য তখন এক টং দোকানের সামনে পেতে রাখা প্লাস্টিকের টুলে বসে ঘোলা চীনামাটির কাপে চা খেতে খেতে হাপুস নয়নে কাঁদছিলো।
বিল্লাল বিপ্লবের পরিচয় প্রথমে ঠাহর করতে পারেনি। তার কাছে চে গেবারা বিপ্লবের সমার্থক, তাই বিপ্লবের চেহারা অনেকটা চে গেবারার মতো হওয়া বাঞ্ছনীয়, এমনটাই সে ধরে নিয়েছিলো। বিপ্লবের গায়ে চে গেবারার চেহারাখচিত একটি টিশার্ট, তার ওপরে একটা বহুলসংখ্যক পকেটোলা হাতাছাড়া জ্যাকেট আর নিম্নাঙ্গে জিন্স বা কর্ডুরয়ের প্যান্ট থাকবে, পায়ে থাকবে একজোড়া ঈষৎ কাদামাখা বুট, এমন একটা ধারণাও উপযুক্ত কারণ ছাড়াই তার মনে জায়গা করে নিয়েছিলো। ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দুলিয়ে মুখে জন হ্যানিবল স্মিথের মতো সিগার কামড়ে ধরে বিপ্লব হোহো করে হেসে উঠে তার পাঁচশো সিসি নরটন মোটর সাইকেলে চড়ে দূরান্তের উদ্দেশে যাত্রা করবে, আকাশে তখন মেঘ গুড়গুড় করে উঠবে, দর্শক থেকে নিরাপদ দূরত্বে বাজ পড়বে কোনো অভাগার ঘাড়ে, দশ-বারো সেকেণ্ড পর বাতাসে ভেসে আসবে তার মন্দ্রধ্বনি, আর দমকা বাতাসে রাস্তায় পড়ে থাকা বিড়ির প্যাকেট, সেলোফেনের টুকরো, দিয়াশলাইয়ের কাঠি পাক খাবে, আর রাস্তা ধরে ক্রমশ দিগন্তপটে ছোটো হয়ে মিলিয়ে যাবে মোটরসাইকেলের পেছনবাতি, এমন সব নাটুকে কল্পনা তছনছ করে বিপ্লব একটা ময়লা সুতির পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি পরে ফোঁস ফোঁস করে কাঁদতে কাঁদতে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলো।
দেখতে বিপ্লব মোটেও চে গেবারার মতো নয়। জুলফিতে পাক ধরেছে, মাথায় চুল পাতলা হয়ে এসেছে, আর সবচেয়ে আপত্তিকর হচ্ছে, তার বয়সটাও যুবকোচিত নয়। তাই যখন চায়ের কাপে চুমুকের ফাঁকে পাঞ্জাবির হাতায় নাক মুছে বিপ্লব বিল্লালকে জানালো, সে বিপ্লব, পরিচয়টুকু বিল্লালের বিশ্বাসের গালে যেন চড় কষিয়ে দিয়ে গেলো। বিপ্লব বুড়ো?
বিপ্লব শুধু বুড়োই নয়, রোগাও। তার অভুক্ত মুখটা তাই প্রথম দেখায় মনের উপরিতলে অভক্তিই জাগিয়ে তোলে। তবে সে অভক্তিকে পরে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ভেতর থেকে উঠে আসা অনুকম্পার ঢেউ। বিল্লাল তাই টংদারকে চায়ের সঙ্গে কয়েকটা সিঙারাও দিতে বলে। প্লাস্টিকের বয়াম থেকে হতাশাজনক রকমের ছোটো আকারের সিঙারা বার করে একটা প্লাস্টিকের থালার এক কোণে কুমড়োর সস ঢেলে টংদার যখন বিল্লালের দিকে বাড়িয়ে দেয়, বিপ্লব সাগ্রহে হাত বাড়িয়ে একটা সিঙারা তুলে নিয়ে কামড়ে খায়। বিল্লাল আরেকটা টুল টেনে নিজের আর বিপ্লবের মাঝামাঝি সুবিধাজনক দূরত্বে রেখে প্লেটটাকে সমীহভরে একটু ঠেলে দেয় সে টুলের ওপর। তারপর চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, "কী হয়েছিলো বলুন তো?"
বিপ্লব প্রথম সিঙারাটাকে তুমুল গতিতে শেষ করে দ্বিতীয় সিঙারা তুলে নিয়ে অন্য হাতে চায়ের কাপটাকে ঠেলে দেয় টংদারের দিকে। বলে, "আরেক কাপ চা হোক, কী বলো?"
বিল্লাল মাথা ঝোঁকায়। হোক আরেক কাপ, ক্ষতি কী? তার কাছে কিছু টাকা আছে, হাতে সময়ও আছে। সবচেয়ে বড় কথা, সে বিপ্লবের দেখা পেয়েছে, প্রয়োজনমাফিক টাফ না হয়েও। তার রমণীমোহন বন্ধু শুকবর যতোই রাফ অ্যান্ড টাফ হোক না কেন, বিপ্লবকে চা-সিঙারা খাওয়ানোর সুযোগ তো সে পায়নি। দৈনিক কচুবনের নারীপুরুষ সিরিজের নারীদের ফিতায় বিল্লালের টাফনেসের আস্তিন কোনোদিনই ২৬ ইঞ্চি পর্যন্ত যাবে না, কিন্তু বিপ্লবের দেখা তো সে-ই পেলো শেষ পর্যন্ত?
টংদারের হাত থেকে নিয়ে বিপ্লব আবার কাপে চুমুক দিয়ে চুক চুক করে চা খায়। সিঙারাগুলো টপাটপ ফুরিয়ে আসে ছুটির দিনের মতো। বিল্লাল নিজের চায়ের কাপে রয়েসয়ে চুমুক দেয়।
"উমর আল বদরের কাছে গিয়েছিলাম," খিদেটাকে একটু বাগে এনে বলে বিপ্লব। "ভাবলাম, এসেই যখন পড়েছি, দেশের সবচেয়ে পাকনা বিপ্লবীর কাছে যাই।"
বিল্লাল সন্তর্পণে টংদারের দিকে খালি প্লেটটা বাড়িয়ে ধরে ইশারা করে। প্লাস্টিকের বয়াম ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে উঠে আসে আরো কয়েকটি কৃশকায় সিঙারা। বিল্লাল একটা মুখে দেয়, বিপ্লব দেয় দুটো।
"উনি ঘুমোচ্ছিলেন।" সিঙারা চিবাতে চিবাতে অভিমানভরে বলে বিপ্লব।
"ভোর বেলা গিয়েছিলেন?" বিল্লাল শুধায়।
"না। দিনে দুপুরে। নিজের শোবার ঘরে শুয়ে সে দিব্যি ঘুমাচ্ছিলো। আমি পানির পাইপ বেয়ে তার ঘর বরাবর উঠে ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখি, ফ্যান ঘুরছে সিলিঙে, ক্যালেন্ডারের পাতা উড়ছে তার বাতাসে, আর বিছানায় শুয়ে নাক ডাকাচ্ছেন উনি। আমি তাকে ফিসফিসিয়ে ডাকলাম, ও বদর সাহেব, উঠুন, আমি এসেছি। তার আর ঘুম ভাঙে না।"
বিল্লাল সিঙারা খায় আর বলে, "তারপর?"
