Tuesday, December 03, 2013

নৈনং ক্লেদয়ন্তি

পূর্বমেঘ

অচেনা বিশাল শহরের আকাশছোঁয়া সব ইমারত কৃপণের মতো ছায়া গুটিয়ে জড়ো করে যে যার পায়ের কাছে। আকাশে অগ্রহায়ণের সূর্য সাগ্রহে তাকিয়ে আছে পৃথিবীর রৌদ্রকাতর গালের দিকে। লীনা ওড়না দিয়ে নিজের মুখটা মুছে নেয় আবার। এ নগরীর রুক্ষ উষ্ণতার অন্য রূপ সে জানে, তাই কাকার অপরাধী দৃষ্টির মুখোমুখি হওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না সে।
রাস্তায় লঙ্গরখানার বাইরে ক্ষুধার্ত বালকের সারির মতো ছটফট করছে পরস্পরের গায়ে প্রায় গা ঠেকিয়ে দাঁড়ানো একেকটি যান, তাদের বনেটের ভেতর চাপা স্বরে ধুঁকছে এঞ্জিন, আর গর্ভের যাত্রীরা সবাই ছটফট করছে। লীনা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে যানজটকে পথচারীর চোখে দেখে। বড়লোকের গাড়ির ভেতরে বসে থাকা ঝকঝকে একজন দু'জন করে নারী পুরুষ। সবার চোখেমুখে ক্রোধ, মাঝে মাঝে একেকজন পাতলা কাগজের মতো রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে গিয়ে সেই ক্রোধের প্রলেপ মুছে সরিয়ে দেয়, তার নিচে দগদগে অসহায় ভীতি দেখা যায়। কিন্তু শহরের মানুষেরা আবার চট করে রেগে উঠতে জানে, তারা হাত পা নেড়ে কাঁচের ওপাশে গাড়ির নিজস্ব আবহাওয়ায় বসে কী কী যেন বলতে থাকে ফোনে। কেউ কেউ আবার কানে তার গুঁজে চুপ করে বসে থাকে। যাদের বয়স একটু কম, তারা মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে টিপতে থাকে সমানে। হয়তো তারা খু্ব এসএমএস করে। হয়তো বাড়িতে তাদের মাকে এসএমএস করে বলে, আমি ভালো আছি, একটু পর বাড়ি ফিরবো।
লীনা গাড়ির চালকদেরও মন দিয়ে দেখে, তাদের চেহারা তুলনামূলকভাবে নিরুদ্বিগ্ন। কয়েকজনের মুখে বেশ দেঁতো হাসি। কেউ কেউ একটু ক্লান্ত, বিরক্ত, স্টিয়ারিঙের ওপর তাদের আঙুল টপাটপ কোনো এক তালের ছক হারিয়ে অসংলগ্নভাবে নড়ছে। লীনা তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে ভয়ের ছাপ, রাগের আঁচড়ের দাগ খোঁজে, পায় না।
কাকা তাকে গলা চড়িয়ে ডাকে, যাবি না?
লীনা তার দুই পায়ের পাতার মাঝে মাটিতে নামিয়ে রাখা গ্যালনটা আবার তুলে নেয়। তার কাঁধটা আবার টনটন করে ওঠে। একটি ভবনের ছায়া থেকে সরে ফুটপাথ ধরে এগোতেই আবার অগ্রহায়ণের সূর্য রোদের হাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করে তাকে। এ শহর নিজের নামটি তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে অফুরান ক্লান্তি আর শ্রান্তিতে।
এ শহরেই তার বাবা আসতো, সপ্তাহে তিনদিন।
জাহেদ তার ভাইঝির হাত ধরে চুপচাপ পা চালায়। লীনার হাত থেকে গ্যালনটা সে নিতে চেয়েছে কয়েকবার, লীনা দিতে চায় না, জোর করে নিজের শরীরের সঙ্গে চেপে ধরে রাখে। সে এখন আর চেষ্টা করছে না। মেয়েটা যা চায়, তা-ই হোক।
