Sunday, April 15, 2012

প্রিয় টাইগার্স, পাকিস্তানে যাবেন না



১.
ছুটির দিনে একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠে দু'টি খবর চোখে পড়লো।
বিডিনিউজের প্রথম খবরটিতে দেখলাম, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল পাকিস্তান সফরে যাচ্ছে। ২৯ এপ্রিল লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে একটি একদিনের ক্রিকেট ম্যাচ এবং ৩০ এপ্রিল একটি টিটোয়েন্টি ম্যাচ খেলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে পিসিবি ও বিসিবি। বিসিবির সভাপতি মুস্তফা কামাল বলেছে,
“পাকিস্তানের জনগণ ক্রিকেট থেকে বঞ্চিত রয়েছে এবং আমরা মনে করি তাদের সমর্থন করা প্রয়োজন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখতে লাহোর ও করাচিতে সফর করার সময় আমারা যে অর্ভথ্যনা পেয়েছি তা অনন্য।”
লাহোরের এই গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে আয়োজিত একটি সিরিজ খেলতে গিয়েই ২০০৯ সালের ৩ মার্চ সশস্ত্র হামলার শিকার হয় শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট দল [২] । নিহত হয় তাদের বহনকারী বাসের চালক ও নিরাপাত্তয় নিয়োজিত ছয় পুলিশ। আহত হন সাত ক্রিকেটার, তিলন সামারাভিরা,
তারাঙ্গা পারানাবিতানা, মাহেলা জয়াবর্ধনে, কুমার সাঙ্গাক্কারা, অজন্তা মেন্ডিস, সুরাঙ্গা লাকমাল, চামিন্দা ভাস ও সহকারী কোচ পল ফারব্রেস। প্রথম দু'জনকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিলো। লাহোরের সেই হামলায় পুলিশ কমপক্ষে ১২ জন সশস্ত্র হামলাকারীর অস্তিত্ব নিশ্চিত করে, এবং জানায়, হামলায় ব্যবহৃত হয়েছিলো রকেট লঞ্চার ও গ্রেনেড।
[ছবিসূত্র: বিবিসি, এএফপি]
পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, পাকিস্তান ক্রিকেটের অন্যতম নায়ক ইমরান খান পাকিস্তান সরকারকে দোষারোপ করেন নিরাপত্তা ব্যবস্থার অসম্পূর্ণতার কথা তুলে। এবং লক্ষ্যণীয়, এই ঘটনার আগেও পাকিস্তান সরকার ও ক্রিকেট কর্তৃপক্ষ যথাযথ নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো।
কুমার সাঙ্গাক্কারা বলেছিলেন, তাঁদের জীবন রক্ষা পেয়েছিলো বাস ড্রাইভারের দক্ষতার কারণেই। এ থেকে আমরা অনুমান করতে পারি, পুলিশের তৎপরতা সে ঘটনায় যথেষ্ট ছিলো না।
এই ঘটনা যারা ঘটায়, তাদের গায়ে আঁচড়ও কাটতে পারেনি পাকিস্তানি পুলিশ। নির্বিঘ্নে আক্রমণ সেরে পালিয়েছে আততায়ীর দল।
হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র, ছবিসূত্র: হাফিংটনপোস্ট, এএফপি/গেটি ইমেইজেস
২.
আরও পেছনে যদি যাই, তাহলে দেখবো, ২০০২ সালের ৮ মে নিউজিল্যাণ্ডের খেলোয়াড়দের হোটেলে বাসভর্তি বোমা নিয়ে আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছিলো কে বা কাহারা। পাকিস্তানের এক সাবমেরিন প্রকল্পে কর্মরত ১১ ফরাসী প্রকৌশলী মারা পড়ে সেই হামলায়। নিউজিল্যাণ্ড এর পর পাকিস্তানে ক্রিকেট খেলা বন্ধ রাখে দীর্ঘ সময় [৩]।
৩.
বিদেশী ক্রিকেটারদের কথা বাদ দিলাম।
প্রকাশ্য দিবালোকে খোলা রাস্তায় হত্যার শিকার হয়েছে পাকিস্তানের অনেক রাজনৈতিক নেতা। বেনজির ভূট্টো রাওয়ালপিণ্ডিতে আর তারই শাসনামলে তার ভাই মুর্তজা ভূট্টো করাচিতে খোলা আকাশের নিচে নিহত হয়েছে। পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসির ইসলামাবাদে খোদ নিজের দেহরক্ষীর বুলেটে নিহত [৪] হয়েছে। বর্তমান সরকারের মন্ত্রী শাহবাজ ভাট্টি নিহত হয়েছে ইসলামাবাদে [৫]।
