Monday, June 18, 2012

গোয়েন্দা ঝাকানাকা ও আহত সুশীল সমাজ রহস্য


ঝাকানাকা বিরসবদনে বললেন, "কার্টুন ছবি চলার সময় আপনি কেন আসেন বলেন তো? আরেকটু পরে বা আরেকটু আগে আসেন না কেন?"
কিংকু চৌধারি গোমড়া মুখে বললেন, "স্যার আপনি সারাদিনই হয় ছায়াছন্দ নয় থাণ্ডার ক্যাটস আর না হলে খবর দেখতে থাকেন। যখনই আসি তখনই তো ধমক দেন। তাহলে ক্যাম্নেকী?"
ঝাকানাকা বললেন, "হুঁহ, বললেই হলো! যাকগে, আবার কী গণ্ডগোল বাঁধিয়েছেন আপনারা?"
কিংকু চৌধারি পকেট থেকে নোটবুক খুলে আড়চোখে ঝাকানাকার দিকে তাকিয়ে বললেন, "স্যার আপনারা খানসামা সামা খানকে একটু মুড়িমাখা লাগাতে বলুন না। পেটটা কেমন যেন মনমরা হয়ে আছে ... ।"
ঝাকানাকা গলা চড়িয়ে বললেন, "সামা খান, মুড়ি লাগাও। বেশি চানাচুর দিও না। আচারের তেলও বুঝেশুনে খরচ কোরো। আর চা দিও।"
কিংকু চৌধারি বিমর্ষ মুখে নোটবুকের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললেন, "স্যার, চানাচুর বেশি না দিলে মুড়িমাখার চরিত্র কি ঠিক থাকে, বলেন? আচারের তেল কম দিলে আবার কীসের মুড়িমাখা?"
ঝাকানাকা বললেন, "হুঁহ! কার্টুন ছবি চলার সময় আমার বাড়ি এলে ঐরকমই পাবেন। এইবার বলুন কী সমস্যা।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "এই যে স্যার ... পেয়েছি। সমস্যা হচ্ছে গিয়ে, ঢাকেশ্বরী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আসিফ নিজামরুলকে নিয়ে। উনি স্যার, আহত।"
ঝাকানাকা গোঁফে তা দিয়ে বললেন, "আপনারা শেষমেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদেরও ঠ্যাঙানো শুরু করেছেন নাকি?"
কিংকু চৌধারি দুঃখিত কণ্ঠে বললেন, "না স্যার, এ আমাদের কাজ নয়। এটা কে বা কাহারা করে গেছে। ওনারা তো স্যার সুশীল সমাজের লোক। পথেঘাটে ওনাদের পাওয়া যায় না স্যার। আমরা ধরেন গিয়ে মাঝেমধ্যে মওকামতো পেলে সাংবাদিক পিটাই, কিংবা ধরেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা স্যার এখানে ওখানে ক্লাস নেন, ডানে বামে কনসালট্যান্সি করেন, টেলিভিশনে টক শো করেন, ওনাদের কি আর মওকা মতো পাওয়া যায়, বলেন?"
ঝাকানাকা বললেন, "সে কী? মওকামতো পেলে পিটাতেন নাকি?"
কিংকু চৌধারি লাজুক হেসে বললেন, "না, মানে, বললাম আর কি। আমাদের তো স্যার ওনাদের পেটানোর সুযোগ নাই, এটাই বুঝিয়ে বললাম আর কি। আর সুযোগ পেলে তো ধরেন গিয়ে, কে কখন কী করে ফেলে। পুলিশের মন স্যার, সহস্র বর্ষের স্যার, সাধনার ধন। অতি বিচিত্র তার স্বভাব, অতি বিচিত্র তার মতিগতি ...।"
ঝাকানাকা বললেন, "আসিফ নিজামরুল কী বললেন? কে পেঁদিয়েছে তাকে? আর কেমন আহত? অল্পস্বল্প নাকি গুরুতর?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "তেমন প্যাঁদায়নি স্যার। তবে উনি সুশীল সমাজের মানুষ তো, একটু কাবু হয়ে পড়েছেন। পুলসিরাত হাসপাতালে ভর্তি আছেন এখন।"
ঝাকানাকা বললেন, "তেমন না প্যাঁদালে কেউ হাসপাতালে ভর্তি হয় নাকি?"
কিংকু চৌধারি হতাশ মুখে মাথা নেড়ে বললেন, "কে যে কখন হাসপাতালে ভর্তি হয়, তার কোনো ঠিক নেই স্যার। তাছাড়া সুশীলেরা তো ধরুন গিয়ে, এয়ার কন্ডিশন্ড গাড়ি বা এয়ার কন্ডিশন্ড বাড়ি ছেড়ে তেমন একটা বেরটের হন না। ব্যায়ামট্যায়ামও করেন না ঠিকমতো। অল্পতেই চোট পান আর কি। আসিফ নিজামরুলের চোট মোটেও গুরুতর কিছু নয় স্যার। তবে বড় বিচিত্র।"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমম, বিচিত্র না হলে কি আর পুলিশ খবর পায়?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "জ্বি স্যার, ঘটনা সেখানেই! উনি কিন্তু পুলিশে খবর দেননি! এমনকি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও পুলিশ ডাকেনি! ওনার আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির খবরটা জেনেছি স্যার, গোপন সূত্রে!"
