Friday, May 18, 2012

গুণীজনের দায়মুক্তি

কৃতী সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ একটি ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস রচনায় হাত দিয়েছেন, সেটির শিরোনাম দেয়াল। উপন্যাসটি নিয়ে বইমেলার সিজনে পত্রিকায় নানা রোমাঞ্চকর কথাবার্তা লিখে প্রোমোশন চালানো হয়েছে, আর দৈনিক প্রথম আলো ট্রেলর হিসেবে এর কিয়দংশ [১] প্রকাশ করেছে।

একই দিনে প্রথম আলো পাঠকের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছে উপন্যাসটির প্রেসকপির পাঠপ্রতিক্রিয়া, সুলেখক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের [২] কলমে। সেখানে একটি বিস্ময়কর শিরোনামে উপন্যাসটির সুখ্যাতি করা হয়েছে, দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত লেখকের প্রতি সহানুভূতি আকর্ষণের প্রয়াস যেখানে খুবই দৃষ্টিগোচর হয়।

সৈয়দ সাহেবের অনর্গল প্রশংসার পরও কিছু দুষ্ট লোক হুমায়ূনের উপন্যাসটির বর্ণনায় রেফারেন্সসহ ইতিহাসের তথ্যগত ত্রুটির প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন। সচলায়তনে হাসান মোরশেদ [৩] ও কুলদা রায়ের [৪] দুটি পোস্টে বেশ কিছু অসঙ্গতি আলোচনা করা হয়েছে। অমি রহমান পিয়াল বাংলানিউজে এ ব্যাপারে আলোকপাত করেছেন [৫]। এর কয়েকদিন পর উচ্চ আদালতে উপন্যাসটিতে শেখ মুজিবুর রহমানের পুত্র রাসেলের মৃত্যুদৃশ্যটি সঠিকভাবে বিধৃত না হওয়ার অভিযোগ এনে এতে সংশোধনের দাবি তোলেন অ্যাটর্নি জেনারেল [৬],  আদালত হুমায়ূন আহমেদকে উপন্যাসটি সংশোধন করতে বলেন।

হুমায়ূন আহমেদের এই উপন্যাসটির বিরুদ্ধে প্রথম আলোতে প্রকাশিত অংশের ভিত্তিতে যেসব অভিযোগ পাঠকেরা তুলেছেন, তা হচ্ছে:

১. তিনি মেজর ফারুককে একজন সংবেদনশীল অথচ দৃঢ়চিত্ত, দেশপ্রেমিক ও কর্মঠ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। সেইসঙ্গে শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ড নিয়ে ফারুকের পরিকল্পনাকে তিনি একান্ত ফারুকের পরিকল্পনা হিসেবে সাজিয়ে এর সাথে একটি আধ্যাত্মিক সংযোগরেখা টেনেছেন। সরলচিত্ত ও ইতিহাসমূর্খ পাঠক এ অংশটুকু পাঠ করে যে সিদ্ধান্তে আসতে পারে, তা হচ্ছে, ফারুক একজন পীরবংশীয় ব্যক্তি, তিনি আধ্যাত্মিক আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে শেখ মুজিবকে হত্যার পরিকল্পনার একটি অলৌকিক অনুমোদন গ্রহণ করেন, এবং শেখ মুজিবকে হত্যার পেছনে তার উদ্দেশ্য ছিলো দেশকে একনায়কতন্ত্র থেকে মুক্ত করা। ইতিহাসের নিবিড় পাঠ আমাদের জানায়, এ প্রতিটি তথ্যই অসত্য।

২. খোন্দকার মুশতাক আহমদকে হুমায়ূন আহমদ ঘটনার পেছনে একজন প্রত্যক্ষ ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে না দেখিয়ে পরোক্ষ চরিত্র হিসেবে এঁকেছেন। খোন্দকার মুশতাকের মাথার জিন্নাহ টুপিকে হুমায়ূন কৌশলে নেহরু টুপি লিখে মুশতাকের পাকিস্তানপন্থাকে আড়ালের চেষ্টা করেছেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল আপত্তি তুলেছেন শেখ রাসেলের হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা নিয়ে।

