Friday, March 16, 2012

মাস্টারকার্ডঅলা নৌপরিবহনমন্ত্রীরা


কিছু জিনিস টাকা দিয়ে কেনা যায় না। বাকি সবকিছুর জন্যে রয়েছে মাস্টারকার্ড।
-মাস্টারকার্ডের বিজ্ঞাপন
মানুষের জীবন কি এই কিছু জিনিসের মধ্যে পড়ে? প্রশ্নের উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন করতে হয়, মানুষটা কি বাংলাদেশের? যদি বাংলাদেশের হয়, তাহলে আর "কিছু জিনিস" নয়, সে চলে যাবে "বাকি সবকিছু"র খাতে।
আমাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পগুলোর কী অবস্থা, আমি জানি না, কিন্তু বুঝি, মানুষের ভারে বাংলাদেশ কাঁপছে। কেবল মানুষের ওজনেই তলিয়ে যাচ্ছে মানুষের জীবনের দাম। অর্থনীতির জটিল গ্রন্থিময় পথ ধরে ক্রমশ নিচে নেমে গেলে তার ভিতের কাছে গেলে পাথরে খোদাই হরফে লেখা দেখি, যার সরবরাহ অফুরান অথচ চাহিদা কম, তার মূল্যও কম। বাংলাদেশে মানুষের জীবন এমনই এক স্বল্পমূল্যে ক্রয়যোগ্য পণ্যের কাতারে চলে গেছে।
বাংলাদেশে লঞ্চডুবি তো কোনো নতুন ঘটনা নয়। নতুন কোনো কায়দাতেও লঞ্চ ডুবছে না। বছরের পর বছর ধরে এই একই খবর দেখতে দেখতে এই খবরের মূল্যও মানুষের কাছে কমে গেছে। আবারও সেই অর্থনীতির ফতোয়া, এ ধরনের খবরের চাহিদার চেয়ে সরবরাহ অনেক বেশি। রাস্তায় ট্রাক এসে পিষে দিচ্ছে নসিমন, ট্রেন এসে তুবড়ে দিচ্ছে বাস, গাড়ি উঠে যাচ্ছে ফুটপাথে শায়িত ছিন্নমূলের শরীরের ওপর, আর নদীতে মানুষের ভারে টলতে টলতে এগিয়ে যাওয়া লঞ্চ ডুবে যাচ্ছে ঝড় অথবা অন্য জাহাজের ধাক্কায়। এই মৃত্যগুলো রোধ করা সম্ভব, কিন্তু কারো কোনো গরজ নেই। মানুষের নিরুদ্বেগ নিস্পৃহতার কারণে প্রতিদিন, আমি আবারও বলছি, প্রতিদিন খবরের কাগজে এই মৃত‌্যুর খবর পড়তে হয় আমাদের। এই খবরগুলো পড়তে পড়তে আমরা একটু একটু করে অমানুষ হয়ে উঠি, আমরা ভুলে যাই "পাঁচজন নিহত হয়েছে" কথাটার অর্থ পাঁচটি মানুষ মারা গেছে, তাদের পরিজনের পৃথিবী থেকে মুছে গেছে পাঁচটি সতেজ নাম, সর্বমোট একশো দেড়শো দুইশো বছরের যাপিত জীবনের স্মৃতি আর দায় বহন করতে হচ্ছে তাদের স্বজনদের, আর যা কিছু তারা দিতে পারতো আমাদের, তা থেকে আমরা বঞ্চিত হলাম। এই খবরের চাপে আমরা দুইশো লাশের সংবাদ পড়ে পাতা উল্টে চলে যাই আফ্রিদির চ্যাগানো ছবি কিংবা স্কারলেট জোহানসনের ন্যাংটা ছবি প্রকাশ কিংবা ঐশ্বরিয়ার বাচ্চার নাম কী রাখা হলো সেসব খবরে।
পৃথিবীতে মানুষের গড় আয়ু সত্তর বছর। আমি মানুষের উত্তরণের দীর্ঘ ইতিহাসের পাঠক, মানুষের ক্ষমতায় আস্থাবান, তাই এই সত্তর বছরের এক দিন আগেও যে মৃত্যু ঘটে, তাকেও মানুষের ব্যর্থতা হিসেবেই পরিগণনা করতে শিখেছি। মেঘনায় লঞ্চডুবিতে যারা মারা গেছে, তাদের মৃত্যুও আমাদের ব্যর্থতায় ঘটেছে। আমাদের সমাজের প্রতিটি মানুষ ঐ মৃত্যুর দায়ভার আংশিক হলেও বহনে বাধ্য। তবে সবচেয়ে বড় দায় আমাদের নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের। বিবেকহীন এই অশিক্ষিত লোকটি এই তিন বছরে নৌপরিবহন মন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে কী কাজ করেছে আমরা জানি না, তার সকাল থেকে সন্ধ্যা নৌপরিবহন ব্যবস্থার কোন উন্নয়নের কাজে সক্রিয়ভাবে লাগে, আমরা জানি না, শুধু জানি, এই লোকটি এই নির্মম দুর্ঘটনার শিকার মানুষগুলোর জীবনের মূল্য নির্ধারণ করেছে তিরিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা। একটা কোরবানির গরুর দাম যে দেশে লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়, সে দেশের মন্ত্রী হয়ে এই লোক অম্লানবদনে, কোনো দুঃখ-লজ্জা-গ্লানি প্রকাশ না করে তিরিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকার শাকে নিজের ব্যর্থতা আর অযোগ্যতার মাছটা ঢাকা দিতে চায়।