ঝাকানাকা বললেন, "কীরকম চোট পেয়েছেন তিনি?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "স্যার, ঐ কে বা কাহারা আসিফ নিজামরুলের দুই গালে ঠাশ ঠাশ করে দুইটা চটকানা মেরে গেছে স্যার!"
ঝাকানাকা একটি ভুরু অন্যটির চেয়ে ইঞ্চি দুয়েক ওপরে তুলে বললেন, "বলেন কী? দুই চটকানা খেয়েই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "এ চটকানা স্যার সাধারণ চটকানা নয়। চটকানার স্কেলে একেকটা চটকানার মাপই ধরুন গিয়ে এক হাজার সাধারণ চটকানার সমান। মানে দুই কিলোচটকানা দেয়া হয়েছে বলতে পারেন!"
ঝাকানাকা বললেন, "চটকানার স্কেলও আছে নাকি?"
কিংকু চৌধারি লাজুক হেসে বললেন, "আছে স্যার। আমাদের লাইনে, বুঝতেই পারছেন, ঘন ঘন চড়চাপড়চটকানা মারতে হয়। সবসময় তো নিজে মারার জো থাকে না, অন্যকে বলতে হয়। তখন স্যার চড়ের ওজনটাও সঙ্গে বলে দিতে হয়। ডেকাচটকানা হচ্ছে স্যার দশটা চড়ের সমান। হেক্টোচটকানা স্যার, একশোটা চড়ের সমান। কিলোচটকানা তেমনি হাজারটা। আবার ধরুন গিয়ে উল্টোদিকেও মাপ আছে স্যার। মাঝেমধ্যে রাঘববোয়ালদের গায়েও স্যার হাত তোলার ভান করতে হয়। গালে কষানোর ঠিক আগে আগে শুধু জোরটা কমিয়ে দিতে হয়। ওরকম চটকানা স্যার ডেসিচটকানা, সেন্টিচটকানা, এমনকি মিলিচটকানাও আছে। বাইরের লোকেরা স্যার এগুলো বোঝে না। আমি হয়তো একটা কনস্টেবলকে ডেকে বললাম, মার শালারে একটা হেক্টো। সে স্যার সেইভাবে ওজন মেপে মারে তখন। সবসময় যে একেবারে কাঁটায় কাঁটায় ঠিক হয়, তেমনটা দাবি করবো না স্যার। হয়তো হেক্টো বললে আটানব্বইটা চড়ের সমান একটা মারলো, কিংবা একশো দশটা। টলারেন্স ধরুন গিয়ে, প্লাস মাইনাস টেন পারসেন্ট?"
ঝাকানাকা বললেন, 'হুমমম। বুদ্ধি তো মন্দ নয়। আপনাদের ভিকটিমদের টলারেন্সের সীমার মধ্যে থাকে সেসব?"
কিংকু চৌধারি হাসিমুখে বললেন, "হেঁহেঁহেঁ, মাঝেমধ্যে কিছু এদিক ওদিক তো হয়ই স্যার। বুঝতেই পারছেন। পুলিশের চড় স্যার, সহস্র বর্ষের স্যার, সাধনার বর!"
ঝাকানাকা বললেন, "তা ঐরকম কিলোচটকানা কে বা কাহারা দিলো, এ ব্যাপারে আসিফ নিজামরুল কিছু বলেননি?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "স্যার, পুরোটা তো বলে শেষ করতে পারিনি। ঐ চটকানা ঠিক শক্তির গুণে কিলোচটকানা নয় স্যার, বরং ফলাফলের গুণে! কে বা কাহারা স্যার, এক বিচিত্র কালি হাতে মাখিয়ে তারপর স্যার আসিফ নিজামরুলের দুই গালে স্যার, একেবারে দিয়েছে পটাং পটাং করে দুইখান বসিয়ে। ওনার দুই গালে স্যার রীতিমতো ছাপ বসে গেছে। একেবারে পার্মানেন্ট। উনি সেই কারণেই স‌্যার পুলসিরাতের কসমেটিক সার্জারি বিভাগে ভর্তি আছেন।"
ঝাকানাকার ভুরু ভয়ানক কুঁচকে গেলো। তিনি আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পায়চারি করতে লাগলেন।
সামা খান এসে মুড়ির বাটি আর চায়ের কাপসহ ট্রে রেখে গেলো নীরবে। কিংকু চৌধারি গোগ্রাসে মুড়িমাখা খেতে লাগলেন।
ঝাকানাকা বললেন, "নিজামরুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি আপনি?"
কিংকু চৌধারি কোঁৎ করে ঢোঁক গিলে বললেন, "আমি স্বপরিচয়ে যাইনি স্যার। গিয়েছিলাম ছদ্মবেশে। উনি স্যার বেশি সময় দেননি আমাকে। দেখলাম ওনার দুই গালে ব্যাণ্ডেজ। খুব গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। আমাকে দেখে একেবারে তেড়ে এলেন।"
ঝাকানাকা বললেন, "কেন?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "আমি তো স্যার, ফ্যান সেজে গিয়েছিলাম। একটা ফুলের তোড়া নিয়ে। গিয়ে বললাম, স্যার আপনি নাকি ইনজুওর্ড? আমি আপনার টক শো-র খুব ভক্ত স্যার। আপনি না থাকলে দেশটার যে কী হোতো! ... এটুকু বলার পরই আসিফ নিজামরুল একেবারে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে তেড়ে এলেন স্যার!"