বিপ্লবের চেহারাটা অভিমানে ভরে ওঠে। "ওঠে না তো আর ওঠেই না। কয়েক বার ডাকার পর গোঁ গোঁ করে স্বপ্নের ঘোরে কী যেন বকে বকে উল্টো পাশ ফিরে শুলো সে। শেষে আমি জানালার গ্রিলের ভেতর হাত গলিয়ে পানির গ্লাসটা তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মেরে বললাম, উমর আল বদর, আমি ডাকিতেছি তুমি ঘুমাইছো নাকি?"
বিল্লাল বিপ্লবের অভিমানের বাড়ির ঠিকানা খুঁজে পেয়ে যায়। বলে, "সে কী?"
বিপ্লব আরেকটা সিঙারার আলুতে গুঁজে অভিমানটুকু পিষে মারতে চায়। বলে, "লোকটা ধড়ফড়িয়ে উঠেই আমাকে গালাগালি করতে লাগলো। আমি যতোই বলি, আমি বিপ্লব, চিনতে পারো হে ... সে ততোই ক্ষেপে ওঠে। দুপুর বেলা তার ভাতঘুমটা ভাঙালাম কেন, কোন অধিকারে পানি ছুঁড়ে মারলাম, নিউমোনিয়া হলে কে বাঁচাবে আর কে পথ্যবদ্যির বিল দেবে, এইসব বুর্জোয়া কথাবার্তা শুরু করে দিলো। আমি তাকে যতোই পরিচয় দিয়ে বলি, আমি বিপ্লব, এসে পড়েছি, ওঠো তুমি, প্যান্টটা পরে নাও, এখন অনেক কাজ অনেক দৌড়ঝাঁপ, অনেক অনেক পাহাড় ঠেলা বাকি, সে ততোই বলে, আমিই সব নষ্টের গোড়া, নইলে ১৯৭৩ সালেই সে কী যেন একটা করে ফেলতো। আমার কারণেই নাকি জাবদুল হক আর মোহাব্বত তোহাকে সে বাগে আনতে পারেনি। আর আমিই নাকি ভুলিয়ে ভালিয়ে নিলাজ শিকদারকে লেলিয়ে দিয়েছিলাম তার পেছনে। নইলে সে নাকি সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া বামকে এক জায়গায় জড়ো করে এনে ...।" বিপ্লবের গলা বুঁজে আসে।
"জড়ো করে এনে?" বিল্লাল জাবদুল হক আর মোহাব্বত তোহার নাম শোনেনি, নিলাজ শিকদারের নামটা মাঝে মাঝে বাতাসে ভাসতে শুনেছে সে।
বিপ্লব চায়ের কাপে নীরবে চুমুক দিয়ে বলে, "জড়ো করে এনে ... বিপ্লব করতো।"
বিল্লাল মাথা চুলকায়। "তাহলে কী রকম হলো ব্যাপারটা? বিপ্লবের কারণে উমর আল বদর সাহেব আর বিপ্লব করতে পারেননি?"
বিপ্লবও মাথা চুলকায়। "অনেকটা সেরকমই। আমি এদিকে পানির পাইপ ধরে কোনোমতে তার জানালা বরাবর আটকে আছি, আর সে বসে বসে আমাকে গালমন্দ করছিলো। আমি যতোই তাকে বলি, কিছু দোষ তারও ছিলো, নইলে কেন সে ফণী সিংহ আর ধ্যান চক্রবর্তীকে বাগ মানাতে পারেনি ... ততোই সে আরও ক্ষেপে উঠছিলো। শেষটায় আমাকে মুখের ওপর শেখ মুজিবের চামচা ডেকে এক রকম গলাধাক্কা দিয়ে জানালা থেকে হটিয়ে, জানালা বন্ধ করে, পর্দা টেনে আবার সে ঘুমোতে চলে গেলো।" বিপ্লবের মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে ওঠে শেষে।
বিল্লাল কী বলবে বুঝতে না পেরে চায়ের কাপে চুমুক দেয়।
বিপ্লব টংদারের প্লাস্টিকের জগ থেকে ঢেলে প্লাস্টিকের গ্লাসে করে ঢক ঢক করে পানি খায়, তার কণ্ঠার হাড় ওঠে নামে, কিছু পানি গড়িয়ে পড়ে চিবুক বেয়ে। বিল্লাল চেয়ে দেখে, সিঙারার প্লেট ফাঁকা।
বিপ্লব পাঞ্জাবির হাতায় মুখ মুছে বলে, "আর কেউ আছে?"
বিল্লাল বলে, "আর কেউ মানে?"
বিপ্লব মিটমিট করে তাকায় তার দিকে। তার বসে যাওয়া, কালিপড়া চোখে টিমটিম করে জ্বলে আশার আলো। এদিক সেদিকে একবার চোখ বুলিয়ে গলা নামিয়ে সে বলে, "বিপ্লবী কেউ আছে আর?"
বিল্লাল চায়ের কাপ আর সিঙারার প্লেট টংদারকে ফিরিয়ে দিয়ে বলে, "বিপ্লবী? মানে ... বাম?"
বিপ্লব মাথা ঝাঁকায়। "আছে আর?"
টংদার বিরস গলায় বলে, "বেয়াল্লিশ টেকা।"
বিল্লাল মানিব্যাগ বার করে টাকা মিটিয়ে দিয়ে বিপ্লবকে বলে, "চলেন আমার সাথে।"
রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা, অল্প কয়েকটা বাস চলছে, তাতে দুরুদুরু বুকে বসে অনন্যোপায় খেটে খাওয়া মানুষ। বাতাসে জমে থাকা শঙ্কা চিরে নিরাপদে জীবিত ও অদগ্ধ অবস্থায় প্রেস ক্লাবের সামনে নেমে পড়ে বিল্লাল আর বিপ্লব। বিপ্লব অবশ্য সারাটা রাস্তা আনমনে জানালার পাশে বসে ঢুলছিলো, বিম্পিজামাতের পাণ্ডারা মলোটভ ককটেল মেরে বাসে চড়ার অপরাধে তাকে পুড়িয়ে খুন করবে, এই দুর্ভাবনা তাকে খুব একটা স্পর্শ করেছে বলে বিল্লালের কাছে মনে হয়নি। বিল্লাল মনে মনে বিপ্লবের প্রশংসা করে। হাজার হোক, বিপ্লব বলে কথা।
প্রেস ক্লাবের সামনে চোখ ডলতে ডলতে বিপ্লব ডানে বামে তাকিয়ে বিপ্লবী খোঁজে। মনমতো কাউকে দেখতে না পেয়ে সে বিল্লালকে বলে, "কই?"
