Thursday, February 09, 2012

বই নিয়ে ০২


অনেক বছর আগে একমাসের জন্যে আমার প্রতিবেশিনী হিসেবে নাদিয়া নামে এক রুশ যুবতীকে পেয়েছিলাম। ব্রেয়ানস্ক নামে একটা ছোটো শহরে সে লাইব্রেরিয়ানের কাজ করতো। একদিন টিভি রুমে হলিউডি লা মিজেহ্রাবলের জার্মান ডাবড সংস্করণ দেখাচ্ছে, আমি আর নাদিয়া ছাড়া আর কেউ দেখছে না সেটা। সিনেমা দেখা শেষ করে নাদিয়া মুখ বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের একটা হাসি হেসে বললো, আমেরিকানরা না পারে উপন্যাস লিখতে, না পারে সিনেমা বানাতে।
কেন এমন ধারণা হলো তার, জানতে চাওয়ার পর নাদিয়া আবার চেয়ার টেনে বসে বিরাট একটা লেকচার দিলো। মার্কিন উপন্যাস সম্পর্কে আমার তেমন ধারণা ছিলো না তখন (এখনও নেই), নাদিয়া লাইব্রেরিয়ান বলে সে বেশ কিছু মার্কিন উপন্যাসের রুশ অনুবাদ পড়েছে, তার কাছে ওগুলোকে আবর্জনা মনে হয়েছে। চার-পাঁচটা চরিত্র দিয়ে তারা কাজ চালিয়ে দেয়, এটাই নাদিয়ার সবচেয়ে বড় অভিযোগ। উপন্যাস লিখতে জানে কেবল রুশরা, জানালো সে। রুশ উপন্যাস নিয়েও আমার তেমন ধারণা ছিলো না (এখনও নেই)। ব্রাদার্স কারামাজভ পড়ার পরামর্শ দিলো নাদিয়া। তার মতে, একটা বই খুলে মাসখানেক ধরে যদি সেটা না-ই পড়া যায়, কুড়ি পঁচিশটা জটিল চরিত্র যদি তাতে না-ই থাকে, এক এক অধ্যায় শেষ করে যদি রাতে ঘুমানোর আগে সেগুলো নিয়ে একটু চিন্তা না করা যায়, তাহলে ওটা একটা ছাতার উপন্যাস। লা মিজেহ্রাবল? হুঁ, নাদিয়ার খারাপই লাগছে বলতে, কিন্তু ওটাও ছাতার উপন্যাস। আনা কারেনিনা পোড়ো, ঘুমাতে যাওয়ার আগে আমাকে হুকুম দেয় সে।
এক মাস পর নাদিয়া ফিরে গেলো ব্রেয়ানস্কে। তার ঘরে এসে উঠলো আরেক নাদিয়া। সে-ও রুশ, এবং কী তাজ্জব, সে-ও লাইব্রেরিয়ান। তবে প্রথম নাদিয়া একটু বিষণ্ণ গম্ভীর ছিলো, দ্বিতীয় নাদিয়া ছটফটে। তার সাথেও আমার ভাব হয়ে গেলো (নাদিয়া নামের মেয়েদের সাথে আমার সহজে খাতির হয়ে যায়)। অলিভার টুইস্টের জার্মান ডাবড সংস্করণ দেখছি একদিন গভীর রাতে বসে, নাদিয়াও এসে বসে দেখা শুরু করলো। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর শুনলাম একটা পরিচিত শব্দ, হুঁহ!
