Friday, May 18, 2012

চাহিদাপত্র


১.
মকবুল স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে পর্যবেক্ষণ ডেস্ক থেকে উঠে পড়লো। তার মাথা টিপটিপ করে ব‌্যথা করছে, শরীরের কোষগুলো একটু পর পর যেন বিড়বিড় করে বলছে, এক কাপ কফি খাওয়া দরকার।
নভোতরী "টিম্বাকটু" একটা ছোটো স্কাউটশিপ, সর্বোচ্চ চারজন নভোনাবিকের জন্যে তৈরি করা। কিন্তু মকবুলের মিশন সঙ্গীবিহীন। শুধু সঙ্গীবিহীনই নয়, ফেলে আসা পৃথিবীর সাথে যোগাযোগবিহীনও।
আরও তিন বছর তাকে কাটাতে হবে টিম্বাকটুতে।
প্রশিক্ষণের সময় নভোমনোবিদ মেয়েটা অবশ্য মকবুলকে পরামর্শ দিয়েছিলো নিজের সাথে কথা বলার। তা নইলে কীসব নাকি সমস্যা হতে পারে। মকবুল বিড়বিড় করে নভোমনোবিদ মার্থা তিশিয়ানোকে কিছু বাছা বাছা বাজে গালি দিলো। শালি কোনো কাজের পরামর্শ দিতে পারেনি। "টয়লেট সেরে পেছন মুছতে ভুলো না", "পানি বুঝেশুনে খরচ কোরো" গোছের ফালতু সব পরামর্শ দিয়ে গেছে প্রশিক্ষণের সময়টা। নিজের সাথে কথা বলতে হবে, এটা কী এমন বিশেষজ্ঞের দাওয়াই?
অবশ্য কী-ই বা বলবে বেচারী? খুব বেশি তথ্য তার বা তার মুরুব্বিদের হাতে এসে জমা হয়নি। পুরোনো নভোযাত্রীদের সঙ্কটের সাথে মকবুলের মতো পেশার মানুষদের সঙ্কটের কিছু বৈসাদৃশ্য রয়েছে। তারা কী সমস্যায় পড়ে, কীভাবে সে সমস্যা কমিয়ে আনা যায় বা সমাধান করা যায়, সেগুলো নিয়ে আরো বিশদ তথ্য জমা হবে যখন মকবুল ও তার সহকর্মীরা একে একে ফিরে যাবে পৃথিবীতে (যদি আদৌ ফিরতে পারে), নভোকেন্দ্রের কোনো এক অবকাশ কুটিরে বসে মার্থা বা তার কোনো সহকর্মীর কাছে ঝাড়া তিন মাস ধরে একগাদা নোটস নিয়ে বসবে, তারপর।
মকবুলের সহপ্রশিক্ষণার্থী লিওনিদ একদিন ক্যাফেটিরিয়ায় আলুর চপ খেতে খেতে বলছিলো, ওরা নির্জন কারাবাসে দণ্ডিত অপরাধীদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ট্রেনিং কর্পাস তৈরি করেছে। লিওনিদ খুব স্বল্পবাক মানুষ ছিলো বলে কেউ চট করে তার কথা ফেলে দিতে পারতো না, আর কথাটাও মোটামুটি বিশ্বাস্য, তবুও সেদিন মকবুলের ক্ষুধা নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। এক অর্থে তো নির্জন কারাবাসেই যেতে হচ্ছে তাদের সবাইকে। নিঃসীম মহাশূন্যে মানবজাতির সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া একটা বড় সময় কাটাতে হবে এক ছোট্টো ধাতব কুঠুরির ভেতরে।
মহাকাশে টানা দশ বছরের ডিউটি! একা!
কফির কাপটা জীবাণু মুক্ত করার হিটার থেকে সাবধানে বার করে কফি মেশিনের নিচে পেতে ধরে বিড়বিড় করতে লাগলো মকবুল, "রোসিও ... রোসিও ... রোসিও ... ।"
যে নীলচে ধূসর গ্রহটাকে ঘিরে টিম্বাকটু তার কক্ষপথে পাক খাচ্ছে, সেটার পোশাকি নাম অনেক বড়, কিন্তু প্রকল্প শুরুর সময় একটা ডাকনাম দেয়া হয়। এটা নিশ্চয়ই কোনো স্প্যানিশ ভাষাভাষীর রাখা। স্প্যানিশে রোসিও অর্থ শিশির।
পরিচিত, একঘেয়ে, কিন্তু মনকে চাঙা করে তোলা গন্ধ নিয়ে কাপের ভেতরে সঞ্চিত হতে লাগলো কালো কফি, সে অবকাশে মকবুল মনে মনে গ্রহটার নাম যে রেখেছে, তার সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য অনুমান করার চেষ্টা করতে লাগলো। নীলচে ছাইয়ের গোলকের মতো একটা গ্রহকে শিশির নাম দেয়ার মতো রোমান্টিক মন আছে তার, হয়তো সে লাঞ্চ ব্রেকে কবিতা লিখতো। হয়তো পাবলো নেরুদার ছবি আঁকা টিশার্ট পরে সে অফিসে ফাইলে মাউস পিষতো। নাম রাখার সুযোগ যারা পায় তারা মোটামুটি উচ্চপদস্থ, হয়তো মকবুল যখন রোসিওকে ঘিরে একাধিক কক্ষপথে টিম্বাকটুকে পাক খাওয়ানোর কাজে গলদঘর্ম তখন পৃথিবীতে বিভিন্ন সেমিনারে বক্তৃতা দেয়ার সময় প্রজেক্টরে রোসিওর কিছু বিশদানুভাগ ছবি দেখিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় আবেগমথিত কিছু বুকনি ঝেড়ে বেড়াচ্ছে সে এখনও। এবং এখনও হয়তো সে রোসিওর মতো আরো কয়েকটি গ্রহের নাম স্প্যানিশ ভাষায় রেখে বেড়াচ্ছে।
জেলখানার এতো সুন্দর নাম রেখে কী লাভ?
কফিতে চুমুক দিয়ে চোখ বুঁজে দাঁড়িয়ে আরও ভাবতে লাগলো মকবুল। নামটা যে রেখেছে, সে কি ছেলে, না মেয়ে? যদি মেয়ে হয়, তাহলে সে দেখতে কেমন? প্রকল্প পরিচালনা পর্ষদের সদস্য না হলে গ্রহের নাম প্রস্তাবের সুযোগ থাকার কথা নয়। প্রকল্প পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হতে গেলে অনেক অভিজ্ঞতা থাকতে হয়, কাজেই মেয়ে নয়, সে হবে মহিলা। বয়স কমসেকম চল্লিশ ... ।
মকবুলের কল্পনার তেল অনেকখানি উবে গেলো। ধুর। চারদিকে শুধু বুড়ি। নভোমনোবিদ মার্থা তিশিয়ানো ছাড়া গত দশ বছরে কোনো যুবতীর সাথে যোগাযোগেরই সুযোগ হয়নি তার। এর আগে যে জেলখানা, মানে, যে গ্রহটায় তার নামতে হয়েছিলো, এমনকি সেখানেও কোনো যুবতী মেয়ে ছিলো না। কেবল কয়েকটা বুড়ি আর তাদের নাতনি পিচকা কতগুলি বাচ্চা মেয়ে, আর কিছু ভয়ানক ক্ষ্যাপা পুরুষ কয়েদী ছিলো করবীতে।
করবী নামটা মকবুলের অবশ্য বেশ পছন্দ হয়েছিলো। কে জানে, বাঙালি কারো রাখাই হয়তো, করবী ফুলের নামে। গ্রহটা মঙ্গলের মতোই ম্যাড়ম্যাড়ে লাল, করবী ফুলের নামে তার নাম রাখার অর্থ, যে ঐ নাম রেখেছে, তার কল্পনাশক্তির দৌড় সাংঘাতিক। মকবুল কফির কাপে চুমুক দিয়ে কোনো তন্বী বাঙালিনীর কথা ভাবার চেষ্টা করলো, যে নভোকেন্দ্রের বহির্গ্রহ অভিবাসন কর্মসূচির নভোকারাগার প্রকল্পে কাজ করে, যার বয়স কোনোমতেই চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়, যে নিজের কালো চুল আঙুলে জড়াতে জড়াতে একটা মহা কুৎসিত লাল গ্রহের নাম করবী রাখার কথা ভাবে, এবং যার বুকের মাপ কমপক্ষে চৌত্রিশ, সি কাপ হলে ভালো হয়।
মকবুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফিতে একটা জোরালো চুমুক দিলো। কল্পনার জগতে ঘুরে ফিরে চৌত্রিশ ইঞ্চি ব্যাপারটা চলে আসছে, বছর তিনেক হলো। মার্থা তিশিয়ানো অবশ্য এ ব্যাপারে তাদের অনেক সবক দিয়েছে। খামাখাই। মেয়েটা এমন কিছুই তাদের শেখাতে পারেনি, যা মকবুল বা তার সহকর্মীরা আগে থেকে জানে না বা নিজে থেকে ভেবে বার করতে পারবে না। খামাখাই নভোকেন্দ্রে বসে বসে বেতন খাচ্ছে শালি। এরচেয়ে মকবুলের সাথে তাকে এই মিশনে পাঠালেও ভালো হতো। নভোমিশন সম্পর্কে হাতেকলমে নানা তথ্য-তত্ত্ব নিয়ে ফিরে একটা বই লিখতে পারতো, মকবুলের সময়টাও ভালো কেটে যেতো।
মকবুল কফির কাপটা খালি করে ভাবে, পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে সে মার্থাকে কোনো এক সন্ধ্যায় নিমন্ত্রণ করবে নিজের বাড়িতে। কাঁচকি মাছের ঝাল চচ্চড়ি, চিংড়ি মাছ দিয়ে পুঁইশাক, হালকা ভাজা ইলিশ মাছ আর ভাঁপ ওঠা লাল চালের ভাত খাওয়াবে, ভালো ভিনটেজের সাদা ওয়াইনসহ। তারপর ভোর পর্যন্ত খাবার ঘর, শোবার ঘর আর স্নানঘরে ... ।
পর্যবেক্ষণ ডেস্ক থেকে মৃদু কিন্তু মনোযোগাকর্ষী একটা শব্দ মকবুলকে আবার ফিরিয়ে আনলো নিমেষে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মকবুল কফির কাপটা কয়েক আউন্স পানিতে ধুয়ে ঢুকিয়ে দিলো অটোক্লেভে। সব জীবাণুর মৃত্যু হোক, নিঃসঙ্গতার জীবাণুসহ। মার্থা তিশিয়ানো, রোসো, আসছি আমি কাজকাম সেরে।
টিম্বাকটুর কেন্দ্রীয় কম্পিউটার মৌখিক আদেশ শুনেই কাজ করতে পারে, কিন্তু মকবুল যন্ত্রের সাথে কথা বলা পছন্দ করেনি কখনোই, সে বরাবরই কম্পিউটারের "কান" বন্ধ করে রাখে। যদিও সে জানে, তার অনেক তথ্যই স্বয়ংক্রিয়ভাবে লগড হয়ে যাচ্ছে যন্ত্রটার ব্ল্যাকবক্সে, তারপরও বাড়তি কোনো কিছু যোগাতে সে নারাজ। মকবুল প্রায়ই একা একা কথা বলে, নিজের সাথে ঝগড়া করে, মোটামুটি সুর-লয় রেখে মাউথ অর্গান বাজায়, পর্নো দেখে স্বমেহন করে এবং বেশ উচ্চগ্রামে নভোকেন্দ্রের কয়েকজন পরিচালকের মায়ের সাথে যৌন সংসর্গের প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ করে। এসব তথ্য শেষমেশ পড়বে মার্থা তিশিয়ানোর হাতে। কী দরকার? মার্থার হাতে যদি কিছু দিতেই হয়, মকবুলের কাছে ঐসব তথ্যের চেয়ে উপযুক্ত একটা কিছু আছে।
কিন্তু পর্যবেক্ষণ ডেস্কের নীল বিকনটা জ্বলছে নিভছে। এর অর্থ, কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার "কান" খুলেছে। ইমার্জেন্সি।
"কী ব্যাপার?" মকবুল খোঁচা খোঁচা দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে জিজ্ঞাসা করলো।
একটা যান্ত্রিক পুরুষ কণ্ঠ একঘেয়ে সুরে বললো, "কোনো প্রত্যুত্তর আসেনি। সর্বমোট বারো ঘন্টা দুই মিনিট ধরে চেষ্টা করা হয়েছে।"
"মানে কী?" মকবুল মানে ভালো করেই জানে, কিন্তু তারপরও প্রশ্নটা এসে গেলো তার মুখে।
"অপর প্রান্তের যোগাযোগ মডিউল বিকল।"
মকবুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানতে চাইলো, "আর কিছু?"
"আরেকটি সম্ভাবনা আছে কমাণ্ডার।"
মকবুলের মেজাজটা খারাপ হতে শুরু করলো। আরেকটা সম্ভাবনা থাকলে সেটা বলে ফ্যাল না ছাগল কোথাকার। খালি নাটক। "কী সম্ভাবনা?"
"অপর প্রান্তের যোগাযোগ মডিউল সচল, কিন্তু তারা যোগাযোগে সাড়া দিতে অনিচ্ছুক।"
মকবুল চোখ বন্ধ করে সম্ভাবনাটা উল্টেপাল্টে দেখলো কয়েক সেকেণ্ড, তারপর জানতে চাইলো, "আর কী তথ্য আছে?"
"আর কোনো তথ্য নেই, কমাণ্ডার।"
"মৌখিক যোগাযোগ নিষ্ক্রিয় করা হোক।"
মৃদু একটা গুঞ্জন করে বন্ধ হয়ে গেলো কম্পিউটারের স্পিকার। মকবুল হাতের তালুতে ঘাড় ডলতে ডলতে পায়চারি করতে লাগলো পর্যবেক্ষণ বে-র সীমিত জায়গাটুকুতে। টিম্বাকটু একটা অক্ষকে ঘিরে পাক খাচ্ছে বলে মৃদু এক কৃত্রিম অভিকর্ষ কাজ করে এর বাসোপযোগী অংশতে, তবে তা পৃথিবীর তুলনায় নিতান্তই ক্ষীণ। তাই মকবুলের হাঁটাচলার ভঙ্গি অনেকটা পাল্টে গেছে গত সাত বছরে। বিশেষ প্রেশার স্যুট পরে না থাকলে এই সাত বছরে তার হাড় আর পেশীর অনেক ক্ষয়ক্ষতি হতো। সেসব থেকে রক্ষা পেলেও নাচুনে লিমারের মতো ভঙ্গি অভ্যাস হয়ে যাবার হাত থেকে রেহাই মেলেনি তার।
একজন পুলিশের পক্ষে এমন ভঙ্গি রপ্ত করা ঠিক শোভন নয়।
বেলা শেষে মকবুলের পরিচয় এটাই, সে একজন ঠোলা। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর পরই পুলিশ একাডেমিতে যোগ দিয়েছিলো মকবুল, নভোপুলিশ হওয়ার প্রবল বাসনা নিয়ে। সারা পৃথিবী থেকে হাতে গোনা কয়েকশো মানুষ নভোপুলিশ হওয়ার সুযোগ পায়, মকবুল শেষ পর্যন্ত সেই দলে টিকে গেছে। নিজের মেধা নিয়ে তেমন আস্থা তার ছিলো না, কিন্তু নিজের উদ্যম সম্পর্কে মকবুল বরাবরই আস্থাবান। প্রচণ্ড পরিশ্রম করে ধাপে ধাপে সে উঠে এসে যোগ দিতে পেরেছে নভোপুলিশ ব্যাটেলিয়নে। আকর্ষণীয় কিন্তু বিপদজনক একটা পেশা, যাতে মধ্যযৌবনেই বেশ বড়সড় অঙ্কের পেনশন নিয়ে অবসরে যাওয়া যায়, নিরিবিলি উপভোগ করা যায় বাকিটা জীবন। মকবুলের লক্ষ্যও সেটাই। পুলিশ একাডেমিতে লেখাপড়া, প্রশিক্ষণ আর নভোকেন্দ্রের অধীনে আরো কয়েক বছর কঠোর মগজ ও শরীর ধোলাইয়ের পর মাত্র এগারো বছর কাজ করতে হবে তাকে। তারপর সে ঘিঞ্জি লোকগিজগিজ পৃথিবীর একটু নির্জন কোনো এক দেশে নিরিবিলি একটা বাড়ি কিনে মাছ ধরে আর বই পড়ে আর সাঁতার কেটে কাটিয়ে দেবে বাকিটা জীবন, যেখানে বাকি পৃথিবীর লোককে মৌলিক চাহিদার সংস্থান করতে গিয়ে বছরভর বেদম খাটতে হচ্ছে ষাট-সত্তর বছর বয়স পর্যন্ত।
ঐ পুরস্কার পাওয়ার জন্যে জীবনের শ্রেষ্ঠ দশটা বছর একা একা মহাকাশে চক্কর কেটে বেড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করেনি মকবুল। পৃথিবীর জীবন সে খুব ভালো করেই দেখেছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত সবার ধারণা ছিলো, কোনো না কোনোভাবে মানুষের জীবনের মূল্য বাড়িয়ে তোলা যাবে মানবসমাজের কাছে, বিজ্ঞান সেই পথ করে দেবে, প্রযুক্তি সেই সুযোগ করে দেবে। কিন্তু তা ঘটেনি। টানা এগারো বছর ভয়ঙ্কর যুদ্ধ চলার পর পৃথিবী আরও কঠিন, নির্মম, কর্কশ একটি গ্রহ হয়ে উঠেছে কেবল। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি মানুষকে আরো মানবিক করে তুলতে পারেনি এখনও।
তবে বিজ্ঞানকে দোষ দেয়াদের দলে মকবুল নেই। সম্পূর্ণ নতুন সব দরজা খুলে গেছে বিজ্ঞানের কল্যাণে। মকবুল যেমন কয়েক লক্ষ আলোকবছর দূরের ছায়াপথে গ্রহ থেকে গ্রহে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফেলে আসা পৃথিবীতে ফিরে যাবার আশাটুকু বুকে নিয়ে। না, কয়েক লক্ষ বছর পরের পৃথিবীতে নয়, মকবুল ফিরতে পারবে ঠিক তার ফেলে আসা পৃথিবীর বয়স দশ বছর গড়ানোর পরই। মহাশূন্যের অলঙ্ঘ্য দূরত্বের প্রাচীরটুকু মানুষ চুরমার করে দিতে পেরেছে।
মকবুলের দুঃখ হয় এগারো বছরে নিহত আঠারো কোটি মানুষের জন্যে। লোকগুলো জানতে পারলো না, কী বিশাল নতুন জগতের দুয়ার অর্গল খুলে মেলে ধরেছে মানুষ।
মকবুল নিজের কাজের প্রতি ভালোবাসা নষ্ট হতে দেয়নি। তুলনারহিত নিঃসঙ্গতার পরও সে জানে, সে কাজ করে যাচ্ছে আগামীর পৃথিবীর জন্যে। মকবুল ফিরে যাবার পর তার রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে নভোকেন্দ্র সিদ্ধান্ত নেবে, মানুষ আর কোন কোন বহির্গ্রহে পা রাখবে, গড়ে তুলবে নতুন বসত। কেবল পৃথিবী, চাঁদ, মঙ্গল আর কিছু ভবঘুরে গ্রহাণুর বুকে মানুষের বন্দিত্বের দিন ফুরিয়ে আসছে দ্রুত। মানুষ এখন ধাওয়া করছে অসীমতটের তারার রশ্মিকে।
বাসযোগ্য অনেক গ্রহের খোঁজই পাওয়া গেছে গত দেড়শো বছরে। স্থানকালের আপাত অলঙ্ঘ্য বাধাটুকু টপকাতে সময় লেগেছে আরো কয়েক দশক। তারপর প্রশ্নটা আর "যদি" দিয়ে শুরু করেনি কেউ, নভোকেন্দ্রের ভেতরে ফিসফাস হলেও বাইরে মানুষ রীতিমতো গর্জন করে প্রশ্ন শুরু করেছে "কবে" শব্দটি দিয়ে। কবে মুক্ত হবে মানুষ এই সৌরজগতের ছোট্ট গণ্ডি ছেড়ে?
মুশকিল হচ্ছে, এর ঝটপট উত্তর মেলেনি নভোকেন্দ্রের বাইরের মানুষের কারণেই। বহির্গ্রহে মানুষের বসতির প্রশ্নে পৃথিবীজুড়ে যে রাজনীতি এর পর শুরু হয়েছে, তার জন্যে অনেকেই প্রস্তুত ছিলো না। বহির্গ্রহে কি প্রাণের অস্তিত্ব আছে, নাকি নেই? সেই প্রাণের সাথে কি বুদ্ধিমত্তা জড়িত, নাকি নয়? বহির্গ্রহের প্রাণের সাথে পৃথিবীর প্রাণের সহাবস্থান কি সম্ভব?
নভোকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পরিচালিত হয়ে আসছে শক্ত হাতে। তাই তাদের কণ্ঠস্বর মৃদু হলেও বলিষ্ঠতার অভাব ছিলো না। পৃথিবীর বাইরে নানা লাভজনক খাতে বিনিয়োগের কারণে নভোকেন্দ্রের কখনোই টাকার অভাবে অন্যকে তোয়াজ করে মিনমিনে গলায় কিছু বলতে হয়নি, তাই গোটা পৃথিবীকেই জোর গলায় উত্তরটা জানিয়ে দিয়েছে তারা, সবই সম্ভব যদি মানুষ চায়, আর সেই চাওয়া যদি নভোকেন্দ্রের ইচ্ছার অনুকূলে থাকে।
পৃথিবী জুড়ে যখন জোর বিতর্ক চলছে, কেমন করে বুদ্ধিমান যন্ত্র পাঠিয়ে বহির্গ্রহ সম্পর্কে যতো তথ্য আছে যোগাড় করে আনতে হবে, নভোকেন্দ্রের প্রধান ইসমেত বির্নি তখন চুপচাপ রাষ্ট্রসঙ্ঘের কাছে একটা প্রস্তাবের চিঠিতে সই করেছেন। নভোকেন্দ্রের বক্তব্য খুব সরল। বুদ্ধিমান যন্ত্রের পেছনে গবেষণা চলছে চলুক, কিন্তু ফলের অপেক্ষায় নভোকেন্দ্র বসে থাকবে না। বহির্গ্রহ কেমন, তা জানতে মানুষ পাঠাতে হবে।
চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ এরপর বেঁধে গেলেও কেউ হয়তো বিস্মিত হতো না - বা আপত্তিও করতো না - এমনই বোমা ফাটিয়েছিলেন বির্নি। মানুষ খুব সহজেই দুই দলে ভাগ হতে জানে। বির্নির প্রস্তাবে ক্ষমতাবানেরা আপত্তিকর কিছু পাননি, সাধারণ মানুষ এই প্রশ্নে দুই দলে ভাগ হয়ে তুমুল কোন্দল শুরু করে দিলো। পথেঘাটে সক্রিয়তাবাদীদের উত্তাল মিছিলের ভিডিও মকবুল দাঙ্গা ব্যবস্থাপনা ক্লাসে দেখেছিলো। তার যেসব পূর্বসূরী সেই মিছিল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিলো, তাদের জন্যে মায়াই লেগেছিলো তার। উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত সব অক্ষাংশে শহরে শহরে মানুষের মুখে তখন একই স্লোগান, "আর কোনো সিবিলিয়া চাই না!"
