Wednesday, October 24, 2012

লেক্স ট্যালিওনিস

একটা ছেলের নাম বলুন।
খোকন?
আচ্ছা, ঠিকাছে। এইবার একটা মেয়ের নাম বলুন।
সুমি?
ঠিকাছে। ঐ যে দেখুন, রিকশায় চড়ে বেড়াতে বেরিয়েছে এক যুগল। খোকন আর সুমি। ঐ যে বেগুনি গেঞ্জি, ধূসর জিন্সের প্যান্ট পরা, ও খোকন। আর ঐ যে হালকা কমলা শাড়ি আর গাঢ় কমলা ব্লাউজ পরা ...।
ও-ই সুমি। বুচ্ছি।
বাহ, খুব অবজারভ্যান্ট আপনি। নিশ্চয়ই ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়েছিলেন?
হ।
আপনাকে দেখেই বোঝা যায়। তো, খোকন আর সুমিকে দেখুন ভালোমতো।
এদের এই অবস্থা ক্যান?
কোন অবস্থার কথা বলছেন?
রিকশায় এতো জায়গা থাকার পরও দুইজনই শরীরের অর্ধেকটা বাইরে ঝুলিয়ে বসে আছে কেন?
বাহ, খুব অবজারভ্যান্ট আপনি।
আমি ক্লাস এইটেও বৃত্তি পেয়েছিলাম।
আপনাকে দেখেই বোঝা যায়।
কিন্তু ওরা এইভাবে বসে আছে কেন?
কত কারণই তো থাকতে পারে। হয়তো খোকনের মানিব্যাগে আজ অনেক টাকা। কিংবা টাকা অল্পই, কিন্তু সব দুই টাকার নোটে। মানিব্যাগের ওজনের কারণে হয়তো বেচারার একখানা নিতম্ব বাতাসে ভেসে আছে। সিম্পল লিভার অ্যাকশন।
দুই টাকার নোটের এত ওজন?
হতেই পারে।
সুমিও কি দুই টাকার নোটের বান্ডিল নিয়ে বের হয়েছে?
সুমির ক্ষেত্রে অবশ্য এই ব্যাখ্যাটা খাটে না। কারণ খোকনের সঙ্গে বের হলে সুমি সঙ্গে টাকা নেয় না। হয়তো সুমি রূপার বিছা পরে কোমরে।
রূপার বিছার এত ওজন?
রূপার স্পেসিফিক গ্র্যাভিটি ১০৪৯০ কেজি পার কিউবিক মিটার।
ও।
আমিও ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়েছিলাম।
আচ্ছা।
অবশ্য এ সবই হাইপোথিসিস। আসল কারণটা অন্য রকম হতে পারে।
তাই?
হ্যাঁ। ঐ দেখুন খোকন আর সুমি ফুচকা খেতে নেমেছে।
খোকন আর সুমি এইভাবে হাঁটে কেন?
হয়তো দুই টাকার নোটের বাণ্ডিল আর রূপার বিছার কারণে সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি পাল্টে গেছে বেচারাদের।
দেখে তো মনে হচ্ছে ...।
আপনি এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছিলেন।
হ।
দেখেই বোঝা যায়। যাই হোক। এখন দেখেন খোকন আর সুমি কী করে।
ফুচকার অর্ডার দিলো মনে হচ্ছে।
হ্যাঁ। কিন্তু দেখুন, এতোগুলো খালি চেয়ার, কিন্তু ওরা বসছে না।
ফুচকা তো দাঁড়িয়েও খাওয়া যায়।
তা যায়। কিন্তু আশেপাশে দেখুন আরো যুগলেরা ফুচকা খেতে এসেছে। মনে করুন ঐ যে লাল শার্ট কালো প্যান্ট লোকমান আর নীল কামিজ সাদা সালোয়ার বদরুন্নেসা, ওরা কিন্তু বসেই খাচ্ছে।
বদরুন্নেসা তো মেশিনের মতো ফুচকা ওড়াচ্ছে ভাইডি।
হুঁ। তারপর দেখুন কালো শার্ট লাল প্যান্ট হরিপদ আর হলুদ শাড়ি হলুদ ব্লাউজ মহানন্দা, ওরাও বসে খাচ্ছে।
হরিপদের প্লেট থেকে ফুচকা ওড়াচ্ছে মহানন্দা।
আহা ভাই এমন করেন কেন। আসল কথা হচ্ছে ওরা বসে খাচ্ছে। কিন্তু খোকন আর সুমি দাঁড়িয়ে। এই যে দেখুন ফুচকাওয়ালা মামু অর্ডার সার্ভ করলো। কিন্তু ওরা দাঁড়িয়েই খাচ্ছে। এই ভারি কাচের প্লেট হাতে নিয়ে কেন ওরা দাঁড়িয়ে খাচ্ছে?
