Friday, June 08, 2012

নতুন কিসিমের চাষবাস



আমাদের দেশে নতুন ব্যবসার ধারা শুরু হলে চিনির পাহাড়ের পিঁপড়ার সারির মতো সবাই একযোগে সেই ব্যবসার পেছনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তৈরি পোশাক শিল্প, চিংড়ি চাষ আর আদমব্যবসা লাভজনক বলে এগুলোর স্ফীতি অন্য সব বিবেচনাকে মলিন করে দিয়েছে। শহরাঞ্চলে তৈরি পোশাকের কারখানা গজিয়ে উঠেছে শয়ে শয়ে, কৃষিজমিতে লোনাপানি ঢুকিয়ে চিংড়ির ঘের বানানো হয়েছে, আর শ্রমবাজার বিশ্লেষণের তোয়াক্কা না করে দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে চড়া টাকা আদায় করে তাদের পাঠানো হচ্ছে এমন সব দেশে, যেখানে তাদের জীবিকানির্বাহই এক বিষম দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, দেশে টাকা পাঠানো তো দূরের কথা। এতে করে কিছু লোক প্রচণ্ড লাভবান হচ্ছে, কিছু লোক খেয়ে পরে বাঁচতে পারছে, আবার এই ব্যবসার চাপে নাগরিক পরিবেশ, প্রাকৃতিক পরিবেশ, কৃষিজমি, শক্তি ও জ্বালানি পরিস্থিতি, এসবের সাম্যাবস্থার ছকও আমূল পাল্টে গেছে।
আমাদের দেশ এখন প্রবাসীদের রেমিট্যান্স আর তৈরি পোশাক খাত থেকে আয়ের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। আমাদের দুইটা মাত্র ডিম আমরা একটা থলিতে নিয়ে পৃথিবীতে ধুঁকতে ধুঁকতে চলছি। পুরুষের কাছে পরিস্থিতিটা নতুন কিছু নয়, কিন্তু অর্থনীতিবিদরা মাঝে মাঝে ক্ষীণ কণ্ঠে পণ্যের বহুমুখীকরণের কথা বলছেন। কারণ এই দুই খাতে কোনো কারণে একযোগে সমস্যা দেখা দিলে আমরা বড় বিপদের মুখে পড়বো।
পণ্যের বহুমুখীকরণ আমাদের জন্য সহজ নয়, কারণ আমাদের শক্তি ও জ্বালানি খাতে দুর্বলতা রয়েছে। আমরা জাহাজ নির্মাণ শিল্প নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠছি, কিন্তু এই শিল্পের জন্যেও প্রয়োজন প্রচুর শক্তি। তৈরি পোশাক শিল্পের মতো জাহাজ নির্মাণ শিল্পেও মূ্ল্য সংযোজনের শেষ দুয়েকটি ধাপে আমরা বিচরণ করতে পারি কেবল। আমাদের প্রয়োজন এমন কিছু পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়া, যেটি খুব শক্তিঘন নয়, কিন্তু মূল্য সংযোজন তুলনামূলকভাবে বেশি।
এমন পণ্যের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তিগত পণ্য (বা সেবা) বোধহয় সবচেয়ে আগে মনে পড়ে, কিন্তু এই সেক্টর নিয়ে আমাদের সব সরকারই বিস্ময়কর রকমের উদাসীন। এমনকি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যে উদ্যোক্তারা আছেন, তারাও খুব একটা জোরালো কণ্ঠে সরকারের কাছ থেকে সুবিধা আদায় নিয়ে সরব নন। বিচ্ছিন্নভাবে পরিচিত কয়েকজন উদ্যোক্তাকে নানা বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখেছি, কিন্তু সেগুলো ঠিক শিল্পোদ্যোক্তার সুবিন্যস্ত দাবি হিসেবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কানে যাওয়ার মতো করে উচ্চারিত নয়।
আমি এমন একটি নতুন ধারার পণ্য নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছি, যেটি বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত একেবারেই অস্পৃষ্ট।
চীনের ঐতিহ্যবাহী খাবার হচ্ছে সু্ইফ্ট পাখির বাসার স্যুপ। তারা মনে করে, এই স্যুপ খেলে শরীর ও মনের নানা উপকার হয়। সুইফ্ট একটা ছোট্টো পাখি, তার বাসা সে তৈরি করে টুকিটাকি এটাসেটার সাথে নিজের লালা মিশিয়ে (দলছুট অ্যালার্ট!)। সুইফটের লালা বাতাসের সংস্পর্শে এলে শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়। এই শক্ত লালার পরত দিয়েই পাখিটার বাসা তৈরি। আর এই বাসা গুলিয়ে ঝোল করে খাওয়ার জন্যে চীনের লোকজন এতই ক্ষ্যাপা যে তারা বেশ চড়া দাম দিতে রাজি আছে।