সিবিলিয়া ছিলো মঙ্গলে মানুষের প্রথম কলোনি। সিবিলিয়ার দুই হাজার তিনশো একাশি জনের সকলে গোটা পৃথিবীর চোখের সামনে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়। বহির্গ্রহে মানুষের বসতি স্থাপনের রাজনীতিও কঠিন করে দিয়ে যায় সিবিলিয়া। মঙ্গল গ্রহে দ্বিতীয় কলোনি স্থাপন করতে নভোকেন্দ্রের সময় লেগেছে তারপর একান্ন বছর।
কিন্তু বির্নি তার পূর্বসূরীদের রেখে যাওয়া বদনামের ঘানি টানার মতো মহিলা ছিলেন না। বির্নির প্রস্তাব তাই সাধারণ মানুষকে প্রথম দফায় প্রচণ্ড উত্তেজিত করে দিলেও রাজনীতিকরা লুফে নিলেন। বহির্গ্রহে কলোনি স্থাপন করতে চান না বির্নি। তিনি চান বহির্গ্রহে কয়েকটা জেলখানা খুলতে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাড়ে আটশো কোটি মানুষ নিয়ে ধুঁকতে থাকা পৃথিবীতে শৃঙ্খলা বাড়েনি, বরং কিছুটা কমেছে। তাই আইন তার সাথে পাল্লা দিয়ে ক্রমশ কঠোর হয়েছে। বির্নির নভোকারাগার প্রকল্পের প্রস্তাব তাই রাষ্ট্রসঙ্ঘ সহজভাবেই নিলো, আর স্থানীয় রাজনীতিকদের বিভিন্ন সুতোতে মৃদু বা কড়া টান দেয়ায় পথেঘাটে রায়টও মিলিয়ে গেলো হপ্তা দুয়েক পর। কয়েকটা কয়েদীর জন্যে কারোই তেমন মাথা ব্যথা ছিলো না। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর গলার জোর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অনেকখানিই কমে গিয়েছিলো, তারা ক্ষীণ গলায় সভাসেমিনারে কিছু বক্তব্য দিলেও সেগুলো তেমন সাড়া ফেলেনি।
ইসমেত বির্নি জনসমক্ষে খুব কম আসতেন, নভোকারাগার প্রকল্পে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সায় পাওয়ার পর তিনি নিজের অফিসের বারান্দায় বসে সাদামাটা একটা সাক্ষাৎকার দিলেন একটি রেডিও চ্যানেলকে। হ্যাঁ, বহির্গ্রহে মানুষের বসতি স্থাপন ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সিবিলিয়াতে যেমনটি ঘটেছিলো, তেমনটি এক্ষেত্রে করা হবে না। ভলান্টিয়ার নেয়ার বদলে দাগী বদমায়েশদের ছোটো ছোটো দল পাঠানো হবে বিভিন্ন বহির্গ্রহে, যেখানে মানুষের বাসোপযোগী পরিবেশ রয়েছে। সঙ্গে কিছু রসদ থাকবে, যাতে তারা কিছু করে খেতে পায় সেখানে। নভোকেন্দ্রের পুলিশ শাখা থেকে দশ বছর পর পর তাদের খোঁজ নেয়া হবে। যদি দেখা যায় তারা ভালোভাবে টিকে যেতে পেরেছে, তাহলে সেই গ্রহে ক্রমান্বয়ে আরো লোক পাঠানো হবে। হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই সেই হতভাগা কয়েদীগুলোর নাগালের বাইরে, দূরে কোথাও নতুন একটা কলোনি খুলে তবেই পাঠানো হবে। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে যেভাবে দাগী বিটকেলদের পাঠানো হতো, অনেকটা সেভাবেই। যদি খারাপ কিছু ঘটে, তাহলে সেটা অল্প কয়েকটা নচ্ছাড়ের ওপর দিয়ে যাবে। না, বির্নি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিতে চান, সিবিলিয়া মানুষের ইতিহাসে কেবল একবারই ঘটেছে। আর ঘটবে না। আর মানুষ কি জানে, সিবিলিয়াতে বির্নির মাতামহও ছিলেন? হ্যাঁ, বির্নি একজন সিবিলিয়া শহীদ পরিবারের সদস্য। তিনি সমস্যাটি সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।
রাষ্ট্রসঙ্ঘ আর রাজনীতিকদের কাজ বির্নি একাই সহজ করে দিয়েছিলেন। সেইসাথে কিছু রাজনীতিকের কাজ খুব কঠিনও করে দিয়েছিলেন বলা যায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর করা কালো তালিকায় প্রথম দশজনের মাঝে তাই বির্নিও একজন। আর নভোকেন্দ্রের নভোপুলিশ ব্যাটেলিয়নের অফিসের বাইরে ফোয়ারাটা তাই ইসমেত বির্নির মূর্তির হাতে ধরা রোমান কলসি থেকেই নির্গত।
এরপর চলছে বহির্গ্রহে একের পর এক জেলখানা খোলা। পুরো গ্রহটিই এক অর্থে জেলখানা। এমন হাজারখানেক গ্রহ ছড়িয়ে আছে কয়েকটি ছায়াপথের কয়েকশো তারার চারপাশে। কোনো গ্রহে অক্সিজেনের মাত্রা কম তো কোনো গ্রহে প্রচণ্ড শীত। কোনো গ্রহে অভিকর্ষের টান পৃথিবীর চেয়ে বেশি তো কোনো গ্রহে জ্বালানি সঙ্কট। কোথাও অক্সিজেন এতো বেশি যে লোকে স্বাভাবিক আচরণ করতে পারে না আর আগুন লাগলে তা নেভানো মুশকিল হয়ে যায়। কোনো গ্রহে আবার সুপেয় পানির মূল্য পৃথিবীতে স্বর্ণের মূল্যের সমান।
কোনো গ্রহে আবার অন্য ধরনের প্রাণ আছে। কোনো গ্রহে আছে বুদ্ধিমান প্রাণীও। আবার কোনো গ্রহে সেই বুদ্ধিমান প্রাণীর সাথে মানুষের সহাবস্থান অত্যন্ত কঠিন।
আজ পর্যন্ত পৃথিবীর তুল্য কোনো গ্রহের সন্ধান মেলেনি। যে গ্রহটি বর্ণে গন্ধে ছন্দে রীতিতে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি, সেটি অম্লীয় জলে পূর্ণ। কোনো এক বিজ্ঞানী তার নাম রেখেছে প্যারানোইয়া।
পাঁচ দশক পূর্তি হয়ে গেছে বির্নির নভোকারাগার প্রকল্পের। অনুষ্ঠানে মকবুল থাকতে পারেনি, সে তখন পাক খাচ্ছে বিগল নামের এক গ্রহকে ঘিরে। সে অনুষ্ঠানে অবশ্য বির্নিও উপস্থিত ছিলেন না, তৃতীয় দশক উদযাপন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির ভাষণ দেয়ার কয়েক দিন পরই বির্নির মৃত্যু ঘটে হাসপাতালে, হৃদরোগে। তখন মকবুল উচ্চমাধ্যমিকের জন্যে তৈরি হচ্ছে কেবল।
দশ বছরে মকবুলকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে ছয়টি বহির্গ্রহ এবং তাতে স্থাপিত কলোনিতে বন্দী মানুষগুলোকে নিয়ে। নভোকেন্দ্র সচেতনভাবেই কলোনি শব্দটি এড়িয়ে কারাগার শব্দটি ব্যবহার করে, কিন্তু কিছু মিডিয়া কৌশলে কলোনিই ডাকে সেগুলোকে। গত পাঁচ দশকে এসব গ্রহ সম্পর্কে খুব কম তথ্যই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে। এমনকি নভোপুলিশ সদস্যরাও একে অন্যের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে পায় না, যদি না কোনো বিশেষ কারণে তা ফাইলে উল্লেখ করা থাকে। মকবুল জানে না, গত পাঁচ দশকে এই হাজারখানেক কারাগার সম্পর্কে ঠিক কী ধরনের তথ্য নভোকেন্দ্রের নভোকারাগার প্রকল্পের হাতে জমা হয়েছে।
কিংবা, ঠিক কতজন নভোপুলিশ সদস্য ফিরে এসে রিপোর্ট করতে পেরেছে।
লিওনিদ একদিন ক্যাফেটেরিয়ায় চা খেতে খেতে বলছিলো, কয়জন ফিরে আসতে পারে বলে তুমি মনে করো? আর যারা আসে, তাদের মধ্যেই বা কয়জন উন্মাদ হিসেবে কোনো অ্যাসাইলামে গিয়ে না ঢুকে এদিকসেদিক ঘুরে বেড়ায়?
লিওনিদের কথাটা শুনে সেদিন মকবুলের চায়ের তেষ্টা নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো।
কে জানে, হয়তো এ সবই গুজব। বেশ কিছু অবসরপ্রাপ্ত নভোকমাণ্ডার প্রশিক্ষণের বিভিন্ন পর্যায়ে এসে অনেক কিছু শিখিয়েছেন তাদের, কিন্তু মার্থা তিশিয়ানোর ক্লাস থেকে বেরিয়ে ক্যাফেতে ঢোকার পর লিওনিদ কখনোই ইতিবাচক কিছু বলেনি। তার চোখে এই পেশাটাই মরণফাঁদের চকচকে দিক কেবল। মকবুল একদিন বিরক্ত হয়ে জানতে চেয়েছিলো, "তুমি তাহলে এলে কেন?"
লিওনিদ আলুভাজা চিবাতে চিবাতে বলেছিলো, "যে কারণে মাছি মক্ষিফাঁদ গাছে রস খেতে ঢোকে। আমার কিছু হবে না, দিব্যি রস চুষে খেয়ে ফসকে বেরিয়ে যেতে পারবো, এমন একটা দুরাশা থেকে।"
মকবুল লিওনিদের মতো নৈরাশ্যের রোগী না হলেও তার মনে কিছুটা ভয় শুরুতে ছিলোই। দাগী আসামীদের দঙ্গলে নেমে তাদের কুশল জিজ্ঞাসা করে আবার গ্রহ ছেড়ে বেরিয়ে কক্ষপথে পাক খেতে থাকা টিম্বাকটুর সাথে ডকিং করার কাজটা প্রশিক্ষণ সিমুলেটরে হাতসওয়া হয়ে গেলেও, বাস্তবে ব্যাপারটা বিপদজনক। একটু এদিক সেদিক হলে সব শেষ।
তবে আশার কথা হচ্ছে, সব সময় গ্রহে নামতে হয় না। বিশেষ পরিস্থিতিতেই কেবল নিচে নেমে সরজমিন তত্ত্বতালাশ করতে হয়। নইলে কক্ষপথ থেকেই রেডিও যোগাযোগে তথ্য আদানপ্রদান করা দস্তুর। এর আগের তিনটি গ্রহের মাত্র একটিতেই তাকে নামতে হয়েছে। বাকি দু'টোতে সে রেডিও দিয়েই কাজ চালিয়ে দিয়েছে।
মকবুলের কাজ সাদাচোখে খুব কঠিন কিছু নয়। নভোকেন্দ্র একটা বিরাট প্রশ্নপত্র দেয় প্রতিটি গ্রহের জন্যে। সেই ফাইল তাকে পূরণ করে আনতে হবে, প্রতিটি ছকে তথ্য পুরে। মকবুল ঠিক তথ্য পূরণ করলো কি না, তা যাচাই করার ব্যবস্থাও রয়েছে নভোকেন্দ্রের হাতে, তাই কোনো অতিচালাকি চলবে না। সাধারণত রেডিও দিয়েই কাজ হয়ে যায়, দুয়েকটি ক্ষেত্রে মকবুলকে নিচে নামতে হতে পারে।
যেমন, যদি গ্রহটিতে স্থাপিত বিশেষ রেডিও টিম্বাকটুর সাথে যোগাযোগে সাড়া না দেয়।
করবীর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্যরকম ছিলো অবশ্য। করবীর আবহাওয়া কেন্দ্রের সার্ভারে ত্রুটির কারণে সেটার তথ্য ডাউনলোড করতে পারছিলো না টিম্বাকটু। অগত্যা মকবুলকে নিজেই নামতে হয়েছে অবতরণযানে করে।
করবী শুধু দেখতেই লাল নয়, গ্রহ হিসেবে তার শ্রেণীও লালচে। অর্থাৎ, বিপদজনক কয়েদী সেখানে বাস করে।
মকবুল সেরকম পরিস্থিতির সাথে মোকাবেলা করার জন্যে তৈরি হতে শিখেছে অবশ্য। পুলিশ একাডেমি আর নভোপুলিশ ব্যাটেলিয়নে তার প্রশিক্ষণের একটা বড় অংশই কেটেছে বৈরী বহুজনের সাথে লড়ে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে রাখার নানা পদ্ধতি শেখা আর প্রয়োগ করা নিয়ে। করবীতে কলোনি স্থাপিত হয়েছে চল্লিশ বছর আগে, তাতে পাঠানো হয়েছিলো একশো জন কয়েদীকে, যাদের মাঝে অন্তত পক্ষে কুড়িজনের বিরুদ্ধে আদালতে সহিংস আচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিলো। বাকি আশিজনও ঠিক ফুলেল চরিত্র নয়, কেউ ঠগবাজ, কেউ জোচ্চোর, কেউ জেলভাঙা পলাতক, কেউ সশস্ত্রবাহিনীর পয়সামারা অফিসার। মোট কথা, মারদাঙ্গা সব লোকজন। মকবুলকে তাই অবতরণ করতে হয়েছে বড় ঝুঁকি নিয়ে।
মকবুল পর্যবেক্ষণ ডেস্কে বসার আগে সিদ্ধান্ত নিলো, সে আরেক কাপ কফি খাবে। জীবাণুনাশক চুল্লি থেকে কফির কাপ বার করে সে আবার কফিমেশিনের নিচে ধরে চোখ বন্ধ করে গুনগুন করতে লাগলো, করবী ... করবী ... করবী।
করবীতে লোকজন বদ হলেও তারা মকবুলকে তেমন কিছু বলেনি। না বলার অনেক কারণ ছিলো অবশ্য। চল্লিশ বছরে মোটামুটি নির্বিঘ্নে নির্জন গ্রহে বাস করে প্রকৃতি আরোপিত শৃঙ্খলার মধ্যে চলে আসে অনেকেই, যতটুকু সহিংসতা অবশিষ্ট থাকে, সোয়া ছয়ফুট লম্বা মকবুলের শীতল হিংস্র মূর্তি তার মাত্রা বেশি চড়তে দেয় না। মকবুলের শারীরিক বলই শুধু নয়, তার হাতে যে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থাকে, সেটির সাথে পাল্লা দেয়ার সাধ্য কয়েদীদের নেই। সাধারণত কোনো কলোনিতেই মারণাস্ত্র রসদের সাথে দেয়া হয় না, এমনকি বুদ্ধিমান প্রাণী যেসব গ্রহে আছে, সেখানেও নয়। মকবুল ক্লাসে বসে জেনেছে, বেশ কিছু গ্রহ থেকেই মাঝে মাঝে আগ্নেয়াস্ত্রের কথা বলা হয় চাহিদাপত্রে, এ যাবৎ নাকি একটি মাত্র ক্ষেত্রে সে আবদার পূরণ করা হয়েছে। কিন্তু একই সাথে সেই কারাগারের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে অবতরণচুক্তি রদ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এরপর আর কেউ সেখানে অবতরণ করবে না, যোগাযোগ যা করার, রেডিওর মাধ্যমে বাইরে থেকে করা হবে, রসদ যোগাতে হলে একমুখী পার্সেল সার্ভিসে পাঠানো হবে।
ঐ গ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীরা ছিলো মাংসাশী।
করবীতে লোকজন ক্ষ্যাপা ছিলো অবশ্য অন্য কারণে। প্রতি দশ বছর পরপর নভোকেন্দ্রের পক্ষ থেকে চাহিদাপত্র চাওয়া হয় প্রতিটি কারাগারের কাছ থেকে। ওষুধ, যন্ত্রপাতি, তথ্য রেকর্ড, নতুন নারী বা পুরুষ কয়েদী, শস্য বা পশু, অনেক কিছুই চাইতে পারে কয়েদীরা। করবীতে কোনো কারণে তৃতীয় মিশনটি আর যোগাযোগ করেনি। মকবুল চতুর্থ মিশন হিসেবে যোগাযোগ করেছে তাদের সাথে। করবীর চাহিদাপত্র ছিলো ওষুধের, তৃতীয় মিশন রহস্যজনক কারণে (বেশি রহস্য নেই অবশ্য, সম্ভবত স্কাউটশিপটি ধ্বংস বা বিকল হয়ে গিয়েছিলো মাঝপথে) যোগাযোগ না করায় কুড়ি বছর সেই ওষুধ ছাড়াই কাটিয়েছে তারা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই নভোকেন্দ্রের ওপর তারা একটু বেশি ক্ষেপে ছিলো, যতটুকু ক্ষেপে থাকা স্বাভাবিক তারচেয়ে।
মকবুল অবশ্য ওষুধ সঙ্গে নিয়ে যাওয়ায় খুব বেশি চোটপাট নিতে আসেনি কেউ। এক মাতাল বুড়ো কয়েদী একটা রেঞ্চ নিয়ে তেড়ে এসেছিলো কেবল। আইন অনুযায়ী মকবুল তাকে হত্যা করার অধিকার রাখলেও বুড়োকে একটা আছাড় দেয়ার বাইরে আর কিছু করেনি মকবুল।
তাকে আক্রমণ করা মতো শারীরিক শক্তিসম্পন্ন আর কেউ ছিলোই না করবীতে। করবীর নিজস্ব ব্যাকটিরিয়াবাহিত রোগে প্রচুর লোক মারা পড়েছে গত কুড়ি বছরে, অল্প কয়েকজন কোনোমতে টিকে ছিলো কেবল, তাদের বেশিরভাগই নারী। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে তাদের কারো মাঝেই পুলিশের ওপর গুণ্ডাগার্দি করার মনোবল অবশিষ্ট ছিলো না।
মকবুল অবশ্য যথেষ্ট আন্তরিকতার সাথেই অনেক সমস্যার সমাধান করে দিয়ে এসেছে করবীতে। কয়েকটা বড় ব্যাটারি বেচারাদের অনেক খাটনি বাঁচিয়ে দিয়েছে। ক্ষয় হয়ে যাওয়া যন্ত্রপাতির কিছু কিছু বদলে দিয়েছে মকবুল, নতুন এক জাতের ভূট্টার বীজ দিয়ে এসেছে যাতে করবীর ভৌত পরিস্থিতিতে ফলন বেশি হয়, ফোটোনিকসের ওপর কিছু ম্যানুয়ালও। সেইসাথে নতুন পুরুষ কয়েদী পাঠানোর প্রতিশ্রুতি। একশোজন কয়েদী নেমেছিলো করবীতে, চল্লিশ বছর আগে, তাদের সংখ্যা বাড়ার বদলে কমে আটাত্তরে নেমে এসেছে, যাদের একটা বড় অংশ নারী। মকবুলের পর যে মিশন আসবে করবীতে, তাদের কাছে করবীর এখন বালিকা শিশুদের প্রত্যাশা থাকবে কয়েকজন তরুণ কয়েদী পাওয়ার।
করবী গ্রহ হিসেবে মোটেও বাসবান্ধব নয়। গ্রহটিতে পানির পরিমাণ খুব বেশি নয়, কলোনির স্থানটিতে বৃষ্টিপাত অনিয়মিত, মাটি অনুর্বর, স্থানীয় ব্যাকটিরিয়ার উৎপাতও যথেষ্ট। তবে বহুকোষী প্রাণ সেখানে এখনও গড়ে ওঠেনি বলে রক্ষা। আবার বহুকোষী প্রাণ নেই বলে জ্বালানিও নেই, একমাত্র ভরসা সৌরকোষ থেকে পাওয়া বিদ্যুৎ। ভূট্টা আর গমের খড় করবীতে চড়া দামে লেনদেন হয়।
আবহাওয়া কেন্দ্রের সার্ভারের জটিলতা মকবুল ছাড়া আর কারো সারানোর এখতিয়ার নেই। এখতিয়ার থাকলেও লাভ হতো না, করবীতে যারা বেঁচে আছে তাদের মাঝে কম্পিউটার বোঝে এমন আর কেউ নেই। মকবুলের খারাপই লাগছিলো, যখন তার অবতরণ যান করবী ছেড়ে চলে আসে। কী বেদনার্ত চোখ নিয়ে তাকে বিদায় জানাচ্ছিলো ভাঙাচোরা মানুষগুলো! পাঁচ বছর পর মানুষের দেখা পেয়ে মকবুলের ভেতরটা খুব ওলটপালট লাগছিলো। মার্থা তিশিয়ানো ক্লাসে তাদের বহুবার বুঝিয়েছে, কোনো কারাগারে নামতে হলে মানুষের সাথে বেশি যোগাযোগ করা যাবে না, খুব বেশি হৃদ্য আচরণও করা যাবে না, কাতর করে তোলার মতো কোনো স্মৃতিও সঙ্গে নিয়ে আসা যাবে না। ঐসব গ্রহে যা ঘটবে, তা ফেলে আসতে হবে ঐ গ্রহেই।
মকবুল তার করবীর ফাইল সঠিকভাবে সাফল্যের সাথেই পূরণ করে এসেছে, অন্য দু'টি গ্রহে যেমন। রোসিও তার চতুর্থ গ্রহ। তারপর আর দু'টি গ্রহ কেবল বাকি। তারপরই সে ফিরে যাবে পৃথিবীতে, তিন মাস কোয়ার‍্যানটাইনে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কাটাবে, তিন মাস নভোমনোবিদদের কাছে হাবিজাবি ইতংবিতং পরীক্ষা দেবে, তারপর ছয় মাস নভোকেন্দ্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সেরে বেতন আর পেনশনের কার্ড তুলে চলে যাবে কোথাও, নিরিবিলিতে, কোনো পাহাড়ি হ্রদের ধারে একটা কুটির তুলে বাস করার জন্যে। আর হ্যাঁ, অবশ্যই মার্থা তিশিয়ানোকে নিমন্ত্রণ করবে সে সান্ধ্যভোজে। মেয়েটা এই দশ বছরে নিশ্চয়ই খুব বেশি বুড়িয়ে যায়নি। ক্লাসে বসে নভোমনোবিদ্যার নামে হাবিজাবি বকবক করলে বেশি বুড়িয়ে যাওয়ার কথাও নয়। হাল ছেড়ো না বন্ধু, বরং ...।
মকবুল কিছুটা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া কফিতে চুমুক দিয়ে মুখ বাঁকালো। সময়ের সাথে সবকিছুই ঠাণ্ডা হয়ে আসে। কফি, মার্থা, হয়তো সে নিজেও?
