Friday, May 03, 2013

উদ্ধারকাজে নিজস্ব প্রযুক্তি ও কৌশল উদ্ভাবন আশু প্রয়োজন

রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনা আমাদের মনে একটি স্থায়ী ছাপ ফেলে রেখে গেলেও এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে আমাদের প্রতিক্রিয়া কী আর কেমন হবে, তা নিয়ে এখনই নীতিনির্ধারকদের জরুরি ভিত্তিতে হোমওয়ার্ক করা প্রয়োজন। আর এ ব্যাপারে উদ্ধারকাজে জড়িত পেশাদার ও স্বেচ্ছাসেবীদের ডেকে একটি গণশুনানি করা হলে তারা উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা আর অভাবের মুখোমুখি হয়েছেন, সেগুলোও সমন্বিত হবে।
রানা প্লাজা ধ্বস নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে, এবং অতীতের আর সব প্রতিবেদনের মতোই সেগুলোর ওপর ধূলোর স্তর পুরু হবে। যেহেতু এই গোটা ঘটনাটিই ঘটেছে কর্তৃপক্ষীয় গাফিলতি আর দুর্নীতির কারণে, এই একই কর্তৃপক্ষকে তাই আর জনচক্ষুর অন্তরালে কোনো নীতি নির্ধারণের সুযোগ দেওয়ার কোনো অর্থ নেই। কী করা হবে সামনে, তা সারা বাংলাদেশের মানুষকে দফায় দফায় জানিয়ে স্থির করতে হবে।
উদ্ধার কার্যক্রমে প্রযুক্তি ও কৌশলের অভাব বা যথাযথ প্রয়োগের অভাব আমরা একাধিকবার প্রত্যক্ষ করেছি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কিছু ভুল ঘটবে না, এমন প্রত্যাশাও করা উচিত নয়। কিন্তু সেসব ত্রুটি বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতের প্রয়োগে সেগুলোর অনুপস্থিতি নিশ্চিত করাও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
কিছু বিষয় আমার নজরে এসেছে বলে সেগুলোকে উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করছি। আমি নিশ্চিত, পাঠকও এমন আরো অনেক কিছু লক্ষ্য করেছেন, যা ‌এক জায়গায় তালিকাবদ্ধ হওয়া জরুরি। মন্তব্যের মাঠে অনুগ্রহ করে আপনার পর্যবেক্ষণ যোগ করুন।
১. একটি গার্মেন্টস কারখানায় বিপদজনক একাধিক যন্ত্র চলমান থাকে। জেনারেটর আর বয়লারের মতো ভারি, তাপোৎপাদী যন্ত্রের পাশাপাশি সেখানে থাকে গরম পানির পাইপ, স্টিম পাইপ, এবং গোদের ওপর বিষফোঁড়া হিসেবে অসংখ্য সহজদাহ্য কাপড়। তাই চলমান অবস্থায় একটি কারখানা ভবন ধ্বসে পড়লে তার ভেতরে অগ্নিকাণ্ডের সমূহ রসদ মজুদ থাকে, যা আক্রান্ত ও উদ্ধারকর্মীদের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ধ্বংসস্তুপের ভেতরে শতভাগ বিশুদ্ধ অক্সিজেন পাম্প করা হলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও বাড়ে, যেহেতু অক্সিজেন দহনে সহায়তা করে। একবার আগুন লেগে গেলে ধ্বংসস্তুপের ভেতরে বিভিন্ন পকেটে সঞ্চিত সামান্য অক্সিজেনও আগুনের কবলে পড়ে নিঃশেষিত হয়ে যাবে, এবং আক্রান্তরা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাবেন ৪ থেকে ৫ মিনিটের মধ্যে। স্বল্প অক্সিজেনবহ পরিবেশে দহনের কারণে উৎপন্ন কার্বন মনোক্সাইডও আটক ব্যক্তিদের মৃত্যু ত্বরান্বিত করবে। এরকম পরিস্থিতিতে বিশুদ্ধ অক্সিজেন পাম্প না করে ব্লোয়ারের সাহায্যে বাইরে থেকে বাতাস এয়ার ফিল্টারের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ করে ভেতরে পাম্প করা যেতে পারে। পাম্প করার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে, ব্লোয়ারের ডেলিভারি প্রেশারটি যেন খুব বেশি না হয়, অন্যথায় ভেতরে ধ্বংসস্তুপে জমা হওয়া সব ধূলা উড়তে শুরু করবে।