ঝাকানাকা বললেন, "ফুল নিয়ে গেলেন কী বুদ্ধিতে? একটা তরমুজ নিয়ে গেলেও তো পারতেন?"
কিংকু চৌধারি মন খারাপ করে বললেন, "আমি ভাবলাম, উনি সুশীল মানুষ ... দৈনিক কচুবনে কতো জ্ঞানের কথা লেখেন ... গাগাণ্ডু টিভির টকশোতে কত জ্ঞানের কথা বলেন ... জ্ঞানীরা কি স্যার ফুল ভালোবাসে না তরমুজ ভালোবাসে?"
ঝাকানাকা বললেন, "গরমের দিনে জ্ঞানীরা তরমুজই ভালোবাসে জনাব কিংকু। বলুন তারপর কী হোলো।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "উনি স্যার খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। আমাকে বার বার ধমক দিলেন, হাতে খামচিও দিয়েছেন। বললেন, ওনার চিকিৎসার খরচ কালাহারি খাতুনকে দিতে হবে। প্রয়োজনে উনি কালাহারি খাতুনের গলায় গামছা দিয়ে সে পয়সা আদায় করবেন। তারপর স্যার বালিশের নিচ থেকে একটা গামছা বের করে দেখালেন আমাকে।"
ঝাকানাকা বললেন, "পুলিশমন্ত্রীকে চিকিৎসার খরচ দিতে বললেন কেন?"
কিংকু বললেন, "আমিও সে কথাটাই জিজ্ঞাসা করেছিলাম স্যার। উনি বললেন, কালাহারি খাতুনকে তার আঘাতের দায় নিতে হবে। আমি মিষ্টি করে জানতে চাইলাম, আপনাকে কে মেরেছে স্যার? উনি তখন খুব ক্ষেপে গিয়ে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিলেন।"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমম। তারপর?"
কিংকু বললেন, "আমি তখন স্যার ডিউটিতে যে নার্স ছিলো, তার সাথে ভাব জমিয়ে জানতে চাইলাম, আসিফ নিজামরুলের কী হয়েছে। সে তখন আমাকে সব খুলে বললো।"
ঝাকানাকা একটু সন্দিগ্ধ চোখে কিংকুকে দেখে নিয়ে বললেন, "কী জানতে পারলেন?"
কিংকু নোটবইয়ের পাতা উল্টে বললেন, "জানতে পারলাম স্যার, আসিফ নিজামরুল একা নন। পুলসিরাত হাসপাতালে গত এক মাসে আরো চারজন সুশীল ঐ কেবিনে ভর্তি হয়েছে স্যার, তাদের প্রত্যেকের গালেই ওরকম পাকা কালিমাখা হাতের চটকানার ছাপ ছিলো!"
ঝাকানাকা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, "বটে! তারা কারা?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "বলছি স্যার। তার আগে আরো ঘটনা আছে, শুনুন। আমি পুলসিরাত হাসপাতালের এক ডাক্তারের কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম, ঘটনা কী। সে পারলে আমাকে গলাধাক্কা দিয়ে বার করে দেয়। তারপর যখন নিজের পরিচয় দিলাম, তখন ডাক্তার চুপসে গিয়ে আমাকে সব খুলে বললো।"
ঝাকানাকা বললেন, "কী বললো?"
কিংকু চৌধারি মুড়ির বাটিটা চেটেপুটে নিঃশেষ করে বললেন, "এই কেসে যারা এসেছেন, প্রত্যেককে চিকিৎসার জন্য ব্যাংকক পাঠাতে হচ্ছে স্যার! বাংলাদেশে ঐ চড়ের দাগের কোনো চিকিৎসাই নেই।"
ঝাকানাকা ঘরের মধ্যে চায়ের কাপ হাতে পায়চারি করতে করতে বললেন, "ইন্টারেস্টিং! তারপর?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "আমি স্যার নার্সের কাছ থেকে জেনে নিলাম, আসিফ নিজামরুল কখন ঘুমিয়ে পড়েন। নার্স আমাকে বললো, উনি নাকি সারাদিনই ভীষণ রাগারাগি করেন। রাতে ওনাকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়াতে হয়। আমি তখন সন্ধ্যাবেলা নিচের তেলেভাজার দোকানে মোগলাই পরোটা খেয়ে কাটিয়ে দিলাম স্যার। রাতের বেলা ওনার কেবিনে গিয়ে ডাক্তার আর নার্সকে ডেকে ব্যান্ডেজ খুলিয়ে আমি ওনার দুই গালে চটকানার ছাপের ছবি তুলে এনেছি স্যার।"
ঝাকানাকা জ্বলজ্বলে চোখে বললেন, "হাতের ছাপ মিলিয়ে দেখেছেন?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "জ্বি স্যার। রিপোর্ট পেয়েই আপনার কাছে ছুটে এসেছি।"
ঝাকানাকা হাতে কিল মেরে বললেন, "বদরু খাঁ!"
কিংকু মাথা ঝাঁকালেন। "জ্বি স্যার! একেবারে খাপে খাপে মিলে গেছে হাতের ছাপ।"
ঝাকানাকা বললেন, "কিন্তু বদরু কেন হাতে পাকা কালি মাখিয়ে আসিফ নিজামরুলকে চটকানা মারবে?"
কিংকু বললেন, "জানি না স্যার! সেজন্যেই তো আপনার শরণাপন্ন হওয়া। ... স্যার সামা খানকে বলেন না আরেক বাটি মুড়িমাখা দিয়ে যেতে?"