মকবুল জানে না, করবীতে কোনো তরুণী থাকলে তার আচরণ কেমন হতো। সে কি প্রশিক্ষণ ভুলে করবীতে কিছু সময় কাটাতো সেই তরুণীর সাথে? সেই করবিনীর গর্ভে শুক্র নিষেক করে বিনিময়ে কোনো অজানা অপার্থিব অণুজীব সঙ্গে নিয়ে ফিরতো টিম্বাকটুতে? তারপর অন্য কোনো গ্রহে গিয়ে সেই অণুজীব ছড়িয়ে দিতো অন্য কোনো তরুণীর গর্ভে?
মাথা ঝাঁকিয়ে মেয়েমানুষের চিন্তা দূর করার চেষ্টা করলো মকবুল। ব্যাপারটা সহজ হবে না, মার্থা ক্লাসে বহুবার বলেছে তাদের। কিন্তু কখনো, কখনোই যেন কোনো কারাগারের কয়েদীদের সাথে কোনো ধরনের ঘনিষ্টতা না ঘটে। যদি কোনো স্বয়ংক্রিয় লগে ধরা পড়ে ব্যাপারটা, পেনশন কাটা যাবে। রোগজীবাণু নিয়ে ফিরলে তো কোয়ার‍্যানটাইনের ফাঁদেই আটকা পড়তে হবে।
মকবুল অবশ্য বুঝতে পারছে না, এইসব শাস্তির ভয় কতটা কাজে দেবে।
রোসিওতে নেমে কী দেখবে, মকবুল জানে না এখনও। করবীর মতো পরিস্থিতি সেখানে নাও হতে পারে। হয়তো অসুখবিসুখে মরে সাফ হয়ে গেছে সবাই। কিংবা দারুণ সব লাস্যময়ী মেয়ে একজন বলিষ্ঠ যুবকের আশায় বুক বেঁধে (চৌত্রিশ ইঞ্চি, সি কাপ হলে ভালো হয়) রোসিওর বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে শয়ে শয়ে। মকবুল কি পারবে ব্যাটেলিয়নের প্রশিক্ষণ ক্লাসে শেখানো ব্যাপারগুলো মাথায় রাখতে?
দু'হপ্তা ধরে রোসিওর ফাইলই ঘেঁটে দেখছিলো মকবুল। রোসিওর ক্যাটেগোরি সবুজ। অর্থাৎ কোনো সহিংসতার অভিযোগে দোষী ব্যক্তিকে রোসিওতে পাঠানো হয়নি। রোসিও নভোকারাগার প্রকল্পের প্রথম দিকের গ্রহ, পঞ্চাশ জনকে পাঠানো হয়েছিলো তখন, ছাব্বিশ জন নারী আর চব্বিশ জন পুরুষ। সকলেই ছোটোখাটো অপরাধ করেছে, এবং মোটামুটি শিক্ষিত পেশাদার লোকজন। তাদের মাঝে চুরিপাগল পকেটমার থেকে শুরু করে মাতাল হয়ে দোকানে আগুন ধরানো ছাত্র আছে। প্রত্যেকের প্রোফাইলেই মোটামুটি চোখ বুলিয়েছে মকবুল, কেউই মারদাঙ্গা গোছের নয়। পেশাগত জীবনে ডাক্তার, উকিল, মিস্ত্রি, কৃষক, সব ধরনের মানুষের মিশেল ঘটানোর চেষ্টা করা হয় কয়েদীদের বাছাইয়ে, রোসিও মোটামুটি আদর্শ বাছাই। গত চারটি মিশনের মাঝে তিনটির রিপোর্ট রয়েছে, চতুর্থ মিশন কোনো কারণে রিপোর্ট পাঠায়নি, হয়তো এটাই সেই মিশন যেটা করবীতে ওষুধ নিয়ে যাওয়ার জন্যে নির্ধারিত ছিলো। মকবুল রোসিওতে পঞ্চম মিশনে এসেছে।
প্রথম তিনটি মিশনের চাহিদাপত্র খুঁটিয়ে দেখেছে মকবুল। অস্বাভাবিক কিছুই নেই। যেসব ওষুধ চাওয়া হয়েছে সেগুলো বেশ মামুলি, আগ্নেয়াস্ত্রের অনুরোধ একবারও আসেনি, যেসব যন্ত্রপাতি আর সফটওয়্যার চাওয়া হয়েছে সেগুলো দেখে বোঝা যায়, বেশ সক্রিয় আর কর্মঠ একটা সমাজ চলছে রোসিওতে। কিছু অদ্ভুত চাহিদা সবসময়ই থাকে, রোসিওর ক্ষেত্রেও তা ব্যতিক্রম নয়, যেমন নাইলনের পাতলা কাপড় চাওয়া হয়েছে প্রচুর পরিমাণে (দেয়া হয়নি)। নারী বা পুরুষ কয়েদীও চাওয়া হয়নি, অর্থাৎ রোসিওতে নারী-পুরুষের সংখ্যার অনুপাত স্বাভাবিক রয়েছে। নতুন শস্য, নতুন পশু বা নতুন কোনো বই, ম্যানুয়াল চাওয়া হয়নি। সাধারণত শুরুতেই বেশ ভালো একটি লাইব্রেরি সঙ্গে দেয়া হয়, সেটা পড়ে শেষ করতেই কয়েকশো বছর লেগে যাওয়ার কথা। পৃথিবীর সাম্প্রতিক আবিষ্কার বা পণ্যগুলো সাধারণত প্রচুর যাচাইবাছাইয়ের পর নভোকারাগারগুলোতে পাঠানো হয়, এবং সেগুলো গ্রহগুলোর পায়ের মাপে বানানো জুতো বলে ব্যাপারটা তহবিলের ওপর নির্ভরশীল। তহবিল ব্যবস্থাপকদের মর্জির ওপর ব্যাপারটা নির্ভর করে।
রোসিওর তৃতীয় চাহিদাপত্রের একটি আইটেম কেবল মকবুলকে ভাবিয়ে তুলেছে।
ইনসুলিন প্ল্যান্ট।
অনেকেই ওষুধ হিসেবে ইনসুলিন চাইতে পারে, কিন্তু একটা প্ল্যান্ট কেন চাওয়া হচ্ছে? ইনসুলিন প্ল্যান্ট ছোটোখাটো কিছু নয়, স্কাউটশিপের গুদামের জন্যে বরাদ্দ আয়তন ও ওজনের অনেকখানিই সেটা নিয়ে নেবে, সে কারণে কিছু ইনসুলিন সঙ্গে দেয়া হয়েছে বলে খোঁজ নিয়ে দেখেছে মকবুল। কিন্তু একটা প্ল্যান্ট কেন চাইছে রোসিওর লোকজন? চাহিদা কি এতই তীব্র যে শুধু ওষুধ দিয়ে আর পোষাচ্ছে না তাদের, আস্ত ফ্যাক্টরিই খুলে বসতে হবে?
এদিকে টিম্বাকটু থেকে পাঠানো যোগাযোগবার্তায় সাড়া আসছে না রোসিও থেকে।
মকবুল অবশ্য টিম্বাকটুর শক্তিশালী ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো খুঁটিয়ে দেখেছে গত দু'দিন ধরে। কলোনিটা একটা পাহাড়ি এলাকায়, বড়সড় একটা হ্রদের পাশে, সেখানে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলেছে রাতের বেলা। বেশ বড় এলাকা নিয়ে ছোপ ছোপ চারকোণা সবুজ-হলুদ দেখে বোঝা যায়, শস্য চাষ চলছে। ডায়াবেটিসে ফৌত হয়ে গেলে এসব থাকার কথা নয়। হয়তো যোগাযোগ মডিউলের কোনো একটা সাবমডিউল বিগড়ে গেছে। কিংবা কে জানে, হয়তো ব্যাটারা ব্যাটারি খুলে গম পেষার যন্ত্রের সাথে লাগিয়ে দিয়েছে।
মকবুল পর্যবেক্ষণ বে-র মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লো, হঠাৎ অবসাদ এসে স্পর্শ করেছে তাকে। "মৌখিক যোগাযোগ সক্রিয় করা হোক।"
মৃদু একটা শব্দ করে কম্পিউটারের স্পিকার সতেজ হয়ে উঠলো। "কমাণ্ডার।"
"আবহাওয়ার তথ্য ডাউনলোড করা গেছে?" মকবুল শবাসনে শুয়ে চোখ বুঁজে জানতে চাইলো।
"আবহাওয়ার তথ্য সফলভাবে ডাউনলোড করা হয়েছে কমাণ্ডার।"
"তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত আর আপেক্ষিক আর্দ্রতার হলোগ্রাম দেখাও।"
পর্যবেক্ষণ বে-র ভেতরে শূন্যে ফুটে উঠলো রোসিওর কারাগার প্রকল্প এলাকার ভেতরে স্থাপিত আবহাওয়া কেন্দ্র থেকে পাওয়া তথ্যের গ্রাফ।
রোসিও পৃথিবীর চেয়ে আকারে কিছুটা ছোটো, কিন্তু স্থিতিশীল বায়ুমণ্ডল সেখানে আছে। সমস্যা আপাতদৃষ্টিতে একটাই, তাতে অক্সিজেনের পরিমাণ বেশ কম, পৃথিবীর তুলনায় প্রায় অর্ধেক। হুট করে পৃথিবীর সমুদ্র সমতলের একজন মানুষকে রোসিওতে এনে ছেড়ে দিলে তার নানা সমস্যা হবে, হাইপোক্সিয়ায় ভুগে টেঁসেও যেতে পারে। এ ধরনের গ্রহতে নামতে গেলে সঙ্গে অক্সিজেন রাখতে হয়। খুব বেশি সময় কোনো গ্রহতে কাটানোর দরকার পড়ে না নভোপুলিশদের, কপালের ফেরে পড়ে লম্বা সময় থাকতে হলেও সেই সময় স্বল্প অক্সিজেনের সাথে শরীরকে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্যে যথেষ্ট হয় না কখনোই। বৈরী পরিবেশে অক্সিজেন সঙ্গে নিয়ে চলাফেরা বেশ দুরূহ বলে স্বল্প-অক্সিজেনের গ্রহগুলো নিয়ে প্রশিক্ষণের সময় সকলেই চটে থাকে বলে এ ধরনের গ্রহের ব্যাপারে নভোকেন্দ্রের হুকুম একটু বেশিই কড়া। উপযুক্ত কারণ থাকার পরও যদি কেউ অবতরণ না করে ফাঁকি মারে, তার পেনশন কাটা যেতে পারে।
কিন্তু রোসিওর বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ পৃথিবীর চেয়ে অনেকগুণ বেশি। তাই যে নক্ষত্রটিকে ঘিরে রোসিও ঘুরছে, সেটি থেকে তার অবস্থান মোটামুটি দূরে হলেও গ্রিন হাউস ক্রিয়ার কারণে রোসিওর তাপমাত্রা মোটামুটি উষ্ণ, অন্ততপক্ষে বিষুবীয় অঞ্চলে তরল পানি ধারণ করার মতো। গ্রহটি পৃথিবীর মতোই কিছুটা হেলে আছে তার তারার দিকে, ফলে পৃথিবীর মতোই ঋতুচক্র রয়েছে। নভোকারাগার প্রকল্প সাধারণত মোটামুটি দুর্গম জায়গায় করা হয়, যাতে সহজে সেখান থেকে বেরিয়ে কয়েদীরা গ্রহের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। রোসিওর কারাগারটি বিষুবীয় অঞ্চলে একটি উঁচু পর্বতমালার মাঝে উপত্যকায়, যার চারপাশে দুর্গম পর্বতশ্রেণী। তাই এখানে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা, সবই মোটামুটি একরকম থাকে বছরভর। আঠারো থেকে কুড়ি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় একটা ভূমধ্যসাগরীয় বসন্তের আমেজ থাকার কথা। রোসিওর কয়েদীরা হয়তো খুব বড়সড় দাগী বদমাশ নয় বলেই এমন আরামের একটা নির্বাসন পেয়েছে। করবীর কারাগার একটা মরুভূমির মাঝে মরুদ্যানের মতো জায়গায়, শীত আর গ্রীষ্ম দুটোরই প্রকোপ সাংঘাতিক। রোসিওর কয়েদীরা নিশ্চয়ই বছরভর শস্য ফলাতে পারে।
মকবুল গলা চড়িয়ে বললো, "রোসিওর কারাগার প্রকল্পের নকশা দেখাও, সঙ্গে এখনকার ছবি।"
গ্লুপ করে একটা শব্দ করে পাল্টে গেলো হলোগ্রাম, রোসিওর কারাগার প্রকল্পের কাকদৃষ্টি নকশা ভেসে উঠলো। মূল নকশায় আছে ভেড়ার খামার, মুরগির খামার, ক্ষেত, ছোটো নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র, পানি পরিশোধন কেন্দ্র, আবহাওয়া কেন্দ্র, যোগাযোগ কেন্দ্র, আবাসিক এলাকা, তৃণভূমি আর বনভূমি।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। নকশার সাথে খুব বেশি মিল থাকার কথাও নয়, পঞ্চাশ বছরে বহু পরিবর্তন আসাই স্বাভাবিক। কম্পিউটারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্ষেত, তৃণভূমি আর বনভূমি ছাড়া আর কোনোকিছুই নকশা অনুযায়ী তৈরি করা হয়নি। বেশ কিছু পুকুর দেখা যাচ্ছে কারাগার প্রকল্প এলাকায়, আর প্রচুর ঘরবাড়ি। এরা মনে হয় আরামদায়ক পরিবেশ পেয়ে খরগোশের মতো বংশবৃদ্ধি করে গেছে গত পাঁচ দশকে, ভাবলো মকবুল। পুকুর থাকার অর্থ হচ্ছে, যে হ্রদের পাশে বসতি তোলা হয়েছে, তার পানি সম্ভবত সুপেয় নয়। আলাদাভাবে মাছ চাষও করতে পারে, কিছুই বলা যায় না। ক্ষেত আর তৃণভূমির মাঝে ছড়িয়ে আছে টুকরো টুকরো গাছের বাগান, তাকে বনভূমি ঠিক বলা চলে না। কয়েদীদের রসদের সাথে বিশেষভাবে সংরক্ষিত বীজ দেয়া হয়, তারা সেগুলো অবস্থা বুঝে যাতে কাজে লাগাতে পারে। রোসিওর অবস্থা দেখে মনে হয়, এরা বেশ ভালোই কাজে লাগিয়েছে সেগুলোকে।
মকবুল আবহাওয়া কেন্দ্রটাকে দেখতে পেলো বসতি থেকে দূরে একটা জায়গায়। মূল নকশাতেও তেমনই রাখা আছে। এরা বোধহয় এই একটা জিনিসই মেনে চলতে পেরেছে। আবহাওয়া কেন্দ্রের পাশে একটা চতুষ্কোণাকৃতির দেয়ালঘেরা জমি দেখা যাচ্ছে, সেটা কী কাজে লাগে কে জানে? যোগাযোগকেন্দ্র আবাসিক এলাকার একেবারে মাঝে থাকার কথা, কিন্তু এরা যোগাযোগকেন্দ্র স্থাপন করেছে এক পাশে, একটু দূরে।
মকবুল অনুভব করলো, তার শরীর ঘুম চায়। কাপের পর কাপ কফি খেয়েও আর জেগে থাকা সম্ভব নয়। সে পর্যবেক্ষণ বে-র মেঝে ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, "মৌখিক যোগাযোগ নিষ্ক্রিয় করা হোক।"
মৃদু গুঞ্জণ করে নীরব হয়ে গেলো কম্পিউটার। পর্যবেক্ষণ বে ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময় মকবুলের মনে হলো, কী যেন একটা দেখা হয়নি তার, অথচ সেটা দেখা জরুরি ছিলো। ক্লাসে মার্থা একটা কথা তাদের বার বার বলতো, মিশনে তোমাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু তোমাদের সুস্থ মন। অবসন্ন মকবুলের সুস্থ মন ক্লান্তির স্তুপ ঠেলে কী যেন বলতে চাইছে তাকে, মকবুল বুঝতে পারছে না। হয়তো টানা ঘুম দিয়ে ওঠার পর সে ধরতে পারবে।
মকবুল ক্লান্ত পায়ে এগিয়ে গেলো নিজের বাঙ্কারের দিকে। ঘুম থেকে উঠে রোসিওতে নামবে সে।
গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে মকবুলের মনে হলো, রোসিওর চতুর্থ চাহিদাপত্রটি তার দেখা প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু সেটা দেখার উপায় নেই, নভোকেন্দ্রের তথ্যভাণ্ডারে সেটি কখনোই জমা পড়েনি।
২.
অবতরণযানে বসে মকবুল মনে মনে পঞ্চাশ-ষাটটা করে গালি দিচ্ছিলো রোসিওবাসীদের।
নামার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত রেডিওতে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে গেছে সে। নভোপুলিশের স্কাউটশিপ থেকে সঙ্কেত পেলে যোগাযোগকেন্দ্র থেকে একটা জোর অ্যালার্ম বেজে ওঠার কথা। শুধু অ্যালার্মই নয়, যোগাযোগকেন্দ্রের লাল বিকনটাও জ্বলতে-নিভতে থাকে। একটা অ্যামবুলেন্সকে যেমন অগ্রাহ্য করা যায় না, নভোপুলিশের তরফ থেকে যোগাযোগ করলেও তা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। কে জানে, হয়তো এগুলো সবই বিকল হয়ে পড়ে আছে। কুড়ি বছর আগে শেষবারের মতো এসবের রক্ষণাবেক্ষণ করে গেছে কোনো এক কমাণ্ডার, তারপর হয়তো প্রাকৃতিক কারণেই কিছু একটা ত্রুটি ঘটেছে। কিন্তু কারণ যা-ই হোক, মকবুলকে নিচে নামতে হচ্ছে। তার মেজাজটাও বিগড়ে আছে সেই কারণেই।
তিনদিন চলার মতো বাড়তি অক্সিজেন সাথে নিয়েছে মকবুল, যদিও বড়জোর দশ বারো ঘন্টার বেশি কাজ তার উপস্থিতি দাবি করে না। চাহিদাপত্রের অভাবে কিছু সাধারণ রসদ সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে সে, সেগুলো কয়েদীদের পালের গোদার হাতে তুলে দেবে সে। আবহাওয়া কেন্দ্র, যোগাযোগ কেন্দ্র, শক্তি কেন্দ্র আর পানি পরিশোধন কেন্দ্রের যন্ত্রপাতির একটা রুটিন চেক করবে, আর লোকজনের সাথে কথাবার্তা বলে তাদের সমস্যা আর দাবির কথা নোট করে নিয়ে আসবে। এর বাইরে বাড়তি কাজ হতে পারে যদি কোনো যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে থাকে সেটা সারানো, আর মদখোর কেউ গায়ে পড়ে মারপিট করতে এলে তাকে ধরে প্যাঁদানো। পরিস্থিতি খুব খারাপ হলে তাকে অস্ত্রের ভাষায় কথা বলতে হতে পারে, তবে ব্যাপারটা সচরাচর ঘটে না। পুলিশের সাথে পাঙ্গা নিতে গেলে কয়েদীদেরই সমস্যা বাড়বে পরে। তারপরও মকবুল প্রস্তুত আছে, বিশেষ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে সে। নভোপুলিশকে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র দেয়া হয়, রোসিওর কয়েদীদের ক্যাটেগোরি বিবেচনা করে মকবুল সাথে নিয়েছে চেতনানাশক বুলেটসহ আগ্নেয়াস্ত্র। প্রতিটি অস্ত্রই একান্ত মকবুলের ব্যবহারের জন্যে সেট করা, কোনো কারণে অস্ত্র তার হাত থেকে অন্য কারো হাতে গিয়ে পড়লেও ক্ষতি নেই, মকবুলের আঙুলের ছাপ না পেলে কাজ করবে না এসব অস্ত্র। পুরোনো দিনের আগ্নেয়াস্ত্রও দুয়েকটা আছে টিম্বাকটুতে, কিন্তু মকবুল নতুন "বুদ্ধিমান" অস্ত্র চালিয়ে বেশি অভ্যস্ত, সে এতেই স্বস্তিবোধ করে। ইলেকট্রনিক নিয়ন্ত্রণ আর লক্ষ্যভেদ ব্যবস্থা থাকায় এসব অস্ত্র চালাতে নিজের ঝুঁকি কম। প্রতিটি বুলেটই হননক্ষম, কিন্তু মকবুল সাধারণত শত্রুর ঊরু বা কাঁধে গুলি করে। বুলেটের ভেতরে যে রাসায়নিক রয়েছে, তা রক্তের সাথে মিশে গেলে কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে পূর্ণবয়স্ক মানুষকে অচেতন করে ফেলে, খুনখারাপি ছাড়াই শত্রুকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়ার ব্যাপারে এসব বুলেট মোক্ষম।
মকবুল রোসিওর অণুজীবের ওপর রিপোর্ট খুঁটিয়ে দেখেছে, এককোষী-বহুকোষী সব ধরনের প্রাণই সেখানে আছে, তবে নিম্নস্তরের, মানুষের জন্যে ক্ষতিকারক নয়। শেষ রিপোর্ট ছত্রাকের কথা বলা হয়েছিলো, কয়েক ধরনের ছত্রাক রোসিওতে পাওয়া গেছে, কিন্তু সেগুলো নিয়ে বড় কোনো অভিযোগ ওঠেনি। তবুও মকবুলকে প্রতিরোধী পোশাক পরে নামতে হবে, বলা যায় না, করবীর মতো এখানেও যদি ব্যাকটিরিয়ার উৎপাত দেখা দেয়?
