Sunday, May 27, 2012

সাবিয়া সুলতানাদের জন্যে


প্রথম আলোতে একটা খবর পড়ে মনে পড়ে গেলো মালেনা সিনেমাটার কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাহিনী, মালেনার স্বামী যুদ্ধে গেছে, সে শহরে একা। শহরের সব পুরুষ সুন্দরী মালেনার প্রতি লুব্ধ। কিন্তু সামাজিক চাপে মালেনা একঘরে হয়ে পড়ে। তার কাছে কেউ কোনো কিছু বিক্রি করে না। মালেনাকে সামান্য খাবারের বিনিময়ে দেহদান করতে হয় লুব্ধ পুরুষের কাছে। জার্মান সৈন্যরা যখন শহরে আসে, মালেনা দেহোপজীবিনী হয়ে তাদের কাছে যায় জীবিকার তাগিদে, এরই মাঝে তাকে নানা ছুতোয় ভোগ করে চলে শহরের পুরুষেরা। জার্মান সৈন্যেরা চলে যাওয়ার পর নগরের বিবাহিতা নারীরা মালেনার ওপর চড়াও হয়, তাকে মারধর করে তাড়িয়ে দেয়। এরই মাঝে ফিরে আসে মালেনার স্বামী, সে যুদ্ধে পঙ্গু। সে এসে খুঁজতে থাকে তার স্ত্রীকে, শহরের সবাইকে অভিসম্পাত করে, এক পর্যায়ে প্রহৃত হয় সে-ও। কিন্তু সে হাল ছাড়ে না, খুঁজে বের করে ফিরিয়ে আনে মালেনাকে, দু'জনে হাত ধরাধরি করে মাথা উঁচু করে হেঁটে যায় বাজারের মাঝ দিয়ে। মালেনাকে আবারও কারো মালিকানায় দেখতে পেয়ে লম্পট স্বামীর স্ত্রীরা নিশ্চিন্ত হয়, তারা মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করে, শুভেচ্ছা জানায়। গোটা সিনেমাটি দেখানো হয় এক বয়োসন্ধি উত্তীর্ণ কিশোরের চোখে, যার চোখে মালেনা এক অধরা যৌনতার প্রতীক। শহরের সবাই যখন মালেনাকে কামনা করে, একমাত্র সেই কিশোরটিই মালেনাকে ভালোবাসে।
প্রথম আলোতে ছাপা খবরটা পড়ে মন খারাপ লাগছে কয়েকটি কারণে। এক কিশোরী নির্জনে আরেক কিশোরের সাথে ঘনিষ্ট হয়েছে, সেই কিশোর এই ইন্টিমেসির মূল্য দিতে জানে না বলে সেই দৃশ্যগুলো মুঠোফোন আর ইন্টারনেট প্রযুক্তির হাত ধরে চলে গেছে বহু মানুষের কাছে। এর জের ধরে মেয়েটিকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়েছে।
আমাদের দেশে পাঠ্যক্রমে যৌন শিক্ষার কোনো স্থান নেই। ফলে এ সংক্রান্ত শিক্ষা আসে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট অথবা বহুলাংশে অপ্রীতিকর বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে। যৌনতার অবদমনই আমাদের দেশে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য পথ, এবং তার বিচ্যুতিকে সামাজিকভাবে শায়েস্তা করাকেই প্রশস্ত বলে ধরে নেয়া হয়। আর এর ঘানি মেয়েদেরই টানতে হয়।
প্রথম আলোতে জানানো হয়েছে,
বাগেরহাট আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুখার্জি রবীন্দ্রনাথ জানান, ৪ এপ্রিল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় ওই ছয়জন শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের ডাকা হয়। পাঁচজন অভিভাবকের উপস্থিতিতে ওই ছয় শিক্ষার্থীকে প্রাক্-নির্বাচনী পরীক্ষা ও নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নিতে অভিভাবকদের সঙ্গে বিদ্যালয়ে আসতে বলা হয়। এ ছাড়া তাদের স্কুলে না আসার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তার মানে, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা ঐ শারীরিক ঘনিষ্টতার দৃশ্যগুলো দেখে সিদ্ধান্তে এসেছেন, এই ঘটনার পাত্রপাত্রীদের সামাজিকভাবে "শাস্তি" দিতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে বসে যৌনাভিচার চালানো বিশৃঙ্খলার মধ্যেই পড়ে, তার শাস্তি নিশ্চয়ই দেয়া যেতে পারে, কিন্তু সে শাস্তি কি অস্ট্রাসিজম বা জনবিচ্ছিন্নকরণ হতে পারে? স্কুল কর্তৃপক্ষ এখানে যা বিবেচনায় আনেননি, তা হচ্ছে, তারা নিজেরাই ডাইনিশিকারের সূচনা করলেন। এই কাজটিকে অভিভাবকরাও সমর্থন করেছেন।
