Wednesday, August 22, 2012

আবাহন


১.
"উনি একজন বুজরুক ছিলেন।" শামীমের কণ্ঠস্বরে তাচ্ছিল্যের কোনো কমতি রইলো না।
সোমা একটু শাসন করার চেষ্টা করলো স্বামীকে, "নিজের দাদাকে কেউ বুজরুক বলে এভাবে?"
শামীম বারান্দার কাঠের রেলিঙে পা তুলে দিয়ে আয়েশ করে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললো, "এই শর্মা বলে। আর টেকনিক্যালি, উনি আমার আপন দাদা নন। বাবার চাচা। ওয়েইট। বাবার আপন চাচাও নন। দাদার ফুপাতো ভাই ছিলেন। ইয়েস, ফুপাতো ভাই। কাজেই আমি ওনার বদনাম করতেই পারি, নিজের দাদার চামড়া বাঁচিয়ে ... কী বলিস তোরা?"
নাসিফ কাঁধ ঝাঁকালো। "তুই তোর দাদার বদনাম যত খুশি কর, আমার কী? আপন দাদাই হোক আর ফুপাতো দাদাই হোক।"
মৌরি হাত বাড়িয়ে নাসিফের বাহুতে চিমটি কাটলো। শামীমের বাগানবাড়িতে বেড়াতে এসে তার দাদার বদনামে সায় দেয়াটা ভদ্র মনে হচ্ছে না তার কাছে।
নাসিফ চোখ গোল করে মৌরির দিকে ফিরে বললো, "চিমটাও ক‌্যানো?"
সোমা মৌরির চেহারার অভিব‌্যক্তি পাল্টে যেতে দেখে দুই হাতে মুখ ঢেকে হেসে ফেললো। এই পরিস্থিতি তার অচেনা নয়। ভরা মজলিশে বেফাঁস কথাবার্তা বলায় শামীমের অভিজ্ঞতাও কম নয়, তাকে আলগোছে সতর্ক করতে গেলে সেও এভাবে সকলের সামনে চিমটির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। নাসিফ শামীমের ঘনিষ্ট বন্ধু কি আর সাধে?
প্রসঙ্গ পাল্টাতে মৌরি তাড়াহুড়ো করে বললো, "বুজরুক মানে কিন্তু বুজুর্গ ... মানে, ঐ যে, কী বলে, সাধু ব্যক্তি। দরবেশ।"
শামীম চায়ের কাপে অনাবশ্যক সশব্দ চুমুক দিয়ে বললো, "তাই নাকি? আমি তো জানতাম বুজরুক মানে ভণ্ড।"
মৌরি হাত নেড়ে আলাপটাকে ভাষাতত্ত্বের কানাগলিতে ঢোকানোর চেষ্টা করলো, "হ্যাঁ ... কিন্তু এসেছে বুজুর্গ থেকে। বুজুর্গ লোকজনের কাণ্ডকারখানা দেখতে দেখতে অতিষ্ঠ হয়ে লোকজন এর মানেটাই পাল্টে দিয়েছে। তাই না চুমকি?"
চুমকি রোদ থেকে দূরে মনমরা হয়ে বসে ছিলো, নিজের নাম শুনে একটু চমকে উঠলো সে। "কী?"
মৌরি চায়ের কাপটা তুলে সোমার দিকে তাকিয়ে নীরবে কানাগলিতে রিলে রেসের ব্যাটনটা তার হাতে তুলে দিলো। সোমা চুমকির দিকে ফিরে বললো, "বুজরুক! বুজরুক মানে বুজুর্গ, তাই না?"
চুমকি গম্ভীর হয়ে বললো, "বুজরুক বুজুর্গ হবে কেন? বুজুর্গ মানে আলেম!"
নাসিফ মৌরির দিকে তাকিয়ে চোখ মিটমিট করলো। চুমকি খুবই ধর্মকাতর, পান থেকে চুন খসলেই সে লম্বা লম্বা লেকচার দিতে থাকে। বুজরুক-বুজুর্গ তত্ত্বে সে নিশ্চিতভাবেই ধর্মের অপমান আবিষ্কার করে বসতে পারে।
সোমা থতমত খেয়ে মৌরির দিকে তাকিয়ে ব্যাটনটা আবার ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু মৌরি ততক্ষণে অন্যদিকে তাকিয়ে চায়ের কাপে হাসি লুকিয়ে চুমুক দিচ্ছে।
"না না, মানে, বুজুর্গ শব্দটা থেকে বুজরুক এসেছে। ধরো গিয়ে, মমমম ... ধরো, কী আছে এমন আর ... মস্তান! মস্তান মানে তো মত্ত, মাতাল। কিন্তু আমরা তো মস্তান বলতে বুঝি গুণ্ডা। এরকম কিছু শব্দ আছে না, যেমন ধরো, অর্থ একটা, কিন্তু লোকে অন্য অর্থ বোঝানোর জন্য বলতে বলতে একসময় মানেই পাল্টে ফেলে? অ্যাই শামীম, এরকম হয় না?"
শামীম নির্দোষ মুখে সোমাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিলো, "না তো? এরকম হয় নাকি? যাহ!"
সোমা শামীমের পাঁজরে আঙুলের গাঁট দিয়ে খোঁচা দিলো। চুমকি মাথার স্কার্ফটা হাত দিয়ে টেনে ঠিক করে গম্ভীর গলায় বললো, "বুজুর্গ হচ্ছেন আলেম ওলামারা। আর বুজরুক হচ্ছে ভণ্ড। পীরফকির। দুইটা দুই জিনিস।"
নাসিফ চায়ের কাপে ফড়াৎ করে চুমুক দিয়ে বললো, "ঠিক। যেমন ডাব আর নারিকেল। বুজুর্গ আর বুজরুকের মধ্যে পাকনামির মাত্রার একটা পার্থক্য আছে। বুজুর্গ পেকে বুজরুক হয়। তারপর, চালভাজা আর মুড়ি। কড়াইতে চাল ছেড়ে দিলেই চালভাজা, কিন্তু মুড়ি হতে গেলে সেটাতে বালু থাকতে হবে। সঠিক সঙ্গ পেলে বুজুর্গ লোক ফুলে ফেঁপে ফর্সা হয়ে বুজরুক হয়ে ওঠে।"
চুমকি গম্ভীর চোখে মামাতো ভাইকে নীরবে তিরস্কার করে আবার বেতের চেয়ারে হেলান দিলো। নাস্তিকমার্কা চালিয়াতি কথা বলায় নাসিফ ওস্তাদ, তার সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। একশো একটা যুক্তি দিয়ে ধর্মকে কাবু করে ছেলেমানুষি আনন্দ পায় নাসিফ। এদের সঙ্গে বেড়াতে আসাই ঠিক হয়নি।
শামীম চোখের কোণে চুমকিকে দেখে নিয়ে বললো, "এনিওয়ে, আমার কুটি দাদা বুজরুকই ছিলেন। তবে মৌরি, কিছু লোক ওনাকে বুজুর্গই ভাবতো। তারা চালপড়া পানিপড়া কুমড়াপড়া ইত্যাদি হাবিজাবি নেয়ার জন্য লাইন দিতো ওনার কাছে।"
মৌরি কেটলি থেকে আরেকটু চা ঢেলে নিলো নিজের কাপে। তার খুব ভালো লাগছে এখানে এসে। শামীমদের বাগানবাড়ি মির্জাপুরে। বেশ বড়সড় জায়গা নিয়ে উঁচু পাঁচিলে ঘেরা কম্পাউন্ড, চারদিকে ফলের গাছ, ছোট্টো একটা পুকুরও আছে। দুটো ইংরেজি এল-আকৃতির বাংলো-টাইপ বাড়ি, আর কিছু দূরে একটা কাঠের দোতলা বাড়ি নিয়ে জায়গাটা ছবির মতো সুন্দর। সবকিছুই বেশ পরিপাটি। ঢাকার চড়া শব্দ আর ধোঁয়ার ভারে নুয়ে পড়া বাতাসের ঝুল যেন বুক থেকে সরে যাচ্ছে এখানে এসে। গত রাতে এসে ঠিক বোঝা যায়নি আশপাশটা কেমন, কিন্তু আজ সারাদিন ঘুরেফিরে, পুকুরে ছিপ দিয়ে মাছ ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করে, কিছুক্ষণ ব্যাডমিন্টন খেলে, আর বহুদিন পর একটা পেয়ারা গাছে চড়ে পেয়ারা পেড়ে খেয়ে তার খুব ভালো লাগছে। পরশু আবার তারা ফিরে যাবে ঢাকায়। মৌরি চায়ের স্রোতে সে চিন্তাটাকে চুবিয়ে মারার চেষ্টা করতে লাগলো।
চুমকি নাক দিয়ে একটা শব্দ করলো, যার সম্ভাব্য অর্থ হতে পারে, কোনো সন্দেহ নেই, শামীমের কুটি দাদা লোকটা বুজরুক। চালপড়া পানিপড়া কুমড়াপড়া কখনোই কারো কোনো কাজে আসতে পারে না। তবে হ্যাঁ, খালেস দিলে আল্লাহর কাছে নামাজ পড়ে মুনাজাত করলে আল্লাহ হয়তো তার বাসনা পূর্ণ করতে পারেন।
নাসিফ নিজের ফুপাতো বোনকে চটিয়ে মজা পায়, সে কাজের ফাঁকে মাঝেমধ্যে প্রায়ই চুমকির ফেসবুক ওয়ালে নানা উদ্ভট গুজব শেয়ার করে আসে। কোন নভোচারী মুসলিম হয়ে গেছে, কোন বিজ্ঞানী মাছের গায়ে আল্লাহু লেখা দেখে খৎনা করে নাম পাল্টে আবু হামজা রেখেছে, এইসব খবর সে যত্নের সাথে জমিয়ে রাখে, কোন একদিন মুষলধারে চুমকির ওয়ালে পেস্ট করে আসার জন্য। বাতিল আর তাগুতের বিরুদ্ধে চুমকির লড়াকু ফেসবুক-জীবনে সে সহযোগিতার হাতই বাড়িয়ে দিতে চায়।
"বলিস কী? খুবই কামেল আদমি ছিলেন মনে হচ্ছে?" নাসিফ মৌরির দিকে চায়ের খালি কাপটা বাড়িয়ে ধরলো।
"যারা লাইন দিতো ওনার কাছে, তারা সেরকমই ভাবতো। তবে," একটা আলুর বড়া চামচে গেঁথে তুলে কামড় দিলো শামীম, "উনি কিন্তু লোকজনকে চালপড়া পানিপড়া কুমড়াপড়া দিতেন না।"
সোমা শামীমের কুটি দাদার কথা অল্পস্বল্প শুনেছে পারিবারিক আলাপে, তার কৌতূহল তাই অন্যদের চেয়ে কম নয়। বাংলোর বারান্দায় বসে কুচকুচে কালো কাঠে তৈরি দোতলা বাড়িটাকে দেখলে যে কারো মনে কৌতূহল জাগবেই।
বাড়িটায় কোনো জানালা নেই।
"তাহলে ওনাকে বুজরুক ডাকো কেন?" সোমা নিজেও একটা আলুর বড়া তুলে নিলো প্লেট থেকে। মনু চাচী মারাত্মক বড়া ভাজতে জানে।
শামীম কাঁধ ঝাঁকালো। "উনি ভূতপ্রেত দত্যিদানো রাক্ষসখোক্কস নিয়ে গবেষণা করতেন। ওনার ধারণা উনি ঐসবের সাথে যোগাযোগ করতে পারতেন। এই শখের পেছনে উনি প্রচুর টাকাপয়সাও নষ্ট করেছেন। ঘরসংসার করেননি, দিনরাত ঐ বাড়িটার একতলায় বশে যন্তরমন্তর হিংটিংছট করতেন, আর মাঝেমধ্যে হুটহাট বাড়ি ছেড়ে এদিকসেদিক চলে যেতেন। আমি যখন ছোটো ছিলাম, তখন বাবাকে দেখেছি বেশ কয়েকবার লোক পাঠিয়ে তাকে উদ্ভট সব জায়গা থেকে আবার বাড়িতে নিয়ে আসতে। বিপদে পড়লে উনি টেলিগ্রাম করতেন বা চিঠি লিখতেন, আমি অমুক জায়গায় আছি, টাকাপয়সা শেষ, আমাকে এসে নিয়ে যাও। সে এক যন্ত্রণা ছিলো।"
মৌরি মাথা নেড়ে বললো, "আহহা, তাহলে বুজরুক বলছেন কেন? বেচারার মাথায় সমস্যা ছিলো বলেন।"
শামীম আঙুল নেড়ে বাতাসে একটা কঠিন নেতিবাচক উত্তর আঁকলো। "মোটেও না। খুবই ট্যাটনা ছিলেন কুটি দাদা। বিশেষ করে যখন টাকাপয়সার দরকার হতো। বাবা যখনই বলতো টাকা দেয়া যাবে না, উনি ঠিকই কীসব জমির হিসাব ধানের হিসাব করে ফেলতেন মুখে মুখে। মাথায় কোনো সমস্যা তার ছিলো না। লোকটা এমনকি ডায়রিও লিখতো।"
সোমা আগ্রহভরে জানতে চাইলো, "কোথায় সেই ডায়রি?"