রোসিওর বায়ুমণ্ডলের বেশ খানিকটা ভেতরে ঢুকে মকবুল পর্যবেক্ষণের জানালার ওপর থেকে ধাতব আবরণ সরিয়ে নিলো। রোসিওর যে অংশে সে নামতে যাচ্ছে, সেখানে এখন বেলা মোটামুটি দুপুর। নিচে পাহাড়ি ভূমি দেখা যাচ্ছে টুকরো টুকরো মেঘের ফাঁকে। পৃথিবীর মতো রোসিওতে এতো পানি নেই, সাগরগুলো এখানে ছোটো আর বিভক্ত। আরেকটু নিচে নামার পর পাহাড়ের শরীর বেয়ে নেমে আসা নদী চোখে পড়লো তার। কারাগার প্রকল্প এলাকার বাইরেও বসতি স্থাপন করার মতো অনেক জায়গা আছে তাহলে রোসিওতে। ফিরে গিয়ে মকবুল রোসিওর চারপাশে কয়েকটা কক্ষপথে চক্কর মেরে ভৌগোলিক তথ্য সংগ্রহ করবে। যদি সবকিছু ঠিক থাকে, তাহলে রোসিওতে বড় একটা কলোনি পাঠানোর সুপারিশ করবে সে। উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণসহ এই সুপারিশ দাখিল করতে পারলে বোনাস পাবে মকবুল। করবীর ক্ষেত্রে যেমন বোনাসের সুযোগ মেলেনি এ যাত্রা, গ্রহটা নতুন কলোনির জন্যে একেবারেই উপযোগী নয়।
কারাগার প্রকল্পকে ঘিরে দেয়ালের মতো যে বিশাল পর্বতশ্রেণী মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে, তার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় মুগ্ধ হলো মকবুল। সাদা বরফে ঢাকা চূড়ার পেছনে নীল আকাশ, কোথাও বরফের আবরণ সরিয়ে কুচকুচে কালো পাথুরে শ্বদন্ত বেরিয়ে এসেছে। পাহাড়ের ঢালে একসময় বরফরেখা হারিয়ে গেছে, শুরু হয়েছে অনাবৃত কালো-ধূসর-লাল পাথর, একসময় সে পাথুরে শরীর গিয়ে মিশেছে সবুজে। তৃণভূমি নিজস্ব নিয়মে উঠে এসেছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। তবে পৃথিবীর মতো ঢালাও সবুজ নয়, ইতস্তত সবুজের ছোপ পাহাড়ের গায়ে। ঘাস গজানোর মতো মাটি বোধহয় এখনও তৈরি হয়নি এখানে। আরো দূরে, আরো নিচে ছোটো ছোটো খেত, সেখানে সবুজ, হলুদ, সোনালি, সব রঙের শস্যই আছে দেখা যাচ্ছে। উল্টোদিকে বেশ বড় বড় গাছের সারি চলে গেছে।
নভোপুলিশের নিজস্ব মেরুন রঙের অবতরণযান যদি কারো চোখে নাও পড়ে থাকে, অবতরণের সময় যে জেট চালু হয়, তার গর্জনই রোসিওর কয়েদীদের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্যে যথেষ্ট। মকবুল নিরাপদে আর নির্বিঘ্নে রোসিওর কারাগার প্রকল্পের এক প্রান্তে আবহাওয়া কেন্দ্র থেকে কয়েকশো মিটার দূরে নামালো যানটাকে।
জায়গাটা আসলেও অপূর্ব। দূরে চারিদিকে পাহাড়ের সারি চারদিকে, বেলা দশটার আগে বোধহয় কেউই এখানে সূর্য দেখতে পায় না। যে হ্রদের পাশে কারাগার প্রকল্প, তার রং ঝকঝকে নীল। আকাশে টুকরো টুকরো পেঁজা তুলোর মতো মেঘ উড়ছে। কিলোমিটার খানিক দূরে দেখা যাচ্ছে ঘরবাড়ি। মকবুল তার হেলমেটের শক্তিশালী টেলিস্কোপ চোখের সামনে এনে দেখলো, বেশ কিছু মানুষ এসে জড়ো হয়েছে একটা চত্বরের মতো জায়গায়। যাক, লোকজন বেঁচে আছে তাহলে।
অবতরণযানের হ্যাচ খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো মকবুল, তার পরনে বায়ুরোধী পোশাক, কোনো কিছুই ঢুকতে পারবে না এর ভেতরে। পোশাকটা হালকা হলেও খুব ত্বরিত নড়াচড়ার জন্যে সুবিধাজনক নয়, যে কারণে প্রশিক্ষণের সময় এটা নিয়ে সবাই খুব চটে থাকতো। চটপটে কয়েকজন যদি হঠাৎ করে চারপাশ থেকে আক্রমণ করে, সামলাতে মকবুলকে খুব বেগ পেতে হবে।
কোমরের হোলস্টারে ইলেকট্রনিক পিস্তলটা গুঁজে কয়েকবার শূন্যে লাফ দিলো মকবুল, তারপর হাত পা টানটান করে জড়তা কাটিয়ে নিলো। লোকগুলো হারামিপনা না করলে তাকে শারীরিক বলপ্রয়োগে যেতে হবে না। কিন্তু যদি যেতে হয়, তার জন্যে তৈরি থাকবে মকবুল।
এখনই রসদ নামাবে না সে, আগে পরিস্থিতি এক নজর দেখে আসা দরকার। চলে যাওয়ার সময় নামিয়ে মালসামানা বুঝিয়ে দিলেই চলবে। ইনসুলিনের কয়েকটা বাক্স নিয়ে এসেছে সে, প্ল্যান্ট না পেয়ে যদি লোকগুলো ক্ষেপে যায়, ওষুধ দিয়ে তাদের কিছুটা শান্ত করা যাবে।
মকবুল যদিও জানে ব্যাপারটা, কিন্তু শূন্যে লাফানোর সময় সে আক্ষরিক অর্থেই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে, রোসিওর অভিকর্ষজ ত্বরণ পৃথিবীর চেয়ে অনেক কম। ব্যাপারটা মকবুলের কাজের জন্যে আপাতত সুবিধাজনক। তবে দীর্ঘদিন কম অভিকর্ষজ ত্বরণে থাকলে হাড় আর পেশীর ওপর প্রভাব পড়ে। মকবুল তার তত্ত্বীয় ক্লাসের শিক্ষা স্মরণ করলো, রোসিওতে কয়েক হাজার বছর পর গাছগুলো হবে বড়সড় আর লোকগুলো হবে হালকা পাতলা।
হেলমেটের টেলিস্কোপ আবার চোখে তুলে মকবুল দেখতে পেলো, বাইসাইকেল চালিয়ে একটা লোক আসছে এদিকে। কিছুটা কৌতুক অনুভব করলো সে, নভোকারাগার প্রকল্পে বাইসাইকেল দেয়া হয়েছে ভেবে। জিনিসটা অন্তত কোনো চাহিদাপত্রে ছিলো না।
মকবুল জোরে পা চালিয়ে আবহাওয়া কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে গেলো, সময় নষ্ট না করে কাজ শুরু করে দেয়া দরকার।
আবহাওয়াকেন্দ্রের পাশে ওপর থেকে যে চারকোণা দেয়ালঘেরা জমিটা দেখতে পেয়েছিলো মকবুল, সেটার পাশ ধরেই চলছে সে। দেয়াল নয়, বরং ফুট দুয়েক উঁচু চুনাপাথরের চাঙর পাশাপাশি রেখে একটা সীমানা তৈরি করা হয়েছে কেবল। ভেতরে উঁকি দিয়ে মকবুল বুঝতে পারলো, জায়গাটা ঠিক কোন কাজে ব্যবহার করা হয়। এটা একটা সমাধিক্ষেত্র।
বাইসাইকেলটা অনেকখানি এগিয়ে এসেছে দেখে মকবুল স্থির করলো, গোরস্থানের ভেতরটা একটু ঢুকে দেখবে সে। বেশ কিছুটা দূরে গোরস্থানের প্রবেশ দ্বার দেখা যাচ্ছে, এক মানুষ সমান উঁচু পাথরের কলাম দিয়ে তৈরি, কিন্তু অতদূর হেঁটে গিয়ে ভেতরে ঢোকার দরকার কী, যখন ছোট্টো একটা লাফ দিলেই সীমানা টপকে ভেতরে ঢোকা যায়?
গোরস্থানটা বেশ বড়সড় হলেও তার সবটুকু জায়গা সমাধি নিয়ে নয়। ভেতরে এক চতুর্থাংশের মতো জায়গায় সমাধিপ্রস্তর চোখে পড়লো মকবুলের, বাকি জায়গাটুকু ঘাসে ছাওয়া। সমাধির অংশটুকু গোছানো, পরিপাটি, বাকি অংশের ঘাস অযত্নে বেড়ে ওঠা।
মকবুল এগিয়ে গিয়ে কয়েকটা সমাধিপ্রস্তরে লেখা নাম খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। চুনাপাথর নয়, গ্রানাইটের পাতলা অমসৃণ স্ল্যাবে খোদাই করে লেখা বিভিন্ন নাম, বেশির ভাগই রোমান হরফে, তবে চীনা, সিরিলিক আর দেবনাগরীও রয়েছে। মকবুল হেলমেটের ভেতরের স্ক্রিনে ডেটাবেজ খুলে নামগুলো মিলিয়ে দেখতে লাগলো। ইংরেজি, ফরাসি, হিসপানিক, জার্মান, নানা ভাষায় নামের নিচে কিছু কথা লেখা।
"এখানে শায়িতা আছে রোজমেরি ফ্র্যাঙ্কলিন, ছয় সন্তানের গর্বিতা মাতা। মৃত্যু: ২১ সন।" মকবুল বিড়বিড় করে বললো, "রোজমেরি ফ্র্যাঙ্কলিন।" হেলমেটের ভেতরের স্ক্রিনে ভেসে উঠলো এক যুবতীর বিষণ্ন সুন্দর মুখ। রোজমেরি ফ্র্যাঙ্কলিন, পেশায় ঋণ ঝুঁকি বিশেষজ্ঞ, অপরাধ মদ্যপ অবস্থায় আরেক তরুণীকে বোতল দিয়ে প্রহার।
মকবুল এর পরের সমাধির দিকে এগিয়ে গেলো। "জাঁ কুস্তো, একজন আদর্শ নাগরিক। মৃত্যু: ২৪ সন।" ডেটাবেজ জানালো, জাঁ কুস্তো একজন ফরাসি সাংবাদিক, পুলিশকে ঘুষ দেয়ার অপরাধে দণ্ডিত।
কয়েকটা নাম মিলিয়ে দেখে মকবুলের আগ্রহ মরে গেলো। তবে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলো সে, এখানে কারোই জন্মসাল উল্লেখ করা নেই। মৃত্যুসাল যেভাবে লেখা, তাতে বোঝা যায়, রোসিওবাসী এখানে ক্যালেণ্ডার শুরু করেছে এই গ্রহে নিজেদের পদার্পণের দিনকে প্রথম দিন ধরে নিয়ে।
কয়েকটা কবর পার হওয়ার পর মকবুল দেখলো, এরপরের কবরগুলো ছোটো ছোটো। ছোটো কবরের সংখ্যাই বেশি। ছোটো কবরের সমাধিপ্রস্তরগুলো ক্রমশ মসৃণ, সেটাতে খোদাইয়ের শৈলীও বড়দের নামফলকের চেয়ে সুন্দর। একটা কবরের নাম দেখলো মকবুল, আমির হালেব, মৃত্যু: ৩৩ সন। কবরের আকার দেখে বোঝা যায়, অল্প বয়সেই মৃত্যু হয়েছে বাচ্চাটার।
শিশুদের সারি সারি কবরের পাশ দিয়ে চলতে চলতে মকবুলের মনটা একটু ভারি হয়ে এলো। কোনো কারণে এখানে শিশুমৃত্যুর হার বেশি। তার মানে অনেক বুড়ো এখনও বেঁচে আছে, কিন্তু বাচ্চাদের অনেকেই টিকতে পারছে না। কেন? কোনো অজানা রোগ?
গোরস্থানের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসেই বাইসাইকেল আরোহীর মুখোমুখি হলো মকবুল।
প্রথমে যে ব্যাপারটা মকবুলের নজর কাড়লো, সেটা আরোহী নয়, বরং সাইকেলটাই। সাইকেলটা কেবল পুরোনোই নয়, দেখতেও নড়বড়ে আর এবড়োখেবড়ো। এই সাইকেল পৃথিবী থেকে আসেনি, এখানেই বানানো হয়েছে। সাইকেলের কাঠামোটা বেত দিয়ে তৈরি, টায়ারগুলো এবড়োখেবড়ো রাবারের, স্পোকগুলো ইস্পাতের। জিনিসটা দেখতে মোটেও সুন্দর নয়, কিন্তু কাজ যে চলে যায়, সেটা বোঝা যায় পরিষ্কার। এর মালিক অনেকদিন ধরে এটি ব্যবহারই যে করছে, শুধু তা-ই নয়, যত্নও নিচ্ছে, কারণ সাইকেলটা পরিষ্কার, স্পোকগুলো ঝকমক করছে। সাইকেলটার হ্যাণ্ডলবার এক হাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে তার আরোহী।
আরোহীর দিকে চোখ পড়ার পর মকবুল আরেকটু বিস্মিত হলো। লোকটা বয়সে যুবক, মকবুলের মতোই হবে বয়স, কিন্তু চেহারার মধ্যে একটা অপুষ্ট ভাব আছে। উচ্চতায় মকবুলে চেয়ে ঝাড়া এক ফুট খাটো লোকটার পরনের পোশাক শণের তৈরি, হাঁটু পর্যন্ত লম্বা রোমান টিউনিকের মতো একটা পোশাক, হাতা ছাড়া। রুগ্ন কিন্তু পাকানো হাতের পেশী দেখে বোঝা যায়, শ্রমঘন কাজ করে অভ্যস্ত সে। কোমরে একটা চওড়া বেল্ট, সেই বেল্ট থেকে একটা খাটো তলোয়ার ঝুলছে, যেটা ঊরুর সাথেও ফিতা দিয়ে বাঁধা। তলোয়ারের বাঁটটা কাঠের তৈরি, তাতে সরু সুতো প্যাঁচানো। আর সবচেয়ে যেটা বেমানান, লোকটার হাত পা সরু সরু হলেও পেটটা মোটাসোটা। তার পায়ের জুতোজোড়া খড় আর রাবার দিয়ে তৈরি।
"রোসিওতে স্বাগতম।" ঘড়ঘড়ে গলায় ইংরেজিতে বললো যুবক। "আমি হুলিও, পাহাড়গ্রামের শেরিফ।"
মকবুল হেলমেটের স্পিকার অন করে হাত তুলে অভিবাদন জানালো। "কমাণ্ডার মকবুল, তৃতীয় কোম্পানি, দ্বিতীয় ব্যাটেলিয়ন, নভোপুলিশ। অভিবাদন শেরিফ।"
হুলিও খুব মনোযোগ দিয়ে মকবুলের পরিচ্ছদ দেখে নিয়ে (বিশেষ করে হোলস্টারে গোঁজা পিস্তলটা) বললো, "গোরস্থানে কী করছেন কমাণ্ডার?"
মকবুল হুলিওর প্রশ্নে কাঠিন্যের সুর টের পেয়ে বিরক্ত হলো। "কিছু না শেরিফ, এমনিতেই ঢুকে দেখছিলাম।"
হুলিও নিষ্পলক চোখ মকবুলের চোখে রেখে আবার প্রশ্ন করলো, "কী দেখলেন?"
মকবুল লোকটাকে না চটানোর সিদ্ধান্ত নিলো। "অনেক বাচ্চা মারা গেছে দেখলাম। আপনাদের এদিকে কি কোনো ধরনের বড় অসুখ, মহামারী এসব হয়েছে নাকি?"
হুলিও কথাটার কোনো উত্তর দিলো না। কিছুক্ষণ মকবুলের দিকে তাকিয়ে থেকে সে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে সাইকেলে চড়লো, তারপর মকবুলের দিকে না তাকিয়ে বললো, "আসুন আপনাকে নগরপালের কাছে নিয়ে যাই।"
মকবুল লম্বা পা ফেলে হুলিওর পাশে চলতে লাগলো, লোকটা শ্লথ গতিতে চালাচ্ছে বাইসাইকেল। কিন্তু চালানোর ভঙ্গি দেখে বোঝা যায়, সাইকেল চালাতে সে বিশেষ দক্ষ।
"পাহাড়গ্রাম কি এই কলোনির নাম?" মকবুল নীরবতা ভাঙলো মিনিট দুয়েক পথ চলার পর।
"হ্যাঁ।" সংক্ষিপ্ত উত্তর এলো হুলিওর কাছ থেকে।
"আরো কলোনি আছে নাকি এটাই একমাত্র?"
হুলিও বিরস গলায় বললো, "এটাই একমাত্র কলোনি কমাণ্ডার।"
আবহাওয়া কেন্দ্রের সামনে এসে মকবুল সিদ্ধান্ত নিলো, যন্ত্রপাতি পরীক্ষার কাজটা এখনই সেরে নেয়া ভালো। যতো সময় যাবে সে ক্লান্ত হয়ে পড়বে, কাজে ত্রুটি হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।
"হুলিও, আপনি অপেক্ষা করবেন একটু? আমি আবহাওয়া কেন্দ্রের মেইনটেন্যান্সটা করে ফেলি।"
হুলিও বিনা বাক্যব্যয়ে সাইকেল থামিয়ে নেমে দাঁড়ালো। মকবুল খেয়াল করলো, হুলিও রোগা হলেও তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা টানটান। শেরিফ হিসেবে লোকটা মনে হয় খারাপ নয়। কিন্তু এমন দুবলা শেরিফ কেন বাছাই করেছে এরা?
আবহাওয়া কেন্দ্র খুব জটিল কিছু নয়, বাতাসের গতিবেগ, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা ইত্যাদি তথ্য পরিমাপ করে সঞ্চয় করে রাখা হয়, শক্তিশালী একটা যোগাযোগ মডিউলের মাধ্যমে মহাকাশ থেকেই সেসব তথ্য ডাউনলোড করা সম্ভব। একটা ছোটো বায়ু টারবাইন দিয়ে কেন্দ্রের ব্যাটারি চাঙা রাখা হয় সবসময়। মকবুল মিনিট বিশেক ধরে প্রতিটি মডিউল পরীক্ষা করে দেখলো। সবকিছুই ঠিক আছে। যাওয়ার সময় শুধু লুব্রিক্যান্ট পাল্টে দিয়ে গেলেই হবে।
আবহাওয়া কেন্দ্রের সংকীর্ণ কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে মকবুল দেখলো, হুলিওর পাশে আরেক যুবক এসে দাঁড়িয়ে আছে। এরও শারীরিক গড়ন আর পোশাক হুবহু হুলিওর মতো, কিন্তু বয়স হুলিওর চেয়ে কম। শুধু তা-ই নয়, বেচারার সাইকেলও নেই। তবে সেই দারিদ্র্য সে পুষিয়ে নিয়েছে অন্যভাবে। এর হাতে ধরা একটা বড় বল্লম। বল্লমের ফলাটা অনেক চওড়া এবং ধারালো।
মকবুল ঠিক করলো, নভোপুলিশের কমাণ্ডার হিসেবে পরিস্থিতি এখন নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা প্রয়োজন তার। কর্কশ কণ্ঠে গর্জন করে উঠলো সে, "কে তুমি?"
তরুণ থতমত খেয়ে আমতা আমতা করে বললো, "দি-দিমিত্রি, আমার নাম দিমিত্রি!"
মকবুলের হোলস্টার থেকে পিস্তলটা বার করার পর চটাশ করে একটা শব্দ হয় স্প্রিং লাগানো ফ্ল্যাপের, সেই শব্দটা দিমিত্রি আর হুলিও, দুজনকেই চমকে দিলো।
"সোজা পেছনে ফিরে যেদিক থেকে এসেছো সেদিকে হাঁটো। ডবল কদম। জলদি জলদি জলদি!"
দিমিত্রি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হুলিওর দিকে একবার, আরেকবার মকবুলের দিতে তাকালো। "আ-আমি তো, আমি তো ...।"
"পা চালা!" হুঙ্কার দিলো মকবুল।
দিমিত্রি মুখ কালো করে দুই হাতে বল্লমটা ধরে পেছনে ফিরে আস্তে আস্তে ছুটতে লাগলো। মকবুল লক্ষ্য করলো, দিমিত্রির দৌড়ানোর ভঙ্গিতে অভ্যাস আর শৃঙ্খলার ছাপ আছে। এই ছোকরা প্যারেড আর পিটি করে অভ্যস্ত।
হুলিও কোনো কথা না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো সাইকেল ধরে।
মকবুল কর্কশ গলায় বললো, "এ কে?"
হুলিও আগের মতোই বিরস কিন্তু অবিচলিত কণ্ঠে বললো, "দিমিত্রি নগরপালের দেহরক্ষী। আপনাকে সঙ্গ দিতে এসেছিলো।"
মকবুল কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে হুলিওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, "শেরিফ, আমি যতক্ষণ রোসিওতে আছি, সব ধরনের অস্ত্র খাপের ভেতরে থাকুক, তা-ই চাই। আপনি এর দায়িত্ব নিন, এই মুহূর্ত থেকে। ঠিক আছে?"
হুলিও নিষ্পলক চোখে কিছুক্ষণ মকবুলের পিস্তলের দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা ঝাঁকালো। "ঠিক আছে।"
মকবুল বললো, "চলুন তবে।"
হুলিও সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিলো বিনা বাক্যব্যয়ে। মকবুল পিস্তলটা আবার হোলস্টারে গুঁজলো।
চলতে চলতে পথের দুই পাশে গাছপালা দেখতে পেলো সে। জলপাই, ডুমুর আর আপেল গাছ ছাড়াও কয়েকটা তরুণ ওক গাছ মাথা উঁচিয়ে আছে। মৃদু হাওয়ায় দুলছে গাছের পাতা। পৃথিবীর সাথে পার্থক্য একটাই, কোনো পাখির ডাক নেই। শুধু গাছের সরসর শব্দ, আর দূর থেকে ভেসে আসা মানুষের কণ্ঠ।
দূরে চত্বরে বেশ কয়েকজন মানুষ এসে জমায়েত হয়েছে, দেখতে পেলো মকবুল। আড়চোখে হুলিওর দিকে তাকিয়ে হেলমেটের টেলিস্কোপটা চোখের সামনে এনে সে দেখলো, রঙিন কাপড় পরা এক বুড়ো কুঁজো হয়ে হাতের লাঠির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, দিমিত্রি তার পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে, বল্লমটা তার হাতে ধরা। বুড়োর পাশে আরো কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে। মকবুল খুঁটিয়ে দেখলো, এদের প্রত্যেকেই রোগাভোগা চেহারার। এরা তো বেশ চাষবাস করে দেখা যাচ্ছে, তাহলে এমন ভুখা চেহারা কেন? বদহজমের রোগ নাকি?
ইনসুলিনের কথাটা মনে পড়তেই মকবুল চমকে উঠলো। এরা কি সবাই ডায়াবেটিস রোগী নাকি?
জোর কদমে পা চালিয়ে পাথুরে চত্বরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দলটার কাছে হাজির হলো মকবুল। হুলিও একটু পেছনে সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়ালো চুপচাপ।
"অভিবাদন, মান্যবর।" হাত তুলে অভিবাদন জানিয়ে নিজের পরিচয় দিলো মকবুল।
বুড়ো লোকটা বয়সের ভারে একটু ঝুঁকে দাঁড়ালেও সে দৈর্ঘ্যে আশপাশের লোকগুলোর চেয়ে এককালে বেশিই ছিলো, বোঝা যায়। সবারই পরনে শণের টিউনিক, বুড়োরও পরনে তা-ই, কিন্তু টিউনিকের ওপর একটা রঙিন উলের শাল পরে আছে সে। শালটায় বেশ চমৎকার একটা নকশা।
বুড়ো লাঠিতে ভর দিয়ে ঠকঠক করে দু'পা এগিয়ে এসে কম্পিত কিন্তু চড়া গলায় বললো, "আমি এভানগেলোস, এই পাহাড়গ্রামের নগরপাল। তোমাকে স্বাগতম হে পৃথিবীবাসী!"
