Saturday, May 26, 2012

গোয়েন্দা ঝাকানাকা ও পিসুনচ্ছাড় রহস্য



১.
গোয়েন্দা বিভাগের দারোগা কিংকর্তব্যবিমূঢ় চৌধারি কচমচ করে মুড়িমাখা খেতে খেতে বললেন, "বলছি স্যার। মুড়িটা চিবিয়ে নিই আগে। আহ, বড় ভালো মুড়ি! চানাচুরটাও সাংঘাতিক! এই যে আচারের তেলটা, এর কোনো তুলনাই হয় না স্যার। শসাটা কোত্থেকে কিনে আনা?"
ঝাকানাকা চায়ের কাপে প্রলম্বিত এক চুমুক দিয়ে আড়চোখে কিংকু চৌধারির মুড়ির বাটির দিকে তাকিয়ে বললেন, "আর মুড়ি নেই কিন্তু। চানাচুরও শেষ।"
কিংকু চৌধারি মুখ কালো করে অবশিষ্ট মুড়িমাখা চেটেপুটে খেতে খেতে বললো, "আপনার বাড়ি এলে সবসময় এই ছোট্টো একটা বাটিতে করে মুড়িমাখা খেতে দেন স্যার ... আপনাকে সামনের জন্মদিনে বড় একটা প্লাস্টিকের বোল কিনে দেবো ভাবছি। অতিথি আপ্যায়নে খুব কাজে লাগে।"
ঝাকানাকা চুরুটের গোড়ায় টান দিয়ে বললেন, "কাজের কথায় আসুন। একটু পরই টেলিভিশনে ছায়াছন্দ শুরু হবে।"
কিংকু চৌধারি জিভ দিয়ে বাটিটা যতদূর চাটা যায়, চেটে নিয়ে হতাশ গলায় বললো, "পরিস্থিতি খুব খারাপ স্যার! বদমাশ বদরু এবার একেবারে মন্ত্রীদের বাড়িতে গিয়ে হানা দিয়েছে। ওপরমহল থেকে প্রচণ্ড চাপ এসেছে স্যার। বদরুকে পাকড়ে টাইট দিতে না পারলে চাকরি থাকবে না স‌্যার। কিংবা বান্দরবানে বদলি করে দিতে পারে।"
ঝাকানাকা চায়ের কাপে আরেকটা চুমুক দিয়ে বললেন, "বান্দরবান খারাপ কী?"
কিংকু চৌধারি মন খারাপ করে বললো, "বান্দরবানে রেডিও ঝাঞ্জাইল শোনা যায় না স‌্যার। বার্মিজ রেডিওর চ্যাঁ-ভ্যাঁ শোনা যায় শুধু।"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমম, তাহলে তো বদরুকে পাকড়াও করতেই হচ্ছে! কী করেছে সে এবার? মন্ত্রীর বাড়িতে লুটপাট?"
কিংকু চৌধারি মুখ কুঁচকে বললো, "না স্যার, তারচেয়েও ভয়ানক!"
ঝাকানাকা বললেন, "কীরকম?"
কিংকু চৌধারি চেয়ারে হেলান দিয়ে হাত পা ছড়িয়ে বসে বললো, "দূতাবাস পাড়ায় একটা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স আছে স্যার, নমরুদ প্যালেস। নাম শুনেছেন?"
ঝাকানাকা বললেন, "না। কী হয় সেখানে?"
কিংকু চৌধারি বললো, "মন্ত্রী গিজগিজ করছে স্যার সে বাড়িতে। চারজন মন্ত্রী আর একজন জেনারেল ওখানে থাকেন স্যার!"
ঝাকানাকা বললেন, "এতগুলো মন্ত্রী এক জায়গায় বাস করা কি ভালো? তার ওপর সঙ্গে আবার একটা জেনারেল?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "তা জানি না স্যার। কিন্তু বাস করলে আমরা কী করতে পারি বলুন?"
ঝাকানাকা বললেন, "হুঁ, তারপর?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "বাড়িটা স্যার, সাততলা। নিচতলায় গ্যারেজ, দোতলায় কমন রুম, আর বাকি পাঁচ তলায় এরা পাঁচজন থাকেন, সপরিবারে। বদরু খাঁ এত্তোবড়ো বদমাশ, সে এই বাড়িতে ঢুকে পিসু করা শুরু করেছে স্যার!"
ঝাকানাকা ভুরু কুঁচকে চুরুটে কামড় দিয়ে বললেন, "বলেন কী! মন্ত্রীদের গুহায় ঢুকে মুতে এসেছে?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "হ্যাঁ স্যার!"
ঝাকানাকা বললেন, "বিস্তারিত বলুন, দিনতারিখসহ।"
কিংকু পকেট থেকে একটা নোটবুক বার করে বললেন, "ঘটনা শুরু হয়েছে স্যার সতেরো দিন আগে। সেদিন জেনারেল সাহেবের মেয়ে সুইমিং পুলে সাঁতরাতে নেমে স্যার, এই পিসুর কবলে পড়ে। কে বা কাহারা সুইমিং পুলে পিসু করে রেখেছে।"
ঝাকানাকা বললেন, "স্টপ। সুইমিং পুলে নেমে পিসু তো যে কেউ করতে পারে। এ তো আকচারই হচ্ছে। বদরুই যে এ কাজ করেছে,তার প্রমাণ কী?"
কিংকু বললেন, "জেনারেল সাহেবের মেয়ে পানিতে নেমেই বদ গন্ধ পেয়ে তড়িঘড়ি করে উঠে এসে দ্যাখে, একটা প্লাস্টিকের এক গ্যালনের খালি ক্যান সুইমিং পুলের পাশে। সেটার গায়ে একটা স্টিকি নোট। তাতে লেখা, বদরু খাঁ-র পিসু, বাজারের সেরা পিসু!"
ঝাকানাকা বললেন, "বটে? বদরু এসব শুরু করেছে আজকাল?"
কিংকু বললেন, "হতভাগার সাহস কতবড়, ভাবুন একবার? গ্যালনভর্তি পিসু নিয়ে উল্টে দিয়েছে পুলে! তারপর কী করেছে শুনুন, তার দুদিন পর, পানিসম্পদ মন্ত্রী আড়িয়াল খানের গাড়ির ভেতরে একেবারে ছ্যাড়াব্যাড়া করে পিসু করে দিয়ে এসেছে স্যার। মন্ত্রীসাহেব দরজা খুলেই দেখেন এই অবস্থা। ভেতরে একটা চিরকুট ফেলে গেছে হতভাগা। তাতে লেখা, "নহে নহে প্রিয়, এ নয় আঁখিজল! ইতি বদরু খাঁ।"
ঝাকানাকা চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, "আচ্ছা! তা সুইমিং পুলে পিসুর ঘটনার পরপরই জেনারেল সাহেব পুলিশে খবর দেননি কেন?"
কিংকু বললেন, "জেনারেল সাহেবের লাইসেন্স করা বন্দুক পিস্তল আছে স্যার। উনি নিজেই সেসবে গোলাবারুদ ভরে একটু পর পর সুইমিং পুল এলাকায় হানা দিচ্ছিলেন। ওনার ভয়ে মন্ত্রীদের ফ্যামিলির লোকেরাও সুইমিং পুলের আশেপাশে ঘেঁষা বন্ধ করে দিয়েছিলো। বোঝেনই তো স্যার, রিটায়ার্ড মিলিটারি ম্যান, কমাণ্ডোপনা করে অভ্যাস, একটা মারপিটের মওকা পেলে সহজে হাত থেকে ছাড়তে চান না, পুলিশের কাজ পুলিশকে করতে দিতে চান না মোটেও।"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমম! তারপর?"
কিংকু বললেন, "তারপর আর কী, আড়িয়াল খানের গাড়ি বিএমডব্লিউ কোম্পানির ডিলারের কাছে নিয়ে গিয়ে ইশপিশাল ধোলাই করে আনা হয়েছে। কিন্তু এ তো আর কালো টাকা নয় যে সাদা করে ফেললে খুশিমনে যখন খুশি ব্যবহার করা যায়। আড়িয়াল খানের বউ নতুন একটা বিএমডব্লিউ কিনে দিতে খুব ঘ্যানাচ্ছেন।"
ঝাকানাকা বললেন, "বদরু তারপর কী করেছে সেটা বলুন।"
কিংকু নোটবুকের পাতা উল্টে বললেন, "এর তিনদিন পরের ঘটনা স্যার। লিফটের ভেতরে কে বা কাহারা পিসু করে রেখে গেছে। লিফটের গায়ে একটা স্টিকি নোট রেখে গেছে, "উমমমমমমমমিষ্টি একটা গন্ধ রয়েছে ঘরটা জুড়ে। ইতি বদরু খাঁ।"
ঝাকানাকা গোঁফে তা দিতে দিতে বললেন, "হুমমম! তারপর?"
কিংকু বললেন, "তারপর থেকে এই কাজ আরো কয়েকবার হয়েছে স্যার। দুই তিনদিন পর পর কে বা কাহারা লিফট ভাসিয়ে পিসু করে রেখে যায়। আর প্রত্যেকবারই একটা স্টিকি নোট রেখে যায়। সেখানে বিদঘুটে সব নোট লেখা স্যার। এই যে শুনুন ... ঘন ঘন রিম্ ঝিম্ রিম্ ঝিম্ রিম্ ঝিম্ বরখত নীরদপুঞ্জ। ইতি বদরু খাঁ। ... তারপর দেখুন কী লিখে রেখে গেছে নচ্ছাড়টা, লিখে রেখো এক ফোঁটা দিলেম শিশির। ইতি বদরু খাঁ। ... তারপরে আবার, গতকাল পাওয়া গেছে আরেকখান ... ঝম্পি ঘন গর্জন্তি সন্ততি ভুবন ভরি বরিখন্তিয়া। বদরু খাঁ কহ কৈছে গোঙায়বি হরি বিনে দিন রাতিয়া। ... আস্পর্ধাটা চিন্তা করে দেখেছেন স্যার?"