বিল্লাল বিপ্লবকে আঙুল তুলে সামনের দিকে দেখায়। বিপ্লব গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যায় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাগত মানুষের ছোটো জটলার দিকে।
প্রথম জটলাটি কুড়ি-পঁচিশজনের। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবির নিচে ম্যাজেন্টা রঙের স্যাণ্ডো গেঞ্জি পরা এক বয়স্ক ভদ্রলোক এক হাত পেছনে ভাঁজ করে আরেক হাত উঁচিয়ে বলছিলেন, "এই সাম্রাজ্যবাদী সরকারের হাতে এ দেশ নিরাপদ নয়। এরা বেলা শেষে সাম্রাজ্যবাদের সহচর। কিন্তু বিরোধী দলও ভারি দুষ্টু। তারাও সাম্রাজ্যবাদেরই সহচর। সাম্রাজ্যবাদের দালালির টেণ্ডার নিয়ে দুই সহচরে লেগেছে সংঘাত, মাঝখান দিয়ে জনতার অবস্থা হালুয়া টাইট। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, সংঘাত নয়, সমঝোতা চাই।"
একটা মৃদু হাততালির রোল ওঠে সমাবেশের সামনে সমাগত মানুষদের মাঝে। তাদের পরনে ধবধবে সাদা কিন্তু অস্বচ্ছ পাঞ্জাবি। তবে তাদের পাঞ্জাবির গলায় বগলে ঘামের পিঙল দাগ।
বিপ্লব সেই ভিড়ের পেছন থেকে হঠাৎ হেঁকে বলে, "আনজিরুল মহসিন খান সাহেব, ফণী সিংহের শিষ্য হয়ে আজ তুমি এ কথা বলছো? হ্যাঁ? সংঘাত নয়, সমঝোতা চাই? সাম্রাজ্যবাদের দালালদের মাঝে সমঝোতা হলে প্রোলেতারিয়েতের লাভটা কী?"
ভাষণরত বিপ্লবী ভদ্রলোক উসখুস করে ওঠেন। তিনি আবার ভাষণ চালু করেন, "এ দেশের মালিকানা খেটে খাওয়া সাধারণ জনগণের, সংবিধানে তেমনটিই বলা আছে। কিন্তু সেই জনগণ যখন তাদের দেখভালের জন্য সাম্রাজ্যবাদের দালালদের ক্ষমতায় পাঠায়, তখন সংবিধান হয়ে পড়ে এক টুকরো তুচ্ছ দস্তাবেজ ...।"
বিপ্লব তার পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে হাত উঁচু করে গর্জে ওঠে, "আনজিরুল মহসিন খান, রাখো তোমার সংবিধান! সাম্রাজ্যবাদের দালালদের মধ্যে সমঝোতা করে কী হবে আগে বলো! লেনিন কি সমঝোতা করেছিলেন? মাও কি সমঝোতা করেছিলেন? ফিদেল কাস্ত্রো কি সমঝোতা করেছিলেন? হো চি মিন কি সমঝোতা করেছিলেন?"
আনজিরুল মহসিন খান মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলেন, "ইয়ে ... কী যেন বলছিলাম, এখন দেশে যা চলছে, তা হচ্ছে চর দখলের সংস্কৃতি ...।"
বিপ্লব তবুও বাঘের মতো গর্জায়, "বলো, কবে কোন বিপ্লবী সমঝোতা করেছিলেন?"
আনজিরুল মহসিন খান এবার চটে গিয়ে বলেন, "আরে কী জ্বালা, শান্তিতে দুইটা বক্তব্য দিতে পারবো না নাকি? কে রে ভাই, হট্টগোল করো?"
বিপ্লব তবুও বার বার নেহারির ঝোলের মতো টলটলে ভিড়ের ভেতর থেকে তড়পায়, সমঝোতা করা বিপ্লবীর নাম জানতে চায়, সাম্রাজ্যবাদের দালালদের মাঝে বিম্পি নেতা নিজামরুল ইসলাম খান কেন আনজিরুল মহসিন খানের ভায়রা, সে কথা জানতে চায়।
আনজিরুল মহসিন ফুঁপিয়ে ওঠে, "আরে বাল আমি কি দুনিয়ার সব বিপ্লবীকে চিনি? এই ডালিম, তোমার হাতে পার্টি দিলাম, কী লোকজন ঢুকাইছো পার্টিতে? এইসব কী কোচ্চেন করে?"
জিহাদুল আসলাম ডালিম চেয়ারে বসে বসে ঢুলছিলেন, আনজিরুল মহসিনের খোঁচা খেয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে তিনি বলেন, "সব সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত। এ সংঘাত সাম্রাজ্যবাদের খেয়ে যাওয়া রোস্টের ফেলে যাওয়া হাড্ডির টুকরার দখল-বখরা নিয়ে সংঘাত। জনগণ এ সংঘাত চায়নি, চায় না। সংঘাত নয়, সমঝোতা চাই ...।"
আনজিরুল মহসিন খান আবার খোঁচান, "আরে এই লোক এগুলি কী জিগায়?"
জিহাদুল আসলাম ডালিম হাত নাড়ে, "এই লোক, চলে যাও। চলে যাও এখান থেকে। সাম্রাজ্যবাদের দালালি ছেড়ে দাও। সংঘাত কোরো না। সমঝোতা চাইলে এসে বসো, বক্তৃতা শোনো। ডাস কাপিটাল পড়েছো?"