চীনের বিশাল এবং ক্রমশ ধনী হয়ে ওঠা জনগোষ্ঠীর এই পক্ষীনীড়ক্ষুধা মোচনের জন্যেই ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম আর কম্বোডিয়ায় গড়ে উঠেছে সুইফ্টের বাসার চাষের ব্যবসা। মালয়েশিয়া বছরে দেড়শো কোটি ডলারের সুইফটের বাসা রপ্তানি করে চীনে, ইন্দোনেশিয়া করে চুরাশি কোটি ডলারের মতো।
ঝোলবান্ধব বাসা বানায় যে সুইফ্ট (এয়ারোড্রামাস ফুসিফেগাস), সে ঠিক আমাদের দেশের পাখি নয়। এ পাখির আবাস শুরু হয়েছে থাইল্যাণ্ড থেকে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় সমস্তটা জুড়েই তারা থাকে। সুইফ্ট থাকে অন্ধকার গুহার ছাদ আর দেয়ালে বাসা বানিয়ে। পাখিটার পা খুব ছোটো বলে এরা পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারে না, তবে গুহার দেয়াল বা ছাদ খামচে ধরে ঝুলে থাকতে পারে। এ কারণেই মুরগির মতো করে সুইফ্ট পালন সম্ভব নয়, তার জন্যে চাই ওরকম অন্ধকার গুহার অনুকরণে বানানো বাসা। উইকিমিডিয়া কমনসের সৌজন্যে দেখুন ওরকম একটা বাসার ছবি।
ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন ছোটো ছোটো দ্বীপে, গঞ্জ এলাকায় গড়ে উঠেছে এমন শয়ে শয়ে সুইফ্টের বাসা। কংক্রিট দিয়ে কয়েকতালা বাসা বানিয়ে তাতে সুইফ্টকে ভুলিয়েভালিয়ে একবার ভেতরে নিতে পারলেই হলো, এরপর বাকিটা তারাই দেখভাল করবে। পাখির সংখ্যা বাড়ানোর জন্যে চাই ভাবভালোবাসার উপযুক্ত পরিবেশ আর খোরাক। সুইফ্ট খায় নানারকম মাছি আর টুকিটাকি পোকা (লেপিডোপ্টেরা আর ডিপ্টেরা, প্রধানত), তাকে হাঁসমুরগিকোয়েলের মতো খাবারও যোগাতে হয় না। শুধু থাকার ব্যবস্থাটা করে দিলে সে নিজেই মাছি ধরে খেয়ে, বাচ্চাকাচ্চা বড় করে একাকার অবস্থা করে ছাড়বে।
সমস্যা হচ্ছে, সুইফ্ট ঝাঁক বেঁধে বাঁচে। বাড়ির ছাদে খাঁচা বানিয়ে যেভাবে মুরগি বা কোয়েল পালা যায়, সেভাবে সুইফ্ট পালা একটু মুশকিল, প্রথমত ঐ অন্ধকার গুহার মতো একখান ঘরের ব্যবস্থা তাকে করে দিতে হবে, আর দ্বিতীয়ত, সুইফ্টের ডাক বড় তীক্ষ্ন। জ্ঞাতিগুষ্টি সবাই একসঙ্গে যখন ডাকবে সন্ধ্যাবেলা, তখন প্রতিবেশীরা নিশ্চিত এসে সুইফ্টের বাসায় আগুন ধরিয়ে দেবে। সুইফ্ট অন্ধকারে থাকে বলে শব্দের সাহায্যে দিঙনির্ণয় (ইকোলোকেশন) করে, আর সে কারণে শব্দও করে প্রচুর।
সুইফ্টের বাসার দাম চীনের আমদানি বাজারে প্রতি কিলোগ্রাম চারশো থেকে তিন হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত হয় (এক কিলোগ্রাম রূপার দাম আজ নয়শো ঊনিশ মার্কিন ডলার)। ঢাকাসহ বড় বিভাগীয় শহরে যেখানে শহর থেকে একটু দূরে আবর্জনা ফেলা হয়, সেখানে অবধারিতভাবে প্রচুর মাছি থাকে, আর পাখির ডাকে আলাদা করে বিরক্ত হওয়ার লোকও সেখানে খুব বেশি থাকার কথা নয় (একে গন্ধ, তারওপর কাকের শোরগোল), এই ডাম্প এলাকা সুইফ্টের জন্যে এক আদর্শ ফিডিং গ্রাউন্ড হতে পারে। এর আশেপাশেই গড়ে উঠতে পারে সুইফ্টের বাসার আবাদ, অর্থাৎ কংক্রিটের কয়েকতলা ফাঁকা বিল্ডিং, যাতে পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস কিছুই দিতে হয় না।
সুইফ্টের বাসা চাষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যদি বছরে কয়েকশো কোটি ডলার আয় করতে পারে, তাহলে এই মার্কেটে আমরাও ভাগ বসাতে পারি। উৎসাহী কোনো উদ্যোক্তা যদি এগিয়ে এসে কাজটা শুরু করেন, আর লাভের মুখ দেখেন, তার পেছনে পেছনে চিনির পাহাড়ে পিঁপড়ার মতো সারি বেঁধে আরো অনেকেই এগিয়ে আসবেন। শুরুটা করার জন্যে পক্ষীবিদ, পতঙ্গবিদ, চীনবিদ ইত্যাদি নানা বিশারদদের নিয়ে প্রারম্ভিক ব্রেইনস্টর্মিং সেরে নিতে হবে। মালয়েশিয়ায় নতুন উদ্যোক্তাদের জন্যে রীতিমতো প্রশিক্ষণ কোর্স করানো হয়, ইন্টারনেটে দেখলাম, বইপত্রও লেখা হয়েছে সুইফ্টের বাসা চাষের ওপর। এখন শুধু কয়েক জোড়া সুইফ্ট যোগাড় করে কাজ শুরু করার পালা।
নিশ্চয়ই অনেক সমস্যা আছে আমার আইডিয়ায়। মন্তব্যের মাঠে ধরিয়ে দিন প্লিজ।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।