Tuesday, June 26, 2012

গোয়েন্দা ঝাকানাকা ও মিস্টার অ্যান্ড মিসেস হাফমজুর হত্যা রহস্য




১.
ঝাকানাকা থমথমে মুখে গম্ভীর গলায় বললেন, "ক্রাইম সিনের এই দশা কেন?"
কিংকু চৌধারি কাঁচুমাচু মুখে বললেন, "আমার কিছু করার ছিলো না স্যার। ফোন পেয়ে আমরা অকুস্থলে এসে দেখি এই অবস্থা।"
ঝাকানাকা ঘরের চারপাশটা চোখ বুলিয়ে দেখে বললেন, "আপনাদের কে ফোন করলো?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "সাংবাদিক শা ভা মোমেন স্যার।"
ঝাকানাকা বললেন, "সে এ খবর কার কাছ থেকে পেলো?"
কিংকু চৌধারি মাথা চুলকে বললেন, "কাজের বুয়া সকালে দরজায় টোকা দিতে গিয়ে দেখে ঘরের দরজা ভেড়ানো। সে দরজা খুলে উঁকি দিয়ে দেখে ভেতরে মিস্টার আর মিসেস, দুইজনই মরে পড়ে আছে। রক্তারক্তি কাণ্ড। সে তখন কী করবে বুঝতে না পেরে ড্রাইভারকে জানায়। ড্রাইভার জানায় শা ভা মোমেনকে। শা ভা মোমেন ফোন করে আমাকে।"
ঝাকানাকা ভুরু কুঁচকে বললেন, "আপনি এসে কী দেখলেন?"
কিংকু চৌধারি গোমড়া মুখে বললেন, "আমি এসে দেখি স্যার গাবতলির গরুর হাটের মতো ভিড়। গোটা শহরের সাংবাদিকরা এই ঘরের মধ্যে স্যার গিজগিজ করছে। বাড়ির সামনে বাদামওয়ালা, চটপটিওয়ালা, চানাচুরওয়ালা, কোল্ড ড্রিঙ্কসের গাড়ির ভিড়। আমি স্যার ভিড়ের চোটে প্রথম দফা ভেতরে ঢুকতে না পেরে বাইরে দাঁড়িয়ে এক প্লেট চটপটি আর একটা কদবেলকোলা খেলাম। তারপর স্যার বহুকষ্টে ভিড় ঠেলে, দুই দফা একেওকে বেতপেটা করে তারপর স্যার ক্রাইম সিনে পৌঁছাতে পেরেছি।"
ঝাকানাকা বিরক্ত হয়ে বললেন, "পৌঁছে কী দেখলেন?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "সবাই ডেডবডির ছবি তুলছিলো স্যার। ডেডবডির সাথেও অনেকে ছবি তুলেছে। সবাইকেই খুব খুশি খুশি দেখাচ্ছিলো স্যার। শুধু সিটিয়েন বাংলার লোকেরা একটু মুখ কালো করে ছবি তুলছিলো। বাকি যেসব সাংবাদিক আছে, গাগাণ্ডু টিভি, রেডিও ঝাঞ্জাইল, দৈনিক কচুবন, এই সব কয়টার সাংবাদিকেরাই বেশ ফূর্তিতে ছিলো স্যার। দুই আঙুল উঁচিয়ে ভি দেখিয়ে লাশের সাথে ছবিটবি তুলছিলো তারা। আমি গিয়ে যখন সবাইকে এক দফা ধমক দিলাম, তখন আমার সাথেও অনেকে ছবি তুলেছে স্যার।"
ঝাকানাকা বিশাল বিলাসবহুল ঘরের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আসবাব পরখ করতে করতে বললেন, "বটে? তা এতো ফূর্তি কেন তাদের?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "জানি না স্যার। তবে ডেডবডির সাথে ছবি তোলা নিয়ে এক পশলা মারামারি পর্যন্ত হয়েছে। নিখিল ঢাকা সাংবাদিক অ্যালায়েন্সের সদস্যরা রিপোর্টার্স উইদিন বর্ডার্সের সদস্যদের লাঠিপেটা করেছে।"
ঝাকানাকা থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, "লাঠিপেটা? তারা লাঠি পেলো কোথায়?"
কিংকু চৌধারি মাথা চুলকে বললেন, "য়্যাঁ ... মমমম, মনে হয় ... মানে, তা জানি না স্যার। হয়তো সাথে করে নিয়ে এসেছে। কিংবা হয়তো এই বাড়িতেই ছিলো?"
ঝাকানাকা বললেন, "লাশের সাথে ছবি তোলার জন্যে কোনো ভদ্রলোক মারামারি করে?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "না স্যার, ভদ্রলোক ছিলো না ঘরের ভেতরে। সব সাংবাদিক। তারাই বেজায় কেলো করেছে।"
ঝাকানাকা গোঁফ চোমড়াতে চোমড়াতে বললেন, "বটে? তা সে ছবি দিয়ে তারা কী করবে?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "মনে হয় ফেসবুকে আপ করবে স্যার। ... একটু দাঁড়ান স্যার, চেক করে দেখি।" পকেট থেকে বাহারি স্মার্টফোন বার করে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে তিনি বললেন, "হ্যাঁ স্যার, অনেকেই নিজের প্রোফাইল পিকচার হিসেবে আপ করেছে। কেউ কেউ টাইমলাইনের ব্যানার হিসেবে টাঙিয়েছে।"
ঝাকানাকা বললেন, "সাংবাদিকরা আপনার ফ্রেন্ডলিস্টে আছে নাকি?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "হ্যাঁ স্যার। গোয়েন্দার চাকরি করলে সাংবাদিকদের সাথে তো একটু খাতির যোগাযোগ রাখতেই হয়। ... ওহ, মিস জয়তুন চুমকি দেখছি আমার সাথে তোলা ছবি প্রোফাইল পিকচার হিসেবে দিয়েছেন, হেঁহেঁহেঁ!"
ঝাকানাকা গম্ভীর হয়ে বললেন, "ঘরের জিনিসপত্র হাঁটকেছে কেউ?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "স্যার, একবার যদি দৃশ্যটা দেখতেন। এই ঘরের ভেতরে সত্তর আশিজন মানুষ, কে কার আগে ডেডবডির সাথে ছবি তুলবে তা নিয়ে তুমুল হইচই শোরগোল কাউমাউ। আলবাত হাঁটকেছে স্যার।"
ঝাকানাকা বললেন, "তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, এই যে সবকিছু ওলটপালট লণ্ডভণ্ড হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সেটা এই সাংবাদিকদের কাজ?"
কিংকু চৌধারি মাথা চুলকে বললেন, "হতে পারে স্যার। আবার এমনও হতে পারে, জিনিসপত্র আগেভাগেই হাঁটকানো ছিলো, সাংবাদিকরা ওর ওপরেই এসে দাপাদাপি করেছে।"
ঝাকানাকা এগিয়ে গিয়ে বিশাল বিলাসবহুল মোগলাই নকশার খাটের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে দেখে বললেন, "হুমমমম। খাটের ওপর অনেকগুলো জুতোর দাগ। সাংবাদিকদের কাণ্ড?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "হ্যাঁ স্যার, অনেকেই খাটে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিল।"
ঝাকানাকা উল্টে পড়ে থাকা সোফা আর চেয়ার মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, "মনে হচ্ছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে কোনো লাভ হবে না।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "কোনোই লাভ নেই স্যার। সবাই সারা ঘরে এটা ওটা হাতড়ে হিজিবিজি করে রেখেছে।"
ঝাকানাকা বললেন, "আর কোনো কিছু দেখেছিলেন?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "স্যার, কোনোকিছুই ঠিকমতো দেখতে পারিনি তখন। আমি আসার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আবার একটা দাঙ্গা বেঁধে গেলো তো। ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টার্সের লোকজন হকিস্টিক দিয়ে সিনে সাংবাদিক ইউনিয়নের মেম্বারদের পেটানো শুরু করেছিলো। বড়কর্তাদের ওয়্যারলেসে সব কিছু জানালাম তখন। তারা ১৪৪ ধারা জারি না করলে আজ এখানে ঢুকতেই পারতেন না স্যার।"
ঝাকানাকা শিউরে উঠে বললেন, "খুনজখম হলেই পালে পালে সাংবাদিক ক্রাইম সিনে গিয়ে কী করে?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "স্যার আজকাল খুনের সিন ছাড়া খবর জমে না। রোজই স্যার চারটা পাঁচটা খুন হয়। টিভি চ্যানেলগুলোর খবর তো স্যার টিকেই আছে খুনের সিন দেখিয়ে। আমার ছোটো খালা স্যার এখন খুনের সিন না দেখলে রাতে ভাতই খেতে পারেন না। মুখে রোচে না স্যার। আর খুনের সিন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কাভার করতে না পারলে পাবলিক খুব চোটপাট করে স্যার। সেদিন ঘড়িয়াল টিভি ঘেরাও করেছিলো ঢাকা টিভি দর্শক ঐক্যের লোকজন। ঘড়িয়াল টিভির স্টেশন চিফ নিয়মিত খুনের সিন খবরে দেখানোর অঙ্গীকার করে মুচলেকা দেয়ার পর তারা পিকেটিং বন্ধ করেছে।"
ঝাকানাকা বিমর্ষ মুখে বললেন, "হুমমম। পরিস্থিতি খুব খারাপ।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "খুব খারাপ স্যার। সেদিন এক বিয়ের দাওয়াতে সাংবাদিক নেতারা আমাদের শাসিয়েছেন। খুন জখম কমে গেলেই তারা আমাদের বকাঝকা করেন। মাঝখানে এক হপ্তা খুব বৃষ্টিবাদল গেছে স্যার, হতভাগা খুনে গুণ্ডাগুলোও মনে হয় বাড়ি ছেড়ে বেরোয়নি। পাবলিক টিভি ছেড়ে খবরে খুনজখম দেখতে না পেয়ে খুব চিল্লাচিল্লি করেছে স্যার।"
ঝাকানাকা ঘরের এক প্রান্তে দেয়ালে গাঁথা শেলফে রাখা বিশাল সাউণ্ড সিস্টেমের দিকে তাকিয়ে বললেন, "এটা অন করা আছে দেখি। আপনি যখন প্রথম এলেন, তখন মিউজিক চলছিলো নাকি?"