বিপ্লব শূন্যে মুষ্ঠি হেনে বেরিয়ে আসে সে ভিড় থেকে, পিছু পিছু বিল্লাল।
বিপ্লব বিড়বিড় করে জোর পা চালিয়ে সামনে এগোতে থাকে। "ফণী সিংহের শিষ্য এরা? এদের হাতে পার্টি? কীভাবে আসবো এ দেশে? কারা আনবে আমাকে? এরা তো আমাকে খেদিয়ে দিচ্ছে।"
বিল্লাল চুপচাপ পিছু পিছু হাঁটে। সে দেখতে পায়, সেই দুবলা রোগাটে ভাবটা বিপ্লবের শরীর থেকে চলে গেছে। পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি পরা চিতাবাঘের মতো বিপ্লব গটগট করে যেন হেঁটে চলে ইতস্তত ভেড়ার পালের মাঝে।
কয়েক কদম এগোতেই চোখে পড়ে আরেক জটলা। সেখানে আঙুল উঁচিয়ে এক প্রৌঢ় বিপ্লবী গর্জন করে চলছেন।
"সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়াদের মোকাবেলা করার আগে নিজেদের প্রস্তুত হতে হবে। আমরা যদি খামোকা অহেতুক হুদা বিতর্কে ব্যস্ত থাকি, আমাদের সংগ্রাম ঢিলা হয়ে যাবে। এ নিয়ে আমি ভ্যানগার্ডের গত সংখ্যায় লিখেছি। কমরেড মনিবুল হালদার ও অসিতাংশু চক্রবর্তী অহেতুক দলকে কমজোর করেছেন। অহৈতুকী বিতর্কে আমাদের দুর্বল করেছেন। পিছিয়ে দিয়েছেন। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, আমরাই প্রকৃত বাঁশদ। তারা দলত্যাগী মোনাফেক মাত্র।"
সমাগত কয়েক ডজন তরুণ তরুণী প্রবল হাততালি দিয়ে চেয়ারে ঢুলতে থাকা এক প্রৌঢ়ের ঘুমের চটকা ভেঙে দেয়।
আলেক মওলা দৃপ্ত কণ্ঠে বলেন, "গণচাঁদার টাকায় সম্পত্তি কেনা নিয়ে এতো তর্কের কী আছে? পার্টির সম্পত্তি তো ভূতের নামে থাকতে পারে না। মানুষের মতো মানুষের নামেই তা থাকতে হবে। আর পার্টিতে আমার চেয়ে উপযুক্ত মানুষ কেউ আছে? থাকলে তার নাম শুনতে চাই।"
বিপ্লব পেছন থেকে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে গর্জন করে ওঠে, "বিপ্লবী রাজনীতির প্রাণ, উন্নত চারিত্রিক মান!"
আলেক মওলা চটে ওঠেন, "আরে রাখো তোমার উন্নত চারিত্রিক মান। একটু আধটু যৌথ জীবন যাপন করতে না দিলে বিপ্লবীরা থাকবে? সব কয়টাই তো দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের পর পটাপট বিয়েশাদি চাকরিবাকরি বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে পগারপার হয়ে যায়। দিনকে দিন বিপ্লবী কমে যাচ্ছে। তার ওপর চরিত্র নিয়ে এতো রশি টানাটানি হলে তো দলই থাকবে না। আবার বিপ্লব!"
বিপ্লব এবার লুঙ্গি মালকোঁচা দিয়ে হুঙ্কার দেয়, "কমরেড আলেক মওলা, তুমি কীভাবে বিপ্লব করবে? তোমার হাতে পড়ে বাঁশদ শুধু ভাঙছে আর ভাঙছে। ছাত্রফ্রন্টিয়ারের বিপ্লবীরা আট বছর আগে কে এক নারী কমরেডের বিয়ের আসরে তোমার মুখে চুনকালি দিয়ে বেরিয়ে গেলো, তুমি ভুলে গেছো? দুই বছর আগে জাবদুল্লাহ সরকার তোমার কান মলে দিয়ে চলে গেলেন। আবার তুমি গিয়ে ভিড়েছো ডালিম-আনজিরদের সাথে, মোর্চা থেকেও তোমার দলকে বাকি বিপ্লবীরা খেদিয়ে দিয়েছে। এরপর তুমি কাদের নিয়ে বিপ্লব করবে?"
আলেক মওলা ক্ষেপে গিয়ে বলেন, "মনিবুল হালদারের হয়ে দালালি করতে এসেছো আমার মিটিঙে, তাই না? সাম্রাজ্যবাদের দালালদের চেয়ে বড় শত্রু এই মনিবুল হালদারের দালালরা। এই কে আছো কমরেড, ধরো তো এটাকে! কোনো সমঝোতা নাই, সংঘাত করতে এসেছে, দেখিয়ে দাও সংঘাত কী জিনিস!"
বিপ্লব খপ করে বিল্লালের হাত চেপে ধরে ছুট লাগায়, বলে, "পালাও!"
বিল্লাল হতচকিত হয়ে দৌড়ায়, পেছন পেছন তাড়া করে আসে কয়েকটি উত্তেজিত তরুণী কমরেড।
বিপ্লব শ'খানেক গজ ছুটে থামে, থেমে ঘাম মোছে। পেলব বিল্লালের এতো দৌড়ঝাঁপের অভ্যাস নেই, সে ধপ করে ফুটপাথে বসে পড়ে হাঁপরের মতো হাঁপাতে থাকে। সব কিছুই তার কাছে উল্টো মনে হয়। বিপ্লব কেন পালিয়ে যাবে?
বিপ্লব যেন বুঝে ফেলে তার মনের কথা। বলে, "পালানো মানেই প্রস্থান নয়। পশ্চাদপসরণ বিপ্লবীর জীবনের নিত্য কৌশল। উমর আল বদরের বাড়ি থেকে তো পশ্চাদপসরণই করলাম, তাই না? সব সময় সবকিছুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকলে বিপ্লব হবে না।"
বিল্লাল হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, "সংঘাত নয়, সমঝোতা চাই?"
বিপ্লব মাথা চুলকায়। "না ... তা তো বলিনি।"
বিল্লাল বলে, "তাহলে?"
বিপ্লব একটু ক্ষেপে ওঠে। বলে, "সমঝোতা তো পশ্চাদপসরণ নয়। সমঝোতা মানে নেকড়ের পালের সঙ্গে ভিড়ে গিয়ে পাতিনেকড়ে হওয়া। সংঘাত মানে নেকড়ের সঙ্গে লড়াই করা। আর পশ্চাদপসরণ হচ্ছে লড়াইটা আজ না করে কালপরশুর জন্যে রেখে দিয়ে প্রস্তুত হওয়া।"
বিল্লাল বড় শ্বাস নিয়ে বলে, "সমঝোতা করে প্রস্তুত হওয়া যায় না?'
বিপ্লব মাথা নাড়ে। "না। সমঝোতা মানে লোহা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া। আর লোহা না তাতালে আমার আর আসা হবে না।"
বিল্লাল বলে, "তাহলে সামনে আগাই, কী বলেন?"