এরপর ঘটনাটিকে আরো বহুদূর টেনে নিয়েছেন দুই সাংবাদিক। প্রথম আলো লিখেছে,
১৫-২০ দিন আগে বাড়িতে গিয়ে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আবদুর রব ও রিফাত আল মাহমুদ বলেন, ‘আপনার মেয়ের আপত্তিকর কিছু ছবি আমাদের কাছে আছে। আমরা এ বিষয়ে তার সাক্ষাৎকার নিতে চাই।’ তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি না হলে তাঁরা কয়েকটি সংবাদপত্রে ও টেলিভিশনে মেয়ের এ ঘটনা প্রকাশ করার হুমকি দিয়ে চলে যান। মেয়েটি ঘরের ভেতর থেকে সাংবাদিকদের সব কথা শুনেছিল। এর পর থেকে সে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়। গত বৃহস্পতিবার স্যাভলন পান করে আত্মহত্যা করে।
কোনো কিশোরের সাথে কোনো কিশোরীর ঘনিষ্ট হওয়ার ব্যাপারটি ঠিক কী বিবেচনায় সংবাদপত্র বা টেলিভিশনে আসতে পারে? কারো আপত্তিকর ছবি কোনো সাংবাদিকের হাতে এলে এ নিয়ে সাক্ষাৎকার নেয়ারই বা কী আছে? রাস্তার ধারে কারো প্রস্রাব করার দৃশ্যটিও আপত্তিকর, এই নিয়ে কোনো ছবি তো মুঠোফোনে ছড়ায় না, কিংবা সাংবাদিকরাও সাক্ষাৎকার নিতে যান না? ঐ দুই সাংবাদিক মেয়েটিকে আরো হেনস্তা করতেই গিয়েছেন, কারণ মেয়েটির ছবিটির পর্নোগ্রাফিক আবেদন রয়েছে। তার ছবিটি প্রকাশ না করেও তাকে পর্নোগ্রাফির উপকরণ হিসেবে সমাজের কাছে উপস্থাপন করা সম্ভব। মেয়েটিকে শুধু তার স্কুলের শাস্তি বা অভিভাবকের শাস্তিতে এই দুই সাংবাদিক সন্তুষ্ট ছিলো না, তারা মেয়েটিকে মালেনার মতো করে বাজারে টেনেহিঁচড়ে এনে সকলের সামনে উন্মুক্ত করে দিয়ে শাস্তি দিতে চেয়েছে। মেয়েটির অপরাধ, বা সমাজের চোখে "পাপ" হচ্ছে ভিকটিম হওয়া।
প্রথম আলো বলছে,
সাবিয়া তাকে বলে, ‘ঘটনার জন্য দায়ী ছেলেদের বাড়ি সাংবাদিক যায় না, আমার বাড়িতে সাংবাদিক আসে। আমি কোথাও বের হতে পারি না। বাড়ির মধ্যেও অনেক কথা শুনতে হয়। আমি আর পারছি না। আমার মনে হয় মরে যাওয়াই ভালো।’ ওই বান্ধবী সাবিয়াকে অনেক বুঝিয়ে চলে যায়। এর কিছুক্ষণ পরই স্যাভলন পানে আত্মহত্যা করে সাবিয়া।
পর্নোগ্রাফিক দৃশ্যে একটি ছেলের উপস্থিতি নিয়ে আমাদের সমাজের কোনো মাথাব্যথা নেই, ঐ ছেলেগুলো সে কথা জানে বলেই তারা নিশ্চিন্ত মনে সে দৃশ্য ছড়িয়ে দিয়েছে। তারা জানে, স্কুল বা অভিভাবক তাদের শাস্তি দিলেও, সমাজ এসে তাদের কিছু বলবে না। তারা হয়তো তাদের অন্য বন্ধুদের কাছে বাহ্বাই পাবে এমন মর্দাঙ্গি দেখানোর জন্যে। মেয়েটাকে শুধু একঘরে হলেই চলবে না, তাকে আবার সেই ঘর থেকে টেনে বের করে অযুতজনের সামনে আবার উন্মোচন করা হবে, মিডিয়ার কল্যাণে।
সাংবাদিক সংগঠনের সদস্যেরা সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের পর পত্রিকায় তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে কিছু আপত্তিকর লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর পত্রিকায় কলম ধরেছিলেন, মানববন্ধন করেছিলেন, অনেক শোরগোল করেছিলেন। তারা কি এই বাচ্চা মেয়েটার আত্মহননের পেছনে নিজেদের গোষ্ঠীর সদস্যদের ইন্ধন বা দায়ের কথা স্বীকার করে একটা অ্যাপোলজি নোট দিতে পারবেন? কোথাও মানববন্ধন করে বলতে পারবেন, তারা লজ্জিত?