কাচের স্পেসিফিক গ্র্যাভিটি কত?
অনেক।
হুমমম। ফুচকার স্পেসিফিক গ্র্যাভিটি কত?
কম নয়।
হুমমম। হ, ভারিই হবে। হয়তো কাচের প্লেটে আটটা করে ফুচকা নিয়ে দাঁড়ালে ওদের সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি আবার ঠিক হয়ে যায়?
হতেই পারে। কিন্তু না-ও হতে পারে।
হইছে কী সেইটা বলেন না কেন?
খোকন আর সুমি দুইজন দুইজনকে খুব ভালোবাসে আসলে। ওদের প্রেম অমর।
তো?
ওরা বাংলাদেশকেও খুব ভালোবাসে। মাঝেমধ্যে ওরা দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গায় বেড়াতে যায়।
তো?
যেমন ধরেন ময়নামতি, সাভারের স্মৃতিসৌধ। পুরনো মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা। মহাস্থানগড়। পুরনো জমিদারবাড়ি। বৌদ্ধবিহার। এইসব জায়গায়।
তো?
স্থাপত্যের প্রতি ওদের একটা অপত্য স্নেহ আছে আর কি।
তো?
যেখানেই যায়, সেখানেই ওরা একটা দাগ রেখে আসতে চায়। এক ফোঁটা শিশির ফেলে আসতে চায়। ধরেন, যারা পরে সেখানে বেড়াতে যাবে, তারা যেন বুঝতে পারে, খোকন সুমিকে ভালোবাসে।
তো?
সেজন্য খোকন সঙ্গে করে একটা চকের বাক্স নেয়। আর সাইনপেন। আর স্প্রে পেইন্ট। বিভিন্ন রঙের। সাদা, কালো, লাল, নীল। মাঝে মাঝে হলুদ।
আচ্ছা।
তারপর যেখানেই যায় সেখানেই এক ফাঁকে দেয়ালে বড়বড় করে লেখে, খোকন + সুমি।
ইকুয়ালস টু হোয়াট?
সমীকরণের ঐ পাশটা ওরা এখনও ফাঁকা রেখেছে। ওরা দুজনই সচেতন। বাঁচতে হলে জানতে হবে।
ও।
কিন্তু মাঝেমধ্যে একটা হৃদয়চিহ্নও আঁকে খোকন। সেইটার ভিতরে লেখে খোকন। তার নিচে লেখে সুমি।
সুমির ওপর খোকন?
মাঝেমধ্যে উল্টোটাও লেখে। খোকনের ওপর সুমি। এ নিয়ে খোকনের মধ্যে কোনো গোঁড়ামি নেই।
আচ্ছা।
তো সেদিন তারা গিয়েছিলো এক পুরনো জমিদার বাড়িতে। বলদিয়ার জমিদার বাড়ি। ইরাদিয়া পরিবারের নাম শুনেছেন?
হ্যাঁ। চোর বাটপার দিয়ে ভর্তি। কী করেছে তারা?
তারা কিছু করেনি। ইরাদিয়া পরিবারের এস্টেটে সুন্দর দুইটা গোলঘর আছে। সেই বৃটিশ আমলে তৈরি। মার্বেল পাথরের। ছাদটা কাচের। জমিদার বুলন্দ হায়দার ইরাদিয়া ঐ গোলঘরে বসে বৃষ্টি দেখতেন। তারা দেখতেন।
দুইটা গোলঘর কেন?