ঝাকানাকা ভুরু সাংঘাতিক কুঁচকে বললেন, "বদরু আজকাল বৈষ্ণব পদাবলীও পড়ছে নাকি? কিংকু সাহেব, নোট করে রাখুন তো ব্যাপারটা। বদরু সামনে কবির ছদ্মবেশে হানা দিতে পারে। আর ফেসবুকে দেখবেন কেউ ব্রজবুলিতে বুকনি ঝাড়ছে কি না। সেরকম আলামত দেখলে নামটা টুকে রেখে খোঁজখবর করবেন।"
কিংকু নোটবই পকেটে গুঁজে বললেন, "এখন একটা কিছু করুন স্যার। চার চারজন মন্ত্রী যেভাবে হুড়ো দিচ্ছে বসদের, আর বসেরা যেভাবে হুড়ো দিচ্ছে আমাকে, চাকরিবাকরি নিয়ে পেরেশানিতে আছি।"
ঝাকানাকা বললেন, "কিন্তু এতো দিন হয়ে গেলো, মন্ত্রীরা কিছু বললো না কেন?"
কিংকু ডানে বামে তাকিয়ে আশপাশটা ভালোমতো দেখে নিয়ে সামনে ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বললেন, "স্যার, মন্ত্রীরা পারতপক্ষে আজকাল পুলিশের কাছে যেতে চায় না। এসব খবর তো চাপা থাকে না। চলে যায় সাংবাদিকদের কাছে। আর বোঝেনই তো। বদরু খাঁ মন্ত্রীদের বাড়িতে গিয়ে লিফটে পিসু করে আসছে, এমন খবর কাগজে এলে বিরাট রাজনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে! সে কারণেই বোধহয় ওনারা এতদিন নিজেদের মতো করে ব্যাপারটা সামলানোর চেষ্টা করে আসছিলেন।"
ঝাকানাকা বললেন, "কীরকম সংকট?"
কিংকু চৌধারি আরো এক ধাপ ফিসফিসিয়ে বললেন, "জানেনই তো স্যার, ঐ যে কিছুদিন আগে এপিএস টাকার বস্তাসহ ধরা পড়ে একটা কেলেঙ্কারি হয়ে গেলো না? এখন যদি পেপারে টিভিতে স্যার বদরুর লিকেজের খবরটা লিকেজ হয়ে যায়, এটা নিয়ে কে কীরকম বিশ্লেষণ করে, সেটা নিয়ে মন্ত্রীরা খুব দুশ্চিন্তায় আছে। কোথাকার জল কোথায় গড়ায় ... হেঁহেঁহেঁ, বুঝতেই পারছেন স্যার! তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও কেউ খুশি নয়। খোদ মন্ত্রীদের বাড়িতে দুর্ধর্ষ দস্যু বদরু খাঁ নির্বিঘ্নে মুতে সটকে পড়ছে, এমন একটা খবর পাঁচকান হলে প্যানিক ছড়াতে পারে তো।"
ঝাকানাকা নতুন চুরুটে আগুন ধরিয়ে বললেন, "হুমমম! তা কী মনে করে মন্ত্রীরা শেষমেশ পুলিশকে খবর দিলো?"
কিংকু মাথা চুলকে বললেন, "মনে হয় ঐ জেনারেল সাহেবের চাপে স্যার। উনি মারাত্মক চটে আছেন। উনি থাকেন একেবারে টপফ্লোরে। ভোরে উঠে জগিং করতে নামার সময় লিফট খুলেই দেখেন পিসু আর বদরুর নোট। উনিই বোধহয় মন্ত্রীদের হুড়ো দিয়ে পুলিশকে খবর দিয়েছেন।"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমম। বেশ। চলুন, কাল শুক্রবার, সকালে যাবো নমরুদ প্যালেসে, সবাইকে থাকতে বলে দিন। আজ আপনি আসুন বরং, ছায়াছন্দ শুরু হয়ে গেছে।"
২.
নমরুদ প্যালেস প্রকাণ্ড বাড়ি। তার এক পাশে আবার বিস্তৃত টেনিস কোর্ট আর সুইমিং পুল। কিংকু চৌধারির গাড়ি থেকে নেমেই ঝাকানাকা সেই সুইমিং পুলের দিকে এগিয়ে গেলেন।
গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পরা মস্ত গুঁফো এক লোক হাতে একটা শটগান নিয়ে সুইমিং পুলের কিনারে পা ফাঁক করে এদিক সেদিক তাকাচ্ছিলেন, কিংকু চৌধারি আর ঝাকানাকাকে দেখে তিনি এগিয়ে এলেন।
"আপনিই নিশ্চয়ই গোয়েন্দা ঝাকানাকা!" বাজখাঁই গলায় বললেন তিনি। "আমি জেনারেল হিম্মত জং কামানী।"
ঝাকানাকা করমর্দন করে সতর্ক চোখে জেনারেলকে আপাদমস্তক দেখলেন। "আপনি বন্দুক হাতে কী করছেন জেনারেল?"
জেনারেল কামানী চোখ পাকিয়ে কিংকু চৌধারির দিকে তাকিয়ে বললেন, "কিপিং ভাইজিল অন মাই গ্রাউন্ডস স্যার! পুলিশের ওপর আমি ভরসা করি না। কোনো ডিসিপ্লিন নেই তাদের। দুর্নীতি ছাড়া আর কোনো কাজই তারা ঠিকমতো করতে জানে না। লুক অ্যাট ইয়োর সাইডকিক মিস্টার ঝাকানাকা! দেখুন, বুটের অবস্থা দেখুন, হারিকেনের চাঁদিতে ওরচেয়ে বেশি কালি থাকে। ফিতার প্যাঁচটা দেখুন, কোনো কারুকার্য নেই। বেল্টের বাকলস দেখুন, কয়দিন ঘষে না কে জানে! ইউনিফর্মে বোতামগুলো দেখুন, হদ্দ ময়লা! চোর বদমাশ ডাকুরা এদের ভয় পাবে কীভাবে?"
কিংকু চৌধারি কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, "আমি ... মানে, ইয়ে, হেঁহেঁহেঁ ...!"
জেনারেল কামানী গর্জে উঠলেন, "স্টপ স্নিগারিং মিস্টার পোলিসম্যান! আমাকে দেখুন। আমার বয়স পঁয়ষট্টি। লুক অ্যাট মাই জুতা। দেখুন কী চমৎকার গিট্টু, দেখুন! ইউ ক্যান টেইক আ পিকচার অফ দিজ জিলাপির প্যাঁচেজ অ্যান্ড ইউজ ইট অ্যাজ ইয়োর উইপন অ্যাগেইনস্ট মিসক্রিয়্যান্টস! লুক অ্যাট মাই হাপ্প্যান্ট! ইলাস্টিক আছে তারপরও দেখুন কী সুন্দর একটা বাকলস লাগানো বেল্ট পরি, দেখুন। লুক অ্যাট মাই গেঞ্জি, অ্যান্ড দৌজ টু শাইনি বাটনস!"
ঝাকানাকা আড়চোখে জেনারেলের শটগানের দিকে তাকিয়ে বললেন, "আপনি আছেন বলেই বদরু খাঁ বেশি উৎপাত করতে পারছে না, নইলে সে রোজই ঘন্টায় ঘন্টায় পিসু করে যেতো।"
জেনারেল কামানী সগর্বে বললেন, "ইনডিড! আমি বুড়া মানুষ। আমি তো সারাক্ষণ বাড়ি পাহারা দিতে পারবো না। ওটা আমার কাজও নয়। আমি যখনই আশেপাশে না থাকি, তখনই দ্যাট ড্যাম ড্যাকয়েট এসে মুতে রেখে যায়। ইটস অল বিকজ অব দিজ মিনিস্টারস। এদের কোনো ডিসিপ্লিন নেই। ডিসিপ্লিন থাকলে বদরু পিসু করার সাহস পেতো না। হি উড হ্যাভ গন টু সাম রিমোট প্লেইস টু রিলিভ হিমসেল্ফ! প্রোবাবলি টু আ থানা!"
কিংকু চৌধারি ম্রিয়মান গলায় বললেন, "স্যার, বদরুর নোটগুলো একটু দেখাবেন ঝাকানাকা স্যারকে?"
জেনারেল কামানী বললেন, "অফকোর্স! আমি সব কয়টা ফাইলে যত্ন করে রেখে দিয়েছি অ্যাজ এভিডেন্স! আপনাদের এই বদরু, শুধু পিসু করে গেলে আমি খুব বেশি রাগ করতাম না। বাট দৌজ নোটস ... পড়লে মাথা ঠাণ্ডা রাখা খুব মুশকিল। ইট উইল পিস ইউ অফ! নট ওনলি হি ইজ পিসিং অন আজ, বাট অলসো পিসিং আজ অফ! আমি একে ধরতে পারলে টানটান করে বেঁধে ন্যাংটা করে চাবকাবো।"
ঝাকানাকা আশপাশটা মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন গোঁফে তা দিতে দিতে, তিনি বললেন, "অবশ্যই চাবকাবেন। এই দেয়ালগুলোতো বেশ উঁচু দেখছি। মাথায় আবার চোখা কাঁচ বসানো। টপকে ভেতরে ঢোকা বেশ কঠিনই, কী বলেন জেনারেল?"
জেনারেল কামানী হাসিমুখে বললেন, "অবশ্যই! কমাণ্ডো বাহিনীর মেজর আটরশির নাম শুনেছেন? দেশের সেরা কমাণ্ডো সে। আটরশিও এসে এই দেয়াল টপকাতে গিয়ে হিমসিম খেয়েছে। আপনাদের বন্ধু, এই বদরু খাঁ, সে কি কমাণ্ডো ট্রেনিং নিয়েছে কোথাও?"
