Wednesday, November 21, 2012

রানওয়ে





তারেক মাসুদের "রানওয়ে" সিনেমাটি দেখলাম মাত্র।
"মাটির ময়না" দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সম্ভবত একই রকম ভালো লাগার প্রত্যাশা নিয়ে দেখতে বসেছিলাম, তাই হতাশ হতে হলো।
সিনেমা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে সিনেমার কাহিনী বলে দেয়াটা হয়রানির সমপর্যায়ে পড়ে। আমি ধরে নিচ্ছি এই পোস্ট পাঠক রানওয়ে সিনেমাটি দেখেননি, তাই কাহিনী নিয়ে যত কম বলা যায়, দর্শকের আসনে বসে পাঠকের রসভঙ্গ তত কম হবে। আর অনিচ্ছাসত্ত্বেও বারবার মাটির ময়নার প্রসঙ্গ উঠে আসবে, সেজন্যে আগাম ক্ষমাপ্রার্থী। আমার কাছে সিনেমা দুটি খোলা বইয়ের রেক্টো আর ভের্সোর মতো, একটির দিকে চোখ রাখতে গিয়ে আরেকটি চোখের সামনে ভেসে থাকছে।
মাটির ময়না আর রানওয়ে, দুটি সিনেমার গল্পই পরস্পর সাদৃশ্যবহুল। ধর্মীয় কট্টরপন্থার প্রতি ঝুঁকে পড়া কোনো একটি প্রধান চরিত্রের মোহভঙ্গ এই দুটি সিনেমার মূল উপজীব্য, বাকি সবকিছুই এই ঘটনাটিকে কাঠামো যোগায়, আর সিনেমাকারের চেষ্টা থাকে সেই কাঠামোর মধ্যে অনুচ্চস্বরে আরো কিছু গল্প বলার। মাটির ময়নার কাজী সাহেব আর রানওয়ের রুহুলের সাদৃশ্য উভয় সিনেমার দর্শককে স্মরণ করিয়ে দেয়, সময় পাল্টেছে, কিন্তু সংস্কার পাল্টায়নি। কিন্তু এই স্মরণ করিয়ে দেয়ার মাঝে দর্শকের জন্যে মৃদু পীড়াও থাকে, কারণ রানওয়ে মাটির ময়নার মতো মসৃণ নয়। উভয় চলচ্চিত্রের সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন ক‌্যাথরিন মাসুদ, কিন্তু দর্শক উপলব্ধি করবেন, রানওয়ের সম্পাদনায় কিছু অযত্ন রয়ে গেছে। সিনেমাটোগ্রাফির দায়িত্বে ছিলেন মিশুক মুনীর, ভালো লাগেনি তাঁর কাজ। মাটির ময়নায় আলোকসম্পাত ও দৃশ্যসজ্জা (কম্পোজিশন) শুধু চমৎকারই ছিলো না, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিক ছিলো। রানওয়েতে এর অনুপস্থিতি আমাকে হতাশ করেছে। মিশুক মুনীর টিভি সাংবাদিকতার সাথে আমৃত্যু জড়িত ছিলেন বলেই হয়তো টিভি সাংবাদিকের চোখে সিনেমাটিকে ধারণ করেছেন। কয়েকটি অপূর্ব শট রয়েছে রানওয়েতে, কিন্তু সিনেমার একটা বড় অংশের সাথে সুবিচার হয়নি বলে মনে হয়েছে। ক্যামেরার সরণ-বিচরণ অনেক সীমিত ছিলো, যার ফলে কিছু দৃশ্য একঘেয়ে বা নিরুত্তাপ লেগেছে আমার কাছে।
রানওয়েতে ভালো লাগেনি নেপথ্য সঙ্গীত, তানভীর আলম সজীব দৃশ্যের মেজাজের সাথে আরো সঙ্গতিপূর্ণ সুরারোপ করতে পারতেন। রানওয়ের গল্প মাটির ময়নার মতো গীতিবান্ধব নয় বলেই নেপথ্য সঙ্গীত এখানে অনেক বেশি গুরুত্ববহ ছিলো। রান-অফ-দ্য-মিল নেপথ্য সঙ্গীত মনোযোগী দর্শককে বিরক্ত করবে একাধিকবার।
রানওয়ের কলাকুশলীরা প্রায় সবাই অপেশাদার অভিনেতা, কিন্তু তাদের অভিনয় ত্রুটিপূর্ণ, এমন অভিযোগ করা অনুচিত হবে। নাজমুল হুদা বাচ্চু অনেক দক্ষ অভিনেতা, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ও ভালো অভিনয় করেছেন। উর্দু ভাই চরিত্রে অভিনেতা মোসলেমউদ্দিন মাটির ময়নাতেও উগ্র মাদ্রাসা শিক্ষকের ভূমিকায় উতরে গিয়েছিলেন, রানওয়েতেও তাঁকে মানিয়েছে। তবে যে সমস্যা মাটির ময়নাতে ছিলো, তা রানওয়েতেও রয়েছে, সংলাপের ভাষায় অসঙ্গতি আর কৃত্রিমতা। পরিচালককেই এর জন্যে দায়ী করতে হবে, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নয়। অভিনয়ে কিছু জড়তা রয়েছে, যা খুব বেশি দৃষ্টিকটু নয়। একেবারেই মানায়নি তিশাকে (ইনি অভিনয় জানেন না, ডেরেক জুল্যান্ডারের মতো সকল চরিত্রেই এর একই ডেলিভারি), কিন্তু কুশলীদের তালিকায় তার নামটি হয়তো গতানুগতিক চলচ্চিত্রের দর্শককেও টেনে আনবে বলে বিবেচনা করেছেন নির্মাতা।