ঝাকানাকা কটমটিয়ে কিংকু চৌধারির দিকে তাকিয়ে বললেন, "সামা খান ... আরেকটু মুড়ি দিয়ে যেও! চানাচুর আর তেল বেশি দিও না!"
কিংকু চৌধারি মনমরা হয়ে বললেন, "আসিফ নিজামরুলকেও মনে হয় ব্যাংকক পাঠাতে হবে স্যার।"
ঝাকানাকা বললেন, "কালিটা পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ পেলেন?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "না স্যার। কালি পরীক্ষা করতে গেলে তো আসিফ নিজামরুলের গালশুদ্ধু পরীক্ষা করতে হবে। উনি জেগে গেলে আর সে সুযোগ মিলবে না স্যার। তবে ইনজেকশন ফুঁড়ে ঘুম পাড়িয়ে ওনাকে ল্যাবরেটরি নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। সাদা চোখে দেখে ভোটের কালির মতোই মনে হয় স্যার, কিন্তু আরো কড়া! একেবারে কলঙ্কের মতো পোক্ত মাল!"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমম! তা বাকি ভিকটিম কারা? বলুন দেখি এক এক করে।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "গত সপ্তাহে রিলিজ নিয়েছেন ফারুক ফসফরাস।"
ঝাকানাকা বললেন, "ঐ যে বাম বিপ্লবী? টক শোতে বিপ্লব করে কিছুদিন পরপর?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "জ্বি স্যার। উনি আর ওনার আরো কয়েকজন সাঙ্গোপাঙ্গো বান্দরবানে সুড়ঙ্গ খোঁড়েন মাঝেমাঝে। বাংলার অসমাপ্ত বিপ্লব সমাপ্ত করবেন ওনারা।"
ঝাকানাকা বললেন, "কেন? বিপ্লবের সাথে সুড়ঙ্গের কী সম্পর্ক?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "আমি তা জানি না স্যার। তবে সুড়ঙ্গ না খুঁড়ে নাকি বিপ্লব করা যায় না। আর একটা বড় মোটর সাইকেলও নাকি লাগে। কী কাজে লাগে জানি না স্যার।"
ঝাকানাকা বললেন, "স্ট্রেঞ্জ! আপনি এসব জানলেন কোত্থেকে?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "বাদশাহবাগে ওনাদের একটা দোকান আছে স্যার, মার্কস অ্যান্ড অ্যাঙ্গেলস নাম। ওখানে সব বিপ্লবী টি-শার্ট পাওয়া যায়। দেশবিদেশের বিপ্লবীদের ছবিঅলা টি-শার্ট, লকেট, মগ, এইসব বিক্রি হয়। অর্ডার দিলে বিপ্লবীদের ছবি আঁকা কেকও ওনারা বানিয়ে দেন। মিস মিলি একবার আমাকে ওখান থেকে একটা টি-শার্ট কিনে দিতে নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন খোঁজখবর নিয়ে জেনেছি স্যার। সুড়ঙ্গটা খোঁড়া হয়ে গেলে ওখানে একটা গাইডেড বিপ্লবী ট্যুরের ব্যবস্থা করবেন ওনারা। এক দিন দুই রাতের ট্যুর, সুড়ঙ্গের সাথে আশেপাশে ঝর্ণা, পাহাড়, নদীতে নৌকাবিহার, স্পা, এইসবের ব্যবস্থা থাকবে। সঙ্গে ফারুক ফসফরাসের লেখা বই ফ্রি।"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমম! বটে? এ ব্যাপারে বদরুর সাথে কোনো যোগাযোগ ছিলো নাকি ফসফরাসের?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "আমি যতদূর খোঁজখবর নিলাম, তাতে বদরুর সাথে এই বিপ্লবী সক্রিয়তার কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাইনি স্যার। ফসফরাস সাহেব অবশ্য একবার গাগাণ্ডু টিভিতে বদরুকে সাম্রাজ্যবাদের ফসল বলে বকাবকি করেছিলেন। ইঙ্গ-ইন্দো-ইসরায়েলি বিটকেলপনার সহচর বলে অনেক জ্ঞানের কথা বলেছিলেন, সবটা আমি বুঝিনি।"
ঝাকানাকা বললেন, "সে তো সবাই বদরুকে গাল দিয়ে কাগজে লেখালেখি করে। বদরু আলাদা করে ফারুক ফসফরাসকে কেন চটকানা মারতে যাবে? তাও পাকা কালি হাতে লাগিয়ে?"
কিংকু চৌধারি মাথা চুলকে বললেন, "জানি না স্যার। ফারুক ফসফরাসের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলাম ব্যাংককে, কিন্তু ওনার ফোনের রিংটোনে শুধু ফয়েজ আহমদ ফয়েজের গজল বাজে। কেউ ধরে না। মনে হয় উনি ব্যাংককে ব্যস্ত।"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমম! তারপর?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "ফারুক ফসফরাসেরও এক হপ্তা আগে পুলসিরাত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে পরে রিলিজ নেন ঔপন্যাসিক সৈয়দ মহানজরুল।"
ঝাকানাকা বললেন, "সে কী? উনি তো পণ্ডিত মানুষ। ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন। তাঁকে কেন চড় মেরেছে বদরু হতভাগা?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "জানি না স্যার। তবে উনিও এখন ব্যাংককে। ফারুক ফসফরাস যে হাসপাতালে, সেখানেই। ওনার বাসায় ফোন করেছিলাম, তারা বললো উনি কয়েকদিন পর ফিরবেন দেশে।"
ঝাকানাকা বললেন, "তাঁর সঙ্গে তো বদরুর কোনো শত্রুতা হওয়ার কথা নয়! আপনি কি পত্রপত্রিকা, রেডিওটিভির সাথে আলাপ করে দেখেছেন?"