শামীম আলুর বড়া চিবাতে চিবাতে তাচ্ছিল্যের সাথে হাত নেড়ে বললো, "কয়েকটা ডায়রি আছে ঐ বাড়িতেই, যদি তেলাপোকায় কেটে না থাকে। আর বেশ কিছু ডায়রি কুটি দাদা পুড়িয়ে ফেলেছে।"
মৌরি বললো, "পুড়িয়ে ফেললেন কেন?"
শামীম কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো, "উনি দুইদিন পরপরই এটাসেটা পুড়িয়ে ফেলতেন। ঐ বাড়িতেও নাকি একবার আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। রশিদ চাচা এখানে না থাকলে হয়তো নিজেও পুড়ে মরতেন। ওনাকে এই কারণেই আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে, যাকে বলে, খেদিয়ে এই বাগানবাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিলো। দাদা যতদিন বেঁচে ছিলেন, উনি বেশি গণ্ডগোল করার চান্স পান নাই, কিন্তু দাদা মারা যাওয়ার পর ইচ্ছামতো গিদরামি করেছেন। আমরা ছিলাম ঢাকায়, আমার এক চাচা ছিলেন গ্রামে, এই বাড়ি দেখাশোনা করতেন রশিদ চাচা, আর কুটি দাদা রশিদ চাচাকে পাত্তা দিতেন না। খুব জ্বালান জ্বালিয়েছে লোকটা।"
নাসিফ বললো, "তোরা এইরকম একটা ক্যারেক্টারকে একটু তেল-কালি মাখাইতে পারলি না? তোরা শালা টাঙ্গাইলের লোকজনগুলি এমন গা-ছাড়া ... একটু উদ্যোগ নিলেই কিন্তু মারদাঙ্গা আগুন পীর মাঠে নামায় দিতে পারতি। তোর দাদা এইসব বিটলামি ... কী হইলো, চোখ গরম করস ক্যান ... ওহ অলরাইট, তোর আপন দাদা না, ফুপাতো দাদা, হোয়াটেভার, উনি এইসব বিটলামি এরশাদের আমলে করতো না? এরশাদ তো খুবই এলিজিবল মুরিদ ছিলো, প্রায়ই এই পীর ঐ পীরের দরবারে তশরিফ রাখতো। তোদের পক্ষ থেকে একটু উদ্যোগ থাকলে এই জায়গা এতোদিনে হাইফাই পীরের গদি হয়ে যেতো। ঐদিকে ফালতু জাম্বুরা গাছটাছ কেটে একটা হেলিপ্যাড বানায় দিতে পারলেই মন্ত্রীমিনিস্টার মুরিদ কালেকশন সহজ হয়ে যেতো। বেকুব কি আর গাছে ধরে? আরে ... চিমটাও ক্যানো? ব্যথা পাই তো!"
মৌরি চোখ পাকিয়ে নাসিফকে নিরুচ্চারে কয়েক সেকেন্ড ধমকে বললো, "উনি তো দেখি পুরোই প্রফেসর শঙ্কু আর হ্যারি পটার ঘুটা দিয়ে বানানো চরিত্র! আপনারা কোনো অ্যাডভেঞ্চার করেননি ওনাকে নিয়ে?"
শামীম মাথা নাড়লো। "বাবা আমাদের কখনোই ওনার ধারেকাছে ঘেঁষতে দিতেন না। আমরা এই বাড়িতে প্রথম এসেছি কুটি দাদা মারা যাওয়ার পর, জানো? ওনারও আমাদের ঢাকার বাসায় যাওয়া নিষেধ ছিলো।"
সোমা আনমনে কাঠের দোতলা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে কুটি দাদার গল্প শুনছিলো। এখানে সে আগেও একবার পিকনিকে এসেছে, কিন্তু তখন আরো আত্মীয়স্বজন গমগম করছিলো পুরো কম্পাউন্ড জুড়ে, হইচইয়ের মাঝে ঐ কেঠো পোড়োবাড়ি নিয়ে কেউই মাথা ঘামানোর সময় পায়নি। বিকেলের রোদ এসে যেন হারিয়ে যাচ্ছে বাড়িটার দেয়ালে, দূরে বাংলোর বারান্দার ছায়ায় বসে দৃশ্যটা দেখে একটু গা ছমছম করছে তার। কুটি দাদা ঐ বাড়িতে বসে কী করতো?
কাছেই আচমকা যান্ত্রিক সুরে ঝনঝন করে আজানের শব্দ বেজে উঠলো, সোমার ঘোর লাগা ভাবটা কেটে গেলো সে শব্দে। চুমকির মোবাইলে আজানের কী একটা সিস্টেম আছে, দিনে পাঁচবার করে সময়মতো বাজতে থাকে। চুমকি বেতের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে মাথার স্কার্ফ ঠিক করতে করতে বললো, "আমি নামাজটা পড়ে আসি।"
নাসিফ বললো, "আমার জন্য দোয়া করিস রে। আল্লাহকে বলিস আমার দিকে যেন একটু মুখ তুলে তাকায়। খুব রাগ করে আছে লোকটা।"
চুমকি জিভ দিয়ে বিরক্তিসূচক একটা শব্দ করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো। বাংলোর ঘরগুলো বেশ প্রশস্ত, বেড়াতে এসে আস্ত একটা ঘর বরাদ্দ পেয়েছে সে।
সোমা মাথার চুল আঙুলে জড়িয়ে টানতে টানতে বললো, "উনি একা একটা দোতলা বাড়িতে কী করতেন?"
শামীম আরেকটা আলুর বড়া তুলে নিয়ে বললো, "বুজরুকি। আবার কী? ভূতপ্রেত, তন্ত্রমন্ত্র, ঝাড়ফুঁক।"
নাসিফ বললো, "তুই জানিস কীভাবে? তুই তো কখনো এসে দেখিসনি।"
শামীম বড়ায় একটা জিঘাংসু কামড় দিয়ে বললো, "আমি রশিদ চাচার কাছে শুনেছি। ... ঐ যে মনু চাচী আসছে মুড়ি মাখা নিয়ে, তুই বিশ্বাস না করলে চাচীকে জিজ্ঞাসা কর।"
মনু চাচীর বয়স পঞ্চাশের ঘরে, তবে সে ঘরের ছাদের কাছাকাছি। মেহমানদের জন্যে গতকাল সন্ধ্যা থেকেই অবিরাম নানা নাস্তা বানিয়ে যাচ্ছেন তিনি অক্লান্তভাবে। মস্ত একটা এনামেলের বাটিতে মুড়ির সাথে এটাসেটা মেখে এখন নিয়ে এসেছেন তিনি।
"ন্যাও, কহোটা মুড়ি খাউ। হাফিজের বউ পাউরোটা বানাইতাছে। হাইঞ্জা বেলায় গরুর গুস্ত দিয়া খাইও।" মনু চাচী টেবিলে মুড়ির বাটি নামিয়ে রেখে আলুর বড়ার প্রায় খালি বাটির দিকে তাকিয়ে খুশির হাসি হাসলেন। "বিলাতী আলু আছাল কহোটা। বড়া বানামু আরো?"
সোমা মনু চাচীকে হাত ধরে চুমকির চেয়ারে বসিয়ে দিলো। "বসেন তো চাচী। আমাদের কুটি দাদার গল্প বলেন। শামীম কিচ্ছু জানে না, আন্দাজে খালি আবোলতাবোল কী কী যেন বলে।"
মনু চাচীর মুখের হাসিটা মলিন হয়ে গেলো। "কাক্কা তো ম্যালা আগে মরছে।"
মৌরি এক মুঠো মুড়িমাখা তুলে মুখে পুরে বললো, "গ্নামগ্নাম ... দারুণ মজা হয়েছে চাচী! এই কুটি দাদা নাকি জ্বিনভূত পালতেন, সত্য নাকি?"
মনু চাচী মুখ কালো করে মাথা ঝাঁকালেন। "হ, হ্যার কামই আছাল খালি দ্যাউ দানো নামানি।"
নাসিফ হাসিমুখে বললো, "আপনি কখনও দেখেছেন ঐ দৈত্যদানো?"
মনু চাচী অস্বস্তিভরে নড়েচড়ে বসে বললেন, "দেখি নাই ... কিন্তু ... ।" তার কণ্ঠস্বর ক্রমশ মিলিয়ে গেলো নাসিফের চওড়া হতে থাকা হাসির সাথে।
সোমা বললো, "কী চাচী? কিন্তু কী?"
মনু চাচী বললেন, "আওজ পাইছি অনেকদিন।"
মৌরি আরেক মুঠো মুড়ি নিতে হাত বাড়িয়েছিলো, সে নাসিফকে আবার চোখের ধমকে শাসন করে বললো, "কেমন আওয়াজ চাচী?"
মনু চাচী শামীম আর সোমার দিকে অসহায় চোখে নিষ্কৃতি চাওয়ার ভঙ্গিতে তাকিয়ে বললেন, "ইয়াল্লা, কয় কি, যে আওজ আছিলরে মা, কানকুন তালা নাইগা যাইতোগা। তুমগো কাক্কা তহনও বাঁইছা আছাল, খুপ সাহসী মানু আছিল, হ্যার বাদেও হে কুটি কাক্কারে কিছু কয়া হারে নাই, ডরে। রাইত বিরাইতে শব্দ হইতো, আজগুবি গুজগুবি আওজ। মাইনষ্যে মুনে করতো উনি জ্বিন নামাইছে। মাঝে মইদ্যেই আইড়া কাইড়া নুক আইতো হ্যার কাছে, জ্বিন নামাইবার। কাক্কা নাঠি নিয়া দৌড়ানি দিত। কিন্তু আইতের বেলার ভয়ের আওজ কমতো না। খুন খুন কইরা ক্যারা যানি কাঁনতো। খিখি আসাহাসির শব্দ হুনা যাইতো। ডরে আমগো আত্মা ধড়াস ধড়াস করতো।"
নাসিফ মৌরির শাসনে হাসিটা মুখ থেকে মুছে গম্ভীর গলায় বললো, "কীরকম শব্দ চাচী?"
মনু চাচী অস্বস্তিভরে নড়েচড়ে বসে বললেন, "কুনো কুনো সুমায় আবার চিকারের শব্দ পাওন যাইতো। জীব জুনাররে নাঠি দিয়া গুতানির পর যেম্বে গুঙ্গাইতো হেইরহম আওজ।"
নাসিফ মৌরির দিকে ফিরে বললো, "উফফ, চিমটাও ক্যানো?"
সোমা মনু চাচীকে বেশ পছন্দ করে ফেলেছে, সে চাচীর হাত জড়িয়ে ধরে নিজের কোলে টেনে নিয়ে বললো, "শুধু কি চিৎকারের আওয়াজ পাইতেন চাচী? কিছু দেখেন নাই কখনো?"
মনু চাচী একটু ভরসা পেলেন যেন সোমার কথায়, মাথা নেড়ে বললেন, "নাগো মা, আমরা রাইতের বেলা দরজা জাল্লা বদ্দ কইরা হুইতাম। হাফিজ তহন গুদা, খুপ ডরাইতো। কুট্টি কাক্কারে ম্যালা কইছি, হাফিজ্যা ডরায়, আপনে হ্যাগো রাইতের বেলা ডাইকেন না। হে খালি আসতো, ফ্যাক ফ্যাক কইরা আসতো, আর কইতো ... ডরাইস্যা ডরাইস্যা।" মনু চাচী হাত নেড়ে গলার সুর পাল্টে কুটি দাদাকে অনুকরণ করে দেখালেন, সোমা হাসতে হাসতে জড়িয়ে ধরলো তাকে।
শামীম মুড়িমাখা খেয়ে যাচ্ছিলো অক্লান্তভাবে, সে কোঁৎ করে মুড়ি গিলে বললো, "ভূতের দৌড়াদৌড়ির আওয়াজের কথাটা বলবা না চাচী?"