ঝাকানাকা ভুরু কুঁচকে বললেন, "হ্যাঁ, সে গোটা দুনিয়া জুড়েই নানা বদমায়েশি করে বেড়ায়। কিন্তু এই দেয়াল টপকাতে গেলে তো দারোয়ানের চোখে পড়বেই, তাই না?"
জেনারেল কামানী বললেন, "হ্যাঁ। তার ওপর এরা কোনো সাধারণ দারোয়ান নয়, দেশের টপ বেসরকারী সিকিউরিটি সার্ভিসের লোক। কিন্তু এরা বলছে এরা কাউকেই ভেতরে ঢুকতে দেখেনি।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "আমরা শুরুতেই সিকিউরিটির লোককে জেরা করেছি স্যার। ওরা বাইরের কোনো লোককেই অনুপ্রবেশ করতে দেখেনি। দেখলে গুলি করে দিতো।"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমমম! এই বাড়িতে বাইরের কোনো লোক আসে না?"
জেনারেল কামানী বললেন, "বাইরের লোক বলতে একমাত্র আমার মেয়ের হাউস টিউটর। হি ইজ আ নাইস ক্লিন ডিসিপ্লিনড চ্যাপ। তবে আপনারা চাইলে ইউ ক্যান কুইজ হিম এনি টাইম ইউ ওয়ান্ট।"
ঝাকানাকা বললেন, "মন্ত্রীদের বাড়িতে বাইরের কোনো লোক আসে না?"
জেনারেল কামানী ডানেবামে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "ঐ যে এপিএস বস্তাসহ ধরা পড়লো, মনে আছে? এরপর থেকে মিনিস্টাররা খুব সাবধান হয়ে গেছে। বাড়িতে বাইরের লোককে এরা কেউই ঢুকতে দেয় না, এমনকি সরকারী লোককেও না। হেহেহে, আমরা জেনারেলরা সেদিক দিয়ে একটু নিশ্চিন্তে থাকি।"
কিংকু চৌধারি বললেন, "আপনাদের বস্তা কে নিয়ে আসে স্যার?"
জেনারেল কামানী চোখ পাকিয়ে বাঘা গলায় বললেন, "হোয়াট আর ইউ ড্রাইভিং অ্যাট মিস্টার পোলিসম্যান? আমরা জেনারেলরা ওসব বস্তার কারবার করি না! বস্তায় কোনো ফিতা থাকে না, কোনো বাকলস থাকে না, কোনো বোতাম থাকে না! মোস্ট আনকুথ টুল ডু ডিল উইথ মানি।বস্তা নিয়ে ঘোরে সিভিলিয়ানরা। যত্তোসব!"
ঝাকানাকা দেয়ালের পাশে টবে পাতাবাহার গাছ দেখছিলেন মন দিয়ে, তিনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, "এই গাছগুলোর গোড়ায় সাদা রং কেন?"
জেনারেল কামানী বিস্মিত হয়ে বললেন, "কেন মিস্টার ঝাকানাকা? গোড়ায় সাদা রং ছাড়া গাছ হয় নাকি?"
ঝাকানাকা জেনারেল কামানীকে আড়চোখে আবার আপাদমস্তক পরখ করে বললেন, "হুমমম, তাও তো কথা। কে করেছে এই রং?"
জেনারেল কামানী বললেন, "আমার আর্দালি। আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারক করেছি। ইউ উওন্ট ফাইন্ড আ সিঙ্গল প্ল্যান্ট ইন দিস কমপ্লেক্স উইদাউট দিস বিউটিফুল ডেকোরেশন। ইটস আ সিম্বল অব ডিসিপ্লিন, বাই দ্য ওয়ে।"
ঝাকানাকা বললেন, "চলুন জেনারেল, মিনিস্টারদের সাথে আলাপ করে আসি।"
জেনারেল কামানী বললেন, "চলুন।" পকেট থেকে একটা হুইসেল বার করে ফুঁ দিলেন তিনি। "মোশারফ! আমার বন্দুক নিয়ে যা!"
গ্যারেজের এক পাশে টুল পেতে বসে থাকা এক লোক ছুটে এসে জেনারেলের শটগান নিয়ে চলে গেলো। জেনারেল কামানী টোটাগুলো খুলে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে রাখলেন তার আগে।
ঝাকানাকা গ্যারেজের ভেতরে ঢুকে থমকে দাঁড়ালেন। "আড়িয়াল খানের গাড়ি কোথায় পার্ক করা ছিলো সেদিন?"
কিংকু চৌধারি পকেট থেকে নোটবই খুলে এগিয়ে গিয়ে জায়গাটা দেখালেন। "এখানে স্যার, এই পাজেরোটার জায়গায়। বাইরের দিকে মুখ করে পার্ক করা ছিলো।"
ঝাকানাকা উল্টো সারিতে পার্ক করা গাড়িগুলো দেখে বললেন, "এগুলোর মধ্যে আড়িয়াল খানের বিএমডব্লিউ কোনটা?"
কিংকু চৌধারি নোটবুক থেকে প্লেট নম্বর মিলিয়ে বললেন, "এই যে স্যার, এই কালোটা।"
ঝাকানাকা ভুরু কুঁচকে গাড়িটাকে এক চক্কর ঘুরে দেখে বললেন, "গাড়ির চাবি ছাড়া ভেতরে ঢুকে পিসু করা বেশ জটিল কাজ। এই গাড়ি তো ছুঁলেই অ্যালার্ম বেজে ওঠার কথা।"
জেনারেল কামানী গর্জে উঠে বললেন, "হি ইউজেজ আ লার্জ ক্যান। সে দুই তিনদিন পর পর কেন এসে পেচ্ছাপ করে? বিকজ দ্যাট স্নিকি বাস্টার্ড কালেক্টস হিজ জ্যুস ইন আ ক্যান ফর টু অর থ্রি ডেইজ। তারপর যখন ক্যান ভর্তি হয়ে যায়, সে এসে সোজা উল্টে দেয়। ইউ নো হোয়াট হি ডিড টু মাই ডটার? আমার বাচ্চাটা ... পুওর গার্ল, সে খেয়াল না করেই সুইমিং পুলে নেমে ঝাঁপ দিয়েছে, খেয়ালই করেনি যে পাশেই খালি ক্যান পড়ে আছে! আমি বারবার তাকে শিখিয়েছি, লুক বিফোর ইউ লিপ, সে আমার কথা শুনলো না!"
ঝাকানাকা আনমনে বললেন, "ক্যান হাতে বদরু। হুমমমমম।"
জেনারেল কামানী বললেন, "চলুন, কমনরুমে মিনিস্টাররা অপেক্ষা করছেন। বদরুর নোটভর্তি ফাইলটাও আনিয়ে রেখেছি আমি, দেখবেন চলুন।"
দোতলাতেই কমনরুম, মস্ত বড় জায়গা নিয়ে। ভেতরে পুল টেবিল, আর ইতস্তত ছড়ানো সোফাসেট আর চেয়ার। এক কোণে একটা বড় স্ক্রিনের টেলিভিশন, তার উল্টোদিকেই একটা বার, কাঁচের শেলফে সাজানো সুদৃশ্য বোতল, ভেতরে নানা রঙের পানীয়।
এক পাশের সোফাসেটে গম্ভীর হয়ে বসে আছেন চার মন্ত্রী, সবার হাতে খবরের কাগজ।
জেনারেল বাজখাঁই গলায় বললেন, "স্যারস, দেখুন কে এসেছেন। মিস্টার ঝাকানাকা হিমসেল্ফ! এবার ঐ নচ্ছাড়টার একটা হেস্তনেস্ত ইনি করেই ছাড়বেন। ফিয়ার নট মাই ফ্রেন্ডস, উই আর ইন গুড হ্যান্ডস নাও!"
সড়কমন্ত্রী বাবুল বৈরাগী খবরের কাগজটা ভাঁজ করে সরিয়ে রেখে মনমরা গলায় বললেন, "একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে গোয়েন্দা সাহেব! দুইদিন পরপর লিফটে পিসু করে দিয়ে যায় ডাকুটা! সিঁড়ি দিয়ে রোজ রোজ ছয়তলায় উঠতে গেলে আমি জানে মারা পড়বো!"
পরিবার পরিকল্পনামন্ত্রী তুফান মোহাব্বতি হেঁকে বললেন, "কিন্তু একটা জিনিস গোয়েন্দা সাহেব! সাংবাদিকদের কানে যেন কোনো কথা না যায়! ওদের কানে কথা গেলেই সব শ্যাষ! তিলকে তাল বানিয়ে একটা বাজে পরিস্থিতি বানিয়ে দিতে পারে ব্যাটারা! শেষে দেখা যাবে আমাদের নামেই লিফটে পিসুর অভিযোগ রটে গেছে। আর একবার খবরের কাগজে এলে সেটাকে টিভিতে টকশোতে নিয়ে লেজেগোবরে মাখামাখি করে সব সম্মান ধূলায় মিশিয়ে দিতে পারে!"
ঝাকানাকা মন দিয়ে কমনরুমের ভেতরটা দেখছিলেন, তিনি সাঁ করে তুফান মোহাব্বতির দিকে ফিরে বাঘা গলায় বললেন, "আপনারা কিন্তু সন্দেহের তালিকার বাইরে নন মাননীয় মন্ত্রীবৃন্দ!"
পানিসম্পদমন্ত্রী আড়িয়াল খান ফ্যাকাসে মুখে বললেন, "আমাদের নিজেদের বাড়ি, সেখানে আমরা সুইমিং পুলে, গাড়িতে, লিফটে মুতে রাখবো দুইদিন পরপর? এটা ক্যামোন ইঞ্ছাপ?"
