Thursday, June 14, 2012

সামাজিক ফিকশন ০১

বাংলাদেশে দরিদ্র নারীর একমাত্র ভরসা, দারিদ্র্যের জানি দুশমন নোবেলপতি ড. মুহম্মদ ইউনূস তরুণদের আহ্বান করেছেন সামাজিক ফিকশন লেখার জন্যে।

পীরানে পীর ইরশাদ করেছেন,

বিজ্ঞান নিয়ে নানা কল্পকাহিনী (সায়েন্স ফিকশন) আছে। কিন্তু আজ থেকে ২০ বা ৫০ বছর পরে মানুষ কোথায় যাবে, কি সামাজিক পরিবর্তন হবে তার কোনো ফিকশন রচনা আমরা করতে পারিনি। তাই তোমাদের এখনই সামাজিক ফিকশনগুলো তৈরি করতে হবে।

শাহে হজরত খাজা বাবা ইউনূস (রহঃ) হয়তো জানেন না, কিন্তু এমন ফিকশন আমরা কিছুমিছু রচনা করেছি। কিন্তু আউলিয়ায়ে আজম যখন বলেছে আমরা করিনি, তখন আমরা অবশ্যই করিনি। আজ থেকেই তবে শুরু হোক এই সামাজিক ফিকশন। আমি একজন সামান্য তরুণ মুরিদ, বাবার পায়ে কদম্বুছি করে হাতে তুলে নিলাম কলম আর দোয়াত। রচনা করি আমার পীরের নামে, যিনি আমার উচ্চতা দশফুট করিয়াছেন।


২০৩২ সাল।

জানালার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরে সবুজ লনের দিকে তাকিয়ে আছেন চেলসি ক্লিনটন। নীল আকাশে ইতস্তত ভাসমান টুকরো টুকরো মেঘ রোদেলা দিনের প্রতিশ্রুতিকে মলিন করতে পারেনি একটুও।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ গবেষণা সহকারী জোসেফ পামার চুপচাপ কফির মগে চুমুক দিচ্ছে পেছনে বসে। পামারের চোখে পুরোনো জমানার চশমা, মাথায় এলোমেলো বাদামি চুল, দেখে মনে হচ্ছে কোনোমতে একটা স্যুট চাপিয়ে অফিসে চলে এসেছে সে। একেবারে কমিকের পাতা থেকে উঠে আসা আঁতেল চরিত্রের মতো। আজকাল কেউ আর চশমা পরে না তেমন একটা, লেজার দিয়ে চোখ ঠিক করে নেয়াই দস্তুর।

"এরা বেশ গোঁয়ার, তাই না?" চেলসি ঘুরে দাঁড়িয়ে আনমনে প্রশ্ন করলেন, তার কপালে সামান্য ভাঁজ।

পামার কফি শেষ করে কাপটা ডেস্কের ওপর রেখে বললো, "হ্যাঁ, একটা ঘাড়ত্যাড়া জাতি। এজন্যই তো টাইটের ওপর রাখতে হয়।"

চেলসি বড়সড় ঘরের ভেতরে পায়চারি করতে লাগলেন। "বছর কুড়ি আগেও একটা সমস্যা বাঁধিয়েছিলো শেইখ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। মনে আছে, জো?"

পামার একটা প্যাড টেনে নিয়ে হিজিবিজি দাগ কাটছিলো, সে মুখ না তুলেই বললো, "হ্যাঁ। মিসেস ক্লিনটন বেশ টাইট দিয়েছিলেন তারপর। কয়েকটা বড়সড় লোন আটকে যাবার পর মজা টের পেয়েছিলো শেইখ।"

চেলসি বললেন, "এবার তারা ক্ষমতায় এসে লেগেছে সামাজিক ব্যবসার পেছনে।"

পামারের মুখে একটা আবছা হাসির রেখা ফুটে উঠে মিলিয়ে গেলো।

চেলসি উত্তেজিত হয়ে আকাশের দিকে হাত ঝাঁকিয়ে বললেন, "হেসো না, জো! তুমি জানো কতোগুলো বড় ব্যবসা ওখানে জড়িয়ে গেছে? খাওয়ার পানি, রান্নার গ্যাস, ফলমূল-সব্জি সরবরাহ, এমনকি ফুটপাথে চপ্পল বিক্রিও এখন সামাজিক ব্যবসা। আমাদের নাগরিকদের কয়েক বিলিয়ন ডলারের সামাজিক ব্যবসা ওখানে বিপন্ন হতে পারে নতুন আইনের কারণে। কল্পনা করতে পারো, কতো বড় স্পর্ধা ওদের?"

পামার হাসিমুখে বললো, "আইনটা কিন্তু বেশ ভালো জায়গায় প্যাঁচ মেরেছে। সামাজিক ব্যবসাকে হস্তান্তর করলে সেটা আর অসামাজিক ব্যবসা হিসেবে চালানো যাবে না!"