মনু চাচীর হাসিটা আবার মলিন হয়ে গেলো। "হ, মাজেমইদ্যে আমরা আওজ পাইতাম। বাগানের আউলে কীয়ের জানি শব্দ। মুনে হইত গাছে বইয়া ভুইট্টা বানর পাউ নড়াইতাছে। ...না না বাজান আইসো না...বাউ বাসাতের আওজ ওইরহম না। কুটি কাক্কা মাজে মইদ্যে বাইরে আইয়া ধমক দিত। তহন আওজ বন হইয়া যাইতো। খুব ডরের মদ্যে আইত পার করছি গো আম্মা। তুমরা দেহ নাই তাই আসো।"
মৌরি ফিসফিস করে বললো, "ডোঞ্চিউ রিয়েলাইজ ইট হার্টস হার? স্টপ বিয়িং সাচ আ প্রিক!"
নাসিফ গম্ভীর মুখে মুড়িমাখা চিবাতে লাগলো। বিকেলের রোদ ইতিমধ্যে সরে গেছে কালো বাড়িটা থেকে। গাছপালার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে জানালাবিহীন দেয়ালের একটা অংশ।
মনু চাচী বললেন, "হাফিজ্যা বাড়িড্যা সাপ কইরা রাকছে। তুমরা দেকপার চাইলে দেইকা আইয়া হারো।"
সোমা বললো, "আপনারা ঐ বাড়িতে ঢোকেন?"
মনু চাচী বললেন, "ঢুকমু না ক্যা? এহন তো আর কাক্কা নাই। কুনো আওজও নাই। আমরা কয় মাস বাদে বাদেই ঘর সাপ করি। ভিতরে খাইলা। বইপুস্তক আর আবিজাবি জিনিস আছে, বাসকোতে ভইরা রাকছি।"
নাসিফ বললো, "আজকে চলো সবাই রাতের বেলা ঐখানে গিয়ে আড্ডা মারি। তাস, মোনোপোলি, চা আর মুড়ি-চানাচুর সঙ্গে থাকবে। এরপর মোমবাতির আলোর সাথে রক্ত পানি করা ভূতুড়ে গল্পের কম্পিটিশন।"
সোমা আড়চোখে মনু চাচীর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো, মহিলার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে উঠেছে। সে চাচীর হাতে মৃদু চাপ দিয়ে বললো, "কী চাচী, ভয় পাইছেন নাকি?"
মনু চাচী বিবর্ণ মুখেই মাথা নাড়লেন। "না না না। আমি হাফিজ‌্যার বউরে কইয়া দিমুনি, উ যানি তুমগো জুনতে নাস্তা পানির যুগার যন্ত্র কইরা রাকে।"
সোমা ফিসফিস করে বললো, "আপনিও আসেন চাচী। ভূতের গল্প করি সবাই মিলে।"
মনু চাচী তাড়াহুড়ো করে মাথা দোলালেন, "নারে আম্মা, আমার ভূতের হাস্তর হুনলে ডর নাগে। আমি হাড়াহাড়ি কইরা ঘুমাইয়া যামু।"
চুমকি নিজের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো, তার মুখ গম্ভীর। মনু চাচীকে দেখে সে মন্দ্রস্বরে বললো, "নামাজ পড়বেন না চাচী?"
মনু চাচী চমকে উঠে তাড়াহুড়ো করে উঠে বললেন, "হ হ..আমি তাইলে যাইগা আম্মা। নুমাজটা পইড়া আহি। তোমরা মুড়ি খাও।"
নাসিফ তাড়াহুড়ো করে পালিয়ে বাঁচা চাচীকে দেখিয়ে চুমকিকে শাসনের সুরে বললো, "তুই এখানে এসেই কীরকম ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিস, দেখলি? মনু চাচী, হাফিজ, হাফিজের বউ, তাদের একরত্তি বাচ্চা, সবাই তোর ভয়ে দরজায় ছিটকিনি আটকে ভেতরে বসে থাকে। বেচারারা গোটা বছরে যত রাকাত নামাজ পড়ে, তোর যন্ত্রণায় তারচে বেশি পড়ে ফেলেছে এই একদিনেই!"
চুমকির মুখে সন্তুষ্টির পাতলা হাসি ফুটে উঠলো। দ্বীনের পথ থেকে বিচ্যুত কয়েকটি আত্মাকে সিরাতুল মুস্তাকিমে ঠেলে তুলে সে বেশ তৃপ্ত।
মৌরি বললো, "তুমি তো গল্পটা মিস করলে চুমকি। শামীম ভাইয়ের কুটি দাদা জ্বিনভূত দৈত্যদানো পুষতেন, বুঝলে?"
চুমকি বেতের চেয়ারে বসে মুড়িমাখার বাটিটা নিজের কোলে টেনে নিয়ে বললো, "জ্বিন পুষতে পারেন হয়তো। কিন্তু ভূত দৈত্য এসব কিছু নেই। ওগুলো কুফরি গুজব।"
নাসিফ একটা সিগারেট ধরিয়ে বললো, "হোয়াটেভার। ঐ বাড়িটায় আমরা আজ সারারাত আড্ডা মারবো ঠিক করেছি।"
চুমকি বললো, "তোমরা আড্ডা মারো গিয়ে, আমি ঘুমিয়ে পড়বো।"
নাসিফ বললো, "উঁহু। তোকেও থাকতে হবে। মোনোপোলি খেলা হবে। তুই ব্যাঙ্কার। আমাদের মধ্যে একমাত্র মুমিন মুসলমান তুই, অন্য কাউকে ব্যাঙ্ক দিলে টাকাপয়সা লুট হয়ে যাবে।"
চুমকি বললো, "ঐ পুরোনো বাড়িতে ধুলাবালুর মধ্যে বসে মোনোপোলি খেলতে হবে কেন? এইখানেই খেলি।" চুমকি মোনোপোলির খুব ভক্ত, একবার খেলতে বসলে তাকে টেনে তোলা শক্ত।
মৌরি বললো, "আরে, দারুণ একটা এক্সপেরিয়েন্স হবে। এরকম ভূতুড়ে একটা বাড়িতে বসে আড্ডা দেয়ার মজাই তো আলাদা। তাছাড়া যদি সত্যি সত্যি ভূত ... মানে, জ্বিন এসে আমাদের ওপর চড়াও হয়, চুমকি একাই দোয়া পড়ে তাদের ভাগিয়ে দিতে পারবে।"
সোমা অন্যদিকে ফিরে হাসি চাপার চেষ্টা করলো প্রাণপণে। বিদ্রুপের আঁশটে গন্ধ পেয়ে চুমকির মুখটা গম্ভীর হয়ে গেলো। "শোনো ভাবী, দোয়াদরূদ নিয়ে মশকরা করবা না। গ্রামেগঞ্জে জ্বিনের উৎপাত কিন্তু কমন জিনিস। আমার দাদাবাড়িতে আমি নিজের চোখে জ্বিন নামাতে দেখেছি ...।"
নাসিফ বললো, "আহহা, এখনই বলিস না। রাতে ভৌতিক গল্প ... কী হলো, চিমটাও কেন? ... ওহ, লেট মি রিফ্রেইজ, ভৌতিক নয়, জ্বৈনিক গল্পের কম্পিটিশন হবে। তখন বলিস। আর তোমরা তো দুইপাতা বিজ্ঞান পড়ে মশকরা করো খালি, চুমকির দাদাবাড়ি কিন্তু, হুঁহুঁ বাবা, একটা রিয়েলি হন্টেড প্লেস। জ্বিনের হিথ্রো এয়ারপোর্ট ঐটা। সারাদুনিয়ার জ্বিন চলাচলের পথে চুমকির দাদাবাড়িতে রিফুয়েল করতে নামে। ... আরে না, সিরিয়াসলি, আমরা ছোটোবেলা থেকে শুনে আসছি। একজন খুব কামেল বুজুর্গ আলেম আছেন, চুমকির চাচার বন্ধু, উনি প্রায়ই জ্বিনের টক শো হোস্ট করতেন, আমরা যখন কলেজে পড়ি। না রে চুমকি? কী হলো, এইভাবে তাকাস কেন ...?"
২.
কাঠের সিঁড়িতে পা রাখার পর বিচিত্র শব্দে পুরো বাড়িটা যেন অস্ফূট গোঙানির শব্দে অতিথিদের স্বাগত জানালো। মৌরি ঘাড় ফিরিয়ে হারিকেন হাতে নাসিফের দিকে তাকিয়ে শুকনো হাসি হাসার চেষ্টা করলো। একতলার বারান্দায় বসে মজা দেখছে সে।
সোমা হাতে কিল মেরে বললো, "কাম অন মৌরি! কোনো ব্যাপারই না। দেখিয়ে দাও নাসিফ ভাইকে! তোমার হাতে হারিকেন আছে, চাবি আছে, তোমার কী ভয়?"
মৌরি এক হাজার টাকা বাজি ধরেছে নাসিফের সাথে, একা একা দোতলায় উঠে তালা খুলে কুটি দাদার ঘরে ঢুকবে সে। তার আগে কনসালট্যান্ট হিসেবে মনু চাচী গোপনে জানিয়েছেন, ছাইভস্ম যা কিছু ছিলো এই বাড়িতে, সবই সাফ করা হয়েছে। দোতলার ঘরে কিছু বইপত্র আর টুকিটাকি জিনিস ছাড়া আর কিছুই নেই। তবে তেলাপোকা, মাকড়সা, টিকটিকি এসব থাকতেই পারে। নাসিফ শুরুতে একশো টাকা বাজি ধরেছিলো, তেলাপোকা-টিকটিকি-মাকড়সার মতো থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের নাম শুনে সে একটা শূন্য বাড়িয়ে দিয়েছে।
সোমাও শামীমের সাথে বাজি ধরতে চেয়েছিলো, কিন্তু সোমার সাহস নিয়ে শামীমের মনে কোনো সন্দেহ নেই, জানিয়েছে শামীম। অবশ্যই একা একা সোমা ভূতুড়ে খালি বাড়িতে গিয়ে তেলাপোকাকবলিত, টিকটিকিআক্রান্ত, মাকড়সামাখামাখি ঘরে ঢুকে দশ মিনিট কাটাতে পারবে। সোমা না পারলে কে পারবে?
চুমকিকেও ঠেলছিলো নাসিফ, কিন্তু চুমকি এইসবের মধ্যে নেই। সে একটা মাদুর আর মোনোপোলি বোর্ড দুই বগলে নিয়ে চুপচাপ অপেক্ষা করছে এইসব বাজির ভাঁড়ামো শেষ হওয়ার অপেক্ষায়। তাছাড়া, বাজি ধরা গুনাহ।
মৌরি হারিকেন হাতে নিয়ে দুপদাপ করে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলো। বাড়িটা কী ধরনের কাঠ দিয়ে তৈরি, মৌরি জানে না, কিন্তু কাঠের রং একেবারে কুচকুচে কালো, আর যথেষ্ট মজবুত। সিঁড়িতে পা রাখলে কিছু ক্যাঁচক‌্যাঁচ শব্দ হয় বটে, কিন্তু গোটা বাড়ি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ার মতো গুরুতর কিছুর আভাস তাতে নেই।
মৌরি সিঁড়ির প্রথম দফা পেরিয়ে নিচের দিকে তাকালো। নাসিফ হারিকেন উঁচিয়ে জুলজুল করে তাকিয়ে আছে দেখে মনে মনে হাসলো সে। অ্যারোসলের একটা ক্যান স্যুটকেসে করে নিয়ে এসেছিলো মৌরি, সেটা বাংলো ছেড়ে বেরোনোর সময় বার করে কোমরে গুঁজে সঙ্গে আনতে ভোলেনি। তাছাড়া, মনু চাচীর ছেলে হাফিজ নাকি গতকাল সকালেই সাফ করেছে বাড়ি, কাজেই ড্রাকুলার গুদামঘরের মতো পরিস্থিতি থাকার কথাও না।
মৌরি বাইরে থেকেই খেয়াল করেছে, বাড়িটা আসলে তিনতলা সমান উঁচু। কিন্তু নিচতলায় ঘরের উচ্চতা অনেক বেশি, সেটা একটা হলঘরের মতো। কুটি দাদা দোতলার দুটো ঘরের একটায় থাকতেন। অন্য ঘরটা একেবারেই ফাঁকা এখন, মেহমান এলে সেটায় থাকতো অতীতে।
তিন দফা সিঁড়ি পেরিয়ে দোতলায় কুটি দাদার ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো মৌরি। এখান থেকে আশপাশটা একেবারেই অন্যরকম দেখায়। কম্পাউন্ডের ভেতরে বাড়ি, পুকুর, গাছপালা, আকাশে একফালি চাঁদ, সবই সুন্দর লাগছে দেখতে। হারিকেন নিয়ে বারান্দার রেলিঙে একটু ঝুঁকে হাঁক ছাড়লো মৌরি, "হিউস্টন, আই হ্যাড নো প্রবলেম!"
সোমা উৎসাহ যোগালো, "সাবাশ মৌরি! মুরগিভাজা না ফুচকা?"