বিপ্লব পা চালায়।
কিছু দূরে আরেকটা জটলা শেষ বিকেলের রোদ পোহাচ্ছে। কাছে গিয়ে বিল্লাল বক্তাকে চিনে ফেলে। এনাকে সে টকশোতে নিয়মিত দেখে।
সাদামাটা পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে ফেননিভ খান মেনন, যাকে সবাই একটু মশকরা করে ফেনোমেনন বলে আড়ালে বা প্রকাশ্যে ডাকে, চোখ বুঁজে বলে যাচ্ছিলেন, "স্বাধীনতার শত্রুদের সঙ্গে কোনো বোঝাপড়া আমরা হতে দেবো না। যদিও আমরা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের সঙ্গে জোট করেছি, কিন্তু নিজেদের পরিচয়, স্বাতন্ত্র, লক্ষ্যকে আমরা বিকিয়ে দিইনি। আমরা খেটে খাওয়াদের দল। আর খেটে খাওয়াদের শত্রুরাই স্বাধীনতা শত্রু। তারা এখন ফাঁসির দড়ি গলায় নিয়ে আমাদের গায়ে আগুন দিচ্ছে, বোমা মারছে, রাতে ঘরে ঢুকে কুপিয়ে মারছে। কীভাবে তাদের এতো স্পর্ধা হলো? এই সাম্রাজ্যাবাদীদেরই প্রত্যক্ষ ও্ পরোক্ষ প্ররোচনায়। এরাই এই কালসাপকে বুকে জড়িয়ে পেলে পুষে বড় করেছে ...।"
বিপ্লব অস্থির হয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা পোস্টার বার করে আনে, বিল্লাল তাতে উঁকি দিয়ে চমকে ওঠে। মইত্যা রাজাকারকে বুকে জড়িয়ে ধরে তৃপ্তির হাসি হাসছেন ফেনোমেনন। পোস্টারের নিচে লেখা, মাত্র ১৯ বছর পর।
ফেনোমেনন কী যেন বকে যাচ্ছিলেন, বিপ্লব গর্জে ওঠে, "এতো খেটে খাওয়া মানুষ থাকতে তোমাকে সাম্রাজ্যবাদের দালালের সঙ্গে জোট করতে হয় কেন? কেন তুমি খেটে খাওয়া মানুষদের নিয়ে বিপ্লব করো না? আর এই পোস্টারে এটা কাকে জাবড়ে ধরে বিটকেল হাসছো তুমি, হ্যাঁ?"
ফেনোমেনন চুপ করে চশমার ফাঁক দিয়ে ভাবুক চোখে বিপ্লবকে দেখেন।
বিপ্লব আবারো তড়পায়, বলে, "আমি সারা দেশ ঘুরে দেখেছি। সেখানে মানুষ খাটতে খাটতে মুখে রক্ত তুলে ফেলছে। কিন্তু তুমি খেটে খাওয়ার দলের নাম ভাঙিয়ে গিয়ে জোট পাকাচ্ছো সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গেই। লেনিন কি জারের সঙ্গে জোটে ঢুকেছিলেন? মাও? কাস্ত্রো?"
ফেনোমেনন অলস হাত নেড়ে বলেন, "য়্যায় কে আছো একটু দেখো তো।"
কয়েকজন খেটে খাওয়া রাগী চেহারার যুবক এগিয়ে আসে ভিড় ঠেলে। বিপ্লব চিৎকার করে বলে, "পালাও পালাও!"
এবার বিল্লালকে আগের চেয়ে আরো শ'খানেক গজ বেশি ছুটতে হয়, বিপ্লবও একটু হাঁপিয়ে ওঠে এবার। বিল্লাল ফুটপাথের রেলিং ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, "আরেকটু হলেই সংঘাত হয়ে যেতো, বাপ রে!"
বিপ্লব বলে, "একটু পানি পাওয়া যাবে কোথাও?"
বিল্লাল বলে, "নাহ, এদিকটায় তো কিছু নেই, সচিবালয়ের ওদিকে গেলে হয়তো দোকানপাট খোলা পাওয়া যেতে পারে ...।"
বিপ্লব জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট চাটে, আর বলে, "আর কেউ নেই?"
বিল্লাল কিছু বলতে যাবে, এমন সময় কাছেই একটা মাইক ঘড়ঘড় করে ওঠে, "হ্যালো, হ্যালো, সোনায়েদ জাকি কলিং অল ইনসাফ ড্যুডস, সোনায়েদ জাকি ডাকছে সব ইনসাফিকে, ডু ইউ কপি ড্যুডস?"
একটা হুল্লোড় ওঠে কাছেই, "কপি, কপি।"
বিপ্লবের চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, সে বিল্লালকে টেনে রেলিং থেকে ছাড়িয়ে সামনে এগোয়। "আছে, আরো আছে!"
বিল্লাল বিপ্লবকে বুঝিয়ে বলতে চায়, কিন্তু বিপ্লব তাকে টানতে টানতে এগিয়ে যায় সামনের জটলার দিকে।
এ জটলা আগের তিন জটলার চেয়ে ঘন, জটলার তরুণরাও অন্যদের চেয়ে বেশি ধোপদুরস্ত। মাইকের সামনে দাঁড়ানো বক্তা সুবেশী, তার চুলগুলো দামি সেলুনে ছাঁটা, পরনে আড়ঙের পাঞ্জাবি আর চাদর। সে বলে, "এতোক্ষণ তোমরা শুনলে আমাদের প্রিয় ইনসাফ সংগ্রামী ফারুক গুয়েবাড়ার মর্মস্পর্শী বক্তৃতা। এখন তোমাদের উদ্দেশে সুন্দরবন নিয়ে কিছু বলবে তোমাদের প্রিয় ইনসাফ সংগ্রামী কলু মুস্তফি। ভাইসব, কলু মুস্তফি।"