মকবুল স্পিকার অফ করে দিয়ে বিড়বিড় করে হেলমেটের অভ্যন্তর স্ক্রিনে নামের তালিকা খুলে পরীক্ষা করতে লাগলো। এভানগেলোস উচ্চারণ করার সাথে সাথে একটা ভুক্তি খুলে গেলো। এভানগেলোস সিমিতিস, পেশায় পেশাদার পকেটমার, অপরাধ একই। ব্যঙ্গের হাসি মুখে নিয়ে যে তরুণের ছবি সেই ভুক্তিতে আছে, তার সাথে এই বৃদ্ধ মেয়রের চেহারার সাদৃশ্য সামান্যই।
স্পিকার অন করে মকবুল বললো, "মান্যবর নগরপাল, আমি আপনাদের জন্যে পৃথিবীর পক্ষ থেকে রসদ নিয়ে এসেছি। একই সাথে আমি শক্তিকেন্দ্র, পানি পরিশোধন কেন্দ্র আর যোগাযোগ কেন্দ্র পরীক্ষা করে দেখবো।"
এভানগেলোস মকবুলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হেঁড়ে গলায় বলে উঠলো, "কী বললে?"
দিমিত্রি এগিয়ে এসে এভানগেলোসের কানের কাছে চেঁচিয়ে বললো, "ও রসদ নিয়ে এসেছে! আর শক্তিকেন্দ্র পানিকেন্দ্র ভোঁভোঁকেন্দ্র পরীক্ষা করে দেখতে চায়!"
এভানগেলোস ফোকলা হেসে বললো, "নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই! কী রসদ এনেছো দেখি?"
মকবুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে গলা চড়িয়ে বললো, "দেখাবো। কিন্তু তার আগে বলুন, আমি দু'দিন ধরে যোগাযোগ কেন্দ্রে সঙ্কেত পাঠিয়ে কোনো উত্তর পেলাম না কেন?"
এভানগেলোস পেছনে দাঁড়ানো এক যুবককে বললো, "য়্যাই ছোকরা, তুই বল দেখি। দারোগা সাহেব উত্তর পায়নি কেন? উত্তর দে হারামজাদা!"
চশমা পরা এক রুগ্ন যুবক কয়েক পা এগিয়ে এসে অভিবাদন জানালো। "কমাণ্ডার, আমি এমিল, যোগাযোগকেন্দ্রের দায়িত্বে আমি আছি।"
মকবুল এমিলের দিকে তাকিয়ে বললো, "আমি কোনো সিগনাল পাইনি। কী সমস্যা?"
এমিল অসহায়ের মতো কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো, "ট্র্যান্সমিটারে কোনো একটা সমস্যা হয়েছে। আমরা কিন্তু গতকাল থেকেই অ্যালার্মের জ্বালায় নাজেহাল। সেই দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত একটু পর পর অ্যালার্ম বেজেই যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের করার কিছু ছিলো না।"
মকবুল এভানগেলোসের দিকে তাকিয়ে বললো, "আমি যোগাযোগ কেন্দ্র পরীক্ষা করতে যাচ্ছি। আপনার সাথে তারপর কলোনি নিয়ে আলাপ করবো।"
এভানগেলোস ফোকলা হেসে সোৎসাহে বললো, "আরে শুধু আমার সঙ্গে কেন? কাউন্সিলের সবার সঙ্গেই কথা বলবে। তারা সবাই আসবে ভোজে।"
মকবুল থমকে দাঁড়ালো। "কীসের ভোজ?"
এভানগেলোস হাত নেড়ে বললো, "পৃথিবী থেকে এসেছো তুমি, ভোজ হবে না? আজ রাতে মান্যিগন্যিদের সঙ্গে একটা ভোজ আছে। আগামীকাল ছুটি, আগামীকাল হবে বড় ভোজ। এই, এই যে হুলিও, অকম্মার ঢেঁকি, লটারি হয়েছে, য়্যাঁ?"
হুলিও স্বল্পবাক মানুষ, বোঝা গেলো, সে বিরস নির্লিপ্ত মুখে বললো, "হ্যাঁ।"
এভানগেলোস বললো, "কয়জনকে ডাকছিস তাহলে?"
হুলিও নিরুত্তাপ কণ্ঠে বললো, "দুইশো।"
এভানগেলোস খনখনে গলায় বকতে লাগলো, "দুইশো জনের পাত পড়বে? য়্যাঁ? বলিস কী? লেকের ধারে টেবিল পাতার ব্যবস্থা করতে বল মেলিন্দাকে। আর রাঁধুনি কে এবার? সেই রাক্ষুসী ফোকলা অপয়া বুড়িটা নাকি? টমাটো আর তেঁতুলের ব্যবস্থা হয়েছে? ..."
মকবুল এমিলের বাহু ধরে টান দিয়ে বললো, "চলো।"
এমিল কথা না বাড়িয়ে জোরে পা চালালো।
"এখানে লোক ক'জন এখন?" মকবুল চাপা গলায় প্রশ্ন করলো। পেছনে এভানগেলোসের তীক্ষ্ণ কাউকাউ শোনা যাচ্ছে এখনও, দিমিত্রিকে মা বাবা তুলে বকা দিচ্ছে সে।
"আটশো বারো জন।" এমিল প্রায় সাথে সাথেই জবাব দিলো।
"আটশো বারো? আটশো বারোজন?" মকবুল একটু চমকে উঠলো। পঞ্চাশজন মানুষ পঞ্চাশ বছর পর আটশো বারোজনের একটা সমাজ গড়ে তুলেছে? এর সাথে যোগ করতে হবে গোরস্থানের আরো সত্তর আশিজনকে। এরা তো মুষলধারে সঙ্গম করেছে দেখি, মনে মনে ভাবলো মকবুল।
এমিলও হুলিওর মতোই মিতবাক, সে কোনো উত্তর দিলো না।
যোগাযোগকেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে মকবুল যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করতে লাগলো। টিম্বাকটু ছেড়ে আসার আগে একটা টেস্ট সিগন্যাল চালু করে এসেছে সে, দশ মিনিট পর পর সেটা একটা করে পালস পাঠায়। সঙ্কেত গ্রহণের যাবতীয় মডিউল ঠিক আছে, কিন্তু এমিলের কথাই ঠিক, ট্র্যান্সমিটারে কোনো একটা সমস্যা আছে।
পকেট থেকে কার্ড বের করে ট্র্যান্সমিটারের বন্ধ কেবিনের দরজা খুলে মকবুল চমকে উঠলো। ট্র্যান্সমিটার মডিউলের জায়গাটা ফাঁকা পড়ে আছে, কতগুলো আলোকতন্তুর কেবল ঝুলছে শুধু!
অবিশ্বাসভরা চোখে পেছনে দাঁড়ানো এমিলের দিকে তাকিয়ে মকবুল প্রশ্ন করলো, "ট্র্যান্সমিটার কোথায় গেলো?"
এমিলের মুখটা এমনিতেই রোগা, শূন্যস্থানটুকু দেখে সেটি আরো রক্তশূন্য হয়ে গেলো। "আমি জানি না কমাণ্ডার!" অসহায় মুখে বললো সে। "এই কেবিনের চাবি তো আমাদের কারো কাছে থাকে না!"
মকবুল এমিলের কাঁধে হাত রেখে একটা শক্ত চাপ দিয়ে শীতল ফিসফিসে গলায় বললো, "এটা তাহলে খালি হলো কীভাবে?"
এমিলের চোখে ভয়ের ছাপ দেখে খুশি হলো মকবুল। বোঝাই যাচ্ছে এর আগে মিশনে যে কমাণ্ডার এসেছিলো, সে খুলে নিয়ে গেছে ট্র্যান্সমিটার। চাবি ছাড়া এই কেবিনের দরজা খোলা সম্ভব নয়, আর দরজাতেও জোর জবরদস্তির কোনো চিহ্ন নেই। কিন্তু এমিল আর তার সঙ্গীসাথীদের ঘাবড়ে দেয়াটা মকবুলের জন্যে জরুরি।
দড়াম করে ট্র্যান্সমিটার কেবিনের দরজা বন্ধ করে মকবুল এমিলের বাহু পাকড়ে ধরে বেরিয়ে এলো যোগাযোগ কেন্দ্র থেকে। বাড়তি মডিউল অবতরণযানে করে নিয়ে এসেছে সে, পরে সেগুলো সাথে করে এনে লাগিয়ে দিতে হবে।
বেরিয়ে এসে আবার এভানগেলোসের মুখোমুখি পড়ে গেলো মকবুল, লাঠি ঠুকঠুকিয়ে এগিয়ে এসেছে বুড়ো। পকেট মেরে হাজতে এলেও পরে পলিটিক্সে ঢুকে ব্যাটা নিঃসন্দেহে উন্নতি করেছে, ভাবলো মকবুল। অবশ্য দুই কাজে আজকাল পার্থক্য সামান্যই।
এভানগেলোস চেঁচিয়ে উঠলো, "কী রে হারামজাদা, পেলি কিছু? কী সমিস্যা, য়্যাঁ? কাল সারাটা রাত ভোঁভোঁ শব্দ শুনে এক ফোঁটা ঘুমুতে পাল্লাম না এই ঘোড়ার ডিমটার জন্য। কী গো দারোগা, তোমার যন্ত্রের কোনো গতি হলো?"
মকবুল এভানগেলোসের পেছন পেছন গোমড়ামুখে আসতে থাকা দিমিত্রির দিকে একটা চোখ রেখে বললো, "এর আগে যে কমাণ্ডার এসেছিলেন, তিনি কি এখান থেকে কোনো যন্ত্র খুলে নিয়ে গিয়েছিলেন?"
এভানগেলোস খনখনে গলায় বললো, "তার আমি কী জানি রে বাপু? তোমরা ষাট সত্তর বছর পরপর নিজেদের মর্জিমাফিক আসো যাও, কখন কী সঙ্গে করে আনো, কখন কী সঙ্গে করে নিয়ে যাও সেসব কি হেফজ করে বসে আছি নাকি আমি? কী রে নাতি, তুই বলতে পারিস কিছু? তুই না এখানকার চার্জে আছিস?"
এমিল ফ্যাকাসে মুখে মাথা নাড়লো, "না দাদু!"
মকবুল এমিলের দিকে এবার মনোযোগ দিয়ে তাকালো। এভানগেলোসের নাতি কি না, তা চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই। অবশ্য, পঞ্চাশজন থেকে বেড়ে আটশো বারোজন হতে গেলে এই বসতিতে এভানগেলোসের আরো এক গণ্ডা নাতিপুতি থাকার কথা।
এভানগেলোস বললো, "তুমি না আরো কী সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করবে?"
মকবুল মাথা নাড়লো। "হ্যাঁ, শক্তিকেন্দ্র আর পানি পরিশোধন কেন্দ্র। ওগুলোর দায়িত্বে কারা আছে?"
এমিল গলা খাঁকরে বললো, "ওগুলো আমরা চালাই না।"
মকবুলের শরীরটা শক্ত হয়ে উঠলো। সবকিছুই কি নষ্ট নাকি এখানে? এরা তাহলে চলছে কীভাবে? "চালাও না মানে?"
এমিল নার্ভাস অভিব্যক্তি লুকানোর চেষ্টা করে বললো, "ইয়ে, মানে, আমাদের শক্তিকেন্দ্রের ফুয়েল রড অনেক আগেই ফুরিয়ে গেছে। আর ... আর পানি পরিশোধন কেন্দ্র ...।"
"অনেক আগে ফুয়েল রড ফুরিয়ে গেছে মানে?" মকবুলের প্রশ্নটা শেষ দিকে এসে চাপা গর্জনে পরিণত হলো।
এভানগেলোস লাঠি ঠুকে এগিয়ে এলো এক পা। "ফুরিয়ে গেছে মানে ফুরিয়ে গেছে রে বাপ! তোমাদের তো দেখাই পাই না আমরা। নতুন জিনিসপাতি যে নিয়ে আসতে বলবো, সেটার উপায়ও তো নাই!"
মকবুল এভানগেলোসের দিকে ফিরে বললো, "একশো বছরের সাপ্লাই দেয়া হয়েছে কয়েক দফায়। ফুয়েল রড ফুরিয়ে যায় কীভাবে এতো জলদি?"
একটা ভারি, খসখসে কণ্ঠস্বর বললো, "ফুরিয়ে যায়, যখন টানা ব্যবহার করা হয়। একশো বছর চলতো, যদি আমরা পৃথিবীর ফতোয়া মেনে বছরে চারমাস শক্তিকেন্দ্র চালাতাম।"
মকবুল ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো।
প্রৌঢ় এক লোক এসে দাঁড়িয়েছে এমিলের পাশে। এমিল, দিমিত্রি বা হুলিওর মতো রোগা নয় সে। তেমন লম্বা না হলেও লোকটা যথেষ্ট শক্তিশালী গড়নের, শক্তিশালী কামানো চোয়াল, শীতল চোখ। অন্যদের মতো শণের টিউনিক পরা তার, কিন্তু কোমরের বেল্টটা টকটকে লাল উলের।
"আমি হোসেন।" হাত তুললো লোকটা। "পাহাড়গ্রামের প্রধান প্রকৌশলী।"
"মকবুল।" অভিবাদন জানালো মকবুল। হোসেনের বয়সই বলে দিচ্ছে, রোসিওর প্রথম প্রজন্মের লোক সে। "টানা চালানোর কারণ কী?"
হোসেন এভানগেলোসের দিকে তাকিয়ে কুর্নিশ করলো, "মাননীয় নগরপাল, কমাণ্ডারকে আমি সঙ্গ দিচ্ছি এখন।" এমিলের দিকে ফিরে একটা ঘোঁৎ শব্দ করলো সে, এমিল ত্রস্ত পায়ে পিছিয়ে অন্য দিকে জোর কদমে হাঁটা দিলো।
মকবুলের দিকে ফিরে দুই হাত পেছনে বেঁধে সামনের দিকে একটু ঝুঁকে হোসেন বললো, "আসুন আমার সাথে।"
মকবুল একটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে হোসেনের পাশে চলতে লাগলো।
হোসেন চলতে চলতে বললো, "আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আমার মা-বাবারা যখন রোসিওতে আসেন, তখন তারা সংখ্যায় অনেক কম ছিলেন?"
মকবুল মাথা নাড়লো। "পঞ্চাশ জন।"
হোসেন সন্তুষ্ট ঘোঁৎ শব্দ করলো। "হ্যাঁ। পঞ্চাশ জন। কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই জানেন, পৃথিবী থেকে মাত্র চারজনকে সক্রিয় অবস্থায় পাঠানো হয়েছিলো। বাকিরা ছিলো প্রাণযতির মধ্যে।"
মকবুল একটু হোঁচট খেলো মনে মনে। ডিসপ্যাচের ব্যাপারস্যাপার সে তেমন স্পষ্ট জানে না।
হোসেন মকবুলের নীরবতার সঠিক অনুবাদ করে নিয়ে বললো, "পৃথিবী থেকে অনেক রসদ সাথে দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু এখানে এসে সবকিছু শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছে। ঘাসের বীজ ছড়িয়ে তৃণভূমি বানাতে হয়েছে, গাছের বীজ পুঁতে বাগান বানাতে হয়েছে, একেবারে পাথুরে মাটি চষে ক্ষেত বানাতে হয়েছে, তারপরে শস্যের চাষ শুরু হয়েছে। তার ফল পেতে আরো মাসচারেক সময় লাগে। চারমাস ধরে পঞ্চাশজন মানুষের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা পৃথিবী করেনি। বোধহয় খরচ কমানোর জন্যেই তারা শুধু চারজন মানুষের ছয় মাসের রসদ সঙ্গে দিয়েছিলো। সেই ছয় মাস চারজনকে কাজ করতে হয়েছে। তারা সবকিছু গুছিয়ে আনার পর একে একে বাকিদের প্রাণযতি থেকে চাঙা করে। রোসিওতে আমাদের এই বসতি গড়ার জন্যে যে পরিমাণ কাজ করতে হয়েছে, তা পঞ্চাশজন মানুষের জন্যে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিলো। সৌভাগ্যক্রমে তারা অনেকেই নিজেদের পেশায় দক্ষ ছিলো বলে আমরা বর্বর গুহামানব হিসেবে বেড়ে উঠিনি। শিল্পায়ন করতে পেরেছি, তাই ...।"
"শিল্পায়ন?" মকবুল নিজের বিস্ময় গোপন করার কোনো চেষ্টা করলো না।
হোসেনও নিজের বিরক্তি গোপনের চেষ্টার ধারেকাছ দিয়েও গেলো না। "হ্যাঁ, শিল্পায়ন। ঐ যে দেখছেন চাঁদপাকুড় পর্বত," আঙুল উঁচিয়ে দূরের লালচে এক পর্বতের দিকে ইঙ্গিত করলো হোসেন, "আমরা ওখানে লোহার খনি পেয়েছি। আর ঐ যে পেছনের নাশপাতিয়া পাহাড়, ওখানে পেয়েছি কয়লা। পরিমাণে খুব বেশি নয়, কিন্তু এর সাথে একটু শক্তি যোগ করলেই পেয়ে যাবেন ইস্পাত।"
হুলিওর সাইকেল আর দিমিত্রির বল্লমের ছবি মকবুলের চোখের সামনে ভেসে উঠলো। "কিন্তু কয়লা পেলেন কীভাবে? রোসিওতে তো শুনেছি প্রাণ খুবই নিম্নস্তরের ...।"
হোসেন কাঁধ ঝাঁকালো। "পৃথিবীতে কয়লা যেমন গাছ থেকে এসেছে, এখানে সেরকম নয়। এককোষী প্রাণীই একটু একটু করে কয়লার ডিপোজিট করেছে বহু বছর ধরে। সে কারণেই পরিমাণে বেশি পাইনি আমরা। কিন্তু আমাদের কাজ শুরু করার জন্যে সেটা যথেষ্ট।"
মকবুল আচমকা খেয়াল করলো, সামনে পথের পাশে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন তরুণী। তাদেরও পরনে শণের টিউনিক। এমিল বা হুলিওর মতো তাদেরও শরীরে কিছুটা অপুষ্টির ছাপ, চোখেমুখে ক্ষুধার্ত ভাব। মকবুল আরও কয়েক পা চলার পর অনুভব করলো, এদের ক্ষুধাটা ঠিক সুবিধার নয়।
এভানগেলোস পেছন পেছন আসছে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে, শুনতে পেলো মকবুল।
হোসেন আবারও একটা কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিলো, কয়েকজন তরুণী একজন আরেকজনকে ঠেলতে ঠেলতে মকবুলের সামনে এসে হাজির হলো।
"অভিবাদন নগরপাল। অভিবাদন যন্ত্রপাল।" কলস্বরে বলে উঠলো তরুণীর দল।
মকবুল বুক ভরে বোতলের অক্সিজেন শ্বাসে টেনে নিলো। সাত বছর পর সে প্রথম কোনো রক্তমাংসের তরুণীকে দেখছে। মেয়েগুলো রোগাভোগা হলেও, তাদের নারীত্বের চিহ্নে তেমন দৈন্যের আভাস নেই। রোসিওতে প্রায় সব নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যে মানুষকেই পাঠানো হয়েছে, মেয়েগুলোর মাঝেও তাই আয়তাক্ষী দক্ষিণামেরিকান, তির্যকলোচনা মঙ্গোলয়েড, শ্যামাঙ্গী ভারতবর্ষীয়া, সুডৌলনাসা ককেশিয়া আর স্ফূরিতোষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গিনী রয়েছে।
বাদামি চুল চূড়া করে খোঁপা বাঁধা এক তরুণী বললো, "ইশশ কতো লম্বা!"
বাকিরা খিলখিল করে হেসে উঠলো এ কথা শুনে। মকবুল অনুভব করলো, তার রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠেছে।
শ্যামাঙ্গিনী একটি মেয়ে তার টলটলে চোখ মকবুলের চোখে রেখে এগিয়ে এসে মকবুলের বাহু স্পর্শ করলো। "তোমার গায়ে অনেক জোর, তাই না?" স্পষ্ট গলায় বললো সে।
এভানগেলোস হুড়মুড়িয়ে এসে দাঁড়ালো মাঝখানে। "য়্যাই বেলেহাজ ছুকরির দল, গেলি এখান থেকে, য়্যাঁ? এহ, নতুন একটা মুশকো মদ্দা দেখেই একেবারে খলবলিয়ে দৌড়ে এসেছে, যত্তসব গতরখাকির দল ... পালা, পালা এখান থেকে?"
মেয়েগুলো একটু ঝুঁকে ব্যঙ্গভরে কুর্নিশ করলো এভানগেলোসকে, টিউনিকের নিচে তাদের অনাবদ্ধ স্তনের খাদ ভেসে উঠলো মকবুলের চোখের সামনে।
আয়তাক্ষী একটি মেয়ে এভানগেলোসকে বললো, "আমার জিভে জল চলে এসেছে মান্যবর নগরপাল! অপরাধ ক্ষমা করুন, দোহাই আপনার!"
স্বর্ণকেশী মেয়েটি মকবুলের বাহু জড়িয়ে ধরে বললো, "আমরাই বরং কমাণ্ডারকে আমাদের শহর ঘুরিয়ে দেখাই। চলো কমাণ্ডার, আমাদের সঙ্গে চলো!"
এভানগেলোস বেতের লাঠিটা আকাশের দিকে উঁচিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো, "তোদের কি অসুখ বিসুখের ভয় নাই? জানিস পৃথিবীতে কত রকমের রোগ? তার ওপর এই ব্যাটা পুলিশ! আজ এখানে কাল ওখানে তোদের মতো বদমাশ ছুকরিদের আশকারা দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে! তোদের মাঝে একটা বেলেল্লা যদি অসুখ বাঁধিয়ে বসিস, পরদিন থেকে গোটা পাহাড়গ্রামের ছোকরাদের মধ্যে অসুখ ছড়িয়ে পড়বে, আর তারপর অসুখ বাঁধাবে রাক্ষুসী বুড়িগুলো! ছেনালপনা করতে চাস তো আসিস রাতের বেলা আমার বাড়িতে!"