হারিকেন হাতে নাসিফ বললো, "বারান্দার অরবিটে চক্কর দিলেই চলবে? ল্যান্ডিং না করেই খানাপিনার হিসাব শুরু করে দিয়েছে!"
মৌরি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো, একটা মৃদু খসখস শব্দ এলো তার কানে।
শব্দটা ঘরের ভেতরে।
মৌরির মনের মধ্যে ফূর্তির অনুভূতিটা এক নিমেষে ফুরিয়ে গেলো। এই ঘরের ভেতরে শব্দ হবে কেন?
নিচ থেকে চুমকির বিরস কণ্ঠ ভেসে এলো, "ভাবী, জলদি। মশা কামড়ায়।"
মৌরি হারিকেন উঁচিয়ে কুটি দাদার ঘরের উঁচু, বন্ধ দরজার দিকে চেয়ে রইলো, তার কান অখণ্ড মনোযোগে কোনো শব্দ শোনার জন্যে তৈরি হয়ে আছে। তার মনের যুক্তিপ্রবণ অংশ বলছে, ঘরের ভেতরে খসখস শব্দ হওয়াই স্বাভাবিক। হয়তো তেলাপোকা উড়ছে। বা পেছনে গাছের ডাল হয়তো বাতাসে নড়ছে। ভূতপ্রেত সব বাজে কথা। কিন্তু একটা রুগ্ন রোমাঞ্চপ্রিয় অংশ বলছে, বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি?
প্রকাণ্ড একটা চকচকে রূপালি তালা ঝুলছে দরজার দুই পাল্লার দুই মোটা কড়ায়। মৌরি হারিকেন নামিয়ে রাখলো দরজার সামনে, তারপর আঁচলে বাঁধা চাবিটা দিয়ে সেই তালাটা খুলে একটা কড়ায় আটকে রাখলো। হারিকেনটা তোলার জন্যে আবার ঝুঁকতেই সে ঘরের ভেতরে মৃদু খসখস শব্দটা আবার শুনতে পেলো।
সেইসাথে মৌরি দেখতে পেলো, ঘরের দরজার নিচের অংশে সরু, আনুভূমিক কতগুলো ফাঁক, অনেক ভেন্টিলেটরের মতো। দরজাটা একেবারে নিরেট নয়।
মৌরি হারিকেনটা হাতে নিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো ঘরের দরজার সামনে। ভেতরে শব্দ হতেই পারে, নিজেকে প্রবোধ দিলো সে। হতেই পারে শব্দ। হয়তো বাতাসের কারণে ...।
নিচ থেকে চুমকির বিরস কণ্ঠ ভেসে এলো আবার, "ভাবী, মশা কামড়াচ্ছে কিন্তু।"
হিউস্টনের টিটকিরিও শোনা গেলো তারপর, "ল্যান্ডিং করতে পারবে একা, নাকি কাউকে পাঠাতে হবে?"
মৌরি চোয়াল শক্ত করে হারিকেনটা উঁচিয়ে ধরে কুটি দাদার ঘরের দরজায় জোরে একটা ধাক্কা দিলো।
এই দরজার কব্জাজোড়া সম্ভবত বহুদিন তেলের মুখ দেখেনি, অমসৃণ হ্রেষা তুলে ধীর গতিতে খুলে গেলো দুটো পাল্লা। মৌরি হারিকেন বাড়িয়ে ধরে ঘরের ভেতরটায় আলো ফেললো। ফাঁকা।
নিচ থেকে হাততালির শব্দ ভেসে এলো। "ইটস আ স্মল স্টেপ ফর আ ম্যান ... কী হলো সোমা, পরপুরুষের গায়ে খোঁচা দাও ক্যানো ... ওহ, ওকে, ইটস আ স্মল স্টেপ ফর আ উওম্যান, বাট আ জায়ান্ট লিপ ফর ... আরে আবার খোঁচাও ক্যানো?"
মৌরি ঘরের ভেতরে পা রাখলো।
হারিকেনের আলোয় ঘরের ভেতরের একাংশ আলোকিত হয়েছে কেবল। পুরোনো দিনের ঘর, যথেষ্ট উঁচু, সিলিঙের কাছে তাই ক্রমশ পিছু হটে গেছে আলো, বৃক্ষচারী ময়ালের ধৈর্য নিয়ে সেখানে শুয়ে আছে অন্ধকার। মৌরি খসখস শব্দটা আবার শুনতে পেয়ে ত্বরিত পায়ে বামে ঘুরলো।
ঘরের ভেতরটায় একটা লোহার খাট, আর দুটো বাক্স ছাড়া আর কিছু নেই। তবে দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার ঝুলছে। সেটার পাতা নড়ে উঠছে একটু পরপর। শব্দটা সেখান থেকেই আসছে।
মৌরি হারিকেন বাড়িয়ে ধরে জানালা খুঁজলো। কিন্তু ঘরে কোনো জানালা নেই।
শিক্ষিত, বইপড়ুয়া, ব্লগ-ফেসবুকে তর্ক করা মৌরি তাকে প্রবোধ দিলো, নিশ্চয়ই কোনো না কোনোভাবে ঘরের ভেতরে বাতাস ঢোকে। নইলে ক্যালেন্ডারের পাতা নড়বে কেন? হয়তো কোনো ছিদ্র আছে দেয়ালে। কিন্তু ভূতুড়ে সিনেমাদেখা মৌরি ফিসফিস করে বলে গেলো, আছে মৌরি, ওরা আছে!
মৌরি মনে মনে নিজেকে কষে ধমক দিয়ে চোখ বন্ধ করলো কিছুক্ষণের জন্য। ক্যালেন্ডারের পাতা নড়ে উঠলো আবারো। চোখ খুলে সে হারিকেন উঁচিয়ে ধরে সিলিঙের দিকে চাইলো।
বিদঘুটে কোনো চেহারা বা আকৃতি তেড়ে এলো না মৌরির দিকে, বরং নিতান্তই নিরীহ একটা কাঠের পাটাতন চোখে পড়লো তার। সেইসাথে চোখে পড়লো দেয়াল আর সিলিঙের মোহনায় কয়েকটা প্রশস্ত ঘুলঘুলি।
কুটি দাদার ঘরটা মোটেও বদ্ধ নয়। হাওয়া চলাচল করে এর ভেতরে। মৌরির চোয়ালের পেশী শিথিল হয়ে এলো। ভয়খোর মৌরি মুখের ওপর যুক্তির দরজা বন্ধ হওয়ার আগ মুহূর্তে ফিসফিসিয়ে বললো শুধু, দেয়ার আর মোর থিংস ...।
মৌরি এবার বাস্তব পৃথিবীর হররের দিকে মন দিলো। ঘুলঘুলিগুলো খোলা, কাজেই তেলাপোকা সাপখোপ সবই থাকতে পারে ঘরের ভেতরে। তবে চামচিকা নেই, নিশ্চিত জানে সে। আলো দেখলে চামচিকা লটপট করে উড়তে থাকে।
মৌরি হারিকেনের আলোয় ঘরটা চারপাশে একবার ঘুরে দেখে নিশ্চিন্ত মনে হাঁক দিলো, "ওপরে এসো তোমরা!"
সিঁড়িতে দুপদাপ পায়ের শব্দ শুনতে পেলো সে। চুমকির বিরক্ত গলা শোনা গেলো, "কামড়ে আমার হাত পা ফুলিয়ে ফেললো মশা!"
মৌরি এগিয়ে গিয়ে কুটি দাদার প্রাচীন খাটের পাশে রাখা বাক্সের দিকে এগিয়ে গেলো। কী আছে ভেতরে?
নাসিফ হারিকেন উঁচিয়ে সবার আগে ঘরে ঢুকলো। "ঢাকায় গিয়ে টাকাপয়সার মতো নোংরা ব্যাপার নিয়ে আলাপ করা যাবে, ঠিকাছে? চুমকি, মাদুর পাত। শামীম তুই ফ্লাস্ক আর কাপ সাজা। সোমা কি টিফিন ক্যারিয়ারে মুড়িটুড়ি কিছু রাখছো আমাদের জন্য নাকি সব একাই খেয়ে ফেলছো? আরে ... বাক্স খুলতেছো কেন?"
মৌরি বললো, "ভিতরে ডায়রি আছে কয়েকটা!"
শামীম বললো, "পড়তে চাইলে বের করে পড়তে পারো।"
মৌরি সোৎসাহে বললো, "ইন্টারেস্টিং কিছু আছে?"
শামীম এগিয়ে গিয়ে বললো, "মমমমম, আছে। কিন্তু পুরোটা না। নানা আবোলতাবোল, মাঝেমধ্যে কিছু ইন্টারেস্টিং বিটস আছে। একটা লাল মলাটের খাতা আছে, সেটাতে নানা কিসিমের ভূতপ্রেত নামানোর তরিকা লেখা, ওটা পড়লেই বুঝবা কুটি দাদা কোন কিসিমের বুজরুক ছিলো।"
সোমা হারিকেনের আলোয় ঘরের ভেতরটা দেখছিলো, তার কাছে মোটেই ভালো লাগছে না ঘরের চেহারা।
চুমকি বিরস গলায় বললো, আমি মশার কয়েল জ্বালাচ্ছি তাহলে।
মৌরি আচমকা কী ভেবে যেন বললো, "চলো আমরা একতলার ঘরটায় যাই। ওখানে গিয়ে খেলি।"
শামীম একটু আড়ষ্ট হয়ে গেলো। "একতলার ঘরে?"
নাসিফ গলা খাঁকারি দিয়ে বললো, "এই ঘরটা কি ইনাফ ভূতুড়ে না? আমার তো গায়ে লোম দাঁড়িয়ে আছে।"
সোমা এই প্রথম মৌরির কথায় আপত্তি করলো, "দরকার কী? চলো এখানেই আড্ডা মারি।"
মৌরি অনুভব করলো, একতলার ঘরটার কথা সে যেন ঠিক স্বেচ্ছায় বলেনি। একতলার ঘরে গিয়ে কেন খেলতে চাইলো সে?
কিন্তু আইডিয়াটা খারাপও লাগলো না তার কাছে। এ কথা স্পষ্ট যে এই বাড়িতে ভূতপ্রেত কিছু নাই। একতলার ঘরটা এই ঘরের চেয়েও উঁচু, সেখানে নিশ্চয়ই হানাবাড়ির পরিবেশটা আরো ভালোমতো পাওয়া যাবে। সে আবার বললো, "এসেই যখন পড়েছি, একতলাটা দেখে আসি চলো। মনু চাচী তো বললেন সবই পরিষ্কার করা আছে। সমস্যা কোথায়?"
চুমকি খনখনে গলায় বললো, "আমাকে মশা কামড়ে শেষ করে ফেললো। তোমরা জলদি জলদি ঠিক করো কোথায় খেলবা।"
শামীম মৃদু গলায় বললো, "একতলার ঘরটা একটু অন্যরকম।"
সোমা টের পেলো, তার ঘাড়ের কাছে রোম দাঁড়িয়ে গেছে। অন্যরকম মানে?
নাসিফ একটা সিগারেট ধরিয়ে বললো, "কীরকম? ডানজনস অ‌্যান্ড ড্রাগনস টাইপ নাকি?"
শামীম কাঁধ ঝাঁকালো, "আয় দেখাচ্ছি। একটু অস্বস্তিকর আর কি।"
মৌরি বললো, "শামীম ভাই, আমি লাল মলাটের খাতাটা পেয়েছি। ওটা নিয়ে আসি সাথে?"
শামীম বললো, "শিওর। তবে একটু সাবধানে হ্যান্ডল কোরো। পুরোনো দিনের খাতা তো, নরম হয়ে গেছে। কালি যেন চটে না যায়।"
মৌরি বাক্সের ভেতর থেকে লাল মলাটের খাতাটা বার করে হাতে নিলো। চুমকি দুপদাপ পা ফেলে বেরিয়ে গেলো হারিকেন ছাড়াই। একটু পর পর চটাশ চটাশ করে মশা মারছে সে।
সবাই ঘর ছেড়ে বেরোনোর পর সবশেষে ঘর ছাড়তে গিয়ে আরেকবার হারিকেন উঁচিয়ে ঘরের ভেতরটা দেখে নিলো মৌরি। নাহ, তেলাপোকা-টিকটিকি-মাকড়সা কিচ্ছু নেই। হাফিজ মনে হয় সব ঝেড়েমুছে সাফ করেছে।
হারিকেনটা নাসিফের হাতে ধরিয়ে দিয়ে দরজার পাল্লা টেনে আবার লাগিয়ে দিলো মৌরি। নাসিফ সিগারেট টানতে টানতে হারিকেনের আলোয় দরজার নিচের ভেন্টিলেটরটা দেখতে লাগলো। "ইন্টারেস্টিং। দেখেছো এটা?"