গতকাল সেই সোনাডাঙা থেকে শুরু হয়েছে লীনার ধকল। মা তাকে দুপুরে পেট ভরে ডিমের ঝোল আর মুসুরের ডাল দিয়ে ভাত খাইয়ে দিয়েছে, যদিও জাহেদ কাকা বার বার বলেছে, অনেক দূর যেতে হবে বাসে, এতো ভাত খাওয়া ঠিক হচ্ছে না, কিন্তু মা শোনেনি। শামীম ভাই জ্বর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, বোনকে বিদায় জানানো হয়নি তার। জাহেদ কাকা ফুলতলা টেম্পো স্ট্যান্ডে পৌঁছেই তাকে বলছিলো, দেখিস, পেট গুলাবে। ধরি বসতি পারবি? লীনা জোরে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলেছে। সোনাডাঙা পর্যন্ত ধরে বসতে পারলেও বাসে উঠে বসার পর বেশিক্ষণ তার সাধ্যে কুলায়নি। জাহেদ কাকা তাকে জানালার পাশে বসিয়েছে সে কারণেই। মাঝরাত পার করে যখন দৌলতদিয়ায় এসে থেমে গেছে বাস, তখন লীনার পেটের ভেতরটা একেবারেই শূন্য।
আগে কখনও ঢাকামুখী সড়কে বাসে চড়েনি সে। অন্ধকার রাতে মহাসড়ককে এক ভীষণ অজগরের মতো মনে হচ্ছিলো লীনার কাছে, যে কেবলই গিলে খাচ্ছে পথের পাশের জমাট অন্ধকার, জোনাকির হাট, ম্রিয়মান ল্যাম্পপোস্ট, অন্ধকারে মগ্ন নিচু মাঠ, প্রকাণ্ড বাবলা আর শিমুল গাছের সারি, যার চোয়াল এক সময় গিয়ে গ্রাস করছে সোনাডাঙা টার্মিনাল। ক্রমশ সে অজগরের পেটের ভেতর ঢুকে পড়ছে সে, আর একটু পর পর তার নিজের পাকস্থলী উগড়ে দিচ্ছে বাড়ি থেকে খেয়ে আসা ভাত।
টিমটিমে বাতি জ্বালিয়ে যে ভাতের ঝুপড়ি হোটেলগুলো দৌলতদিয়া ঘাটের রাস্তায় সারি সারি দাঁড়িয়ে, তার পাশে বাসের দীর্ঘ সারিতে সে প্রথম দেখেছে, যানজট কাকে বলে। ফেরির অপেক্ষায় নিস্পন্দ দাঁড়িয়ে থাকা সেই বাসগুলোর জানালায় তারই মতো মানুষের ক্লান্ত চোখ, একটু পর পর তারই মতো কেউ না কেউ অকাতরে বমি করছে, এরই মাঝে পতঙ্গের মতো শসা, পেয়ারা, মুড়ি, সিঙ্গারা নিয়ে সেই বাসকে ঘিরে ভনভন করছে ফেরিওয়ালারা। জাহেদ তাকে আবার ভাত খেতে সাধলেও লীনা রাজি হয়নি।
লঞ্চঘাট ফেরিঘাট থেকে খুব বেশি দূরে নয়, আরও অনেকেই হাতে বা কাঁধে ব্যাগ নিয়ে সেদিকে ক্লান্ত পায়ে হাঁটছিলো। লীনার চোখ ফেরিঘাটের পেছনে সারিবদ্ধ বাসের চালকের আসনে বসা মানুষগুলোকে ত্রস্ত চোখে দেখছিলো শুধু। প্রায় সব ড্রাইভারই নেমে পড়েছে বাস থেকে, কেউ ভাতের হোটেলে ভাত খেতে গেছে, কেউ রাস্তায় পায়চারি করে বিড়ি টানছে, সিটের ওপর হেলান দিয়ে ঝিমাচ্ছে কেউ। লীনার চোখ কেবল একের পর এক বাসের চালককে ছুঁয়ে যাচ্ছিলো। জাহেদ শক্ত মুঠিতে তার হাত চেপে একটু আকর্ষণ করে বলেছিলো, আয় মা, জলদি যাই, এইখানে আর কোনো কাজ নাই আমাদের।
লীনার তৃষিত চোখ তবুও চালকের আসনগুলো আস্বাদন করে চলছিলো। কী করে এরা এ সময়ে, এতদূর বাস চালিয়ে এসে? তারা কি খায় কিছু? খেয়ে বাড়িতে ফোন করে? স্ত্রীর সাথে, কন্যার সাথে কথা বলে? বলে, আমি ভালো আছি, দৌলদ্দিয়ায় আসি পৌঁছলাম এই মাত্র, তা তোমরা খাইছো রাত্রে? এখন ঘুমাও, সকালে আবার কথা কব।
ফেরিঘাট থেকে লঞ্চঘাট পর্যন্ত আবছায়া পথটুকু ঘোরের মধ্যে কেটে যায় লীনার। তাকে পাশ কাটিয়ে ঢাকামুখী মানুষেরা জোর পায়ে এগিয়ে যায়। জাহেদ লঞ্চঘাটে পৌঁছেও তাকে আবার কিছু খেতে সাধে। লীনা বোঝে, কাকার ক্ষুধা লেগেছে। সে মৃদু স্বরে শুধু বলে, আমি পানি খাই, তুমি ভাত খায়ে নেও।