সামা খান আবার এক বাটি মুড়িমাখা দিয়ে গেছে, কিংকু বাটির ওপর হামলে পড়ে বললেন, "জ্বি স্যার। উনি শুধু রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি করেন আর কথাবার্তা বলেন। বদরু বিষয়েও উনি কখনও কিছু বলেননি। কেউ ইতিহাসের ঘটনা নিয়ে গালগল্প লিখলে উনি সেসব নিয়ে আলোচনা করেন শুধু। কারও সাতে-পাঁচে থাকেন না। সবাইকেই ভালো বলেন।"
ঝাকানাকা বললেন, "এমন একজন নিরীহ নিপাট ভালোমানুষকে বদরু খাঁ হাতে পাকা কালি মাখিয়ে দুই কিলোচটকানা মেরে গেলো! কেন?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "এ প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই স্যার! আমি ফোনে যোগাযোগ করেছিলাম, কিন্তু ওনার ফোন বন্ধ।"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমম! তারপর?"
কিংকু নোটবইয়ের পাতা উল্টে বললেন, "এর আগের ভিকটিম স্যার, আবুল বোকশিশ সৈয়দী।"
ঝাকানাকা বললেন, "ওহ, উনিও তো আন্দোলন সংগ্রাম লাইনের লোক। প্রায়ই দেখি আধাবেলা অনশন করেন এখানে সেখানে।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "জ্বি স্যার। তাছাড়া যানজট দেখলেই উনি কিছুক্ষণ অবস্থান ধর্মঘট করেন নানা ঘটনার প্রতিবাদে। আর স্যার, উনিও কিন্তু ইতিহাসের পণ্ডিত। মোগল আমল বৃটিশ আমল পাকিস্তান আমল সব আমল ওনার মুখস্থ স্যার।"
ঝাকানাকা বললেন, "উনি কি বদরুর বিরুদ্ধে কিছু বলেছেন?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "না স্যার। বদরুকে নিয়ে ওনার কোনো মাথাব্যথাই নেই। তাছাড়া উনি অহিংস সংগ্রাম লাইনের লোক। বদরুর মতো সহিংস বদমাশদের নিয়ে উনি কিছুই বলেন না।"
ঝাকানাকা বললেন, "তাহলে ওনার গালে কেন বদরুর কালিমাখা হাতের চটকানা?"
কিংকু বললেন, "না স্যার, ওনার গালে চড় মারেনি বদরু। আরো খারাপ কেস। ওনার ধুতি তুলে একটা বাজে জায়গার গোস্তে পায়ে কালি মেখে লাথি মেরেছে স্যার!"
ঝাকানাকা গম্ভীর হয়ে গেলেন। "বদরুর এতো বড় আস্পর্ধা?"
কিংকু বললেন, "উনি ব্যাংককে গিয়ে ঐ বাজে জায়গার কালিমা মোচন করিয়ে এনেছেন স্যার। আমি ফোন করেছিলাম ওনাকে, কিন্তু উনি এ ব্যাপারে কিছু বলতে রাজিই হলেন না। আমি আমার পরিচয় জানিয়ে চাপাচাপি করেছিলাম, উনি এখন স্যার আমার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে রবীন্দ্র সরোবরে দুই ঘন্টার অনশন করছেন।"
ঝাকানাকা ভুরু কুঁচকে বললেন, "হুমমমম! আর কে?"
কিংকু বললেন, "শেষ সুশীল ভিকটিম হচ্ছেন গিয়ে নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, কবি আনিসুল হাই।"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমম। আচ্ছা। বেশ বেশ। ভালো। তা কী মেরেছে, চড় না লাথি?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "চড় লাথি দুটোই স্যার। এক মাস আগে পুলসিরাত হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়েছিলেন উনি। এখনও ব্যাংককে আছেন।"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমম। আচ্ছা। বেশ। ভালোই তো। চিকিৎসা চলছে এখনও?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "না স্যার, চিকিৎসা শেষ। উনি থাই ভাষায় ওনার মামা উপন্যাসটা অনুবাদ করিয়েছেন, সেটা নিয়ে ফাংশন করে বেড়াচ্ছেন এখানে ওখানে।"
ঝাকানাকা বললেন, "চড় আর লাথি দুটোই মেরেছে বললেন?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "জ্বি স্যার।"
ঝাকানাকা বললেন, "কিলোচটকানা মেরেছে, নাকি?"