মানুষ কত প্রবল সম্ভাবনা নিয়ে পৃথিবীতে আসে। মানুষ দুর্গম মরুভূমিতে বসে দূরবীণে চোখ রেখে সহস্র আলোকবর্ষ দূরের তারার কাছে গ্রহের সন্ধান করে একদিন সেখানে পা রাখার আশা নিয়ে, পৃথিবীর হৃদস্পন্দন শুনতে সাগরের গভীরতম খাদে নেমে পড়ে ছোট্ট ডুবোজাহাজে ঢুকে, উন্মত্ত বিশাল উল্কাপিণ্ড থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র জীবাণুর হাত থেকে অন্য মানুষকে রক্ষার জন্যে নিজের সবটুকু সময় ব্যয় করে, কেন করে? মানুষের কাছে মানুষের প্রাণের মূল্য আছে বলে। আমাদের দেশের মানুষ ক্রমশ এই মূল্য দিতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ছে। যে কিশোরী সাংবাদিকের ভয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিলো, সে কিন্তু এই ক্রমহ্রাসমান মূল্যের কথাই আবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেলো আমাদের। আর তার এই আত্মহননের সংবাদ তার মতো আরো অনেক কিশোরীর কাছে একটি মেসেজই বহন করবে, এমন কিছু যদি তাদের ক্ষেত্রে ঘটে, সমাধান এটিই। স্কুল-অভিভাবক তাদের আড়াল করতে চাইলেও সাংবাদিক এসে তাকে পুনরায় উলঙ্গ করতে চাইবে,তখন বাঁচতে হলে তাকে মরতে হবে।
মানুষের জীবন অনেক বড়। কোনো ছবি তার জীবনের চেয়ে বড় নয়। যারা ছবিকে জীবনের চেয়ে বড় করে দেখাতে চায়, তারা মানুষ নয়। ঐ দুই সাংবাদিকের শাস্তি চাই। আর এই বাচ্চা ছেলেমেয়েদের পাশে তার স্কুল আর অভিভাবকরা এসে দাঁড়ান প্লিজ, তারা আপনাদের শিক্ষা, দিকনির্দেশনা আর সহযোগিতা দাবি করে।

সংযোজন: বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল অ্যাক্ট, ১৯৭৪ এর ধারা ১১ এর উপধারা ২ এর গ অংশে প্রেস কাউন্সিলের উদ্দেশ্যে ও কার্য সম্পর্কে বলা হয়েছে [সূত্র],
to ensure on the part of newspapers and news agencies and journalists the maintenance of a high standard of public taste and to foster a due sense of both the rights and responsibilities of citizenship;
কোনো মানুষের "আপত্তিকর দৃশ্য" জনরুচির উচ্চমানের মধ্যে পড়ে কি না, কিংবা নাগরিকের অধিকার ও দায়িত্বের যথাযথ বোধ জাগিয়ে তোলে কি না, তা নিয়ে মাননীয় প্রেস কাউন্সিল কি স্বতপ্রণোদিত হয়ে সাংবাদিকদের কোনো সবক দেবেন? মনে হচ্ছে এ ব্যাপারে কোনো ধরনের শিক্ষা ছাড়াই অনেকে সাংবাদিকতা পেশায় সক্রিয় আছেন।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।