কলু মুস্তফি নামের তরুণ গটগট করে এগিয়ে আসে মাইকের সামনে। প্রত্যয়ী কণ্ঠে সে বজ্রমুষ্ঠি উঁচিয়ে ধরে বলে, "আমাদের দেশের তেল গ্যাস কয়লার মালিক আমাদের জনসাধারণ। সাম্রাজ্যবাদী টাউট বাটপারের হাতে এসবের মালিকানা আমরা ছেড়ে দেবো না। শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আমরা সুন্দরবনের হরিণশিশুকে রক্ষা করবো। সে যাতে তার মায়ের সঙ্গে ভোরবেলা নিশ্চিন্ত মনে চরে বেড়াতে পারে পশুর নদীর পারে। সে যেন বনের ঘাসপাতা চিবিয়ে আর নদীর পানি পিয়ে বড়টি হতে পারে। তারপর একদিন যেন নাদুস শরীরে ভরা যৌবনে সে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের একটি বাংলাদেশী বাঘের হাতেই ঘাড় মটকে মারা পড়ে। এটিই সুন্দরবনের হরিণের সমুচিত নিয়তি। কিন্তু কী হচ্ছে এসব ভাইসব? সাম্রাজ্যবাদের দালাল নব্য রাজাকার আম্লীগ তার শয্যাসঙ্গী ভারতকে নিয়ে সুন্দরবনের মাঝে এ কী গড়ে তুলছে? হরিণশিশুর চোখ দিয়ে দেখুন ভাইসব। দূরে ওটা কীসের ধোঁয়া? নদীতে এটা কীসের কালি? বনের সুস্বাদু টসটসে গাছের পাতায় জমা হওয়া গুঁড়াগুঁড়া ভুসিভুসি এগুলো কী রে? বনের পাশ দিয়ে নদীতে এ কী ভোঁভোঁ শব্দ আর আলো? এ কী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্বন ডায়োক্সাইড? নদীতে এটা কি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য? এ কি গাছের পাতায় জমা কয়লার কাজলরেখা? এ কী কয়লাবাহী জাহাজের ভেঁপু আর বাতি? আমি বেচারা হরিণশিশু রাতে ঘুমাবো কীভাবে? খাবো কী? শরীরে গোস্তো জমবে কী করে? আর শরীরে গোস্তো না জমলে সুন্দরবনের বাওয়ালি মৌয়ালি খাবে কী? আর বাওয়ালি মৌয়ালিরা খেতে না পেলে তাদের শরীরে গোস্তো জমবে কী করে? আর তাদের শরীরে গোস্তো না জমলে সুন্দরবনের বাঘ খাবে কী? আম্লীগ, তুই সুন্দরবনের বাঘ হরিণ সব মারলি।"
কলু মুস্তফি কান্নায় ভেঙে পড়ে।
বয়স্ক এক সৌম্যকান্তি ভদ্রলোক দু'পায়ে প্লাস্টার বেঁধে একটি চেয়ারে বসে ছিলেন, তিনি হাততালি দিয়ে বলেন, "কলু মুস্তফি গোটা ব্যাপারটি সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে বলেছে। সাবাশ ইনসাফি সংগ্রামী, সাবাশ।"
কলু মুস্তফি চোখ মুছে ধরা গলায় বলে, "অধ্যাপক ঝানু মোহাব্বতকে ধন্যবাদ। ঝানু স্যার কিছুদিন আগেই সাম্রাজ্যবাদী ভারতে কীভাবে লোকে কয়লাখনির বিষে আক্রান্ত হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছে, তা সরজমিন পরখ করে দেখতে গিয়েছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী ভারত স্যারকে পুলিশ দিয়ে কয়লাখনি থেকে বন্দী করে, তারপর নির্মমভাবে প্রহার করে, অত্যাচার নির্যাতন করে, তাঁকে ডিম দেয়। দেখুন স্যারের পায়ে প্লাস্টার দেখুন।"
ঝানু মোহাব্বত প্লাস্টার করা পা দুটি টর্চ লাইট জ্বেলে সকলকে দেখান। ফারুক গুয়েবাড়ার পাশে ভিডিও ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক গম্ভীরবদনা মহিলা সে দৃশ্য ভিডিও করেন।
বিপ্লব গর্জে ওঠে, "ডিম দিলে পায়ে কেন প্লাস্টার করতে হবে?"
কলু মুস্তফি পাল্টা গর্জন করে, "আরে ডিম দিয়েছে অন্য জায়গায়। সঙ্গে পাও ভেঙে দিয়েছে। ডিমের জায়গার প্লাস্টার কি সবাইকে দেখানো যাবে?"
অন্যান্য ইনসাফ সংগ্রামীরাও হুঙ্কার দেয়, "দেখানো যাবে?"
ঝানু মোহাব্বত ভুরু কুঁচকে বিপ্লবকে দেখেন আপাদমস্তক।
বিপ্লব পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে বলে, "ফেব্রুয়ারি মাস থেকে জামাতশিবিরবিম্পির লোকজন সারা দেশে হাজার হাজার গাছ কেটেছে। সেটা নিয়ে ঝানু মোহাব্বত সরজমিন পরখ করতে যায় না কেন?"
ঝানু মোহাব্বত টর্চ নিবিয়ে দিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে বসে অন্য দিকে তাকান।
কলু মুস্তফি পাত্তা দেয় না বিপ্লবের কথায়, সে আবার তর্জনী উঁচিয়ে গর্জন করে, "সাম্রাজ্যবাদী ভারতের অত্যাচারের ভয়েই অধ্যাপক ঝানু মোহাব্বত দীর্ঘ তিনটি মাস ধরে সুন্দরবন নিয়ে আর কিচ্ছু বলছেন না। আমরা যারা তাঁর ভাবশিষ্য, আমরাও আপাতত চুপ আছি। কারণ যারা একজন প্রবীণ গবেষককে ডিম দেয়, তারা একজন নবীন গবেষককেও ছাড়বে না। আর দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ভুখা নাঙা আমজনতার মালিকানা বুঝে নেওয়ার জন্য, রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ইনসাফের জন্য কাউকে না কাউকে তো গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে। তাই ভাইসব ...।"
বিপ্লব আবারও গর্জায়, "ভুখানাঙা আমজনতার মালিকানাধীন সামাজিক বনায়নের কয়েকশো কোটি টাকা দামের হাজার হাজার গাছই তো জামাতশিবিরবিম্পির লোকজন কেটে নিয়ে সড়ক অবরোধ করেছে। এটা নিয়ে তোমরা কিছু বলো না কেন?"
ইনসাফ ড্যুডরা চুপ করে যায়। সোনায়েদ জাকি উদাস মুখে ঘড়ি দেখে, ফারুক গুয়েবাড়া মোবাইলে কাকে যেন কল দেয়, আর ঝানু মোহাব্বত ইতস্তত কাশেন।
কলু মুস্তফি কিছুক্ষণ ভাবগম্ভীর মুখে চেয়ে থেকে বলে, "হাজার হাজার গাছ?'
বিপ্লব গর্জে উঠে বলে, "হ্যাঁ!"
কলু মুস্তফি শরীরের ভর এক পা থেকে অন্য পায়ে নিয়ে বলে, "কয়েকশো কোটি টাকা দাম?"
বিপ্লব বলে, "হ্যাঁ!"