মেয়েগুলো একযোগে ইইইই শব্দ করে মকবুলের আরো কাছে ঘেঁষে এলো। এভানগেলোস ধমকে তাদের হটিয়ে দিলো।
মকবুলের দিকে মদির কটাক্ষ হেনে মেয়েদের দল চলে গেলো, যাওয়ার আগে তাদের সঙ্গে পাহাড়গ্রাম ঘুরে দেখার আরেকদফা আমন্ত্রণ জানিয়ে।
এভানগেলোস গজগজ করতে লাগলো, "বাপরে বাপ, কী খাইখাই রে ছেমরিগুলির! এই সেদিনও হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াতো এগুলো, আর আজ পারলে রাস্তাতেই ধরে পুলিশটাকে খাবলে খেয়ে ফ্যালে! য়্যাই দিমিত্রি, এরা কাদের মেয়ে রে?"
দিমিত্রি গোমড়া মুখে বললো, "পাথুরিয়া এস্তেবান, করাতি সলোমন আর কামার তুফান সিঙের মেয়ে এরা।"
এভানগেলোস মকবুলের পাজরে কনুই মেরে বললো, "দ্যাখো, দ্যাখো! এই গোটা শহরের সব মেয়ে কোনটা কার, সব এই হারামজাদার মুখস্থ। কাজের বেলায় ঢুঢু, আর খালি মেয়েদের ঠিকুজি হেফজ করে হতভাগাটা!"
মকবুল কথা না বলে হোসেনের দিকে চাইলো। হোসেন এতক্ষণ কিছুই বলেনি, শুধু তার কপালে একটা সাংঘাতিক ভ্রুকুটি দেখা যাচ্ছে। গোটা হাঙ্গামা শেষ হওয়ার পর আবার মুখ খুললো সে।
"পানি পরিশোধন কেন্দ্রও আমরা বন্ধ করে রেখেছি। এখানে নিয়মিত বৃষ্টি হয়, আর প্রচুর চুনাপাথর পাওয়া যায়। আমরা কয়েকটা পুকুরের তলা চুনাপাথরের সিমেন্ট দিয়ে বাঁধিয়ে দিয়েছি। বৃষ্টির পানি এসে তাতে জমা হয়, আমরা সেটাই ব্যবহার করি। আর এই যে এই ঘোড়ামুখ লেক দেখছেন, এই লেকের পানি ভয়ানক ক্ষারীয়, আমরা কেবল ধোয়ামোছার কাজে লাগাই।"
মকবুল কাঁধ ঝাঁকালো। "তাহলে কি নতুন ফুয়েল রড চাইছেন আপনাদের চাহিদাপত্রে?"
হোসেন থমকে দাঁড়ালো। "চাহিদাপত্র?"
মকবুল অস্বস্তি নিয়ে হোসেনের মুখোমুখি হলো। "হ্যাঁ। আপনাদের এবারের চাহিদাপত্রে চাইলে ফুয়েল রডের কথা উল্লেখ করে দিতে পারেন। এরপর যে নভোপুলিশ সদস্য আসবেন, তিনি ফুয়েল রড নিয়ে আসবেন সাথে করে, যদি নভোকারাগার প্রকল্প তা অনুমোদন করে।" শেষ অংশটুকু জোর দিয়ে বললো সে।
হোসেনের মুখের রং লালচে হয়ে উঠলো। এভানগেলোস লাঠি ঠুকে বললো, "যন্ত্রপাতি আর পরীক্ষা না করলে চলো তোমাকে ওনার কাছে নিয়ে যাই।"
হোসেনের মুখের রক্তিমাভার পেছনে রাগ নাকি লজ্জা কাজ করছে, সেটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে মকবুল এভানগেলোসকে প্রশ্ন করলো, "কার কাছে?"
এভানগেলোস দিমিত্রিকে পাশে নিয়ে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে এগিয়ে গেলো, তার খনখনে উচ্চগ্রামে স্বর ভেসে এলো বাতাসে, "রোসিওর রাষ্ট্রপতির কাছে।"
মকবুল হোসেনের দিকে না তাকিয়েই বুঝতে পারলো, লোকটা তার সচকিত বিস্ময় গভীর সন্তোষ নিয়ে উপভোগ করছে।
৩.
পাহাড়গ্রাম পুরোটা ঘুরে দেখতে গিয়ে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেলো। পর্বতের কল্যাণে এখানে সূর্য আকাশ থেকে হারিয়ে যায় মাঝবিকেলেই। রোসিওর তারার আকার সূর্যের চেয়ে বেশ কিছুটা ছোটো দেখা যায়, রোসিওবাসী একে ডাকে জোনাকি বলে।
রোসিওর কয়েদীদের পরবর্তী প্রজন্ম জীবনটাকে কঠোর পরিশ্রম করে গুছিয়ে নিয়েছে, এই সত্যটা অস্বীকার করার উপায় নেই। সবজি, গম আর সরিষার ক্ষেত উপত্যকার অনেকটা জুড়ে, তারপর তৃণভূমি আর নানারকম গাছপালা। পৃথিবী থেকে মৌমাছিও এসেছে শস্য আর বৃক্ষের পরাগায়নের জন্যে, আর শণ আসে ভাং গাছ থেকে। মধু আর ভাঙের কল্যাণে মাদকেরও কমতি নেই, পড়ন্ত বিকেলেই তার নমুনা দেখা গেলো কিছু। লোকজনের মধ্যে বেশ উল্লসিত ভাব, যদিও তাদের বেশিরভাগেরই চেহারা রোসিওর দ্বিতীয় প্রজন্মের মতো, শীর্ণকায় আর ক্ষুধিত।
এভানগেলোস লাঠি উঁচিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সবকিছু দেখালো। "ঐ যে ওটা হচ্ছে আমাদের কামারশালা। ওখানে যাবতীয় শক্ত জিনিসপাতি তৈরি হয়। আর ওটা হচ্ছে রাবারশালা। রাবার গাছের বাগান আছে আমাদের এখানে, উউউউই যে ওদিকে, ওখান থেকে আমরা রাবার আনি, আর ওদিকের পাহাড়ে গন্ধক পাওয়া যায়। রাবারে গন্ধক মেশালে অনেক মজবুত হয়, জানো তো? ঐ রাবার দিয়ে আমরা জুতা বানাই, বর্ষাতি বানাই। ওটা হচ্ছে করাতখানা, সব কাঠের কারবার ওখানে। ওর পাশে ওটা হচ্ছে পাথরশাল, পাথর কাটাকাটি খোদাখুদি সব ওখানে করা হয়।"
মকবুল শুরুতে ভাবছিলো, নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্রের ফুয়েল রড ফুরিয়ে গেলে এরা বিদ্যুৎ পায় কোত্থেকে, কিন্তু একটা টিলার ওপর চড়তেই তার কাছে উত্তরটা চলে এসেছে।
উপত্যকার ঢালে সারি সারি বায়ু টারবাইন বসিয়েছে এরা।
হোসেন বেশ নির্লিপ্ত মুখেই জানিয়েছে, ম্যানুয়াল দেখে দেখে ভারি বৈদ্যুতিক যন্ত্র বানাতে পারে তারা। তবে ইলেকট্রনিক্সে তারা কাঁচা, ওরকম কিছু উৎপাদন করার মতো প্রযুক্তি এখনও তাদের হাতের নাগালে আসেনি। চলে আসবে বিশ বছরের মধ্যেই।
মকবুল বৈদ্যুতিক কেবলের কথা জিজ্ঞাসা করেনি আর। লোহার আকরিক পাওয়া গেলে রোসিওতে অ্যালুমিনিয়ামের আকরিকও পাওয়া দুষ্কর কিছু নয়। আর রাবার তো এরা রীতিমতো ভালকানাইজ করছেই।
এভানগেলোস আবাসিক এলাকার এক প্রান্তে এক চত্বরে নিয়ে এলো মকবুলকে। "এটা হচ্ছে সরাইখানা। আমরা গম থেকে কিছুমিছু বানাই, মধু থেকে কিছুমিছু, আর এই যে দেখছো শণ, শণ আসে ভাং গাছ থেকে, সেটা থেকেও মনে করো কিছুমিছু বানাই। সব কিছুমিছু মিলে, ছুটির দিনে লোকজন খুব শোরগোল করে। এদেরকে ঠাণ্ডা রাখে হুলিও আর তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা। তোমাকে ছেঁকে ধরেছিলো যে বেলেল্লাগুলো, ওগুলো ছুটির দিনে পড়াশোনা ঘরের কাজকম্মো বাদ দিয়ে এসে ছেলেবুড়ো সবার সাথে ঢলাঢলি করে। আর আমি বুড়ো মানুষটা, যার একটু সেবাযত্ন দরকার, যদি একটু হাত ধরে কাছে টানি, যদি একটু রানে চিমটি কাটি, যদি বলি চল আমার সাথে আমার বাড়িতে চল, ইইইই করে আওয়াজ তোলে! উচ্ছন্নে যাবে সমাজটা, বুঝলে? উচ্ছন্নে যাবে।"
মকবুল বিরস বদনে বললো, "আসলেই। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, আমাকে তো আবার ট্র্যান্সমিটার ঠিক করতে হবে, আবহাওয়া কেন্দ্রেও লুব্রিক্যান্ট ভরতে হবে। আপনাদের রাষ্ট্রপতি মহোদয় আর কাউন্সিল সদস্যদের সাথে কখন সাক্ষাৎ ঘটতে পারে?"
এভানগেলোস ব্যস্ত হয়ে বললো, "আরো রোসো না বাপু, এতো তাড়াহুড়ো কেন? রাষ্ট্রপতির ওখানে ভোজ আরেকটু বাদেই। তুমি চাইলে সরাইখানার বাইরে বসে এক পাত্তর মেরে দিতে পারো কিন্তু। আর মুণ্ডুতে এই বয়ামটা লাগিয়ে কেন ঘুরছো দারোগা বাবা? আমাদের এখানে এমন কোনো ভূতপেত্নী নেই। তুমি নিশ্চিন্তে ওটা খুলে বোসো, চাঁদিতে আমাদের এখানকার নিম্মল হাওয়া লাগাও একটু।"
চত্বরের মাঝখানে একটা ভাস্কর্য আছে, এভানগেলোসের কথায় পাত্তা না দিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলো মকবুল। কয়েক পাত্র মদ খেয়ে রোসিওর কচি মেয়েগুলোর সাথে হুল্লোড় করতে পারলে মন্দ হতো না, কিন্তু পেনশন কাটা যেতে পারে। সব আলাপই স্বয়ংক্রিয়ভাবে লগ হয়ে যাচ্ছে মকবুলের হেলমেটের ক্ষুদে ইভেন্ট লগারে, এগুলো তাকে জমা দিতে হবে রিপোর্টের সাথে।
চত্বরের ওপাশ থেকে এক যুবতী ছুটতে ছুটতে এসে হাজির হলো এভানগেলোসের কাছে, মকবুলের শরীর আরেকবার উষ্ণ হয়ে উঠলো তাকে দেখে। মেয়েটা অন্যদের মতো রুগ্ন নয়, তার চেহারায় একটা স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের দ্যুতি কমনীয় মুখশ্রীকে আরো ফুটিয়ে তুলেছে। অন্যদের মতো এই মেয়েটিও হাঁটু পর্যন্ত টিউনিক পরে আছে, দৌড়ের তালে তালে দুলে উঠছে তার বুক, ভরাট তামাটে ঠোঁট দুটি একটু ফাঁক হয়ে আছে শ্বাসের তোড়ে।
"অভিবাদন নগরপাল!" হাঁপাতে হাঁপাতে বললো মেয়েটা। "লেকের পাশে পার্কে দুশো মানুষের বসার আয়োজন করেছি, মান্যবর!"
এভানগেলোস স্নেহের হাত রাখলো মেয়েটার কাঁধে, কিন্তু মেয়েটা সম্ভবত এভানগেলোসের স্নেহের সাথে পরিচিত, সে মুচড়ে সরে গেলো মেয়রের হাতের নাগাল থেকে।
এভানগেলোস মনমরা গলায় বললো, "সাবাশ মেলিন্দা। খুব ভালো করেছো। ইয়ে, রান্নার আয়োজন নিয়ে আমরা রাতে কথা বলবো, কেমন? এসো আমার বাড়িতে।"
মেলিন্দা মুখের হাসি বজায় রেখেই বললো, "না মান্যবর। যা বলার এখনই বলুন। রাতে ঘুমোতে হবে জলদি জলদি। আগামীকাল অনেক কাজ।"
এভানগেলোস গজগজ করতে করতে বললো, "কই হে দারোগা, এদিকে এসো, আলাপ করিয়ে দিই। এ হচ্ছে মেলিন্দা, আমাদের পাহাড়গ্রামের উৎসবকর্ত্রী। সব বড় উৎসব সে আয়োজন করে। আর এ হচ্ছে মফিদুল, নভোদারোগা, বিরাট কমাণ্ডার।"
মকবুল হেলমেটের এপাশেই হাসলো মেলিন্দার চোখের দিকে তাকিয়ে। "মকবুল। অভিবাদন।"
মেলিন্দা আন্তরিকতার সাথে মকবুলের বাহু জড়িয়ে ধরলো। "স্বাগতম কমাণ্ডার। আপনাকে আমাদের মাঝে পেয়ে আমরা খুবই আনন্দিত। আপনি কালকে ভোজে থাকছেন কিন্তু!"
মেলিন্দার নৈকট্য আর আমন্ত্রণভরা আয়ত চোখ মকবুলের হাঁটুর কাছটা কয়েক সেকেণ্ডের জন্যে শক্তিরহিত করে তুললো। কী ক্ষতি যদি সে এই মেয়েটার সাথে কিছুক্ষণ একান্তে সময় কাটায়? সাত বছর! সাত বছর সে কোনো মেয়ের সাথে সময় কাটায় না। আরও তিনটা বছর সে কীভাবে কাটাবে টিম্বাকটুতে? মার্থা তিশিয়ানো এ কারণেই কি তাদের সঙ্কট ব্যবস্থাপনা ক্লাসে পইপই করে বোঝানোর চেষ্টা করতো, কখনও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি যোগাযোগ রাখবে না? যা ঘটবে সব ভুলে যেতে হবে। আর নারীসান্নিধ্য, নৈব নৈব চ। অসুখের ভয়, কোয়ার‍্যানটাইনে আটকের ভয়, পেনশন কাটা যাওয়ার ভয়, জেলজরিমানার ভয়।
মেলিন্দা অনেকখানি পথ ছুটে এসেছে, তার বুক এখনও দুলে উঠছে নিঃশ্বাসের তালে, মকবুল মনে মনে নিজের গালে প্রচণ্ড একটা চড় কষালো। মেলিন্দাকে বাহুলগ্ন করেই সে ঘুরে দাঁড়ালো, "আপনার আমন্ত্রণ ... মানে, নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারলে আমি খুবই আনন্দিত হতাম। কিন্তু এই দুঃখ নিয়েই আমাকে ফিরে যেতে হবে মিস। ... কিন্তু আপনি আমাকে বুঝিয়ে বলুন, এই ভাস্কর্যের মানে কী?"
চত্বরের ঠিক মাঝে সিমেন্ট দিয়ে তৈরি অদ্ভুত একটা ভাস্কর্য। একটা ভেড়ার গলায় ছুরি চালাচ্ছে এক মহিলা। ভাস্কর্যটা যে তৈরি করেছে, তার হাত যথেষ্ট পাকা। রোদবৃষ্টিতে ভাস্কর্য খানিকটা ক্ষয়ে গেছে, কিন্তু আবেদনটা তাতে মলিন হয়নি।
দিগন্তে পাহাড়ের ওপাশে ডুব দিচ্ছে রোসিওর জোনাকি, পড়ন্ত আলোয় মেলিন্দার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে মকবুল আরও একবার বিবেচনা করলো, পেনশন কাটা গেলে কী এমন ক্ষতি হতে পারে।
মেলিন্দা অসহায় হেসে মকবুলকে বললো, "আমি ... আমি ঠিক জানি না কমাণ্ডার, এটা যখন তৈরি হয় তখন আমি অনেক ছোটো ছিলাম, সম্ভবত মান্যবর কলাপাল আপনাকে বুঝিয়ে বলতে পারবেন।"
"কলাপাল?" মকবুল প্রশ্নবোধক চোখে তাকালো এভানগেলোসের কাছে, বুড়ো কাছেই লাঠির ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে দেখছে মেলিন্দা আর মকবুলকে, ভ্রুতে ঘোর অসন্তোষ নিয়ে।
"আমরাও তো ছবিটবি আঁকি রে দারোগা। মূর্তিটুর্তিও গড়ি। গানবাজনাও খারাপ করি না। শিল্পোসমোসকৃতির এসব ব্যাপারস্যাপার একজন দেখাশোনা করে, বুড়ো গনজালেস। সে-ই আমাদের চিফ আর্টিস্ট, কলাপাল। এ জিনিস তারই পয়দা।"
হেলমেটের ক্ষুদে কিন্তু শক্তিশালী টর্চ জ্বালিয়ে মকবুল মূর্তিটা আরেকবার ভালোমতো দেখে নিলো। কেন যেন ভেড়া জবাইরত মহিলাটিকে তার চেনা চেনা মনে হচ্ছে।
"আপনাদের ভেড়া আর মুরগির খামারটা কোথায় করেছেন?" মকবুল টর্চ নিভিয়ে মেলিন্দাকে প্রশ্ন করলো, মেয়েটার সঙ্গ তার ছাড়তে ইচ্ছা করছে না।
সেটা টের পেয়েই বোধহয় এভানগেলোস হুড়ো দিলো মেলিন্দাকে। "মেলিন্দা, বাছা, তোমার অনেক কাজ আগামীকাল। তুমি এসো বরং এখন। কাজটাজ করো। আর আমরা নিরিবিলি দুজনে কিছু আলাপ করবো, কেমন?"
মেলিন্দা মকবুলের শরীরে মৃদু ঠেস দিয়ে দাঁড়ালো, "কমাণ্ডার, আমাকে বিদায় নিতে হচ্ছে। কাল ভোজে আপনি থাকছেন, আপত্তি করলে চলবে না কিন্তু! আসি।"
মকবুল বায়ুরোধী পোশাকের নিচে নিজের উত্থান দমন করার চেষ্টা করতে করতে জোর পায়ে অন্যদিকে চলতে থাকা মেলিন্দার দিকে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটা পেছন থেকেও দেখতে দারুণ!
এভানগেলোস গলা খাঁকরে বললো, "চারটা বাজতে চললো। কই হে যন্ত্রপাল, চলো, দারোগাবাবুকে নিয়ে আমরা রাষ্ট্রপতির প্রাসাদে যাই। পেটে তো কিছু পড়েনি দুপুরের পর থেকে। তোমার খিদে লাগেনি কমাণ্ডার?"
মকবুল আবারও জিজ্ঞাসা করলো, "আপনাদের ভেড়ার খামার কি ওদিকে নাকি?" আঙুল তুলে একটা টিলার দিকে নির্দেশ করলো সে।
এভানগেলোস মাথা নেড়ে বললো, "নাহ, ওদিকে নয়, অন্যদিকটায়। চলো, মহামান্য রাষ্ট্রপতি আর কাউন্সিল সদস্যদের সাথে মোলাকাত সেরে আসি। আমাকে আবার একটু জলদি জলদি বাড়ি ফিরতে হবে। মেলিন্দা ছুঁড়িটাকে বাগ মানানো বড় শক্ত। মেয়েটা যেদিকেই যায় সবকিছু শক্ত করে তোলে ...।"
মকবুল কথাটার সাথে একমত না হয়ে পারলো না।
আবাসিক এলাকাটুকু ছোটো ছোটো টিলার ওপরে বানানো প্রশস্ত ঘর আর ফাঁকে ফাঁকে চত্বর নিয়ে তৈরি, কিন্তু রোসিওর রাষ্ট্রপতির বাসভবন এই এলাকা থেকে দূরে, একটা বড় পাহাড়ের ঢালে। পাহাড়ের গায়ে সুন্দর করে বসানো পাথরের ধাপ চলে গেছে সেই বাড়ি বরাবর। বাড়িটা পাহাড়গ্রামের অন্যান্য বাড়ির মতোই কাঠের তৈরি, কিন্তু অনেক প্রশস্ত।
মকবুল পেছনে লাঠির শব্দ শুনে ফিরে তাকিয়ে দেখলো, আরো কয়েকজন বয়স্ক মানুষ লাঠি ঠুকতে ঠুকতে উঠে আসছে পাহাড় বেয়ে। এরাই বোধহয় কাউন্সিলের সদস্য।
জোনাকি পুরোপুরি দিগন্তরেখার ওপাশে হারিয়ে গেছে, আকাশে পৃথিবীর মতোই বিলীয়মান রক্তিম আভা। রাষ্ট্রপতির বাড়ির বারান্দায় একটা লণ্ঠন জ্বলে উঠেছে, দেখতে পেলো মকবুল। নিচে হ্রদের পাশে টিলার ওপর ঘরগুলোয় টিমটিমে আলো জ্বলা শুরু করেছে। সড়ক আর চত্বরে জ্বলে উঠেছে বৈদ্যুতিক বাতি। সবকিছু পৃথিবীর মতোই, অথচ পৃথিবী নয়। মকবুল নতুন করে নিঃসঙ্গ বোধ করলো আবার।
এভানগেলোসের পিছু পিছু রাষ্ট্রপতির বাড়ির বারান্দায় উঠে এলো মকবুল। মাঝবয়েসী একজন মানুষ সেখানে বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে, তার পরনে সাধারণ পোশাক, কিন্তু গায়ে এভানগেলোসের মতোই রঙিন নকশাকরা উলের চাদর। লণ্ঠনের আলোয় সে নকশাটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো মকবুল। একটা ভেড়ার মাথা।
এভানগেলোস হাত তুলে অভিবাদন করলো। "শুভ সন্ধ্যা হেক্টর। রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ কামনা করছি।"
হেক্টর কুর্নিশ করলো। "শুভ সন্ধ্যা মান্যবর নগরপাল। রাষ্ট্রপতি অতিথিদের জন্যে ভোজঘরে অপেক্ষা করছেন।"
এভানগেলোস পেছনে তাকালো, পাহাড় বেয়ে উঠে আসছে বৃদ্ধ কাউন্সিল সদস্যেরা। "আসুক ওরা আস্তে আস্তে, চলো হে দারোগা, রাষ্ট্রপতির সাথে আলাপ করিয়ে দিই তোমাকে।"
হেক্টর মৃদু গলায় বললো, "কোনো অস্ত্র নিয়ে রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাৎ করা নিষিদ্ধ। আপনার আগ্নেয়াস্ত্রটি আমার কাছে জমা দিয়ে যান, কমাণ্ডার।"
মকবুল একটু ঝুঁকে বিনয়ের সাথে বললো, "আমি এই নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই বলছি, আমি যে কাজে এসেছি, তাতে এই অস্ত্রটি আমার হাতছাড়া হওয়ার উপায় নেই। প্রয়োজনে আমি রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাৎ ছাড়াই ফিরে যেতে প্রস্তুত আছি।"
হেক্টর ফিরে চাইলো এভানগেলোসের দিকে, বুড়ো খনখনে গলায় বললো, "আরে এতো দেমাগ দেখাও কেন রে বাবা হেক্টর, এ তো পৃথিবীর পুলিশ রে। রাষ্ট্রপতিকে সে কি গুলি করে মারতে এসেছে নাকি? আর রাষ্ট্রপতিকে গুলি করলে ও আস্ত থাকবে? য়্যাঁ? তোমার প্রিটোরিয়ান প্রহরীরা কোথায়?"