রাতের তৃতীয় প্রহরে লঞ্চের নিচে পদ্মা আস্তে আস্তে গভীর আর চঞ্চল হয়ে ওঠে তস্করের মতো, দৌলতদিয়া একটু একটু করে সারিবদ্ধ অগণিত বাস আর তাদের অচেনা চালকদের নিয়ে দূরে সরে যায়।
তারপর পাটুরিয়ায় নেমে আবার বাস ধরতে হয়। এবার আর লীনার বমি পায় না, ডিজেলপোড়া গন্ধ আর ঝাঁকুনি আর নতুন কিছু হরণ করে নিতে পারে না তার শূন্য শরীর থেকে, সে জাহেদের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। স্বপ্নে সে ফিরে যায় নিস্পন্দ নিস্তরঙ্গ ফুলতলায়।
ভোরে গাবতলিতে নেমে জাহেদ লীনাকে নিয়ে যায় তেলেভাজার দোকানে। সেখানে আরো আরো ভ্রমণক্লান্ত মানুষ ফোলা ফোলা মুখে পরোটা দিয়ে আলু ভাজি ডিম ভাজি খায়, অস্বচ্ছ সবুজাভ কাচের গ্লাস থেকে ঢকঢক করে পানি খায়, তারপর চায়ের কাপ ঠোঁটে ছুঁইয়ে সমস্ত ক্লান্তি সেখানে দ্রবীভূত করার চেষ্টা করে। লীনা কোনোমতে দুটো পরোটা খায়। জাহেদ চা খেতে খেতে শূন্য চোখে দোকানের বাইরের পৃথিবীটুকু দোকানের দরজার ফ্রেমে গেঁথে দেখে। লীনা ভাবে, বাসের ড্রাইভার লোকটা এখন কী করবে? সে কি ঘুমোবে? নাকি আবার বাস ঘুরিয়ে ফিরে যাবে পাটুরিয়ায়, পরের খ্যাপে? যদি ঘুমোয়, তো কোথায় ঘুমোবে? তার কি ঘুমোবার একটা জায়গা আছে এ শহরে? নাকি সে পথের পাশে কোথাও বাস থামিয়ে ঘুমিয়ে পড়বে ভেতরেই?
তেলেভাজার দোকান থেকে বেরোবার পর লীনার কানে শুধু এক একটা সংখ্যা চিৎকার করে বলে যেতে থাকে ঢাকা শহর। ১ নম্বর, ১০ নম্বর, ১৪ নম্বর। তার শরীরের ক্লান্ত পেশীগুলো ক্ষণে ক্ষণে স্মরণ করিয়ে দেয়, একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। লীনা হলারের ভেতরে, বাসের ভেতরে বসে এক নম্বর থেকে আরেক নম্বরে এসে নামে, তারপর আবার হলারে ওঠে, বাসে ওঠে। নম্বরের সাথে শহরটা পাল্টায় না, একই রকম অকরুণ দানবত্ব নিয়ে একটু একটু করে পিছিয়ে গিয়ে তাদের জন্য পথ করে দেয় কচুক্ষেতের, ক্যান্টনমেন্টের, কাকলীর। লীনার চারপাশে ঘনিয়ে আসে শুধু গাড়ি আর গাড়ি, তার ভেতরে হরেক পদের মানুষ, কারো চোখে শ্রান্তিজাত রক্তিমাভা, কারো চোখে ঘন রোদচশমা। এক সমুদ্র মানুষের ভিড়ে তার চোখের সামনে আস্তে আস্তে আরো কুৎসিত হতে থাকে মহানগরী, আস্তে আস্তে তার চারপাশের সড়ক ভরে ওঠে প্রকাণ্ড সব গাড়িতে, সেসব গাড়ি নবজাতকের দুঃখ নিয়ে তারস্বরে চেঁচায়, আর সমস্ত পৃথিবী কাঁপতে থাকে জলের নিচে মাছের আলোড়নে ত্রস্ত পদ্মের ডাঁটার মতো।
লীনার পৃথিবী এভাবেই কেঁপে উঠেছিলো, যখন এক শনিবার বিকেলে বাবাকে ফোন দিয়ে সে আর বাবার উত্তর শুনতে পায়নি। বরং অচেনা এক লোক তার নাম্বারে কল দিয়ে দায়সারা কণ্ঠে বলেছিলো, আপনাদের বাড়িতে পুরুষ লোক কে আছে, তারে ফোন দেন। শামীম ভাই ভুরু কুঁচকে ফোন ধরে হ্যালো বলার কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে তার মুখটা পাংশু হয়ে যায়, রুদ্ধ গলায় সে শুধু বলে, কেন, কেন, কারা করলো, কেন করলো? তারপর সে কাঁদতে থাকে তাদের চেনা পৃথিবীকে কম্পিত করে, বুক চাপড়ে শুধু বলে, আব্বারে আগুন দিয়ে মারি ফেলিছে। আগুন দিয়ে জ্যান্ত পুড়ায়ে মারি ফেলেছে আমার বাবারে। ইয়া মাবুদ, কেন?
