Monday, November 05, 2012

হন্তদন্ত তদন্ত প্রয়োজন


কাজী সাহেব উসখুস করেন শুধু। আড়ে আড়ে স্ত্রীর দিকে তাকান, কিন্তু কিছু বলেন না।
মিসেস কাজী খনখনে গলায় বলেন, একুশ বছর বয়স কম নাকি? আইনেও তো বলা আছে, মেয়েদের আঠারো বছর আর ছেলেদের একুশ বছর বয়সে বিয়ে দেওয়া যায়। তুমি খালি ত্যানা প্যাচাও ক্যান?
কাজী সাহেব কাশেন দুয়েকবার। একবার ঘড়ি দেখেন। অস্ফূটে কী যেন বলেন।
কিন্তু দীর্ঘদিনের সংসারের অভিজ্ঞতা থেকে কাশির ভাষা মিসেস কাজীর দখলে চলে এসেছে। তিনি খনখনানির ডায়ালে মোচড় দিয়ে এক দাগ চড়িয়ে বলেন, না না, লেখাপড়া শেষ করার দরকার নাই। এখনই বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। তোমার ছেলের ভাবগতিক আমার সুবিধার লাগে না।
কাজী সাহেব মনে মনে মুয়াজ্জিনের মুণ্ডপাত করেন। এশার ওয়াক্ত হয়ে গেছে, তিনি নিশ্চিত। কিন্তু মুয়াজ্জিন গায়েব। আজানটা দিলে তিনি হুড়াহুড়ি করে দিল্লী থেকে কিনে আনা নতুন নকশী জায়নামাজটা বগলে নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারতেন।
মিসেস কাজী বলেন, বারবার বললাম ছেলেটারে মানারাত ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করাইতে। শুনলা না। বিলকিস আপা ঠিকই বলছিলো, এনএসইউয়ের বাতাস ভালো না। তোমার ছেলে ... আমি কী কই শুনতেছ? খালি ঘড়ি দ্যাখো ক্যান?
কাজী সাহেব আবার কাশেন। এবার একটু অন্যরকম।
মিসেস কাজী বলেন, ছেলে বড় হয়ে গেছে। বিয়েশাদীর ব্যবস্থা দেখো।
কাজী সাহেব মিহি গলায় বলেন, ওর কোনো পছন্দ টছন্দ নাই?
মিসেস কাজী বলেন, জানি না। সারাক্ষণই তো দেখি নামাজকালাম কোরানহাদিস নিয়া পইড়া থাকে। ইউনিভার্সিটিতে গিয়া কী করে তা তো আমি বলতে পারি না। আমারেও কিছু বলে নাই, তোমার মেয়েও কিছু বলতে পারলো না।
কাজী সাহেব এইবার একটু দরাজ গলায় বলেন, এতো তাড়াহুড়ার তো কিছু নাই। ছেলেটা আধ্যাত্মিক লাইনে আছে, তুমি এতো টেনশন করো ক্যান? আরো কয়েকটা বছর যাক, আমৃকা যাইতে চায় পড়ালেখার জন্য, সেই লেখাপড়া শেষ হোক, হজটা কইরা আসুক, তারপর আল্লাহর মর্জি হইলে ...।
মিসেস কাজীর চোখ সরু হয়ে আসে। তিনি সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে বসেন, যেভাবে বাঘিনী হরিণের পালের দিকে গুড়ি মেরে এগিয়ে যায়। বলেন, হ, আরও কয়েক বছর যাক, তোমার বন্ধু ইদরিসের মাইয়া ততদিনে শেয়ানা হৌক, তাই না? তুমি ঠিকমত শুইনা রাখো, ঐ ইদরিসের মেয়ের সঙ্গে আমার ছেলের বিয়াশাদি হইত না। আমার জান থাকতে না। ইদরিসের মেয়ের সঙ্গে নাফিসের বিয়া দিতে চাও, আগে আমারে লোক ভাড়া কইরা খুন করো। আমৃকা যাওনের দরকার নাই নাফিসের, এখনই বিয়াশাদি করায় দ্যাও।
কাজী সাহেব আনমনা হয়ে যান। তারপর শশব্যস্ত হয়ে কাশেন, যাতে মিসেস কাজী আবার ভেবে না বসেন, বিকল্পটা তিনি খতিয়ে দেখছেন।
