Friday, June 01, 2012

"তুমি কোন কাননের ফুল?"



২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের দুই দাবিদারের একজন, কৃতী ব্যবসায়ী ড. মুহম্মদ ইউনূসের একটি বিবৃতি দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত [১] হয়েছে। ইউনূস এই বিবৃতিতে গ্রামীণ ব্যাঙ্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর সন্দেহ, সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে গ্রামীণ ব্যাঙ্ক তার কর্মসংস্কৃতি হারিয়ে ফেলতে পারে। গ্রামীণ ব্যাঙ্ক নিয়ে ইউনূসের উদ্বেগ প্রকাশের পূর্ণ অধিকার রয়েছে, যেহেতু এটি বহুলাংশে তার মস্তিষ্কপ্রসূত, এবং তার সরাসরি তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় প্রায় পুরোটা সময় পরিচালিত হয়েছে। বয়সের কারণে কর্তৃপক্ষীয় হস্তক্ষেপে এবং পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের রায়ে ইউনূস গ্রামীণ ব্যাঙ্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন, নইলে হয়তো এখনও তিনিই ব্যবস্থাপনা পরিচালক রয়ে যেতেন।
এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই। কয়েকদিন আগেই "বিজনেস ফর পিস" পুরস্কার পেয়েছেন ট্রান্সকম গ্রুপের মালিক লতিফুর রহমান। তিনি দৈনিক প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারেরও মালিক। দৈনিক প্রথম আলো এই পুরস্কারটিকে ব্যবসায় নোবেলের সমকক্ষ বানানোর জন্যে উঠেপড়ে লেগেছে। বিজনেস ফর পিস ফাউন্ডেশন গঠিত হয়েছে ২০০৭ সালে [৩], এটি পরিচালিত হয় নরওয়ে থেকে। নরওয়ে থেকে নোবেল শান্তি পুরস্কারও ঘোষিত হয়। উকিলের বাড়ির বিড়ালও যেহেতু উকিল হয়, তাই "নরওয়ে" ও "পুরস্কার" শব্দ দুইটি এক বাক্যের মধ্যে থাকায় প্রথম আলো একে "ব্যবসায় নোবেল" হিসেবে চালিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসা বা অর্থনীতিতে লতিফুর রহমানের নোবেলপ্রাপ্তির সম্ভাবনা নেই, কামনা করি তিনি যেন শান্তি বা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মানসপটে গুমরে মরা নোবেলক্ষুধার নিবৃত্তি ঘটান এবং নরওয়ে থেকে পাওয়া যে কোনো টুকিটাকি পুরস্কারকে "অমুক ক্ষেত্রে নোবেল" হিসেবে চালিয়ে দেয়ার বদলেযাউবদলেদাউপনা থেকে মতিউর রহমান ভাইয়াকে উদ্ধার করেন। নরওয়ের জনগণের প্রতিও আহ্বান জানাই, আপনারা বেশি বেশি করে ফাউন্ডেশন স্থাপন করুন, এবং আরো বৈচিত্র্যপূর্ণ ক্ষেত্রে পুরস্কার দিয়ে তৃতীয় বিশ্বের বাহ্বাক্ষুধিত অশিক্ষিত মানুষগুলোকে নাকের পরিবর্তে নরুণ দিয়ে তুষ্ট করুন। "সম্পাদনায় নোবেল", "উপসম্পাদকীয় লেখায় নোবেল", "কলাম লেখায় নোবেল" এবং "কলামের ভেতরে বইয়ের বিজ্ঞাপন লেখায় নোবেল" দেয়ার জন্যে অন্তত পক্ষে আরো চারটি নরওয়েজিয় ফাউন্ডেশন গঠন এখন সময়ের দাবি।
বিজনেস ফর পিস ফাউন্ডেশনের পুরস্কার পর্ষদ আলোকিত করে আছেন আমাদের ঘরের নোবেলপতি ড. ইউনূস স্বয়ং, এবং অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী ড. মাইকেল স্পেন্স। এই ফাউন্ডেশনের পুরস্কার পর্ষদের সদস্য হওয়ার মানদণ্ডই এটি, শান্তি বা অর্থনীতিতে নোবেল জয় করতে হবে। দুই দুইজন নোবেল জয়ী যখন "সততা"র জন্য লতিফুর রহমানকে এই পুরস্কার গছিয়ে দেন, তখন লতিফুর রহমানের সততাকে চ্যালেঞ্জ করার আর কোনো জো থাকে?
