Sunday, December 22, 2013

হাদুল্লাপুরে ওম শান্তি

বড় বড় খবরের কাগজের বড় বড় সম্পাদকেরা সম্পাদকীয় পর্ষদে আলোচনা করেন ব্যাপারটা নিয়ে। বড় বড় টেবিলের এপারে ওপারে বড় বড় সাংবাদিকেরা ঘটনার সব চুল এক এক করে ছেঁড়েন, তারপর চেরেন। ছোটো ছোটো পিয়নেরা মাঝারি আকৃতির ট্রেতে করে কয়েক দফা ছোটো ছোটো কাপে চা আর ছোটো ছোটো পিরিচে কেক-বিস্কুট দিয়ে যায়। মোটামুটি বড় বড় মিটিং রুমের বাতাসে বড় বড় গোল গোল শব্দ ইতস্তত ভেসে বেড়ায়।
তারপর সকলেই ঐকমত্যে পৌঁছান, খবরটা যেতে পারে। বড় বড় কলামিস্টদের মোবাইলে ছোটো ছোটো বার্তা যায়, এ নিয়ে বড় বড় বিশ্লেষণধর্মী স্তম্ভ রচতে হবে। আধুনিকরা ল্যাপটপে হামলে পড়েন, বুড়ো বুড়ো কয়েকজন জলছাপ মারা প্যাডে কলম নিয়ে ঝুঁকে বসেন। স্ক্রিনে আর পাতায় ফুটে উঠতে থাকে বড় বড় কথা।
হাদুল্লাপুরে আম্লীগ ও বিম্পি এক টেবিলে বসেছে অবশেষে। তারা সিদ্ধান্তে এসেছে, এখন থেকে দুই যুযুধান দল মিলে মিশে নাশকতা প্রতিরোধ করবে। আর এই দুই দলকে এক টেবিলে বসিয়েছেন হাদুল্লাপুরের সাংবাদিকরাই। আর ছোট্টো হাদুল্লাপুরের ছোট্টো প্রেসক্লাবে রাতবিরাতে অনুষ্ঠিত সুদীর্ঘ মিটিঙের খবর বড় ঢাকার বড় বড় খবরের কাগজগুলোর টনক একেবারে টনটনিয়ে ছাড়ে।
জামাত-শিবিরের খুনীরা গত সপ্তাহেই হাদুল্লাপুরের দামালপুর বাজারে আম্লীগের এক বড় নেতাকে ধরে কসাইকোপান কুপিয়েছে। আহত শেখ ফটিক এখনও হাসপাতালে। তার শরীরে সেলাইয়ের দাগে দাগে ফুটে আছে ফাঁসির অপেক্ষায় প্রহর গোণা মুজাহিদ-কামারুজ্জামান-সাঈদীর কুটিল ভ্রুকুটি। শেখ ফটিকের গা ধরে বসে আছে কখনও তার স্ত্রী, কখনও সন্তান, শিয়রের কাছে হাসপাতালের খাটের হুকে সর্বক্ষণ ব্যঙ্গমী হয়ে ঝুলতে থাকা স্যালাইনের ব্যাগ।
জামাত-শিবিরের খুনীরা কসাইপনা সেরে নির্বিঘ্নে সটকে পড়ে, রাস্তায় পড়ে থাকে শেখ ফটিকের রক্তাক্ত শরীর, আর সে শরীরের দিকে তাকিয়ে দেঁতো হাসে হাদুল্লাপুর সদরে বিম্পি নেতা উকিল টিপু সুলতানের বাড়িটা। বাজার থেকে একদল মানুষ শেখ ফটিককে ধরাধরি করে রিকশায় বসিয়ে নিয়ে যায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, আরেক দল এগিয়ে যায় টিপু উকিলের বাড়ির দিকে। সে বাড়ি যাওয়ার পথেই পড়ে বিম্পির আরেক নেতা বাতেন ভুট্টোর আটার কল আর সিমেন্টের দোকান। একটা মুদি দোকানও পড়ে সে পথে, যার সামনে দিয়ে আরোহীর কোলে নেতিয়ে পড়া শেখ ফটিক পথে রক্তের ফোঁটা ছড়াতে ছড়াতে চলে যায়। মুদি দোকানি ঝাঁপটা নামিয়ে বেরিয়ে আসে, হাতে কেরোসিনের টিন। হাদুল্লাপুর বাজারে মানুষের মিছিল আস্তে আস্তে দীর্ঘ হয়।
একটু পর টিপু সুলতান উকিলের বাড়ি দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। বাতেন ভুট্টোর আটার কল আর সিমেন্টের দোকানও সাড়া দেয় সে সংলাপে। বাতেনের মোটর সাইকেলটা একা একা পোড়ে এক কোণায়।
প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকেরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে জেলার বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা শেখ ফটিককে অস্ত্রোপচারের পর দেখে ফিরে আসে টিপু সুলতানের পোড়া বাড়িটা এক নজর সরজমিন ঘুরে দেখতে। বাতেন ভুট্টোর আটার কল আর সিমেন্টের দোকানটাও তাদের যাওয়ার পথেই পড়ে। তারপর তারা আম্লীগ আর বিম্পির বাকি নেতাদের মোবাইলে কল দেয়। বলে, বাহে অ্যানা আইসেন, সগলায় বসিয়া কতা কই।
ভাইদের একদল শেখ ফটিককে দেখতে গিয়েছিলেন জেলা শহরে, তারা আপত্তি করেন না। ভাইদের যে দল টিপু সুলতানের বাড়ি এক নজর ঘুরে দেখে এসেছেন, তারাও রাজি হয়ে যান।