চেলসি গনগনে মুখে বললেন, "সামাজিক ব্যবসা যদি হস্তান্তরের পর অসামাজিকই করা না যায়, তাহলে সামাজিক ব্যবসা করতে যাবে কে? তুমি জানো পানির ব্যবসা ওখানে কতো বড়ো? আর ওদের দেখাদেখি যদি অন্য সব দেশেও এই আইন করার ধান্ধা শুরু হয়, বাড়িটা কার পাছায় এসে পড়বে বুঝতে পারো?"

পামার দাঁত বের করে হাসে। "আমার মনে হয়, একটা রেজিম পরিবর্তনের বাতাস ওখানে লেগেছে। আমাদের একটু পাখা নেড়ে সেটা উস্কে দিতে হবে আর কি।"

চেলসি ডেস্কের ওপর চড়ে বসে পা দোলাতে লাগলেন। "দ্যাট ওল্ড ম্যান ... বেচারার নব্বইয়ের ওপর বয়স, এই বয়সেও চেষ্টা করে যাচ্ছে সে। আমাদের অবশ্যই উচিত যত শিগগীর তাকে একটা হাত বাড়িয়ে দেয়া।"

পামার চেয়ারে হেলান দিয়ে বললো, "বয়স হয়েছে বেচারার। আমাদের দরকার কোনো তরুণ তুর্কি।"

চেলসি বললেন, "কেন? ওকে দিয়ে আর হবে না বলছো?"

পামার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে বললো, "তোমার মনে আছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে আমরা কী করেছিলাম?"

পামারের উস্কোখুস্কো চুলের নিচে কোনো একটা মতলব আড়মোড়া ভাঙছে আঁচ করে চেলসি মনোযোগ দিলেন তার দিকে। "কী করেছিলাম?"

পামার ঘরের ভেতরে হাঁটতে লাগলো তুরতুর করে। "আমরা হিরোশিমায় নিউক্লিয়ার বোমা ফেলেছিলাম।"

চেলসি ভুরু কুঁচকে বললেন, "তো?"

পামার বললো, "কিন্তু, তাতে কি কাজ হয়েছিলো পুরোপুরি?" 

চেলসি কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে বললেন, "কী বলতে চাইছো?"

পামার বিচিত্র ভঙ্গিতে কয়েকবার ওঠবোস করে শরীরের আড়ষ্টতা ভাঙার চেষ্টা করতে করতে বললো, "আমরা তার দু'দিন পর কিন্তু নাগাসাকিতেও বোমা ফেলেছিলাম!"

চেলসি সরু চোখে পামারের নাচনকোঁদন দেখতে দেখতে বললেন, "হুমমম। তো?"

পামার হাসিমুখে দাঁত বার করে বললো, "তো হচ্ছে কি, কাজ উদ্ধার করতে গেলে মাঝেমধ্যে দুইবার বোমা ফেলতে হয়। ইরাকের তেল দখলে আনতে উই হ্যাড টু বম্ব দ্য ব্যাস্টার্ডস টোয়াইস। ইউ অলওয়েজ হ্যাভ টু স্ট্রাইক টোয়াইস। এটাই হচ্ছে মূল কথা।"

চেলসির কপালে চিন্তার হলরেখা ফুটে উঠলো। "বটে?"

পামার বললো, "বম্ব দ্য ফাকটার্ডস অ্যাগেন। এই কুড়ি বছরে আমরা ওদের দেশে আর কাউকেই নোবেল দিইনি, এখন আরেকটা নোবেলের জন্যে খুবই অনুকূল পরিবেশ আছে! মাঝে অবশ্য সাহিত্যে একজন আর চিকিৎসায় দুইজন নোবেল পেয়ে যাচ্ছিলো প্রায়, সময়মতো আটকে দেয়া গেছে। বাট নাও ইজ দ্য টাইম। লেটস ডু দ্যাট থিং হোয়াট স্প্রিং ডাজ টু ... ।"

চেলসি হাসলেন, "চেরি ট্রিজ?"

পামারের চোখা দুটো দাঁত বেরিয়ে এলো হাসির সাথে, "...অ্যান্টার্কটিক আইসবার্গস। লেটস মেল্ট দ্য ইডিয়টস ওয়ানস আগেন। আরেকটা নোবেল পুরস্কার দাও কোনো চ্যাংড়াকে। শান্তিতে, অবশ্যই। রসায়নে নোবেল দিয়ে লাভ নেই ওদের। পিস হ্যাজ ওয়ান পার্টিকুলার ভায়োলেন্ট কনোটেশন, ইউ নো। ইট হ্যাজ আ সনিক বুম, মোর পাওয়ারফুল দ্যান রোরিং ক্যাননস।"

চেলসি চোখ ছোটো করে হাসলেন, হাসিটা তার চোখকে স্পর্শ করলো না। "ভালো বুদ্ধি পামার। কিন্তু একটু সংশোধন করতে হবে। কোনো চ্যাংড়াকে নয়, উই শুড গো ফর দ্য ওল্ড চ্যাপ।"

পামারের কাঁধ ঝুলে গেলো, "বুড়োকে? আবার? কেন? ইটস লাইক বম্বিং দ্য শিট আউট অব হিরোশিমা, টোয়াইস!"

