Thursday, April 12, 2012

মন্ত্রীর এপিএসের কাজ আসলে কী?



মিনিস্ট্রির সঠিক বাংলা মন্ত্রণালয় না হয়ে মন্ত্রক হওয়া উচিত, এমন একটা কথা পড়েছিলাম কোথাও। মন্ত্রণালয় শুধু একটি বাড়িকে নির্দেশ করে, প্রতিষ্ঠানটিকে নয়। আমাদের মন্ত্রকগুলো কমবেশি বড়সড়, এগুলোর অধীনে অনেক লোকে কাজ ও অকাজ করে। এই কাজ ও অকাজের দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ওপর যেমন চাপে, তেমনি চাপে তাদের ঊর্ধ্বতনদের ওপরও।
সরকারি কাজকর্মের কিসিম সম্পর্কে আমার ধারণা তেমন স্বচ্ছ নয়, তাই রেল মন্ত্রকের (বা যে কোনো মন্ত্রকের) মন্ত্রীর এপিএসের কাজ কী, জানার জন্যে গুগলের শরণাপন্ন হলাম। সরকার ডিজিটাল ডিজিটাল বলে আলজিহ্বা ক্ষয় করে ফেললেও রেল মন্ত্রকের কোনো ওয়েবসাইট এখনও নেটস্থ হয়নি, তাই তার আদিরূপ যোগাযোগ মন্ত্রকের ওয়েবসাইটে গেলাম। সেটি মোটামুটি গোছানো, যদিও কোনো লিঙ্কে ক্লিক করলে বিচিত্র প্রাগৈতিহাসিক চেহারার সব পেইজ খোলে।এক জায়গায় যোগাযোগ মন্ত্রকের মন্ত্রীর এপিএসের হদিশ পেয়ে আগ্রহভরে তার জব ডেসক্রিপশনে ক্লিক করে একটা খালি পেইজ পেলাম। মন্ত্রী বা তার পিএস, এপিএস কারোই জব ডেসক্রিপশনের কোনো বালাই নেই, সেই পেইজগুলো ফাঁকা। যোগাযোগ সচিবের জব ডেসক্রিপশন আছে, কিন্তু তার পিএসের আবার সেই দীনহীন দশা, বেচারার জব আছে, ডেসক্রিপশন নাই। তবে যোগাযোগ সচিবের পিএস একজন জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব।
আমি যতদূর জানি, মন্ত্রীর পিএস একজন সরকারী কর্মকর্তা, কিন্তু এপিএস রাজনৈতিক চ্যানেলে নিযুক্ত কর্মকর্তা। আমার কৌতূহল, মন্ত্রীর এপিএসদের কাজ কী? বিশাল মন্ত্রকের নানা দিক সামলাতে মন্ত্রীর লোকবলের প্রয়োজন হতেই পারে, কিন্তু কেন একজন একান্ত সচিব ও একজন জনসংযোগ কর্মকর্তার পরও মন্ত্রীছাহেবের আরো একজন সহকারী একান্ত সচিব প্রয়োজন হয়? কী সেই অতিরিক্ত কাজ?
আবারও গুগলের শরণাপন্ন হলাম। এপিএস লিখে প্রথমে খোঁজ করলাম দায়িত্বশীল খালুপেপারে। ও মা, গুগল দেখি শুধু বদনাম করে! কোনো ভালো খবর বের হয় না মন্ত্রীর এপিএসদের নামে। তারা প্যান্টের ওপর জাঙ্গিয়া পরে ক্রাইমফাইটিং করবে, কিংবা অগ্নিনিমজ্জিত সুউচ্চ ভবন থেকে কোনো সুন্দরী তরুণীকে ঘাড়ে করে নামিয়ে আনবে, এমন কোনো অভ্রংলিহ প্রত্যাশা আমার ছিল না। তারা মন্ত্রকের কাজ করছেন, এমন স্বাভাবিক উল্লেখ দেখলেই আমি খুশি হয়ে উঠতাম বোধহয়। কিন্তু দায়িত্বশীল খালুপেপারের পাল্লায় পড়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর এপিএসবৃন্দ শুধু মুন্নির মতোই বদনাম হয়ে আছে দেখলাম। কিছু উদাহরণ দিচ্ছি।
নরসিংদীর পৌর মেয়র লোকমান হোসেন হত্যা মামলায় টেলিযোগাযোগমন্ত্রীর এপিএস মাসুদুর রহমান মুরাদ আদালতে আত্মসমর্পণের পর তাকে দুদিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছে আদালত। ...
রংপুরে টেন্ডারবাজির ঘটনায় গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) সাজ্জাদ হোসেন সাগরসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ...
রেলওয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং মন্ত্রীর সহকারীকে বহনকারী একটি গাড়ি থেকে সোমবার রাতে বিপুল পরিমাণ টাকা পাওয়ার খবরের পর রেলপথ মন্ত্রণালয় দুটি তদন্ত কমিটি করেছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ...
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে আসামি দুই জন জামিন পেয়েছেন। তারা হলেন- খালেদার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর এপিএস জিয়াউল ইসলাম (মুন্না) এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার এপিএস মনিরুল ইসলাম খান। ...
দিনাজপুর প্রেসক্লাব ভবন দখলের অভিযোগে ভূমি প্রতিমন্ত্রীর এপিএস মির্জা আশফাক হোসেনের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। ...
ঢাকার ধামরাইয়ের সংসদ সদস্য বেনজীর আহমদকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করায় প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক ই-ইলাহী চৌধুরীর এপিএস মনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ...