মৌরি মাথা নাড়লো, "হ্যাঁ। ঘরটায় জানালা নেই, কিন্তু ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা আছে ভালোই।"
নাসিফ নিচু হয়ে ভেন্টিলেটরের ভেতরে আঙুল চালিয়ে কী যেন পরীক্ষা করলো, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললো, "ইউ নো সামথিং? আই থিঙ্ক দিস কুটি দাদা চ্যাপ ওয়াজ কোয়াইট অ্যান ইন্টারেস্টিং ফেলো। এটা একটা কাঠের লুভার।"
মৌরি আঁচলের চাবি দিয়ে তালা এক কড়া থেকে খুলে দুটো কড়ার ভেতরে লাগাতে লাগাতে বললো, "লুভার কী জিনিস?"
নাসিফ সিগারেটে টান দিয়ে বললো, "মমমম ... কীভাবে বোঝাই? এটাতে কাঠের কতগুলো পাত একটু কোণ করে বসানো, যাতে হাওয়া ঢোকে, কিন্তু ধূলোবালি, শব্দ, রোদ না ঢোকে। আবার ঘরের ভেতরে ছাদের কাছে ঘুলঘুলিগুলো খোলা। ইন ফ্যাক্ট, এটাই কিন্তু ঘর ঠাণ্ডা রাখার এফিশিয়েন্ট ব্যবস্থা। ঠাণ্ডা বাতাস নিচ দিয়ে ঢুকবে, ঘরের ভেতরের হিট শুষে গরম হয়ে ওপরে উঠে ভেন্টিলেটর দিয়ে বেরিয়ে যাবে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেশিনারি এইভাবেই কুল করা হয়, শুধু কয়েকটা এগজস্ট ফ্যান থাকে ঘুলঘুলির জায়গায় ...।"
মৌরি লাল মলাটের খাতাটা বগল থেকে বের করে হারিকেন নিজের হাতে নিয়ে বললো, "চলো, নিচে চলো। যন্ত্রপাতির গল্প পরে শুনবো।"
নাসিফ সিগারেটে জোরে শেষ টান দিয়ে কাঠের রেলিঙে ঠেসে ধরে আগুন নিভিয়ে বাইরে ছুঁড়ে মারলো।
একতলার ঘরের দরজার সামনে শামীম চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সোমা ফিসফিস করে কী যেন বলছিলো শামীমকে, মৌরি আর নাসিফকে নেমে আসতে দেখে সে চুপ করে গেলো।
নাসিফ হাতে হাত ঘষে বললো, "ওক্কে। ডিল হচ্ছে, আমরা এখানে ঢুকবো, ভূতপ্রেত যা-ই আছে, দেখবো, তারপর সোজা মাদুর পেতে বসে মোনোপোলি খেলা শুরু করে দেবো। উইথ চা অ্যান্ড মুড়ি-চানাচুর। ঠিকাছে মৌরি? নো মোর গ্যালিভান্টিং অ্যারাউন্ড। এলাম, দেখলাম, মোনোপোলি খেললাম। ভিনি ভিডি ... চিমটাও কেন?"
মৌরি বললো, "এটার তালা কি একই চাবি দিয়ে খোলে, শামীম ভাই?"
শামীম মাথা ঝাঁকালো। তার মুখের গাম্ভীর্য কি কপট, নাকি হারিকেনের আলোয় এমন মনে হচ্ছে, ধরতে পারলো না মৌরি। কিন্তু সোমাকে দেখে সে একটু দমে গেলো। বেচারি নার্ভাস হয়ে আছে। একতলার ঘরটা কাল সকালে দেখলেও চলতো।
তালা খুলে মৌরি কারো দিকে না তাকিয়ে জোরে একটা ধাক্কা দিলো। দরজার পাল্লা দুটো খোলার সময় কর্কশ শব্দে কব্জায় তেলের অভাবের কথা স্মরণ করিয়ে দিলো তাদের সবাইকে।
শামীম গলা খাঁকরে বললো, "ওকে, ভয়ের কিছু নেই। ঘরটা প্রায় ফাঁকা। শুধু ...।" হারিকেন বাড়িয়ে ঘরের এক কোণে ধরলো সে।
মৌরি হারিকেন হাতে ঘরের ভেতরে ঢুকে শামীমের নির্দেশ করা দিকে চাইলো।
একতলার ঘরটা অনেক উঁচু, হলঘরের মতো। তিনটা হারিকেনের আলো ঘরের ভেতরের একটা ছোটো অংশই কেবল আলোকিত করতে পেরেছে, সেই বলয়ের ভেতরে কিছুই চোখে পড়লো না মৌরির। সে কয়েক পা এগিয়ে হারিকেন উঁচিয়ে ধরার পর দেখতে পেলো জিনিসটা।
একটা খাঁচা।
সোমা অস্ফূট শব্দ করে উঠলো। ঘরের উচ্চতার সমান একটা খাঁচা, মোটা লোহার গরাদ কংক্রিটের ভিত্তির ওপর বসানো। খাঁচাটা গোল, খুব বড় নয়, কিন্তু তার উচ্চতার মাঝে একটা অশুভ ইঙ্গিত যেন আঁকা আছে।
মৌরির কানে একটা ভীতু মৌরি ফিসফিস করে বললো, আমি আবার এসেছি। বলো তো এই ঘরে খাঁচা কেন?
শামীম গলা খাঁকরে বললো, "জাস্ট একটা খাঁচা। চলো এবার, খেলা শুরু করি।"
প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়রো বিশাল ঘরটায়, শুরু করি ... করি ... করি ... করি ... ওরি ...।
সোমা বিড়বিড় করে বললো, "চলো ওপরে গিয়ে খেলি। আমার ভালো লাগছে না।"
মৌরি এগিয়ে গিয়ে হারিকেন বাড়িয়ে ধরে খাঁচাটা দেখতে লাগলো। খাঁচার ভেতরে একটা কাঠের পিঁড়ি রাখা। খাঁচার একটা দরজা আছে স্বাভাবিক উচ্চতার, সেটার গায়ে ঘরের দরজার মতোই রূপালি নতুন তালা মারা। মৌরি হারিকেন যতদূর সম্ভব উঁচিয়ে ধরে খাঁচার পুরোটা দেখার চেষ্টা করলো, কিন্তু তার আলো ঘরের সিলিঙের উচ্চতার অন্ধকার দূর করার মতো জোরালো নয়।
চুমকির বিরক্ত কণ্ঠ ভেসে এলো, "ভাবী, আসো তো। খেলা শুরু করি।"
মৌরি ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখলো, শামীম সোমাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে অভয় দিচ্ছে। সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো, "অ্যাই সোমা, বোকা মেয়ে! একটা খাঁচা শুধু। ভয়ের কিছু নেই।"
সোমা ঝাঁঝালো গলায় বললো, "আমি ভয় পাচ্ছি না। আমার ভাল্লাগছে না, সেটা বললাম।"
মৌরি সোমার কাঁধে চাপড় দিলো, "চলো, আমরা একেবারে খাঁচাটার সামনে গিয়ে মাদুর পেতে বসে খেলি।"
নাসিফ খাঁচাটা দেখে কোনো মন্তব্য করেনি, সে একটা হাই তুলে বললো, "আমার বউ খাঁচার ভিতরে ঢুকে খেলার প্রস্তাব দেয়ার আগেই চলো, আমরা যে কাজটা করতে এখানে এসেছি সেটা শুরু করি। চা, মুড়ি, মোনোপোলি। চুমকি, বোর্ড সাজা। শামীম, চা বের কর। সোমা, টিফিন ক্যারিয়ার খোলো। দিস ইজ ওয়ান ব্লাডি স্পুকি প্লেস। আমরা ভূতের গল্প করে আজকে ফাটিয়ে ফেলবো।"
চুমকি একটা হারিকেন তুলে স্যান্ডেল টেনে টেনে হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগিয়ে গেলো।
সোমা এরকম বড় হলঘর আশা করেনি। বাইরে থেকে দেখে চট করে বোঝা যায় না, ঘরের ভেতরটা কত বড়। সে দেখতে পেলো, তাদের হারিকেন এই মস্ত ঘরটার ভেতরে তিনটা আলোর পুকুর তৈরি করেছে কেবল, যাকে ঘিরে আছে ক্রমশ ঘনায়মান অন্ধকার।
শামীম স্ত্রীর কপালে থুতনি ঘষে বললো, "আর কিছু নেই ঘরের ভেতর। একদম খালি। চলো খেলতে বসি।"
সোমার শরীরটা একটু শিথিল হয়ে এলো। খামোকাই ভয় পাচ্ছে সে। মনু চাচীর গল্প শুনে সে ভয় পেয়ে গেলো? মৌরির দিকে তাকিয়ে একটু লজ্জা পেলো সে। সেইসাথে অনুভব করলো, ভয় পাওয়ার আগ্রহই এর মূল কারণ। চুমকি যেমন মোটেও ভয় পাচ্ছে না, কারণ তার আগ্রহই নেই।
সোমা জোর পায়ে এগিয়ে গেলো সামনে। চুমকি খাঁচার দুই গজ সামনেই মাদুর পেতে বসে মোনোপোলি বোর্ড মেলে ধরেছে। মৌরি তার পাশে বসে কুটি দাদার খাতাটা খুলে ধরেছে হারিকেনের আলোয়। সোমা চুমকির উল্টোদিকে বসে মাটিতে হারিকেন নামিয়ে রাখলো। তার সামনে মস্ত দানবের পাঁজরের মতো পড়ে আছে খাঁচাটা। সোমা নিজেকে শাসন করলো মনে মনে, এটা সামান্য খাঁচা একটা। একটা আধপাগল লোকের খেয়ালের ফল।
মৌরি মলাট দেয়া খাতাটার পৃষ্ঠা ওল্টালো। সে অখণ্ড মনোযোগে পড়া শুরু করেছে।
চুমকি ঝড়ের বেগে টাকা ভাগ করছে। দেড় হাজার ডলার বেঁটে দিতে তার দেড় মিনিটও লাগে না। "কে কী গুটি নিতে চাও? আমি জাহাজ নিচ্ছি।"
নাসিফ মৌরির উল্টোদিকে বসে পড়ে বললো, "আমার একখান ইস্ত্রি আছে যদিও, আরেকটা পেলে মন্দ হয় না।"
শামীম হারিকেন নামিয়ে রেখে চায়ের ফ্লাস্ক আর কাগজের গ্লাস খুলতে খুলতে বললো, "মনু চাচীকে বলে রেখেছি, রান্নাঘরের দরজা খোলা রাখা আছে। বেশি রাতে যদি চা খেতে হয়, ওদের আর বিরক্ত করার দরকার হবে না, আমরাই বানিয়ে নিয়ে আসতে পারবো। ওরা আবার একটু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। এন্তার পরোটা বানিয়ে রেখেছে হাফিজের বউ, হাঁড়ি ভর্তি গরুর গোস্তো আছে, আর এক থালা মুড়ি মাখিয়ে রাখা আছে। শুধু গিয়ে নিয়ে আসতে হবে। কাজেই ... সারারাত ননস্টপ আড্ডা মারা যাবে।"
নাসিফ বললো, "সোমা টিফিন ক্যারিয়ারটা খোলো, এক চক্কর মুড়ি হয়ে যাক। আর ননস্টপ আড্ডা মারবো কীভাবে রে, তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তে হবে না আমাকে? অজুর পানির কী ব্যবস্থা?"
চুমকি জিভ দিয়ে ছ্যাক করে একটা শব্দ করলো। নাসিফের এসব রসিকতা পছন্দ করে না সে।
নাসিফ হারিকেন উঁচু করে ধরে বললো, "আরেব্বাহ, অজুর বদনা যোগাড় করে রেখেছিস দেখি!" হারিকেনের আলোয় খাঁচার পাশে দেয়ালের কাছে একটা কাঁসার পাত্রের দিকে আঙুল তুললো সে।
শামীম শুকনো হেসে বললো, "ঐটা বদনা না রে। কুটি দাদার মাম্বোজাম্বোর পাত্র।"
মৌরি খাতা থেকে চোখ তুলে চকচকে বদনাটার দিকে তাকিয়ে ছিলো, সে অনেকক্ষণ পর মুখ খুলে বললো, "আয়ুষ্কটাহ!"
নাসিফ চমকে ওঠার ভান করে বললো, "কস্কী! এইসব কী বলে রে?"
মৌরি হাতে ধরা খাতায় আঙুল দিয়ে টোকা দিলো, "এখানে বলা আছে এটার কথা। প্রেত নামাতে এটা লাগে।"
সোমা একটু কাত হয়ে উঁকি দিলো খাতার পাতায়। হলদে হয়ে এসেছে পাতাগুলো, তাতে বড় বড় গোটা গোটা বাংলা হরফে কী যেন লেখা। সেইসাথে অদ্ভুত সব নকশা আঁকা।
শামীম চুমকির শ্যেন দৃষ্টি দেখতে পেয়ে থতমত খেয়ে বললো, "আমার টুপি।"
সোমা অন্যমনস্কভাবে বললো, "আমার জুতো। ... এই মৌরি, কী লেখা এই খাতায়?"