চেলসি হাসলেন। "এখন পর্যন্ত দু'বার নোবেল পেয়েছে মোটে চারজন মানুষ। জন বার্ডিন, মারি কুরি, লিনাস পলিং আর ফ্রেড স্যাঙ্গার। আর ঐ দক্ষিণ এশীয় হতভাগাগুলো একটা নোবেলের চটকনাতেই লাইনে চলে এসেছিলো, দুটো নোবেলের লাথি সহ্য করার ক্ষমতা ওদের নেই। বম্ব হিরোশিমা টোয়াইস, ইফ ইট ওয়ার্কস।"

পামার ভুরু কুঁচকে বুকে হাত বেঁধে চিন্তা করতে লাগলো।

চেলসি ডেস্ক থেকে নামলেন। "ইট উইল উইন হিম দ্য হোল হোর্ড অব পুওর সডস, জো। সব গরিবগুর্বো পটাপট লাইনে এসে দাঁড়াবে বুড়োর পেছনে, কোনো মিস নাই, দেইখো!"

পামার বললো, "কিন্তু গরিবরা তো নোবেল নিয়ে মাথা ঘামায় না। ওদের তো খাওয়াপরার চিন্তাতেই হালুয়া টাইট। তুমি আবার ভেবে দেখো ...।"

চেলসি হাত তুলে থামিয়ে দিলেন পামারকে। "উঁহু জো! ভুল কোরো না। আই হ্যাভ বিন দেয়ার। যখন আমি ছোটো ছিলাম, তখনও দেখেছি, যখন বড় হলাম, তখনও গিয়েছি, আর সেক্রেটারি হিসেবেও গিয়েছি একবার। আই নোও দেম। ওখানে যারা খেতে পায় না, পরতে পায় না, তারা গরিব না। দে আর আ ব্লাডি রেজিলিয়েন্ট লট। ওদের গরিব হচ্ছে সেই লোকগুলো, যারা খেতে পায়, পরতে পায়, কিন্তু নিজেদের ভিখিরির চেয়ে বড় কিছু ভাবতে পারে না। এরা করাপ্ট বুরোক্র্যাটদের ছেলেমেয়ে, এরা করাপ্ট পলিটিশিয়ানের নাতিনাতনি, এরা ট্যাক্সচোর ব্যবসায়ীদের বংশধর, এরা দেশে আর বিদেশে ছড়িয়ে থেকে এর ওর কাছে করাপশনের বদনাম করে আর বলে দেশটা পলিটিক্সের কারণে শ্যাষ হয়ে গেলো। এরাই বুড়োর সবচেয়ে বড় সমঝদার। দে আর দ্য পুওর ওয়ানস হু উইল নেভার লেট পোভার্টি পেরিশ ইন দ্যাট গড ফরসেইকেন স্ট্রিপ অভ ল্যান্ড ফুল অব বাগারস। আমাদের টার্গেট করতে হবে এই মনের ফকিরগুলোকে, ধনের ফকিরগুলোকে নয়।"

পামার হাঁ করে কিছুক্ষণ চেলসির দিকে তাকিয়ে বললো, "মাই গুডনেস! ইউ আর ওয়ান শ্রুড বিচ, ডিয়ার সেক্রেটারি!" নাটুকে ভঙ্গিতে কার্পেটে হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত সামনে মেলে কুর্নিশ করলো সে। 

চেলসি দরাজ হেসে বললেন, "দূর হও বেল্লিক। সুইডেনের সাথে যোগাযোগ করোগে, যাও।"

পামার ভুরু কুঁচকে বললো, "সুইডেন কেন? নরওয়ে না?"

চেলসি হাতে হাত ঘষে বললেন, "উঁহু। এবার অর্থনীতি। সামাজিক ব্যবসাকে বাঁচাতে হলে অর্থনীতিতে নোবেল ছাড়া আপাতত উপায় দেখছি না।"

পামার উঠে দাঁড়িয়ে বললো, "আচ্ছা, যদি গতবারের মতো এটাও কাজ না করে, তাহলে ...?"

চেলসির মুখটা কঠিন হয়ে এলো। তিনি জানালার দিকে তাকিয়ে আকাশে উড়ন্ত মেঘের টুকরো দেখতে দেখতে মৃদু গলায় বললেন, "উই বম্বড হিরোশিমা ওয়ান্স, বিকজ উই হ্যাড টু। যদি মূলায় কাজ না হয়, তাহলে কীসে কাজ হবে, আমরা জানি।"

পামারের কপালে ভাঁজ মিলিয়ে গেলো মুখের হাসির টানে। "লাঠি?"

চেলসি উত্তর দিলেন না। বাইরে সকালের আকাশে অপূর্ব নকশা তৈরি করেছে গ্রীষ্মের মেঘ, মিষ্টি রোদে ভেসে যাচ্ছে ওয়াশিংটন ডিসি।

1 comment:

  1. আহা ফিকশনটা যদি তাহার গোচরে আনা যেত !
    এই একটা লোকের জন্যই বিজিএমইএ কর্তাদের চেয়ে বেশি ঘৃনা জমা আছে আমার ।
    সম্ভাব্য আরো অনেককে নিয়ে এরকম ফিকশন পেলে ভাল লাগবে ।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।