পাকিস্তান নিজের মন্ত্রীদেরই যেখানে রক্ষা করতে পারে না, রক্ষা করতে পারে না বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কা দলের খেলোয়াড়দের, রক্ষা করতে পারে না নিজের দেশে সামরিক প্রকল্পে কাজ করতে আসা ফরাসী প্রকৌশলীদের। পাকিস্তানে জুম্মার নামাজের সময় মসজিদে চালানো হয় আত্মঘাতী হামলা, আক্রান্ত হয় সামরিক ঘাঁটি, আক্রান্ত হয় ব্যাঙ্ক, আক্রান্ত হয় স্কুল, দাঙ্গায় অচল হয়ে যায় প্রধান বন্দর নগরী করাচি [৬], সেই পাকিস্তানে কেন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে খেলতে যাবে আমাদের টাইগারের দল?
সচল অচ্ছ্যুৎ বলাই একটি পোস্টে [৭] পরিষ্কার করেছেন বিসিবির অযোগ্য, লোভী, অকালকুষ্মাণ্ড সভাপতি মুস্তফা কামালের আইসিসির সভাপতি হওয়ার খায়েশের সাথে পাকিস্তানে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে ঠেলে খেলতে পাঠানোর সম্পর্ক।
পাকিস্তানীরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, সে কি আমাদের দোষে? তারা বঞ্চিত হচ্ছে তাদের নিজেদের বাঞ্চোতপনার কারণে। তাদের বিষ্ঠা সাফ করার দায়িত্ব তাদের, কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, মুস্তফা কামাল সেই বিষ্ঠা সাফ করার দায় চাপিয়ে দিচ্ছে আমাদের টাইগারদের ওপর। আমরা মোটেও পাকিস্তানী জনগণের সাথে সমব্যথী নই। পাকিস্তান হচ্ছে সেই অসভ্য জাতি, যারা আমাদের তিন মিলিয়ন মানুষ হত্যা করে দীর্ঘ ৪১ বছরেও ক্ষমা চায়নি, দোষীদের শাস্তির উদ্যোগ নেয়নি, এবং তাদের ক্রিকেটার ইউনূস খান কয়েক মাস আগেও বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস হরণ করে তা আফগানিস্তানকে দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছে আইসিসিকে উদ্দেশ করে। এই পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যে কেন গুরুত্বপূর্ণ? পাকিস্তানের দোস্তি ছাড়া যদি বিশ্বের আরো দশটা দেশ ক্রিকেট খেলে যেতে পারে, আমাদের কী ঠ্যাকা পড়েছে আমাদের টাইগারদের এই মৃত্যুপুরীতে খেলতে পাঠানোর, যেখান থেকে তারা অক্ষত ফিরে আসতে পারবে কি পারবে না তার কোনো গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না?
প্রিয় টাইগার্স, যাবেন না পাকিস্তানে। আপনারা বাংলাদেশের ষোলো কোটি মানুষের সম্পদ। যে পাকিস্তানের হাতে এখনও আপনাদের স্বজনদের রক্তের দাগ লেগে আছে, তাদের কপাল থেকে কলঙ্কের দাগ মোছার কোনো দায় আপনাদের পড়েনি। পাকিস্তান যদি অস্ট্রেলিয়ার সাথে নিরপেক্ষে ভেন্যুতে খেলতে পারে, বাংলাদেশের সাথেও তা-ই করতে হবে। আমরা খুচরা নই, আমরা ভাংতি নই, আমরা পাকিস্তানের ছোট ভাই নই। আমরা বাংলাদেশ। আমাদের যারা সম্মান দেয় না, তাদের জঞ্জাল গায়ে পড়ে সাফ করতে আমরা কেন যাবো?
এই সফর থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের প্রত্যেক টাইগারের প্রতি করজোড়ে অনুরোধ জানাই। কত পরাজয়, কত বিষাদ, কত তিক্ত গ্লানির পর আমরা আপনাদের ওপর ভরসা রাখতে শিখেছি, আপনারা পাকিস্তানের মতো অসভ্য একটা দেশে গিয়ে তিলেকমাত্র আহত হন, তা দেখতে চাই না।
পাকিস্তানে ক্রিকেট খেলা নিয়ে যদি মুস্তফা কামাল এতোই ব্যস্ত হয়, সেই ক্রিকেট টিমটি গঠিত হোক তার বাপ, ভাই, ছেলে, চাচা, মামা, খালু, ফুপা আর কাজিন নিয়ে। সেইসাথে এই লোভী স্বার্থপর লোকটাকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড থেকে লাথি মেরে দূর করে দেয়ার অনুরোধ করি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। যদি আমাদের ক্রিকেটারদের কোনো অনিষ্ট ঘটে, সরকার কি তার দায় এড়াতে পারবে? পাবলিক এমনিতেই অন্য বহু কারণে ক্ষিপ্ত, তাদের বিপদগ্রস্ত কাঁধে নতুন কোনো শোকের ভার আর ক্ষোভের আগুন চাপাবেন না।
আবারও বলি, প্রিয় টাইগার্স, পাকিস্তানে খেলতে যাবেন না। ইউনূস খান যখন আফগানিস্তানের ক্রিকেট নিয়ে এতোই উদ্বিগ্ন, আফগানিস্তান দলকেই পাকিস্তানের ক্রিকেটকলঙ্ক মোচনের ভার দিক তারা।

