Wednesday, April 17, 2013

কী মতি, ডরাইলা?



Happy families are all alike; every unhappy family is unhappy in its own way.
 Leo Tolstoy, Anna Karenina, Chapter 1, first line.

শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে গণমাধ্যমের একাংশের প্রতিক্রিয়া ও আচরণ বুঝতে গেলে আরেকটু পেছনে যেতে হবে আমাদের। একাধিক বিবেচনায় দেশ পেছন দিকে হাঁটছে, সে যাত্রায় ক্ষণিকের জন্যে সঙ্গী হলাম নাহয় আমরাও।
'তৃতীয় শক্তি'র ব্যাপারে গণমাধ্যমের একাংশের উচ্চাশাসঞ্জাত প্রশ্রয় শাহবাগ আন্দোলনের ব্যাপারে এর প্রতিক্রিয়া বা আচরণকে বহুলাংশে ব্যাখ্যা করতে পারে। কাদের মোল্লার রায়ের আগে মতিঝিলে পুলিশের মৌন সম্মতিতে আয়োজিত শোডাউনে জামায়াতের পাণ্ডাদের প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারার্থে গঠিত ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হুমকি আর কাদের মোল্লার অপরাধের সঙ্গে বেমানান সাজা ও সাজা পরবর্তী বিজয়চিহ্ন প্রদর্শন, এ দুটিই প্রকৃতপক্ষে শাহবাগে মানুষকে সমাগত হতে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু প্রথম দিনের জড়ো হওয়া বিচ্ছিন্ন কিছু তরুণ-তরুণীর ভিড় যে শ্রেণী-পেশা-লিঙ্গ-বয়স নির্বিশেষে মানুষকে শাহবাগে ডেকে আনতে পারবে, তা সম্ভবত সবার হিসাবে ছিলো না। ঐ ভিড়টুকু হঠাৎ একটি মিশ্র বার্তা দিয়েছে মানুষ ও মিডিয়ার কাছে। আরাধ্য যে তৃতীয় শক্তি নিয়ে অধ্যাপক ড. ইউনূসের নোবেলজয়ের পর দৈনিক প্রথম আলোর নেতৃত্বে আরো কিছু পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মাধ্যম নিরলস প্রচার চালিয়েছে, এ ধারণাটিকে "খাওয়াতে" চেয়েছে মানুষকে, সেই তৃতীয় শক্তির কল্পিত ছবিটিকে মাড়িয়ে দলে মুচড়ে একাকার করে এক ভিন্ন তৃতীয় শক্তি শাহবাগে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে। এ যেন মঞ্চে বাঘের ছাল গায়ে অভিনেতার বদলে সুন্দরবনের বাঘেরই উপস্থিতি। অনভিজ্ঞের কাছে, ভুক্তভোগীর কাছে, বহুলপ্রত্যাশীর কাছে, রূপমুগ্ধের কাছে, বা ধান্দাবাজের কাছে বাঘছালে ঢাকা মানুষ আর আসল বাঘের মধ্যে পার্থক্য না-ও থাকতে পারে, কিন্তু সে বাঘ যার মুখোমুখি হবে, সে জানে, পার্থক্য কোথায়।
তাই শাহবাগ নিয়ে মিডিয়ার উদ্বেগও যথেষ্ট স্পষ্টই ছিলো।
দৈনিক প্রথম আলোসহ কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীন টেলিভিশন চ্যানেল প্রথম কিছুদিন চেষ্টা করেছে, শাহবাগের বাঘটির মুখে নিজেদের কথা বায়ুস্বননের। মাহবুব রশীদ বা ফারুক গুয়েবাড়ার মতো উটকো লোকজনকে তাই আমরা শাহবাগের প্রতিনিধি হিসেবে পত্রিকা ও টিভিতে প্রলাপ বকতে দেখেছি। কিন্তু এরা সময়ের সঙ্গে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে।
