Friday, July 20, 2012

বিদায়, হুমায়ূন


সিলেটে আমরা যে বাসায় থাকতাম, তার বারান্দায় টবে একটা বেলি গাছ ছিলো। সেই বাসা ছেড়ে আমরা যখন চলে আসি, আমরা পেছনে ফেলে আসি চারপাশের সুপারি গাছে সারি, বারান্দার আকাশ দখল করে রাখা কৃষ্ণচূড়া, রান্নাঘরের উল্টোদিকের পেয়ারা গাছ, স-মিলের জন্যে আনা কাঁচা কাঠের ঘ্রাণ, আমাদের তেরো বছরের জীবন, শুধু বোকার মতো সঙ্গে করে নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম টববন্দী গাছগুলোকে। আমরা জানতাম না, ট্রাকে করে ফুলের টব দূরের শহরে আনা নিরাপদ নয়। আমাদের একটা ফুলগাছও বাঁচেনি। এখনো মাঝে মাঝে বৃষ্টির পর পথে স্তুপ হয়ে পড়ে থাকা চেস্টনাটের পাঁপড়ির গন্ধ সেই বেলি গাছে ছাওয়া বারান্দার কথা মনে করিয়ে দেয়। ঐ গাছটির সাথে আমার শৈশবের একটা টুকরোও মৃত্যুবরণ করেছে।
স্বার্থপরের মতো চাই, যা কিছু নিয়ে আমার শৈশব ছিলো, তার সবই টিকে থাকুক, বেঁচে থাকুক, নাম ধরে ডাকলে সাড়া দিক। এর সম্ভবপরতা যাচাই করতে ইচ্ছা করে না। তাই যখন দেখি জিগ'স পাজলের এক একটা টুকরো একদিন হঠাৎ করে হারিয়ে যাচ্ছে, শুধু দুঃখ পাই। অপ্রবোধসম্ভব দুঃখ নিয়ে যেমন দাঁড়িয়ে ছিলাম আরেক শহরের আরেক বারান্দায় আমাদের ভাঙা ফুলের টবগুলোর সামনে, তেমনি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে দেখি, শৈশবের শহর মরে গেছে, শৈশবের কৃষ্ণচূড়ায় ছাওয়া পথ মরে গেছে, মরে গেছে খেলার মাঠ, কাকচক্ষু সরোবর, শৈশবের মানুষেরা। এটাই বোধহয় জীবনের শেষ গন্তব্য, যেখানে সান্ত্বনাহীন পরিবর্তন চেনা পৃথিবীকে ফোকলা করে রেখে যায়।
বিদায় হুমায়ূন আহমেদ, বিদায় নীল হাতির লেখক। আপনি আমার শৈশবের একটা অংশ ছিলেন। আরো অনেকের মতো আমিও অনুভব করছি, ঘরের মানুষ না হয়েও স্বজনবিয়োগের বেদনা দিয়ে গেলেন আপনি।

এঁকেছেন সুজন চৌধুরী

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।