কিংকু চৌধারি নোটবুক দেখে নিয়ে বললেন, "জ্বি স্যার। আর দুই বাজে গোস্তে দুটো হেক্টোলাথি। পাকা কালিমাখা পায়ে।"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমম। আচ্ছা। বেশ। ভালো। তা কেন মেরেছে ... আন্দাজ করতে পারেন?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "না স্যার। উনিও বদরুর ব্যাপারে কখনও কোথাও কিছু বলেননি। তাছাড়া শুনেছি বদরু ওনার মামা উপন্যাসের বেশ ভক্ত। এক বদরুক্যাপ্টেনকে আজই রিমান্ডে নিয়ে জেরা করেছি স্যার, সে বললো, বদরুবাহিনীতে স্যার মামা উপন্যাস পাঠ্য হিসেবে সিলেবাসে ঢোকানো হয়েছে। তারপরও কেন বদরু ওনাকে এভাবে দুই গালে চটাশ চটাশ করে দুটো চড় আর দুই ইসেতে ওরকম ওজনদার দুটো লাথি মারলো, সে এক রহস্য!"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমম। আচ্ছা। বেশ। ভালো।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "আরও একজন লোক গালে চড়ের দাগ নিয়ে পুলসিরাত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলো স্যার, মাস দেড়েক আগে। তবে সে সুশীল নয়। বদ লোক। আমাদের খাতায় স্যার তার নাম আছে।"
ঝাকানাকা বললেন, "বটে? কে সে?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "হেবো বাজিয়াল।"
ঝাকানাকা ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, "নাহ, এই নামে কাউকে কখনও প্যাঁদাইনি আমি। কে এই হেবো বাজিয়াল?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "এই লোক স্যার, জুয়ার আড্ডাধারী। নানারকম জুয়া আর বাজির আয়োজন করে বেড়ায় এখানে সেখানে। বিভিন্ন ক্লাবে, হোটেলে, মেলায়। এমনকি হতভাগাটা বাচ্চাদের স্কুলের সামনেও ছোটোদের জুয়ার আসর বসায়।"
ঝাকানাকা বললেন, "সে কী? ছোটোরাও জুয়া খেলে নাকি?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "হেবো বাজিয়ালের পাল্লায় পড়লে স্যার সবাই জুয়া খেলতে বাধ্য, সে এমনই পাকা জুয়াখোর। এজন্যে স্যার ওকে গ্রেফতার করলে হাজতে রাখা মুশকিল। গোটা থানা জুয়া খেলতে শুরু করে। ওকে কয়েকবার জেলে পাঠানো হয়েছিলো স্যার, মেয়াদ ফুরোনোর আগে জেল কর্তৃপক্ষই অতিষ্ঠ হয়ে ওকে কানে ধরে বার করে দেয়। লৌহজং জেল তো স্যার বন্ধই করে দিতে হলো ওর কারণে।"
ঝাকানাকার ভুরু সাংঘাতিক কুঁচকে গেলো। তিনি সোফায় বসে পায়ের ওপর পা তুলে গোঁফে তা দিতে দিতে বললেন, "একটা ব্যাপার দেখুন জনাব কিংকু। হেবো বাজিয়াল বদরুর হাতে কালিমাময় চটকানা খেয়ে নাহয় চুপচাপ হাসপাতালে ভর্তি হলো। কিন্তু বাকিরা কেন এ ব্যাপারটা গোপন রাখতে চাইলো? তারা কেন পুলিশকে খবর দিলো না? কেন তারা গোপনে ব্যাংককে গিয়ে মারের দাগের চিকিৎসা করায়? কেন এতো লুকোছাপা?"
কিংকু চৌধারি মুড়ি চিবাতে চিবাতে বললেন, "স্যার, আমার মনে হয় কি জানেন, পুলসিরাত হাসপাতাল আর ব্যাংককের ঐ হাসপাতালটার সাথে বদরুর কোনো রকম বোঝাপড়া হয়েছে। রোগী যোগাড় করে দিয়ে কমিশন কামাচ্ছে বিটকেলটা।"
ঝাকানাকা বললেন, "উমমমম? নাহ। সেরকম বোঝাপড়া হলে কতই বা আর কমিশন পাবে সে? ওরকম খুচরো কাজ বদরু করবে না। চার-পাঁচটা রোগী ধরে দালালি কামানোর মতো ছিঁচকে পাজি সে নয়। এর পেছনে আরো গভীর কোনো ষড়যন্ত্র আছে!"
কিংকু চৌধারি বললেন, "কীরকম স্যার?"
ঝাকানাকা বললেন, "আপনি খেয়াল করে দেখুন, বদরু মোটামুটি বেছে বেছে সুশীল প্যাঁদাচ্ছে। যাদের সে হাসপাতালে পাঠিয়েছে, সকলেই মান্যগণ্য বিশিষ্ট লোক। সমাজের মাথা। জাতির বিবেক। প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। কেউ শিক্ষক। কেউ বিপ্লবী। কেউ ইতিহাসবেত্তা। কেউ অনশনযোদ্ধা। কেউ আনিসুল হাই। এদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য কী, সেটা আগে আমাদের বুঝতে হবে। তারপর দেখতে হবে কেন এরা পুলিশের কাছে গেলেন না।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "স্যার, এদের মধ্যে কোনো সাধারণ বৈশিষ্ট্য তো দেখতে পাচ্ছি না। ওনারা সবাই অসাধারণ।"
ঝাকানাকা ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন, তারপর টিভির রিমোটের বোতাম টিপে টিভি চালু করলেন।
কিংকু চৌধারি বললেন, "স্যার আরেক কাপ চা দিতে বলেন না।"
ঝাকানাকা বললেন, "সামা খান ... দুই কাপ চা দিও। চিনি বেশি দিও না।"
কিংকু চৌধারি মনমরা হয়ে বললেন, "আমার মনে হয় কি, স্যার, বদরু এদের মধ্যে কারো একজনের ছদ্মবেশ ধরে ব্যাংকক গেছে কোনো চোরাচালানের কাজে। হয়তো ইউরেনিয়াম আনবে দশ কেজি। কিংবা কোনো খতরনাক জীবাণুর শিশি।"
ঝাকানাকা চিন্তামগ্ন কণ্ঠে বললেন, "সেজন্যে বদরুকে কষ্ট করে হাতেপায়ে কালি মেখে এদের ঠ্যাঙাতে হবে কেন? সে তো যে কোনো একজনকে তুলে নিয়ে কয়েকদিন আটকে রেখে ছদ্মবেশ নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে!"