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যদি তলস্তয়ের সুখী পরিবারের মতো হয়, মিডিয়ার আঁকা 'তৃতীয় শক্তি' মূলত অসুখী পরিবারের একটি জোট, কিংবা সুখী পরিবারের ঘরছাড়া অসুখী ছেলেমেয়েদের সমাবেশ। ঝানু ব্যবসায়ী ইউনূস যখন রাজনীতিকে গ্রামীণ ব্যাঙ্কের কায়দায় চালাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে রাজনীতির ময়দান থেকে সটকে পড়লেন, তার সঙ্গে তাল দিয়ে হুক্কাৎকার তোলা প্রথম ও দ্বিতীয় সারির অসুখীরা সমস্যায় পড়েন। একদিকে দলের রুষ্ট লোক, অন্যদিকে বিমুখ হাঁটুবাহিনীর চাপে পড়ে তারা উপলব্ধি করেন, গাছে অনেকদূর চড়ার পর মইবাহীরা নীরবে মই গুটিয়ে বাড়ি চলে গেছে। রাজনীতির ফুটবলে ইনজুরি-আক্রান্ত এই বিপন্ন খেলুড়েদের পরবর্তীতে রাজনীতির পটপরিবর্তনের পর একটি সম্মানজনক লুঙ্গি প্রয়োজন ছিলো ঝড়-ঝঞ্ঝায় লাল হয়ে থাকা পাছা একটু আবৃত করার জন্যে। মইবাহী মিডিয়ামোগলের সভারত্ন মানসিংহেরা, যাদের সংক্ষেপে মই-মানসিংহ ডাকা যায়, অকাল মইচুরির কথা স্মরণ করে এ লুঙ্গি তাদের সরবরাহ করেন। লুঙ্গিটিতে প্রাকৃতিক হলুদের ওপর দহনের পোড়া কালিতে 'তৃতীয় শক্তি' লেখা আছে।
টিভিতে রাতের টক শো ও পত্রিকার উপসম্পাদকীয় পাতায় মিডিয়ার এই হালুমরূপী পোষ্য ম্যাওয়ের প্রাদুর্ভাব গত পাঁচ বা সাড়ে পাঁচ বছর ধরেই দৃশ্যমান। নিতম্বে হাই কমাণ্ডের সুখতলার সাথে বিস্ময়কর সাদৃশ্যপূর্ণ নকশার কালসিটে নিয়ে বিভিন্ন সভা সেমিনারে সুখী পরিবারের অসুখী ভাগ্নে-ভাতিজারা দুই দলকেই সশব্দ সমান চিহ্ন দিয়ে যুক্ত করে অনেক গরম গরম কথা বলেন। সেখানে লীগভাবাপন্ন মাহমুদুর রহমান মান্না, বিম্পিভাবাপন্ন মুহম্মদ জাহাঙ্গীর বা জামাতভাবাপন্ন আসিফ নজরুল নয়নমনোহর ঘনিষ্টতা নিয়ে পাশাপাশি বসেন, নানা কথা বলেন। রাস্তায় বড় গর্তের জন্যে স্বীয় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় আনমনা হয়ে থাকা চামচিকারা হাতিদের সমালোচনা করছে, এর বাইরে এই তৃতীয় শক্তির কোনো মুখ্য, সর্বজনগ্রাহ্য কার্যক্রম বা আবেদন মানুষের চোখে পড়েনি। এমন কোনো ডাক তারা গত পাঁচ বা সাড়ে পাঁচ বছরে দিতে পারেননি, যা মানুষকে তাদের পাশে উপস্থিত করতে পারবে। ময়দানের ময়দানব হয়ে নয়, বরং মিডিয়ার মিডিয়াম আঁচের বারবিকিউ খাসি হয়ে তারা জাহান্নামের আগুন থেকে নিরাপদ দূরত্বে ঘূর্ণায়মান অক্ষে ঘুরপাক খেয়ে পুষ্পের হাসি হেসে গিয়েছেন।
