Sunday, April 22, 2012

সবারই ক্যামেরা আছে, পুলিশের নাই



কাজী সৈয়দ আজিজুল হক নামে এক বাঙালি পুলিশ অফিসার বৃটিশ শাসনামলে করাঙ্ক শ্রেণীবিন্যাস (ফিঙ্গারপ্রিন্ট ক্লাসিফিকেশন) পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করে একে সহজতর করে তোলেন এবং এর সাহায্যে অপরাধী শনাক্তকরণের কাজটির জটিলতা [১] বহুগুণে কমিয়ে আনেন । এর এক শতাব্দী পর বাংলাদেশের পুলিশ সম্পর্কে খবর এসেছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা হাসপাতালের ফরেনসিক রিপোর্টের ভাষা বোঝেন না [২]।
মৃতদেহের প্রকৃতির ওপর তদন্তকারী কর্মকর্তা একটি সুরতহাল (রূপাবস্থা) রিপোর্ট করেন। মৃতদেহ কোথায় কী অবস্থায় পাওয়া গেছে, মৃতদেহে আঘাতের চিহ্ন আছে কি না, থাকলে তা কেমন, পরিধেয় কী ছিলো, ইত্যাদি অনেক বর্ণনা তারা লিপিবদ্ধ করেন। কিন্তু মৃত্যু পরবর্তী বিকৃতি সম্পর্কে তাদের যথাযথ জ্ঞান বা প্রশিক্ষণ থাকে না বলে সেই সুরতহাল প্রতিবেদনের সাথে চিকিৎসকের পোস্ট মর্টেম প্রতিবেদনের গরমিল পাওয়া যায়। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে যা উঠে এসেছে, সেটি আরো বিড়ম্বনাকর, পুলিশ সেই রিপোর্ট বোঝে না।
না বোঝার পেছনে কাজ করছে একটি অদ্ভুত অযোগাযোগ। সাব-ইনস্পেক্টরদের জন্যে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা কী, আমি জানি না, কিন্তু তারা ফরেনসিক রিপোর্টে ব্যবহৃত জারগন বোঝেন না। এতে লজ্জার কিছু নেই, কারণ চিকিৎসার ভাষা বিশেষায়িত। মুশকিল হচ্ছে, সাব-ইন্সপেক্টররা সেই বিশেষ শব্দাবলী বোঝেন না, এবং ধারণা করা যায়, তারা ইংরেজিতে কাঁচা। ঘটনাক্রমে কিছু ঘটনায় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের লিখিত রায় পড়ার সুযোগ আমার ঘটেছে, সেখানে খোদ ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়ের বাংলা ভাষা নিয়ে মন্তব্য করে বিপদে না পড়াই ভালো, আর তদন্তকারী সাব-ইন্সপেক্টরের প্রতিবেদনের অবস্থা তথৈবচ। বাংলাতেই যদি এই হাল হয়, ইংরেজিতে যে খুব ভালো হবে না তা অনায়াসানুমেয়। সাব-ইন্সপেক্টরদের নানা খাটনির কাজে জড়িত থাকতে হয়, লেখাপড়ার ব্যাপারটায় তারা বেশি সময় দিতে পারেন বলে মনে হয়নি। পুলিশের তদন্ত রিপোর্ট বেশ দীর্ঘ এবং নানা হাবিজাবি তথ্যে ভরপুর হয়, সেটা লিখতেও লম্বা সময় লাগার কথা। সেই রিপোর্টে আইনের ভাষাও যথোচিত পরিমাণে এস্তেমাল করতে হয়। এই অবস্থায় যদি তাদের ডাক্তারি এলেমও অর্জন করতে হয়, বেচারা সাব-ইন্সপেক্টররা আয়রোজগার করবে কখন?
