Wednesday, January 23, 2013

প্রতিক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া


বাচ্চু রাজাকার, যে একাত্তরে নানা অপরাধ ঘটানোর পর পঁচাত্তরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে মাওলানা আযাদ নাম ভাঁড়িয়ে যত্রতত্র ধর্মীয় ব্যাখ্যা বয়ান দিয়ে বেড়াচ্ছিলো, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারার্থে গঠিত ট্রাইব্যুনালে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার পর চারটি ক্ষমতাধর রাষ্ট্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
জার্মানি ও ফ্রান্স, ইয়োরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম দুই দেশ এই রায় ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিরুদ্বেগ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
প্রথম আলোর [১] বর্ণনায়,
জার্মান রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়টিতে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। তবে আপনাদের অতীতের অমীমাংসিত বিষয়ের সুরাহা কীভাবে হবে, সেটি ঠিক করার দায়িত্ব আপনাদের। একজন জার্মান নাগরিক হিসেবে শুধু এটুকুই বলতে পারি, যন্ত্রণাকর অতীত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তির জন্য পরিবেশ তৈরি করতে হয়। আর আপনারা সেটাই করতে চলেছেন।’
আলব্রেখট কনিয়ে আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল বিশেষ করে যুক্তরাজ্য বিচারের প্রক্রিয়াগত বিষয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল, ট্রাইব্যুনাল সেটিকে আমলে নিয়েছে। ট্রাইব্যুনালের কাজে প্রক্রিয়াগতভাবে বড় কোনো বিচ্যুতি ব্যক্তিগতভাবে আমার চোখে পড়েনি। আর আইনমন্ত্রী আমাদের (ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূত) ট্রাইব্যুনালের আইন সম্পর্কে জানিয়েছেন, তিন দশকেরও বেশি সময় আগে ফৌজদারি দণ্ডবিধি বিষয়ে অভিজ্ঞ দুই জার্মান অধ্যাপক এ আইন প্রণয়নে যুক্ত ছিলেন। কাজেই এ আইন নিয়ে আমার কোনো সংশয় নেই।’
এবং,
একই বিষয়ে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মিশেল ট্রিনকুইয়ে বলেন, ‘আইনমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের যথেষ্ট ফলপ্রসূ মতবিনিময় হয়েছে। আমরা তাঁর কাছে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চেয়েছি। তাই এ বিচার নিয়ে হস্তক্ষেপ করা ঠিক হবে না। অতীতের সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে, সেটি ঠিক করার দায়িত্ব প্রত্যেক দেশেরই নিজেদের বিষয়। কোনো কোনো দেশ ক্ষমা প্রদর্শনের নীতি অনুসরণ করেছে। আবার কোনো কোনো দেশ যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ট্রাইব্যুনাল চালু করেছে।’
বাংলাদেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে কি না—জানতে চাইলে মিশেল ট্রিনকুইয়ে বলেন, ‘এ বিষয়ে আপনারাই ভালো বলতে পারবেন। সম্প্রতি একটি জনমত জরিপে দেখেছি, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ যুদ্ধাপরাধের বিচার-প্রক্রিয়ায় তাদের সমর্থন জানিয়েছে।’
যে প্রতিবেদক ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতের কাছে জিজ্ঞাসা করেছেন, বাংলাদেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে কি না, তাকে শৈশবে আয়োডিনযুক্ত লবণ না খাওয়ানোর জন্য তার পিতামাতার প্রতি ধিক্কার জানাই। ভাগ্যিস প্রথম আলো ছিলো, না হলে এই ব্যক্তি জীবনে নির্বুদ্ধিতার কারণে পদে পদে বিপন্ন হতেন। প্রথম আলো এই জড়বুদ্ধিসম্পন্নদের ওপর বটবৃক্ষ হয়ে ছায়া দিচ্ছে, তাদের ধন্যবাদ। নিজের দেশ ঠিকমতো চলছে কি না, এ প্রশ্ন ভবিষ্যতে ভিনরাষ্ট্রের দূতকে না করে দেশের চিন্তাবিদদের কাছে করুন। আজ ফ্রান্সে কোনো অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত উপস্থিত হলে একজন ফরাসী সাংবাদিক কখনো কি তাঁকে জিজ্ঞাসা করবেন, ফ্রান্স ঠিক পথে এগোচ্ছে কি না? হে প্রথম আলোর প্রতিবেদক, আপনি আকাট কাঠবলদ হয়ে করে খান, কোনো সমস্যা নেই, শুধু বাংলাদেশকে এভাবে ভিনদেশী রাষ্ট্রদূতদের কাছে 'কাঠবলদ সাংবাদিক উৎপাদনকারী দেশ' হিসেবে উপস্থাপন করবেন না।
যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়া এসেছে তার পররাষ্ট্র দফতর থেকে। পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত ব্যারনেস সাঈদা হোসেন ওয়ারসির তরফ থেকে আসা বিবৃতিতে বলা হয়েছে [১],
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায় সম্পর্কে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের কনিষ্ঠ মন্ত্রী ব্যারনেস ভার্সি এক বিবৃতিতে বলেন, তাঁর সরকার এই রায় পর্যবেক্ষণ করছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নৃশংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করার যে উদ্যোগ বাংলাদেশ নিয়েছে, যুক্তরাজ্য সরকার তা সমর্থন করে। তবে যুক্তরাজ্য সব ক্ষেত্রেই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী।
যুক্তরাজ্য মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী হলেও, বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। বাংলাদেশে নিয়মিত সে বিধান পালিতও হচ্ছে। বৃটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর যারা গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছিলো, সেই বাংলা ভাইদেরও ফাঁসি হয়েছে বাংলাদেশে। যুক্তরাজ্যের ফরেন অফিস তখন বাংলা ভাইদের মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে কিছু বলেছিলো কি? গুগল ঢুঁড়ে পেলাম না।
সারা দুনিয়ার মালিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে [২],
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, “এ ধরনের অপরাধ (মানবতাবিরোধী অপরাধ) যারা করে তাদের বিচার যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে, এই বিচার অবশ্যই অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হতে হবে। এবং এই বিচার হতে হবে বাংলাদেশের নিজস্ব আইন ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রাণলয়ের মুখপাত্র ভিক্টরিয়া নুল্যান্ড এই বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চালানো গণহত্যার বিচার শুরু হয়েছে এবং শিগগিরই আন্তর্জ্যাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আরো কয়েকটি মামলার রায় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব মামলার বিচারেও আন্তর্জাতিক সনদ অনুসরণ ও আইনের শাসনের নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
প্রিয় যুক্তরাষ্ট্র, ওসামা বিন লাদেনের বিচার কি অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হয়েছিলো? কোনো মার্কিন আদালত কি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আইন ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে তার বিচার করেছিলো? তার বিচার করার এখতিয়ার কি মার্কিন আদালতের ছিলো? কোনো আন্তর্জাতিক সনদ কি যুক্তরাষ্ট্র অনুসরণ করেছিলো তখন? আর বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ আইনে সাধিত বিচারকে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে হতে হবে কেন? আর এই আন্তর্জাতিক মান কোন আন্তর্জাতিক মান? আমরা তো উঠতে বসতে যুক্তরাষ্ট্রের সবকিছু অন্ধভাবে অনুসরণ করার রাস্তায় চলি, আমরা কি তবে বাচ্চু রাজাকারকে পাকিস্তানে সেনা পাঠিয়ে রাতের অন্ধকারে বিন লাদেনের মতো হত্যা করলে আন্তর্জাতিক মান অনুসৃত হবে? নিজামী-গোআ-সাঈদী-কামারু-মুজারাজাকার এগুলিরে আদালতে দাঁড় না করিয়ে লাদেন স্টাইলে বডি ঝাঁঝরা করে সমুদ্রে ফেলে দিলে আন্তর্জাতিক মান বজায় থাকবে গো স্যারেরা?
প্রিয় ব্যারনেস ওয়ারসি, যুক্তরাষ্ট্র যখন ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করলো, মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কে যুক্তরাজ্যের আপত্তি আপনি জোর গলায় উত্থাপনের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না জানি না। বেটার লেট দ্যান নেভার, মি'লেডি। এখন বলেন। বলেন না, প্লিজ?
[ক্রমশ যোগ হবে]
তথ্যসূত্র:

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।