কিংকু চৌধারি হতাশ মুখে বললেন, "খেয়াল করিনি স্যার। মিউজিক চললেও তো শোনার উপায় ছিলো না। কী পরিমাণ হাউকাউ যে হচ্ছিলো, যদি একবার শুনতে পেতেন!"
ঝাকানাকা এগিয়ে গিয়ে বোতাম চেপে ট্রে থেকে একটা মিউজিক সিডি বার করে মনোযোগ দিয়ে দেখলেন।
কিংকু চৌধারি বললেন, "স্যার, লাশ দুটো পরীক্ষা করে দেখবেন না?"
ঝাকানাকা বললেন, "দেখবো। আপনি এক কাজ করুন, যাদের প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার, তাদের এক জায়গায় জড়ো করুন।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "স্যার আমি এর মধ্যেই কয়েকজনকে টয়লেটে আটক করে রেখেছি।"
ঝাকানাকা সিডিটা প্লেয়ারে ঢুকিয়ে একটা হেডফোন তুলে নিয়ে বললেন, "বটে? কারা তারা?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "কাজের বুয়া, ড্রাইভার, শা ভা মোমেন, বদি ভাই রহমান, সোবহানাল্লাহ কুংফু আর শরিয়তুন্নেসা টাইফুন স্যার।"
ঝাকানাকা প্লে বাটনে চাপ দিয়ে হেডফোন কানে গুঁজে চিন্তিত মুখে বললেন, "হুমমম! তা নিয়ে আসুন এক এক করে সবাইকে।"
কিংকু চৌধারি যখন কাজের বুয়াকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন, তখন ঝাকানাকা গম্ভীর মুখে ঘরের ভেতর পায়চারি করছেন।
কাজের বুয়া হাপুস কেঁদে বললো, "সার সার আমারে ছাইড়া দেন গো সার আমি কিছু করি নাই!"
ঝাকানাকা কাজের বুয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, "আচ্ছা, ছেড়ে দেয়া হবে তোমাকে। কী নাম তোমার?"
কাজের বুয়া আঁচলে চোখ মুছে বললো, "হানুফা খাতুন।"
ঝাকানাকা বললেন, "হানুফা খাতুন, তুমি বিস্তারিত ঘটনা আমাদের খুলে বলো।"
হানুফার বর্ণনা থেকে জানা গেলো, সে রাত বারোটার দিকে টিভিতে লেট নাইট টক শো লাখ কথার এক কথা দেখে ঘুমিয়ে পড়ে। লাখ কথার এক কথা সে নিয়মিত দেখে, কখনো মিস করে না। হানুফা লেখাপড়া তেমন জানে না, তবে লাখ কথার এক কথা দেখে সে দেশ সম্পর্কে অনেক কিছু শিখেছে। ঢাকেশ্বরী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নিজামরুল লাখ কথার এক কথার নিয়মিত কথোয়াড়। হানুফা মনে করে, একাত্তর সালে দালালি খুনখারাপির জন্য রাজাকারদের বিচার হচ্ছে, এটা খুব খারাপ। কেন খারাপ, তা সে জানে না, তবে আসিফ নিজামরুল যখন বলেছেন খারাপ, তখন নিশ্চয়ই খারাপ।
হানুফার ঘুম সাধারণত ভাঙে সকাল সাতটার দিকে। আজ তার ঘুম কিছুটা আগেই ভেঙে যায়। সে দুঃস্বপ্ন দেখছিলো, সে কারণেই সম্ভবত তার ঘুম আগে ভাঙে। স্বপ্নে সে দেখে, অধ্যাপক আসিফ নিজামরুল একটা সবুজ লুঙ্গি পরে টিভিতে দৌড়াদৌড়ি করছেন আর চিৎকার করছেন, "আমি আর সহ্য করতে পারতেছি না! আমি আর সহ্য করতে পারতেছি না!" ঘুম ভাঙার পর হানুফা আত্তাহিয়াতু দোয়া পড়ে উল্টো পাশ ফিরে শুয়ে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তখন তার মনে হয়, দোতলায় কোনো একটা ধস্তাধস্তি হচ্ছে। সাহেব আর বিবিসাহেবের ঘর থেকে প্রায়ই বিচিত্র সব আওয়াজ আসে, তাই সে পাত্তা না দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙে একটু দেরিতে, আটটার সময়। সে উঠে হুড়াহুড়ি করে নাস্তা বানায়, চা বানায়, তারপর কারো পাত্তা না পেয়ে দোতলায় শোবার ঘরে টোকা দিতে গিয়ে দেখে দরজা ভেড়ানো শুধু। সে তখন কাশি দিয়ে ডাক দেয়। কিন্তু সাহেব বা বিবিসাহেব, কারোই সাড়া মেলে না। কৌতূহলী হয়ে সে দরজা খুলে ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখে, মেঝেতে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে দুজনই। বিবিসাহেবের সারা গায়ে রক্ত।
ঝাকানাকা পুরো বক্তব্য মন দিয়ে শুনে হানুফাকে বললেন, "ঘরের ভিতরে কি জিনিসপত্র এরকম উল্টোপাল্টা ছিলো?"
হানুফা ঘরের ভেতরটা পুরোটা দেখে মাথা নাড়লো, "না সার। সবকিছু ঠিক ছিল। এইটা সাম্বাদিগ সাহেবদের কাম। তারা আইসা অনেক উলটপালট করছেন।"
ঝাকানাকা বললেন, "আচ্ছা। হুমমমম। তা তুমি যখন ঘরে ঢুকলে, তখন কি কোনো গানবাজনার আওয়াজ পেয়েছিলে?"
হানুফা বললো, "না সার। আমি ঘুম থেইকা উঠার পর কোনও আওয়াজই পাই নাই। সব চুপচাপ আছিল।"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমমমম। আচ্ছা, ঠিকাছে। হানুফা তুমি যাও, বিশ্রাম নাও, খাওয়াদাওয়া করো। কিংকু সাহেব, একে আর পাকড়াও করে রাখার দরকার নেই। আপনি বরং ড্রাইভারকে নিয়ে আসুন।"
কিংকু চৌধারি যখন ড্রাইভারকে সঙ্গে করে ঘরে ঢুকলেন, ঝাকানাকা তখন আতশ কাঁচ দিয়ে একটা কাঠের টুকরো পরীক্ষা করছিলেন।
ড্রাইভার ফ্যাকাশে মুখে বললো, "স্যার আল্লার কিরা আমি কিচ্ছু জানি না। হানুফাবু আমারে ডাইকা আইনা লাশ দেখাইছে স্যার। আমি কিচ্ছু জানি না।"
ঝাকানাকা ড্রাইভারের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, "টেনশন করো না। নাম কী তোমার?"
ড্রাইভার গেঞ্জি তুলে চোখ মুছে বললো, "হাফিজ।"
ঝাকানাকা আতশ কাঁচ দিয়ে একটা ধাতব তার পরীক্ষা করতে করতে বললেন, "বলো হাফিজ, তুমি কী দেখেছো?"
হাফিজের বক্তব্য থেকে জানা গেলো, সে এ বাড়িতেই থাকে। গ্যারেজের লাগোয়াই তার ঘর। রাতে সে হাফমজুর রহমানকে হোটেল মৌতাত থেকে বাড়িতে নিয়ে আসে রাত দেড়টার দিকে। সাহেব তখন মদের ঘোরে প্রায় বেহুঁশ। হ্যাঁ, তিনি প্রায়ই হোটেল মৌতাতে গিয়ে মদ্যপান করতেন। তারপর তাকে ধরাধরি করে গাড়িতে তুলে বাড়িতে আনতে হতো। তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে হাফিজ কিছুক্ষণ গভীর রাতের টক শো "শুনতে হবে" দেখে। হাফিজ শুনতে হবে নিয়মিত দেখার চেষ্টা করে। তার ডিউটি গভীর রাতে শেষ হয় বলে এই একটামাত্র টক শো-ই সে দেখার সুযোগ পায়। সমাজ গবেষক নুরুল কাপুর তার প্রিয় বক্তা। হাফিজ মনে করে, একাত্তরের রাজাকারদের বিচার ঠিকমতো হচ্ছে না। তাদের বেকসুর খালাস দিলেই একমাত্র সুবিচার সম্ভব। কেন, এতো কিছু হাফিজ জানে না। নুরুল কাপুর যখন বলেছেন সুবিচার হচ্ছে না, তখন হচ্ছে না।
শুনতে হবে দেখা শেষ করে হাফিজ ঘুমিয়ে পড়ে। ভোরের দিকে দুঃস্বপ্ন দেখে তার ঘুম ভেঙে যায়। স্বপ্নে সে দেখতে পায়, নুরুল কাপুর একটা সবুজ লুঙ্গি পরে টিভিতে চিৎকার করছেন, "আমি আর সহ্য করতে পারতেছি না! আমি আর সহ্য করতে পারতেছি না!" হাফিজ জেগে উঠে এক গ্লাস পানি খেয়ে উল্টো কাতে শুয়ে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করে। তার একবার মনে হয়েছিলো, দোতলায় ধস্তাধস্তির আওয়াজ হচ্ছে, কিন্তু সে বেশি পাত্তা দেয়নি। ওরকম আওয়াজ প্রায়ই হয়। কিন্তু তার ঘুম ঠিকমতো জমাট হওয়ার আগেই হানুফাবু চিৎকার করতে করতে তার দরজায় ধাক্কা দেয়। সে কোনোমতে একটা শার্ট গায়ে দিয়ে দোতলায় গিয়ে দেখে, সাহেব আর মেমসাহেব মেঝেতে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছেন। মেমসাহেবের সারা গায়ে রক্ত। এরপর সে মোবাইল থেকে শা ভা মোমেন সাহেবকে ফোন করে।
ঝাকানাকা ভুরু কুঁচকে চোখ পাকিয়ে হাফিজকে আপাদমস্তক দেখেন একবার, তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, "তুমি যখন এ ঘরে ঢুকলে, তখন জিনিসপত্র কি এমন ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো?"