প্রত্যাশা পূরণ না হলেও, রানওয়ের অন্যতম শক্তিশালী দিকটি উল্লেখ না করলেই নয়, এর কাহিনী ও বিন্যাস প্রশংসনীয়। যে সময় আর যে সব গল্প সিনেমাকার তুলে ধরতে চেয়েছেন, তা নব্বই মিনিটে শেষ করতে গেলে সিনেমার লয় একটু চড়া থাকারই কথা। সে কারণেই হয়তো অনেক ছোটো ছোটো টুকরো শটে ধারণ করতে হয়েছে একে। প্রবাসী শ্রমজীবী মানুষের পেছনে ফেলে যাওয়া পরিবারটিকে রানওয়ের একেবারে প্রান্তে রেখে দেখানোর ভাবনাটি অভিনব। রুহুল-ফাতেমা-রহিমার পরিবারটিকে প্রতি ভোরে সগর্জনে উড্ডীন বিমানগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় প্রবাসী পিতার কথা, যে মধ্যপ্রাচ্যে কাজের সন্ধানে গিয়েই মাৎস্যন্যায়ের মুখোমুখি হয়ে দিশাহারা আর অন্তর্হিত। আকাশে উড়ে যাওয়া বিমানের গর্জন ভেসে এসে বারে বারে থামিয়ে দেয় তাদের কথা, সেই অব্যক্ত সংলাপের মধ্যে সিনেমাটির আত্মা লুকিয়ে আছে অনেকাংশে। রহিমার ঘরের অদূরে পড়ে থাকা শূন্য রানওয়ে দর্শকের চোখের সামনে তুলে ধরে তাদের মনের নৈরাশ্যশাসিত শূন্যস্থান, যেখানে ক্ষুদ্র ঋণ আর উগ্র মৌলবাদ এসে দর্পী সাপের মতো ফুটো গলে ঢুকে পড়ে, আকাশে ডানা মেলা বিশাল বিমানের মতোই এই অসহায় মুমূর্ষু ফাঁদবন্দী পাখির মতো পরিবারটির ওপর ক্ষণে ক্ষণে উড়ে যায় শকুনের ধৈর্য নিয়ে। আর যথেষ্ট সাহস নিয়ে মৌলবাদী ইসলামী রাজনীতির ময়দানের খেলোয়াড়দের চরিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে রানওয়েতে, আমি বাংলাদেশের আর কোনো সিনেমায় এমনটি দেখিনি।
সিনেমাটির গল্প আরো একটু সময় দাবি করে দর্শকের হাত থেকে। আরেকটু সময় ধরে বিধৃত হলে হয়তো কিছু সংক্ষিপ্ত দৃশ্য আরো বিস্তারিত হয়ে পরিস্ফূট হতে পারতো। সেইসাথে পেশাদার কুশলীদের নিয়ে কাজ করলে পরিচালক সম্ভবত সিনেমাটিকে অন্যভাবেও চিত্রায়িত করার কথা চিন্তা করতে পারতেন। মাটির ময়নার নির্বাহী প্রযোজক ছিলেন নাতালি ক্রয়ঠার, হয়তো সে কারণেই সিনেমাটিকে মিঠা করার জন্য গুড়ের অভাব হয়নি। তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদ নিজেদের প্রযোজনায় সীমিত সাধ্যের কথা হিসাবে রেখেই হয়তো রানওয়েকে এভাবে তৈরি করেছেন। আবদুল জলিল অনন্তের হাস্যকর সিনেমার পেছনে যতো টাকা খরচ হয়, ততো টাকা এই সিনেমাটির পেছনে খরচ হলে আমরা নিশ্চয়ই দীর্ঘদিন একে নিয়ে আলাপ করার মতো একটা কিছু পেতাম। রানওয়ের যা কিছু ত্রুটি, তার জন্যে দর্শক হিসেবে আমার আর আমাদের ভূমিকার দায়ও কি কম?
বুকে ব‌্যথা নিয়ে স্মরণ করছি তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর ও তাঁদের তিন সহকর্মীর কথা, যাঁদের মৃত্যু আমাদের দরিদ্র করে রেখে গেছে। মানুষ ভাতের অভাবে দরিদ্র হয় যেমন, তেমনি দরিদ্র হয় কল্পনার অভাবেও। আমাদের দেশে কল্পনার চর্চা যাঁরা করেন, তাঁদের একজনের মৃত্যুই যেন জনপদের মৃত্যুর সমকক্ষ। কামনা করি, তাঁদের রেখে যাওয়া শূন্যস্থানটি যেন নতুন নির্মাতারা বহুগুণে পূর্ণ করেন।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।