মিসেস কাজী বলেন, আমি আলমগীররে খবর দিছিলাম, সে কয়েকটা বায়োডাটা ধরাইয়া দিয়া গেছে দুপুরে। তুমি এগুলি মন দিয়া পইড়া দেখো।
কাজী সাহেবকে স্বস্তির সাগরে ভাসিয়ে দূর থেকে ভেসে আসে বুলন্দ স্বরে মধুর আজান। কাজী সাহেবের হৃদয়ের তারে তারে প্রাণের শোণিত ধারে ভক্তির তুফানে ঢেউ ওঠে, আনন্দিত চিত্তে তিনিও বলে ওঠেন, আল্লাহ আকবার! নাফিসের মা, তুমি নাফিসের সঙ্গে আলাপ করোগা, আমি নামাজটা পইড়া আসি।
মিসেস কাজী বিরক্ত হয়ে দুপদাপ পা ফেলে বেরিয়ে যান ঘর ছেড়ে। কাজীর সঙ্গে দীর্ঘ তিরিশ বছরের সংসার জীবনে একটি সত্যই তিনি উপলব্ধি করেছেন, সব জরুরি কাজ তার নিজেকেই করতে হবে। কাজী কোনো কাজের না।
নাফিসের ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকে সবসময়। ছেলেটা বড় বেশি গুটিয়ে গেছে নিজের ভেতরে। কলেজে ওঠার পর থেকেই এই রোগ শুরু হয়েছে। এই বয়সের ছেলেদের ঘর আটকে ভেতরে বসে থাকার সুযোগ যতো কম দেওয়া যায়, ততো ভালো, বিলকিস আপা বারে বারে বলেন। রাতে খাবার টেবিলে বসে দরজা বন্ধ করে ভিতরে বসে কী করে জিজ্ঞাসা করলে নাফিস হুঁ হাঁ করে এড়িয়ে যেতে চায়। কাজী সাহেব ইঙ্গিতপূর্ণ কাশি কেশে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিতে চান বরাবরই। নাফিসের দাদী অবশ্য অনেক রসিক মহিলা, তিনি চোখ টিপে খিলখিল করে হেসে বলে, মুবাইল ফুনে ইশক মহাব্বত করস দাদাভাই? হায় রে আমাদের কিসমত, আমাদের আমলে ক্যান এই মুবাইল ফুন আইলো না!
মিসেস কাজী নাফিসের দরজায় শক্ত হাতে টোকা দেন। দরজায় একটা আরবি পোস্টার লাগানো, তাতে তলোয়ারের মতো করে আরবিতে কী যেন লেখা।
তিনবার টোকা দিয়ে সাড়া না পাওয়ার পর মিসেস কাজী গলা চড়িয়ে ডাকেন, নাফিস! বাবু দরজা খোলো! আম্মা জরুরি কথা বলবে।
নাফিসের চেয়ার হিঁচড়ে পেছনে সরার আওয়াজ পান মিসেস কাজী। সেকেণ্ড পনেরো পর নাফিস দরজা খুলে দেয়, তার মুখ যথারীতি গম্ভীর।
মিসেস কাজী শক্ত গলায় বলেন, আমার সঙ্গে আসো। তোমাকে কতগুলি বায়োডাটা দেখাবো, তোমার কোনটা পছন্দ হয় বলবা। ঠিকাছে?
নাফিস জড়ানো গলায় বলে, কীসের বায়োডাটা আম্মা?
কাজী সাহেব নকশী জায়নামাজ বগলে উৎফুল্ল মুখে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলেন, নাফিসের আম্মা, আমি গেলাম!
মিসেস কাজীর মাথায় রক্ত চড়ে যায়। লোকটাকে সংসারের কোনো জটিলতায় সঙ্গে পাওয়া যায় না। সবসময় সে সিঁদ কেটে পালানোর ধান্দায় থাকে। চুমকির বিয়ের সময়ও সে এইভাবে পিছলানোর তালে ছিলো। নাহ, আর সহ্য করা যায় না।
মিসেস কাজী গর্জে ওঠেন, নাফিসের আব্বা, তুমি এক্ষণ ডাইনিং রুমে গিয়া চেয়ার টাইনা বসো! তোমার ছেলের বিয়া আর তুমি নামাজের দোহাই দিয়া পলাইবা, এইসব চলতো না! এক্ষণ যাও, যাও কইলাম!