প্রেসক্লাবে রাতের বেলা কেউ রিকশায়, কেউ সাইকেলে, কেউ সদলে পায়ে হেঁটে অগ্রহায়ণের শেষ ভাগের রাতের কুয়াশা আর শীত ঠেলে চলে আসেন। আম্লীগ আর বিম্পির নানা উপসর্গখচিত দলের সভাপতি সাধারণ সম্পাদকেরাও আসেন। সকলেই একটু ক্লান্ত, আর গম্ভীর। মাফলারের পেছনে তারা উৎকণ্ঠিত ঢোঁক গেলেন, একে অন্যের দিকে আড়ে আড়ে চান।
হাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোটর সাইকেলে তালা দিয়ে গটগট করে ভেতরে ঢোকেন। বণিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্জ একাব্বর হোসেন, ব্যবসায়ী মকিম ভরসা, ইউনিয়ন পরিষদের সভাপতি সৈয়দ আলি হায়দার, সকলেই গাড়িতে চড়ে আসেন, আরো কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে।
বৈঠক চলে। হাদুল্লাপুরের ছোট্টো প্রেসক্লাবের ছোট্টো বায়ুমণ্ডলে অনেক ছোটো ছোটো কথা ইতস্তত ভাসে। কিছু কথা একটু বেশি সময় ধরে বুদ্বুদ হয়ে ভেসে থাকে, কিছু কথার বুদ্বুদ চট করে ফেটে যায়।
দূরে জেলা শহরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেখ ফটিক কাতরায়। ডিউটি নার্স কর্কশ কণ্ঠে তার শিয়রে অপেক্ষমান ছেলেকে কী একটা হুকুম দেয়, পাশের বেডে আরেক রোগী কাতরায়, হাসপাতালের পাশের গলিতে একটা বেড়াল আরেকটা বেড়ালকে ধমকায়। ছোট্টো হাদুল্লাপুরের ছোট্টো প্রেসক্লাবে শেখ ফটিকের নাম কয়েকবার উচ্চারিত হয়, বিম্পির নেতারা স্বীকার করেন, কোরবানির গরুর মতো একজন মানুষের বাজারে খোলা আকাশের নিচে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে থাকা সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। আম্লীগ নেতারা স্বীকার করেন, টিপু সুলতানের বাড়ি কোনো দোষ করেনি, যেমন দোষ করেনি বাতেন ভুট্টোর আটার কল, সিমেন্টের দোকান, বা তার মোটর সাইকেলটি।
হাদুল্লাপুর বিম্পির সাধারণ সম্পাদক ওমর আলি পল্টু দীর্ঘ আলোচনার পর চামড়ার জ্যাকেটের ভেতর থেকে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বলেন, হাদুল্লাপুরে মাইনষের জানের উপ্রে, মালের উপ্রে কোনো ক্ষতি আইসে, অ্যাঙ্কা কাম হামরা কক্ষনো করোং নাই, কোরব্যারো নোং। হামরা তো মানুষ, নাকি? মানুষ হয়া ভাই, মাইনষের সাতে অ্যাঙ্কা কেউ করে?
আম্লীগ সভাপতি ইয়াসিন ব্যাপারি বলেন, আজনীতি কল্লে এট্টু-আট্টু মতের অমিল তো হবারই পারে। তার জন্যে তো মিছিল হয়, মিটিং হয়। আগাআগি চিল্লাচিল্লি সবে হয়। কিন্তু মাইনষোক জবো করা বা দোকানপাট ঘরবাড়ি পুড়ি দেওয়া যত কম হয় তত ভালো।
হাদুল্লাপুরের ছোট্টো প্রেসক্লাবের বাইরে রাত ভরে ওঠে কুয়াশায়। বারান্দার বাইরে রাখা সাইকেল, মোটর সাইকেল আর গাড়িগুলো গোপনে হিমে কাঁপে। নারকেল গাছে একটা ক্লান্ত প্যাঁচাকে ঠোকরায় কয়েকটা ক্রুদ্ধ কাক। জানালার বাইরে সোয়েটারে, চাদরে, মাফলারে ওম খোঁজা সাধারণ মানুষ কান পেতে শোনে, প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা কী কী যেন বলছেন, তাদের শীতে অবশ নাকে প্রেসক্লাবের জানালা গলে ভেসে আসা বাতাস আশার স্ফূলিঙ্গের ছোঁয়াচ দেয়।
হাদুল্লাপুর থানার ওসি গলা খাঁকরে চড়া গলায় বলে, হাদুল্লাপুরের প্রেসক্লাব যে শান্তির উদ্যোগ নিলো, তা সারাদেশে মডেল হয়ে থাকবে।
এরপর আরো অনেকে অনেক কথা বলতে থাকেন। বাড়ির মালিক, গাড়ির মালিক, কলের মালিক, দোকানের মালিকরা একটু জোর দেন শান্তির ওপরে। বিম্পি নেতার দোকান আর বিম্পি নেতার মাকানের ওপর হামলা ঘটার পরই কেবল হাদুল্লাপুর টের পায়, শান্তি রক্ষা করতে হবে, নাশকতা রুখতে হবে। হাদুল্লাপুর ঝিম ধরে থেকে সে শান্তির কথা শোনে।
প্রেসক্লাবে শান্তি চুক্তির ওপাশে ঝোপের আড়ালে ত্রস্ত পায়ে ছুটে যায় কে যেন। জামাত? শেয়াল? মতিউর রহমান? বোঝা যায় না।

কিছু সংলাপ উত্তরবঙ্গে চলতি ভাষায় অনুবাদ করে দেওয়ার জন্যে প্রদীপকে ধন্যবাদ।

1 comment:

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।