গোবিন্দগঞ্জ সদর আসনের সাংসদের এপিএস মতলুবর রহমান নান্না সাংসদকে না জানিয়ে নোটিশ টানানোয় বিকালে মোবাইল ফোনে তাকে (ফেরদৌস) গালাগাল এবং অফিস থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেন। ...
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যের সহকারীকে গুলি চালানোর পর গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহতের নাম সারোয়ার হোসেন মোফাজ্জেল (৪০)। তিনি ময়মনসিংহ-১০ আসনের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন আহমেদের সহকারী ব্যক্তিগত সচিব (এপিএস) ছিলেন। ...
দুর্নীতির দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সহকারী ব্যক্তিগত সচিব (এপিএস) মো: শামসুল আলমকে ১৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ৮৮ লাখ টাকা জরিমানা এবং তা অনাদায়ে আরো এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। একইসঙ্গে স্বামীর দুর্নীতিতে সহযোগিতা করায় শামসুল আলমের স্ত্রী খাদিজা আনামকে তিন বছরের কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা জরিমানা এবং তা অনাদায়ে আরো ছয় মাসের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। ...
ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর সাবেক এপিএস শফিকুল ইসলাম রতনসহ ৪ জামায়াত কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ...
এই দশটি খবর আপাতত দায়িত্বশীল খালুপেপারের ভাঁড়ারে পাওয়া গেলো। দলমত নির্বিশেষে এপিএসবৃন্দ যে নানা অকাজে জড়িত থাকেন, সেটা পরিষ্কার। তাদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু বীরভোগ্যা বসুন্ধরা।
এপিএসের এই দাপটের উৎস খুঁজতে আমাদের চীন দেশে গমনের প্রয়োজন নেই। এপিএস মন্ত্রী-পাতিমন্ত্রী-টুনিমন্ত্রীর সারোগেট মাত্র। মন্ত্রী নিজে যে সব ডার্টি জব ভাবমূর্তির খাতিরে সশরীরের গিয়ে করতে পারে না, সেইসব ছাই ফেলতে ভাঙা কুলার কাজ করে এইসব এপিএসের দল। এরা হয় মন্ত্রীর আত্মীয়, এবং/অথবা দলের ছাত্র শাখার প্রাক্তন নেতা। মন্ত্রী নিজে ঘুষের বখরা নিতে অধস্তন চোর আমলার কাছে যেতে পারেন না (আরে ওনার একটা মান ইজ্জত আছে না?), তাই তার হয়ে সেখানে যায় এপিএস। মন্ত্রী নিজে স্থানীয় বেয়াদব আমলা-সাংবাদিক-পাবলিককে দুইটা চটকানা দিতে পারেন না, তাই সেই ময়লা কাজটা করে এপিএস হাত গন্ধ করে। কারো লাশ পড়লেও পেছনে মন্ত্রীর জায়গায় মন্ত্রীর এপিএসকে পাওয়া যায়, আবার পাল্টা লাশ পড়লেও মন্ত্রীরটা না পড়ে এপিএসেরটাই পড়ে। এপিএস তাই কার্যত মন্ত্রীর সক পাপেট। বাটে পড়লে "এপিএস পচা ওকে বকে দেবো" বলে নিজে সটকে পড়ার একটা উপায়ও থাকে।
এপিএস নিয়োগ করে মন্ত্রীরা কী কাজ উদ্ধার করেন, ওপরের দশটা খবর থেকে পড়ে ধারণা করা যায়। আমার প্রশ্ন, মন্ত্রী-পাতিমন্ত্রীদের এই রাজনৈতিক ডালকুকুরদের বেতন কি জনগণের ট্যাক্সের পয়সা থেকে আসে?
যদি এপিএসদের কাজই হয় টেন্ডার নিয়ে মস্তানি, আততায়ী ভাড়া, বখরা পরিবহন, বেয়াদব শাসন ও প্রহার, জমি দখল, ইত্যাদি, তাহলে সেসব মন্ত্রকের ওয়েবসাইটেও জব ডেসক্রিপশন পেইজে লিপিবদ্ধ করা হোক। যদি করা না যায়, তাহলে মন্ত্রীর এপিএস পদটি বিলোপ করা হোক। যদি এপিএসের বেতন পাবলিকের পয়সায় দেয়া হয়, তাহলে সেই পয়সা বাঁচিয়ে মন্ত্রীকে নিজেই কষ্ট করে ওপরোক্ত কাজগুলো সশরীরে করতে দেয়া হোক। পাবলিক এতকিছু সহ্য করে নিচ্ছে যখন, ঐটুকুও পারবে। আর মন্ত্রীরাও সশরীরে মাঠে নেমে করে কর্মে খেতে পারবেন। উল্লেখের অযোগ্য প্রত্যঙ্গে চর্বি কম জমবে, কাজেকর্মে গতি আসবে।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এই ৭০ লক্ষ টাকার কিচ্ছা কীভাবে ডিল করে, দেখার জন্যে আগ্রহ ও পপকর্ন নিয়ে বসলাম। শুধু একটাই কথা, আপনার এপিএস চোর, আপনার রেলওয়ের জিএম ঘুষখোর, আর আপনি একা সাধু, এই কথা বিশ্বাস করার মতো কাঠবলদ দয়া করে আমাদের ভাববেন না। তারচেয়ে টিভি ক্যামেরার সামনে একটা হাসি দিয়ে বলুন, ম্যাঁও!

1 comment:

  1. ভালো লাগলো। ধন্যবাদ।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।