কাজী সাহেব ফ্যাকাসে মুখে বলেন, আরে নামাজটা পইড়া লই ...।
নাফিসও ঘড়ি দেখে ক্ষীণ গলায় বলে, আম্মা আমি নামাজটা পইড়া আসতেছি ... ।
মিসেস কাজী মাটিতে পা ঠুকে চিৎকার করে বলেন, এক্ষণ ডাইনিং রুমে গিয়া বয়! এক্ষণ যাবি!
নাফিস ঢোঁক গিলে এগিয়ে যায় ডাইনিং রুমের দিকে। সদর দরজার মাথায় পঁচিশ ওয়াটের বাল্ব জ্বলছে বলে কাজী সাহেবের কণ্ঠার ওঠানামা ভালোমতো ঠাহর করা যায় না।
মিসেস কাজী দুপদাপ পা ফেলে ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে বসেন। হাতের মুঠোয় ধরা বায়োডাটাগুলো নাফিসের সামনে সশব্দে আছড়ে রাখেন তিনি। "দেখো!"
কাজী সাহেব জায়নামাজ টেবিলের ওপরে ভাঁজ করে রেখে সন্তর্পণে নাফিসের পাশে চেয়ার টেনে বসেন।
নাফিস নিরাসক্ত মুখে প্রথম বায়োডাটা তুলে নেয় হাতে। আশি গ্রাম অফসেট কাগজে লেজার প্রিন্টারে ছাপানো ঝকঝকে বায়োডাটা, সাথে বেগুনি রঙের জেমস ক্লিপ দিয়ে আটকানো দুটি ছবি। সুশ্রী এক তরুণীর ছবি সেখানে, তার গলায় ওড়না।
মিসেস কাজী বলেন, এর নাম রুখসানা। তোদের ইউনিভার্সিটিতেই ফার্মেসিতে পড়ে। ওদের নিজেদের বাড়ি আছে খিলগাঁওয়ে। বাপ কাস্টমসে চাকরি করতো ... ।
নাফিস বায়োডাটা সরিয়ে রাখে। তারপর মাথা নাড়ে।
মিসেস কাজী খনখনে গলায় বলেন, কী হলো? ঠিকমতো তো দেখলিও না।
নাফিস আবার দেখে রুখসানার ছবি। সে মনস্থির করে, এই মেয়ের ছবি স্ক্যান করে সে "অই ছেড়ি ওড়না গলায় না দিয়ে বুকে দে কামে দিবো" ফেসবুক গ্রুপে তুলে দেবে। প্রতিশোধ প্রতিরোধ প্রতিবাদ কমরেড, গড়ে তোলো গড়ে তোলো গড়ে তোলো ব্যারিকেড।
"না আম্মা। এই মেয়েকে বিয়ে করা যাবে না। ও আন্নানা।" মৃদু কিন্তু শক্ত গলায় বলে নাফিস।
মিসেস কাজী কাজী সাহেবের দিকে তাকান, কাজী সাহেব গালে হাত দিয়ে উদাস চোখে বায়োডাটা হাতে তুলে দেখেন কিছুক্ষণ।
"আন্নানা কী?"
নাফিস কেশে গলা সাফ করে, তারপর বলে, মুয়াল্লেম শেখ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল উছাইমিন ফেয়সালা করে দিয়ে গেছেন, যেসব নারী সবসময় ঘ্যানঘ্যান করে, কান্নাকাটি করে, অভিযোগ করে, আর ... আর মাথায় পট্টি বেন্ধে রাখে, আর অসুখের কথা বলে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অসুখের ভান করে, তারা আন্নানা। তাদের শাদি করা যাবে না।
মিসেস কাজী বলেন, রুখসানারে চিনস তুই?
নাফিস বলে, হ। আমাদের ভার্সিটিতেই পড়ে তো।
মিসেস কাজী বলে, সে খালি ঘ্যানঘ্যান করে?