উপন্যাসটির প্রেসকপি পড়ার সুযোগ আমাদের হয়নি, যাদের সে সুযোগ হয়েছে, তাদের মাঝে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও মো. আনোয়ার হোসেন রয়েছেন।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম উপন্যাসটিকে অত্যন্ত আবেগমণ্ডিত ভাষায় সত্যানুসন্ধানে সফল বলে সার্টিফিকেট দিয়েছেন। এর ঐতিহাসিক তথ্যগত বিকৃতি নিয়ে সৈয়দ হয় অনবগত, নয়তো তিনি ব্যাপারটা বুঝেও এড়িয়ে গিয়েছেন। তাঁর মতো পণ্ডিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে দুটিই অমার্জনীয় ত্রুটি। একটি ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাসের শংসাবচন লেখার জন্যে যিনি কলম ধরেন, স্বাভাবিকভাবেই পাঠক ধরে নেন, তিনি ইতিহাস ও উপন্যাস, উভয় বিষয়েই গভীর প্রজ্ঞার অধিকারী। সৈয়দ মনজুরুলের উপস্থাপনায় পাঠক আরো আশ্বস্ত হয়। তিনি একটি চমকপ্রদ শিরোনাম হাজির করছেন, "ইতিহাসের দায়মুক্তি", যা পড়ে পাঠকের মনে হতে পারে, ইতিহাস নিজেই একটি গভীর দায় নিয়ে হতাশ মুখে পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলো, হুমায়ূন এসে সে দায় মোচন করেছেন। আমরা সৈয়দের কলমে ইতিহাসকেই দায়গ্রস্ত অপরাধী হিসেবে সনাক্ত হতে দেখি, যেভাবে গ্রাম্য শালিসে ধর্ষিতাই অপরাধী বিবেচিতা ও ঘোষিতা হয়, এবং প্রায়শ আক্রান্তও হয় শালিসদারদের হাতে। ইতিহাসকে সৈয়দ সালিশে চড়িয়ে হুমায়ূনকেই নায়ক হিসেবে রায় দেন। ইতিহাসের তথ্যবিকৃতিকে ইতিহাসের ধর্ষণ বললে অত্যুক্তি হয় না, তাই সৈয়দকে কলম হাতে গ্রামের সালিশদারের মোড়ায় বসতে দেখে আমরা, তাঁর সূক্ষ্ম রসবোধের সমঝদাররা আহত হই।

সৈয়দ গভীর আত্মবিশ্বাস নিয়ে তাঁর অ্যাকোলেডে লিখেছেন,

এই উপন্যাসে তিনি কোনো ইতিহাসবিদের জায়গা নেননি, যদিও একজন ইতিহাসবিদের নির্মোহ দৃষ্টি, বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা এবং তথ্যনির্ভরতা তিনি বজায় রেখেছেন। 
আমরা সৈয়দের সাথে একমত হতে না পেরে "নির্মোহ দৃষ্টি", "বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা" আর "তথ্যনির্ভরতা" শব্দগুলোর সংজ্ঞা ও সঠিক ব্যবহার নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ি। নির্মোহ দৃষ্টিমান একজন মানুষ কেমন করে রাষ্ট্রনায়ক হত্যার ষড়যন্ত্রকে আধ্যাত্মিক অনুমোদনের লেবাস পরান? "বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা" করে একজন লোক কেমন করে মেজর ফারুককে মুক্তিযুদ্ধে বীর সেনানী হিসেবে উপস্থাপন করেন, আর জিন্নাহ টুপিকে নেহরু টুপি বানিয়ে দেন? "তথ্যনির্ভরতা" কথাটিও এসব প্রশ্নের পাকে মুখ লুকায়। সৈয়দের কাছে এসব জিজ্ঞাসা রইলো। সৈয়দ এরপর হাজির করেছেন আরো একটি অদ্ভূত ধারণা,