মৌরি চুমকির দিকে না তাকিয়ে বললো, "আমার গাড়ি। ... আর বোলো না সোমা। পুরো খাতা ভর্তি নানা ভূতপ্রেত নামানোর কায়দা। ইন্টারেস্টিং।"
শামীম সোমার হাত থেকে টিফিন ক্যারিয়ার একরকম কেড়ে নিয়ে খুলে একটা বাটি আলগা করে বসলো। "আমি অনেক আগে কয়েকটা পড়েছিলাম, যখন খাতাটা প্রথম খুঁজে পাই। রশিদ চাচা তখনো বেঁচে ছিলেন। উনি বলেছিলেন, কুটি দাদা নাকি অসুস্থ হওয়ার পর এরকম আরো দশ-বারোটা খাতা পুড়িয়ে ফেলেছিলেন কেরোসিন ঢেলে।"
সোমা বললো, "এটা পোড়াননি কেন?"
শামীম ঠোঁট উল্টে বললো, "কে জানে? বাকিগুলোই বা পোড়ালেন কেন, তা-ই বা কে জানে?"
মৌরি চুমকির দৃষ্টির তাপমাত্রা টের পেয়ে তাড়াহুড়ো করে হাতে দুই ছক্কা নিয়ে বললো, "ওকে, লেটস রোল ... কে কার আগে মারবে সেটা ঠিক হোক। এই চাললাম ... দুই আর এক ... ধুত্তেরি!"
খেলা শুরু হলেও একটু পর সবাই মৌরির ওপর ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠলো। সে আনমনে ছক্কার চাল দিয়ে খাতার পাতা উল্টে যাচ্ছে। খেলায় একজন এমন অমনোযোগী হয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বাকিরা চটে ওঠে।
মিনিট চল্লিশেক খেলার পর চুমকি চটাশ করে হাতে পায়ে চাপড়ে মশা মারতে মারতে বললো, "ভাবী, তুমি হয় খেলো, নয় বই পড়ো।"
মৌরি বললো, "আমি খেলছি তো! ... আর তোমাকে এতো মশা কামড়াচ্ছে কেন? কয়েল তো জ্বলছে দেখি।"
চুমকি বিরক্ত স্বরে ট্রাফালগার স্কোয়ারে সোমাকে ভাড়ার টাকা গুণে দিতে দিতে বললো, "জানি না। আমার রক্ত মনে হয় বেশি টেস্টি।"
নাসিফ কাপে চা ঢেলে নিয়ে বললো, "চুমকি, মোনোপোলিতে ব্যাঙ্কের সিস্টেমটা পাল্টানো যায় নাকি রে? একটু পর পর চান্স আর কমিউনিটি চেস্টে কীসব সুদের কথা বলে। এটাকে মুদারাবা বানিয়ে দিলে কেমন হয়?"
চুমকি মশা মারতে মারতে আগুনঝরা চোখে নাসিফের দিকে চেয়ে ছক্কা বাড়িয়ে ধরলো। নাসিফ চাল দিতে দিতে বললো, "সুদ আর মুদারাবা সেই বুজুর্গ আর বুজরুকের মতো। আকাশপাতাল তফাৎ রে।"
শামীম হাতঘড়িতে সময় দেখে বললো, "সাড়ে এগারোটা বাজে। কেউ কি গোস্ত-পরোটা খেতে চাও আবার?"
সোমা কনুই দিয়ে গুঁতো দিলো শামীমকে। "সন্ধ্যা বেলায় না গপগপ করে খেলে?"
শামীম বললো, "এখন আবার একটু খাবো। কে কে খাবা বলো, সেই অনুপাতে বেড়ে নিয়ে আসি।"
চুমকি হাত তুললো, "আমি খাবো ভাইয়া। দুটো পরোটা।"
নাসিফ বললো, "নিয়ে আসিস গোটা চারেক। সোমা লজ্জা কোরো না। কয়টা খাবা আগেভাগে বলো। পরে ভাগ চাইলে পাবা না কিন্তু।"
সোমা বললো, "অ্যাই মৌরি, পরোটা খাবে?"
মৌরি কুটি দাদার খাতা থেকে চোখ তুলে বললো, "শামীম ভাই, আমার আর সোমার জন্য দুটো করে। আর এক টুকরো কয়লা আনতে পারবেন?"
শামীম একটু বিস্মিত হয়ে বললো, "কয়লা?"
মৌরি বললো, "হ্যাঁ। মনু চাচীরা কয়লা দিয়ে রান্না করে দেখলাম। এক টুকরো হলেই চলবে।"
নাসিফ বললো, "কয়লার ছাই দিয়ে দাঁত মাজবা নাকি?"
মৌরি চোখ পাকিয়ে বললো, "পাকনা পাকনা কথা না বলে শামীম ভাইয়ের সাথে যাও। এতো গোস্ত-পরোটা উনি একা আনতে পারবেন নাকি? আর টিউবওয়েল থেকে বোতলে করে ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এসো।"
শামীম আর নাসিফ একটা হারিকেন তুলে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।
চুমকি ব্যাঙ্কের টাকা সন্তর্পণে সাজিয়ে রাখতে রাখতে বললো, "সোমা আপুর দান এরপর।"
সোমা বললো, "আচ্ছা আসুক ওরা। খেয়েদেয়ে আবার শুরু করবো নাহয়।"
চুমকি একটা হারিকেন তুলে নিয়ে বললো, "আমি ঘরটা একটু ঘুরে দেখি।"
মৌরি কুটি দাদার খাতার পাতায় ডুবে আছে, সে কোনো উত্তর দিলো না।
সোমা ঘষটে ঘষটে মৌরির পাশে এসে বসে বললো, "অ্যাই মৌরি ... কী পড়ছো এতো মন দিয়ে? কী লেখা আছে খাতায়?"
মৌরি মুখ না তুলেই বললো, "খুবই ইন্টারেস্টিং জিনিস! আর শামীম ভাই যতোই বলুক, এই কুটি দাদা লোকটাকে আমার বুজরুক মনে হচ্ছে না। হয়তো মাথায় সামান্য গোলমাল ছিলো, কিন্তু ... অনেক গোছানো।"
সোমা বললো, "কী গোছানো?"
মৌরি খাতায় আঙুলের টোকা দিয়ে বললো, "অ্যাপারেন্টলি ... উনি বিভিন্ন ভূতপ্রেত নামানোর কায়দা নোট করে গেছেন। একেবারে স্কেচসহ।"
সোমা গলা বাড়িয়ে খাতায় উঁকি দিলো। হলদেটে পাতায় ফাউন্টেন পেন দিয়ে স্পষ্ট হস্তাক্ষরে সমান্তরাল লাইনে লেখা। এক পাতা জুড়ে ছবি, অন্য পাতায় লেখা।
মৌরি বললো, "এটা সম্ভবত একটা পাণ্ডুলিপি। উনি অন্য কোথাও রাফ করে এখানে ফ্রেশ কপি তুলেছেন। কোনো কাটাকুটি নেই। বানান ভুল আছে কিছু, কিন্তু খুব সহজ ভাষায় লেখা। কিছু কিছু শব্দের মানে জানি না, হিংটিংছট টাইপের কিছু মন্ত্রও আছে, আবার মাঝেমধ্যে আরবিফারসি কথাবার্তা ... বাট ভেরি ইনট্রিগিং! তুমি কি রক্ষ বা হাড়কুড়ানির নাম শুনেছো কখনো?"
সোমা আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো, চুমকি হারিকেন হাতে ঘরের এক প্রান্তের দেয়াল ঘেঁষে হাঁটছে। সে মাথা নাড়লো, "নাহ। কী এগুলো?"
মৌরি সোৎসাহে বললো, "আমিও জানি না। কিন্তু উনি ক্যাটেগোরি ভাগ করে এদের ডাকার পদ্ধতি বর্ণনা করে গেছেন। জিহ্বিক, রক্ষ, দৈত্য, গুলমন্ত, হাড়কুড়ানি, লাশখাকি, করীদানো ...।"
সোমা বললো, "তারপরও তোমার মনে হয় উনি বুজরুক ছিলেন না?"
মৌরি খাতা থেকে চোখ তুলে সোমার দিকে তাকিয়ে বললো, "আমি জানি না সোমা। বুজরুকরা এতো ফ্যাসিনেটিং জিনিস লেখে না বোধহয়। তারা লোকজনের ওপর নিয়ন্ত্রণ করতে ভালোবাসে। কুটি দাদা লোকটা বরং অনেকটা ... ফ্যান্টাসি লেখকদের মতো। উনি হয়তো নিজের তৈরি একটা ফ্যান্টাসির জগতে বাস করতেন। বুজরুক বললে একটু অবিচারই হবে।"
সোমা কুটি দাদার খাতায় উঁকি দিয়ে বললো, "এটা কীসের নকশা?"
মৌরি বললো, "এটা হচ্ছে হাড়কুড়ানি আবাহন মঞ্চের নকশা। মাটিতে চুনের গুঁড়ো দিয়ে একটা বৃত্ত আঁকতে হবে। তারপর কয়লার গুঁড়ো দিয়ে তার ভেতরে একটা ত্রিভূজ। দুটোর মধ্যেই একটু ফাঁক রাখতে হবে যাতে হাড়কুড়ানি এসে ঢুকতে পারে ভেতরে। তাকে টোপ দেয়ার জন্যে খাসির পাঁজরের হাড়ের টুকরো এইরকম স্পাইরাল করে বিছিয়ে দিতে হবে। সবচেয়ে বড় টুকরোটা থাকবে ঐ ত্রিভূজের ভেতরে। হাড়কুড়ানি সেটা তুলতে গেলে কয়লা আর চুন দিয়ে ত্রিভূজ আর বৃত্ত বন্ধ করে দিতে হবে। ... মজার না?"
সোমা ফিসফিস করে বললো, "আচ্ছা, এই যে মনু চাচীরা রাতের বেলা নানা শব্দ শুনতেন, সেগুলো কীসের?"
মৌরি হলঘরের পরিসীমা ধরে পায়চারি করে বেড়ানো চুমকির দিকে চোখ রেখে আনমনে বললো, "আমার ধারণা কুটি দাদা নিজেই ঐসব শব্দ করতেন। এই খাতায় অনেক মন্ত্রটন্ত্রের কথা বলা আছে। আর দূর থেকে রাতের বেলা কোনো শব্দ এলে সেটাকে শুরুতেই ভূতের শব্দ বলে মনে হতে পারে। ... নেভার মাইন্ড। কিন্তু প্রত্যেকটা পদ্ধতিই খুব ... ইম্যাজিনেটিভ। অনেকটা সুকুমারের ছড়ার মতো লাগে পড়তে।"
সোমা বললো, "কয়লা দিয়ে কী করবে তুমি?"
মৌরি জিভ কেটে বললো, "আমি ভাবছিলাম, আজ রাতে একটা ভূতকে আমরা ডাকলে কেমন হয়?"
সোমা চমকে উঠলো। "না না মৌরি, এসব নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ির দরকার নেই। আমরা মজা করতে এসেছি, মজা করে চলে যাই চলো।"
মৌরি বললো, "দূর বোকা! ভয়ের কিছু নেই। এটাও তো একটা মজাই?"
চুমকির মশা মারার শব্দ প্রবলভাবে প্রতিধ্বনিত হলো ঘরের ভেতরে। "উফফ, এত্তো মশা!" মশা ... মশা ... মশা ... অশা ...।
সোমা ফিসফিস করে বললো, "এই মেয়েটাকে এতো মশা কামড়ায় কেন?"
মৌরি বললো, "জানি না। আমাকে কিন্তু এতক্ষণ একটা মশাও কামড়ায়নি।"
সোমা বললো, "এই খাঁচাটার কী কাজ, কোথাও লেখা আছে খাতায়?"
মৌরি আনমনে মাথা নাড়লো। "আমি পড়তে পড়তে সেটাই খুঁজছিলাম। এখন পর্যন্ত খাঁচার কথা তো কিছুই লেখা নেই। নানা মন্ত্র, নকশা, আর প্রচুর হাড্ডিগুড্ডির কথা লেখা।"
চুমকি পিতলের পাত্রটার গায়ে পা দিয়ে টোকা দিতেই একটা খনখনে ধাতব শব্দ ছড়িয়ে পড়লো ঘরে। "এই ভাবী, সারা ঘরে আর কিচ্ছু নেই, জানো?"