কলু মুস্তফি পকেট থেকে একটা ক্যালকুলেটর বার করে কী যেন পার্সেন্টেজ হিসাব করে আড়চোখে সোনায়েদ জাকি আর ফারুক গুয়েবাড়ার দিকে তাকায়। তারাও পাল্টা কড়া চোখে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। ঝানু মোহাব্বত হাত তুলে গৌতম বুদ্ধের বরাভয় মুদ্রা দেখান তাকে।
কলু মুস্তফি ক্যালকুলেটরটিকে পকেটস্থ করে বলে, "হুমমম, আচ্ছা ... বেশ বেশ। এখানে আমাদের বুঝতে হবে, সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পথে অন্তরায় কে। গাছ যে কাটে, সেও প্রোলেতারিয়েত। এখানে জামাতশিবিরবিম্পিকেও ভুখানাঙা আমজনতা ধরতে হবে। তারা নিজেরা নিজেদের গাছ কাটছে। বরং রাষ্ট্রের গলা টিপে ধরা বুর্জোয়া আম্লীগ ঐ গাছগুলিকে যাতে সাম্রাজ্যবাদী ভারতের কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রে পাচার করতে না পারে, তাই তারা আগাম নিজেদের মাল নিজেরা বুঝে নিয়েছে।"
বিপ্লব ঘাবড়ে গিয়ে বলে, "এ কেমন কথা?"
সোনায়েদ জাকি বজ্রনির্ঘোষে হাততালি দেয়, "এনকোর, এনকোর!"
কলু মুস্তফি উৎসাহ পেয়ে তর্জনী উঁচিয়ে বলে, "সুন্দরবনের হরিণশিশু যদি নিজেই সুন্দরবনের মাঝে কয়লাবিদ্যুতের কেন্দ্র খুলে বসতো, আমরা কিছু বলতে পারতাম? চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে, আমরা ভেবে করবো কী? জামাতশিবিরবিম্পির গাছকাটাকেও সুন্দরবনের হরিণশিশু কর্তৃক সুন্দরবনে কয়লাবিদ্যুৎ খুলে বসা হিসাবে দেখতে হবে। যেহেতু এই গাছগুলো কাটায় ভারতের ক্ষতি হয়েছে, তাই এখানে কোনো সমস্যা হয়নি। সর্বোপরি ...।" সে থেমে যায়।
বিপ্লব চিৎকার করে বলে, "ভারতের কীভাবে ক্ষতি হলো?"
কলু মুস্তফি আড়চোখে অধ্যাপক ঝানু মোহাব্বতের দিকে তাকায়, তিনি শব্দ না করে হাততালির ভঙ্গি করেন। ভরসা পেয়ে কলু বলে, "হয়েছে। এটা আপনি বুঝবেন না। অর্থনীতি বলে, ভারতেরই ক্ষতি হয়েছে। ঠিক যেভাবে সুন্দরবনের মাঝখানে সুন্দরবনেরই হরিণশিশু কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র খুললে ভারতের ক্ষতি হতো। জামাতশিবিরবিম্পি এখানে সেই হরিণশিশু।"
বিপ্লব বলে, "গাছ কাটলো বাংলাদেশে, টাকা মার গেলো বাংলাদেশের গরিবের, জামাতশিবিরবিম্পির ক্যাডাররা এখানে সুন্দরবনের হরিণশিশু হয় কীভাবে?"
ঝানু মোহাব্বত প্লাস্টার চুলকাতে চুলকাতে তৃপ্ত গলায় বলেন, "হয়, হয়, zানতি পারো না!"
বিপ্লব তোতলাতে থাকে, "মানে কী এসবের?"
কলু মুস্তফি আবার শুরু করে, "সর্বোপরি, এই গাছ কাটা হচ্ছে চাইনিজ কুড়াল ও চীন হতে আমদানি করা বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে। যেহেতু এতে করে দেশের কুড়াল ও করাতের বাজারে সংগ্রামী চীনা ইনসাফি ভাইদের অংশগ্রহণ বাড়ছে, তাই এতে করে ভারতের আবারও ক্ষতি হচ্ছে। অতএব এই সামান্য গাছকাটা নিয়ে আমরা বেশি সময় নষ্ট করবো না। ফিরে যাই সুন্দরবনের হরিণশিশুর জুতো পায়ে দিতে ...।"
বিপ্লব লাথি দিয়ে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার উল্টে দিয়ে বলে, "এসব কী বাকোয়াজ? কীভাবে হয়? ব্যাখ্যা কই? প্রমাণ কই? তথ্যসূত্র কই?"
কলু মুস্তফি এবার শার্টের হাতা গুটিয়ে চোখ পাকিয়ে শীতল গলায় বলে, "ব্যাখ্যা? প্রমাণ? তথ্যসূত্র? আপনি কোথাকার কোন হরিদাস পাল যে আপনাকে এসব দিতে যাবো? বাংলায় কথা বলি বোঝা যায় না?"
ফারুক গুয়েবাড়া দুই পা এগিয়ে এসে ধমক দিয়ে বলে, "বাড়ি কই আপনার? গোপালি?"
সোনায়েদ জাকি ধমকে বলে, "য়্যায়, কে আপনি?"
অধ্যাপক ঝানু মোহাব্বত দাঁত খিঁচিয়ে বলেন, "ঐ তুই কে রে?"
বিপ্লব এবার সামনে পড়ে থাকা সব প্লাস্টিকের চেয়ার লাথি মেরে ছিটকে ফেলে দিয়ে আকাশ কাঁপানো গর্জনে বলে, "আমি বিপ্লব!"