হুমায়ূন আহমেদ রাজনীতির মানুষ নন। তিনি রাজনৈতিক বিতর্কে যাননি, সাজানো আখ্যানগুলোর অনেক দূরে রেখেছেন নিজের অবস্থান এবং শুধু মানবসত্যের প্রতি অবিচল থেকে ওই বিষণ্ন ইতিহাস থেকে রসদ নিয়ে দেয়াল উপন্যাসটি লিখেছেন।
এখানে বাংলাদেশের বিরাজনৈতিকীকরণের ভূতে আক্রান্ত সমাজ, যারা মূলত প্রথম আলো ও হুমায়ূন আহমেদের মুগ্ধ পাঠক, যারা দলরাজনীতি নিয়ে বিরক্ত এবং প্রথম আলোর কল্যাণে এই বিরক্তির কাটা ঘায়ে নুন ও লেবু রেখে তেকিয়া পান করতে আগ্রহী, তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। আমরা শঙ্কিত হই, কারণ রাজনৈতিক ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস লিখতে গেলে দলীয় রাজনীতির অংশ না হলেও চলে, কিন্তু রাজনৈতিক বিতর্কের মুখোমুখি হতে হয়, তার মোকাবেলা করতে হয়, এবং লিখতে হয় সৈয়দ কথিত নির্মোহ দৃষ্টি, বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা আর তথ্যনির্ভরতাকে পুঁজি করেই। রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে সত্য কথা বলার ব্যাপারটি কাঁঠালের আমসত্ত্বের মতোই, কারণ সত্যকে আক্রমণ করেই রাজনৈতিক বিতর্কের সূচনা ঘটে। আমাদের দ্বিধাবিভক্ত রাজনীতিতে সব কূল রক্ষা করে যদি কেউ ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাস রচনা করতে যান, সেটি সত্যকে সমুন্নত করে না, সমুন্নত করে সুবিধাবাদকে।

প্রথম আলোতে তারপর কলম ধরেছেন মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষক ড. মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি জানিয়েছেন, তিনি মেজর ফারুক সংক্রান্ত তথ্যবিকৃতি নিয়ে পাঠকের উদ্বেগ সম্পর্কে অবগত এবং এ ব্যাপারে তিনি প্রেসকপিতে সংশোধনী হিসেবে মন্তব্য লিখে দিয়েছেন। আনোয়ার লিখেছেন,

চিঠিতে হুমায়ূন লিখেছেন, ‘পাণ্ডুলিপি পড়ার সময় মনে রাখবে, আমি উপন্যাস লিখতে বসেছি। ইতিহাস না। আমি লেখক মানুষ, উপন্যাসই লিখব। তোমরা লিখবে ইতিহাস।’ 
আমরা এখানে আনোয়ারের বরাতে হুমায়ূনের একটি কৌশল দেখতে পাই, তিনি একাধারে ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাস লিখবেন, কিন্তু পাঠকের কাছে ইতিহাস থেকে উপন্যাসটিকে বিযুক্ত করেও উপস্থাপন করবেন। এই স্ববিরোধিতার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? উপন্যাসটির আধেয়র কারণে এটি বিতর্কিত হবে, এর কাটতি বাড়বে, লেখক-প্রকাশক লাভবান হবেন, কিন্তু ইতিহাসের সচেতন বিকৃতির দায়টি তারা চাপিয়ে দেবেন উপন্যাসের ঘাড়ে, তারা সেই বিকৃতির দায়মুক্তি নেবেন এই বলে যে উপন্যাস ইতিহাস নয়। উপন্যাস ইতিহাস নয়, এ কথা শিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রেই জানে, কিন্তু ইতিহাস যদি উপন্যাসে এসে বিচ্যুত হয়, বিকৃত হয়, তার দায় ঔপন্যাসিক নেবেন না কেন? উপন্যাস যদি ইতিহাস না-ই হবে, তাহলে কেন হুমায়ূন উপন্যাসে রেফারেন্স ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন? উত্তরটি হচ্ছে, তিনি নিজের করা বিকৃত ইতিহাসকেও সূত্র যুগিয়ে সমর্থনযোগ্য করে তোলার একটা প্রয়াস চালিয়েছেন। এই চেষ্টাটি নতুন কিছু নয়, গত বছর মেহেরজান চলচ্চিত্রেও আমরা এই প্রবণতা দেখেছি এবং প্রতিবাদ করেছি। মেহেরজানের প্রোমোশনও করেছিল প্রথম আলো। এই বিষয় নিয়ে অন্য কেউ বিস্তারিত লিখবেন, সে অনুরোধ রেখে আমি ড. আনোয়ারের লেখার পরবর্তী অংশ নিয়ে আলোকপাত করতে চাই। আনোয়ার লিখেছেন,