মৌরি বললো, "হ্যাঁ, সব সাফ করে রেখেছে।"
শামীম আর নাসিফ কথা বলতে বলতে ঘরে এসে ঢুকলো। শামীমের হাতে একটা বড় ট্রে, আর নাসিফের হাতে একটা পানির জেরিক্যান। "এ কী? মৌরি এখনও লেখাপড়া করো নাকি?" নাসিফ হাঁক ছেড়ে বললো।
মৌরি বললো, "চলো একটা ভূত নামাই।"
শামীম মাদুরের ওপর ট্রে নামিয়ে রেখে বললো, "মৌরি কুটি দাদার খাতা পড়ে খুব এক্সাইটেড মনে হচ্ছে? পাতায় পাতায় এই ভূত সেই ভূত নামানোর কায়দা লেখা, তাই না?"
মৌরি বললো, "শামীম ভাই কি পুরোটা ম্যানুস্ক্রিপ্ট পড়ে দেখেছেন?"
শামীম বললো, "আমি ইউনিভার্সিটিতে থাকতে একবার কয়েক বন্ধুর সাথে এসেছিলাম এখানে। তখন আমরা একবার কুটি দাদার প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চেষ্টা করেছিলাম। চামচিকা ছাড়া আর কিছু তো আসেনি।"
মৌরি একটা কাগজের প্লেটে মাংস আর পরোটা তুলে নিয়ে বললো, "কোন ধরনের প্রেত নামানোর চেষ্টা করেছিলেন?"
শামীম বললো, "মনে নেই ঠিক। মাটিতে চুনের গুঁড়া দিয়ে হিজিবিজি নকশা করতে হয়েছিলো। আর কুটি দাদার চোথায় প্রচুর উদ্ভট জিনিসের কথা লেখা। বরই গাছের ডালপোড়া ছাই, শিং মাছের মাথা, পেকে পঁচে যাওয়া আমের আঁটি ... আমরা সব জিনিস যোগাড় করতে পারিনি। মনে হয় সে কারণেই আর কিছু আসেনি শেষ পর্যন্ত।"
নাসিফ পরোটা ছিঁড়ে মুখে পুরে বললো, "মৌরির গায়ে হলুদের কথা মনে পড়ে গ‌্যালো!"
চুমকি এসে হারিকেন নামিয়ে খাবার বেড়ে নিতে নিতে বললো, "তোমরা একটু পর পর খালি খাচ্ছো। খেলার মুড নাই কারো। আমি বরং খেয়েদেয়ে গিয়ে শুয়ে পড়ি।"
নাসিফ বললো, "আরে না। ভূতুড়ে গল্পের কম্পিটিশন হবে এখন। তোর স্টকে তো অনেক সত্য গল্প আছে, ঘুমিয়ে পড়লে সেগুলো বলবে কে?"
মৌরি বললো, "কয়লা এনেছো?"
নাসিফ পকেট থেকে খবরের কাগজে মোড়ানো এক টুকরো কয়লা বার করে দেখালো মৌরিকে। "এখনই খাবা?"
মৌরি বললো, "শামীম ভাই, চলেন খাওয়ার পর আজকে আবার কোনো প্রেতকে ডাকি আমরা।"
শামীম সোমার দিকে একবার তাকিয়ে বললো, "প্রেত নামাতে একশো একটা হাবিজাবি লাগে যে?"
নাসিফ গরুর মাংস চিবাতে চিবাতে বললো, "এই ডানজনের মধ্যে একটা ড্রাগনকে ডাকো মৌরি।"
মৌরি চাপা হেসে বললো, "ইন ফ্যাক্ট, কুটি দাদার খাতায় ড্রাগনের জন্যও একটা ফর্মুলা আছে!"
শামীম বললো, "তাই নাকি? ওটাকে ডাকতে কী লাগে?"
মৌরি টিস্যুতে হাত মুছে খাতার পাতা ওল্টালো। "খুবই সিম্পল জিনিস শামীম ভাই। এক টুকরা কয়লা, আর ঐ যে ঐ পাত্রটা ... আয়ুষ্কটাহ। ওটার মধ্যে পানি ঢেলে কয়লার টুকরোর ওপর বসিয়ে মনে মনে মন্ত্র পড়তে হয়। ওহ, তার আগে তেজসৃপ আবাহন মঞ্চ আঁকতে হয়।"
চুমকি পরোটার ভেতরে মাংস পুরে রোল বানিয়ে চিবাতে চিবাতে বললো, "এইসব মন্ত্র পড়লে গুনাহ হয়।"
শামীম সোমার দিকে তাকিয়ে বললো, "কী সোমা, নামাবে নাকি একটা ড্রাগন?"
সোমা পরোটার ছোটো ছোটো টুকরো মাংস দিয়ে খেতে খেতে বললো, "চলো নামাই।"
নাসিফ ঝড়ের বেগে পরোটা শেষ করছিলো একের পর এক, সে মুখভর্তি খাবার নিয়ে বললো, "ভালোই হয়। কষ্ট করে আর চুলা জ্বালতে হবে না এরপর। ড্রাগনের মুখের উপর কেটলি ধরেই চা বানানো যাবে।"
চুমকি চটাশ করে নিজের পায়ে চাপড় দিয়ে বললো, "উফফফ, সাংঘাতিক চুলকাচ্ছে এখন। এত্তো মশা!"
মৌরি দ্রুত পরোটা খাওয়া শেষ করে খবরের কাগজের পোঁটলা থেকে কয়লার টুকরোটা বের করে হারিকেন হাতে উঠে এগিয়ে গেলো এক পাশে। "তোমার খাওয়া শেষ হলে আলোটা একটু ধরবে? আমাকে খাতা দেখে দেখে আঁকতে হবে।" নাসিফকে ডাকলো সে।
সোমা প্লেটটা নামিয়ে রেখে কাগজে হাত মুছে উঠে পড়ে বললো, "আমি আসছি দাঁড়াও। নাসিফ ভাইয়ের খাওয়া মনে হয় ভোরের আগে শেষ হবে না।"
নাসিফ আরেকটা পরোটা প্লেটে তুলে নিয়ে বললো, "ড্রাগনের সাথে মারপিট করার আগে গায়ে একটু শক্তি জোগাতে হবে না?"
শামীম কোনো কথা না বলে চুপচাপ খেতে লাগলো, তার মুখ গম্ভীর।
চুমকি বুঝে গেছে, আজ আর মোনোপোলির মুড নেই কারো, সে জমির দলিল আর টাকা গোছাতে লাগলো প্রয়োজনের অতিরিক্ত শব্দ করে। মৌরি চোখ তুলে বললো, "চুমকি, ছক্কা দুটো কাজে লাগবে কিন্তু।"
চুমকি চটাশ করে মশা মেরে বললো, "আচ্ছা।"
নাসিফ খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে উঠে এগিয়ে গেলো, তার একটু কৌতূহল হচ্ছে।
মৌরি খাতা দেখে দেখে সিমেন্টের মেঝেতে কয়লা দিয়ে একটা নকশা আঁকছে। মৌরির আল্পনার হাত বেশ ভালো, তাই জটিল নকশাটাও সহজেই তার হাতে ফুটে উঠছে মেঝেতে। একটা বৃত্তের মাঝখানে দুটো ত্রিভূজ দিয়ে আঁকা তারা, তার ভেতরে একেক অংশে বিচিত্র সব চিহ্ন। হারিকেনের আলোয় মৌরির অভিব্যক্তি দেখে নাসিফ একটু বিস্মিত হলো, এমন তন্ময়ভাবে সে মৌরিকে আগে কিছু করতে দেখেনি। সোমা হারিকেন হাতে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে, তার চেহারায় স্পষ্ট অস্বস্তি। নকশাটা যতোই পূর্ণ চেহারা নিচ্ছে, সোমার চেহারা ততোই ফ্যাকাসে হয়ে উঠছে।
"তা এই ড্রাগন এসে কী করবে? আলাপসালাপ করবে আমাদের সাথে?"
মৌরি খসখস করে নকশা আঁকতে আঁকতে বললো, "সেরকমই তো মনে হয়।"
নাসিফ খাঁচাটা দেখিয়ে বললো, "ওটার ভিতরে আসবে তো, নাকি?"
মৌরি নাসিফের ইশারা দেখে হেসে ফেললো, "হ্যাঁ! ঐ যে বদনাটা, ওর মাঝে পানি ঢেলে ওটার নিচে কয়লা রেখে ঐ কাঠের পিঁড়িটার ওপরে রেখে আসতে হবে। যদি ড্রাগন আসে, কয়লার টুকরোটা আপনাআপনি জ্বলে উঠবে। বদনার নিচে ছোটো ছিদ্র আছে, সেই ছিদ্র দিয়ে পানি বের হতে থাকবে। পানি পড়ে আগুন নিভে গেলে ড্রাগন আবার চলে যাবে।"
"বাপরে! বদনাটা তাহলে একটা টাইমার? ওয়াটারক্লক?"
"মমমমম ... হ্যাঁ! এর জন্যই ওটার নাম আয়ুষ্কটাহ। ড্রাগনের আয়ু আছে ওটার মধ্যে।" মৌরি খসখস করে কয়েকটা টান দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। "পানি এনেছো সাথে?"
নাসিফ আঙুল বাড়িয়ে জেরিক্যানটা দেখালো। সোমার অস্বস্তিটা তার মাঝেও ধীরে ধীরে সংক্রামিত হচ্ছে।
মৌরি জেরিক্যান থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে ঢকঢক করে খেয়ে বললো, "সবার খাওয়া শেষ হলে আমরা শুরু করবো। আমি খাঁচার ভেতরে ঐ পাত্রটা রেখে আসি।"
শামীম ধীরে ধীরে খাচ্ছে, সে একবার নাসিফের দিকে তাকালো শুধু। নাসিফ শামীমের কাছে এগিয়ে গিয়ে চাপা গলায় বললো, "কী রে, ভয় পাচ্ছিস নাকি?"
শামীম হাসার চেষ্টা করলো। "ধুর! ... এই ঘরটাই একটু ডিপ্রেসিং। খাওয়া শেষ কর, মজাই হবে।"
চুমকি মোনোপোলির বোর্ড গুছিয়ে আবার প্লেটে একটা পরোটা নিয়ে বসলো। "আমি এইসব কুফরি কাজে নেই ভাইয়া। আমি খাই, তোমরা ড্রাগন নিয়ে খেলো।"
মৌরি ঘরের এক প্রান্ত থেকে পিতলের পাত্রটা নিয়ে এসেছে, তার চোখেমুখে একটা চাপা উত্তেজনা। জেরিক্যান থেকে সেটার ভেতর অল্প একটু পানি ভরে সে জিনিসটা উঁচু করে ধরলো। পাত্রটার তিনটা পায়া আছে, তার নিচে সামান্য ফাঁকা জায়গা তৈরি হবে মাটির ওপর নামিয়ে রাখলে। মৌরি পাত্রের নিচে হাত ধরে দেখলো, তার হাতে সূক্ষ্ম জলের বিন্দু ঝরে পড়ছে।
নাসিফ তার প্লেটে পরোটার শেষ টুকরোটা মুখে পুরে বললো, "থিওরেটিক্যালি, কয়লায় আগুন জ্বলা শুরু করলেও কিন্তু এই পাত্রের ভেতরের পানি বাষ্প হয়ে যাবে। কাজেই পানি পড়ে আগুন নিভে যাবে, সে সম্ভাবনা খুব কম।"
চুমকি হেসে ফেললো। "তুমি কি ভাবছো সত্যি ড্রাগন আসবে?"
নাসিফ মৌরির দিকে তাকিয়ে কাঁধ ঝাঁকালো। "আমি শুধু ফিজিক্যাল সমস্যাটার কথা বললাম।"
সোমা এসে মাদুরের ওপর বসে দুই হাঁটু হাতে ভাঁজ করে বসলো। তার মুখ গম্ভীর।
মৌরি এগিয়ে গিয়ে আঁচলের চাবি দিয়ে খাঁচার তালা খুললো। সারাবাড়িতে একই রকম তালা লাগানো, সব তালা একই চাবি দিয়ে খোলা যায়।
নাসিফ দেখলো, মৌরি সাবধানে কাঠের পিঁড়িতে কয়লার টুকরোটা নামিয়ে তার ওপর আয়ুষ্কটাহ বসিয়ে হারিকেনের আলোয়া খাঁচার ভিতরটা ঘুরে ফিরে দেখছে। সে গলা চড়িয়ে বললো, "ড্রাগনের বিষ্ঠাফিষ্ঠা আছে নাকি?"
মৌরি উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে এসে দরজায় আবার তালা লাগিয়ে দিলো। নাসিফ একটু অস্বস্তি নিয়ে দেখলো, মৌরি দরজাটা বার বার ধাক্কা দিয়ে পরীক্ষা করে দেখছে।
শামীম নাসিফের অভিব্যক্তি পাল্টে যেতে দেখে চাপা গলায় বললো, "কুটি দাদা খুব কনভিন্সিং বুজরুক ছিলেন, বুঝতেই পারছিস। মৌরি তো খুব একটা ইমপ্রেশনেবল মেয়ে না। তাহলেই ভাব, মনু চাচীরা কেন ভয় পাবে না?"