কিন্তু রাজনীতি শেষ পর্যন্ত ময়দানেরই ব্যাপার। অন্তত, এখন পর্যন্ত।
আর এখানেই শাহবাগ চড় মেরেছে তৃতীয় শক্তির পাইকারদের গালে। শাহবাগ জেগে উঠেছে বিকল্প মাধ্যমে সংক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের নেতৃত্ববিহীন আবাহনে। এবং স্বল্প সময়ের মাঝে এক বিপুল কলেবর নিয়ে সগর্জনে সে তার চরিত্র স্পষ্ট করেছে, যা মিডিয়ার মই-মানসিংহদের আকাঙ্খিত রূপটি থেকে ভিন্ন।
শাহবাগের শক্তির দিকটি কেবল তার সংখ্যায় নয়, বরং উপাদানে। শাহবাগে সমাজের প্রায় প্রতিটি প্রস্থচ্ছেদের মানুষ এসে যোগ দিয়েছেন বলেই সেটি অশ্রুত বাঘের মতো আচমকা এসে গর্জন করে ছোট্টো বাংলাদেশ হিসেবে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে পেরেছে। বাংলাদেশের ওপর সারির প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই সামর্থ্য আছে নিজেদের কর্মীদের বিপুল সংখ্যায় সমাবিষ্ট করার। কিন্তু শাহবাগ ভিন্ন তার স্বতস্ফূর্ততায়, তার সংযুক্তির প্রকৃতিতে, তার প্রাণভ্রমরটির দীর্ঘায়ুর কারণে।
আর তাই শাহবাগকে জাগরিত রাখার কাজটি নিজের কাঁধে তুলে নেয়া নারীরা শুরু থেকেই আক্রান্ত। কারণ বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক সমাবেশের চেয়ে শাহবাগ ভিন্ন নারীদের মুখ্য অংশগ্রহণের কারণেই। এই নেতৃত্ব কেবল মঞ্চে মাইক হাতে স্লোগানেই নয়, এই নেতৃত্ব টুকরো টুকরো করে হাতে নিয়েছেন তাঁরা। ৬ এপ্রিল হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ থেকে যখন শাহবাগে হামলা হলো, ফুলের দোকান থেকে লাঠি নিয়ে তাই অসমসাহসিনী নারীরা শাড়ি কোমরে বেঁধে পাল্টা প্রতিরোধ গড়েছেন। এই নারীরা সংরক্ষিত মহিলা আসনের ঘাড়েগর্দানে সংসদ সদস্যা নন, নিরীহ গৃহিণী আর কোমলস্বভাবা ছাত্রী।
আক্রমণ তাই শুরু হয়েছে একদম শুরু থেকেই, নারীদের লক্ষ্য করে। জামায়াতের সমর্থক ব্লগ, ফেসবুক পেজ ও মিডিয়া শাহবাগে উপস্থিত নারীদের নিয়ে যথেচ্ছ গুজব ছড়িয়েছে। ফটোশপ নামের সফটওয়্যারটি তারা যে উৎসাহে ব্যবহার করেছে, শাহবাগের ছেলেমেয়েরা একই উৎসাহে গুগলের ইমেজ সার্চের মাধ্যমে তাদের সকল নোংরামি উন্মোচন করে দেখিয়েছে।