নাফিস বলে, আর অসুখের কথা বলে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অসুখের ভান করে।
মিসেস কাজী বলেন, কী অসুখ?
নাফিস কিছুক্ষণ চিন্তা করে, তারপর সিদ্ধান্ত নেয়, এ ব্যাপারে এখানেই থেমে যাওয়া ভালো। কিছু কিছু ব্যাপার বাবা মা যতো কম জানে ততো ভালো।
সে বলে, রুখসানা একজন আন্নানা। সবাই জানে।
মিসেস কাজী ফোঁস করে শ্বাস ফেলেন, কাজী সাহেব মনোযোগ দিয়ে রুখসানার বক্ষভ্রষ্ট ওড়নার ছবিটি দেখেন।
নাফিস পরের বায়োডাটা হাতে তুলে নেয়। কিছুক্ষণ নিষ্পলক মনোযোগী চোখে পড়ে দেখে নামিয়ে রাখে কাজী সাহেবের নামিয়ে রাখা রুখসানার বায়োডাটার ওপর।
মিসেস কাজী বলেন, ওর নাম কুলসুম। খুব পরহেজগার মেয়ে। সবসময় হিজাব করে। ওর বাবা ইসলামী ব্যাংকের ডিজিএম, শান্তিনগরে নিজেদের বাড়ি আছে, ইডেন কলেজে ইংলিশে পড়ে ... ।
নাফিস সংক্ষেপে শুধু বলে, ও মান্নানা।
মিসেস কাজী মনে মনে একটু হোঁচট খান। বলেন, তুই ওরে চিনস?
নাফিস মাথা নাড়ে, বলে, আমাদের সঙ্গে একই ব্যাচে দেবদুলাল স্যারের কাছে ফিজিক্স পড়তো।
কাজী সাহেব কুলসুমের বায়োডাটা তুলে নিয়ে ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ দেখে আবার রুখসানার বায়োডাটা তুলে নিয়ে দেখতে থাকেন।
মিসেস কাজী বলেন, মান্নানা মানে কী?
নাফিস কেশে গলা সাফ করে বলে, মুয়াল্লেম শেখ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল উছাইমিন ফেয়সালা করে দিয়ে গেছেন, যেসব নারী অন্যকে দামী উপহার বা সুযোগ সুবিধা দেয়, কিন্তু পরবর্তীকালে সেসবের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে খোঁটা দেয়, বলে আমি তোমার জন্য অমুক তমুক করিয়াছিলাম তুমি কি বিস্মৃত হইলে, তারা মান্নানা।
মিসেস কাজী বলেন, কুলসুম মান্নানা?
নাফিস নিঃশঙ্ক চিত্তে মাথা দোলায়।
মিসেস কাজী দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ছেলে ইসলামের রাস্তায় চললে কিছু সমস্যা হবে, বিলকিস আপা বলেছিলেন। সিরাতুল মুস্তাকিমের পথ সিধা, কিন্তু বন্ধুর।
পরেরটা দ্যাখ। তাড়া দেন তিনি।
নাফিস আরেকটি বায়োডাটা তুলে নেয় হাতে। আগের দুটির মতো এটিও ঝকঝকে অফসেট কাগজে ছাপা, সঙ্গে বেশ কয়েকটি নয়নাভিরাম আলোকচিত্র। ছবিতে মিষ্টি তাবাসসুমখচিতা এক তরুণী। কখনো গাছের নিচে, কখনো বাড়ির ছাদে, কখনো ক্যাম্পাসের ইঁটকাঠের সামনে।
মিসেস কাজী বলেন, ওর নাম চমন আরা। আইইউবিতে বিবিয়ে পড়ে। ওর নানা মাদারগাছির পীর। বাবা বিজনেস করে, বাড্ডায় ওদের নিজেদের বাড়ি আছে ... ।
কথা শেষ হবার আগেই নাফিসে হাত থেকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বেড়ালের মতো আলগোছে নেমে পড়ে কুলসুমের বায়োডাটার ওপরে।
মিসেস কাজী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন, কী হইছে?