হেক্টর মকবুলের দিকে কিছুক্ষণ নিষ্পলক তাকিয়ে একপাশে সরে দাঁড়ালো। "আসুন কমাণ্ডার, ভেতরে আসুন।"
মকবুল আবারও মৃদু ঝুঁকে ধন্যবাদ জানালো, "ধন্যবাদ, প্রিটর হেক্টর।"
হেক্টরের মুখে মৃদু একটা হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেলো। মকবুলের সম্বোধন ভুল নয়, হেক্টর রাষ্ট্রপতির দেহরক্ষী দলের প্রধান, সেনাধ্যক্ষ তাকে বলাই চলে।"
মকবুল আরও লক্ষ্য করলো, হেক্টরের কোমরে কোনো ধরনের অস্ত্র ঝোলানো নেই। মনে মনে আরও সতর্ক হয়ে উঠলো সে। এরা যখন ইস্পাত বানাতে পেরেছে, তখন আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি করতে পারাও অসম্ভব কিছু নয়। এখন পর্যন্ত কারো কাছে সে জিনিস না থাকলেও, হেক্টরের কাছে থাকতে পারে। হাজার হোক, রাষ্ট্রপতির রক্ষীবাহিনীর প্রধান বলে কথা।
ভোজঘরটা যথেষ্ট বড়, তাতে যে টেবিলটি পাতা আছে সেখানে হেসেখেলে পঞ্চাশ জন লোক ফেলেছড়িয়ে খেতে পারবে। টেবিলের দূরবর্তী প্রান্তে বসে আছে কেউ একজন। নিঃসন্দেহে তিনিই রাষ্ট্রপতি। ঘরের ভেতরে অনেকগুলো লন্ঠন জ্বলছে, কোনো অন্ধকার নেই। মকবুল দেয়ালের দিকে তাকালো, সেখানে কাঁচা হাতে আঁকা বেশ কিছু আবক্ষ প্রতিকৃতি দেখা যাচ্ছে।
মকবুল হেক্টরের পিছু পিছু এগিয়ে গেলো মাপা পায়ে।
প্রশস্ত কাঠের চেয়ারের ওপর একটা গদি পাতা, তাতে জবুথবু হয়ে যে লোকটা বসে আছে, তার বয়স কমপক্ষে নব্বই হবে। লোকটার চোখে একটা মোটা ঝাপসা লেন্সের চশমা, মাথায় কয়েক গাছা পাকা চুল, গালের চামড়া ঝুলে পড়েছে। পরনে শণের টিউনিক, তার ওপরে উলের নকশা করা চাদর। নকশাটা খুবই বাহারি, রাষ্ট্রপতির জন্যে বিশেষভাবে করা নিশ্চয়ই।
মকবুল রোসিওর রাষ্ট্রপতিকে কুর্নিশ করে নিজের পরিচয় দিলো। "আমি কমাণ্ডার মকবুল, তৃতীয় কোম্পানি, দ্বিতীয় ব্যাটেলিয়ন, নভোপুলিশ।"
রাষ্ট্রপতি কিছুক্ষণ চুপচাপ মকবুলকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখে নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় বললেন, "আমার নাম রাগনার। আমি তোমার কাছে একজন বন্দী, কিন্তু রোসিওর লোকজন আমাকে এই সমস্ত গ্রহের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছে। আমি চাই তুমি তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান দেখাও।"
মকবুল আবার কুর্নিশ করলো। কে যায় খামাকা ঝামেলা পাকাতে? এই লোক নিজেকে রোসিওর রাষ্ট্রপতি ভেবে খুশি থাকলে থাকুক না। স্পিকার অফ করে সে হেলমেটের ভেতরের স্ক্রিনে তথ্যভাণ্ডার খুঁজতে লাগলো আবার। রাগনার ওলাফসন, পেশায় আইনজীবী, অপরাধ ছিলো দ্বিগামিতা।
রাষ্ট্রপতি রাগনার ইশারায় মকবুলকে পাশে চেয়ারে বসতে বললেন। মকবুল সাবধানে একটা চেয়ার টেনে বসলো।
রাগনার নিচু গলাতেই বললেন, "আমরা এখন সামান্য কিছু খাবো, আর সবার স্বাস্থ্যের উদ্দেশ্যে পান করবো। তুমি চাইলে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারো, তোমার হেলমেটটিও খুলে রাখতে পারো।"
মকবুল একটু ইতস্তত করে হেলমেটটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলো। কেবল তার নাকে অক্সিজেনের প্লাগটুকু রয়ে গেলো।
আরো কয়েকজন বৃদ্ধ লাঠিতে ভর দিয়ে প্রবেশ করেছে ঘরে, রাষ্ট্রপতি এক হাত তুলে তাদের অভিবাদন গ্রহণ করলেন। "স্বাগতম, মাননীয় কাউন্সিল সদস্যবৃন্দ। আমাদের অতিথির সাথে পরিচিত হোন।"
মঙ্গোলয়েড চেহারার এক বৃদ্ধ এসে কম্পিত কণ্ঠে বললো, "জলদি জলদি খানা লাগাতে বলুন মাননীয় রাষ্ট্রপতি। সবার আগে এক পাত্র ভাঙের শরবত হলে সবচেয়ে ভালো হয়।"
রাগনারকে কিছুই বলতে হলো না, শণের টিউনিক পরা এক তরুণ এসে প্রত্যেকের সামনে এক পাত্র করে পানীয় রেখে গেলো।
মকবুল এক এক করে কাউন্সিলরদের খুঁটিয়ে দেখলো। সব মিলিয়ে সাতজন কাউন্সিলর, প্রত্যেকেরই বয়স আশির কোঠায় বলে মনে হচ্ছে। এরা নিঃসন্দেহে সবাই রোসিওর মূল কয়েদী দলের লোক।
রাগনার বললেন, "আগামীকাল আমাদের এক বিরাট ভোজ হবে, তোমার সম্মানে। আশা করি তুমি তাতে অংশ নেবে।"
মকবুল বিনয়ের সাথেই বললো, "মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আমি দুঃখিত যে আমাকে আজই চলে যেতে হবে। আপনার এবং মাননীয় কাউন্সিলরদের সাথে আলাপের পর আরো দু'টি কাজ আমাকে সম্পন্ন করে আজই ফিরে যেতে হবে।"
রাগনার কিছু বললেন না আর, পরিচারক এসে খাবার পরিবেশন করা শুরু করলো।
রাগনার পানীয়ের পাত্র তুলে ধরে বললেন, "সকলের সুস্বাস্থ্যের উদ্দেশ্যে পান করছি।"
কাউন্সিলররা সোৎসাহে পাত্র তুলে কড়া চুমুক দিলো। মকবুল সাবধানে পাত্র তুলে ঠোঁটের কাছে ধরলো, সিদ্ধির শরবত খাওয়ার কোনো ইচ্ছাই তার নেই। তবে পাত্রটা চীনামাটির তৈরি, বেশ বাহারি জিনিস। যদি রোসিওতে বানানো হয়ে থাকে, তাহলে বলতে হবে এদের মধ্যে বেশ দক্ষ মৃৎশিল্পীও রয়েছে।
খাবার যা পরিবেশন করা হয়েছে, তা দেখে বেশ বিস্মিত হলো মকবুল। রাষ্ট্রপতি আর কাউন্সিলররা সবাই বোধহয় নিরামিষাশী। পরিবেশন করা হয়েছে ধোঁয়া ওঠা গরম গমের রুটি, সরু লম্বা সাদা ভাত, অনেক রকমের সব্জির ভাজাভুজি, মসুরের ডাল, সীমের বিচি, বেগুন ভাজা, সব্জি আর ফলের সালাদ আর ফলের রস। মহাকাশযানে দীর্ঘদিন কৃত্রিম সংশ্লেষিত খাবার খেয়ে খেয়ে মকবুলের অরুচি চলে এসেছে, টাটকা খাবার সামনে পেয়ে সে সানন্দ আগ্রহ নিয়ে খেয়ে চললো।
খাওয়া শেষে সকলের জন্যে ধূমায়িত চা নিয়ে আবার ঘরে ঢুকলো পরিচারক।
রাগনার বললেন, "আলাপ শুরুর আগে তোমার জন্যে একটা উপহার আছে কমাণ্ডার। আমার নাতনি তোমার জন্যে একটা ছবি এঁকেছে। তুমি অনুমতি দিলে সে সেটা নিজের হাতে তোমাকে উপহার দিতে চায়।"
মকবুল অপ্রতিভ কণ্ঠে বললো, "নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।"
রাগনার একটা ছোটো ঘন্টা তুলে বাজালেন।
ষোড়শী এক তরুণী সলজ্জ ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকলো। তার পরনে সাধারণ পোশাক। এই মেয়েটির চেহারাতেও সেই হাড়গিলে রুগ্নভাব, কিন্তু তার শরীর বেশ প্রস্ফূট। মেয়েটি মকবুলের কাছে ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে মৃদু গলায় বললো, "কমাণ্ডার, আপনার জন্যে এই উপহার।"
একটা কাঠের ট্রে-র ওপরে একটা ক্যানভাসের ওপর একটি তৈলচিত্র আঁকা। তাতে একটি অবতরণযানের ছবি, তার সামনে নভোপুলিশের উর্দি পরা এক লোক দাঁড়িয়ে। মকবুল চিত্রকর্ম তেমন বোঝে না, সে শুধু জানে কিছু শিল্পী ছবিতে স্বাভাবিক রং বসায়, আর কিছু শিল্পী ভুলভাল রং দেয়, রাষ্ট্রপতির চৌত্রিশ ইঞ্চিসম্পন্না ডবকা নাতনিটি মনে হচ্ছে দ্বিতীয় দলের। মেয়েটি যে ভঙ্গিতে ছবিটি নিবেদন করছে, তাতে বোঝা যায়, সে নিজেকেও উপহার দিতে বেশ ব্যগ্র। মকবুল বহুকষ্টে নিজের নাকের কয়েক ইঞ্চি সামনে প্রস্ফূটিত স্তনস্তবক থেকে চোখ সরিয়ে প্রশংসার অভিব্যক্তি ফোটানোর চেষ্টা করলো। সবুজ আকাশ, মেরুন অবতরণযান, গোলাপি ইউনিফর্ম, কালো নভোপুলিশ। পুলিশটি শুধু কালোই নয়, তার চেহারাও আফ্রিকানদের মতো।
রাগনার বললেন, "এই ছবিটি এঁকে এডনা গত বছর পাহাড়গ্রামের সেরা শিল্পীর পুরস্কার জিতেছে।"
মকবুল বহু কষ্টে এডনার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, "চমৎকার এডনা। খুব সুন্দর। দারুণ ফুটে উঠেছে সবকিছু।"
এডনা আমন্ত্রণভরা হাসি নিয়ে তাকিয়ে রইলো মকবুলের দিকে।
মকবুল মাথা চুলকে বললো, "ছবিটা কি আমি গোল করে পাকিয়ে সঙ্গে নিতে পারি?"
রাগনার বললেন, "এডনা, তুমি ছবিটা কমাণ্ডারের জন্যে প্যাকেট করো গিয়ে, যাও।"
এডনা হাসিমুখে ছবি তুলে নিয়ে চলে গেলো কোমর দুলিয়ে। মকবুল তাড়াহুড়ো করে পেয়ালায় চা ঢেলে নিলো কেটলি থেকে।
রাগনার বললেন, "তোমার নাম বানান করো কীভাবে কমাণ্ডার?"
মকবুল থতমত খেয়ে বললো, "কেন, মাননীয় রাষ্ট্রপতি?"
রাগনার বললেন, "তোমার নামের সঠিক উচ্চারণ বুঝতে পারছি না, তাই। ইংরেজিতে কীভাবে লেখো?"
মকবুল অপ্রস্তুত হয়ে বললো, "এম ও কিউ বি ইউ এল। মকবুল।"
রাগনার আসনের পাশ থেকে একটা তুলোট কাগজ আর কালির দোয়াত বার করে টেবিলের ওপর রাখলেন। হেক্টর এসে তার পাশে দাঁড়িয়ে সেই কাগজে একটা কিছু লিখলো খসখস করে। রাগনার পকেট থেকে একটা সিল বার করে কালিতে চুবিয়ে কাগজে সিল মেরে বললেন, "কাউকে দিয়ে এস্তেবানের কাছে পাঠিয়ে দাও। কাজে লেগে পড়ুক সে।"
কাউন্সিলররা সকলেই চায়ে সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে চুমুক দিচ্ছে, মকবুল সাবধানে চায়ের কাপে একটা ছোটো চুমুক দিলো। চমৎকার সুগন্ধী চা, বোধহয় কোনো ফুলের পাঁপড়ি মেশানো।
হেক্টর কাগজের টুকরোটা নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো, রাগনার নিজের আসনে হেলান দিয়ে বসে বললেন, "এবার বলো মকবুল।"
মকবুল বললো, "আমি আসলে আপনাদের চাহিদাপত্র নিয়ে যেতে এসেছি। যোগাযোগ কেন্দ্র বিকল হয়ে পড়ে ছিলো, নইলে হয়তো আমাকে আসতেও হতো না। আমি সরাসরি একটা ক্যাপসুলে করে সব রসদ পাঠিয়ে দিতাম।"
রাগনার কাউন্সিলরদের দিকে তাকালেন। কাউন্সিলররা সবাই নির্বিকার চুমুক দিচ্ছে চায়ের পেয়ালায়। এভানগেলোসের চুমুকের আওয়াজ সবচেয়ে উচ্চগ্রামে শোনা যাচ্ছে।
রাগনার বললেন, "আমাদের কোনো চাহিদাপত্র নেই। আমরা যা চাই তা পেয়ে গিয়েছি।"
মকবুল বিস্মিত হলো কথাটা শুনে। চাহিদাপত্র নেই মানে?
"আপনারা একটা ইনসুলিন প্ল্যান্ট চেয়েছিলেন ...", মকবুল কেশে শুরু করলো।
রাগনার একটা হাত তুললেন। মকবুল থেমে গেলো। রাগনার বললেন, "আমরা কুড়ি বছর আগে ইনসুলিন প্ল্যান্ট চেয়েছিলাম। কিন্তু আর পাইনি। এখন আর আমাদের ইনসুলিন প্ল্যান্টের প্রয়োজন নেই বলে আমরা সিদ্ধান্তে এসেছি।"
মকবুল এবার নিজের ভেতরে একটা ক্রোধের ছোঁয়া অনুভব করলো। ঘটনা কী?
সে কণ্ঠস্বরে রাগের আঁচ লাগতে না দিয়ে প্রশ্ন করলো, "তাহলে আপনি আমার কিছু কৌতূহল নিবৃত্ত করুন বরং।"
রাগনার মাথা ঝাঁকালেন, "চেষ্টা করতে পারি।"
মকবুল বললো, "কিছু জিনিস একেবারেই হিসেবে মেলাতে পারছি না আমি। আপনাদের সর্বশেষ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের দেখলাম, তাদের দেখে মনে হয় তারা কোনো অসুখে ভুগছে। সবাই পেটরোগা। কিন্তু আপনারা বা আপনাদের সন্তানদের প্রজন্মের সবাই মোটামুটি স্বাভাবিক। আপনাদের কমিউনিটিতে কি কোনো রোগ ছড়িয়ে পড়েছে? আপনারা কি এ কথা গোপন করে যেতে চান পৃথিবীর কাছ থেকে?"
রাগনার স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, "না, কোনো রোগ আমাদের নাতি নাতনিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েনি। তাদের খাদ্যাভ্যাস আমাদের তুলনায় একটু ভিন্ন, এ কারণে হয়তো তোমার চোখে তাদের পেটরোগা মনে হচ্ছে। তবে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ এবং কর্মক্ষম।"
মকবুল সোজা হয়ে বসে শক্ত গলায় বললো, "আমি আপনার সাথে একমত হতে পারছি না মাননীয় রাষ্ট্রপতি। আপনাদের গোরস্থানে আমি ঢুকেছিলাম। আমি দেখেছি, সেখানে সারি সারি শিশুর কবর। কী হয়েছিলো ঐ শিশুদের?"
কাউন্সিলররা সকলেই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। রাগনার নিরুত্তেজ গলায় বললেন, "সারি সারি শিশুর কবর? আমাদের এখানে কয়েকটা বাচ্চা মারা গেছে জন্মের কয়েক বছরের মধ্যে, কিন্তু সারি সারি কবর দেয়ার মতো এতো শিশুর মৃত্যু তো হয়নি। তুমি ভুল দেখেছো।"
মকবুলের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। সে জানতো, একটা কিছু ঘাপলা আছে রোসিওতে। কিন্তু এ নিয়ে বুড়োকে পরে চেপে ধরবে সে। "ইনসুলিন প্ল্যান্ট আপনারা কেন চেয়েছিলেন?"
রাগনার কাঁধ ঝাঁকালেন। একজন কাউন্সিলর খুনখুনে গলায় বলে উঠলো, "রোসিওতে সবাই কমবেশি ডায়াবেটিক রোগী হে দারোগা। আমরা তো বটেই, আজকালকার ছোঁড়াছুঁড়িগুলোও পটাপট ডায়াবেটিস বাঁধিয়ে বসছে। ওষুধ আর কতো মাঙিয়ে আনবো? আমরা নিজেরা একটা প্ল্যান্ট পেলে নিজেরাই বানিয়ে নিতে পাত্তাম, সেটাও বোঝো না?"
মকবুল এবার তীব্র কণ্ঠে প্রশ্ন করলো, "আপনাদের যোগাযোগ কেন্দ্রে ট্র্যান্সমিটার মডিউলগুলো পাওয়া যায়নি। কেউ ওগুলো খুলে নিয়ে গেছে। কে খুলেছে, কেন খুলেছে?"
রাগনার মকবুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, "যোগাযোগ কেন্দ্র আমি আজ থেকে ঊনপঞ্চাশ বছর আগে নিজের হাতে অ্যাসেম্বল করেছিলাম ম্যানুয়াল দেখে দেখে। ট্র্যান্সমিটার মডিউল তো তালাবন্ধ থাকে। সেই তালার চাবি থাকে তোমাদের হাতে, পুলিশের হাতে। সেটা যদি কেউ খুলে থাকে, তোমাদের লোকই হয়তো খুলেছে।"
মকবুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীর কণ্ঠে বললো, "রোসিওর প্রতীক কি ভেড়া?"
কাউন্সিলররা মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো আবার। রাগনার সোজা হয়ে বসে একটা কঠিন হাসি মুখে নিয়ে মকবুলকে বললেন, "কেন তোমার এ কথা মনে হলো?"
মকবুল বললো, "আপনাদের সকলের গায়ে চাদরের নকশায় ভেড়ার মাথা দেখতে পাচ্ছি। আপনাদের খাবার টেবিলে কাপড়ের মাদুরের ওপরে ভেড়ার মাথা নকশা করা। আপনার পেছনে দেয়ালে একটা ভেড়ার শিংওয়ালা মাথা স্টাফ করা। আপনার নাতনির গলায় একটা হার ঝুলছে, সেখানে ভেড়ার মাথার লকেট। আর আপনার সিলটাও ভেড়ার মাথার। রোসিওতে আপনারা ভেড়ার মাথার অনেক দাম দেন, বুঝতে পারছি।"
রাগনার কঠিন হাসিটা মুখে রেখেই বললেন, "এটা কি তোমাদের পুলিশে রিপোর্টে পাওনি?"
মকবুল মাথা নাড়লো। "না। পুলিশের রিপোর্টে এসব কিছু নেই। এমনকি রাষ্ট্রপতির কথাও সেখানে বলা নেই। আমার ধারণা যদি ভুল না হয়, এই ভড়ংগুলো খুব বেশিদিন ধরে হয়নি। বড়জোর কুড়ি বছর ধরে চলছে। কারণ আমাদের শেষ রিপোর্ট কুড়ি বছর আগের।"
রাগনারের মুখ থেকে হাসি মুছে গেলো। তিনি গলা চড়িয়ে বললেন, "ভড়ং?"
মকবুল চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পেলো, হেক্টর ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে এদিকে।
মকবুল ঘাড় না ঘুরিয়েই বললো, "মাননীয় রাষ্ট্রপতি, আপনার প্রিটর যদি আমার ধারে কাছে আসে, আমি তাকে পিটিয়ে তক্তা বানাবো, এ কথাটা তাকে জানিয়ে দিন।"
রাগনার কঠিন চোখে মকবুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, "তোমরা, নভোকেন্দ্রের মাতবররা কি ভেবেছো, আমরা সারাটা জীবন, বাপ-ছেলে-নাতি সবাই তোমাদের কয়েদ থেকে যাবো?"
মকবুল শক্ত, হিংস্র গলায় বললো, "হ্যাঁ! এটা একটা জেলখানা, আপনাকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আপনারা হয়তো নিজেদের খেয়াল খুশিমতো বাস করতে পারছেন, কিন্তু এ কথাটা ভুলে যাবেন না! এটা একটা জেল, আপনারা সকলে কয়েদী! আপনারা ছেলে-নাতি পয়দা করতে পেরেছেন নভোকেন্দ্রের মাতবরদের দাক্ষিণ্যেই। পৃথিবীতে থাকলে বাচ্চা পয়দা করার সুযোগ পেতেন আপনারা?"
রাগনার শক্ত, নিচু গলায় বললেন, "কয়েদীর সন্তানও কয়েদী হবে? বংশ পরম্পরায় চলতেই থাকবে এমন?"
মকবুল একই রকম হিংস্র কণ্ঠে বললো, "হ্যাঁ! দশ বছর পর পর এ কথা স্মরণ করিয়ে দিতে আমরা আসবো। ভুলে যাবেন না সেকথা! ইসমেত বির্নি ভেড়ার গলায় ছুরি চালাচ্ছে, এমন মূর্তি যতো খুশি বানান, আসল কথাটা না ভুললেই আমরা খুশি। অস্ট্রেলিয়াতে যেভাবে কয়েদী পাঠিয়ে বসতি গড়ে তোলা হয়েছিলো, রোসিওতেও সেরকমই করা হবে!"
রাগনারের মুখে আবার হাসিটা ধীরে ধীরে ফিরে এলো। তিনি আয়েশ করে হেলান দিয়ে বসে বললেন, "গনজালেসের বানানো মূর্তিটা তুমি দেখেছো তাহলে? কেমন বুঝলে কলাপাল গনজালেস? তোমার মূর্তি দেখে পৃথিবীর নভোপুলিশ তো মহাক্ষিপ্ত দেখছি!"