দেয়াল-এর কিছু অংশ পড়ে কিছু বিষয় বিশেষ করে কর্নেল ফারুক প্রসঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের বক্তব্য নিয়ে যাঁরা সমালোচনামুখর হয়েছেন, তাঁদের অনুভূতির সঙ্গে আমি একমত। আমার এ লেখায়ও সে সম্পর্কে বলেছি। তবে তথ্য উৎসের ভ্রান্তি, সময়ের চাপ এবং পাণ্ডুলিপির ওপর মতামত প্রাপ্তির আগেই ছাপা হয়ে যাওয়ায় হুমায়ূনের ফারুক প্রসঙ্গ প্রকাশিত অংশ তথ্যনির্ভর হয়নি। ওই সব পাঠকের কাছে একটি বিনীত অনুরোধ—মোহন জাদুকর হুমায়ূনের থলিতে আরও বহু জাদু আছে। একটু অপেক্ষা করুন। তাঁর সম্পর্কে শেষ কথাটি বলার সময় হয়তো এখনো আসেনি।
তাঁর লেখার শেষাংশ পড়ে শ্রদ্ধা হারাই কিঞ্চিৎ, যেমন হারিয়েছি সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ওপর থেকে। আমি বুঝতে পারি, তিনি এই লেখাটি লিখছেন বন্ধুকৃত্য হিসেবেই। তিনি হুমায়ূন আহমেদকে "মোহন জাদুকর" আখ্যা দিয়ে তার জাদুর থলির ওপর আস্থা রাখতে বলছেন, যে জাদুর থলি থেকে "জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প" শিরোনামে হুমায়ূন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আংশিক ও বিকৃত চেহারায় উপস্থাপন করে গিয়েছেন নির্বিকারচিত্তে, ঐ জাদুর থলি থেকে বের করেছেন হুমায়ুন আজাদের ওপর মৌলবাদীদের শারীরিক আক্রমণের সাফাই [৮] আর এখন সেই মোহন জাদুর থলি উপুড় করে খুব সচেতন ও সূক্ষ্মভাবে টুইস্ট করছেন শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে।

ড. আনোয়ারকে যদি কেউ ছিয়াত্তর সালে এসে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে বলতো, মোহন জাদুকর জিয়াউর রহমানের থলিতে আরও বহু জাদু আছে, তিনি কথাটিকে খুব ভালোভাবে নিতেন বলে মনে হয় না, আমি যেমন তার কথাটিকে ভালোভাবে নিতে পারিনি। 


ড. আনোয়ারের কাছে এ প্রশ্নও রেখে যেতে চাই, তিনি যদি মনে করেন, উপন্যাসে তথ্যবিকৃতি রয়েছে, তাহলে তিনি কি মনে করেন না, হুমায়ূনের মোহন জাদুর থলিটির কোনো একটা সমস্যা আছে? যদি সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে কেন তিনি বন্ধু হয়ে হুমায়ূনকে সেই সমস্যা থেকে উত্তরণের আহ্বান জানাচ্ছেন না, তিনি পাঠককে কেন ধৈর্যের নামে সরিয়ে আনতে চাইছেন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার রাস্তা থেকে? 


আমরা অনুভব করি, হুমায়ূন আহমেদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও আনোয়ার হোসেনের মতো মানুষকে ব্যবহার করছেন দায়মুক্তির ঢাল হিসেবে। তারা কলম ধরেছেন হুমায়ূনের হয়ে, এক গুণী অন্য গুণীকে বেকায়দা অবস্থায় দেখে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছেন। আর এই কাজটা করতে গিয়ে তাঁরা বিস্মৃত হচ্ছেন ইতিহাসের কাছে তাঁদের নিজেদের দায়ের কথা। 


দায়মুক্তি নিয়েই যদি কথা বলতে হয়, তাহলে আমাদের সমাজের গুণীজনের মাঝে যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আছে, সেটি নিয়ে যেন তারা আত্মসমালোচনা করেন। হুমায়ূন আহমেদ যদি ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাসে  তথ্যবিকৃতি করে থাকেন, তাকে প্রকাশ্যে তার দায় নিজের কলমে স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে বলা হোক। ইয়ারদোস্তোরা এসে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে তাকে বাঁচিয়ে দেবেন, আবার ইতিহাসের দায়মুক্তি নিয়ে বক্তৃতা মারবেন, এসব দিনের অবসান ঘটুক।


<hr>

তথ্যসূত্র:

[১] দেয়ালের দুটি অধ্যায়, দৈনিক প্রথম আলো, ১১.০৫.২০১২

[২] "ইতিহাসের দায়মুক্তি", সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ১১.০৫.২০১২