নাফিস বলে, ও হান্নানা।
মিসেস কাজী বুক ভরে দম নেন। কাজী সাহেবের দিকে সংক্ষিপ্ত স্ট্রোবোস্কোপিক অগ্নিদৃষ্টি হানেন, কিন্তু কাজী সাহেব নিবিষ্ট মনে রুখসানার বায়োডাটা, কিংবা আরো নির্দিষ্ট করে বললে, বায়োডাটায় গাঁথা ছবি দেখছেন।
মিসেস কাজী নিজেকে মনে মনে সামাল দিয়ে বলেন, চিনস ওরে?
নাফিস মাথা দোলায়। মুখে কিছু বলে না।
মিসেস কাজী বলেন, হান্নানা কী?
নাফিস কেশে গলা সাফ করে বলে, মুয়াল্লেম শেখ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল উছাইমিন ফেয়সালা করে দিয়ে গেছেন, যেসব নারী নিজের আগের স্বামী অথবা আগের স্বামী হইতে প্রাপ্ত সন্তানাদির জন্য হাহাকার করে, তারা হান্নানা।
মিসেস কাজী বলেন, চমন আরার আগের স্বামী আইলো কইত্থিকা?
নাফিস বলে, স্বামী নাই। কিন্তু বয়ফ্রেন্ড ছিলো। আমাদের সঙ্গেই পড়ে। জারুলকাঠির পীরসাহেবের নাতি। ব্রেকাপ হয়া গেছে। চমন আরা তারে ভুলতে পারতেছে না।
মিসেস কাজী অধৈর্য হয়ে হাত নেড়ে পরবর্তী বায়োডাটার দিকে ইঙ্গিত করেন।
কাজী সাহেব বহু কষ্টে রুখসানার বায়োডাটা নামিয়ে রেখে চমন আরার বায়োডাটা তুলে নেন।
নাফিস পরবর্তী বায়োডাটা, যদিও তা হাতে লেখা, অনেক সময় ধরে দেখে। মিসেস কাজী আশাভরা চোখে কাজী সাহেবের দিকে তাকান, কাজী সাহেবও উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করেন।
কিন্তু নাফিস নামিয়ে রাখে বায়োডাটাখানা।
মিসেস কাজী বলেন, দেখলি? এই মেয়েটার নাম জহরে মিল্লাত, খুব ভালো মেয়ে। খুব খানদানী বংশের মেয়ে, সিরাজগঞ্জে বাড়ি। ঢাকায় চাচার বাসায় থাকে, ব্র্যাক ভার্সিটিতে লেখাপড়া করে। নিয়মিত নামাজ পড়ে, বাপের সঙ্গে গিয়ে ওমরা করে আসছে গত বছর ...।
নাফিস টলে না। সে বলে, ও হাদ্দাকা।
মিসেস কাজী কান খাড়া করে বলেন, কী?
নাফিস বলে, হাদ্দাকা।
মিসেস কাজী বান্নানা ফান্নানা জান্নানা কোনো কিছু শুনতে না পেয়ে একটু আশাবাদী হন। বলেন, হাদ্দাকা আবার কী?
নাফিস কেশে গলা সাফ করে বলে, মুয়াল্লেম শেখ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল উছাইমিন ফেয়সালা করে দিয়ে গেছেন, যেসব নারী শুধু এটাসেটা অবলোকন করে, তারপর সেগুলি কামনা করে, তারপর স্বামীর কাছে সেসব কিনে দেওয়ার বায়না করে, তারা হাদ্দাকা।
মিসেস কাজী বলেন, জহরে মিল্লাতের বয়ফেরেন্ডও কি তোগো লগে পড়ে?