লীনা পরে জানতে পারে, তার বাবার অপরাধ ছিলো, ইলিয়াস নামে কোনো এক হারিয়ে যাওয়া মানুষের খোঁজ না জেনেই রাজধানীর বিশ্বরোডের পাশে বাস থামিয়ে ভেতরে ঘুমিয়ে পড়া। শুক্রবার সারারাত গাড়ি চালিয়ে বাবা ঢাকায় গিয়েছে, একটু ঘুমোবে না সে? সোনাডাঙা থেকে দৌলতদিয়া, তারপর ফেরিঘাটের সেই দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা, তারপর আবার পাটুরিয়া থেকে গাবতলি হয়ে ভোরে ঈগল পরিবহনের স্ট্যান্ড পর্যন্ত বাস চালিয়ে তার বাবা কোথায় ঘুমোবে? ঢাকায় কি তাদের ঘুমোনোর জন্য কোনো ঘর আছে? বাসের ভেতর ঘুমোনো কি অপরাধ এই শহরে? ইলিয়াসের খোঁজ ষোল কোটি মানুষের কেউ দিতে পারেনি, পরে টেলিভিশনে দেখেছে লীনা। কিন্তু ইলিয়াসের লোকজন দায়ী করেছে তার বাবাকেই।
কাকলী থেকে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে সুদৃশ্য সব ভবন আর মানুষের মুখ লীনার চোখ এড়িয়ে যায়। বাবার লাশটা ফিরিয়ে আনতে গিয়েও ভুগতে হয়েছে তাদের। তার বাবাকে শুধু ইলিয়াসের লোকেরাই দায়ী করেনি, বাসের মালিকও হয়তো মনে মনে দায়ী করেছে। বাবার সাথে সাথে বাসটাও পুড়ে ছাই হয়েছে, হয়তো সেই শোকেই কাতর ছিলো কাপড়িয়া সাহেব। দুই দুইজন মন্ত্রী তার পোড়া বাবার লাশটার কাছে এসে সাংবাদিকের মাইকের সামনে কথা বলা শুরু করেছে দেখেই হয়তো চক্ষুলজ্জার খাতিরে অ্যামবুলেন্সের ভাড়াটা পকেট থেকে বার করে দিয়েছিলো লোকটা। নাহলে হয়তো জাহেদ কাকাকে তার বাবার লাশ আনার জন্য এর ওর কাছে হাত পাততে হতো। বলতে হতো, আমার ভাইয়ের দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাটা কইরে দেন আপনারা বড় মানুষেরা, আল্লাহর দোহাই লাগে।
গুলশান ২ এ নামার সময় লীনার কানে ঝনঝন করে বাজছিলো মন্ত্রীদের মেকি আহাউহু কথাগুলো। নোংরা রাজনীতি, নেতিবাচক আচরণ পরিহার, আরো কিছু গম্ভীর ঝনঝনে শব্দের নিচে ক্যামেরার সামনে লজ্জিতের মতো চাদরের নিচে সবটুকু লুকিয়ে পড়ে ছিলো তার বাবা। দুই বাঘা বাঘা মন্ত্রীর ধবধবে পাঞ্জাবি পায়জামা আর কুচকুচে মুজিব কোটের সামনে সত্যটুকু সাদায় কালোয় পরিস্ফূট হয়ে ছিলো সে দৃশ্যে, নোংরা রাজনীতি আর নেতিবাচক আচরণের খেসারত সবটুকুই লীনার বাবাকে দিতে হয়েছে। মন্ত্রীরা কথা বলতে বলতে মুখস্থ গোলগোল শব্দগুলো হারিয়ে ফেলছিলো বারবার, সাংবাদিকরা ধৈর্যভরে তাদের গোঁফের নিচে মাইক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো, এক পাশে বিরক্ত জ্বলজ্বলে চোখে দাঁড়িয়ে ছিলো বাসের মালিক, কোথাও দেখা যাচ্ছিলো না কাকাকে, আর মাঝে মাঝে করুণাভরে ক্যামেরার চোখ ফিরছিলো শায়িত বদর বেগের সজ্জিত অঙ্গারের দিকে। নোংরা রাজনীতি আর নেতিবাচক আচরণকে ঐ সাদা কাপড়টুকু দিয়ে যতোটুকু পারা যায়, ঢেকে রাখার চেষ্টা করছিলো এই শহরের মানুষেরা। দুই মন্ত্রীই টেলিভিশনের ওপাশে দেশের মানুষকে শুনিয়ে শুনিয়ে আশ্বাস দিয়েছিলেন, নিহতের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। তারপর শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে দশ হাজার টাকা ধরিয়ে দেওয়া হয় কাকার হাতে। ক্যামেরা আর মাইকের আশপাশে জড়ো হয়ে থাকা ধবধবে সাদা আর কুচকুচে কালো জামাকাপড় পরা মানুষেরা নীরবে বুঝিয়ে দেন, মাংস পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া ভাইকে নিয়ে বেড়াল পার হতে হবে জাহেদ কাকাকে।