সংযোজন:

বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে ন্যাকামির চূড়ান্ত করা আনিসুল হক ভাইয়া এই ইস্যুতে কলম ধরেন কি না, তা খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছি।
২২ মার্চ, ২০১২ সালে প্রথম আলোয় "আমরা যেভাবে চ্যাম্পিয়ন হতে পারি" [সূত্র] শীর্ষক এক জঘন্য আর্টিকেলে (যেখানে তিনি বাংলাদেশের টপ নচ ক্রিকেটারদের অপুষ্ট আর গরিব ডেকে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন, খামাকাই। এই লোক ফিটনেস আর অপুষ্টির মধ্যে তফাত বোঝে না, ক্রিকেট নিয়ে লিখতে যায়) ইরশাদ করেছিলেন,
আমরা ক্রিকেটকে ভালোবাসি। আমরা বাংলাদেশকে ভালোবাসি। আমরা আমাদের ক্রিকেটারদের ভালোবাসি। ভালোবাসা থেকেই আসে দায়িত্ববোধ। জাতি হিসেবে আমাদের মাথা যেন উঁচু থাকে। সেটা কেবল মুশফিক, সাকিব, তামিম, মাশরাফি, নাসির, নাজমুলেরা করবেন, তা নয়, আমাদের প্রত্যেকের ওপরেই আজ সেই দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। আমরা যেন আমাদের নিজেদের দায়িত্বটুকুন পালন করি।
আনিসুল ভাইয়ার ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধের পরিচয় দেয়ার সময় কিন্তু এখন চলে এসেছে। ঠিকাছে ভাইয়া?

তথ্যসূত্র:

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।