Tuesday, July 10, 2012

বাজারের টাকায় পদ্মাসেতু?


ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা ও আনিসুলের মা উপন্যাসের দামামাবাদক দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক খবরে [১] দেখতে পাই,
জাতীয় সংসদের উপনেতা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বলেছেন, ‘বিশ্বব্যাংক টাকা দেয় নাই, তাতে কী হয়েছে? আমরা আমাদের নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করব। দরকার হলে এক বেলা বাজার করব না।’
এক বেলা বাজার না করে বাঁচানো টাকায় দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণের মনোবল থাকা ভালো। আজই বিবিসিতে [২] পড়ছিলাম, দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৯৭ সালে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে যে সঙ্কটে পড়েছিলো, তা থেকে উত্তরণের জন্য আইএমএফের কাছ থেকে কঠিন সব শর্তে ৫৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছিলো। আজ গ্রিস সাধ্যের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যয় করে আর ধার করে ঘি খেয়ে যে সঙ্কটে পড়েছে, আর ইয়োরোপের আরো কয়েকটি বড় অর্থনীতির দেশ যেভাবে গ্রিসের মতো না হলেও কাছাকাছি সঙ্কটে নিমজ্জিত আছে, দক্ষিণ কোরিয়ার সমস্যাও ছিলো তেমনি। কিন্তু আইএমএফের ঋণ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া তিন বছরের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ায়, সেইসাথে ঋণও শোধ করে দেয়।
কোরিয়ার লোকেও আমাদের মতোই ভাত খায় শুনেছি। কিন্তু সম্ভবত অন্য চালের। অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে যে সে সঙ্কটের ভার এবং সঙ্কট মোকাবিলায় দায়িত্বের ভার সকলকেই ধনানুগভাবে নিতে হবে, এ কথা দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতিকরা তার জনগণকে বোঝাতে পেরেছিলেন। গোটা দেশ যখন দেউলিয়া হওয়ার পথে, তখন টেলিভিশনে নাগরিকদের কাছে তাদের অতিরিক্ত সম্পদ রাষ্ট্রকে দানের আহ্বান জানানো হয়। মানুষ তার বিয়ের আংটি খুলে তখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরকারি গহনা-সংগ্রহ কেন্দ্রে গিয়ে দিয়ে আসে। এ ছাড়া দেশীয় পণ্য ক্রয়ে মানুষকে উৎসাহিত করে অতিরিক্ত বিদেশী মুদ্রাও সরকারি কোষাগারে দানের আহ্বান জানানো হয়। এ ছাড়া চলতে থাকে নজিরবিহীন অর্থনীতিগত পুনর্গঠন। কোরীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্তার মতে,
"Burden-sharing," he said. "Every economic player should take their fair burden of the economic restructuring - so asset holders and major shareholders, they cut their stakes in the companies or passed on their assets. Managers and workers agreed to accept salary cuts and layoffs. The consensus among the people is a key ingredient, so we asked our people to take the bullet. And they did."
কেন তারা এমনটা করেছিলো, সে ব্যাপারে কোরিয়াতে দীর্ঘদিন কাটানো এক সাংবাদিক বলেন, ব্যাপারটা এমন নয় যে সরকারের ওপর কোরীয়দের আস্থা বেশি। কোরীয়দের তিনি ইয়োরোপীয়দের মতোই আত্মমগ্ন, অ-ঐক্যবদ্ধ আর অনাস্থাকাতর বলে মনে করেন। কিন্তু কোরীয়দের আরেকটা জিনিস ছিলো, দারিদ্র্যের সাম্প্রতিক স্বাদ। তারা সেই দারিদ্র্য ঐক্যবদ্ধভাবে জাতীয়তাবাদের সাহায্যে মোকাবেলা করে এসেছে, তাই সরকার যখন ঠিকভাবে তাদের সেই বোধে সুড়সুড়ি দিতে পেরেছে, তারা সাড়া দিয়েছে।