শাহবাগে নারীরা তাই এখন সরাসরি আক্রান্ত হচ্ছেন কুলীন দৈনিকের কুলীনতর সাহিত্যপাতায়। দৈনিক প্রথম আলো তার সাহিত্য পাতায় গতকাল প্রকাশ করেছে তৃতীয় শ্রেণীর সাহিত্যকর্মের জন্যে প্রথম শ্রেণীর পুরস্কারপ্রাপ্ত আমলা হাসনাত আবদুল হাই ও প্রথম আলোর নিজস্ব পুরস্কারপ্রাপ্ত অদিতি ফাল্গুনীর দুটি লেখা। পাশাপাশি প্রকাশিত এই দুটি লেখার কাঠামো ও বক্তব্যে বিস্ময়কর মিল রয়েছে, এবং দুটিতেই শাহবাগের সমাগতা তরুণীদের উপস্থাপন করা হয়েছে "মফস্বল" এর "ব্যবহৃতা" মানুষ হিসেবে, যারা রাজনীতির বোর্ডগেমে কিছুটা ঊনমানের গুটি। গল্প দুটিতে তাদের পরিণতি যথাক্রমে স্বেচ্ছায় সম্ভুক্ত ও ধর্ষিত হওয়া। এই সম্ভোগ ও ধর্ষণ করে আবার একটি রহস্যময় রাজনৈতিক পক্ষের লোক, যাদের সঙ্গে ঘুরেফিরে শাহবাগে আন্দোলনে জড়িত রাজনৈতিক দলগুলোরই সাদৃশ্য চোখে পড়ে। মফস্বলের মেয়েদের ঢাকায় গিয়ে রাজনীতিকদের শয্যাশায়িনী বা শিকার হওয়ার এই গল্পগুলো পূর্বে বর্ণিত জামাতি পত্রিকা ও ফেসবুক পেজের কদর্য ছবিগুলোর লৈখিক রূপমাত্র। মফস্বলের যে বিপুল সংখ্যক মানুষ দৈনিক প্রথম আলোর পাঠক, তারা অনেকেই আমার দেশ বা বাঁশের কেল্লার সাবস্ক্রাইবার নন, পত্রিকার মার্কেটিং কৌশল, রাজনৈতিক রুচি বা প্রযুক্তিগত কারণে তারা শাহবাগ নিয়ে জামায়াতের কদর্য প্রোপাগাণ্ডার প্রকোপের বাইরে হয়তো অবস্থান করছিলেন, এবার এ গল্প, এবং এ গল্পের মাধ্যমে একটি বিকৃত সন্দেহ তাদের কাছে পৌঁছে গেলো দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ও সাহিত্যপাতার বিভাগীয় সম্পাদক সাজ্জাদ শরীসৃপের কল্যাণে। এ গল্পের চরিত্র তাদের মফস্বলেরই কোনো তেজস্বিনী, যে রাজধানীতে গিয়ে "বরবাদ" হয়ে যাচ্ছে। এই পয়মাল হওয়া মফস্বলের রক্ষণশীল সমাজের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য উপায়েই, অর্থাৎ নাভির নিচে নষ্ট হওয়া। এর অভিঘাত কতদূর, তা পরে বোঝা যাবে, এখন অনুমান করা বা করানো আমার অভিপ্রায় নয়।
এখানে স্মর্তব্য, মেহেরজান নামের একটি গুহ্যদ্বার থেকে টেনে বার করা স্ক্রিপ্টে ঘূর্ণায়িত অখাদ্য বটতলার সিনেমা নিয়ে প্রথম আলোতে অনেক রথী লেখক কীবোর্ড কলম ক্ষয় করেছিলেন। হাসান ফেরদৌস নামে এক পাছাভারি বিজ্ঞ কেষ্টুবিষ্টু নিজের গুহ্যদ্বার থেকে একাত্তরের ধর্ষিতা নারীদের মেহেরজানে উপস্থাপনকে "নারীর কামজ প্রয়োজন" এর দৃশ্যায়নের থিওরি বের করে কলাম চুদিয়েছিলেন, ফারুক গুয়েবাড়া তার মৌসুমী বিপ্লবদগ্ধ রেক্টাম থেকে বার করে ফেঁদেছিলেন "রিকনসিলিয়েশন" তত্ত্ব। কিন্তু যখন শাহবাগের নারীদের মফস্বলের পাঠকের চোখে লয়ের পথে যাত্রী হিসেবে আঁকার প্রয়োজন হয়, তখন "নারীর কামজ প্রয়োজন"-এর অস্তিত্ব বিস্মৃত হন সাহিত্যপাতার কেরানী ও দারোয়ানবৃন্দ। শাহবাগের নারীদের কল্পিত যৌনতার বর্ণনা তাই অতি অবশ্যই অনিচ্ছাসম্ভোগ বা ধর্ষণমুখী, যা মফস্বলের চোখে ঘৃণার্হ ও পরিত্যাজ্য। মেহেরজানে