একটি কাজের দায়িত্বে যখন দুই বা ততোধিক ভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার মানুষ জড়িত থাকেন, তখন তাদের মধ্যে মিসকমিউনিকেশন হওয়া স্বাভাবিক। পুলিশের কাজে আইন ও চিকিৎসা, উভয় বিদ্যাই কমবেশি জড়িত। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে (সাধারণত উপপরিদর্শক) এই দুই বিষয়ে কিছু না কিছু জানতে হয়। কিন্তু পুলিশের উপপরিদর্শক পদটির মর্যাদা বিচার করলে দেখা যায়, এই পদে উচ্চশিক্ষিত লোক (যারা স্বল্প আয়াসে আইন ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় প্যাচঘোচ হেফজ করতে পারবেন) সাধারণত যোগদান করবেন না। আমাদের দেশে আইন ও চিকিৎসা, উভয় বিদ্যা শুদ্ধরূপে বলিতে-পড়িতে-লিখিতে গেলে ইংরেজি জানা অবশ্যকর্তব্য। সমাধানটা তাহলে কোথায়?
রাতারাতি আমাদের উপপরিদর্শকদের ইংরেজিতে দক্ষ করে তোলা যাবে না। ফরেনসিক রিপোর্টের ডিটেল ফুলপ্যান্ট ছেঁটে উপপরিদর্শকের মাপে হাফপ্যান্ট বানানোও অনুচিত হবে, তাতে ফরেনসিক পরীক্ষাটিকে পঙ্গু করা হবে কেবল। পুলিশ বিভাগ উপপরিদর্শকের প্রশিক্ষণ আয়োজন করতে চায়, কিন্তু সেটি করে কতটুকু ফল আসবে, সে প্রশ্ন সামনে আসতে বাধ্য। তদন্তকারী কর্মকর্তারা ইংরেজি জ্ঞানের অভাবে ফরেনসিক রিপোর্টের সব কিছু ডিঙিয়ে নাকি শুধু শেষটা দেখেন, হত্যা নাকি আত্মহত্যা ইত্যাদি। তাদের এই কর্মসংস্কৃতি দূর করা খুব কঠিন।
প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে আমাকে বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার মানুষের সাথে কাজ করতে হয়েছে, এবং তাদের দিয়ে কিছু কাজ করিয়ে নিতে হয়েছে। ইংরেজি বোঝে না এমন টেকনিশিয়ানের জন্যে আমাকে বাংলায় ফর্ম বানিয়ে দিতে হয়েছে রিপোর্ট লেখার জন্যে, এবং ক্ষেত্রবিশেষে সেগুলো ছিলো টেইলরমেড, একেক জনের জন্যে একেক রকম। আমাদের দেশে যে লোকটা দৈহিক শ্রমঘন কাজ করে, তার জন্যে কাগুজে কাজ প্রায়শই কঠিন। এই কঠিন কাজটায় সে হয় ফাঁকি দেয়, নয়তো মনোযোগ দেয় না। এই কারণে তার জন্যে সবচেয়ে সহজ, এমন একটা ফর্ম ডিজাইন করাই শ্রেয় সাময়িক সমাধান।
পুলিশের উপপরিদর্শকের কাজ সহজ করে তার দক্ষতা বাড়ানোর জন্যে পুলিশ বিভাগ যা করতে পারে, তা হচ্ছে তার সুরতহাল রিপোর্টে জন্যে একটি ফর্ম তৈরি করে দেয়া। এই ডিজিটাল ক্যামেরার যুগে যেখানে প্রতিদিন পোলাপান কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাঙের ছবি তুলে ফেসবুকে আপ করে লোকজনকে ট্যাগিয়ে অস্থির, সেখানে কেন পুলিশের কাছে একটা সবচেয়ে বেসিক ডিজিটাল ক্যামেরা থাকবে না, আর কেন সুরতহালের এক হাজার শব্দের পরিবর্তে একটি ছবি ব্যবহার করা হবে না, সেটিই আশ্চর্য প্রশ্ন। একটা সাধারণ এনজিনিয়ারিং ইনস্টলেশনের আগে-পরেই যেখানে কয়েকশ ছবি তোলা হয়, মৃত্যু বা হত্যকাণ্ডের পর কেন তোলা হবে না? সুরতহালের জন্যে যদি একটি ফর্ম পুলিশকে তৈরি করে দেয়া হয়, যেখানে তাকে শুধু টিক/ক্রস দাগাতে হবে, তাহলেই তার কাজ সহজ হয়ে যায়। পুলিশকে প্রচুর পেপারওয়ার্কস করতে হয়, এবং তার অনেক কিছুই একঘেয়ে ও পুনরাবৃত্তিপ্রবণ, একটা সঠিকভাবে প্রণীত তথ্যবহুল ফর্ম তাকে দেয়া হলে, এবং সেটার ওপর সংক্ষিপ্ত একটা প্রশিক্ষণ দিলে সুরতহাল প্রতিবেদন সঠিক হওয়া সম্ভাবনা বাড়ে, তদন্ত এনজিনিয়ারিঙের সুযোগও কমে।