ফুলতলায় বাবাকে ফিরিয়ে এনে কাপড় সরিয়ে নোংরা রাজনীতি আর নেতিবাচক আচরণ এক নজর দেখেছিলো লীনা। জ্ঞান ফেরার পর কাকা তাকে বলে, গোসল দেওয়ানো শেষ মা। তুই থাক, ভাইজানের কবরটা দিয়ে আসি। লীনার শুধু মনে হয়, বাবা আর কখনো দৌলতদিয়ায় থেমে ফোন করবে না তাকে, সকালে ঢাকায় পৌঁছে জিজ্ঞাসা করবে না তারা ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করেছে কি না, বাড়ি ফেরার পথে কাগজে মোড়ানো এক টুকরো তালমিছরি এনে দিয়ে বলবে না, এটা খেলি পরে পড়ালিখায় মাথা খোলে।
লীনা এক হাতে গ্যালনটা আঁকড়ে ধরে জাহেদের হাত ধরে পা চালায়। খুব বেশি দূরে নয় তার গন্তব্য।
জাহেদ থমকে দাঁড়ানোর পর লীনা ফুটপাথ থেকে মুখ তুলে প্রথমে কাকার দিকে, তারপর কাকার দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকায়। তাদের একটু সামনে ক্লান্ত পায়ে হাঁটছেন এক মহিলা। তার হাত ধরে হাঁটছে এক কিশোরী। তার হাতে একটি গ্যালন।
পিয়া অবশ্য গ্যালনটা মায়ের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে আপত্তি করে না। তার বাহু অসাড় হয়ে আছে, তাই একটু পর পর গ্যালনটা মায়ের হাতে দিয়ে সে একটু বিশ্রাম করে নেয়। বাস থেকে কাকলীতে নেমে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ ধরে হাঁটতে হয়েছে তাদের।
মা বগুড়া থেকেই বলছিলো, গ্যালনটা একেবারে ঢাকায় গিয়েই ভর্তি করতে। পিয়া রাজি হয়নি। শহরটাকে চেনে না সে, তাই যা নেওয়ার, তা একেবারে বাড়ি থেকে ভর্তি করে নেওয়াই তার কাছে ঠিক মনে হয়েছে। নাহয় একটু কষ্ট করতেই হলো, বার বার, রোজ রোজ তো আর এই কাজ করতে হবে না। কিন্তু এখন পুরো কাজী নজরুল এভিনিউ পাড়ি দিয়ে তার মনে হচ্ছে, হয়তো মায়ের কথাই ঠিক ছিলো। কিন্তু, খালি গ্যালন নিয়ে এলে এখানেই বা কোত্থেকে ভর্তি করতে পারতো সে?
অগ্রহায়ণের আকাশ মা আর মেয়েকে উদার হয়ে ক্লান্ত করে। ছায়াহীন রাজধানীর পথ ধরে তারা মন্থর পায়ে হাঁটে, গন্তব্য খুব বেশি দূরে নয়।
পিয়ার চোখে ভাসে খবরের কাগজে দেখা তার বাবার জুতো পরা পোড়া পা, বাসের জানালা দিয়ে বেরিয়ে আছে। বাবার বাকিটুকু বাসের ভেতরে আগুনের ভীষণ কুণ্ডলীতে অদৃশ্য।
মা কিংবা পিয়া, কেউই প্রথমটায় ভাবেনি, নাসিরের পরিণতি এমন হতে পারে। পাগলাটে বাবা সারাদিন গান নিয়ে থাকে, হঠাৎ হঠাৎ এখানে ওখানে চলে যায়, দূর দূরান্তের ফাংশনে গিয়ে গান গায়, এর বাড়িতে ওর বাড়িতে থাকে, দশবার কল করলে একবার ধরে বলে, হুঁ হুঁ, আসবো তো, ভাত খেয়েছিস? আসবো আমি, ভাবিস না। ফাংশন শেষ করেই আসবো। তোর মা কী করে? ভাত খেয়েছে সে? তনয় কই?