হাফিজ এক নজর চারপাশ দেখে নিয়ে বললো, "না স্যার! এইতান সাম্বাদিগগো কাম!"
ঝাকানাকা কিছুক্ষণ পায়চারি করে বললেন, "আচ্ছা হাফিজ। তুমি যাও। বিশ্রাম নাও। তোমার কোনো ভয় নাই। কিংকু সাহেব, ওকে আর আটক করার দরকার নেই।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "স্যার, একে আর হানুফাকে এক দফা করে পিটিয়ে রাখি? এরা দুইজন ষড়যন্ত্র করে হাফমজুর আর ভিভা ম্যাডামকে কোতল করতে পারে!"
ঝাকানাকা বললেন, "নাহ, পেটানোর দরকার নেই। চোখে চোখে রাখলেই হবে। আপনি বরং শা ভা মোমেনকে নিয়ে আসুন।"
কিংকু চৌধারি হাফিজের পেছনে বেতের একটা মাঝারি বাড়ি দিয়ে বললেন, "নিচে যাও। এক ডাক দিলেই যেন তোমাকে পাওয়া যায়। বাড়ি ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করলে ধরে ক্রসফায়ারে দিবো। নয়তো ফাঁসি।"
হাফিজ পড়িমড়ি করে পালালো।
ঝাকানাকা ঝুঁকে পড়ে ভিভা রহমানের রক্তাক্ত মৃতদেহ পরীক্ষা করতে লাগলেন।
শা ভা মোমেন কিছুক্ষণ পর কিংকু চৌধারির সাথে ঘরে ঢুকলেন। ঝাকানাকা ভয়ানক ভুরু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আসুন জনাব শা ভা মোমেন! এ কী ... আপনার হাতে রক্ত কেন?"
শা ভা মোমেন আঙুলের গাঁটে ফুঁ দিতে দিতে বললেন, "আপনার এই গুণ্ডা পুলিশ অফিসার আমাকে সোবহানাল্লাহ কুংফুর সাথে একটা চিপা টয়লেটের ভিতরে কয়েক ঘন্টা ধরে আটকে রেখেছে! আমি এর বিচার চাই!"
কিংকু চৌধারি বললেন, "স্যার, এই মোমেন সাংবাদিকের সাথে কুংফু লোকটার পুরোনো শত্রুতা আছে। টয়লেটে দুইজন অনেক মারপিট করেছে স্যার!"
শা ভা মোমেন চোখ গরম করে বললেন, "আমি আপনাকে শুরুতেই বললাম, আমাকে আটকে রাখতে হয় তো মাস্টার বেডরুমের টয়লেটে নিয়ে আটকে রাখুন! আপনি শুনলেন না!"
কিংকু চৌধারি বললেন, "এহ, সব টয়লেট ভর্তি করে রাখলে বিপদে আপদে আমরা কোথায় যাবো?"
শা ভা মোমেন বললেন, "নিচতলায় হানুফার টয়লেটেই তো যেতে পারতেন!"
ঝাকানাকা বললেন, "আপনার দেখছি এই বাড়ির টয়লেট সম্পর্কে খুব স্বচ্ছ ধারণা জনাব শা ভা মোমেন! আপনি প্রায়ই আসেন নাকি?"
শা ভা মোমেন থতমত খেয়ে বললেন, "তা তো আসতে হয়ই। বসের বাড়ি। মাঝেমধ্যেই আসতে হয়।"
ঝাকানাকা পায়চারি করতে করতে বললেন, "যা জানেন, খুলে বলুন। কোনো কিছু লুকানোর চেষ্টা করবেন না। করলেই প্যাঁদাবো।"
শা ভা মোমেন ঢোঁক গিলে বললেন, "আমি ... আমি কী জানবো বলুন? আমি চাকরি করি, বেতন পাই, বাস।"
ঝাকানাকা বললেন, "বটে? আজকের ঘটনা খুলে বলুন। কখন কীভাবে কী জানলেন, সঅব।"
শা ভা মোমেনের বক্তব্য থেকে জানা গেলো, গত রাতে তিনি হোটেল মৌতাতে হাফমজুর রহমানের সঙ্গে রাত একটা পর্যন্ত ছিলেন। না, শা ভা মোমেন মদ্যপান করেন না, তিনি এক বোতল কদবেলকোলা নিয়ে হাফমজুরকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন। হোটেল মৌতাতে মদের সঙ্গে উন্নতমানের বাদামের চাঁট পরিবেশন করা হয়, তিনি সেটা খেতে পছন্দ করেন। হাফমজুর মদ খেতে খেতে পুরো হয়রান হয়ে পড়ার পর তিনি মোবাইলে হাফিজকে ভেতরে আসতে বলেন। তারপর দুজন মিলে হাফমজুরকে চ্যাংদোলা করে তুলে হোটেলের বাইরে বার করে গাড়িতে তুলে দেন। শা ভা মোমেন সখেদে বলেন, হাফমজুর লোকটা কী খায় কে জানে। তার ওজন কোরবানির গরুর মতো। গাবতলি থেকে গরু হাঁটিয়ে গ্রিন রোডে আনতে গেলে যে পরিমাণ পরিশ্রম হয়, তার সমান পরিশ্রম হয় তাকে হোটেল থেকে বার করে গাড়িতে তুলতে। শা ভা মোমেন প্রায়ই ভাবেন, তিনি শুকনাপাতলা কোনো বস বেছে চাকরি পাল্টে চলে যাবেন সিটিয়েন বাংলা ছেড়ে। কিন্তু সেরকম বস পাওয়া খুব মুশকিল। অন্যান্য টিভি চ্যানেলের মালিকগুলিও হাফমজুরের মতোই ওজনদার।
বাড়ি ফিরে শা ভা মোমেন ঘুমিয়ে পড়েন। না, রাত জেগে টক শো দেখার অভ্যাস তার নেই। সকালে মোবাইলে হাফিজের কল পেয়ে তার ঘুম ভাঙে। তিনি ব্যাপারটা জেনে নিয়ে সরাসরি কিংকু চৌধারিকে ফোন দেন। তারপর চলে আসেন এই বাড়িতে। এসে দেখেন বিপুল ভিড়। সব টিভি, রেডিও আর কাগজের লোক জড়ো হয়ে গেছে। পুলিশ ভিড় সামলানোর বদলে চানাচুরওয়ালা আর কোল্ড ড্রিঙ্কসওয়ালার গাড়ি থেকে চাঁদা তুলছে। কিংকু চৌধারিও চটপটি আর কদবেলকোলা খাচ্ছিলেন। চটপটিওয়ালা তার কাছে গোপনে বিচার দিয়েছে, কিংকু চৌধারি পয়সা দেননি।
কিংকু চৌধারি ভয়ানক চটে গিয়ে বললেন, "আপনারা, এই সাম্বাদিগগুলি সবসময় তালে থাকেন আমাদের নামে উল্টাপাল্টা স্টোরি করার!"
শা ভা মোমেন নাক টেনে বললেন, "আমরা সত্যকে তুলে ধরি শুধু।"
ঝাকানাকা কিংকু চৌধারিকে আড়চোখে কিছুক্ষণ দেখে নিয়ে বললেন, "আপনি যখন এই ঘরে এলেন, তখন কী দেখতে পেলেন?"
শা ভা মোমেন কপাল টিপে ধরে বললেন, "ভয়ঙ্কর দৃশ্য! বর্ণনা করা কঠিন! আমার সাংবাদিক জীবনে আমি বহু ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখেছি, কিন্তু এমন দৃশ্য আর দেখি নাই!"
কিংকু চৌধারি গজগজ করতে লাগলেন, "যত্তোসব ফালতু নিউজ করে!"
ঝাকানাকা দেয়ালে টাঙানো একটা ছবির দিকে তাকিয়ে বললেন, "কী দৃশ্য?"
শা ভা মোমেন বললেন, "আমি দেখলাম, হাফমজুর ভাইয়ের ডেডবডির সাথে ছবি তোলার জন্য সব সাংবাদিক কিলাকিলি করছে! ছোটো বড় নারী পুরুষ হিন্দু মুসলিম ঢালী পার্টি চুন্নু পার্টি কোনো ভেদাভেদ নাই! গাগাণ্ডু টিভির নূরজাহান নানচাকুকে দেখলাম দৈনিক কচুবনের নিখিল মন্তাজকে চুল ধরে মারছে! সাংবাদিক মহাসমাজের সভাপতি ঐ ব্যাটা সোবহানাল্লাহ কুংফুকে দেখলাম রেডিও ঝাঞ্জাইলের গুলবদন পিঙ্কির সাথে লাঠালাঠি করতে। চারিদিকে আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা! এমন দৃশ্য আমি আগে কখনো দেখিনি! ঐ পরিবেশে একটা সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে হাফমজুর ভাইয়ের ডেডবডির পাশে গিয়ে ছবি তোলার কোনো সুযোগই ছিলো না। আমি তখন চিৎকার করে বললাম, আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা একজন একজন করে ছবি তোলেন। যারা সিনিয়র, তাদের আগে ছবি তুলতে দিন। যারা জুনিয়র, তারা পরে আসুন। আমরা জাতির বিবেক, আমাদের পক্ষে নিজেদের মধ্যে এই মারপিট, এই লড়াই, এই সংঘর্ষ মানায় না। হে তরুণ এসো সত্যের কাফিলায়। ... এই কথা বলার পর সোবহানাল্লাহ কুংফু পিঙ্কির সাথে লাঠালাঠি বাদ দিয়ে আমাকে পিটানো শুরু করলো!"