কিংকু চৌধারি বললেন, "তাহলে কেন স্যার? হোয়াই?"
ঝাকানাকা খবরের কাগজ টেনে নিয়ে একটা পাতা খুলে কিছুক্ষণ মন দিয়ে পড়লেন, তারপর ভুরু কুঁচকে উঠে দাঁড়িয়ে পায়চারি করতে লাগলেন।
সামা খান দুই কাপ চা এনে রেখে গেলো টেবিলে। কিংকু চৌধারি ফিসফিস করে বললেন, "আমার কাপে আরেক চামচ চিনি দিও!"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমমম। পাঁচ পাঁচজন সুশীলকে এভাবে গালে আর ইসেতে চড়-লাথি মেরে প্রথমে দেশের হাসপাতালে, তারপরে বিদেশের হাসপাতালে পাঠালো বদরু। কেন?"
কিংকু চৌধারি চায়ের কাপে এক্সট্রা চিনি চামচ দিয়ে চুপিসাড়ে গুলতে গুলতে বললেন, "তাই তো স্যার, কেন?"
ঝাকানাকা বললেন, "যদি চড়ই মারতে হবে, তবে সঙ্গে আবার কালি কেন?"
কিংকু বললেন, "তাই তো স্যার, কালি কেন? হোয়াই?"
ঝাকানাকা বললেন, "খালি হাতে কালি ব্যবহার করলে চড়ের মালিক হিসেবে বদরুর পরিচয় ফাঁস হতে বাধ্য। এ কথা বদরু নিজেও জানে। তারপরও সে মেরেছে। অর্থাৎ, সে জানতো, চড় খেয়েও কেউ পুলিশের কাছে যাবে না। বরং গোপনে, চুপিচুপি, যাবে হাসপাতালে। আপনি গোপন সূত্রে আসিফ নিজামরুলের ঘটনার খোঁজ না পেলে ব্যাপারটা গোপনই থাকতো।"
কিংকু চায়ে এক দীর্ঘ চুমুক দিয়ে বললেন, "আহ! ঠিকই তো স্যার!"
ঝাকানাকা পায়চারি করতে করতে বললেন, "ওদিকে হেবো বাজিয়ালকেও পিটিয়েছে বদরু। একই কায়দায়। কেন?"
কিংকু বললেন, "কেন স্যার?"
ঝাকানাকা আচমকা থমকে দাঁড়িয়ে গোঁফ টানতে টানতে বললেন, "জনাব কিংকু! আপনি এক্ষুণি খোঁজ নিন, প্রতিদিন রাত নয়টা বাজার ঠিক আগে আগে কোনো বিশেষ মোবাইল নাম্বারে ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিসে প্রচুর পরিমাণ এসেমেস লেনদেন হয় কি না!"
কিংকু চৌধারি থতমত খেয়ে নিজের মোবাইল বার করে গোয়েন্দা দপ্তরে ফোন দিয়ে কথা বলতে লাগলেন।
ঝাকানাকা আবার সোফায় বসে ভুরু কুঁচকে ভাবতে লাগলেন কী যেন।
কিংকু চৌধারি মিনিট কুড়ি এর সাথে ওর সাথে কথাবার্তা বলে ফোন বন্ধ করে ঝাকানাকার দিকে ফিরলেন। "স্যার, আপনার সন্দেহই ঠিক! প্রতিদিন রাত আটটা পঞ্চাশ থেকে রাত ন'টার মধ্যে ৬৬৬ নাম্বার থেকে প্রচুর এসেমেস আসে যায় স্যার!"
ঝাকানাকার মুখে সন্তুষ্টির হাসি ফুটলো। "আর সেই সার্ভিসের মালিক কে?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "হেবো বাজিয়াল স্যার!"
ঝাকানাকা অট্টহাসি হেসে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, "রহস্যের সমাধান পেয়ে গেছি কিংকু সাহেব!"
কিংকু চৌধারি ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া চা-টুকু কোঁৎ করে গিলে খেয়ে বললেন, "কী সমাধান স্যার?"
ঝাকানাকা হাসিমুখে বললেন, "স্পট ফিক্সিং!"
কিংকু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন, "স্পট ফিক্সিং? কোথায় স্যার?"
ঝাকানাকা হাতে কিল মেরে বললেন, "গাগাণ্ডু টিভির টক শো-তে!"
কিংকু চৌধারি বিস্মিত হয়ে বললেন, "টক শো-তে স্পট ফিক্সিং? সে আবার ক্যামোন জিনিস?"
ঝাকানাকা মুহাহাহাহা হেসে বললেন, "সেখানেই তো আসল গোমর! আপনি যাদের কথা বললেন, এরা সকলেই গাগাণ্ডু টিভির রাত ন'টার টক শো "আজকের কলতলা"-র নিয়মিত কথোয়াড়।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "কথোয়াড়?"