লতিফুর রহমান সৎ, নাকি অসৎ, সেটা নিয়ে আমার আপাতত মাথাব্যথা নেই। তবে প্রথম আলোর ঐ খবরে [২] দু'টি আগ্রহোদ্দীপক ব্যাপার চোখে পড়েছে। এক, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা এ উপলক্ষ্যে গান পরিবেশন করেছেন, তুমি কোন কাননের ফুল। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি প্রশ্ন, বিশদ আলোচনার দাবি রাখে বলেই মনে হয়েছে আমার কাছে। আর দুই, ড. ইউনূসের একটি বক্তব্য সে খবরে প্রকাশিত হয়েছে। খবরটিকে সত্য বলে মেনে নিলে, ইউনূস বলেছেন,
"বিজনেস ফর পিস পুরস্কারপ্রাপ্তিতে লতিফুর রহমানকে অশেষ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। এমনিতেই বাংলাদেশের ভাবমূর্তির কথা বললে প্রথমেই চলে আসে দুর্নীতির প্রসঙ্গটি। তার মধ্যে ব্যবসার কথা এলে লোকজন সন্দেহ করে যে, এ থেকে দুর্নীতির সূত্রপাত। সেখানে একজন ব্যবসায়ী সফল হবেন, সততা ও শান্তির জন্য পুরস্কার পাবেন, সেটা জাতির জন্য গৌরবের ও খুশির খবর। জাতিকে এ গৌরবের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য লতিফুর রহমানকে অভিনন্দন।"
বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে, তা জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীও বলেছেন বলে জানিয়েছে প্রথম আলো।
বহির্বিশ্বের কাছে আমরা মুখ দেখাতে পারতাম না, যদি আমাদের একজন ইউনূস আর একজন লতিফুর না থাকতো। তারা কোন কাননের ফুল? কীভাবে তারা বাংলার এই দুর্নীতিসিঞ্চিত মাটিতে গজালেন?
সততার সনদপত্র দিয়ে বেড়ানো ইউনূসকে নিয়ে বিডিনিউজে দেড় বছর আগে একটি খবর [৪] প্রকাশিত হয়েছিলো, যেটি পরবর্তী হট্টগোলের কারণে মানুষের মন থেকে মুছে গেছে প্রায়। এর কৃতিত্বও মিডিয়াকেই দেয়া চলে। সেই খবর অনুযায়ী,
দারিদ্র্য দূর করার জন্য ভর্তুকি হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংককে ১৯৯৬ সালে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেয় ইউরোপের কয়েকটি দেশ। নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির দেওয়া অর্থ থেকে ১০ কোটি ডলারেরও বেশি গ্রামীণ ব্যাংক থেকে গ্রামীণ কল্যাণ নামে নিজের অন্য এক প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নেন ইউনূস। ঢাকার নরওয়ের দূতাবাস, নরওয়ের দাতাসংস্থা নোরাড এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এ অর্থ গ্রামীণ ব্যাংকে ফেরত নিতে চেয়েও পারেনি। ১০ কোটি ডলারের মধ্যে সাত কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণ নামের প্রতিষ্ঠানেই থেকে যায়। এরপর গ্রামীণ কল্যাণের কাছে ওই অর্থ ঋণ হিসেবে নেয় গ্রামীণ ব্যাংক।
আমরা যদি ফিরে যাই গ্রামীণ ব্যাঙ্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ইউনূসের বিবৃতির কাছে, সেখানে দেখি তিনি লিখেছেন,
আমি নিজের উদ্যোগে বহু প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছি। আমার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলির নামের সঙ্গে আমি ‘গ্রামীণ’ নাম ব্যবহার করে এসেছি। এই প্রতিষ্ঠানগুলির বেশির ভাগই হলো ‘মুনাফার জন্য নয়’, এমন প্রতিষ্ঠান। আইন অনুসারে এদের কোনো ‘মালিক’ নেই। কোম্পানি আইনের সেকশন ২৮ দিয়ে বেশির ভাগ কোম্পানিগুলি সৃষ্ট। এগুলিতে শেয়ার বিক্রি করার ব্যবস্থা থাকে না (নন স্টক), এগুলি থেকে কেউ মুনাফা পায় না, যেহেতু কারও এতে মালিকানা নেই, এবং এগুলি স্পনসরদের ব্যক্তিগত গ্যারান্টি দ্বারা সীমিত, অর্থাৎ কোম্পানি দায়দেনা শোধ করতে না পারলে স্পনসররা ব্যক্তিগতভাবে তাদের দেয়া গ্যারান্টি পর্যন্ত অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন। কাজেই এমন প্রতিষ্ঠানে গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা থাকারও প্রশ্ন আসে না। আর কিছু আছে মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান। মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানগুলির মালিক হচ্ছে এক বা একাধিক ‘মুনাফার জন্য নয়’, এমন প্রতিষ্ঠান। এখানেও গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা থাকার কোনো অবকাশ নেই।