সোমা মুখ তুলে মৌরিকে জিজ্ঞাসা করলো, "এখন কী?"
মৌরি মাদুরের ওপর বসে পড়ে বললো, "এখন আমরা পাঁচজন চক্র তৈরি করবো ...।"
চুমকি গলা চড়িয়ে বললো, "আমি নাই এইসবের মধ্যে। আমি খাচ্ছি, তোমরা চক্র করো গিয়ে।"
মৌরি চুমকিকে অনুরোধ করতে যাচ্ছিলো, নাসিফ বললো, "ও এসব করতে না চাইলে সাধাসাধি করো না তো। কী করতে হবে বলো।"
মৌরি নাসিফের গলায় হালকা বিরক্তির আভাস পেয়ে একটু আহত হলো। সে ক্ষুণ্নমুখে বসে পড়ে বললো, "সবাই হাত ধরে গোল হয়ে বসতে হবে।" চুমকির মোনোপোলির বোর্ড থেকে ছক্কা দুটো হাতে তুলে নিলো সে।
সোমা পরিবেশ হালকা করার জন্য বললো, "এই চান্সে নাসিফ ভাইয়ের সাথে হাত ধরাধরি করা যাবে।"
নাসিফ নিজেকে সামলে নিয়েছে, সে তরল গলায় বললো, "আলো থাকবে নাকি নিবিয়ে দিতে হবে?"
মৌরি কুটি দাদার খাতার একটা পাতা ওল্টালো। "অন্ধকারের কথা বলা হয়েছে এখানে। আমরা হারিকেনের সলতে কমিয়ে দিতে পারি। কারণ একেবারে অন্ধকার করলে ইনস্ট্রাকশনগুলো পড়া যাবে না।"
চুমকি চটাশ করে মশা মেরে বললো, "আমি খাচ্ছি তো!"
নাসিফ বললো, "হারিকেন কমিয়ে দিয়ে খা না।"
চুমকি গজগজ করতে করতে হারিকেনের সলতে কমিয়ে দিয়ে উঠে একটু দূরে গিয়ে বসলো।
মৌরি বাকি দুই হারিকেনের সলতে নিভু-নিভু করে দিতেই ঘরটার চেহারা পাল্টে গেলো। সোমার মনে হলো, অন্ধকারের সমুদ্রে দুটো ছোট্টো আলোর ভেলা ভাসছে তাদের সামনে। একটু দূরে প্রায়নির্বাপিত আলোর সামনে চুমকিকে আবছা দেখা যাচ্ছে কেবল।
মৌরি বললো, "এখানে বলা আছে, চক্র মন্ত্র দ্বারা রক্ষিত। আবাহন মন্ত্রজপপূর্বক তেজসৃপকে ডাকিতে হইবেক। তেজসৃপের উপস্থিতির ব্যাপ্তি আয়ুষ্কটাহ দ্বারা নির্ধারিত হইবেক। ।"
নাসিফ বললো, "আবাহন মন্ত্রটা কী?"
মৌরি পৃষ্ঠা উল্টে বললো, "ওহ, মমমমম ... না সবাইকে পড়তে হবে না। মন্ত্রটা একবার করে পড়ে এই ছক্কা দুটো মারতে হবে। একসঙ্গে দুটো ছক্কা উঠলে তেজসৃপ এসে হাজির হবে, এমনটাই বলা আছে।"
নাসিফ খিকখিক করে হেসে উঠলো। "কুটি দাদা লোকটা কটঠিন চিজ! প্ল্যানচেট, উইচক্র্যাফট, হোকাসপোকাস, লুডু সব একসঙ্গে ঘুটা দিয়ে ... হিহিহিহি!"
চুমকি বিরক্ত স্বরে বলে উঠলো, "হাত পা চুলকাচ্ছে! এত্তো মশা!"
মৌরি ছক্কা দুটো হাতে নিয়ে বললো, "সোমা আমার কাঁধে হাত রাখো, নাহলে ছক্কা চালার জন্যে হাত খোলা পাবো না।"
সোমা চুপচাপ মৌরির কাঁধে হাত রাখলো।
মৌরি ছক্কা দুটো হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে খাতায় টোকা মন্ত্রটা জপতে লাগলো। তারপর গলা খাঁকরে বললো, "সবাই রেডি?"
সম্মতিসূচক মৌনতা চুমকির মশা মারার শব্দটাকে জোরালো করে তুললো শুধু।
মৌরি একটা শ্বাস ফেলে হাত থেকে ছক্কা দুটোকে গড়িয়ে যেতে দিলো।
শামীম চোখ কুঁচকে ছক্কার রিডিং দেখার চেষ্টা করলো, কিন্তু আবছা আলোয়া কিছুই বোঝার উপায় নেই।
নাসিফ ফিসফিস করে বললো, "ছক্কা দেখার দরকার কী? দুই ছক্কা উঠলে তো খোদ ড্রাগনই এসে হাজির হবে?"
মৌরি হাত বাড়িয়ে ছক্কা দুটো আবার তুলে নিলো। তারপর আবার বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে লাগলো।
সোমা ঘাড় ঘুরিয়ে খাঁচার দিকে চাইলো। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার সেখানে।
মৌরি আবার ছক্কা ছুঁড়ে মারলো।
সোমা টের পেলো, ঘরের ভেতরে হঠাৎ ফুরফুরে বাতাস বইছে। বাইরে আকাশে মেঘ ডেকে উঠলো একবার।
নাসিফ বললো, "ড্রাগন আসুক আর না আসুক, আমার বৌ বৃষ্টি নামিয়ে দিয়েছে ছক্কা মেরে। এরপর মনে হয় বাজ পড়বে।"
মৌরি মুখ দিয়ে শশশশ আওয়াজ করে আবার ছক্কা হাতে নিয়ে বিড়বিড় করতে লাগলো।
মৌরির ছক্কার চালের পর গোটা ঘর ঝমঝম করে নেচে উঠলো বাইরে বৃষ্টির শব্দে। ঘরের ভেতরে একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার স্রোত বয়ে গেলো আবার। চুমকি একটু দূরে খাবারের প্লেট নামিয়ে রেখে হাত মুছতে লাগলো।
নাসিফ প্রতি চালের পরপরই রসিকতা করছে। "কিন্তু না ... অফ স্টাম্পের বাইরে দিয়ে চলে গেলো ছক্কা। ... গোলপোস্টের ওপর দিয়ে সীমানার বাইরে ...। হাৎ ভাই, আসছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশে, কুটি দাদা লিখিত, মৌরি বেগম পরিবেশিত, দাঁত-নখ-লেজসহ, ড্রাআআআগোনননননন!"
মৌরি হাতের ছক্কা একটু জোরে গড়িয়ে দিলো।
নাসিফ কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিলো, কিন্তু তার চোখের সামনে একটা উজ্জ্বল আগুনের বিন্দু নিঃশব্দে জ্বলে উঠে তাকে চুপ করিয়ে দিলো।
সোমা নাসিফের জোরে শ্বাস নেয়ার শব্দ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে আঁতকে উঠলো। "মৌরি!"
মৌরি খাঁচার দিকে পেছন ফিরে বসেছিলো, সে আগুনটা দেখে চমকে উঠে অস্ফূটে বললো, "এসেছে!"
একটু দূরে চুমকি গজগজ করে উঠলো, "কী যে চুলকাচ্ছে সারা গায়ে! এত্তো মশা!"
কয়লার আগুনটা অন্ধকারে একটা হিংস্র প্রশ্নবোধক হয়ে জ্বলতে থাকলো।
শামীম খাবি খাওয়া গলায় বললো, "এখন কী?"
মৌরি কাঁপা হাতে খাতাটা তুলে নিয়ে চাপা গলায় বললো, "তেজসৃপের উপস্থিতি স্বল্পকালীন হওয়া বাঞ্ছনীয়। চক্র যদিও মন্ত্র দ্বারা রক্ষিত, কক্ষটি নহে। সকল প্রদীপ নির্বাপিত রাখিতে হইবেক। তেজসৃপ যেন সাধককে দেখিতে না পায়। তোমরা ... তোমরা কেউ হাত ছেড়ো না, ঠিক আছে? চক্র ভাঙা যাবে না, এটা মন্ত্র দিয়ে রক্ষিত বলছে।"
শামীম চাপা গলায় বললো, "মৌরি তুমি একটা হারিকেন নিবিয়ে দাও তো!"
মৌরি কাঁপা কাঁপা হাতে হারিকেনের সলতের চাবি খুঁজতে লাগলো।
নাসিফ ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বললো, "কিন্তু ওটা কোথায়? খাঁচার ভেতরে তো কিছু দেখা যাচ্ছে না!"
সোমা ফুঁপিয়ে উঠে বললো, "আমার পিঠে ... আমার পিঠে কে যেন শ্বাস ফেললো এই মাত্র!"
নাসিফ বললো, "মৌরি ... এরপর কী করতে হবে? কয়লার আগুন তো এখনও জ্বলছে!"
মৌরি খাতার পাতা উল্টে চাপা গলায় পড়তে লাগলো, "তেজসৃপের দেহ অন্ধকারে প্রজ্জ্বলিত হইয়া দেখা দিবেক। কোনরূপেই সাধক চক্রের দরজা খুলিয়া যেন বাহির না হয়।"
একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো ঘরে। দূরে কোথায় যেন একটা চাপা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেলো।
শামীম ভাঙা গলায় বললো, "চক্রের দরজা?"
মৌরি কাঁপা গলায় বললো, "তাই তো বলছে ... চক্রের দরজা আবদ্ধ রাখিতে হইবেক।"
সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে খাঁচাটার দিকে তাকালো। খাঁচার ভেতরে কয়লার টুকরোটা ক্রমশ উজ্জ্বলতর হয়ে জ্বলছে।
নাসিফ বিড়বিড় করে বললো, "চক্র হচ্ছে ঐ খাঁচাটা।"
সোমা ককিয়ে উঠলো, "আমাদের ওটার ভেতরে থাকার কথা? আমাদের খাঁচার ভেতরে থাকার কথা ছিলো?"
মৌরি কাঁপা হাতে পৃষ্ঠা ওল্টালো, কিন্তু এরপর নতুন অধ্যায় শুরু। করীদানো আবাহন।
মৌরির হাত থেকে খাতাটা পড়ে গেলো একটা চাপা, দীর্ঘ, ঘড়ঘড়ে শব্দে।
একটু দূরে চুমকির হারিকেনের পাশে একটা শরীরের আকার ফুটে উঠলো ঠাণ্ডা, নীলচে আভায়। চুমকির শরীরের।
চুমকি উঠে দাঁড়িয়েছে। পাগলের মতো শরীর চুলকাচ্ছে সে। একটা ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছে তার গলা দিয়ে।
ধারালো কিছু দিয়ে কাপড় ছেঁড়ার ফড়ফড় শব্দ ভেসে এলো এরপর। চুমকি নিজের শরীর থেকে কাপড় ছিঁড়ে খুলে ফেলছে। তার গোটা শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে নীলচে আভা। সে আলোয় দেখা যাচ্ছে, চুমকির গায়ে চামড়ার ওপর ছোটো ছোটো আঁশ গজিয়ে উঠছে।
চুমকির একটা হাত মাথার ওপর উঠে গেলো। বাইরে ঘুলঘুলি দিয়ে চকিতে ঘরে ঢুকলো চমকিত বিদ্যুতের আলো, সে আলোয় সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্যে দেখা গেলো, চুমকির সারা গায়ে আঁশ, তার হাতে গজিয়ে উঠেছে ধারালো নখর, স্কার্ফ ছিঁড়ে ক্রমশ বিকৃত আকার নিচ্ছে তার মাথা।
ড্রাগন এসেছে ডাকে সাড়া দিয়ে।
মন্ত্রে রক্ষিত চক্রের ভেতরে নির্লিপ্তভাবে জ্বলতে লাগলো এক দলা কয়লা। তার বাইরে, অরক্ষিত ঘরের ভেতরটা কয়েকবার উজ্জ্বল হয়ে উঠলো দীর্ঘ, শ্বেততপ্ত শিখার স্রোতে।
চারবার।

[সমাপ্ত] (৮৩৫৯)

টাঙ্গাইলের কথ্য ভাষায় কিছু সংলাপ অনুবাদ করে দিয়েছেন সবুজ বাঘ।

গল্পটি রহস্যপত্রিকার মার্চ ২০১৪ সংখ্যায় প্রকাশিত।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।