কাউন্সিলরদের মাঝে এক বৃদ্ধ চায়ের পেয়ালা তুলে সুড়ুৎ করে চুমুক দিলো।
রাগনার মকবুলের দিকে ফিরে বললেন, "তুমি কি জানো, পৃথিবীতে আমার অপরাধ কী ছিলো?"
মকবুল বললো, "জানি। আপনার নাম শোনার সাথে সাথেই চেক করেছি। দ্বিগামিতা।"
রাগনার বললেন, "হ্যাঁ। আমি আইসল্যাণ্ডের লোক। আমার দেশে ওর শাস্তি খুব একটা কড়া কিছু ছিলো না। কিন্তু তোমাদের ইসমেত বির্নির ঠেলে দেয়া আইনের প্যাঁচে পড়ে আমার নাম লটারিতে উঠে গেলো। আমাকে দুটোর মধ্যে থেকে একটা সুযোগ বেছে নিতে বলা হলো। হয় নভোকারাগারে বাকি জীবন কাটাবো, অথবা পৃথিবীতে আমরণ কারাবাস। আমাকে রংচঙে একটা পুস্তিকা ধরিয়ে দেয়া হলো, তাতে রোসিওর আজগুবি সব ছবি। বলা হলো, এখানে একটা স্বাধীন জীবন পাবো আমি। এই কি তোমাদের ন্যায়বিচার? আমি বছর তিনেকের মধ্যে ছাড়া পেয়ে যেতাম। বির্নির কারণে আমাকে শুধু আমরণ কারাবাসেই আসতে হলো না, আমি আরও কী হারালাম, তা জানো?"
মকবুল কোনো উত্তর দিলো না।
রাগনার নিচু, হিংস্র গলায় ফুঁসে উঠলেন, "আমি মানুষ হিসেবে হাজার হাজার বছরের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকার হারালাম! আমি ছিলাম একজন আইনজীবী, একজন সভ্য মানুষ, যে দুটি নারীকে ভালোবাসতো, কিন্তু তাদের কাছে সে কথা মুখ ফুটে বলার সাহস করেনি, চুরি করে দুজনের সাথেই জীবনটা ভাগ করে নিতে চেয়েছে! আমার কাপুরুষতার অধিকারটুকু তোমাদের আইন কেড়ে নিতে চেয়েছে, কিন্তু মানুষ হিসেবে আমার ইতিহাস, আমার সভ্যতা, আমার শিক্ষা, আমার সংস্কারের উত্তরাধিকার কেড়ে নিয়েছে তোমাদের ইসমেত বির্নি! আমি, আমরা সবাই হয়ে গেছি পরীক্ষাগারের ইঁদুর! কতগুলো ঘাস লতাপাতার বীজ আর ভেড়া-মুরগি সম্বল করে আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে মহাবিশ্বের আরেক প্রান্তে! আমাকে বলা হচ্ছে একটা প্রাণীর মতো বেঁচে থেকে প্রমাণ করতে, যে এখানে এই গ্রহে, এই ভাসমান পাথরের টুকরোয়া তোমরা আরো অনেক মানুষকে পাঠাতে পারবে! তারা আসবে স্বেচ্ছায়, মানুষের হাজার হাজার বছরের অভিজ্ঞতার প্রত্যেকটা সুতোকে টেনে সঙ্গে নিয়ে। আর আমি? আমি এসেছি সব মূল পেছনে ফেলে, কয়েকটা ম্যানুয়াল সম্বল করে! আমাকে নিজের হাতে এই মরা মাটিতে ঘাসের বীজ ছড়াতে হয়েছে ভেড়া চড়ানোর জন্যে, আমাকে আকাশের দিকে মুখ হাঁ করে বসে থাকতে হয়েছে সঠিক পিএইচের বৃষ্টির জলের অপেক্ষায়! আমি একটা ল্যাবরেটরির সাদা ইঁদুর? আমি? রাগনার ওলাফসন, যার অন্য সবার মতো পৃথিবীর মাটিতে একটা মানুষ হয়ে, মানুষের উত্তরাধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার পূর্ণ অধিকার ছিলো? তোমরা আমাকে দ্বিগামিতার জন্যে শাস্তি দিয়েছো, এখানে এসে আমি বারোজন নারীর গর্ভে সন্তান উৎপাদন করেছি, তোমরা মানুষের যে উত্তরাধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করেছো, তা নতুন করে সৃষ্টি করতে। তোমরা দশ বছর পর পর তোমাদের কর্তৃত্ব জাহির করতে আসো তোমাদের ভিক্ষার থলি নিয়ে, এটাসেটা হাবিজাবি দিয়ে যেতে চাও, যেভাবে গবেষণাগারের ইঁদুরকে কয়েকদিন পর পর পনিরের টুকরো দেয়া হয় তার ইঁদুর দৌড়ের পুরস্কার হিসেবে! তোমরা দেখতে আসো, আমরা ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারি কি না, আমাদের এখানে ঠিকমতো বৃষ্টি হয় কি না, ফসল ফলে কি না, মৌমাছি ফুলের মধু খায় কি না। আমরা এখানে মানুষ নই, আমরা এখানে শুধু পৃথিবীর প্রাণচক্র কৃত্রিমভাবে রোপণ করার দাসমাত্র! আমাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে যখন এখানে তোমাদের চোখে সত্যিকার মানুষেরা বড় নভোযানে চড়ে হাজারে হাজারে, অযুতে অযুতে এসে নামবে! তাই তো? মানি না আমি তোমাদের এই মাতবরি! রোসিও তোমাদের মর্জিমতো চলবে না!"
রাগনার হাঁপাতে লাগলেন, মকবুল পাথরের মতো স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তার একটি চোখ একই সাথে টেবিলের ওপর রাখা নিজের হেলমেটে হেক্টরের প্রতিবিম্বের দিকে। হেক্টর নড়লে সেও নড়ে উঠবে। মকবুল কামনা করলো, হেক্টর নড়ে উঠুক। তার ভেতরে দলা পাকিয়ে ওঠা রাগ কারো ওপর ঝাড়তে হবে।
রাগনার বললেন, "তোমার কৌতূহল মিটেছে?"
মকবুল ধীর গলায় বললো, "না। আপনাদের ভেড়ার খামার কোথায়?"
কাউন্সিলরদের মধ্যে একজন কেশে উঠলো।
রাগনার হাসিমুখে বললেন, "আমাদের কোনো ভেড়ার খামার নেই।"
মকবুল তাকিয়ে রইলো রাগনারের দিকে। লোকটার হাসিতে ভেতরের হিংস্রতাটুকুই শুধু ফুটে উঠেছে। "মুরগির খামার?"
রাগনার বললেন, "আমাদের কোনো মুরগির খামারও নেই। ঊনিশ বছর আগে, এক ছত্রাকের সংক্রমণে আমাদের সব ভেড়া আর মুরগি মারা গিয়েছে। আমরা ভেড়া আর মুরগির যাবতীয় সরঞ্জাম অ্যালকোহল ঢেলে পুড়িয়ে দিয়েছি।"
মকবুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, "এ কারণেই আপনারা সবাই নিরামিষাশী?"
রাগনার কাঁধ ঝাঁকালেন। "আমাদের এখানে প্রাণীজ আমিষের কোনো উৎস নেই আর।"
মকবুল ঝুঁকে পড়ে বললো, "ঐ রোগেই কি আপনাদের শিশুগুলো মারা গিয়েছে?"
রাগনার হাসলেন। "না। আমি তো বললাম, আমাদের শিশুদের কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেনি।"
মকবুল হেলমেটটা তুলে নিয়ে ভেতরের স্ক্রিন স্পর্শ করে দুপুরে দেখা গোরস্থানের দৃশ্য আবার নতুন করে দেখলো। একটা শিশুর কবরের নামফলক থেকে জোরে জোরে নাম পড়লো সে, "আমির হালেব। এই শিশুটির সাথে অন্তত পক্ষে ষাটটি শিশুর কবর দেখেছি আমি ...।"
কাউন্সিলররা হেসে উঠলো সবাই। মকবুল কঠিন চোখে তাকালো তাদের দিকে।
রাগনার হাসিমুখে বললেন, "আমির হালেব আমাদের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলো। সে শিশু হতে যাবে কেন? পরিণত বয়সেই তার মৃত্যু ঘটেছে।"
মকবুল গোরস্থানে আমির হালেবের কবরের দৃশ্য আরেকবার দেখলো। পরিষ্কারভাবেই সেটি একটি শিশুর কবর।
বাইরে একটা ঘন্টা বেজে উঠলো। হেক্টর দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলো। মকবুল রাগনারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার মাথায় চিন্তার ঝড় বইছে।
সাধারণ টিউনিক পরা একজন লোক হাতে একটা বাক্স নিয়ে প্রবেশ করলো হেক্টরের পিছু পিছু। রাগনার হাত বাড়িয়ে ইশারা করলেন। "এসো এস্তেবান।"
মকবুল ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। এস্তেবানের বয়স হেক্টরের মতোই হবে, সাধারণ চেহারা তার। হাতে একটা বাক্স।
রাগনার বললেন, "আমি বুঝতে পারছি, তোমার ভুল কোথায় হচ্ছে। এই যে এসে গেছে এস্তেবান। আমাদের পাথরশালের অধ্যক্ষ। যাবতীয় পাথরের কাজ ও দেখে। আর এটা হচ্ছে একটা চুনাপাথরের বাক্স, আস্ত পাথর কুঁদে বানানো। অসুয়ারি কাকে বলে জানো?"
মকবুল মাথা নাড়লো। সে জানে না।
রাগনার ইশারা করার পর হেক্টর বাক্সের ওপরের ঢাকনাটা নামিয়ে বাক্সটা দেখালো মকবুলকে। ছোটো, দুই ফুট বাই দুই ফুট বাই এক ফুট মাপের বাক্সটা, ভেতরটা খালি। বাক্সের বাইরের দিকটা চমৎকার পালিশ করা।
রাগনার বললেন, "অসুয়ারি হচ্ছে অস্থ্যাগার। ওর ভেতরে হাড়গুলো থাকে কেবল। পুরোনো দিনের অর্থডক্স খ্রিষ্টান আর ইহুদিদের ওভাবে সমাহিত করা হতো, জানো না বোধহয়।"
মকবুল কিছু বললো না। ব্যাখ্যাটা গ্রহণযোগ্য। ওরকম একটা বাক্সে হাড়গোড় ভরে কবর দিয়ে রাখলে কবরটা ছোটোই হবে, বাচ্চাদের কবরের মতোই দেখাবে বাইরে থেকে।
রাগনার হাসলেন। বললেন, "তুমি খুব চটে আছো আমার ওপর। ভাবছিলে একটা উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করে চেপে ধরবে আমাকে? কিন্তু চেপে ধরলেই বা কী? আর কী শাস্তি দেবে আমাকে? ধরে নিয়ে যাবে? অন্য কোনো ফালতু গ্রহে আবার জেলে ঢোকাবে?"
মকবুল ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে রইলো রাগনারের দিকে।
রাগনার ইশারা করলেন, এস্তেবান বাক্সটা রেখেই চলে গেলো। হেক্টর বাক্সটা নিয়ে পিছিয়ে সম্মানজনক দূরত্বে গিয়ে দাঁড়ালো।
রাগনার খুব ঠাণ্ডা, কঠিন স্বরে বললেন, "তুমি হয়তো ভাবছো, তুমি চাইলে ওরকম কিছু করতে পারবে। পারবে কি পারবে না, সক্ষমতা বা ঔচিত্যের আলাপ আমি পরে করবো। কিন্তু তুমি ঠিক প্রশ্নগুলো করছো না। ঠিক প্রশ্নগুলো করলে আমাকে ঠিকই প্যাঁচে ফেলতে পারো কিন্তু।"
মকবুল ধীরে হাত বাড়িয়ে কোমরে পিস্তলের বাঁটের স্পর্শ নিলো আঙুলে।
রাগনার চোখ বুঁজে বললেন, "যেমন মনে করো, তুমি বুঝতে পারছো, আমরা শর্করাপ্রধান খাবার খাই, আর আমিষ কম খাই বলে আমাদের নাতিনাতনিগুলো ওরকম পেটরোগা। কিন্তু তুমি জানতে চাইছো না, কেন আমরা তারপরও পৃথিবীর কাছ থেকে নতুন করে আমিষের চালান চাইছি না। কেন আমরা আরও ভেড়া, গরু, মুরগি বা মাছ চাইছি না, এ প্রশ্ন কিন্তু তুমি করছো না?"
মকবুল বললো, "কেন?"
রাগনার একটা হাত তুললেন। "বলছি। তুমি আরও জানতে চাইছো না, কেন আমার নাতনী, যার বয়স মাত্র ষোলো, যে কুড়ি বছর আগে জন্মায়ওনি, কীভাবে গতবছর এক ছবি আঁকার প্রতিযোগিতায় নভোপুলিশ আর তার অবতরণযানের ছবি এঁকে প্রথম পুরস্কার পেলো।"
মকবুল অনুভব করলো, তার শরীরে একটা ঠাণ্ডা ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে। তার কয়েক মুহূর্ত পরই তার হৃদস্পন্দনের গতি দ্রুত হয়ে উঠলো।
রাগনার বললেন, "তুমি আরও জানতে চাইছো না, কেন তোমার আগমন উপলক্ষে পাহাড়গ্রামে ছুটি ঘোষণা করে একদিনের ভোজ উৎসব ডাকা হয়েছে।"
মকবুলের শরীরের পেশী কঠিন হয়ে উঠলো।
রাগনার তাকিয়ে রইলেন মকবুলের দিকে, "এগুলো জরুরি প্রশ্ন কিন্তু!"
মকবুলের মাথায় একটা আবছা ছবি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হওয়া শুরু করলো।
রাগনার একটু সামনে ঝুঁকে ধীর গলায় বললেন, "তুমি জানতে চাইছো না, কেন আমরা বলছি, আমাদের কোনো চাহিদাপত্র নেই, আমরা যা চাই তা পেয়ে গিয়েছি?"
মকবুল ঘড়ঘড়ে গলায় বললো, "কেন?"
রাগনারের মুখে একটা সূক্ষ্ম হাসি খেলে গেলো। "কারণ, আমরা পৃথিবীর সাথে আর এই ইঁদুর আর ইঁদুরওয়ালার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী নই। আমাদের যা কিছু সম্বল আছে, তা নিয়েই আমরা সামনে চলবো যতদিন পারি। তোমরা একটা মরা গ্রহে আমাদের রোপণ করে দিয়ে গেছো, আমরা সে কথা ভুলে গিয়েছি। আমাদের সবকিছু আবার শূন্য থেকে শুরু হয়েছে। আমরা চাই না, তোমরা আমাদের সাথে আর যোগাযোগ করো।"
মকবুল ধীরে ধীরে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, "বাকি প্রশ্নগুলোর উত্তর কী?"
রাগনার বললেন, "আমার নাতনি তোমাদের অবতরণযানের ছবি আঁকতে জানে, কারণ সে অল্প বয়সে ওরকম একটা জিনিসকে নামতে দেখেছিলো। সেই অবতরণযান থেকে এক কৃষ্ণাঙ্গ পুলিশও নেমেছিলো রোসিওতে। তবে, সে আর ফিরে যায়নি। এখানেই রয়ে গেছে।"
মকবুলের হোলস্টার থেকে পিস্তলটা বিদ্যুৎবেগে বেরিয়ে এলো, ফ্ল্যাপের চটাশ শব্দে কেঁপে উঠলো ভোজঘর।
"কোথায় সে?" চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞাসা করলো মকবুল।
রাগনার বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। হেক্টর বুকে হাত বেঁধে যেমন দাঁড়িয়েছিলো, তেমনই দাঁড়িয়ে রইলো।
"তাকে, বা তার অবশিষ্টাংশ তুমি দেখেছো হয়তো, তবে মনোযোগ দিয়ে দেখোনি।" রাগনার অলস কণ্ঠে বললেন, "সে আমাদের গোরস্থানেই আছে।"
মকবুলের মাথার ভেতরে একটা ছবি ক্রমশ দানা পাকিয়ে স্পষ্ট হয়ে আসছে, সে কপালের ঘাম মুছলো হাতের দস্তানায়। "কী হয়েছিলো তার?"
রাগনার বললেন, "বলছি। তার চাবি দিয়েই ট্র্যান্সমিটার কেবিনের দরজা খুলেছিলাম আমরা। তারপর ট্র্যান্সমিটার মডিউল খুলে আমরা সেগুলো ধ্বংস করেছি। তারপর কেবিনের দরজা আবার লাগিয়ে দিয়েছি। সে কারণেই তুমি এসে সেগুলো দেখতে পাওনি।"
মকবুল পিস্তলের মাজলটা হেক্টরের বুকের দিকে তাক করে বললো, "কেন?"
রাগনার মকবুলের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "ঊনিশ বছর হয়ে গেছে, আমরা প্রাণীজ আমিষ খেতে পাই না, কমাণ্ডার মকবুল। তোমরা দশ বছর পর পর তাগড়া মোষের মতো একেকজন পুলিশ পাঠাও। তাদের ওজন কমসেকম দুশো পাউণ্ড হয়। দুশো পাউণ্ডের শরীরে মাংস থাকে ধরো একশো পাউণ্ডের মতো? আমরা একটা ভোজের আয়োজন করি, যেখানে মাথাপিছু আধ পাউণ্ড করে মাংস বরাদ্দ করা হয়। ধরো, দুশো জনের মতো লোক সেই ভোজে একটা দিন পেট পুরে মাংস খেতে পায়?"
মকবুলের শরীরটা অবশ হয়ে এলো। তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো মেলিন্দার মুখ। স্ফূরিত ঠোঁট মেলে মেয়েটা বলছে, আপনাকে কালকের ভোজে অংশ নিতে হবে কিন্তু!
ভোজে কীভাবে অংশ নেবে মকবুল? অতিথি হয়ে, না খাবার হয়ে?
নিরামিষাশী নয়, এরা নরখাদক!
রাগনার নিজের আসনে হেলান দিয়ে বসে তৃপ্ত গলায় বললেন, "খুব তো অস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ দিলে ছোকরা। পাপুয়া নিউগিনিতে কী করে লোকে জানো? কেউ মারা গেলে তাকে কেটেকুটে খেয়ে ফেলে। কেন খায়? কারণ তাদের প্রাণীজ আমিষের তেমন কোনো উৎস নেই। আমাদের মতোই। আমরাও তাই কেউ মারা গেলে তার মাংসের অপচয় আর করি না। খেয়ে ফেলি, হাড়গোড়গুলো একটা অস্থ্যাগারে পুরে কবর দিয়ে দিই। ... তোমার অস্থ্যাগারটা কেমন দেখলে? পছন্দ হয়েছে তো? হেক্টর, ঢাকনাটা দেখাও কমাণ্ডারকে। মকবুল, দেখো তোমার নামের বানান ঠিক আছে কি না।"
মকবুল ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো, হেক্টর একটা চুনাপাথরের স্ল্যাব ধরে রেখেছে বুকের কাছে। তাতে চমৎকার খোদাইয়ে আলকাতরা পুরে লেখা, কমাণ্ডার মকবুল। সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। মৃত্যু: ৫০ সন।
মকবুল হাতের পিস্তলটা তাক করলো রাগনারের মাথার দিকে। "দুঃখিত, মহামান্য রাষ্ট্রপতি।" চিবিয়ে চিবিয়ে বললো সে। "এখনই মরার ইচ্ছা আমার নেই।"
রাগনার মকবুলের পিস্তলের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলেন। "আমারও না।"
মকবুল অনুভব করলো, ঘামের একটা ধারা তার পিঠ বেয়ে নেমে যাচ্ছে।
রাগনার কৌতুকের সাথে বললেন, "তুমি আরেকটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গেছো কমাণ্ডার।"
মকবুলের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো, তার চোখের আগুনে ভেসে উঠলো প্রশ্নটা।
রাগনার বললেন, "এভানগেলোসের মতো একটা পকেটমারকে আমরা কেন নগরপাল বানিয়েছি?"
মকবুলের মুখ থেকে আস্তে আস্তে রক্ত সরে যেতে লাগলো। কেন? এভানগেলোসের মতো লোক কেন নগরপাল?
রাগনার বললেন, "কারণ নগরপাল নভোপুলিশের কমাণ্ডারদের অভ্যর্থনা জানায়, সাথে সাথে থাকে। আর গত ষাট বছর ধরে প্র্যাকটিসের কল্যাণে, খুব সফলভাবে সেই কমাণ্ডারদের হোলস্টারের ইলেকট্রনিক পিস্তল থেকে ব্যাটারিটা খুলে রেখে দেয়।"
মকবুল সাঁই করে ঘুরে হেক্টরের মাথা বরাবর পিস্তল তাক করে ট্রিগারে চাপ দিলো।
কিছুই ঘটলো না।
মকবুলের পেছনে দরজা খুলে গেলো। খাটো টিউনিক পরা ছয়জন যুবক প্রবেশ করলো সেই পথে। তাদের প্রত্যেকের হাতে খোলা তলোয়ার ধরা।
৪.
ঘোড়ামুখ হ্রদের পারে ঝলমল করছে রোদ। পাইন কাঠের আগুনে ঝলসানো হচ্ছে টুকরো টুকরো মাংস। বেলেল্লা ছুকরির দল হাসাহাসি করছে একটা বিশেষ টুকরো নিয়ে।
মেলিন্দা চুপচাপ আগুন খুঁচিয়ে আঁচ বাড়াতে লাগলো। সবাইকে পরিবেশন করে তবেই নিজে পাতে খাবার নিয়ে বসবে সে।
[সমাপ্ত]

3 comments:

  1. অসাধারণ! দুর্ধর্ষ!! প্রথম দিকটা পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, বোধহয় Moon (http://www.imdb.com/title/tt1182345/) এর মতো গল্প হতে চলেছে... কিন্তু কি করলেন!

    একটা অনুরোধ করবো? আমাদের ব্লগের জন্য (http://kothatobolarjonyei.blogspot.in/) আপনার লেখাটা পেতে পারি? আপনার ইচ্ছে থাকলে এই ঠিকানায় যোগাযোগ করতে পারেন- kotha2bolarjonyei@gmail.com

    ReplyDelete
  2. আপনাকে ধন্যবাদ সুনন্দ। আমি শুধু সচলায়তনে লিখি [www.sachalayatan.com], আর আমার নিজের ব্লগে, অন্য কোনো ব্লগে লেখা প্রকাশের ইচ্ছা আমার আপাতত নেই। আপনাদের ব্লগের জন্যে শুভকামনা রইলো।

    ReplyDelete
  3. কোন অসুবিধে নেই... 'রয়ে সয়ে' কে আমাদের ব্লগ রোলে যোগ করায় নিশ্চয়ই আপনার অসুবিধে নেই, তাই অনুমতি ছাড়াই সেটা করে ফেললাম... :)

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।