Friday, May 17, 2013

আশাকর্পূর


কয়েকদিন আগেও এটা ছিলো একটা স্কুল। এর মাঠে সকালে ঘুম ঘুম চোখে সারি বাঁধা ছেলেমেয়েদের সামনে দপ্তরীর হাতের দায়সারা টানে আকাশে এক মন্থর ভূবন চিলের মতো ডানা মেলতো সবুজের মাঝে লাল একটি বৃত্ত, সহকারী প্রধান শিক্ষকের গম্ভীর আদেশের পর অনেক বিপথগামী কণ্ঠের মাঝে পাশের আমগাছের পাতায় কাঁপন ধরাতো কী শোভা কী ছায়া গো কী স্নেহ কী মায়া গো।
কী আঁচল মৃত্যু এসে বিছিয়ে দিয়ে গেলো স্কুলের মাঠে। এখন আর এটি মাঠ নেই, শবাগারে পরিণত হয়েছে। একটু পর পর সেনাবাহিনীর ছাপ্পড় মারা চটের বড় ব্যাগে বাহিত হয়ে মাঠে এসে যোগ হচ্ছে গলিত শব।
মৃত্যু এসে স্কুলের ঘন্টায় সশব্দ টোকা দিয়ে জানিয়েছে, ছুটি। আগামী কয়েকদিন আর আসতে হবে না স্কুলে।
বাতাসে গলিত লাশের তীব্র গন্ধ একটু পর পর স্রোতের টানে ছুটে যাচ্ছে স্কুলের বারান্দায় জবুথবু হয়ে বসে থাকা মানুষের দিকে। এক একটা মৃতদেহ স্কুলের মাঠে এসে জড়ো হলে এরা টলোমলো পায়ে উঠে দাঁড়ায়, ছুটে যায়। লাশের গন্ধে স্থবির হয়ে পড়া আম গাছের পাতা ক্ষীণ আন্দোলনে জীবনে শেখা একমাত্র গানের কলির স্মৃতি মন্থন করে, কী স্নেহ কী মায়া গো।
ধ্বসে পড়া ভবনটি তার আলিঙ্গন থেকে একটু একটু করে অর্গল খুলে উগড়ে দিচ্ছে মৃতদেহ। বৈশাখ তার সবটুকু দাপট নিয়ে অণুজীবের কাজ সহজ করে তুলেছে, উদ্ধারকর্মীদের হাতের দস্তানায় উঠে আসছে গলে যাওয়া চামড়া আর মাংস। চটের ব্যাগ থেকে বেরিয়ে আছে শবের প্রকাশিত অস্থি, তার কোনোটিতে সস্তা স্বর্ণানুকৃতির চুড়ি, কোনোটিতে কালচে হয়ে আসা নূপুর, সস্তা প্লাস্টিকের ডিজিটাল ঘড়ি। স্কুলের বারান্দা থেকে উঠে আসা মানুষেরা ঠাহর করতে পারে না, এই গলিত মাংসের মাঝে হলদে হাড়গুলোর কোনটা তাদের কন্যার, স্ত্রীর, বোনের।
তারপরও একটি বালিকা চিনে ফেলে তার মাকে। জীবন যে রূপবৈভিন্ন্য তৈরি করেছিলো, গার্মেন্টস কারখানার চাকরি আর ধ্বসে পড়া দালান মৃত্যুর তুলি বুলিয়ে সেই সামান্য বিভেদ ঘুচিয়ে চটের ব্যাগগুলোতে সব গলিত মাংসের রং খয়েরি আর সব হাড় হলুদ রঙে রাঙিয়েছে, কিন্তু সালোয়ারের জড় নকশায় বিশেষ পরিবর্তন আসেনি। কাপড় দেখে অভুক্ত মেয়েটি অস্ফূট কণ্ঠে গুঙিয়ে ওঠে, মা, ও মা, মা? তার সঙ্গে আসা মধ্যবয়স্কা নারী মুখে কাপড় গুঁজে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকেন, বালিকাটি তাকে জড়িয়ে ধরে স্কুলের পাশের আমগাছের পাতাকে শেখায় আরেকটি নতুন সুর। বাতাসে লাশের জমাট গন্ধ কেটে যায় মেয়েটির কান্নার সুরে, স্কুলের মাঠে বাতাস কেঁপে কেঁপে বলে, মা, ও মা, মা গো। মধ্যবয়স্কা মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে অব্যক্ত শব্দে ফোঁপায়। হয়তো মনে মনে ভাবে, আরো অনেক সালোয়ার থাকা উচিত ছিলো নিহত যুবতীর, তার কন্যার স্মরণশক্তিকে পরাস্ত করার মতো সংখ্যায়। আলনায় রাখা মায়ের সবক'টি সালোয়ারের নকশাই বালিকার চেনা। সে ভুল করে শুধু দেখে ফেলেছে, করোটির ওপর গলিত মাংস হয়ে যাওয়া মায়ের মুখটি।
আমগাছের পাতা শিহরিত হয় কান্নার শব্দে। মা, তোর বদনখানি মলিন হলে?