আমাদের সরকার বা রাজনীতিকরা যখন আমাদের একইভাবে সুড়সুড়ি দিতে চান, মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে পদ্মাসেতু ইস্যুতে গোটা জাতিকে অন্তত এক বেলা বাজারের খরচের সমান আত্মত্যাগে আহ্বান জানান, তারা বেশ সুবিধাজনকভাবে ভুলে যান, মুক্তিযুদ্ধের নায়কেরা সেই ত্যাগে নিজেরা অন্য সবার মতোই শামিল ছিলেন। বঙ্গবন্ধু নিজেকে বা পরিবারকে সুরক্ষিত করে স্বাধীনতার ডাক দেননি, তাজউদ্দীন স্ত্রীকে সসন্তান জনতার ভিড়ে মিশে যাবার কথা চিরকুটে লিখে প্রবাসী সরকার গঠনের জন্যে চলে গিয়েছিলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় সকলেরই আত্মীয়স্বজন শত্রুকবলিত দেশে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ঝুঁকির মাঝে ছিলেন।
এক বেলা বাজার না করার হুঙ্কার দেয়া সাজেদা চৌধুরীর নাম দেখতে পাই দৈনিক সংবাদে [৩], শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি করা সাংসদদের তালিকায়। সে খবরে বলা হয়েছে,
সংসদ সচিবালয়ের হিসাব শাখা থেকে জানা যায়, যেসব গাড়ি আনা হয়েছে তার অধিকাংশ গাড়ি ল্যান্ডক্রুজার, সর্বশেষ মডেলের টয়োটা, কিংবা ডিজেলচালিত ভিএক্স মডেলের বিলাসবহুল গাড়ি। এসব প্রত্যেকটি গাড়ির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা হলেও এমপিরা শুল্ক সুবিধায় এসব গাড়ি এনেছেন ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকায়।
বিরোধী দলীয় নেতাদের মাঝে ব্যতিক্রমী কণ্ঠ হিসেবে শুনতে পাই জয়নুল আবদীন ফারুকের কথা। তিনি বলেছেন [৪],
‘প্রয়োজনে আমরা এক বেলা খাব না, তবে এর আগে বিশ্বব্যাংক যে চিঠি দিয়েছে, তা প্রকাশ করুন।’
বিশ্বব্যাঙ্কের ১২০ কোটি ডলারের ঋণ বাতিল হওয়ার পর এক বেলা না খাওয়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে এমন বেয়াকুল ঐকমত্য আমাদের ভাবিয়ে তোলে। কারণ জয়নুল আবদীন ফারুকের নামটিও দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানিকারক সাংসদের তালিকায় [৩] জ্বলজ্বল করছে।
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাঙ্কের ওপর গোস্বা করে নিজেদের পয়সায় পদ্মাসেতু করার ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্বব্যাঙ্কের মতো একটি অর্থনীতিবিনাশী পরাশক্তির খপ্পর থেকে বেরিয়ে নিজেদের ভাগ্যের হাল নিজেরা ধরার চেষ্টা বিচক্ষণ তাজউদ্দীনও নিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি দলের ভেতরে আর দেশের বাইরের চাপে টিকতে পারেননি। তাজউদ্দীনকে বঙ্গবন্ধু নিজেই অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনাকে তাজউদ্দীনের পথে চলার চেষ্টা করতে দেখে তাই মিশ্র অনুভূতি হয়।
সংসদের বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী পদ্মাসেতুর ব্যয়ের জন্যে অর্থসংস্থানের কথা বলেছেন:
চলতি বাজেটে ৫৫ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দ আছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছি এবং এখান থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারি। এ জন্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। এ টাকা দিয়ে কাজ শুরু করতে পারি। এ ছাড়া অর্থমন্ত্রী সেতুর জন্য বাজেটে আলাদা করে কিছু টাকা রেখেছিলেন।’ তিনি বলেন, বাজেট থেকে সেতু নির্মাণ করতে গেলে উন্নয়নকাজ কিছুটা কমাতে হবে। তবে সেতুটা হলে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে। অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধিতে তা অবদান রাখবে। প্রধানমন্ত্রী সেতু নির্মাণের জন্য ২২ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, ‘৭৫০ মিলিয়ন ডলারের সভরিন বন্ড ছাড়া হবে। সারচার্জ আরোপ করা হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি কর্মসূচি বা পিপিপিতে তিন হাজার কোটি টাকা আছে। এ টাকা দিয়ে আমরা কাজ শুরু করতে পারি।