বাবার ঐ জুতোপরা পা-টুকুই খটকা জাগিয়ে আর খটকা বাঁচিয়ে রেখেছিলো। বার বার কল দেওয়ার পরও যখন সে আর ফোন ধরে না, তখন মা পত্রিকা বুকে চেপে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলো, চল পিয়া, থানায় যাই।
বগুড়া থেকে সিলেট বহুদূর। যমুনা আর মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে যেতে হয় চণ্ডীপুলে, যেখানে বাবার বাসটা পুড়িয়ে দিয়েছিলো ইলিয়াসের লোকজন। সবাই গাড়ি থেকে নেমে পালিয়ে যেতে পেরেছিলো, বাবা পারেনি। বাবা বুড়ো মানুষ, সত্তর বছর বয়স, দেখতে দেখতে বাসটাকে গিলে খেয়ে ফেলে আগুন, সাথে খায় বাবাকেও। বাবা হয়তো শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলো জানালা দিয়ে লাফিয়ে নামতে, পারেনি। তার একটা পা পৃথিবীর জন্যে জুতোটাকে রেখে গেছে, যাতে কন্যা আর স্ত্রী এসে তাকে শনাক্ত করতে পারে।
বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে মানিক পীরের টিলায় কবর হয়ে গিয়েছিলো বাবার। সেকেন্ড অফিসার আমিনুল ভদ্রভাবেই তাদের সঙ্গে কথা বলে, বাবার পরিচয়পত্র দেখতে চায়, তারপর বলে, আসেন আমাদের সঙ্গে।
থানায় জব্দ করা বাসের পোড়া কঙ্কালটা দেখিয়ে আমিনুল বলে, দেখেন আপনার বাবার কোনো জিনিস ভিতরে পান কি না। পিয়া সেই বাসের ভেতরে ছাই ঘেঁটে বাবার ঘড়ির বেল্ট আর ভিজিটিং কার্ডের অর্ধেকটা পায়। বাকি অর্ধেকের ছাই সেই বাসের ভেতরে পড়ে ছিলো, হয়তো বাবারও বাকি অর্ধেকের ছাইয়ের সঙ্গে।
পিয়া থানার টয়লেটের বেসিনে অনেক ক্ষণ ধরে হাত পরিষ্কার করার চেষ্টা করছিলো, কিন্তু তার মনে হচ্ছিলো, তার সারা শরীর একটু একটু করে ভরে যাচ্ছে বাবার ছাইয়ে।
ইলিয়াস কোথায়, বাবা জানতো না। বাবা জানতো শুধু গান। ইলিয়াসের লোকেরা যদি জিজ্ঞাসা করতো, তাহলেও হয়তো বাবার উত্তর দেওয়ার সুযোগ হতো। তারা কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। তারা জানতো, নোংরা রাজনীতি আর নেতিবাচক আচরণের জন্যে নাসিরকেই পুড়তে হবে। একের পর এক মোটর সাইকেলে চড়ে জোড়ায় জোড়ায় এসে শিবিরের ছেলেরা বাসে নিষ্ঠার সঙ্গে আগুন ধরিয়ে ফিরে গেছে দক্ষিণ সুরমায়।
পিয়া মায়ের হাত থেকে আবার গ্যালনটা নিজের হাতে নেয়। অগ্রহায়ণের আকাশের নিচে জ্বলতে থাকে ছায়াহীন নগর। তার নিচে পিয়া দেখতে পায়, অদূরে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক আস্তে আস্তে এগোচ্ছেন। তার অবসন্ন হাতে ঝুলছে একটা গ্যালন।
রমজানকে মনু আসতে দিতে চায়নি। বার বার বলছিলো, যাইয়েন না। আবার যদি আগুন দেয়, এইবার যদি আপনে মরেন? পোলাটারে তো মাইরা ফালাইলো, যাইয়েন না, বাড়িতে থাকেন, বাড়িতে।
রমজান তবুও বের হয়েছে। মনুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছে, লিখনরে দেইখো। আমার কিচ্ছু হইব না। কতদিন বাড়িতে বইসা থাকন যাইব? বাইর তো হইতেই হইব। আইতাছি আমি।
লিখন বাবাকে ছাড়তে চায় না তবু, সে এসে পা জড়িয়ে ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ভাইয়া মরে যাওয়ায় সে এখন খাটের পুরোটা অংশ জুড়ে শুতে পারে ঠিকই, কিন্তু রাতের বেলা তার ভয় করে। আগে ভাইয়ার ওপর ঘুমের ঘোরে পা তুলে দিলে ভাইয়া ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতো, বলতো, এই লিখন, সইরা ঘুমাও, ঠিকমত ঘুমাও। গায়ে পা দিও না। এখন ঐ শূন্যতার ধাক্কায় লিখনের ঘুম ভেঙে যায়, সে রাতের বেলা মাঝে মাঝে উঠে মাকে ডাকে। মনু পাগলের মতো ছুটে আসে, বলে, কী হইছে, কী হইছে লিখন? কই আগুন লাগছে?
অনেকটা জোর করেই লিখনকে নিজের শরীর থেকে ঠেলে দূরে সরিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছে রমজান। বারবার পেছনে তাকিয়ে দেখে, দরজার চৌকাঠে মাথা ঠেকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে মনু, তার গালে বিশীর্ণা নদীর মতো অশ্রুর হলরেখা, তার দৃষ্টি অনির্দিষ্ট অতীতের দিকে। লিখন মায়ের কোমরে মাথা ঠেকিয়ে রমজানকে দেখে, বাবা ঘাড় ফেরালে সে হাত নাড়ে।

রমজান গ্যালনটা নিয়ে জোরে পা চালায়। কালিয়াকৈর থেকেই গ্যালনটা ভর্তি করে এনেছে সে। গুলশানে কোথায় সে এই গ্যালন ভর্তি করবে?