ঝাকানাকা বললেন, "আপনি কি ঘরে ঢুকে কোনো মিউজিক শুনতে পেয়েছিলেন?"
শা ভা মোমেন থতমত খেয়ে বললেন, "মিউজিক? না কোনো মিউজিক তো শুনিনি। আর তখন যে শোরগোল হচ্ছিলো, তাতে মিউজিকের বাবারও সাধ্য নেই বাজার। হইচই চেঁচামেচি মারপিট ... প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে একজনের হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে লড়াই করতে হয়েছে সোবহানাল্লাহ কুংফুর সাথে। মিউজিক বাজলেও আমার খেয়াল নেই।"
ঝাকানাকা ঘরের ভেতর পায়চারি করতে করতে বললেন, "আপনার কী মনে হয়, মিস্টার অ্যান্ড মিসেস হাফমজুরকে কে খুন করতে পারে?"
শা ভা মোমেন গলা খাঁকরে বললেন, "আমি তো এতোকিছু জানি না গোয়েন্দা সাহেব। আমি চাকরি করি, বেতন পাই।"
ঝাকানাকা চোখ পাকিয়ে বললেন, "বললেই হোলো? হাফমজুর আর ভিভার মতো দুইজন নামিদামি মানুষকে মারার জন্য একটা মোটিভ তো থাকতে হবে। কী সেই মোটিভ? এরা কাদের পাকা ধানে মই দিয়েছিলো? যা জানেন শিগগীর বলুন!"
শা ভা মোমেন গলা খাকরে নিচু গলায় কিংকু চৌধারিকে বললেন, "ঝাকানাকা সাহেব টিভি খুব একটা দেখেন না মনে হয়?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "ওনার বাড়িতে সিটিয়েন বাংলা চ্যানেলটা ব্লক করা।"
শা ভা মোমেন বললেন, "আহ, তাই তো বলি। ... না মানে, মোটিভ আর কী। ধরেন, দেশের মানুষ ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠছে। তারা সামান্যতেই ক্ষেপে ওঠে। মুখের কথায় যেখানে কাজ হওয়ার কথা, সেখানে কামান দাগে। এ-ই আর কী।"
ঝাকানাকা বললেন, "কিছুই তো বুঝলাম না। এক এক করে বলুন। হাফমজুর কার পাকা ধানে মই দিয়েছিলো?"
শা ভা মোমেন গলা নামিয়ে বললেন, "হাফমজুর ভাইয়ের কথা আমি বিস্তারিত জানি না। কিন্তু ভিভা ম্যাডামের ওপর অনেক লোক খুব ক্ষ্যাপা।"
ঝাকানাকা বললেন, "বটে? কারা তারা?"
শা ভা মোমেন বললেন, "দুইটা কান আছে এমন যে কোনো লোককেই আপনি সন্দেহ করতে পারেন। তার সাথে যদি দুইটা চোখও তাদের থাকে, তাহলে ধরুন গিয়ে সন্দেহ আরো গাঢ় হতে পারে!"
ঝাকানাকা বললেন, "আচ্ছা। হুমমম। বেশ। তা সম্প্রতি হাফমজুর বা ভিভাকে নিয়ে অস্বাভাবিক কোনো কিছু কি আপনার নজরে এসেছে?"
শা ভা মোমেন গলা নামিয়ে বললেন, "হাফমজুর ভাইয়ের সাথে ভিভা ম্যাডামের কোনো কিছু নিয়ে গণ্ডগোল চলছিলো সম্ভবত। আমি একদিন অফিসে কাজের ফাঁকে শুনলাম, উনি ভিভা ম্যাডামকে ফোনে ধমকাচ্ছেন।"
ঝাকানাকা সরু চোখে তাকিয়ে বললেন, "কী নিয়ে ধমকাচ্ছিলো?"
শা ভা মোমেন বললেন, "ইয়ে, তা তো বলতে পারি না। তবে বলছিলেন, "তুমি যদি এইরকম চালিয়ে যাও, আমিও কিন্তু শুরু করে দিবো!" ... কেন এ কথা বললেন, সেটা আপনি চিন্তা করে দেখবেন!"
ঝাকানাকা পায়চারি করতে করতে বললেন, "ভিভা রহমানকে এ কথা কেন বললো হাফমজুর? কী চালিয়ে যাওয়ার কথা হচ্ছে এখানে?"
শা ভা মোমেন আড়চোখে ঝাকানাকাকে দেখে নিয়ে বললেন, "দেখুন, ভিভা ম্যাডাম অত্যন্ত উচ্ছল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। হাসিখুশি। দিলখোলা। সবাইকে ভালোবাসতেন। শুনেছি তার আয়োজনে বাসায় নিয়মিত আসর বসতো। অনেকে সেই আসরে আসতেন। এইসব ব্যাপারস্যাপার আর কী।"
ঝাকানাকা থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, "আসর? কীসের আসর?"
শা ভা মোমেন চোয়াল ঘষতে ঘষতে বললেন, "গানের আসর, সম্ভবত। উনি খুব গানপাগল ছিলেন, জানেন তো।"
ঝাকানাকা গলা খাঁকরে বললেন, "সেই আসর কি হাফমজুর সাহেবের উপস্থিতিতে হতো, নাকি?"
শা ভা মোমেন বললেন, "না মনে হয়।"
ঝাকানাকা চোখ পাকিয়ে বললেন, "এই যে আপনি নিয়মিত হোটেল মৌতাতে হাফমজুরের সঙ্গে বসে কদবেলকোলা পান করেন, আপনি জানেন না এ নিয়ে কোনো সমস্যা চলছিলো কি না?"
শা ভা মোমেন বললেন, "আমি কীভাবে জানবো? উনি মদ খেয়ে ঘুরেফিরে শুধু বদি ভাই রহমানের বদনাম করতেন।
ভিভা ম্যাডামের গানের আসর নিয়ে তো কোনো কথা হয়নি।"
ঝাকানাকা বললেন, "সে আসরে কে বা কারা আসতো, আপনি জানেন না?"
শা ভা মোমেন গলা খাঁকরে বললেন, "একদম না। আমি সাংবাদিক মানুষ। স‌ত্যকে তুলে ধরি। গুজব নিয়ে আমার কোনো কারবার নাই।"
ঝাকানাকা চোখ গরম করে শা ভা মোমেনকে এক নজর দেখে নিয়ে বললেন, "দেয়ালের এই ছবিটা দেখুন। এটা আগে দেখেছেন?"
শা ভা মোমেন দেয়ালে টাঙানো একটা ছবি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে বললেন, "না। এরকম ছবি আমি আগে কখনো দেখিনি। বড় অদ্ভুত!"
ঝাকানাকা বিড়বিড় করে বললেন, "আমিও তাই ভাবছিলাম।"
শা ভা মোমেন বললেন, "আপনি আমাকে এখন ছেড়ে দিন। আমাকে কয়েক ঘন্টা টয়লেটে আটকে রেখেছেন, আমি টয়লেটে যাওয়ার সুযোগটাও পাইনি। আমাকে রেহাই দিন, আমাকে অফিসে যেতে হবে। ফেসবুকে ছবি আপলোড করা হয়নি ... কত কাজ বাকি!"
কিংকু চৌধারি বললেন, "স্যার, আমাদের নামে চটপটির টাকা মারার মতো জঘন্য নিউজ করার আগেই একে এক রাউন্ড ঠ্যাঙানোর সুযোগ দিন!"
ঝাকানাকা বললেন, "আপনি আপাতত এই বাড়িতেই থাকুন। নিচে গিয়ে বসুন। টিভি দেখুন, চা খান। তবে জেরা এখনও শেষ হয়নি। কিংকু সাহেব, আপনি বরং বদি ভাইকে নিয়ে আসুন।"
শা ভা মোমেন কিংকু চৌধারির দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে সংলগ্ন টয়লেটে ঢুকে পড়লেন।
কিংকু চৌধারি বদি ভাই রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢুকে দেখলেন, ঝাকানাকা আতশ কাঁচ দিয়ে একটা প্লাস্টিকের টুকরো পরীক্ষা করছেন মন দিয়ে।
বদি ভাই রহমান গরম হয়ে বললেন, "আপনারা উন্নত বিশ্বের চোখে দেশকে কতটা খাটো করলেন, জানেন? প্রেসের স্বাধীনতার উপর আপনারা আলকাতরার কলঙ্ক লেপে দিয়েছেন! আমাকে বাড়ি থেকে ধরে এনেছে আপনার এই অসভ্য পুলিশের দল! আমাকে কাপড়টা পর্যন্ত ঠিকমতো পাল্টানোর সময় দেয়নি!"
ঝাকানাকা বদি ভাই রহমানকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে বললেন, "মন্দ কী? গেঞ্জি আর পায়জামা পরে আছেন। আরামদায়ক পোশাক। গেঞ্জিতে এটা কী লেখা? হুমমম? সানডে হোক আর মানডে, রোজ পুনম পান্ডে? এই নেংটো মেয়েটিই বুঝি পুনম পান্ডে? বেশ বেশ।"
বদি ভাই গর্জে উঠলেন, "আপনাদের নামে আমি এক মাস টানা স্টোরি করবো দৈনিক কচুবনে। তখন বুঝবেন কত ধানে কত চাল!"
ঝাকানাকা বললেন, "কিংকু সাহেব, বদি ভাইকে ঘর থেকে ধরে এনেছেন কেন?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "স্যার, এনার সাথে নিহত ভিভা রহমানের গতকাল রাতে দীর্ঘ সময় মোবাইলে কথা হয়েছে। আমরা কল রেকর্ড চেক করে দেখেছি স্যার। ইনি প্রায়ই ভিভার সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতেন!"
ঝাকানাকা হাসিমুখে বললেন, "বটে?"
বদি ভাই রহমান ঝাঁঝালো গলায় বললেন, "কথা হয়েছে তো কী হয়েছে? কথা বলা কি পাপ? মানুষের সঙ্গে মানুষ কথা বলবে, সারাদিন কথা বলবে। তাই বলে আমাকে বাড়ি থেকে ধরে আনবেন নাকি?"