প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পে বিলম্ব ঘটানোর জন্য বিশ্বব্যাঙ্কের কাছে জরিমানা চাওয়া উচিত বলেও মত দিয়েছেন। তাঁর অর্থমন্ত্রী ও বিশ্বব্যাঙ্কের প্রাক্তন কর্তা আবুল মাল আবদুল মুহিত আপাতত অন্য দাতাগোষ্ঠীর কাছে বিশ্বব্যাঙ্কের নামে আদুরে "বিশ্বব্যাঙ্ক পচা আমাকে মালে ওকে মেলে দাও" গোছের নালিশ ঠুকেছেন। তাতে কী হবে আমরা জানি না।
এদিকে জনগণের কাছে মোবাইলে কলপিছু ২৫ পয়সা করে চেয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার আব্দুল হামিদ। খবরে দেখি [৬],
পদ্মা সেতু নিয়ে রোববার সংসদে স্বতন্ত্র সাংসদ ফজলুল আজিমের বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে স্পিকার বলেন, “আমার একটা প্রস্তাব আছে। প্রত্যেক কলে ২৫ পয়সা নিয়ে দেশকে সেতু নির্মাণে সহায়তা করা যায়। এতে অনেক পয়সা আসবে।” এ ব্যাপারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলার জন্য আহ্বান জানান স্পিকার।
অথচ মাননীয় স্পিকারের সামনে সংসদেই অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, দেশে সোয়া লাখ ঋণখেলাপি [৭] রয়েছে। তার মাঝে সরকারি চার ব্যাঙ্কে ঋণখেলাপির সংখ্যা নিতান্ত কম নয়, খবর অনুযায়ী,
এছাড়া ২০১২ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত অংগ্রণী ব্যাংকের সাত হাজার ৯২৩ জন, জনতা ব্যাংকের চার হাজার ৯৪১ জন, রূপালীর তিন হাজার ৯১৪ জন, সোনালীর সাত হাজার ৭৮১ জন
স্পিকার কেন এই ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায় করার প্রস্তাব অর্থমন্ত্রীকে দিচ্ছেন না? সরকারি ব্যাঙ্ক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপ করে কয়েক বছর পর পর পুনঃতফশিলীকরণ করে যাবে কিছু বোঁচকামারা বাটপার, আর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে করা রোজগার দিয়ে কোনোমতে জীবনধারণ করে চলা সাধারণ মানুষকে কলপিছু ২৫ পয়সা দিতে হবে পদ্মাসেতুর জন্য? এ কেমন বিচার?
অথবা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রকের দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রীকে আমরা প্রশ্ন করতে পারি, আপনি আপনার উপদেষ্টা, রাজনীতির ময়দানে দলপর্যটক মওদুদের ভায়রাভাই ও বাংলাদেশের একমাত্র দেশপ্রেমিক তৌফিক ইলাহীকে কেন শেভ্রন আর নাইকোর কাছ থেকে আমাদের প্রাপ্য ৪৫ হাজার কোটি টাকা [৮] উদ্ধারের দায়িত্ব দিচ্ছেন না? তাহলে তো সভেরেইন বণ্ড আর সারচার্জের বোঝা থেকে দেশের সাধারণ মানুষেরা বাঁচে।
বিশ্বব্যাঙ্কের মতো বাটপার প্রতিষ্ঠানের কাছে আত্মা বিক্রি করে দেয়া আমলা-বিশেষজ্ঞদের ঘাড়ে নিয়ে বাংলাদেশ সামনে কতদূর যেতে পারবে জানি না, কিন্তু নিজেদের ব্যয়ে পদ্মাসেতু নির্মাণের উদ্যোগকে সমর্থন জানাই। কিন্তু পাবলিকের ঘাড়ে সারচার্জ চাপানোর আগে দেখতে চাই, নির্লজ্জের মতো যেসব সাংসদ বিনা শুল্কে কয়েক কোটি টাকা দামের বিলাসবহুল গাড়ি কয়েক লক্ষ টাকা দিয়ে কিনে এনেছেন, তারা সবার আগে দেশের প্রাপ্য শুল্ক শোধ করেছেন। এক বেলা বাজারবিমুখ সাজেদা চৌধুরী আর এক বেলা অনশনী জয়নাল আবদীন ফারুককে সবার আগে এই শুল্ক শোধকারীর তালিকায় দেখতে চাই। আমি বহু বছর ধরে এক বেলা ভাত খাই, অন্য বেলা ভাতের টাকা পদ্মা সেতুর জন্য দিতে রাজি আছি, যদি দেখি সাংসদেরা দেশের প্রাপ্য টাকা পরিশোধ করেছেন। যদি তারা সেটা না করেন, পাবলিককে যেন দয়া করে এক বেলা উপবাস করতে না বলেন। অশ্লীল শোনায়।
তথ্যসূত্র:

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।