একটা বুলন্দ হায়দারের জন্য। আরেকটা তার কনিষ্ঠা ভার্যা গুলবদন ইরাদিয়ার জন্য। উনি ঐ গোলঘরে বসে বুলন্দ হায়দারের উপর নজরদারি করতেন। যাতে বুলন্দ হায়দার তারা দেখার নাম করে রাতের বেলা অতিরিক্ত শরবত পান বা বাঈজি সংসর্গ না করেন।
আচ্ছা।
তারাও একে অপরকে বড় ভালোবাসতেন। পয়সার অভাবে বুলন্দ হায়দার তাজমহল বানাতে পারেননি। দুইটা গোলঘর বানিয়েই ক্ষান্ত দিয়েছিলেন।
আচ্ছা।
তো সেই গোলঘরে অনেক পর্যটক যায়। খুব সুন্দর কারুকার্য করা স্থাপত্যকর্ম। ফরাসী নকশাকার এনে বানানো হয়েছিলো। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে। খানিকটা বারোক ছোঁয়া আছে যদিও।
আচ্ছা।
তো খোকন আর সুমি একদিন বাসে করে সেই গোলঘর দেখতে হাজির।
হুমমম।
শুনশান দুপুর। আশেপাশে কেউ নেই।
বটে?
খোকন আর সুমিই শুধু সেই গোলঘরে।
কোন গোলঘরে? বুলন্দেরটায় না গুলবদনেরটায়?
গুলবদনেরটায়।
আচ্ছা। তারপর?
তখন বসন্তকাল। মৃদুমন্দ সমীরণ চলছে। অ্যামবিয়েন্ট টেম্পারেচারও প্রেমবান্ধব। দূরে লাল নীল হলুদ ফুল ফুটে আছে। ভ্রমরার গুঞ্জন কানে শোনা যায়। গাছের ডালে একটা পরিযায়ী পাখি ডাকছে, কুকুকু।
খুব উসকানিমূলক আবহাওয়া।
হ। খোকন তখন সুমিকে একহাতে জড়িয়ে শক্ত করে বুকের কাছে টেনে নিলো।
ওহ নো। তারপর?
সুমিও খোকনের গায়ে হেলান দিয়ে চোখ বুঁজলো।
আরে বলেন কী?
খোকন তখন জিপার খুললো।
ছিছিছিছিছি। তারপর?
তারপর স্প্রে পেইন্টের কৌটাটা বের করলো ব্যাগ থেকে।
ওহ। ঐ জিপার। তারপর?
তারপর গুলবদনের গোলঘরের মার্বেল পাথরের ধবধবে সাদা অসূর্যম্পশ্য অনাঘ্রাত দেয়ালে টকটকে লাল স্প্রে পেইন্ট দিয়ে লিখলো "খোকন + সুমি"।
তারপর?
তারপর সুমিকে জড়িয়ে ধরে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেলো বুলন্দ হায়দারের গোলঘরটার দিকে।
তারপর?
বাতাসে তখনও ভ্রমরা, পাখি, ফুল ইত্যাদির ঘনঘটা।
বুচ্ছি।
খোকন বুলন্দ হায়দারের গোলঘরের সামনে পৌঁছে সুমিকে আরেকটু কাছে টেনে নিলো।
বুচ্ছি।
সুমিও খোকনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
বুচ্ছি।
খোকন স্প্রে পেইন্টের ক্যানটা উঁচিয়ে যেই না গোলঘরের দেয়ালে একটা কিছু লিখতে যাবে, অমনি ঘটে গেলো এক আশ্চর্য ঘটনা।
কী?
গোলঘরের দেয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো দুটো মার্বেলের হাত।
য়্যাঁ?
সেই হাতে ধরা একটা গনগনে লোহার শিক।
বলেন কী?
সেই হাত খোকন আর সুমিকে এক চটকানা মেরে মাটিতে ফেলে দিলো।
তারপর?
তারপর দুজনকেই উপুড় করে ঠেসে ধরলো মাটিতে।
ইয়া ক্ষুদা! তারপর?
তারপর খোকনের প্যান্ট আর সুমির সালোয়ার ইঞ্চি আষ্টেক নিচে নামালো টেনে।
ওহ নো! তারপর তারপর?
তারপর হাতে ধরা সেই গনগনে শিক দিয়ে খোকনের একখানা নিতম্বে লিখলো "বুলন্দ +", আর সুমির একখানা নিতম্বে লিখলো "গুলবদন"!

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।