রাতের বেলা কার্গো জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ, এই বিধি আছে, এর প্রয়োগ নিশ্চিত করা কি এতই কঠিন? শাজাহান খান এই তিন বছর বসে কোন অঙ্গের কেশ উৎপাটন করেছে যে এই সামান্য নিষেধ কার্যকর করার ব্যবস্থা করতে পারলো না? রাতের বেলা জাহাজ চালানোর খরচ বাঁচাতে জাহাজের মাস্টার-সারেং-সুকানিরা আলো জ্বালায় না। ধরে নিলাম তারা অশিক্ষিত মূর্খ কাঠবলদ, কিন্তু নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় কী করে? তারা কি এই মাস্টার-সারেং-সুকানির চেয়ে উন্নত কিছু? যদি উন্নতই হবে, তারা কেন এই সামান্য চর্চাটুকু নিশ্চিত করতে পারে না? লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন ঠেকানোর ক্ষমতা তো দূরের কথা, লঞ্চের বাতিটার ওপরও তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই, এমনই পালোয়ান নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।
গত পরশু সুইটজারল্যাণ্ডের এক টানেলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চুরমার হয়ে গেছে বেলজিয়ামের স্কুলশিশুবাহী এক বাস। বাইশটি শিশু ঘটনাস্থলেই মারা গেছে, ড্রাইভার আর চার শিক্ষকসহ। বেলজিয়ামে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করা হয়েছে, বেলজিয়াম আর সুইটজারল্যাণ্ডের বিশেষজ্ঞরা নেমে পড়েছে কী করে দুর্ঘটনা হলো তা খতিয়ে দেখতে। এতে করে ঐ আটাশ জনের প্রাণ ফিরে আসবে না, কিন্তু ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা যাতে আর না হয়, সে চেষ্টা নিশ্চিত করা হবে। আর এ জন্যে যা লাগে, তা পড়ে সেই "কিছু জিনিস"-এর মধ্যে, যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না। এদের এই তৎপরতার পেছনে কাজ করছে দায়বদ্ধতা, বিবেক আর মনুষ্যত্বের চাপ। এরা জানে, এই প্রাণহানির জন্যে কোথাও না কোথাও কাউকে না কাউকে জবাবদিহি করতে হবে। আমাদের মাস্টারকার্ডঅলা নৌপরিবহনমন্ত্রী দায়বদ্ধতা আর মনুষ্যত্ব বানান করে কাগজে লিখতেই পারবে না (নিজের নাম শাহজাহানই তো ঠিকমতো লিখতে পারে না সে, লেখে শাজাহান), তুলনামূলকভাবে সহজ শব্দ বিবেক লিখতে পারলেও পারতে পারে, কিন্তু তার মানে সে বোঝে না। শাজাহানের আগে এই মন্ত্রণালয় চালাতো আরেক বিবেকহীন আকবর, যে লঞ্চ দুর্ঘটনায় মৃতের পরিবারকে একটা বা দুটো ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল ক্ষতিপূরণ দেয়ার অঙ্গীকার করেছিলো। তিরিশ হাজার টাকায় হয়তো চারটা ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল কেনা যাবে। তাই শাজাহান ছাগল-স্কেলে আকবরের তুলনায় এগিয়ে আছে। মানুষ স্কেলে এই দুইজনকেই খুঁজতে যেতে হবে স্কেলের ঋণাত্মক প্রান্তে, হয়তো লঞ্চে করেই যেতে হবে, এমনই দূরবর্তী এক প্রান্তের অমানুষ এরা। আমরা পনেরো কোটি মানুষের চল্লিশ বছর পুরনো জাতি, কিন্তু একজন, মাত্র একজন দায়িত্ববান বিবেকসম্পন্ন মানুষ তৈরি করতে পারলাম না যে আমাদের নৌপরিবহন ব্যবস্থার অভিভাবক হতে পারে।