ঝাকানাকা বললেন, "আপনি কি ভিভা রহমানের গানের আসরে এসেছেন আগে?"
বদি ভাই রহমান বললেন, "পাগল নাকি? আমার ঐসব গানবাজনার পেছনে খরচ করার মতো সময় নেই। আমার অনেক কাজ।"
ঝাকানাকা বললেন, "আপনি গতকাল রাতে কোথায় ছিলেন?"
বদি ভাই রহমান গলা খাঁকরে বললেন, "এই তো একটু বাইরে ছিলাম। কেন?"
ঝাকানাকা চোখ পাকিয়ে বললেন, "সব ভালোয় ভালোয় খুলে বলুন। নয়তো আপনাকে আজ সারাদিন টয়লেটে আটকে রাখা হবে সোবহানাল্লাহ কুংফু আর শা ভা মোমেনের সঙ্গে।"
বদি ভাই রহমানের বক্তব্য থেকে জানা গেলো, গতকাল হোটেল মৌতাতে তিনি রাত একটা পর্যন্ত ছিলেন। অল্পস্বল্প মদ্যপান করেছেন। আরো বেশি মদ খাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েই তিনি গিয়েছিলেন, কিন্তু ভিভা রহমান ফোন করে ঘ্যানঘ্যান করে তার নেশায় পানি ঢেলে দেয়। হ্যাঁ, হাফমজুর আর শা ভা মোমেনও ছিলো হোটেল মৌতাতে, কাছেই আরেকটা টেবিলে। কিন্তু তাদের সাথে তার কোনো কথা হয়নি। ভিভা রহমান ফোন করেছিলো ফালতু প্যাচাল পাড়তেই। তাকে কেন দৈনিক কচুবনের প্রোগ্রামে গান গাইতে ডাকা হয় না, সেই অভিযোগ। কেন তাকে নিয়ে দৈনিক কচুবনে নিউজ হয় না, সেই অনুযোগ। বিগড়ে যাও বিগড়ে দাও কর্মসূচির ব্র্যান্ড অ্যামবাসেডর হতে চেয়ে অনেক দিন ধরেই ঘ্যানঘ্যান করে আসছিলো ভিভা রহমান। হ্যাঁ, গানের আসরেও সে আমন্ত্রণ জানিয়েছে অনেকবার। বলেছে, হাফু যখন বাসায় থাকে না, তখন চলে আসবেন বদি ভাই। গান শোনাবো। কিন্তু বদি ভাই রহমান ব্যস্ত মানুষ। ভিভা রহমানের গান শোনার চেয়ে পুনম পান্ডের সাথে ফেসবুকে গল্পগুজব করাই শ্রেয়।
ঝাকানাকা বললেন, "আপনি তো সাংবাদিকতার জগতে গভীর জলের অক্টোপাস। আপনার কী মনে হয়, হাফমজুর আর ভিভাকে কে খুন করতে পারে?"
বদি ভাই রহমান হাই তুলে বললেন, "আমি করি নাই, এইটুকু জানি। আমি ছাড়া বাংলাদেশে আরো কোটি কোটি লোক আছে। তাদের মধ্যে কে বা কাহারা করে গেছে, সেটা আপনারা খুঁজে বের করুন।"
ঝাকানাকা বললেন, "হাফমজুর আর ভিভার মৃত্যুতে কে বা কারা লাভবান হতে পারে জনাব বদি ভাই?"
বদি ভাই বললেন, "তা তো জানি না গোয়েন্দা সাহেব। তবে আমি লাভবান হয়েছি, এটা বলতে পারি। আমাকে আর ভিভা রহমানের ফোনের অত্যাচার সহ্য করতে হবে না। নিরিবিলি একটু মদিরা সেবন করতে পারবো। তারপর ধরেন গিয়ে শা ভা মোমেনও লাভবান হয়েছে, তাকে আর হাফমজুরকে মদের আড্ডায় সঙ্গ দিতে হবে না, সেও নিরিবিলি কদবেলকোলা খেতে পারবে। তারপর ধরেন গিয়ে সোবহানাল্লাহ কুংফু, তারও লাভ হয়েছে, সে দীর্ঘদিন হাফমজুরের সাথে সাংবাদিক সমিতির হালুয়ারুটি ভাগাভাগি নিয়ে কোন্দল করছিলো। শরিয়তুন্নেসা টাইফুনেরও লাভ হয়েছে, উনি বছরের পর বছর ধরে রবীন্দ্র সঙ্গীত বাঁচাও আন্দোলন করে আসছিলেন।"
ঝাকানাকা দেয়ালের ছবিটা দেখিয়ে বললেন, "এই ছবিটা দেখুন তো একবার।"
বদি ভাই ছবিটা দেখে চমকে উঠে অস্ফূটে বললেন, "এ কী? এ আবার কেমন ছবি?"
ঝাকানাকা বিড়বিড় করে বললেন, "আমিও সেটাই ভাবছিলাম।"
বদি ভাই রহমান বললেন, "আমাকে আপনারা ছেড়ে দিন। আমি এইসব খুনজখমের কিছুই জানি না। আমার মোবাইলটা পর্যন্ত সঙ্গে আনতে দেয়নি আপনার বিটকেল পুলিশ। আজকে পুনম টুইটারে কী টুইট করলো, ফেসবুকে কী স্ট্যাটাস দিলো, কোথায় জামাকাপড় খুললো, কিছুই জানা হলো না! এই সোবহানাল্লাহ কুংফু বদমাশটাকে কত অনুরোধ করলাম, বললাম ভাই আপনার মোবাইলটা আমাকে দশ মিনিটের জন্য ধার দেন, সে দিলোই না! নরাধম আর কাকে বলে!"
কিংকু চৌধারি বললেন, "না আজকে জামাকাপড় খোলেনি সে। আমি চেক করেছিলাম একটু আগে। আপনি কিছুই মিস করেননি।"
বদি ভাই রহমান স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, "ওহ, ঠিকাছে তাহলে!"
ঝাকানাকা কড়া গলায় বললেন, "আপনি নিচে গিয়ে বসুন। তবে বাড়ি ছেড়ে বেরোবেন না। কিংকু সাহেব, একে চোখে চোখে রাখার ব্যবস্থা করুন।"
কিংকু চৌধারি সোৎসাহে বললেন, "স‌্যার, এনার পেছনে বেতপেটা করবো নাকি কয়েক ঘা?"
বদি ভাই গর্জে উঠে বললেন, "খবরদার! প্রেসের স্বাধীনতায় টোকা পর্যন্ত দেবেন না!"
ঝাকানাকা বললেন, "কিংকু সাহেব, আপনি ওনার প্রেসের স্বাধীনতাকে নিচে নিয়ে বসান, আর সোবহানাল্লাহ কুংফুকে নিয়ে আসুন।"
সোবহানাল্লাহ কুংফু যখন ঘরে এলেন, ঝাকানাকা তখন মেঝেতে বসে কয়েকটা ভাঙা চকচকে প্লাস্টিকের টুকরো বিছিয়ে আতশ কাঁচ দিয়ে কী যেন দেখছিলেন। সোবহানাল্লাহ কুংফুর পরনে কুংফুর পায়জামা, হাতে একটা লাঠি। তিনি ঘরে ঢুকেই গর্জে উঠলেন, "এই খুন শা ভা মোমেনের কাজ! তাকে এক্ষণই ফাঁসি দিতে হবে। আমি সাংবাদিক মহাসমাজের হেড অফিসে ফোন করে দিয়েছি, তারা পাটের দড়ি নিয়ে রওনা হয়েছে। দেরি করলে চলবে না ঝাকানাকা সাহেব! ঐ শা ভা মোমেন একটা সমাজবিরোধী নরপশু!"
টয়লেট থেকে শা ভা মোমেনের পাল্টা হুঙ্কার ভেসে এলো, "সাবধান কুংফু! চুকলি কেটো না! হাফমজুরের সঙ্গে তোমার গণ্ডগোল আসলে কী নিয়ে, সব ফাঁস করে দেবো কিন্তু!"
সোবহানাল্লাহ কুংফু টয়লেটের দরজার সামনে ছুটে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, "মানী লোকের মান নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া কোরো না শা ভা! আর একটা কথা বলেছো কি লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তোমার চাঁদি ফাটাবো! আর হাগতে বসে এতো কথা কীসের, হ্যাঁ?"
শা ভা মোমেনের মুহাহাহা হাসি ভেসে এলো টয়লেট থেকে। "হাফমজুর ভাইয়ের টয়লেট মোগল বাদশার সিংহাসনের মতো রে কুংফু! কী নকশা, কী বাহার! এখানে বসলে শুধু গজল গাইতে ইচ্ছা করে!"
সোবহানাল্লাহ কুংফু টয়লেটের আলোর সুইচ বাইরে থেকে নিবিয়ে দিলেন। ভেতর থেকে শা ভা মোমেন গর্জে উঠলেন, "তবে রে কুংফু! ঝাড়বাতিটা নিভিয়ে দিলি কেন রে ছোটোলোক? জলদি জ্বালা, নইলে ভিভা ম্যাডামের সাথে তোর ইটিশপিটিশ দোস্তির কথা বেবাক খুলে বলে দিচ্ছি কিন্তু!"
সোবহানাল্লাহ কুংফু টয়লেটের দরজায় কিল মেরে বললেন, "এখন আমার কথা বলার পালা, তুই চুপ থাক বজ্জাত!"
ঝাকানাকা বললেন, "আপনারা কলতলা বন্ধ করুন এখন। জনাব কুংফু, আপনার হাতে লাঠি কেন?"
সোবহানাল্লাহ কুংফু বুক ফুলিয়ে বললেন, "সাংবাদিকের অধিকার আদায়ের জন্য, মাই ডিয়ার গোয়েন্দা স্যার!"
কিংকু চৌধারি বললেন, "আমার তো ধারণা ছিলো সাংবাদিকের হাতে কলম থাকে!"