একাত্তরের নারীরা যেখানে পাকিস্তানী সেনার প্রেমপুষ্করিণীতে সীসার গোলকের মতো নিমজ্জিত হয়, হাসনাত আবদুল হাই বা অদিতি ফাল্গুনীর গল্পে শাহবাগের নারীরা সম্ভুক্তা বা ধর্ষিতা হয় তাদেরই সহযোদ্ধাদের হাতে। তাহরির স্কোয়্যারে অসভ্য মিশরীয়রা যেখানে সহস্রাধিক ধর্ষণের অন্ধকার উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করেছে, শাহবাগে তার অনুপস্থিতি মোচনের দায়িত্ব তুলে নেয় দৈনিক প্রথম আলোর সাহিত্যপাতা। যা খবরের পাতায় তারা আনতে পারেনি, তা তারা নোংরা গ্রাফিতির মতো আঁকে সাহিত্যপাতায়।
আরও বিচিত্র, সম্প্রতি ফাঁস হওয়া সাঈদী রাজাকারের ফোনালাপে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার যে মফস্বলবাসিনী তরুণীটি "দাদু" সম্বোধন করে সাঈদীর সঙ্গে কথামৈথুন চালিয়ে যাচ্ছে, বা প্রবাসী জামায়াত কর্মীর যে মফস্বলবাসিনী স্ত্রী সাঈদীর সঙ্গে সূক্ষ্ম যৌন ইঙ্গিতবহ আলাপ চালিয়ে যাচ্ছে, সমাজের সে নারীদের নিয়ে গল্পকারদ্বয় বা সম্পাদক-পাতিসম্পাদকের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। রাজনীতি ও মফস্বলের তরুণী-যুবতীদের রাজনীতিকদের হাতে ব্যবহৃত হওয়ার উদাহরণটি কেবল শাহবাগের নারীদের দিয়েই চরিতার্থ করার ব্যাপারে এই বাটপারচতুষ্টয়ের সকল আগ্রহ নিহিত। অবশ্য, সেরকম গল্পকেও আমরা স্বাগত জানাবো বলে মনে করি না।
পাঠকের সশব্দ প্রতিক্রিয়ার মুখে পিছু হটে মতিউর রহমান আজ হাসনাত আবদুল হাইয়ের বিষ্ঠার গন্ধমাখা লেখাটি প্রত্যাহার করেছে নিজেদের অনলাইন আর্কাইভ থেকে। অদিতি ফাল্গুনীর মলখণ্ডটি বহাল তবিয়তে আছে। দুটি গল্পই বিপুল সংখ্যক পাঠকের কাছে পৌঁছে, সে বিষটুকু যে প্রত্যাহার করা যায় না, তা মতিউর রহমান ভালো করেই জানে।
প্রথম আলোর সাহিত্য পাতার এই ছোটলোকামি অবশ্য নতুন নয়। রাজু আলাউদ্দিন ও তার স্ত্রীকে আক্রমণ করে সাহিত্যপাতায় অপাঙক্তেয় একটি রচনার কারণে আলিম আজিজ নামে একজন কর্মীকে তারা অতীতে বহিষ্কারও করেছে। হয়তো এবারও তারা কোনো বলির পাঁঠা খুঁজে বার করবে। নিরাপদে রয়ে যাবে সাজ্জাদ শরীসৃপ নামে সাহিত্যপাতার মাসীটি, এ কথা অবশ্য অনায়াসানুমেয়।
শাহবাগ থেকে নারীদের হাতে মেরে দূর করা না করা গেলে, জাতে মেরে বের করার চেষ্টায় মরিয়া দৈনিক প্রথম আলো কী চায়, তা নিয়ে নানা অনুমান রয়েছে। শাহবাগ থেকে উচ্চারিত ইসলামী ব্যাঙ্ক বর্জনের দাবি মই-মানসিংহদের সরাসরি লাভবান করেছে, বিডিনিউজ২৪.