দু'টি খবর যদি আমরা মিলিয়ে পড়ি, তাহলে বুঝতে পারি, গ্রামীণ কল্যাণের মালিকানা কোনোভাবেই গ্রামীণ ব্যাঙ্কের হতে পারে না। আর গ্রামীণ ব্যাঙ্কের মালিকানা তো আমাদের দেশের দরিদ্র নারীদের। তার অর্থ হচ্ছে, ইউনূস সেই দরিদ্র নারীদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ সরিয়ে নিয়েছেন মালিকানাহীন একটি প্রতিষ্ঠানে, তারপর সেই প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রামীণ ব্যাঙ্কের মাধ্যমে ঋণ নিয়ে সেই দরিদ্র নারীদের ঘাড়ে ঋণের দায়ও চাপিয়েছেন। অর্থাৎ, দরিদ্র নারীর প্রাপ্য সম্পদকে ইউনূস দরিদ্র নারীর দেনা ও দায়ে পরিণত করেছেন।
এটা কি সততা? এটা কি এথিক্যাল প্র্যাকটিস?
ইউনূস যখন দরিদ্র নারীদের মালিকানাধীন গ্রামীণ ব্যাঙ্ক সম্পর্কে বিভিন্ন জায়গায়, দেশে ও বিদেশে, বিবৃতি দেন, তিনি দুর্নীতি শব্দটি উচ্চারণ করেন বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাঙ্কের বাইরে যে বাংলাদেশ রয়েছে, তার কোলে তিনি অবলীলায় দুর্নীতির ভাবমূর্তি তুলে দেন। ইউনূসের কথা শুনলে মনে হতে পারে, গ্রামীণ ব্যাঙ্ক আর ট্রান্সকম বাদে গোটা বাংলাদেশ দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন। ইউনূস নিজে কি দুর্নীতিমুক্ত? গরিব মহিলাদের সম্পদকে তিনি গরিব মহিলাদের দেনা বানিয়েই ক্ষান্ত হননি, এ প্রসঙ্গ ধামাচাপা দিতে নোরাডের কর্তাদের কাছে চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। সে চিঠিতে [৪] লিখেছিলেন,
১৯৯৮ সালের ১ এপ্রিল লেখা ওই চিঠিতে ইউনূস বলেন, "আপনার সাহায্য দরকার আমার। ... সরকার এবং সরকারের বাইরের মানুষ বিষয়টি জানতে পারলে আমাদের সত্যিই সমস্যা হবে।" নোরাড, ঢাকার নরওয়ে দূতাবাস এবং বাংলাদেশ সরকারের সংশ্ল্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করে।
সেই ইউনূস আবার বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নিয়ে বড়বড় কথা বলেন, সেইসাথে সততার সনদপত্রও দেন একে ওকে।
নিজের বিবৃতিতে ড. ইউনূস অভিমানভরে বলেছেন,
এই তদন্ত কমিশন গঠন করে আমরা একটা রেকর্ড স্থাপন করলাম। নোবেল পুরস্কারের ১১০ বছরের ইতিহাসে মোট ২০টি নোবেলজয়ী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এশিয়ার একমাত্র নোবেল বিজয়ী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের ওপর তদন্ত কমিশন বসিয়ে। আমাদের ইতিহাসে এটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ইউনূস হয়তো বিস্মৃত হয়েছেন, ২০১০ সালে খোদ নরওয়ে সরকারই নোরাডকে দিয়ে গ্রামীণ ব্যাঙ্ক থেকে তহবিল স্থানান্তর বিষয়ে তদন্ত করিয়েছিলো। তখন কি ইউনূস নরওয়ে সরকারের কাছে এই নোবেলজয়ী প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তদন্ত করা নিয়ে কোনো অভিমানজরজর অভিযোগ ঠুকেছিলেন? কোনো পত্রিকায় বিবৃতি পাঠিয়ে নোবেলজয়ী প্রতিষ্ঠানের প্রতি নরওয়ে সরকারের এই নজিরবিহীন তদন্তের মাধ্যমে স্থাপিত রেকর্ড নিয়ে কিছু বলেছিলেন? বলেননি সম্ভবত। বাংলাদেশ তদন্ত করলে মানসম্মান নষ্ট হয়ে যায়, আর নরওয়ে তদন্ত করলে কিছু হয় না?