এই ঘটনার তদন্তের পর দুর্ঘটনার শিকার লঞ্চ মালিক, মাস্টার-সারেং-সুকানি আর অজ্ঞাতনামা জাহাজের মাস্টার-সারেং-সুকানির নামে মামলা হয়েছে। কিন্তু যার দায় সবচেয়ে বড়, সেই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আর তার অযোগ্য মন্ত্রীর কাজের কৈফিয়ত কে নেবে? আমরা কি কোথাও গিয়ে তার কাজের হিসাব চাইতে পারি? বলতে পারি, এই তিন বছরে তুমি কী আঁটি বেঁধেছো আমাদের দেখাও? এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধের জন্যে তুমি আর তোমার মন্ত্রণালয় কী করেছে তার বিবরণ দাও জাতির কাছে? আমরা পারি না। কারণ আমরা পাবলিক। সংবিধানে লেখা, আমরা সবকিছুর মালিক, কিন্তু আমাদের জীবনের মূল্য সংবিধানে লেখা নেই। ওটা শাজাহান খান লিখে দিয়েছে, তিরিশ হাজার, আর যদি আমাদের পরিবারের আরো একজন একই দুর্ভাগ্যের শিকার হয়, তাহলে পঁয়তাল্লিশ হাজার। চার থেকে ছয়টি ছাগলের মূল্যে আমাদের এই মাস্টারকার্ডঅলা নৌপরিবহনমন্ত্রীরা নিজেদের অযোগ্যতার দায়টুকু চুপচাপ কার্পেটের নিচে চাপা দিয়ে দিতে চায়।
সড়ক পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের নেতা শাজাহান খানের দাপট আমরা দেখেছি তারেক মাসুদ-মিশুক মুনীরের ঘাতক বাসচালকের গ্রেফতারের পর। শুধু ঢাকা শহরে বেআইনীভাবে বাস-ট্রাক সমাবিষ্ট করেই এই লোকটি ক্ষান্ত হয়নি, সে তার সংগঠনের ক্ষমতা দেখিয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যানবাহন ধর্মঘট করে। নৌপরিবহন শ্রমিকদেরও হয়তো অনুরূপ সংগঠন আছে, শাস্তি দিতে গেলে তারাও হয়তো তাদের সংগঠিত শক্তির দৌড় দেখাবে পাবলিককে জিম্মি করে। সংগঠন নাই শুধু পাবলিকের, সংগঠন নাই শুধু ঘুরে বেড়ানো তিরিশ হাজার টাকা দামের জ্যান্ত লাশগুলির, তারা বালটাও ছিঁড়তে পারে না। তারা শুধু বাসের ভেতরে পিষ্ট বা দগ্ধ হয়, নয়তো নদীতে ডুবে অপেক্ষায় থাকে, কখন ডুবুরি এসে লাশ তুলবে বা পেট ফাঁসিয়ে সমাধি করে দেবে জলের নিচেই।
ফাঁসির আসামি রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসে, কিন্তু প্রতিনিয়ত ফাঁসির চেয়েও নির্মম মৃত্যুর খাঁড়া ঝুলে থাকে যাদের মাথায়, সেই সাধারণ মানুষদের কোনো ক্ষমা নাই। তাদের পাপ, তারা বেলজিয়াম জন্মায়নি, তারা সুইটজারল্যাণ্ডে জন্মায়নি, তারা জন্মেছে বাংলাদেশে যেখানে মন্ত্রী হয় আকবর আর শাজাহানের মতো লোক। আমাদের ক্ষমা করে দেয়ার কেউ কি আছেন? প্লিজ মাফ করে দেন এই পনেরো কোটি মানুষকে। মাস্টারকার্ডটা পকেটে রেখে এক দিনের জন্যে একটু তাকিয়ে দেখুন, কত মানুষ মারা যাচ্ছে প্রতিদিন, শুধু আপনাদের অযোগ্যতা আর গাফিলতির জন্য! সংখ্যার আড়ালে প্রতিদিন একটু একটু করে চাপা পড়ে যাচ্ছে জীবিত ও মৃত মানুষের মনুষ্যত্ব!
ক্ষতিপূরণ দিতে চেয়ে শাজাহান খান স্বীকার করে নিয়েছে, ক্ষতির দায়ভার তার। এই লোক পদত্যাগ করবে, এই দুরাশা আমি করি না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আরজি জানাই, তিরিশ হাজার টাকায় মানুষ কিনতে চাওয়া এই লোকটাকে পশ্চাদ্দেশে শক্ত একটা লাথি মেরে মন্ত্রিসভা থেকে বের করে দিন। একজন যোগ্য লোককে নিয়োগ দিন নৌপরিবহন মন্ত্রী হিসেবে। পনেরো কোটি মানুষের মধ্য থেকে তেমন একজনকে কি পাবেন না?

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।