কুংফু ঠা ঠা করে হেসে বললেন, "ঐসব ইকোনো ডিয়েক্সের যুগ বহুদিন আগেই ফৌত হয়েছে দারোগা সাহেব! যেসব ছোটো বাচ্চা এসএসসি পাশ করে সাংবাদিকতা মাত্র শুরু করেছে, তারা কলম নিয়ে ঘোরে। আমি সাংবাদিক মহাসমাজের সভাপতি, আমাকে লাঠি নিয়েই চলতে হয়। বুড়ো বয়সে কুংফু শিখে ব্ল্যাক বেল্ট পেয়েছি, এই যে দেখুন।"
ঝাকানাকা বললেন, "আপনাকে সাংবাদিকের অধিকার আদায়ের জন্য লাঠি ধরতে হচ্ছে কাদের বিরুদ্ধে?"
সোবহানাল্লাহ কুংফুর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। তিনি মেঝেতে লাঠি ঠুকে বললেন, "যে অপশক্তি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর সাংবাদিকের ওপর হামলা চালাচ্ছে! যে অপশক্তি পদে পদে সাংবাদিকের মুখ বন্ধ করে দিতে চাইছে! যে অপশক্তি প্রশাসন আর সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে অশুভ আঁতাত করে দেশের জনগণের কাছে সত্য প্রকাশ করতে বাধা দিচ্ছে! যে অপশক্তি মরহুম হাফমজুর আর তার গুণবতী স্ত্রী ভিভা রহমানের ডেডবডির সাথে ফেসবুক প্রোফাইল পিকচার খিঁচতে বারণ করছে! যে অপশক্তি ...!"
টয়লেট থেকে শা ভা মোমেনের কণ্ঠ ভেসে এলো, "গাধাটা আমার বিরুদ্ধে লাঠি ধরেছে!"
সোবহানাল্লাহ কুংফু লাঠিটা দুই পাক ঘুরিয়ে বললেন, "শা ভা মোমেন দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার শত্রু, সাংবাদিকের স্বাধীনতার দুশমন! ওকে ফাঁসি দিন গোয়েন্দা সাহেব! নিচে রাস্তায় দেখলাম কলাওয়ালা বসে বসে কলা বিক্রি করছে। আমি নিজের হাতে পাটের রশি কলা দিয়ে মেজে পিছলা করে দেবো, আপনারা শুধু ওকে লটকে দিন!"
কিংকু চৌধারি বললেন, "আপনার লাঠিটার লাইসেন্স আছে তো?"
সোবহানাল্লাহ কুংফু সগর্বে বললেন, "নেই আবার?" কুংফু পায়জামার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একটা ল্যামিনেট করা কাগজ বার করে আনলেন তিনি।
কিংকু চৌধারি লাইসেন্স এক নজর দেখে বললেন, "এটা তো গত পাঁচ বছরে রিনিউ করা হয়নি দেখছি! আপনাকে লাঠি আইনে আটক করে চালান দিতে পারি, জানেন?"
সোবহানাল্লাহ কুংফু গর্জে উঠলেন, "প্রেসের স্বাধীনতায় হাত লাগাবেন না দারোগা সাহেব! আপনারা কী করেন না করেন, সবই কিন্তু খোঁজ রাখি আমরা! চটপটিওয়ালা বাবুলের সাক্ষাৎকার নিয়েছি আমরা। বেশি বাড়াবাড়ি করলে আজকে সন্ধ্যার নিউজেই চালিয়ে দেবো, হ্যাঁ!"
শা ভা মোমেন টয়লেট থেকে বললেন, "আমার কাছে সোবহানাল্লাহ কুংফুর অবৈধ লাঠিবাজির ফুটেজ আছে কিংকু সাহেব। চটপটি নিয়ে নিউজ করলে আমি সিটিয়েন বাংলার রাতের খবরে কুংফুর ওপর নিউজ করতে পারি।"
কিংকু চৌধারি ছুটে গিয়ে টয়লেটের বাতির সুইচ অন করে দিলেন।
সোবহানাল্লাহ কুংফু গজগজ করে উঠলেন, "বলেছিলাম না, প্রশাসনের সঙ্গে অশুভ আঁতাত? দেখুন গোয়েন্দা সাহেব, আপনার চোখের সামনেই দেখুন শা ভা মোমেনের কীর্তি! এভাবেই এরা সাংবাদিকতাকে বিপন্ন করে চলছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর!"
ঝাকানাকা বললেন, "এবার বলুন, আপনি এই খুন সম্পর্কে কী জানেন? একেবারে গত রাত থেকে শুরু করুন।"
সোবহানাল্লাহ কুংফু জানালেন, গত রাতে তিনি গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে টক শোতে ব্যস্ত ছিলেন। আসিফ নিজামরুলের সাথে লাখ কথার এক কথায় তর্ক বিতর্ক চুলাচুলি করে তার পর আবার শুনতে হবেতে নুরুল কাপুরের সাথে মত বিনিময় ও কিলাকিলি করেছেন। টক শো শেষে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছেন। ইদানীং টক শোতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়, সেজন্যে জিমে নিয়মিত অনুশীলন করতে হয়, কুংফুর আখড়ায় যেতে হয় সকাল সকাল। সিটিয়েন বাংলা ছাড়া সব চ্যানেলেই তিনি টক শো করে থাকেন। হতভাগা হাফমজুর আর তার ল্যাংবোট শা ভা মোমেনের কারণে সিটিয়েন বাংলায় তিনি অবাঞ্ছিত। সকালে তার মোবাইলে এক সাংবাদিক ফোন করে হাফমজুর আর ভিভার মৃত্যুসংবাদ জানালে তিনি তড়িঘড়ি করে জামা না পাল্টেই কোনোমতে লাঠি আর মোবাইল সঙ্গে নিয়ে ছুটে আসেন। এসে দেখেন, শা ভা মোমেন অন্যান্য সাংবাদিকদের সাথে ফ্যাসিবাদী আচরণে লিপ্ত। শা ভা মোমেনের ইঙ্গিতে এক চ্যাংড়া সাংবাদিক তার ওপর লাঠি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে তিনি পাল্টা লাঠি ধরেন। এরপর পুলিশ চলে আসে। তারপর ১৪৪ ধারা জারি করার পর সকলে চলে যায়, কিন্তু ফ্যাসিবাদী শক্তির পেটোয়া বাহিনীর পাণ্ডা এই কিংকু চৌধারি তাকে আরো কয়েকজনের সঙ্গে টয়লেটে আটক করে। সেখানেও শা ভা মোমেন তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আক্রমণ চালায়।
ঝাকানাকা বললেন, "আপনি যখন এলেন, তখন কি ঘরে কোনো গানবাজনা হচ্ছিলো?"
সোবহানাল্লাহ কুংফু অশ্রুগদগদ রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, "গানবাজনা হবে কীভাবে, গানের পাখিই যখন আর নেই আমাদের মাঝে?"
শা ভা মোমেনের অট্টহাসি ভেসে এলো টয়লেট থেকে, "গোয়েন্দা সাহেব, ওকে জিজ্ঞাসা করুন, ভিভা ম্যাডামের গানের আসরে সে কী করতো!"
কুংফু টয়লেটের দরজার সামনে তেড়ে গিয়ে বললেন, "খবরদার শা ভা, উল্টাপাল্টা কলঙ্ক লেপিস না! ভিভা ম্যাডামের গানের কদর তুই কী করবি রে, অসভ্য কোথাকার? তুই গানের বুঝিস কী?"
ঝাকানাকা বললেন, "আপনি কি নিহত ভিভা রহমানের গানের আসরে কখনো অংশগ্রহণ করেছেন জনাব কুংফু?"
সোবহানাল্লাহ কুংফু জামার হাতায় অশ্রু মুছে বললেন, "হ্যাঁ! মাঝেমাঝে আমি তার গানের রেওয়াজে এসে হাজির হতাম বৈকি! অহো, অপূর্ব তার গানের গলা! মধুর সেই সুরলহরী! কিন্নরী তার কাছে তুচ্ছ!"
শা ভা মোমেন টয়লেটের ভেতর থেকে কৃতজ্ঞ কণ্ঠে বললেন, "থ্যাঙ্কিউ কুংফু, থ্যাঙ্কিউ! হচ্ছিলো না অনেকক্ষণ ধরে। আহ!"
ঝাকানাকা বললেন, "এই গানের রেওয়াজে আপনি ছাড়া আর কেউ আসতো?"
সোবহানাল্লাহ কুংফু থমথমে মুখে বললেন, "আসতে পারে। তবে আমি যখন আসতাম, তখন অন্য কেউ থাকতো না।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "আপনিও গান করেন নাকি?"
সোবহানাল্লাহ কুংফু বললেন, "নাহ। আমি সমঝদার। সঙ্গীতরসিক। শুধু শুনি।"
শা ভা মোমেন টয়লেটের ভেতর থেকে বললেন, "হাফমজুর ভাইয়ের সঙ্গে তোমার কী নিয়ে ঝগড়া ছিলো, সেটা বলো না কেন? ... ফ্লাশ করে কোনটা দিয়ে, য়্যাঁ? এখানে দেখি শয়ে শয়ে বোতাম। স্পেস শাটলের কনট্রোল প্যানেলেও তো এতো বোতাম থাকে না রে!"
সোবহানাল্লাহ কুংফু বললেন, "একটা গোল লাল বোতাম আছে বাম দিকে, ঐটাতে চাপ দাও, ইডিয়েট! কিচ্ছু জানে না, জংলি কোথাকার!"
ঝাকানাকা বললেন, "তা এই গানের আসর কোথায় বসতো?"