জেনারেল কামানী অট্টহাসি হেসে বললেন, "স্যারেরা, আপনারা কঠিন গোয়েন্দার পাল্লায় পড়েছেন। আপনারা সবাই লজিক্যালি সাসপেক্ট। আমি সবসময় বলি, ইউ ক্যান জাজ আ ম্যান বাই হিজ মুসট্যাশ! লুক অ্যাট আজ! ফাইন ডিসিপ্লিন্ড পিপল, উইথ ম্যাগনিফিশেন্ট পেয়ারস অব মুসট্যাশেস! ইটস আ সিম্বল অব ডিসিপ্লিন অ্যান্ড ইনটেগ্রিটি, বাই দ্য ওয়ে! গোড়ায় সাদা রং না থাকলে যেমন গাছ হয় না, মোচ না থাকলেও মানুষ হয় না।"
ঝাকানাকা নিজের গোঁফে তা দিতে দিতে আড়চোখে কামানীর দিকে তাকিয়ে বললেন, "আপনিও কিন্তু সন্দেহের বাইরে নেই জেনারেল!"
জেনারেল কামানী গর্জে উঠলেন, "হোয়াট? মি! সাবধান গোয়েন্দা সাহেব, ইউ আর অ্যাবাউট টু ওয়াল্টজ অন আ মাইনফিল্ড!"
ঝাকানাকা কড়া গলায় বললেন, "চুপ করে ঐ সোফায় গিয়ে বসুন! আপনাদের সবার কাছ থেকে বিস্তারিত শুনবো এখন। কিংকু সাহেব, চায়ের বন্দোবস্ত করা যাবে?"
নৌমন্ত্রী ভাস্কর দা গামা উঠে গিয়ে ইন্টারকম তুলে বললেন, "কমনরুমে চা নাস্তা পাঠাও।"
ঝাকানাকা কমনরুমের জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি মেরে দেখে এসে বললেন, "আপনাদের এই বাড়ির চারপাশে উঁচু দেয়াল। কেউ টপকে এসে পিসু করে রেখে চলে যাবে, আর সিকিউরিটির চোখে পড়বে না, সেটা অসম্ভব। কাজেই, দুটো সম্ভাবনা বিবেচনা করে দেখছি আমি। এক, বাড়ির ভেতরের কেউ এ কাজ করেছে। দুই, বদরু বাড়ির ভেতরের কারো ছদ্মবেশ ধরে বসে আছে।"
সবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো।
তুফান মোহাব্বতি ক্ষেপে গিয়ে বললেন, "আমাদের বাড়ির লোকেরা কেন খামাখা লিফটে মুতবে? আপনি মশকরা করছেন নাকি আমাদের সাথে? আমরা মন্ত্রী, বুঝলেন? চাইলে গোটা দেশের উপর গিয়ে পিসু করে ভাসিয়ে দিতে পারি। প্রয়োজন হলে সেরকম করবোও! গোটা দেশ বাদ দিয়ে নিজের বাড়ির কোনাকাঞ্জিতে মোতে কেউ?"
ঝাকানাকা ক্রুর হেসে বললেন, "সে কারণেই তো আপনাদের সন্দেহ থেকে বাদ দিচ্ছি না মাননীয় মন্ত্রী!"
সড়কমন্ত্রী বাবুল বৈরাগী ঢোঁক গিলে বললেন, "আপনি কী বলতে চান গোয়েন্দা সাহেব? আমাদের মধ্যে কেউ একজন বদরু খাঁ, কিন্তু আমরা বাকিরা সেটা জানি না?"
ঝাকানাকা বললেন, "হ্যাঁ, সেরকমটা হতে পারে। হতেই পারে। হয়তো বদরু আপনার স্ত্রীর ছদ্মবেশ নিয়ে আছে। কিন্তু আপনি জানেন না।"
তুফান মোহাব্বতি বললেন, "বদরু অন্তত আমার স্ত্রীর ছদ্মবেশ নিয়ে বসে নাই, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত!"
বাকিরা সবাই অস্বস্তিভরে নড়েচড়ে বসলো।
ঝাকানাকা গোঁফে তা দিয়ে বললেন, "আপনাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জানতে চাই এখন। সাততলায় কে থাকেন, জেনারেল কামানী? আপনার বাসায় কে কে থাকে?"
জেনারেল কামানী গোমড়া মুখে বসে ছিলেন, তিনি অভিমানভরে বললেন, "আমি, আমার মিসেস, আমার মেয়ে, আমার আর্দালি আর আমার কাজের মেয়ে।"
ঝাকানাকা কিংকু চৌধারিকে বললেন, "নোট করে নিন কিংকু সাহেব। কাজের লোকদের আলাদা করে জেরা করতে হবে।"
কিংকু চৌধারি হাসিমুখে বললেন, "সে আমি গতকাল সকালেই এক দফা করে জেরা করেছি স্যার। কাজের লোকদের এক পশলা করে ঠেঙিয়েছি শুরুতেই। আর মহিলা পুলিশ এসে কাজের মেয়েগুলোকে একেবারে আঁতিপাতি সার্চ করে দেখেছে। ওদের মধ্যে কেউ অন্তত বদরু নয়।"
বাবুল বৈরাগী হাসিমুখে বললেন, "আমার কাজের মেয়েটা বদরু হতেই পারে না, আমি নিশ্চিত!"
বাকি সবাই আড়চোখে বাবুল বৈরাগীর দিকে তাকালো শুধু।
"গুড! নেক্সট, ছয় তলায় কে থাকেন? আপনি, স্যার? আপনার বাসায় কে কে থাকেন?" বাবুল বৈরাগীর দিকে ফিরে শুধালেন ঝাকানাকা।
"আমি, আমার স্ত্রী আর আমাদের কাজের মেয়েটা।" বাবুল বৈরাগী জানালেন ঝটপট।
"হুমমম! তারপর, পাঁচতলায় কে কে থাকেন?" ঝাকানাকা পায়চারি করতে লাগলেন মস্ত ঘরটার ভেতরে।
ভাস্কর দা গামা মিহি গলায় বললেন, "আমি, আমার স্ত্রী, আর একটা বাচ্চা কাজের ছেলে।"
ঝাকানাকা বললেন, "কিংকু সাহেব, কাজের ছেলেটাকে জেরা করেছেন?"
কিংকু চৌধারি বললেন, "হুঁ। সে ছোকরা বদরু নয় স্যার, আমি একেবারে নড়া ধরে তুলে চেক করেছি।"
ঝাকানাকা পায়চারি থামিয়ে প্রশ্নবোধক চোখে ঘুরে তাকালেন।
"আমি থাকি চারতলায়।" গলা খাঁকরে বললেন তুফান মোহাব্বতি। "আমার স্ত্রী, আমার ভাগিনা, আর কাজের বুয়া। আমার ভাগিনাই আমার এপিএস। তবে সে যদি বদরু হয়ে থাকে, আমি কোনো দায় নিতে রাজি নই। সে বদরু হলে আপনারা তদন্ত করবেন, দুদক তদন্ত করবে, পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে বিভাগীয় তদন্ত হবে ... আমাকে শুধুমুধু টানবেন না এসবের মধ্যে।"
ঝাকানাকা মৃদু হাসলেন কেবল। তারপর বললেন, "ওকে, তিনতলায় কাদের নিয়ে থাকেন আড়িয়াল খান সাহেব?"
আড়িয়াল খান বললেন, "আমি, আমার স্ত্রী, আমাদের ছেলে আর কাজের মেয়ে।"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমম। তার মানে, শুধু জেনারেল সাহেব, আর আপনারই কেবল সন্তান আপনাদের সাথে বাস করে, তাই তো? জেনারেল সাহেবের মেয়েকে তো এক ছেলে পড়াতে আসে, আপনার ছেলেকে পড়াতে আসে না কেউ?"
আড়িয়াল খান বললেন, "আসতো, কিন্তু ছেলের তো স্কুল ছুটি চলছে। মাসখানেক ধরে আসছে না কেউ।"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমম! জেনারেল সাহেব, আপনার মেয়ের টিউটরকে ডেকে পাঠান তো, কথা বলা প্রয়োজন তার সাথে।"
জেনারেল কামানী বললেন, "সে এখনই আছে এখানে, পড়াতে এসেছে। আমি নিচে আসতে বলছি ছোকরাকে।" উঠে গিয়ে ইন্টারকমে হাঁক দিলেন তিনি, "মোশারফ, বিল্লালকে বল নিচে কমনরুমে আসতে। ডাবল মার্চ!"
বাচ্চা এক কাজের ছেলে একটা ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে ঘরের ভেতরে ঢুকলো। ট্রলিতে চা আর হালকা নাশতার সরঞ্জাম সাজানো।
ঝাকানাকা পায়চারি করতে করতে বললেন, "হুমমম। জেনারেল সাহেব, আপনার সেই ফাইলটা দেখান দেখি। নোটগুলো দেখা প্রয়োজন।"
জেনারেল কামানী উঠে গিয়ে একটা টেবিলের ওপরে রাখা একটা প্লাস্টিকের ফাইল এনে ঝাকানাকার হাতে ধরিয়ে দিলেন।
ঝাকানাকা ফাইল খুলে ভেতরে চোখ বুলিয়ে বললেন, "এখানে তো কিছু নেই।"
জেনারেল কামানী বললেন, "নেই মানে? আমি নিজে কাগজে স্টেপল করে রেখেছি স্টিকি নোটগুলি! দিন তারিখসুদ্ধু!"
ঝাকানাকা ফাইলটা এগিয়ে ধরলেন, 'আপনিই দেখুন। কিছু নেই ফাইলের ভেতরে। শুধু সাদা কাগজ।"
জেনারেল কামানী গর্জে উঠলেন, "আমি নিজে আধঘন্টা আগে এখানে ফাইলটা রেখে নিচে গেলাম বন্দুক নিয়ে! এর মাঝে ফাইল থেকে কাগজ চুরি করলো কে? আপনারা," মন্ত্রীদের দিকে ফিরলেন তিনি, "আপনাদের সামনেই তো ফাইল রেখে গেলাম আমি! কাগজ হাপিস হলো কীভাবে?"
