Friday, March 16, 2012

ত্রোস ঈ গারেগ: পাথরসেতু পেরিয়ে

আমার ঘরে টিভি দেখার ব্যবস্থা আছে, কিন্তু টিভি নেই। আমি একটা রেডিও কিনে নিয়েছি জার্মানিতে আসার কিছুদিন পরই। তাতে একগাদা হাবিজাবি আমচ্যানেলের মাঝে একটা অপূর্ব স্টেশন ধরে, ক্লাসিকরাডিও। পাশ্চাত্য ধ্রুপদ সঙ্গীতভিত্তিক রেডিও চ্যানেল। সারাদিন তাতে ঘন্টায় ঘন্টায় পাঁচ মিনিটের খবর যেমন হয়, তেমনি বাজে সেরা সব সুর। কেবল বেটোফেন মোৎসার্ট চাইকোভস্কি দ্ভোরজাক নয়, হাল আমলের ফিল্মি কম্পোজিশনও শোনায় উপস্থাপকেরা। মাঝেমধ্যে বই নিয়ে লেখকের সাথে আড্ডা হয় ঘন্টা দুয়েক, সেখানেও আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে নানা সুর বাজে। কেউ যদি পাশ্চাত্য ধ্রুপদ সঙ্গীত ভালোবাসে, তার জন্যে সোনায় সোহাগা। আমি পাশ্চাত্য ধ্রুপদ সঙ্গীত সম্পর্কে তেমন জ্ঞান রাখি না, কিন্তু সুর বোঝার জন্যে কান আর মনই তো যথেষ্ট হবার কথা। বাসায় যতক্ষণ থাকি, ক্লাসিকরাডিও বাজতে থাকে। মাঝেমধ্যে এক একটা সুর পারিপার্শ্বিকের সাথে, আমার জানালার ওপাশে আকাশ, রাস্তার পাশের গাছে ক্ষণিকের অতিথি পাখি, দূরে জ্বলে ওঠা বাড়ির বারান্দায় মলিন বাতি, হু হু ঠাণ্ডা বাতাসের সাথে মিশে যায়, মনে হয় পৃথিবী তার করতল বাড়িয়ে আমার হৃদয় স্পর্শ করে বলছে, এই কয়েকটা মিনিট তোমার কাছ থেকে চেয়ে নিলাম আমার জন্যে।

 আজ কাজের ফাঁকে তেমনি এক হার্প কনসার্টের কিছুটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। তারপর নেট ঘেঁটে খুঁজে বার করলাম কনসার্টের ঐ অংশটা। কার্ল জেনকিন্স নামে এক ওয়েলশ বাদক ও সুরকারের রচিত একটি কনসার্ট, ত্রোস ই গারেগ, এর চতুর্থ স্তবক। নিচের ছবিটা জেনকিন্সের।




ওয়েলশ ভাষায় ত্রোস ঈ গারেগ-এর অর্থ, পাথর টপকে। পাথরসেতু পেরিয়ে এক প্রেমিক ফিরছে নিজের প্রেমিকার কাছে, নিজের গাঁয়ে। কিন্তু তাকে আবার বেরিয়ে যেতে হবে। ঘরে ফেরার পথে সে গাইছে এই গান। ওয়েলশ থেকে জার্মান অনুবাদ পেলাম, বাংলা করে তুলে রাখলাম। বাংলায় ছন্দ মেলাতে গিয়ে কিছু যোগবিয়োগ করতে হলো।

 গ্রীষ্ম যখন চারটি পাশে শোভায়
দেশ আমাকে ভীষণ রকম লোভায়
চাইছি যেতে ঐ উঁচু সে ধার
টপকে হব পাথরসেতু পার
পাহাড়চূড়ো উপত্যকার পর
ভাসিয়ে দেবো আমার গলার স্বর

 এপার থেকে ওপার যাবো ছুঁয়ে
মাঠের মাঝে চুপটি করে শুয়ে
নির্বিবাদে আগুন পোহাই জ্বেলে
ফিরবো ঘরে আবার ঘরের ছেলে
গ্রীষ্ম যখন দিচ্ছে টোকা দোরে
বুকটা যে কী ভীষণ রকম পোড়ে
এক পা দু পা এগিয়ে আসে ঘর
বুকের ভেতর মনের কলস্বর।

 


কম্পোজিশনটা শুনে ভীষণই একা লাগছে হঠাৎ। নতুন কিছু নয়, কিন্তু প্রতিবার যখন একা লাগে, মনে হয় বহু বছর পর যেন হঠাৎ একলা হয়ে গেলাম।

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।