ঝাকানাকা বলেন, "হ্যাঁ। ওনারা কথা বলেন। অনেক কথা। আর আপনি তো জানেনই, আজকের কলতলায় একটা পর্যায়ে অনেক কিছু ঘটে। কথা বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে এক পর্যায়ে কথোয়াড়েরা মারামারি করেন, গালাগালি করেন, একজন আরেকজনের দিকে মগের পানি ছুঁড়ে মারেন, অনুষ্ঠানের সেট ছেড়ে চলে যান, কান্নাকাটি করেন, কেউ কেউ রাগের চোটে বিষ খান। নানা নাটক চলে সেখানে।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "হ্যাঁ স্যার, আমি তো এজন্যেই রোজ গাগাণ্ডু টিভি দেখি!"
ঝাকানাকা বললেন, "আপনি যেমন দেখেন, তেমনই আরো অনেক ছেলেবুড়ো গিন্নিবান্নি এই টকশো দেখে। আর সেখানেই হতভাগা হেবো বাজিয়াল ফাঁদ পেতে রেখেছে। সে এক গোপন বাজির আড্ডা খুলে বসেছে মোবাইলে। সেখানে বাজি ধরা হয়, আজ কোন কথোয়াড় কখন কী খেল দেখাবেন। কে কার সাথে মারপিট করবেন, কে কাকে জুতাচোর বলে গালি দেবেন, এইসব টুকিটাকি ডিটেলসের ওপর স্পট বাজি ধরা হয়। সবই চলে মোবাইলে, এসেমেসে আর ক্যাশ ট্র্যান্সফারে।"
কিংকু চৌধারি চটে গিয়ে বললেন, "সে কী স্যার, এরকম একটা জোশ জিনিস, আমি তো আজ পর্যন্ত এটার খোঁজই পেলাম না! এ কেমন অন্যায়"
ঝাকানাকা আড়চোখে কিংকুকে দেখে নিয়ে বললেন, "আজকাল লোকজন কেউ আর পরিশ্রম করতে চায় না। শেয়ার বাজার, এমএলএম, এইসব করে পয়সা কামানোর ঝোঁক সবার। সেটা বদরুও জানে। তাই সে এই টক শোয়ের পেছনে হেবো বাজিয়ালকে দিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছিলো। মনে হয় কোনো সমস্যা করেছিলো হেবো, তাই বদরু তাকে মাস দেড়েক আগে প্যাঁদায়।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "তা নাহয় বুঝলাম স্যার, কিন্তু সুশীলরা কেন মার খেলেন?"
ঝাকানাকা বললেন, "এদের সাথেও বদরুর বোঝাপড়া ছিলো। সম্ভবত এনারা স্পট ফিক্সিং ঠিকমতো করতে পারেননি। আর সে কারণে বদরু বাজির খেলায় কিছু লোকসান দিয়েছে নিশ্চয়ই। আর তারই শাস্তি হিসেবে সে ঐ পাকা কালি হাতে মেখে এদের এমনভাবে পিটিয়েছে, যাতে এরা কিছুদিন আর লোকচক্ষুর সামনে আসতে না পারেন। টক শো থেকে সুশীলদের দূরে রাখা খুবই কঠিন, জানেন তো?"
কিংকু চৌধারির কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠলো, "সব মিলে যাচ্ছে স্যার! গালে চটকানার কালো দাগ নিয়ে এরা কেউই তো টিভিতে যেতে পারবেন না!"
ঝাকানাকা বললেন, "কেস ক্লোজড। জলদি গিয়ে ৬৬৬ নাম্বারটাকে বন্ধ করুন, হেবো বাজিয়ালকে আটক করুন।"
কিংকু চৌধারি এক চৌকস স্যালুট দিয়ে বললেন, "এক্ষুণি যাচ্ছি স্যার! কিন্তু একটা জিনিস তো বুঝতে পারলাম না স্যার!"
ঝাকানাকা বললেন, "কী?"
কিংকু চিন্তিত হয়ে বললেন, "আবুল বোকশিশ সৈয়দীর ব্যাপারটা স্যার। ওনার গালে তো কোনো দাগ ফেলেনি বদরু। ফেলেছে বাজে জায়গার গোস্তে। উনি তবু কেন ব্যাংকক গেলেন?"
ঝাকানাকা উদার হেসে বললেন, "উনি তো নেংটি পরেন, জনাব কিংকু! টেলিভিশনে কখন ফ্যানের বাতাসে কাপড় উড়ে কী বেরিয়ে পড়ে, তার ঠিক আছে?"
কিংকু চৌধারির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো আবার। "স্যার, এই সুশীলদেরও কি আটক করবো?"
ঝাকানাকা বিষণ্ণ মুখে বললেন, "না জনাব কিংকু। সুশীলদের কিছু বলা বারণ। আপনি বরং আপাতত হেবো বাজিয়ালকেই আরেক পশলা প্যাঁদান।"
[সমাপ্ত]

গোয়েন্দা ঝাকানাকার একটি ফেসবুক পেইজ রয়েছে।

1 comment:

  1. #অসাধারন.......গোয়েন্দা ঝাকানাকা নিজে রহস্য সমাধান না করে কিংকু চৌধুরীকে দিয়ে করালে কেমন যে হবে.....!

    #ভাল থাকুন সবসময়

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।