পৃথিবীতে আর কোনো শান্তিতে নোবেলজয়ী কি গরিব মহিলাদের চেহারা দেখিয়ে চেয়ে আনা টাকা অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করে সেই টাকাকে গরিব মহিলাদের দেনাদায়ে পরিণত করেছেন? যদি না করে থাকেন, জনাব ইউনূস নিজেই একটি রেকর্ড স্থাপন করে বসে আছেন কিন্তু। এই রেকর্ডের জন্যে তাকে সাধুবাদ দিতে পারছি না।
লতিফুর রহমান যে মিডিয়াগোষ্ঠীর মালিক, সে মিডিয়াগোষ্টী ইউনূসের পয়গম্বরীকরণ সম্পন্ন করতে গিয়ে উঠতে বসতে একই কথা পুনরাবৃত্ত করছে, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি খারাপ। আর মুহম্মদ জাফর ইকবাল আর হুমায়ূন আহমেদ সেই মিডিয়াগোষ্ঠীর কাগজে কলম ধরে লিখছেন, ইউনূস একাই বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন। যদি ইউনূস দরিদ্র নারীদের সম্পদকে তাদের দেনায় পরিণত করেন এবং সেই কুকীর্তি ধামাচাপা দেয়ার জন্যে দাতাদের কাছে চিঠিও লিখে থাকেন, আর তার পরও যদি বহির্বিশ্বে তিনি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে চলেন, তাহলে বহির্বিশ্বের বিবেচনাবোধ সম্পর্কে খুব একটা ভরসা পাই না।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল লিখেছেন,
প্রফেসর ইউনূস সারা পৃথিবীর মাঝে একজন অত্যন্ত সম্মানী মানুষ। তিনি শুধু যে ২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তা নয়, কিছুদিন আগে তাকে স্টিভ জবস, বিল গেটস কিংবা গুগল বা ফেসবুকের প্রবর্তকদের মতো সমান কাতারের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আমি তাকে অসম্ভব পছন্দ করি (আশির দশকেই আমি একটা লেখায় তাঁর নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছিলাম) কাজেই তাঁর সম্পর্কে আমার লেখায় যুক্তিতর্ক খুঁজে লাভ নেই! কিন্তু প্রফেসর রেহমান সোবহান তাঁর লেখায় লিখেছিলেন এই মানুষটি সারা পৃথিবীর অল্প কয়েকজন মানুষের ভেতর একজন, যিনি যেকোনো সময় পৃথিবীর যেকোনো রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে টেলিফোন তুলে কথা বলার অধিকার রাখেন, কাজেই বাংলাদেশের উচিত হবে এই অসাধারণ সুযোগটি দেশের মঙ্গলের জন্য গ্রহণ করা।
মুহম্মদ জাফর ইকবালের কথা শুনলে মনে হয়, ইউনূস বাংলাদেশের বাইরের একজন মানুষ, যাকে নিরন্তর স্তব করে বাংলাদেশের মানুষ বিদেশী রাষ্ট্রনায়কদের কাছে টেলিফোন করিয়ে কৃপা প্রার্থনা করবে। বাংলাদেশের মানুষ কি পৃথিবীর যে কোনো রাষ্ট্রনায়কের কাছে আবদারের জন্য লালায়িত? আর ইউনূস নিজের গ্রামীণ ব্যাঙ্কের গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে কবে কোন রাষ্ট্রনায়কের কাছে টেলিফোন করে কী সুবিধা আদায় করেছেন বাংলাদেশের জন্য? আমরা তো দেখি তিনি নিজের তহবিল স্থানান্তরের কথা ধামাচাপা দেয়ার অনুরোধ করে চিঠি লিখতেই ব্যস্ত। আর জাফর ইকবালের লেখায় আমরা যুক্তিতর্ক খুঁজবো না তো কি আমিনীর লেখায় খুঁজবো? রাজনীতি নিয়ে ভাবতে বসে সে লেখায় যুক্তিতর্ক না থাকলে সেই লেখার আদর্শ ব্যবহার হতে পারে মুড়ির ঠোঙ্গা বানানোতে।
ইউনূসের পয়গম্বরীকরণে যারা ব্যস্ত, তারা একটু যেন ব্যাখ্যা করেন, ইউনূসের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাঙ্ক, যার মালিকানা লক্ষ লক্ষ দরিদ্র মহিলাদের হাতে, সেই গ্রামীণ ব্যাঙ্কে দরিদ্র মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব কেমন করে নিশ্চিত করা হয়। নামকাওয়াস্তে কয়েকজন পরিচালক তাদের মধ্যে থেকে নির্বাচিত হয় বলে শুনেছি, কিন্তু সেই পরিচালকেরা ব্যাঙ্কিং সম্পর্কে কতটুকু বোঝেন, বা পরিচালনা পর্ষদে বসে এই ধরনের তহবিল স্থানান্তর গোছের সিদ্ধান্তে দ্বিমত পোষণের জন্যে প্রয়োজনীয় শিক্ষা তাদের রয়েছে কি না, সেটা আমরা জানি না। এ ব্যাপারে তাদের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় কি না, তা-ও জানি না। এ ব্যাপারে কি কেউ আমাকে আলোকিত করতে পারেন?
মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাছে অনুরোধ, যে ব্যক্তিটি যে কোনো সময় পৃথিবীর রাষ্ট্রনায়কদের ফোন মেরে বসতে পারেন, তাঁর সাথে দেখা হলে তিনি যেন এই গরিব, দুর্নীতিগ্রস্ত, বহির্বিশ্বে ভাবমূর্তি সঙ্কটে ভোগা দেশকে কর দেয়ার অনুরোধ করেন। একজন নোবেলজয়ী মানুষ নিজের দেশকে নানা অজুহাতে কর দেয়া থেকে বিরত থাকলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে না, আমি নিশ্চিত। কালের কণ্ঠের এক খবরে [৬] বলছে,
ইউনূসের ব্যক্তিগত আয়কর নথিতে করমুক্ত আয় হিসেবে প্রদর্শিত অর্থের পরিমাণ ৫৪ কোটি ৫৩ লাখ ২৩ হাজার ৫৩৫ টাকা। ইউনূস বিদেশ থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ অর্থ আয় করার দাবি করেছেন এবং বিভিন্ন ব্যাংকে মেয়াদি জমা (এফডিআর) হিসেবে তা রেখেছেন। কিন্তু এনবিআর 'বিদেশে উদ্ভূত আয় কর অব্যাহতি যোগ্য নয়' যুক্তি দেখিয়ে প্রতিবেদনে বলছে, 'ড. ইউনূস যে এসআরওর উল্লেখ করে বিদেশে উদ্ভূত আয়ের ওপর কর অব্যাহতি নিয়েছেন তা আইনানুগ হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় না। মূলত বাংলাদেশি ওয়েজ আর্নারদের আয়কে করমুক্ত করার জন্যই ওই এসআরও জারি করা হয়। তিনি কোনোক্রমেই একজন ওয়েজ আর্নার নন। তাঁর বিদেশে উদ্ভূত আয় বাংলাদেশে উদ্ভূত আয় হিসেবেই গণ্য হবে। যদি তা না হয়, তবে সব রপ্তানিকারকের আয় কর অব্যাহতিযোগ্য হতো। কারণ রপ্তানিকারকের আয়ও বিদেশে উদ্ভূত হয় এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে বাংলাদেশে আসে।'
ইউনূস প্রকৃতপক্ষে কোন কাননের ফুল, আর কোন কেতাবি নন্দন কাননের ফুল হিসেবে তাকে চিত্রিত করলে বাংলাদেশে বিরাজনৈতিকীকৃত সুশীল সমাজের গায়ে চুলকে করা ঘায়ে মলম লাগাতে সুবিধা হয়, সেটা আমরা জানি। ইউনূসকে সামনে রেখে এর আগেও একবার আখের গোছাতে মাঠে নেমেছিলেন যারা, তারা আবার এই লোকটাকে সামনে ঠেলতে চাইছেন। ওনাকে লতিফুর রহমানের মতো শান্তিতে ব্যবসা করতে দিন, সেই ব্যবসা সামাজিক হোক বা না হোক।
সংযোজন:
যারা ইউনূসের তহবিল স্থানান্তর অধ্যায়টি ইতিমধ্যে বিস্মৃত হয়েছেন বা ভুলে থেকে স্বস্তি পেতে চান, তাদের বোঝার সুবিধার্থে শুভাশীষ দাশের "প্রফেসর ইউনূস, গ্রামীণ ও সাম্প্রতিক তথ্যচিত্র" পোস্টটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সেখানে পরিস্থিতির সসূত্র বর্ণনা রয়েছে।

তথ্যসূত্র:

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।