বাবুল বৈরাগী গরম গলায় বললেন, "আপনি কী বলতে চান জেনারেল? আপনার কাগজ আমরা চুরি করেছি?"
জেনারেল কামানী বললেন, "ওয়ান অভ ইউ মিনিস্টারস মাস্ট হ্যাভ প্লেইড আ ট্রিক অন দ্যাট ফাইল! ফাইল গায়েব করার ব্যাপারস্যাপার আপনাদেরই ভালো জানার কথা!"
তুফান মোহাব্বতি বললেন, "আপনি নিজে খালি ফাইল রেখে যাননি, তার কী নিশ্চয়তা?"
জেনারেল কামানী বললেন, "সাবধান স্যার, ইউ আর অ্যাবাউট টু ফিডল উইথ আ লঞ্চড গ্রেনেড! আমি দিনের পর দিন যত্ন করে নোটগুলো কালেক্ট করে রাখলাম গোয়েন্দাদের দেখাবো বলে, আর আপনি বলছেন আমিই নোটচোর? গোয়েন্দা সাহেব, এই মোহাব্বতিকে ভালোমতো জেরা করুন! আমার ধারণা হি ইজ দ্য ওয়ান উইথ লিকি ব্ল্যাডারস!"
তুফান মোহাব্বতি গর্জে উঠলেন, "ইংরাজি আমিও জানি, শুধু বলি না দেখে! সাবধান জেনারেল! ইংরাজিতে এমন গালি দিবো যে মানেও বুঝবেন না!"
ভাস্কর দা গামা হাত তুলে বললেন, "আহ নিজেদের মধ্যে আবার ঝগড়া বিবাদ কেন? গোয়েন্দা সাহেব তো আছেনই সমস্যা সমাধান করার জন্য। আসুন চা নাস্তা খাই।"
জেনারেল কামানী আর মোহাব্বতি ফোঁসফোঁস করতে করতে চায়ের কাপ তুলে নিলেন।
কমনরুমে এসে ঢুকলো এক টিংটিঙে তরুণ। তার পরনে ফুলহাতা শার্ট, চোখে চশমা, ছোটো করে ছাঁটা চুল, মুখে ভয়ার্ত ভাব।
জেনারেল কামানী বললেন, "এসো বিল্লাল। গোয়েন্দা সাহেব, এ আমার মেয়ের টিউটর। ভালো ছেলে। লুক ‌অ্যাট হিজ জুতার ফিতা। পারফেক্ট নট, পারফেক্ট লুপস। ডিসেন্ট বাকলস। নিট বাটনস। শেভ করে, চুল ছাঁটে। আ ভেরি ডিসিপ্লিনড ইয়াং ম্যান।"
ঝাকানাকা বললেন, "বিল্লাল, তুমি কি সকালেই পড়াতে আসো সবসময়?"
বিল্লাল ঢোঁক গিলে বললো, "ন্ন-না স্যার! ঠিক নাই। আন্টি যেদিন যখন আসতে বলেন, সেদিন তখন আসি। লোলা একেকদিন একেকসময় বাসায় থাকে তো, তাই। আঙ্কেল গাড়ি পাঠিয়ে দেন যখন, আমি তখন চলে আসি।"
ঝাকানাকা মধুর গলায় বললেন, "তুমি কি লিফটে চড়ো, নাকি সিঁড়ি ব্যবহার করো?"
বিল্লাল মাথা চুলকে বললো, "মাঝেমধ্যে নামার সময় কারেন্ট থাকে না, তখন সিঁড়ি দিয়ে নামি। কিন্তু ওঠার সময় সাধারণত লিফটেই উঠি। সাততলা তো, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে অনেক কষ্ট।"
জেনারেল কামানী বললেন, "বিল্লাল, তোমার বয়সে আমি পিঠে সাপ্লাই আর দাঁতে রাইফেল নিয়ে হাতে দড়ি বেয়ে বেয়ে বৃষ্টির মধ্যে রাতের বেলা পাহাড়ে উঠেছি! ইউ শুড বি অ্যাশেইমড অফ ইয়োরসেল্ফ!"
বিল্লাল ঢোঁক গিলে চুপ করে গেলো।
ঝাকানাকা বললেন, "তুমি কি খালি হাতেই আসো এ বাড়িতে, নাকি সঙ্গে কিছু থাকে?"
বিল্লাল বললো, "ইউনিভার্সিটি থেকে আসি যখন, তখন সাথে ব্যাগ থাকে। বাসা থেকে এলে খালি হাতে আসি।"
ঝাকানাকা হাসিমুখে বললেন, "ঠিকাছে বিল্লাল, তুমি এখন এসো তাহলে।"
জেনারেল কামানী বললেন, "হ্যাঁ, যাও পড়াতে যাও। আর ডু সাম এক্সারসাইজ। আমি সিকিউরিটিকে বলে দেবো, তোমাকে যাতে এখন থেকে লিফটে আর চড়তে না দেয়।"
বিল্লাল ফ্যাকাশে মুখে চলে গেলো।
ঝাকানাকা চায়ের কাপ তুলে সিঙাড়ায় একটা কামড় বসিয়ে বললেন, "আমাদের হাতে তাহলে এখন দুটো রহস্য। কে বা কারা কীভাবে পিসু করে বেড়ায়, আর এই ফাইলের ভেতর থেকে স্টিকি নোটগুলো কে বা কারা কেন সরালো।"
জেনারেল কামানী তুফান মোহাব্বতির দিকে ভ্রুকুটি করে বললেন, "সঠিক!"
ঝাকানাকা বললেন, "আমি কিংকু সাহেবের কাছ থেকে ঘটনার দিনতারিখসমেত নোটস আর আপনাদের সিকিউরিটি লেজার, দুটোই নিয়ে দেখেছি। ঘটনার দিন আপনারা প্রত্যেকেই বাড়িতে ছিলেন। শুধু মিস্টার মোহাব্বতির এপিএস মাঝখানে বেশ কিছুদিন অনুপস্থিত ছিলো।"
মোহাব্বতি কেশে গলা সাফ করে বললেন, "হ্যাঁ, নির্বাচনী এলাকায় পাঠাতে হয় তাকে প্রায়ই। বেয়াদব লোকজন সব, কথা শুনতে চায় না। ও গিয়ে একটু শাসন করে আসে আর কি।"
ঝাকানাকা চায়ের কাপটা নামিয়ে বললেন, "আপনারা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রস্তুত হন। আমি একটু টয়লেট থেকে আসছি। টয়লেটটা কোন দিকে?"
আড়িয়াল খান কমন রুমের একদিকে একটা দরজা দেখিয়ে দিলেন।
ঝাকানাকা আয়েশী ভঙ্গিতে হেঁটে টয়লেটে গিয়ে ঢুকলেন।
জেনারেল কামানী কিংকু চৌধারির দিকে তাকিয়ে বললেন, "হেহ, আমাদের মধ্যে একজন বদরু খাঁ হলে কি আমরা টের পেতাম না? কয়েক বছর ধরে এক সঙ্গে বাস করছি ... বললেই হলো আমাদের একজন বদরু? আপনার গোয়েন্দার মাথায় ছিট আছে।"
কিংকু চৌধারি হাই তুলে বললেন, "স্যার, বদরু আপনার কোলবালিশের ছদ্মবেশ নিয়ে আপনার পাশে শুয়ে থাকলেও আপনি টের পাবেন না যে সে বদরু। বছরের পর বছর ধরে বদরুকে দৌড়ানি দিচ্ছি আমরা। সে অত্যন্ত ঘোড়েল চিজ।"
ঝাকানাকা টয়লেট থেকে বেরিয়ে এসে গলা খাঁকরে বললেন, "প্রথম দিনের ঘটনাটা কে খুলে বলতে পারবেন?"
জেনারেল কামানী বললেন, "আমি। আমার লোলা নিচে নেমেছিলো সুইমিং করতে। আচমকা শুনি তার চিৎকার। আমি বেডরুমের বারান্দা দিয়ে বেরিয়ে এসে দেখি সে পুলের পাশে দাঁড়িয়ে চেঁচাচ্ছে। আমি সাথে সাথে আমার রিভলভারটা বের করে এক এক করে ছয়টা গুলি ভরলাম। তারপর লিফটে করে নিচে নামলাম। ছুটে গেলাম লোলার কাছে। গিয়ে দেখি সে একটা ক্যান হাতে নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছে। দেন আই রেড ইট অ্যান্ড ফিগারড অল আউট।"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমম। সুইমিং পুলে এক ক্যান পিসু ঢালতে গেলে অনেক প্রস্তুতি লাগে। তার মানে বদরু বেশ সময় নিয়েই ঘটিয়েছে ব্যাপারটা। ... গাড়ির ঘটনাটা কী, আড়িয়াল খান সাহেব?"
আড়িয়াল খান নাক কুঁচকে বললেন, "আমি সকালে আমার স্ত্রীর সঙ্গে তাদের ক্লাবে একটা অনুষ্ঠানে যাবো বলে গাড়ির দরজা খুলে দেখি ভেতরে বিকট গন্ধ! আমি তো অবাক। প্রথমে ভাবলাম আমার ছেলে নোটনের কাজ, কিন্তু সে কখনও এমন দুষ্টুমি করে না। স্কুলে একে ওকে মেরে নাক ফাটিয়ে দিয়েছে কয়েকবার, কিন্তু নিজের গাড়িতে পিসু করবে না সে, কখনোই না। কোনোমতে বমি চেপে বের হয়ে আসতে গিয়ে দেখি ড্রাইভারের সিটের পেছনে স্টিকি নোট সাঁটানো।"
ঝাকানাকা বললেন, "গাড়ি তো চাবি মারা থাকে, নাকি?"