ছেলেটা ঢাকা দেখেনি। বারবার ঘ্যান ঘ্যান করছিলো, চলো না আব্বা, নিয়া চলো। আমি তোমারে মাল তুলতে হেল্প করমুনি। ঢাকা দেইখা আসি, চলো।
ঢাকা দেখতে সমস্যা হয়নি কোনো। সেদিন নগরীতে উত্তাপ ছিলো, নিরুদ্বেগ ব্যস্ততাও ছিলো। নির্বিঘ্নেই ঢাকা দেখেছে রমজানের ছেলে, সদরঘাট দেখেছে, মোগলাই পরোটা আর পেপসি খেয়েছে এক দোকানে। ফেরার পথে গাজীপুর চৌরাস্তায় বসে বাপ ব্যাটা এক সঙ্গে নাস্তাও খেয়েছে। ডিম ভাজা দিয়ে পরোটা খেতে খেতে নিউজিল্যান্ড নিয়ে বকবক করছিলো ছেলেটা। কিচ্ছু পারে না এডি, আমাগো মাশরাফি আর সোহাগ গাজী আর রুবেল কি বলিং করছে, হ্যারা সবডি ম্যাচ হাইরা গেছে। বাংলাওয়াশ।
ছেলেকে ভ্যানের ভেতর বসিয়ে রাস্তাটা একটু উজিয়ে দেখতে যাওয়াই ভুল হয়েছিলো রমজানের। মিনিট পাঁচেক পর ফিরে এসে সে দেখে, যেখানে তার গাড়িটা থাকার কথা, সেখানে এক ভীষণ আগুনের কুণ্ড। আর তার পাশে রাস্তায় হাত পা ছড়িয়ে ছাই মাখা সঙের মতো কে যেন বসে। কাছে এসে তার বুক ধক করে ওঠে, কারণ ঐ গাড়িটা তারই ভ্যান, আর ঐ সং তারই দগ্ধ পুত্র। ছেলেটা কাঁপছিলো ঝড়ে সুপারি গাছের পাতার মতো, মুখে কোনো কথা নেই, একটা অস্পষ্ট অবিরাম গোঙানি শুধু শোনা যাচ্ছিলো। আশেপাশের লোকজন তাড়াতাড়ি অ্যামবুলেন্সে খবর দিয়ে বলেছিলো, ভাই ঢাকা মেডিকেলে লইয়া যান, দেখেন আল্লাহ রহম করে কি না। নিজেদের মাঝে নিচু স্বরে তারা কী বলছে, সেটাও রমজান শুনতে পেয়েছিলো।
তবুও বৃন্ত যেমন ফুলকে ধরে রাখে, সেভাবে আশা ধরে রাখে জীবনকে। বার্ন ইউনিটের ডাক্তারদের দেখে রমজান ভেবেছিলো, ছেলেকে নিয়েই বাড়ি ফিরতে পারবে সে। ছেলেটা তিন দিন ধরে শুধু গোঙাচ্ছিলো, ডাকছিলো আল্লাহকে, প্রত্যুত্তর শোনার ফুরসতও তার ছিলো না। ভোরের দিকে বাবাকে বলেছিলো, আব্বা, বাসায় যামু, বাসায় নিয়া চলো আব্বা, বাসায় যামু, মার কাছে যামু আব্বা। রমজানের মনের ভেতরে সামান্য একটু আশা বিশাল নিরাশাকে গলা টিপে ধরে বলছিলো, ছেলেটা ভালো হয়ে যাবে, ওকে একটা ক্রিকেট ব্যাট কিনে দিও, ভালো হয়ে যাবে ছেলে। কিন্তু ভোর যখন আরো পরিস্ফূট হয়, হাসপাতালের পাশে গাছের শাখায় মদকল পাখির গান শোনা যায়, তখন শেষবারের মতো খিঁচুনি দিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যান্ডেজে মোড়া বাচ্চা ছেলেটা নিথর হয়ে যায়। ইলিয়াসের খোঁজ না জানার অপরাধেই কি জাতীয়তাবাদ আর ইসলামের বরকন্দাজরা পুড়িয়ে মারলো তাকে? নাকি নির্দলীয় সরকারের জন্যে একটাও নিরপেক্ষ লোকের নাম না জানার পাপে? অথবা সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হয়ে যাওয়ার সময় বাড়ি থেকে দূরে সন্ধ্যা পর্যন্ত কালৈয়াকৈরের গহীনে শালবন কেটে বানানো চকে ক্রিকেট খেলার স্পর্ধার শাস্তি দেওয়া হলো ওকে? ওর বেলায় অজুহাতটা কী ছিলো আসলে?