নাফিস বলে, হ।
মিসেস কাজী তর্জনী আর মধ্যমা দিয়ে কপাল টিপে ধরেন, চোখ বুঁজে কিছুক্ষণ নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করেন, তারপর ভাঙা গলায় বলেন, আচ্ছা আরেকটা দ্যাখ।
কাজী সাহেব জহরে মিল্লাতের বায়োডাটা তুলে ছবি দেখেন নিষ্ঠার সাথে।
নাফিস পরবর্তী বায়োডাটা হাতে তুলে মন দিয়ে পড়ে। মিসেস কাজী ফোঁস করে শ্বাস ফেলেন।
নাফিস এবার কিছুটা অধৈর্য হয়ে একটু যেন জোরের সঙ্গেই নামিয়ে রাখে বায়োডাটা।
মিসেস কাজী ক্লান্ত কণ্ঠে বলেন, সুন্দর না মেয়েটা? তোর মোহসিন মামার কলিগের মেয়ে। বাপ আর্মি অফিসার, খুব টাইটের মধ্যে বড় করছে। এআইইউবিতে ভর্তি হইছিলো, কিন্তু ওরা নাকি লন্ডনে চাচার কাছে পাঠায় দিতে চায় মেয়েরে।
নাফিস বলে, সফদরিকে চিনি আমি। ও বাররাকা।
মিসেস কাজী কোনো প্রশ্ন করেন না আর, কেবল চেয়ে থাকেন।
নাফিস কেশে গলা সাফ করে বলে, মুয়াল্লেম শেখ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল উছাইমিন ফেয়সালা করে দিয়ে গেছেন, যেসব নারী দিনের বেশিরভাগ অংশ প্রসাধনে ব্যয় করে, এবং সাজতে সাজতে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যে দেখলে মনে হয় তার মুখ আসলে কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত করা, তারা বাররাকা।
কাজী সাহেব বলেন, নাফিস ঠিকই কইছে।
মিসেস কাজী হঠাৎ যেন বলি-উপযোগী মেষ খুঁজে পান হাতের কাছে, তিনি দাঁতে দাঁত ঘষে কাজী সাহেবকে ধমকে বলেন, থামো তুমি, খালি পাকনা পাকনা কথা তোমার! নাফিস তুই পরেরটা দ্যাখ।
নাফিস গম্ভীর রুষ্ট অতৃপ্তি নিয়ে পরের বায়োডাটা দেখে। কাজী সাহেব আড়চোখে মিসেস কাজীকে একবার দেখে নিয়ে রুখসানার বায়োডাটা তুলে নেন আবার।
নাফিস রুষ্ট তাজিমের সঙ্গে পরবর্তী বায়োডাটাটিও নামিয়ে রাখে।
মিসেস কাজী যান্ত্রিকভাবে বলেন, ওর নাম নূরে কান্দাহার। ওর বাপ জয়েন্ট সেক্রেটারি, সামনে বিম্পি পাওয়ারে আসলে ফুল সেক্রেটারি হয়ে যাবেন শুনলাম। এখন ওএসডি হয়ে আছেন, বেচারা। ওদের বাড়ি আছে গুলশান দুই নাম্বারে, ইকুয়েডরের দূতাবাসের পাশে। ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী, কিন্তু খুব ভালো মেয়ে। শুঞ্ছি তোর মতোই হাদিসকোরান নিয়ে লেখাপড়া করে সারাদিন।
নাফিস ভুরু কুঁচকে বলে, ও শাদ্দাকা।
মিসেস কাজী মনে মনে ভেঙে পড়েন। বিলকিস আপা বলেছিলেন, মাঝে মাঝে সমস্যা হবে। কিন্তু তাই বলে এরকম? মুয়াল্লেম শেখ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল উছাইমিনের বইপত্র খুঁজে বের করে পুড়িয়ে ফেলার অপশনটা আবছাভাবে বিবেচনা করে দেখেন তিনি।
নাফিস কেশে গলা সাফ করে বলে, মুয়াল্লেম শেখ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল উছাইমিন ফেয়সালা করে দিয়ে গেছেন, যেসব নারী বেশি কথা বলে, তারা শাদ্দাকা।
মিসেস কাজী বলেন, তুই ওরে ক্যামনে চিনস?