আড়িয়াল খান বললেন, "ড্রাইভাররা নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করে, তারা সবসময় যে দরজা চাবি মেরে বন্ধ করে রাখে, এমন নয়। তবে ঘটনার পর ড্রাইভারকে বলেছি চাবি মেরে রাখতে। সব ড্রাইভারই তারপর থেকে চাবি মেরে রাখে।"
ঝাকানাকা বললেন, "বটে? আচ্ছা, তারপর?"
বাবুল বৈরাগী বললেন, "তারপর দিনদুয়েক বাদে একদিন ভোরে জেনারেল সাহেবের হাঁকডাক শুনে বের হয়ে দেখি, উনি লিফট খুলে চেঁচাচ্ছেন। আমাদের বাড়িতে লিফট বাড়ির একদিকে, আর সিঁড়ি একেবারে তার উল্টো পাশে। আমি করিডোর পুরোটা ডিঙিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে আবার করিডোর উজিয়ে গিয়ে দেখি, উনি লিফট খুলে রেখে খুব রাগারাগি করছেন। আর ভেতরে পিসুর গন্ধ। সে কী কড়ড়া গন্ধ রে বাবা! আপনাদের বদরু খায় কী? একেবারে সার কারখানার অ্যামোনিয়ার গন্ধ, মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে!"
জেনারেল কামানী আড়চোখে মোহাব্বতির দিকে চেয়ে বললেন, "বদলোকের পেচ্ছাপে দুর্গন্ধ বেশি হয়!"
তুফান মোহাব্বতি দাঁত বার করে হিংস্র হেসে বললেন, "একেবারে ঠিক কথা বলেছেন জেনারেল সাহেব!"
ঝাকানাকা বললেন, "নোটখানা পড়েছিলেন আপনি, বৈরাগী সাহেব?"
বাবুল বৈরাগী বললেন, "না, জেনারেল সাহেব সেই নোট বাজেয়াপ্ত করে নিজের কাছে রেখে দিলেন। পড়ার সময় পেলাম কই? আর এতো লেখাপড়া করার জো ছিলো না তখন, কী দুর্গন্ধ রে বাবা!"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমম। তারপরের ঘটনা কে দেখেছেন শুরুতে?"
তুফান মোহাব্বতি বললেন, "আমি একদিন রাতের বেলা লিফটে ঢুকতে গিয়ে একই কাহিনি দেখেছি। ভয়ানক বাজে গন্ধ! আমি সিকিউরিটির লোকজনকে ডেকে ধমক দিচ্ছিলাম, তখন জেনারেল সাহেব সুইমিং করছিলেন। তিনি দৌড়ে এলেন জাঙ্গিয়া পরে। তারপর খুব রাগারাগি করলেন। জেনারেল সাহেবই স্টিকি নোট খুঁজে পেয়েছিলেন, তারপর সেটা বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে গেলেন। সেদিন সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে উঠতে হয়েছে। আমি হার্টের রোগী, সিঁড়ি দিয়ে চলতে ফিরতে গিয়ে মরার দশা!"
ঝাকানাকা বললেন, "ইন্টারেস্টিং! তারপর?"
ভাস্কর দা গামা বললেন, "আমি একদিন ভোরবেলা হাঁটতে বের হবো বলে লিফটের দরজা খুলে দেখি এই অবস্থা। লিফটের ভেতরে মারাত্মক পিসুর দুর্গন্ধ। আমি সিকিউরিটির লোকজনকে ধমক দিচ্ছিলাম ইন্টারকমে। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে জেনারেল সাহেবের সঙ্গে দেখা। উনি ছুটে এসে লিফটের ভেতরে আঁতিপাতি করে খুঁজে স্টিকি নোট বার করলেন। তারপর রাগারাগি করতে লাগলেন।"
ঝাকানাকা জেনারেল কামানীর দিকে তাকিয়ে বললেন, "খুবই ইন্টারেস্টিং। সব আবিষ্কারের সময়ই জেনারেল সাহেব আশেপাশে ছিলেন দেখছি।"
জেনারেল কামানী গর্জে উঠে বললেন, "দেখুন গোয়েন্দা সাহেব, আমি একজন যোদ্ধা! আই শ্যাল ফাইট ইন দ্য হাউজেজ, আই শ্যাল ফাইট ইন দ্য স্ট্রিটস, আই শ্যাল নেভার ফ্ল্যাগ নর ফেইল! হুএভার হ্যাজ বিন পিসিং ইন দ্য এলিভেটর ইজ আওয়ার এনিমি! এই শত্রুকে আমি নিশানা করে রেখেছি।" আড়চোখে মোহাব্বতির দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, "তাকে পাকড়াও করে জাস্টিসের মুখোমুখি করাই আমার যুদ্ধের লক্ষ্য!"
ঝাকানাকা বললেন, "হুমমম! কিন্তু নোটগুলো সব গায়েব হয়ে গেলো তো। এখন কী উপায়?"
জেনারেল কামানী হঠাৎ উজ্জ্বল মুখে বললেন, "ওয়েইট! আমার মোবাইলে ছবি তোলা আছে নোটগুলোর। ডিসপেয়ার নট, ও ব্রেদরেন!"
মন্ত্রীরা একে অন্যের মুখের দিকে চাইলেন।
ঝাকানাকা জেনারেল সাহেবের বাড়িয়ে ধরা ফোন হাতে নিয়ে ছবিগুলো খুঁটিয়ে দেখে গম্ভীর হয়ে গেলেন।
আড়িয়াল খান বললেন, "আমার বাসা তিনতলায় বলে তেমন কষ্ট হয় না, কিন্তু অন্য সবাই আরো ওপরে থাকেন। ভাইসাহেবদের, ভাবিদের বড় কষ্ট হয়। লিফট ছাড়া শহরে বাস করতে গেলে হায়াৎ বলতে কিছু থাকে, বলেন? আমরা কয়েক সপ্তাহ ধরে সিঁড়ি দিয়ে চলাচল করে একেবারে হয়রান হয়ে গেছি। লিফট ব্যবহারই করতে পারি না। একবার ঐ মুতের গন্ধওলা লিফটে ঢুকে চলাচল করলে গন্ধটা গায়ে একেবারে সারাদিনের জন‌্য বসে যায়। লোকজন আড়ে আড়ে তাকায়। আমাদের তো বিদেশীদের সাথে মিটিং ফিটিং করতে হয়। দিনের বেলা বিশ্বব্যাঙ্ক থেকে শুরু করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, রাতের বেলা সৌদি রাষ্ট্রদূত থেকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত, সবার কাছে যেতে হয়। এইভাবে তো চলতে পারে না।"
জেনারেল কামানী বললেন, "বদরু ইজ ট্রাইং টু টারনিশ আওয়ার ইমেইজ বিফোর ইন্টারন্যাশনাল ফিগারস। গায়ে পিসুর গন্ধ নিয়ে মার্কিন এমব্যাসেডরের কাছে গেলে আমাদের দেশ আর টিকবে? এমনিতেই তো তাদের চটিয়ে রেখেছি আমরা। মদের গন্ধ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায়, বাট মুতের গন্ধ? নেভার! ইউ মাস্ট ডু সামথিং বিফোর ইউনাইটেড স্টেটস অফিশিয়ালি রিয়্যাক্টস!"
ঝাকানাকা চিন্তিত গলায় বললেন, "জেন্টলমেন, আমি আজকে উঠবো। রহস্যটা আমি মোটামুটি উদ্ধার করে ফেলেছি, শুধু একটা জিনিস মিলছে না। আপনারা কাল কোথাও যাবেন না। সকালে এখানে থাকবেন সবাই। আপনাদের সমস্যা আশা করি আগামীকাল মিটে যাবে।"
"কী জিনিস মিলছে না?" ভাস্কর দা গামা মিহিগলায় জানতে চাইলেন।
ঝাকানাকা গোঁফে তা দিতে দিতে বললেন, "একদম প্রথম যে গ্যালনটা পাওয়া গেলো, সেটা।"
সকলে একে অন্যের মুখের দিকে চাইলেন শুধু।
ঝাকানাকা উঠে পড়লেন। কিংকু চৌধারি উঠে এলেন তাঁর পেছন পেছন।
বাড়ির বাইরে বেরিয়েই ঝাকানাকা দেখলেন, বাড়ির সামনে সারি সারি টেলিভিশনের গাড়ি, আর ভিড় জমিয়েছে কয়েকজন টেলিসাংবাদিক। কারো কাঁধে ক্যামেরা, কারো হাতে ধরা বুম। কিংকু চৌধারির পুলিশি গাড়ি বেরিয়ে আসতেই সকলে এসে ছেঁকে ধরলো গাড়িকে।
"গোয়েন্দা ঝাকানাকা, মন্ত্রীদের বাসভবনে কী ঘটেছে?" বুম বাড়িয়ে বললো একজন।
"জনাব ঝাকানাকা আমরা খবর পেয়েছি মন্ত্রীদের বাড়িতে আবার একটি এপিএস-কাহিনী ঘটেছে। এ ব্যাপারে আপনার কী মন্তব্য?" আরেকজন বুম গুঁজে দিলো ঝাকানাকার নাকের নিচে।
"চারজন মন্ত্রী কেন একসঙ্গে এক বাড়িতে থাকেন? আপনি কি সে রহস্যের সমাধান করতে এসেছেন?" হুঙ্কার দিলো আরেক সাংবাদিক।
ঝাকানাকা গাড়ি থেকে নেমে হাত তুলে বললেন, "তদন্তের স্বার্থে আমি বিস্তারিত বলতে পারছি না। তবে এর সাথে বদরু খাঁ জড়িত।" কথা আর না বাড়িয়ে গাড়িতে চড়ে তিনি বললেন, "চালাও গাড়ি।"
কিংকু চৌধারি টুপি ঠিক করতে করতে বললেন, "স্যার, এভাবে সাংবাদিকদের সামনে বদরুর নাম বলা কি ঠিক হলো?"