সোবহানাল্লাহ কুংফু অশ্রুগদগদ রুদ্ধস্বরে বললেন, "এই ঘরেই। এখানেই কখনো মেঝেতে কখনো খাটের ওপর বাঘছাল পেতে তানপুরা হাতে নিয়ে রেওয়াজ করতেন আমাদের গানের পাখি! কতোদিন তন্ময় হয়ে শুয়ে শুয়ে শুনেছি সেই গান! আর আজ ...!" লাঠি বগলে চেপে দুই হাতে মুখ ঢাকলেন তিনি।
ঝাকানাকা আড়চোখে কুংফুকে এক নজর দেখে নিয়ে বললেন, "হুমমমম! আচ্ছা এই যে দেয়ালের এই ছবিটা একটু মন দিয়ে দেখুন তো?"
সোবহানাল্লাহ কুংফুর হাত থেকে লাঠি পড়ে গেলো। তিনি ফিসফিস করে বললেন, "এ কী! এ ছবি তো ... এ ছবি তো এমন ছিলো না আগে!"
ঝাকানাকা বিড়বিড় করে বললেন, "আমিও তা-ই ভাবছিলাম।"
সোবহানাল্লাহ কুংফু লাঠি মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিয়ে বললেন, "আমাকে ছেড়ে দিন আপনারা। আমি নির্দোষ। আমি এসব খুনজখমের কিছুই জানি না, শুধু জানি শা ভা মোমেন এই কাজে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। তাকে ফাঁসি দিন গোয়েন্দা সাহেব। আমি পাটের দড়ি আর কলা রেডি করছি, আপনারা শুধু লটকে দিন নচ্ছাড়টাকে।"
টয়লেট থেকে ফ্লাশের প্রলয়ঙ্কর শব্দ ভেসে এলো।
ঝাকানাকা বললেন, "আপনি আপনার বেআইনি লাঠিটা কিংকু সাহেবের জিম্মায় দিয়ে নিচে গিয়ে বসুন। চা খান, বিশ্রাম নিন। কলা-দড়ি আপাতত থাকুক। কিংকু সাহেব, আপনি শরিয়তুন্নেসা টাইফুনকে নিয়ে আসুন।"
কিংকু চৌধারি কুংফুর ব্ল্যাকবেল্ট পাকড়ে ধরে টেনে হিঁচড়ে তাকে বাইরে নিয়ে গেলেন।
শরিয়তুন্নেসা টাইফুন যখন হাজির হলেন, ঝাকানাকা মন দিয়ে হাফমজুরের মৃতদেহ পরীক্ষা করছেন।
শরিয়তুন্নেসা টাইফুন গর্জে উঠলেন, "অহহো, কী দুঃসহ স্পর্ধা! আপনার পুলিশ আমাকে বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে বার করে এই অসভ্য ফ্যামিলির টয়লেটে কতগুলো গুণ্ডাবদমাশের সঙ্গে আটকে রেখেছে! বদি ভাইয়ের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, কালই রবীন্দ্র সরোবরে আপনাদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করছি দাঁড়ান!"
ঝাকানাকা বললেন, "কিংকু সাহেব, টাইফুন ম্যাডামকে কেন আটক করা হয়েছে?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "স্যার, উনি ফেসবুকে হাফমজুর আর ভিভার বিরুদ্ধে একটা হেইট ক্যাম্পেন চালিয়ে আসছেন অনেক বছর ধরে। "এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে" নামে একটা পেইজ খুলে। খুব পপুলার পেজ স্যার, লক্ষ লক্ষ সাবস্ক্রাইবার। সবাই সেখানে প্ল্যানপ্রোগ্রাম করে, কীভাবে হাফমজুর আর ভিভাকে কোতল করা যায়। গত রাতেই স্যার উনি একটা পোস্ট দিয়েছেন, "আর বিলম্ব না না আর বিলম্ব নয়" শিরোনামে।"
শরিয়তুন্নেসা টাইফুন সগর্বে বললেন, "সুযোগ পেলে আমি গীতবিতান দিয়ে পিটিয়ে এই অসভ্য দুটোকে পিটিয়ে ভর্তা বানাতাম। কিন্তু আমার আগেই কে বা কাহারা স্কোর করে গেছে, আমি আর চান্সই পেলাম না!"
ঝাকানাকা বললেন, "বটে? আপনি থাকেন কোথায়?"
টাইফুন হাত মুঠো পাকিয়ে হুঙ্কার দিয়ে বললেন, "এই তো, পাশের বাসায়! এই বেডরুমের লাগোয়া ঘরটাই তো আমার বেডরুম! এদের জ্বালায় আমি গত দশটা বছর ঠিকমতো রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চা করতে পারি না! আমাকে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে ধারাগোল সঙ্গীত আশ্রমে গিয়ে তারপর গান গাইতে হয়, জানেন?"
ঝাকানাকা বললেন, "ইন্টারেস্টিং! আপনি একটু বলুন তো, গতকাল রাত থেকে, ঠিক কী জানেন আপনি এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে?"
শরিয়তুন্নেসা টাইফুন জানালেন, টিভিতে টক শো দেখার বদভ্যাস তার নেই। ওখানে লোকজন এসে ঝগড়া করে কেবল। তিনি জলদি ঘুমিয়ে পড়েন, ভোরবেলা উঠে ভিভা রহমান ওঠার আগেই ঘন্টাখানেক রেওয়াজ করে নেন। আজ ভোরে তিনি দুঃস্বপ্ন দেখছিলেন। স্বপ্নে দেখেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটা সবুজ লুঙ্গি পরে শান্তি নিকেতনের মাঠে ছুটতে ছুটতে বলছেন, "আমি আর সহ্য করতে পারতেছি না! আমি আর সহ্য করতে পারতেছি না!" তারপর তার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি এক গ্লাস চিরতার রস খেয়ে আবার উল্টো কাতে শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করেন। তখন ধুপ ধাপ ধস্তাধস্তির আওয়াজ শুনতে পান তিনি। কিন্তু পাত্তা না দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়েন। সকালে লোকজনের শোরগোলে তার ঘুম ভেঙে যায়। তখন তিনি বিরক্ত হয়ে জানালা খুলে জানতে চান, ঘটনা কী। এক সাংবাদিক তাকে জানায়, হাফমজুর আর ভিভা খুন হয়েছে। তারপর তিনি তার ফেসবুক পেইজে টিএসসির সামনে আনন্দযাত্রার আহ্বান জানিয়ে পোস্ট দেন। তিরিশ হাজার তিনশো এগারোজন সেটাতে লাইক দিয়েছে। কিছু ভালোমন্দ বাজার করে রান্না করবেন ভেবে যখন বেরোতে যাবেন, তখন এই বর্বর পুলিশ কিংকু তাকে আটক করে এনে টয়লেটে আটকে রাখে। বদি ভাই রহমানও সেখানে ছিলেন। বদি ভাই রহমান একটু পর পর তার মোবাইল ধার চাইছিলেন। কিন্তু তিনি দেননি। আরো দুটো লোক টয়লেটে মারপিট করছিলো একটু পর পর। এমন খুশির দিনে তাকে কেন এই শাস্তি পেতে হচ্ছে, তিনি জানেন না। কিন্তু এর বিচার চান তিনি।
ঝাকানাকা চিন্তিত মুখে বললেন, "আপনি কি সকালে কোনো গানের শব্দ পেয়েছিলেন?"
টাইফুন বললেন, "ঘুম ভাঙার পর কোনো গানের শব্দ পাইনি।"
ঝাকানাকা বললেন, "আপনি বলছিলেন, এদের জ্বালায় আপনি রেওয়াজ করতে পারেন না ... কিন্তু কেন?"
শরিয়তুন্নেসা টাইফুন চোখ পাকিয়ে বললেন, "এরা নিজেরাই তো সারাক্ষণ বেসুরো গলায় গানের রেওয়াজ করতে থাকে! স্বামী স্ত্রী দুইজনেই! আপনি সিটিয়েন বাংলায় এদের গান শোনেননি কখনো?"
ঝাকানাকা তৃপ্ত গলায় বললেন, "নাহ, ঐ চ্যানেলটা ব্লক করে রেখেছি। দুজনই গান গাইতো?"
শরিয়তুন্নেসা টাইফুন বললেন, "হ্যাঁ! শুধু তা-ই নয়, ঐ রাক্ষুসীটা মাঝে মাঝে গানের আসর বসাতো! তখন আরো লোকজন এসে গান গাইতো!"
ঝাকানাকা গলা খাঁকরে বললেন, "একাধিক লোক?"
টাইফুন বললেন, "তা বলতে পারবো না। তবে গানগুলি ছিলো যুগলবন্দী! কী সব বিটকেলে জঘন্য গান, সুর নেই তাল নেই লয় নেই ... অহহো, কী দুঃসহ স্পর্ধা!"
কিংকু চৌধারি বললেন, "কী ধরনের গান?"
শরিয়তুন্নেসা টাইফুন ভুরু কুঁচকে বললেন, "জানি না। ইংরেজিতে ভক্তিমূলক গান, মনে হয়।"
ঝাকানাকা বললেন, "ইংরেজিতে ভক্তিমূলক গান?"
টাইফুন বললেন, "হ্যাঁ। ও গড আই অ্যাম কামিং, বা এইরকম একটা লাইন মনে আছে শুধু, প্রায়ই শুনতাম। কিন্তু কোনো সুরের বালাই ছিলো না। চিৎকার করে পাড়া মাথায় তুলে রেওয়াজ করতো, সে গান শুনলে কাক হার্টফেল করবে!"
কিংকু চৌধারি বললেন, "কিন্তু ... কিন্তু এটা তো ...!"
ঝাকানাকা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, "ঠিকাছে জনাব কিংকু, ঠিকাছে! আপনি টাইফুন ম্যাডামকে ওনার বাসায় পৌঁছে দিন।"
শরিয়তুন্নেসা টাইফুন মুষ্টিবদ্ধ হাত ঝাঁকিয়ে বললেন, "ইয়েসসসসসসস!" তারপর নাচতে নাচতে কিংকু চৌধারির সাথে বেরিয়ে গেলেন।
শা ভা মোমেন টয়লেট ছেড়ে বেরিয়ে এলেন, চোখেমুখে পরিতৃপ্ত ভাব। "হাফমজুর ভাইয়ের টয়লেট এমন আলিশান, আগে জানতাম না! একবার ঢুকলে আর বের হতে ইচ্ছা করে না। শাদ্দাদের বেহেস্ত একেবারে, আহা!"