নাফিস বলে, হিজবের একটা মিটিঙে আসছিলো। আম্মা, ও শাদ্দাকা।
কাজী সাহেব গলা খাঁকরে বলেন, না না শাদ্দাকা আর চলবে না।
মিসেস কাজী আগুনঝরা চোখে কাজী সাহেবের দিকে তাকিয়ে ঈষৎ আমিষগন্ধী "আর" শব্দটা কতোখানি নিরীহ আর কতোখানি মতলববাজিতে ভরা, তা বিশ্লেষণ করতে করতে বলেন, আচ্ছা পরেরটা দ্যাখ।
নাফিস অবশিষ্ট বায়োডাটা তুলে নিয়ে উদাস চোখে দেখে, কাজী সাহেব স্ত্রীর অগ্নিদৃষ্টির মুখোমুখি না হয়ে সাবধানে বায়োডাটার স্তুপকে গুছিয়ে দৈর্ঘ্যে আর প্রস্থে মেলাতে থাকেন।
নাফিস বায়োডাটা নামিয়ে রাখে, মিসেস কাজী ফুঁপিয়ে উঠে বলেন, এই মেয়েটা একেবারে সর্বাঙ্গ সুন্দরী। দ্যাখ কী পরীর মতো ফুটফুটে, পাঁচ অক্ত নামাজ পড়ে, তিলাওয়াত করে নতুন কুঁড়ি পুরস্কার পাইছিলো, বেইলি রোডে বাড়ি আছে নিজেদের, আমি মেয়েটারে অনেক দেখছি ... ।
নাফিস চেয়ারে হেলান দিয়ে বলে, শামশিরাকে চিনি আমি। ও কাইয়াতুল ক্কাফা।
মিসেস কাজী স্তব্ধ হয়ে যান।
কাজী সাহেব সোৎসাহে বলেন, এরা বেশি খায় নাকি?
নাফিস কেশে গলা সাফ করে বলে, মুয়াল্লেম শেখ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল উছাইমিন ফেয়সালা করে দিয়ে গেছেন, যেসব নারীর গর্দানে দাগ আছে, অর্থাৎ তার নামে সমাজে বদনাম আছে, বা লোকজন তার সুনাম সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করে, তারা কাইয়াতুল ক্কাফা।
মিসেস কাজী ভাঙা গলায় চিৎকার করে বলেন, তুই শামশিরার গর্দান দেখলি কই? আমি নিজে দেখছি ওর গর্দানে কোনো দাগ নাই!
নাফিস বলে, দাগ তো গর্দান ছাড়া অন্য কোথাও থাকতে পারে।
কাজী সাহেব সন্দিগ্ধ কণ্ঠে বলেন, যেমন?
নাফিস আর ব্যাখ্যা করে না। সে এক রহস্যময় মৌনতা অবলম্বন করে বসে থাকে প্রশান্ত আলেমসুলভ গাম্ভীর্য নিয়ে। কিছু কিছু ব্যাপার বাবা মা যতো কম জানে, ততোই ভালো। বিশেষ করে মেয়েদের গায়ে দাগদুগ সংক্রান্ত ব্যাপারে।
মিসেস কাজী শেষ খড়কুটো হিসেবে অযোগ্য কাজী সাহেবকেই আঁকড়ে ধরেন, তোমার ছেলের কথা শুনলা? কিছু বলো ওরে। বুঝায় বলো। ও এগুলি কী বলে?
কাজী সাহেব কেশে বলেন, নাফিস এই মুয়াল্লেম সাহেবের বইটা আমারে দিস তো পড়তে। উনি কী বলছেন, আগে আমি বুইঝা লই। তারপর আবার বায়োডাটা নিয়া বসা যাবে।
নাফিস কিছু বলে না।
মিসেস কাজী অশ্রু সংবরণ করে বলেন, আচ্ছা, আমি আলমগীররে আবার খবর দিতেছি। দ্যাশে কি মেয়ের অভাব পড়ছে নাকি? নাফিস তুই যা, নামাজ পড় গিয়া।
নাফিস উঠে দাঁড়িয়ে বলে, আসসালামু য়ালাইকুম। তারপর নিজের ঘরে ঢুকে আলগোছে দরজা লাগিয়ে দেয় আবার।
কাজী সাহেব জায়নামাজ হাতে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, নামাজটা তাইলে বাসাতেই পড়ি। নাফিসের আম্মা, একটু চা-চু দিও আমারে।
মিসেস কাজী স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন। বিলকিস আপা যা বলেছিলেন, সেটাই তার মনে আবার সন্দেহ হয়ে দেখা দেয়। নাফিসকে বিয়েশাদি করিয়ে দেশে ধরে রাখা যাবে না, আমৃকা সে যাবেই যাবে।

তাশাক্কুর:
ইসলামী মাসআলা সংক্রান্ত এলেম দ্রোহীর সৌজন্যে পাওয়া। জাযাকুল্লাহ খায়ের।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।