ঝাকানাকা গোঁফে তা দিতে দিতে আনমনে বললেন, "হুঁ। একটা টোপ ফেলা দরকার ছিলো।"
কিংকু বললেন, "কী টোপ স্যার?"
ঝাকানাকা বললেন, "কাল বলবো। আপনি কি একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন কিংকু সাহেব?"
কিংকু বললেন, "কোন ব্যাপার স্যার?"
ঝাকানাকা বললেন, "ভাস্কর দা গামা চায়ের সাথে চিনি খান না। আপনি একটু খোঁজ নেবেন, উনি ডায়াবেটিক রোগী কি না। আর আপনাকে আরো কয়েকটা জিনিস খোঁজ নিতে হবে। নোট করে নিন। এক, ...।"
৪.
সন্ধ্যেবেলা ঝাকানাকা টিভি ছেড়ে চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগলেন। বেশি অপেক্ষা করতে হলো না তাঁকে, সন্ধ্যার খবরের পরপরই একটা এসএমএস পেলেন তিনি ফোনে। সেটা পড়ে তাঁর মুখে ভয়ানক এক হাসি ফুটে উঠলো। তিনি খুটখুট করে টিপে টিপে একটা উত্তর লিখে পাঠিয়ে দিলেন।
রাতে কিংকু চৌধারি ফোন করে আনন্দিত কণ্ঠে বললেন, "স্যার, আপনার ধারণাই সঠিক।"
ঝাকানাকা হাসিমুখে জেনারেল কামানীর মোবাইলে ফোন দিলেন। তারপর ফোন দিলেন তুফান মোহাব্বতির নাম্বারে।
কঠিন রহস্য ভেদ করা বড় আনন্দের।
৫.
সকালে নমরুদ প্যালেসের কমনরুমে আবার সকলে এসে বসেছেন। সবারই মুখে একটু স্নায়বিক পীড়ার ছাপ।
ঝাকানাকা টয়লেট থেকে হাসিমুখে বেরিয়ে এসে বললেন, "জেন্টলমেন, রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে!"
সকলেই একে অন্যের মুখের দিকে তাকালেন। জেনারেল কামানী আড়চোখে তাকালেন তুফান মোহাব্বতির দিকে।
ঝাকানাকা পায়চারি করতে করতে বললেন, "বদরু খাঁ আমার দীর্ঘদিনের শত্রু। তাকে আমি হাড়েমজ্জায় চিনি। তার পেজোমির কায়দাকানুন আমার মুখস্থ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, লোকেও সেটা জানে। জানে, কোথাও বদরুর উৎপাত হলেই আমার ডাক পড়বে।"
বাবুল বৈরাগী রাগী কণ্ঠে বললেন, "কিন্তু আপনি যেভাবে সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে কাল সব বলে দিলেন, সেটা কি ভালো করলেন? গতকাল রাতে সব চ্যানেলে আমাদের ওপর নিউজ হয়েছে! আজ পত্রিকার প্রথম পাতায় খবর এসেছে!"
ঝাকানাকা হাসিমুখে বললেন, "কী খবর এসেছে?"
বাবুল বৈরাগী বললেন, "এই যে দেখুন, দৈনিক কচুবনে কী লিখেছে! মন্ত্রীর প্রাসাদে বদরুর ছায়া! ভেতরে একগাদা আজগুবি খবর! আমরা নাকি বদরুকে পুষছি নাশকতা করার জন্যে! কেন আমরা চার মন্ত্রী আর এক জেনারেল এক সাথে থাকি, কী ষড়যন্ত্র করি, দেশের টাকাপয়সা কীভাবে মেরে সাফ করি, তার বৃত্তান্ত!"
ঝাকানাকা বললেন, "তো আমার কী?"
বাবুল বৈরাগী থতমত খেয়ে চুপ করে গেলেন।
ঝাকানাকা বললেন, "আমার সব কেসেই বদরু কোনো না কোনোভাবে উপস্থিত থাকে। কিন্তু, মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই কেসে বদরু ছিলো না। অন্তত, শারীরিকভাবে ছিলো না। তবে তার নামখানা ছিলো।"
জেনারেল কামানী বললেন, "মানে?"
ঝাকানাকা গোঁফে তা দিয়ে হেসে বললেন, "কেউ একজন চাইছিলো, বদরু খাঁর নামটা ধার করে আলগোছে একটা বদমায়েশি করতে। জানা কথা, বদরু কোথাও উৎপাত করলে আমার ডাক পড়বে। কিন্তু আমার ডাক পড়ার মানেই ব্যাপারটা সাংবাদিকদের কানে চলে যাওয়া, আর তারপর বিরাট কাভারেজ পাওয়া। কাজেই, আমাকে ডাকা চলবে না। আমাকে ডাকা না গেলে বদরুর জুজুও কাজে লাগবে, আবার আমার অভাবে তার সমাধানও মিলবে না। বদরুও জানতে পারবে না, তার নাম ব্যবহার করে অন্য কেউ একটা গিয়ানজাম পাকাচ্ছে কোথাও। এ-ই ছিলো আমাদের আলোচ্য পাজিটার মতলব।"
ভাস্কর দা গামা বললেন, "মানে?"
ঝাকানাকা বললেন, "বলছি বুঝিয়ে। কিছুদিন আগে আপনাদের এক বন্ধুর এপিএস টাকার বস্তা নিয়ে ধরা পড়ে অনেক কেলেঙ্কারি ঘটালেন, মনে আছে তো?"
মন্ত্রীদের মুখ শুকিয়ে গেলো।
ঝাকানাকা বললেন, "আপনারাও তারপর সাবধান হয়ে গেলেন। কেউ আর বাড়িতে এপিএসদের ঘেঁষতে দেন না। তুফান মোহাব্বতি বাদে। ওনার এপিএস ওনার আপন ভাগ্নে, তাকে হুট করে বাড়ি থেকে খেদিয়ে দিলে বরং সন্দেহ বাড়বে।"
মোহাব্বতি ফ্যাকাসে মুখে বললেন, "তো কী হয়েছে? বাড়িতে এপিএস থাকা কি খারাপ?"
ঝাকানাকা বললেন, "না, খারাপ হবে কেন? তাছাড়া ঘটনার সময় সে অনেকদিন ঢাকাতেও ছিলো না, আমি খোঁজ নিয়েছি।"
আড়িয়াল খাঁ বললেন, "তাহলে?"
ঝাকানাকা বললেন, "আপনাদের মধ্যে একজন দুষ্টু তখন টাকাপয়সা লেনদেনের জন্যে এক দারুণ ব্যবস্থা করে ফেললেন। এমন এক ব্যবস্থা, যাতে কারো কোনো সন্দেহ হবে না।"
মন্ত্রীদের মুখ শুকিয়ে গেলো।
ঝাকানাকা বললেন, "কিন্তু সেই ব্যবস্থায় একটাই সমস্যা। আপনারা নিজেরা যদি কেউ দেখে ফেলেন, তাহলে যে ল্যাং মারবেন না, কলকাঠি নেড়ে সেই দুষ্টুকে ফাঁসিয়ে দেবেন না, তার কী নিশ্চয়তা? কাজেই, এমন একটা ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কেউ সহজে এই লেনদেনের দৃশ্য দেখতে না পায়।"
ভাস্কর দা গামা বললেন, "লেনদেন?"
ঝাকানাকা ভয়ানক মুচকি হেসে বললেন, "হ্যাঁ। বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে ঘুষ, কমিশন, তোল্লা, চাঁদা, এসবের টাকা তো পৌঁছাতে হবে মন্ত্রীমহোদয়ে হাতে। অফিসে বসে আজকাল এসব করতে গেলে ফাঁসতে হয়, ব্যাঙ্ক লেনদেন করতে গেলে রেকর্ড থেকে যায়, তাই দরকার ক্যাশ লেনদেন। বাড়িতে বসে সেই টাকা হাতে পাওয়া গেলে সবচেয়ে ভালো।"
মন্ত্রীরা ঢোঁক গিললেন, জেনারেল কামানী উল্লসিত চোখে তাকালেন মোহাব্বতির দিকে।
ঝাকানাকা বললেন, "কিন্তু প্রশ্ন আসতে পারে, তার জন্যে সুইমিং পুলে কেন পিসু পাওয়া যাবে? কেনই বা পিসু পাওয়া যাবে গাড়িতে, বা লিফটে? সেই পিসু কীভাবে কে করে যাচ্ছে?"
জেনারেল কামানী বললেন, "হু হাউ হোয়াই?"
ঝাকানাকা বললেন, "তারচেয়েও বড় প্রশ্ন, কেন সুইমিং পুলে একবার, গাড়িতে একবার, কিন্তু লিফটে বারবার পিসু করা হচ্ছিলো?"
কিংকু বললেন, "কেন স্যার?"
ঝাকানাকা বললেন, "ওখানেই বেচারা দুষ্টু একটা ক্লু রেখে গেছে। উত্তর হচ্ছে, একটা ধারণা তৈরি করা, সারা বাড়ি জুড়ে পিসু করে বেড়াচ্ছে বদরু খাঁ। এ কারণে যত্রতত্র তার পিসু আর স্টিকি নোট পাওয়া যাচ্ছে।"
জেনারেল কামানী বললেন, "কিন্তু ... আসল উদ্দেশ্যটা কী ছিলো মোহাব্বতির?"
তুফান মোহাব্বতি বললেন, "সাবধান জেনারেল! ফাটা বাঁশের চিপার উপর বসে ফূর্তি করবেন না!"
