Tuesday, March 27, 2012

অভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগ তত্ত্বাবধানে তথ্য প্রযুক্তি



কিছুদিন আগে মুন্সিগঞ্জে মেঘনায় কার্গো জাহাজের আঘাতে লঞ্চডুবি হয়ে মারা গেছেন শতাধিক মানুষ। এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রায় বার্ষিক ভিত্তিতে ঘটে, এবং যা কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো, তা গ্রহণে জাহাজ মালিক, জাহাজ চালক, যাত্রী ও তদারককারী সরকারি প্রতিষ্ঠান, এই চার পক্ষেরই এক আশ্চর্য নিস্পৃহ মনোভাব দেখা যায়। দুর্ঘটনার পর স্মার্ট লোকেরা অনেক স্মার্ট স্মার্ট কথা বলে, কিন্তু ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্যে যেসব স্বল্প-মধ্য-দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা গ্রহণ করলে মানুষের এই নির্মম প্রাণহানি এড়ানো যাবে, তা গ্রহণে কারোই মাথাব্যথা দেখা যায় না।
সহব্লগার দ্রোহী একদিন বলেছিলেন, বাঙালির দৃষ্টিসীমা অতীতে পাঁচ বছর আর ভবিষ্যতে সাত দিন। কথাটি যে সত্য, তা এ ধরনের দুর্ঘটনার সময় আরো ভালোভাবে অনুভব করি।
একটা অব্যবস্থাপনা তখনই জিইয়ে রাখা হয়, যখন তা থেকে কেউ লাভবান হয়। জাহাজ মালিকরা হয়তো মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়ে কিছু আর্থিক লাভ করে, এবং সেই লাভের কিছু অংশ উৎকোচ হিসেবে সরকারী কর্তৃপক্ষের জায়গামতো তুলে দেয়, কিন্তু জাহাজ চালক আর যাত্রীরা, যারা নিজেরাই সেই দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে, তারা কেন একে চলতে দেয়?
সদ্য ঘটিত দুর্ঘটনাটি ঘটেছে রাতের বেলা, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, বালিবাহী কার্গো জাহাজের আঘাতে। লঞ্চটিতে এমনিতেই যাত্রী বেশি ছিলো (বিম্পিজামাতের মহাসমাবেশের কারণে দেশে সরকারী হস্তক্ষেপে অঘোষিত ঢাকা-অবরোধের কারণে), আবার মাঝপথে লঞ্চে কাঁচামরিচ, ধনেপাতা, পেঁয়াজ প্রভৃতি কার্গো তোলা হয়। ওদিকে রাতে কার্গো জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ছিলো, কিন্তু সেই আজ্ঞাকে পালনে বাধ্য করার মতো লোকবল এতগুলো বছরেও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় যোগাড় করতে পারেনি। আরো জানা গেছে, জাহাজগুলো রাতে জ্বালানি খরচ বাঁচাতে আলো না জ্বালিয়ে চলাচল করে।
এ ধরনের আরো কারিগরী ও পরিচালনাসংক্রান্ত ছোটো ছোটো কারণ যখন জমতে থাকে, সেগুলো জন্ম দেয় দুর্ঘটনার। আর আমাদের নীতি নির্ধারকরা তথ্য প্রযুক্তি নিয়ে বড় বড় শব্দ ব্যবহার করলেও বেলা শেষে এ-ই সত্য যে আমাদের তথ্য প্রযুক্তির দিকপাল মোস্তফা জব্বারের মতো লোক।
সরকার চাইলেই অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ব্যবস্থাকে জিপিএসের মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে মনিটর করার ব্যবস্থা নিতে পারে। প্রতিটি নৌযানেই স্বল্প ব্যয়ে সেন্সর বসিয়ে এর মালামালের ওজন অনুমোদিত সীমার ভেতরে আছে কি না, রাতে আলো জ্বলছে কি না, ইত্যাদি কার্যকালীন প্যারামিটারসহ এর গতিবেগ ও অবস্থান জিপিএসের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কাছে নির্দিষ্ট সময় পরপর জানিয়ে দেয়া সম্ভব। আমার জানামতে, দেশে গ্রামীণফোনের ভেহিকল পুলে এমন ভেহিকেল ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু আছে বহুদিন যাবত, এটা এমন কোনো রকেট সায়েন্স নয়। নৌযানের জন্যে এ ধরনের একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা তৈরির জন্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা নেয়া যেতে পারে, তারা ইতিমধ্যেই প্রিপেইড মিটার ও ইভিএম ডেভেলপ করে দেখিয়ে দিয়েছে যে এ ধরনের প্রযুক্তি বিকাশে তারা সক্ষম। পূর্ণাঙ্গ এক একটি মনিটরিং মডিউল বুয়েটের তত্ত্বাবধানে সংযোজন করে সেটি নিজ ব্যয়ে ইনস্টল করতে বাধ্য করার জন্যে নতুন আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে, ঠিক সিএনজিগুলোতে যেভাবে মিটার সংযোজন করানো হয়েছে।
আপত্তি তোলা যেতে পারে যে এ ধরনের ব্যবস্থা ইনস্টল করলেও নৌযান মালিক বা চালকরা তা নিষ্ক্রিয় করে রাখতে পারে, সিএনজির মিটারের মতোই। সেক্ষেত্রে যদি আইন করা হয় যে এই মনিটরিং ব্যবস্থা কোনো কারণে নিষ্ক্রিয় করা হলে বিপুল জরিমানা দিতে হবে, তাহলে সে পথ অনুসরণ করা থেকে নৌযানগুলো বিরত থাকবে।
এই ব্যবস্থা নেয়া হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিটি নৌযানের আচরণ মনিটর করা সম্ভব হবে, তারা বিধিভঙ্গ করলে সে মোতাবেক স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা আরোপ করা যাবে, সর্বোপরি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বহুগুণে নিশ্চিত করা যাবে। বিটিসিএলের টেলিফোন বিল যেভাবে বুয়েটের একটি ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে করা হয়, একই ভাবে এই দায়িত্বটিও একই ইনস্টিটিউটকে দেয়া যেতে পারে।
এই পদ্ধতিটি খুব ব্যয়বহুল হওয়ার কথা নয়। যৎসামান্য যা ব্যয় হবে, তা অবশ্যই জাহাজ মালিক-শ্রমিক-যাত্রী-কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত গাফিলতিতে নিহতদের প্রাণের মূল্যের চেয়ে কম হবে। দীর্ঘ মেয়াদে এই ব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্কৃতিতে কিছু শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারবে বলে বিশ্বাস করি।
একটি মানুষের প্রাণের মূল্য তিরিশ হাজার বা পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকায় না মেপে, এক একটি লঞ্চে কিছু অর্থ ব্যয় করে মনিটরিং ব্যবস্থা ইনস্টল করা শ্রেয়তর বলে মনে করি। এই প্রযুক্তি আমাদের আয়ত্বের মধ্যেই রয়েছে, কাজে লাগানোর জন্যে সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে আসুন, প্লিজ।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।