এবার সবাই চমকে ওঠে।
ফারুক গুয়েবাড়া কাছে এগিয়ে আসে, সোনায়েদ জাকি পকেট থেকে দূরবীণ বার করে বিপ্লবকে খুঁটিয়ে দেখে, কলু মুস্তফি দ্রুত মঞ্চ ছেড়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। অধ্যাপক ঝানু মোহাব্বত বিপ্লবের মুখে টর্চের আলো ফেলেন।
বিল্লাল পেছনে অস্ফূট গুঞ্জন শুনে ঘাড় ফিরিয়ে দেখে, আনজিরুল মহসিন, জিহাদুল ইসলাম ডালিম, আলেক মওলা, ফেনোমেনন, সবাই গুটি গুটি পায়ে এসে হাজির। তাদের সবার চোখে অস্বস্তি।
ঝানু মোহাব্বত প্লাস্টারমোড়া পা নিয়ে থপথপিয়ে হেঁটে এসে ক্রুদ্ধ বিপ্লবের চেহারাটা টর্চের আলোয় ভালো করে দেখেন।
ফারুক গুয়েবাড়া চমকে উঠে সোনায়েদ জাকি আর কলু মুস্তফির পেছনে গিয়ে লুকায়।
এক এক করে প্রবীণ বামেরা বিপ্লবকে ভালো করে দেখেন। বিকেল নিংড়ে পৃথিবী শেষ রোদটুকু ঢেলে দেয় বৃদ্ধ বিপ্লবের অবয়বে। ইনসাফিরা অপরাধীর চোখে একে অন্যের দিকে আড়ে আড়ে তাকায়।
বড়রা বিড়বিড় করে নিজেদের মধ্যে কথা বলেন, বিপ্লব একটা প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে ধপ করে তার ওপর বসে পড়ে। তাকে আরো বুড়ো দেখায়। বিড়বিড় করে সে বলে, "কতো জায়গায় গিয়েছি আমি! একদিনের জন্যে হলেও গিয়েছি! শুধু ডাক পাই না তোমাদের কাছ থেকে। ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলে বসে বসে ভাবি, এই বুঝি ডাক আসে। কীসের কী! তোমরা করবে বিপ্লব? তোমাদের পাঞ্জাবির ভিতর দিয়ে রংবেরঙের নকশা করা গেঞ্জি ফুটে থাকে, এক একজনের পকেটে স্মার্টফোন, হাতে ভিডিও ক্যামেরা, বুক ভর্তি কুযুক্তি টোকা চিরকুট, মুখে হাসি আর মিথ্যা কথা। তোমরা কীভাবে আমাকে ডাকবে? আমাকে ডাকার কেউ নেই।"
সবাই বিপ্লবকে ঘিরে ধরে, কিন্তু সে চেয়েও দেখে না। আনমনে বকে যায় নিকারাগুয়ার জঙ্গলে তাকে ডাকতে গিয়ে সামোজার ন্যাশনাল গার্ডের তাড়া খাওয়া কিশোরের গল্প, নেপালের সিমিকোটের পাহাড়ে গুর্খা রেজিমেন্টের মুখোমুখি হওয়া ত্রস্ত কিশোরীর হাতে ধরা স্টেনে শেষ বুলেটটির লক্ষ্য নিয়ে দ্বিধার গল্প, ঝাড়খণ্ডের গহীন অরণ্যে রাজ্য পুলিশের রেইডের মুখে আসন্নপ্রসবা গেরিলার হাত ধরে তার মুখ চেপে ধরে রাখা প্রৌঢ় পিতার শুকনো চোখের গল্প। তার এক একটা এলোমেলো গল্পের কাছে ফিকে হয়ে আসে মাইকে ভেসে আসা অদূরে অন্য কোনো বাম নেতার একঘেয়ে হুঁশিয়ারি, সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান, সংঘাত নয় সমঝোতা চাই, দুনিয়ার মজদুর এক হও এক হও, সোনায়েদ জাকি কলিং ইনসাফি ড্যুডস অ্যাকশন অ্যাকশন ডাইরেক্ট অ্যাকশন।
অ্যাকশনের কথা শুনে বিল্লালের সম্বিত ফেরে, সে বিপ্লবের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে আশেপাশে তাকায়। দেখে, সবাই ঘিরে ধরেছে বিপ্লবকে।
তারপর অ্যাকশন শুরু হয়। আনজিরুল মহসিন খান আর জিহাদুল আসলাম ডালিম মারে ডাস কাপিটাল দিয়ে, আলেক মওলা মারে ভ্যানগার্ডের বাণ্ডিল দিয়ে, ফেনোমেনন মারে দুর্নীতি দুবৃত্তি সাম্প্রদায়িকতার হার্ড কভার দিয়ে, আর ঝানু মোহাব্বত পকেট থেকে বার করে ইস্পাতের মলাটে বাঁধাই করা ফরহাদ মগবাজারের মোকাবেলা। একটু পেছনে দাঁড়িয়ে হ্যা হ্যা করে হাসে আর উৎসাহ দেয় ফারুক গুয়েবাড়া, মার, মার শালারে, মার।
বিপ্লব লুটিয়ে পড়ে পথে। বাম নেতারা তাকে জামাতশিবিরের হিংস্রতা নিয়ে মারে। বিপ্লবের গরম রক্ত ছিটকে পড়ে তাদের সফেদ পাঞ্জাবিতে।
বিল্লাল শুনতে পায়, দূরে কোথায় যেন ঢাকের কাঠি বেজে উঠেছে। সূর্য অতি দ্রুত মুখ লুকিয়ে আড়াল করতে চায় এই হত্যাকাণ্ডকে, অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকে কয়েকজন প্রবীণ বামপন্থীর ধবধবে সাদা পোশাকে জ্বলন্ত রক্তের ফোঁটা। বুক ভরা অব্যক্ত গল্প নিয়ে বিপ্লব খুন হয়।
পেলব বিল্লাল হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। বলে, আপনারা বিপ্লবকে মেরে ফেললেন?
সবাই এবার ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায়। বিল্লাল ভয় পায় না এতটুকুও। সে আবারও বলে, আপনারা বিপ্লবকে মেরে ফেললেন?
এবার বামেরা সবাই নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে আলাপ করেন। ডাস কাপিটাল, ভ্যানগার্ড, দুর্নীতি দুর্বৃত্তি সাম্প্রদায়িকতা আর মোকাবেলা থেকে টপ টপ করে রক্ত ঝরে পড়ে পথে। নিথর স্তুপ হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে বিপ্লব।
ঢাকের কাঠির গুড়গুড় শব্দ একটু একটু করে আরো জোরালো আর স্পষ্ট হয়। তাকে ছাপিয়ে অধ্যাপক ঝানু মোহাব্বত এবার এগিয়ে এসে মিষ্টি করে বলেন, "কই, না তো?"
বিল্লাল হাহাকার করে বলে, "আপনারা বিপ্লবকে মেরে ফেললেন?"
ইনসাফ সংগ্রামীরা বিপ্লবের মৃতদেহ চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে রমনা পার্কের এঁদো জলাশয়ের দিকে এগিয়ে যায়। ঢাকের শব্দ সেদিক থেকেই ভেসে আসছে। ক্রমশ সে শব্দের প্রাবল্যে বিসর্জন যাত্রা একটা ছন্দ পেয়ে যায়। অচেনা সংগ্রামীদের কাঁধে চড়ে মৃত বিপ্লব এগিয়ে যায় জলের দিকে।
বামেরা সবাই সার বেঁধে দাঁড়ায় ঝানু মোহাব্বতের পেছনে। ঝানু মোহাব্বত হেসে বলেন, "এ বিপ্লব সে বিপ্লব নয়!"
[মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োজিত ভারতীয় কূটনীতিক দেবযানী খোবরাগাড়েকে নিয়ে কয়েকটা দিন প্রচুর কথাবার্তা হয়েছে। এই গল্পে খোবরাগাড়ে প্রাসঙ্গিক নন। তার নামটা অপ্রচলিত বলে সামান্য বদলে নিয়ে নতুন একটা শব্দ কয়েন করলাম, খুব-রগুড়ে। অর্থাৎ, অনেক রগড় ঘটায় যা, বা রগড় ঘটান যিনি। রগড়ের অর্থের মধ্যে কৌতুক, ঘর্ষণ, পেষণ, ইত্যাদি যেমন আছে, তেমনি আছে ঢাকের কাঠির আওয়াজ।]

2 comments:

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।