[৩] হুমায়ূন আহমেদ, আপনি মিথ্যে লিখছেন

[৪] সাহিত্যের দেয়াল-দেয়ালের সাহিত্য: ফ্রম হুমায়ূন আহমেদ টু আনোয়ার শাহাদাত

[৫] "হুমায়ূন আহমেদ, দেয়াল এবং দায়মুক্তি…", বাংলানিউজ২৪.কম, ১২.০৫.২০১২

[৬] "হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘দেয়াল’ প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা", বাংলানিউজ২৪.কম, ১৫.০৫.২০১২

[৭] "ইতিহাসের কাছে ঔপন্যাসিকের দায়", মো. আনোয়ার হোসেন, ১৮.০৫.২০১২

[৮] হুমায়ূন আহমেদ কি হুমায়ুন আজাদের পুত্রকন্যার কাছে ক্ষমা চাইবেন?

4 comments:

  1. ইঁদুর18 May, 2012

    "উপন্যাস যদি ইতিহাস না-ই হবে, তাহলে কেন হুমায়ূন উপন্যাসে রেফারেন্স ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন? উত্তরটি হচ্ছে, তিনি নিজের করা বিকৃত ইতিহাসকেও সূত্র যুগিয়ে সমর্থনযোগ্য করে তোলার একটা প্রয়াস চালিয়েছেন।"

    এই পয়েন্টটাই খুঁজতেছিলাম-অনেকেই inglorious bastards movie এর উদাহরন দিল আমারে ইতিহাস বিকৃতি আর সাহিত্য চলচ্চিত্র নিয়ে। হু আ চাইলেই লিখে দিতে পারতেন এটা ইতিহাসভিত্তিক কিছু নয় লেখকের পারস্পেকটিভ তাহলেই তো ঝামেলা থাকতনা।

    ReplyDelete
  2. মোঃ আনোয়ার হোসেনের পয়েন্ট অফ ভিউ টা বলার চেষ্টা করি। জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প তাঁর পড়া না হলেও তিনি বোঝেন, হুমায়ূনের লেখার মান বেশ কয়েক বছর ধরেই কমে গিয়েছে। আর চরম তথ্য বিকৃতি আমরা দেখেছি দেয়ালে। হুমায়ূনের কিছু লেখায় যেমন একজন মোহন জাদুকরের চিহ্ন খুঁজে পাব আবার তাঁর নিম্নমানের লেখাও পাওয়া যাবে। তবে যিনি এক সময় নন্দিত নরকে অথবা শঙ্খনীল কারাগার এর মত বই লিখেছেন তাঁর potential যে নিঃসন্দেহে অনেক তা হয়তো কেউই অস্বীকার করবে না। খেয়াল করে দেখেন, হুমায়ূন আহমেদ সব সময়ই বিএনপি ঘেঁষা ছিলেন। তবে বিএনপি ঘেঁষা হোক আর যাই হোক হুমায়ূনের ফ্যান-ফলোইং প্রশ্নাতীত। হুমায়ূন যা লিখবেন অনেকেই তা সত্য বলেই ধরে নিবেন, যদি সেই লেখা ঐতিহাসিক কোন বিষয় নিয়ে লেখা হয়ে থাকে। কথা হচ্ছে, হুমায়ূনকে আমরা গল্প লিখতে বাঁধা দিতে পারব কি পারব না। (আমি purely একজন মানুষের অধিকারের perspective থেকে কথাটা বলছি) আসল কথা হচ্ছে হুমায়ূন গল্প লিখবেন। কিন্তু তিনি ‘কি’ লিখবেন সেখানে আমরা মতামত দিতে পারি, চেষ্টা করতে পারি হুমায়ূনকে সেই পথে ফেরত আনতে, যেই পথে তিনি ছিলেন অনেক আগে। চেষ্টা করতে পারি হুমায়ূনকে দিয়ে এমন কথাগুলো বলিয়ে নেয়া যেগুলো তিনি আগে কখনো বলেননি। এই ‘strategic sense’টি আপনি নিশ্চই ধরতে পারবেন - কারন অনেকের কাছে হুমায়ূন যা লিখবেন তাই হয়ে যাবে ইতিহাস। তেমন একটি চিত্রই মো. আনোয়ার হোসেন পেয়েছেন হুমায়ূনের আংশিক পান্ডুলিপি পড়ে – বিএনপি ঘেঁষা হুমায়ূনের সাথে এই নতুন হুমায়ূনের মধ্যে মিল নেই বলতে গেলে। আমি মনে করি মো. আনোয়ার তাঁর লেখায় বন্ধু হুমায়ূন কে আহ্বান করছেন যেন মৃত্যুর আগে তিনি আবারো তাঁর জাদু দেখান যা তিনি বহু বছর ধরে দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই তিনি বলেছেন, “চার দশক ধরে পাঠক ও ইতিহাসের মাঝখানে খাড়া করা হয়েছে নানা কৃত্রিম দেয়াল—মিথ্যার দেয়াল যা সত্যকে আড়াল করেছে, প্রতিবিপ্লবের দেয়াল যা বিপ্লবী প্রচেষ্টাকে ম্লান করে দিয়েছে, খলনায়কের দেয়াল যা দিয়ে আসল নায়ককে পাঠানো হয়েছে নির্বাসনে, অবিশ্বাসের দেয়াল যা দিয়ে মানুষের সহজাত বিশ্বাসে চিড় ধরানো হয়েছে এবং দুঃস্বপ্নের দেয়াল যা দিয়ে মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে স্বপ্ন দেখতে এবং দেখাতে। হুমায়ূন আহমেদ যদি তাঁর দেয়াল উপন্যাস দিয়ে পাঠকের মনোজগতে খাড়া করা সারি সারি সেসব দেয়াল ভেঙে ফেলতে পারেন, যাতে তাঁরা সত্যকে চিনে নিতে পারে সহজে—তাহলে তার চেয়ে মহান কাজ আর কী হতে পারে? ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন সাহসী হুমায়ূন আহমেদ। যুদ্ধ করছেন নিজের সঙ্গেও। কালের সঙ্গেও তাঁর যুদ্ধ। আগামীকালের খ্যাতি না মহাকালের ডাক শুনে এগিয়ে যাওয়া। কোনটা গুরুত্বপূর্ণ? রবীন্দ্রনাথের সেই অমরবাণী, ‘সত্য যে কঠিন,/ কঠিনেরে ভালোবাসিলাম—/ সে কখনো করে না বঞ্চনা’—তা হুমায়ূন মনে রাখবেন।” লেখার মূল মেসেজটা এখানেই - i.e. হুমায়ূনের প্রতি দরজাটা খোলা রাখা যেন তিনি 'কর্নেল ফারুক একজন মুক্তিযোদ্ধা' - এমন ভুল আর না করেন।