ঝাকানাকা বললেন, "আপনারা বরং বাড়ি চলে যান। কেস ক্লোজড।"
শা ভা মোমেন বিস্মিত হয়ে বললেন, "য়্যাঁ? ধরে ফেলেছেন কে খুন করেছে?"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমম! তবে সেসবের বিস্তারিত কিংকু সাহেবের কাছ থেকে যোগাড় করে নেবেন।"
২.
কিংকু চৌধারি গাড়িতে বসে বিস্মিত মুখে বললেন, "সে কি স্যার, এদের মধ্যে কেউ তাহলে খুন করেনি?"
ঝাকানাকা আসনে হেলান দিয়ে বললেন, "না।"
কিংকু বললেন, "তাহলে কে?"
ঝাকানাকা চুরুটে কষে টান দিয়ে বললেন, "ঘটনার মূলে আছে ঐ মিউজিক সিস্টেম।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "মিউজিক সিস্টেম? কীভাবে!"
ঝাকানাকা বললেন, "গতকাল অনেক রাতে একেবারে পাঁড় মাতাল হয়ে মদের আড্ডা থেকে বাড়ি ফেরে হাফমজুর। তারপর ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু সে বা ভিভা, কারোই খেয়াল ছিলো না, সিডি প্লেয়ারে ভোর ছ'টার সময় অ্যালার্ম দেয়া ছিলো! ঠিক ছ'টা বাজতেই গান বেজে ওঠে তাতে।"
কিংকু বলেন, "তারপর?"
ঝাকানাকা বলেন, "হাফমজুর ভিভা রহমানের গান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরক্ত ছিলো। সে যদিও অনেক চেষ্টাচরিত্র করেছে, ভিভাকে নিজের টিভি চ্যানেলে গানের সুযোগ করে দিয়েছে, তার মিউজিক অ্যালবামের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে, বাড়িতে গানের রেওয়াজের ব্যবস্থা করে দিয়েছে, কিন্তু লাভ হয়নি তেমন। কাকের পিছনে পয়সা খরচ করলেই সে কোকিল হয় না। তাই কিছুদিন ধরে সে ভিভা রহমানকে এইসব গানবাজনা, গানের আসর বন্ধ করার হুমকি দিয়ে আসছিলো। ভিভা পাত্তা না দেয়ায় সে হুমকি দেয়, "তুমি এসব বন্ধ না করলে কিন্তু আমিও শুরু করে দেবো!" এ নিয়ে দুইজনের মধ্যে একটা কোল্ড ওয়ার চলছিলো, বুঝলেন?"
কিংকু অস্ফূটে বললেন, "ওহ, সে কারণেই হাফমজুর ইদানীং নিজের টিভিতে নিজেই গান গাইতো?"
ঝাকানাকা বললেন, "হ্যাঁ, ঠিক তাই! কিন্তু ভিভা রহমান পাত্তা দেয়নি। সে নিজের গান শোনে সারাদিন, হাফমজুরের গান শুনলে তার সমস্যা হবে কেন?"
কিংকু চৌধারি বিড়বিড় করতে লাগলেন।
ঝাকানাকা বললেন, "তাছাড়া ভিভা রহমান তার বিভিন্ন গুণগ্রাহীদের সাথে মাঝেমধ্যে ... গানের চর্চা করতেন। এ নিয়েও দুইজনের মধ্যে মনান্তর হয়েছিলো বোধহয়।"
কিংকু চৌধারি উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, "আমিও তো সেটাই বলছি স্যার! ঐ যে ইংরেজি ভক্তিমূলক গান ...!"
ঝাকানাকা বললেন, "ঠিকাছে জনাব কিংকু, ঠিকাছে! হ্যাঁ, ঐ গানটা একটু ... ভক্তিমূলকই বটে। কিন্তু আজকের ঘটনা বলছি, শুনুন। মদের নেশায় কাবু হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলো হাফমজুর, অ্যালার্মের কল্যাণে তার ঘুম ভেঙে যায় ভিভা রহমানের রবীন্দ্র সঙ্গীতের এক অ্যালবামের চতুর্থ ট্র্যাক শুনে! ওঠো ওঠো রে বিফল প্রভাত বয়ে যায় যে। মেলো আঁখি জাগো জাগো থেকো না রে অচেতন! ... এই গানটি হাফমজুরের মনের মধ্যে এক বিচিত্র অনুভূতি তৈরি করে, বুঝতে পারছেন?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "জ্বি স্যার! গানটা খুবই সন্দেহজনক। এভাবে উঠতে বলা, অচেতন হয়ে থাকার খোঁটা দেয়া, কাঁচা ঘুম ভেঙে এসব সহ্য করা খুবই কঠিন স্যার!"
ঝাকানাকা বললেন, "ঠিক! ভোরবেলা এই গান শুনে আরামের ঘুম নষ্ট হলে মাথায় রক্ত চড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। হাফমজুরের মদের ঘোরও ঠিকমতো কাটেনি, সে তখন মেজাজ সামলাতে না পেরে চিৎকার করে ওঠে ...।"
কিংকু চৌধারি বলেন, "আমি আর সহ্য করতে পারতেছি না!"
ঝাকানাকা বললেন, "ব্রাভো! এই চিৎকারের শব্দ হানুফা, হাফিজ আর টাইফুন ম্যাডাম, তিনজনই শুনতে পান। কিন্তু যে যার মতো করে স্বপ্নে নিজেদের পছন্দসই ক্যারেক্টারের মুখে সেটা শুনতে পান। জানেন তো, ভোরবেলার স্বপ্নে আশেপাশের শব্দগুলোও এসে ঢুকে পড়ে?"
কিংকু চৌধারি বলেন, "জানি স্যার! এ জন্যেই তো আমি রোজ সকালে রেডিও ঝাঞ্জাইলের গুনগুনগুন উইথ মুনমুনমুন প্রোগ্রামের আরজে মুনমুনমুনকে স্বপ্নে দেখি!"
ঝাকানাকা গলা খাঁকরে বললেন, "যাই হোক। হাফমজুর তখন ঘুমন্ত ভিভার গলা টিপে ধরে। ভিভার ঘুম ভেঙে যায়। দুইজনে ধস্তাধস্তি করতে থাকে। সে ধস্তাধস্তির শব্দই শুনতে পায় হানুফা, হাফিজ আর টাইফুন।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "দুইজনই তো পালোয়ান স্যার! কেহ কারে নাহি জিনে সমানে সমান!"
ঝাকানাকা বললেন, "হুঁ। সম্ভবত ভিভা রহমানই হাফমজুরকে পাল্টা কাবু করে ফেলে। তখন আত্মরক্ষার জন্য হাফমজুর তানপুরা নিয়ে ভিভাকে আক্রমণ করে।"
কিংকু চৌধারি বলেন, "তানপুরা?"
ঝাকানাকা বললেন, "হ্যাঁ। তবে তানপুরা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে একেবারে। আমি কাঠের টুকরো আর তার পরীক্ষা করে দেখলাম। ওটাই অস্ত্র।"
কিংকু চৌধারি বলেন, "তারপর?"
ঝাকানাকা বলেন, "তারপর হাফমজুর ভিভা রহমানকে পিটিয়ে রক্তারক্তি খুন করে তার গানের সব সিডি টুকরো টুকরো করে ভেঙে সারা ঘরে ছড়িয়ে রাখে।"
কিংকু বলেন, "ওহ! ঐ যে প্লাস্টিকের টুকরোগুলো, ওগুলো সিডির টুকরো নাকি? আমি তো ভাবলাম সাংবাদিকরা এসে ওগুলো ভেঙে দিয়েছে!"
ঝাকানাকা বললেন, "না, সবই হাফমজুরের কাজ। সব ভাংচুর শেষে হাফমজুরের হার্ট অ্যাটাক হয়। সে একটা পাঁড় মদখোর, সারা গায়ে চর্বি, হার্টের অবস্থাও সঙিন ছিলো। এতো উত্তেজনা খাটাখাটনি করে সে অভ্যস্ত নয়, তাই সে ঢলে পড়ে ভিভার পাশেই।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "ওহ! তাহলে তো কেস ক্লোজড স্যার!"
ঝাকানাকা চিন্তিত মুখে বললেন, "অলমোস্ট ক্লোজড জনাব কিংকু, অলমোস্ট ক্লোজড!"
কিংকু বললেন, "কেন স্যার?"
ঝাকানাকা বললেন, "একবার চিন্তা করে দেখেছেন, এই গল্পের ক্যাটেগোরিতে "হড়ড়" লেখা কেন?"
কিংকু গল্পের শুরুতে ক্যাটেগোরি দেখে নিয়ে বললেন, "কেন স্যার?"
ঝাকানাকা বললেন, "দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের একটা পোর্ট্রেট ঝুলছিলো, দেখেছেন?"
কিংকু বললেন, "যে ছবিটাকে সবাই অদ্ভুত বলছিলো স্যার, সেটা?"
ঝাকানাকা বললেন, "হ্যাঁ। ঐ ছবিটার হিসাব মিলছে না।"
কিংকু বললেন, "কেন স্যার?"
ঝাকানাকা বললেন, "আমি রবীন্দ্রনাথের ওরকম দাঁত বের করা হাসিমুখের ছবি কখনো দেখিনি। আপনি দেখেছেন?"
কিংকু ফ্যাকাশে মুখে বললেন, "না স্যার। রবি ঠাকুরের যে দাঁত থাকতে পারে, এটাই ভাবিনি কখনো।"
ঝাকানাকা কিছু বললেন না, গুম হয়ে কী যেন ভাবতে লাগলেন।
[সমাপ্ত]



রহস্য পত্রিকা, নভেম্বর ২০১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।