২. ভেতরে আটকদের অবস্থান শনাক্তকরণের জন্য কোনো উন্নত প্রযুক্তি এই মুহূর্তে আমাদের উদ্ধারকর্মীদের হাতে নেই। তারা যেভাবে কাজ করেছেন, তা হচ্ছে নিজেরা যতদূর পর্যন্ত ঢুকতে পেরেছেন, ঢুকে চিৎকার করে ডেকে জিজ্ঞাসা করেছেন। যারা সাড়া দিতে পেরেছেন তাদের কাছে দ্রুত পৌঁছানোর চেষ্টা করে প্রাণ রক্ষার কাজ করেছেন। কিন্তু প্রক্রিয়াটি যেহেতু মন্থর, এবং আহতরা সবসময় উদ্ধারকর্মীদের মনোযোগ আকর্ষণ করার মতো যথেষ্ট জোরে শব্দ করতে পারেন না, তাই এ ব্যাপারে প্রযুক্তি ও কৌশলের সাহায্য নেওয়া জরুরি। আর এ কাজে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এগিয়ে আসতে পারে।
মানুষের শরীরের তাপ দূর থেকে শনাক্ত করা সম্ভব, কিন্তু ধ্বসে পড়া ভবনে প্রচুর তাপবাহী উপকরণ থাকায় এবং দিনের বেলা কংক্রিটও তাপ সঞ্চয় করে বলে সঠিকভাবে এই প্রযুক্তি কাজে লাগানো একটু কঠিন। তা ছাড়া হিট সিগনেচার স্ক্যানার বেশ ব্যয়বহুল। তারপরও স্বল্প ব্যয়ে যদি হিট সিগনেচার স্ক্যানার নির্মাণ করার একটি অ্যাসাইনমেন্ট বিভিন্ন প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মাঝে বন্টন করা যেতে পারে।
দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হচ্ছে প্যাসিভ ট্র্যান্সপন্ডারবিশিষ্ট আরএফআইডি চিপ ব্যাজ আকারে গার্মেন্টস কর্মীদের পোশাকের সাথে পরিধান করা। এটি তুলনামূলকভাবে অনেক সস্তা, এবং উদ্ধারকর্মীদের হাতে আরএফআইডি রিডার থাকলে তারা আশেপাশে কয়েক মিটারের মধ্যে আটকে পড়া কর্মীদের (জীবিত বা মৃত) অবস্থান শনাক্ত করতে পারবেন। এই পদ্ধতির মুশকিল হচ্ছে, এটি আহত আর নিহতের মাঝে পার্থক্য করতে পারবে না, আর কংক্রিটের স্তুপের কারণে এর স্বল্প মাত্রার তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ বেশ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হবে।
তৃতীয় পদ্ধতিটি হচ্ছে, প্রত্যেক গার্মেন্টস কর্মীকে নিজের সাথে একটি হুইসল রাখতে বলা। আটকে পড়লে তারা ক্রমাগত চিৎকার না করে কিছুক্ষণ পর পর হুইসল বাজাতে পারেন। সেই সাথে এ ধরনের হুইসলের শব্দ ও রেঞ্জ শনাক্ত করার জন্যে একটি স্বল্প ব্যয়সাপেক্ষ শনাক্তকরণ যন্ত্রের প্রোটোটাইপ তৈরি করার জন্যে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চিন্তা করে দেখতে পারে।
সরকার যদি এ ব্যাপারে গবেষণার জন্যে কিছু অর্থ বরাদ্দ করে, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে প্রাণহানি আরও কমানো সম্ভব হবে।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।