বালিকাটি তার আত্মীয়াকে জড়িয়ে ধরে ফিরে যায় কম্পিত শরীরে। বাকিরা কান্নার সুযোগ খোঁজে চটের ব্যাগ থেকে চটের ব্যাগে। দূরের গ্রাম থেকে আসা পিতা জানেন না, কন্যার সালোয়ার কেমন, তাই একের পর এক গলিত মুখ দেখে চলেন। একটিও তাঁর কাছে পরিচিত মনে হয় না। তাঁর কন্যাটির ঈষৎ স্ফূরিত ঠোঁট, বাঁশির মতো নাক, হনুর উঁচু হাড়কে তিনি খুঁজে পান না। তাঁর বালক পুত্রটি স্কুলের মাঠে একটি গাছের ডাল কুড়িয়ে পেয়েছে, সে বোনকে চটের ব্যাগের ভেতর খোঁজে না, একটু পর পর তেড়ে যায় আমগাছের ডাল থেকে নেমে আসা রোমাঞ্চাভিলাষী কাকের দিকে। বাতাসে শবের গন্ধ এলাকার অনেক কাককে আমগাছটির নিয়মিত সান্নিধ্যচারী করে তুলেছে। যখন লাশের অধিকার বুঝে নিতে সমাগত মানুষেরা আবার ফিরে যাবে স্কুলের বারান্দায়, কাকগুলো হালকা চক্কর দিয়ে, কয়েক পা নেচে একটু একটু করে ফিরে আসবে পছন্দসই শববাহী ব্যাগের ওপর, সুযোগ পেলে দুয়েকটা ঠোকরও দেবে।
বালকটি গতকাল রাতের পর আর কিছু খায়নি। তার অভুক্ত শরীরে সঞ্চিত ক্রোধ কেবল হাতের পেশীকে সচল রাখে, সে একটু পর পর দুর্বল পায়ে ছুটে গিয়ে লাঠি নেড়ে বলে, হেই হুশ হুশ যা যা যা।
টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকরা অনেকেই স্পট থেকে বিদায় নিয়েছে বাতাসে লাশের গন্ধ প্রকট হওয়ার পর। কয়েকজন রয়ে গেছে, তারা দূরে পায়চারি করছে ক্লান্ত পায়ে, মাঝে মাঝে সেনাবাহিনীর নিম্নতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলছে, কিংবা হঠাৎ উপস্থিত কোনো হোমরাচোমরার দেখা পেলে ছুটে যাচ্ছে মাইক হাতে, পেছন পেছন অবসন্ন পায়ে ছুটছে তাদের ক্যামেরাচালক। মধ্যবয়স্কা পোড় খাওয়া উচ্চপদস্থ এক নারী সাংবাদিক স্কুলের মাঠে নাকে ওড়না পেঁচিয়ে নিষ্কম্প দাঁড়িয়ে আছেন কেবল, বাতাসে লাশের গন্ধ তাকে বিচলিত করার জন্যে যথেষ্ট নয়। হাতের ইশারায় সঙ্গী ক্যামেরাচালককে বালকের কাক তাড়ানোর দৃশ্য ধারণ করতে বলেন তিনি।
বালকটির তাড়া খেয়ে কাকগুলো প্রথমে নাচে তিড়িক তিড়িক, তারপর শেষ মুহূর্তে বাতাসে ডানা ভাসিয়ে উড়াল দেয়। তাচ্ছিল্যমাখানো কা কা ডাক ডাকে দুয়েকটা কাক। নারী সাংবাদিক চুপচাপ সে দৃশ্য দেখেন। কাকগুলোকে চেনা মনে হয় তার কাছে।
স্কুলের মাঠে বাতাস এসে দোল খায়, লাশের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসের হাত ধরে। স্বেচ্ছাসেবী এক তরুণী নাকে মুখোশ বেঁধে পলিথিন ব্যাগ থেকে কর্পূরের টুকরো বার করে এক এক করে সব চটের ব্যাগে ছড়িয়ে দিতে থাকেন।
আরেকটি বালক তার বাবার সঙ্গে চলতে চলতে থমকে দাঁড়িয়ে যায় হঠাৎ। তার বাবা নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে দেখে একটি চটের ব্যাগ থেকে বেরিয়ে আসা সালোয়ার। তারপর গলায় ঝোলানো গামছা দিয়ে প্রথমে চোখ, তারপর নাক ঢাকে।
বালকটি তার বাবার হাত চেপে ধরে শুধু। শবের গন্ধে তার চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে।
কর্পূর ছড়াতে ছড়াতে এগিয়ে আসা মেয়েটিকে সে হাতছানি দিয়ে ডাকে তারপর। বলে, আপা, এইখানে একটু দেন।
মেয়েটি মুহূর্তমাত্র নষ্ট না করে ছুটে এগিয়ে আসে। তার ব্যাগ থেকে আঁজলা ভরে কর্পূর সে ছড়িয়ে দিতে থাকে ব্যাগটির ওপর। কর্পূরের ভারি, মিষ্টি, ঝাঁঝালো গন্ধ লড়াই করতে থাকে বালকটির মায়ের গলিত শবের সঙ্গে। নিচু গলায় তরুণী প্রশ্ন করে, উনি কে?
বালক নিম্নস্বরে শুধু বলে, মা।
মেয়েটি ফিরে যাওয়ার আগে আরেক আঁজলা কর্পূর ছড়িয়ে দিয়ে যায়। আমগাছের পাতা কাকের পায়ের ভারে কেঁপে ওঠে, ও মা ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে, মরি হায় হায় রে ও মা।
বালকের পিতা তাকে দুর্বল হাতে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে স্কুলের মাঠে। ক্ষুধা এসে পরাস্ত করে তাদের শোককে, অভুক্ত পিতাপুত্র শুষ্ক চোখে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে নিহত গার্মেন্টস কর্মী যুবতীর শবের সামনে। ছড়ানো কর্পূর একটু একটু করে উবে যেতে থাকে বাতাসে।
স্কুলের মাঠে শবের সারিতে রোদ ঢালে আকাশ। আকাশে ঈশ্বর নেই। নেই শকুনও। তারা থাকে আরো দক্ষিণে, দূরে, শহরে।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।