রমজান নিজের বাহুতে চোখ মুছে পা চালায়, তার হাতের গ্যালন হঠাৎ ত্বরণে একটু দুলে ওঠে।
রমজান দেখতে পায়, কয়েক গজ সামনে শ্লথ গথিতে পথ চলছে এক বোরখা পরা উত্তরযৌবনা, তার হাতে ধরা একটি গ্যালন। তার সামনে এক লুঙ্গি পাঞ্জাবি স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরিহিত বৃদ্ধ, তারও হাতে গ্যালন। তার সামনে আরো একজন। এবং আরো একজন। এবং আরো গ্যালন হাতে মানুষের সারি সামনে।

উত্তরমেঘ

অলকার প্রাসাদের মতো সুদৃশ্য বাড়িটির সামনে উর্দিপরা আর উর্দিছাড়া বলিষ্ঠ মানুষের ভিড়। ভিড়ের ফাঁকে বিদ্যুতের মতো দীপ্তিময়ী সুন্দরী রমণীও আছেন দুয়েকজন।
ইন্দ্রধনুর বিচিত্র বর্ণ নিয়ে সে প্রাসাদের দেয়াল সজ্জিত। কৃপাপ্রার্থী নারীদের হাতে সেখানে লীলাকমল, তাদের কেশপাশে কুন্দপুষ্প, লোধ্রপুষ্পের পরাগে তাদের মুখ পাণ্ডুর। সদাপুষ্পময় অলকার বৃক্ষের মতো সে প্রাসাদের চারপাশে মধুলোভী উন্মত্ত ভ্রমরকূলের মতো নেতা আর কর্মীদের সমাগম। দীপ্তিময় পুচ্ছের গৃহময়ূরের মতো সেখানে উপদেষ্টারা বিরাজমান, তাদের কেকাধ্বনিতে চারদিক মুখরিত। সেখানে আনন্দ থেকেই অশ্রু দেখা দেয়, অন্য কোনো কারণে নয়, সেখানে বেদনার একমাত্র কারণ পুষ্পশরাঘাত, তাও প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ক্ষণিকের মাঝে তার মোচন হয়।
ক্রুদ্ধ কর্মীরা সে প্রাসাদের বাইরে গুঞ্জন করছে, সরকার পানির লাইন কেটে দিয়েছে। সকাল থেকে ম্যাডামের বাড়িতে পানি নাই। উপস্থিত পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনারের কাছে গিয়ে কৈফিয়ত দাবি করছে কেউ কেউ, কেউ কেউ বাড়ির আশপাশের পথে ক্ষণস্থায়ী মিছিল করছে, সিটি করপোরেশন কেন এখনও পানির ট্যাঙ্কার পাঠালো না, এ নিয়ে মোবাইল ফোনে ত্রস্ত উদ্বেগে উঁচু গলায় কথা বলছেন নেতাস্থানীয়রা।
দূরান্ত থেকে গ্যালন হাতে শোকশ্রান্ত মানুষের সারি এসে জমতে শুরু করে সে প্রাসাদের সামনে। পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া মানুষদের স্বজনেরা জানেন, এ প্রাসাদে বাস করেন কোনো এক বিরহী যক্ষী, আসনবিরহে যার বাহু থেকে শিথিল হয়ে পড়েছে স্বর্ণবলয়। দুইদিন ধরে তার কর্মীরা গর্জন করছেন, ম্যাডামের বাড়িতে পানি নেই।
সে প্রাসাদের বাইরে বলিষ্ঠ যুবাদের প্রহরা, তাদের প্রহরার স্তর শেষে পুলিশের প্রাচীর, সে প্রাচীরের ওপারে বিশেষ সিকিউরিটি ফোর্সের অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের চক্রব্যূহ, আর সে চক্রব্যূহের কেন্দ্রে প্রাসাদের ভেতরে বিরহী যক্ষী এক প্রস্তরকঠিন নির্বিকার নিষ্করুণ ভালোবাসাহীন অনীহার অর্গল তুলে পাহারা দিচ্ছেন কোনো এক ভীষণ দুর্নিবার আগুনের শিখাকে, যে আগুন কেবল ছড়িয়ে পড়ে জনপদ থেকে জনপদে, শকট থেকে শকটে, মানুষ থেকে মানুষে।
স্বজনের অঙ্গার হাত থেকে মুছতে না পেরে স্বজনেরা সবাই এক এক গ্যালন পানি বয়ে এনেছেন যক্ষীর কাছে। সে প্রাসাদে সরকারবাহিত পানি যদি না-ও আসে, অগ্রহায়ণের আকাশের সূর্যকে ঢেকে কোনো মেঘ যদি না-ও ভাসে, নরমেধ যজ্ঞের ঐ শিখাটুকু কি তাদের নৈবেদ্যে নিভবে না? ভূমি ভেদ করে ভূকন্দলী ফুল বেরিয়ে এসে কি বলবে না, এবার পৃথিবী অবন্ধ্যা হবে?

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।