কম বাদে সকল পত্রিকাই ইসলামী ব্যাঙ্কের বিজ্ঞাপনশিশ্নটিকে সাদরে লুঙ্গি তুলে নিজেদের পেছনে গুঁজে নিয়েছে। কিন্তু চলমান অনেক গুজবের একটি হচ্ছে, শাহবাগকে "সমর্থন" দেওয়ার কারণে প্রথম আলোর সার্কুলেশন নাকি হ্রাস পেয়েছে। আবার 'আমার দেশ' বন্ধের মুখে পড়ায় এর মার্কেট শেয়ারের একাংশ নাকি প্রথম আলো হস্তগত করতে চায়। মতিউর রহমান নাকি পানি কতোটুকু ঠাণ্ডা, তা মাপতেই হাসনাত আবদুল হাই আর অদিতি ফাল্গুনীর মতো খরচের খাতায় রাখা বটতলার সাহিত্যিকদের ওপর দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চালাচ্ছে। পরিস্থিতি খারাপ দেখলে আলপিন সম্পাদক সুমন্ত আসলাম, আলপিন কার্টুনিস্ট আরিফ বা সাহিত্যপাতাকর্মী আলিম আজিজের মতো কেউ চাকরি খোয়াবে, বা হাই-ফাল্গুনীকে প্রথম আলোতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হবে, এ-ই তো।
শাহবাগে নারীদের অংশগ্রহণ কমে গেলে বা দূর হলে শাহবাগকে আর দশটি রাজনৈতিক দলের মামুলি সমাবেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার কাজটি সহজ হয়। হঠাৎ শাহবাগের চরিত্র বদলে গেলে মনস্তাত্ত্বিক চাপের ব্যাপার তো রয়েছেই। অমিতবল শিমশোন যখন নিদ্রিত ছিলো, তার প্রেমাস্পদা দেলাইলাই কিন্তু শিমশোনের শক্তির উৎস লম্বা চুল কেটে নিয়েছিলো। শাহবাগের নারীরাও যেন শিমশোনের দীর্ঘকেশের মতোই এ আন্দোলনের গোপন বলকেন্দ্র। 'তৃতীয় শক্তি'র প্রস্তাবকরা জানে, শাহবাগকে শুধু দুর্বল করলে হবে না, তাকে করতে হবে অগ্রহণযোগ্য ও পঙ্গু, যাতে প্রকৃতপক্ষেই সাধারণ মানুষের আকাঙ্খার উপস্থাপনের জন্যে কেউ আর মাঠে না থাকে, বলখেলাটি ফিরে যায় সুখী পরিবারের সুখী সদস্যদের পায়ে।
পরিশেষ, ক্ষমা প্রার্থনার পালা। গতকাল হাইয়ের লেখাটি পড়ে টয়লেটে সশব্দে প্রস্রাব করতে করতে এক সম্পাদক ও এক সাহিত্যপাতার বিভাগীয় সম্পাদককে যথাক্রমে কুত্তার বাচ্চা ও খানকির ছেলে বলে বিড়বিড় করে গালি দিচ্ছিলাম। আজ দেখলাম মতিউর রহমান ক্ষমা চেয়ে হাইয়ের লেখা প্রত্যাহার করেছে। সেখানে সে লিখেছে, ২৯০১ শব্দবিশিষ্ট হাইয়ের রচনাটি নাকি তারা "অসাবধানতাবশত" প্রকাশ করেছে ও পাঠকের কাছে সে কারণে ক্ষমা চেয়েছে। আমার ক্ষোভ তাই প্রশমিত হয়েছে। আমিও অনবধানতাবশত গালি দেওয়ার কারণে আমার টয়লেটে প্রস্রাবের ফেনার কাছে ক্ষমা চেয়ে গালি দুটি প্রত্যাহার করে নিলাম।

1 comment:

  1. Anwar Hossain26 June, 2013

    "আমিও অনবধানতাবশত গালি দেওয়ার কারণে আমার টয়লেটে প্রস্রাবের ফেনার কাছে ক্ষমা চেয়ে গালি দুটি প্রত্যাহার করে নিলাম।"

    আমি ferot nite parlam na bole dukkhito!!

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।