    হিমু ভাই, আপনি বলছেন, "আমরা অনুভব করি, হুমায়ূন আহমেদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও আনোয়ার হোসেনের মতো মানুষকে ব্যবহার করছেন দায়মুক্তির ঢাল হিসেবে।" ... আনোয়ার হোসেনের ব্যাপারে আপনার ধারণা ভুল। ভুল কারন তাইই যদি হত আনোয়ার হোসেন ফারুক প্রসঙ্গের তথ্য বিকৃতি নিয়ে পত্রিকায় লিখতেন না। এই যদি আপনার বিবেচনাবোধ হয়, i.e. সৈয়দ মঞ্জুর ও আনোয়ার হোসেনের লেখাকে এক কাতারে ফেলা এবং তার তফাৎ বুঝতে না পারা, তাইলে আমাদেরও আপনার বিবেচনাবোধের প্রতি আস্থাও কমতে সময় লাগবে না। :)

    ReplyDelete
  3. @Sanjeeb,

    আনোয়ার হোসেনের পয়েন্ট অব ভিউ আমি জানি না, কিন্তু লেখার পুনশ্চ অংশে তাঁর এই পয়েন্ট অব ভিউ ফুটে ওঠেনি। পুনশ্চ অংশটুকু তাঁকে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের কাতারে নিয়েই দাঁড় করিয়েছে।

    ReplyDelete
  4. @ হাঁটুপানির জলদস্যু,

    আমার ধারণা আপনি লেখার 'strategy'টা ধরতে পারেননি। লেখক লিখেছেন, "মোহন জাদুকর হুমায়ূনের থলিতে আরও বহু জাদু আছে। একটু অপেক্ষা করুন। তাঁর সম্পর্কে শেষ কথাটি বলার সময় হয়তো এখনো আসেনি।" তার মানে লেখক তাঁর মূল লেখার মেসেজকে reiterate করছেন। মেসেজটি হলঃ সেই সুযোগটি হুমায়ূনকে দেয়া যাতে তিনি ইতিহাসের প্রতি তাঁর দায়ের কথা মনে রেখেই 'দেয়াল' রচনা করেন, এবং তা করার সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।