একই সাথে ফরেনসিক রিপোর্টটিকেও একটি ফর্মের চেহারা দেয়া সম্ভব। সেটি দ্বিভাষিক হলে চিকিৎসক ও পুলিশ, উভয়ের জন্যে কাজ সহজ হয়। চিকিৎসক তাঁর অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী ইংরেজি অপশনে টিক চিহ্ন দিয়ে যাবেন, যার পাশেই ব্র্যাকেটে বাংলায় লেখা থাকবে, ঐ বস্তুটি আসলে কী। এতে করে টার্মগুলো শেখার কাজটিও তারা দীর্ঘ সময় ধরে চর্চা করতে পারবেন, যা স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণে সম্ভব নয়। স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণে ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার ইত্যাদি শব্দ এবং দুয়েকটি গল্প শেখানো সম্ভব, কিন্তু আস্ত ফরেনসিক বিজ্ঞানের দাঁতভাঙা সব বিশেষায়িত শব্দ শেখানো বেশ কঠিন।
পুলিশ বিভাগ চাইলে এক ধাপ এগিয়ে আরো একটি কাজ করতে পারে, একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে এই সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনকে সমন্বয় করতে পারে। তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শনে গিয়ে সুরতহালের ফর্ম ফিল আপ করবেন, ছবি তুলবেন, আরো যা যা করণীয় করবেন, তারপর থানায় ফিরে এসে লগ অন করবেন পুলিশের ওয়েবসাইটে। সেখানে তিনি সুরতহাল প্রতিবেদনের অনলাইন ফর্মটিতে তারপর মাউসের কয়েক ক্লিকে সেই রিপোর্ট জমা করে দেবেন পুলিশের কেন্দ্রীয় তথ্য গোলায়, ছবিসহ। একইভাবে ফরেনসিক চিকিৎসকও হাসপাতাল থেকে তার রিপোর্টটি পাঠিয়ে দেবেন পুলিশের কাছে। দুইজনের তথ্য সমন্বয় করে একটি রিপোর্ট চলে যাবে সেই থানার ফোল্ডারে, থানার ইনচার্জ সেখান থেকে তা ডাউনলোড করে বিস্তারিত দেখবেন। একই সাথে সেই রিপোর্টটি জনসমক্ষেও প্রকাশের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে [ছবি ছাড়া], তাতে করে স্বচ্ছতা আরো বাড়বে।
আমাদের পুলিশ আইন রয়ে গেছে বৃটিশ আমলে, পুলিশের আচরণও বৃটিশ আমলের পুলিশের মতো, কিন্তু বৃটিশ পুলিশের ব্যবস্থা আর উপকরণ কিন্তু এগিয়ে গেছে বহুদূর। পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে গেছে অনেক, আমাদের ক্ষমতাবানেরা বৃটিশ আমল আঁকড়ে পড়ে আছেন। কারণ তাতেই ফায়দা। একটা ব্যবস্থা আধুনিকীকরণের জন্যে দরকার হয় আধুনিক কর্তার। আমরা সেই আধুনিক কর্তাদের ঠেকিয়ে দিয়েছি বৃটিশ আমলেই। সেই কারণেই আমরা কাজী সৈয়দ আজিজুল হককে নিয়ে গর্বিত হই, বর্তমান পুলিশকে নিয়ে নয়। গোটা ব্যবস্থাটাকে আরো স্বচ্ছ করে তোলার জন্যে শুধু পুলিশের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, আমাদের পক্ষ থেকেও চাপ থাকতে হবে।

তথ্যসূত্র:

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।