ঝাকানাকা বললেন, "দুষ্টু লোকটার আসল উদ্দেশ্য ছিলো, এই বাড়ির লিফটটাকে অচল করে রাখা। যাতে লোকে লিফট দিয়ে চলাচল না করে। আপনারা তো জানেন, আপনাদের সিঁড়িটা লিফটের একেবারে উল্টোদিকে। লোকে ওদিক দিয়েই বের হয়, ওদিক দিয়েই চলাচল করে, লিফটের প্রান্তটা আর ব্যবহৃত হয় না। এমনই একটা পরিস্থিতি দরকার ছিলো আমাদের দুষ্টের জন্যে।"
আড়িয়াল খান বললেন, "কিন্তু বদরু জড়িত নেই, আপনি কীভাবে জানেন?"
ঝাকানাকা বললেন, "স্টিকি নোটের ছবি দেখে। ওটা বদরুর হাতের লেখা নয়। ওর হাতের লেখা আমি খুব ভালো করে চিনি। অন্য কেউ বদরু সেজে ওসব লিখে রেখে গেছে। সবাই জানে বদরু ভয়ানক বদ, এইসব পেজোমি করা তার বদভ্যাস, তাই বদরুর মতো করে নোট লিখে রাখতে গিয়ে দুষ্টু লোক একটা ভুল করেছে। সে বুঝতে পারেনি, আমাকে এক পর্যায়ে ডাকা হবে। যখন সে জানতে পেরেছে, গোয়েন্দা ঝাকানাকা আসবে, তখন সে নোটগুলো হাপিস করে দিয়েছে। জেনারেল কামানী ছবি তুলে না রাখলে, আমরা আজও ছদ্মবেশী বদরুকে খুঁজে বেড়াতাম, আর ধোঁকা খেতাম।"
ভাস্কর দা গামা বললেন, "আর গ্যালন?"
ঝাকানাকা বললেন, "গ্যালনটা সুইমিং পুলের পাশে রাখা হয়েছে আপনাদের ধোঁকা দেয়ার জন্যে। আপনারা এর পর থেকে গ্যালন হাতে একজন বদরুকে খুঁজবেন, সে আশায় একটা খালি গ্যালনের গায়ে স্টিকি নোট রেখে সুইমিং পুলের পাশে রাখা হয়েছে। কিন্তু আসল ঘটনা হচ্ছে, সুইমিং পুলে কেউ গ্যালন ভরা পিসু ফেলে আসেনি। জেনারেল সাহেবের মেয়ে, লোলা, সাঁতার কেটে উঠে এসে ঐ ক্যান হাতে পেয়েছে, আর নোট পড়ে তার ধারণা হয়েছে কেউ একজন পুলে পিসু ঢেলে এসেছে ক্যানে করে। আপনারা অনেকেই ঐ পুলে সাঁতরান, অনেক দিন পরপর পানি পাল্টানো হয়, কাজেই পুলের পানি এমনিতেই নোংরা হয়ে থাকার কথা। নোটটা শুধু পিসুর ধারণাটা তৈরি করেছে। আর সুইমিং পুলে খালি গ্যালন এক ফাঁকে যে কেউ প্রথমবার রেখে আসতে পারে। শুধু তা-ই নয়, আপনাদের প্রত্যেকের বাসার টয়লেটের জানালা দিয়ে একটা খালি গ্যালন নিচে ফেলা সম্ভব। কমনরুমের টয়লেট থেকে সুইমিং পুলের পাশটা পরিষ্কার দেখা যায়।"
বাবুল বৈরাগী বললেন, "কিন্তু এতো খাটনি কেন?"
ঝাকানাকা হাসিমুখে বললেন, "ঐ যে বললাম, নিরাপদে লেনদেনের জন্য? এই ব্যবস্থা অবশ্য সাময়িক হওয়ার কথা। সুইমিং পুলের পর গাড়িতে পিসু করে স্টিকি নোট রেখে আসার উদ্দেশ্যও একই। নজর অন্যদিকে ঘোরানো। আর তারপর শুরু হলো লিফটের ঘটনা।"
জেনারেল কামানী মোহাব্বতির দিকে ফিরে বললেন, "কে সেই লোক?"
ঝাকানাকা বললেন, "বলছি। সেই লোকের লেনদেনের পদ্ধতিটা বলি। টাকার বাহক তার সাথে ফোনে যোগাযোগ করতো যথাসময়ে। তিনি বেরিয়ে লিফটের সামনে দাঁড়াতেন। লিফটের দরজা খুলে টাকার বাহক তার হাতে টাকা ধরিয়ে দিতো। তিনি ঘরে ঢুকে যেতেন। লিফট অচল হওয়ার পর আপনাদের বাইরে বেরোনো কমে গিয়েছে, সিঁড়ি ভেঙে সহজে কেউ ওঠানামা করেন না, তাই এই লেনদেনের সাক্ষীও কেউ নেই।"
মন্ত্রীরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন।
ঝাকানাকা হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, "বিল্লালের ব্যাগের রং কী, মাননীয় মন্ত্রী?"
বাবুল বৈরাগী বললেন, "কালো।" বলেই চুপ করে গেলেন তিনি।
ঝাকানাকা হাসলেন মিটিমিটি। "ঠিক! কিন্তু জেনারেল কামানীর মেয়ের টিউটরের ব্যাগের রং আপনি কী করে জানলেন?"
বাবুল বৈরাগী কোনো উত্তর দিলেন না।
ঝাকানাকা বললেন, "আপনি জানেন, কারণ আপনাদের ব্যবস্থাটা খুব চমৎকার। বিল্লাল একটা টাকাভর্তি ব্যাগ নিয়ে আসে, আপনি তাকে একটা একইরকম খালি ব্যাগ দেন। সেই ব্যাগের ভেতরে একটা বোতল থাকে। বোতল ভর্তি থাকে পিসু। বিল্লাল শুধু পড়ানো শেষ করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সেই পিসু ভরা বোতল মওকামতো লিফটে উপুড় করে দিয়ে যায়। সঙ্গে রেখে যায় একটা স্টিকি নোট। তাই না?"
বাবুল বৈরাগী চুপ করে বসে আছেন দেখে ঝাকানাকা বললেন, "বিল্লাল যে আপনার এপিএসের শালা, সেটাও কিন্তু আপনি জেনারেল কামানীর কাছে চেপে গিয়েছিলেন। জেনারেল সাহেব অবশ্য রাতে আমাকে জানিয়েছেন, আপনিই ছেলেটাকে রেফার করেছিলেন তার কাছে। মোহাব্বতি সাহেব সেটার সাক্ষী।"
বাবুল বৈরাগী কিছুই বললেন না।
জেনারেল কামানী হাঁ করে ঝাকানাকার দিকে তাকিয়ে বললেন, "মানে ... আপনি বলছেন, বিল্লাল এতদিন আমার গাড়িতে চড়ে কালো টাকা ক্যারি করে এনে মিনিস্টার সাহেবকে পৌঁছে দিতো?"
ঝাকানাকা বললেন, "হ্যাঁ।"
জেনারেল মুখ কালো করে বললেন, "কিন্তু হি হ্যাড ইম্যাকুলেট বাটনস, অ্যান্ড বাকলস, অ্যান্ড জুতার ফিতা! আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে না তো?"
ঝাকানাকা বললেন, "না। আর বিল্লালই আপনার ঘর থেকে ফাইলের নোটগুলো সরিয়ে রেখেছিলো এক ফাঁকে, আপনি পুলিশ ডাকার পর। গতকাল টিভিতে বদরুকে নিয়ে নিউজ হওয়া কিছুক্ষণ পরই বদরু আমাকে এসএমএস করে ঝাড়ি দিয়েছে, কেন বিনা অনুমতিতে তার নাম ব্যবহার করে আমি তদন্ত করছি। সে কপিরাইট আইনে আমার নামে মামলা করে দিতে চায়। তাকে আমি বলেছি, কে তাকে ফাঁসাতে চায়, সেটা আমি তাকে জানাবো।"
বাবুল বৈরাগী হেহে করে হেসে বললেন, "আপনার কাছে কোনো প্রমাণ নাই। এই সবই আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আর অপপ্রচার। আপনি আমার কচুটা করবেন। আমি মন্ত্রী, ভুলে যাবেন না।"
ঝাকানাকা মৃদু হেসে উঠে পড়ে বললেন, "আইন আদালত দিয়ে আপনার কিছু করা যাবে না, আমি জানি মাননীয় মন্ত্রী। আমি শুধু আপনার নামটা বদরুকে জানিয়ে দেবো আর কি।"
বাবুল বৈরাগী ফ্যাকাসে মুখে বললেন, "তারপর?"
ঝাকানাকা চোখ টিপে বললেন, "তারপর কী হবে, পত্রিকায় দেখে নেবেন!"
৫.
দিন দুয়েক পরই কিংকু চৌধারি খবরের কাগজ হাতে নিয়ে ছুটে এলেন। "দেখেছেন স্যার, বদরুর কাণ্ড?"
ঝাকানাকা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে প্রশান্ত মুখে শিরোনামে চোখ বোলালেন। "মন্ত্রীর মূত্রস্নান: নেপথ্যে বদরু খাঁ?"
কিংকু করুণ মুখে বললেন, "বদরুকে ধরতে দারুণ চাপ আসছে স্যার, কী করবো?"
ঝাকানাকা বললেন, "বার্মিজ রেডিও শুনে শুনে অভ্যাস করে ফেলুন।"

সত্য ঘটনার ছায়াবলম্বনে। সত্য ঘটনাটি যুগিয়েছে সঞ্জীব, তাকে ধন্যবাদ। সঞ্জীব, আপনাদের ফ্ল্যাটে যে লিফটে পিসু করতো, তাকে চটাবেন না। চটালে সে কঠিন তরল বায়বীয় সব ফ্রন্টে যুগপৎ আক্রমণ চালাতে পারে।

গোয়েন্দা ঝাকানাকার একটি ফেসবুক পেইজ রয়েছে।

1 comment:

  1. হিসুনচ্ছাড় হবে না?

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।