এবার মেজাজটা খারাপই হয়ে গেলো। ঘটনা কী? রাশিয়ার সব নাদিয়াই কি লাইব্রেরিয়ান? তারা সবাই কি লাইব্রেরিতে বসে বসে বই পড়ে? দ্বিতীয় নাদিয়ার কথা শুনে মনে হলো ঘটনা সেরকমই। তার মতে, অলিভার টুইস্ট একটা ফালতু উপন্যাস। উপন্যাস লিখতে পারে শুধু রুশরা। তাতে অনেকগুলো চরিত্র থাকে, অনেক ঘটনা থাকে, এক একটা সংলাপ নিয়ে চিন্তা করেই নাকি দিন কাটিয়ে দেয়া যায়। ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট পড়ার হুকুম দিয়ে সে ঘুমোতে চলে যায়, অলিভার টুইস্ট একটা বিষ্ঠা, এই মত রেখে।
পরে আবার জার্মানিতে এসে আরেক রুশ লাইব্রেরিয়ান নাদিয়ার সাথে আলাপ হওয়ার পর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, নাদিয়া নামের কোনো রুশ মেয়ের সাথে বই নিয়ে আলাপ করতে যাবো না। কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?
বাংলা উপন্যাস নিয়ে কোনো নাদিয়ার সাথেই তেমন আলাপ হয়নি। উপন্যাসের বিস্তৃতি দিয়ে তার মহত্ত্ব বিচার করতে গেলে রুশদের সাথে আমাদের টক্কর না লাগাই মঙ্গল। ক্লাসিক উপন্যাসগুলো দিয়ে মুখ রক্ষা করা গেলেও, এখন যে কলেবরের উপন্যাস আমাদের দেশে লেখা হয়ে চলছে, সেগুলো সম্বল করে আমরা পশ্চিমবঙ্গের সাথেই কি তুলনা করতে পারবো?
উপন্যাস নামে যা বিক্রি হয় আমাদের বইমেলায়, তার একটা বড় অংশ আসলে উপন্যাসিকা। প্রথম পর্বে বলেছিলাম কাগজ নিয়ে। এই কাগজের দাম আমাদের একটা অদ্ভুত কাচদেয়ালে ঘিরে ফেলছে। বইমেলায় বইগুলোর একটা ম্যাজিক দাম থাকে, প্রতি তিন চার বছর পর পর এই ম্যাজিক দামটা বাড়ে। এই সীমাটা টপকে গেলে পাঠক আর ক্রেতা হয়ে উঠতে পারে না, বইটা নেড়েচেড়ে রেখে সে চলে যায়। এই ম্যাজিক দামটা পাঁচ ফর্মার বইয়ের মূল্যের আশেপাশে।
এই আকারের বই বাংলাদেশে জনপ্রিয় করেছেন যারা, প্রকাশনা শিল্পের ওপর তাদের অনেক প্রভাব। তারা প্রচুর নতুন পাঠক যেমন তৈরি করেছেন ও ধরে রেখেছেন, সেইসঙ্গে বাজারে বইয়ের গ্রহণযোগ্য একটি আকৃতিও প্রতিষ্ঠা করেছেন। এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে কেউ হুট করে একটা মোটাসোটা বই লিখে সুবিধা করতে পারবেন না। নতুন লেখকের বৃহদায়তন বই প্রায় কোনো প্রকাশকই প্রকাশে আগ্রহী হবেন না, যেহেতু ঝুঁকি বেশি, আর পুরনো লেখকরাও এই প্রতিষ্ঠিত কলেবর ছেড়ে দূরে গিয়ে তেমন একটা লেখেন না। দশ ফর্মা কেন লিখবেন, যদি পাঁচ-ছয় ফর্মা লিখেই কাজ হয়? বইয়ের বিবর্তনের ধারায় পাঁচ-ছয় ফর্মা একটা স্থিতিশীল পরিসর। যদি পাঁচ ফর্মার কম লেখা হয়, তাহলে ফন্টের আকার বাড়িয়ে, লাইন স্পেসিং বাড়িয়ে, মার্জিন বাড়িয়ে, প্রয়োজনে দুই পাতা সাদা রেখে একে পাঁচ ফর্মায় তুলে আনা হয়। গত কুড়ি বছরে আমরা এটিকে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের স্ট্যান্ডার্ডে পরিণত করে ফেলেছি কি?
যুক্তি আসতে পারে, চাহিদা আছে বলেই হয়তো এমন পরিসরের উপন্যাস বা গল্পসংকলনের সরবরাহ বেশি। রুশরা মাসের পর মাস ধরে গোদা গোদা বই পড়ে বলে বাঙালিকেও সেটা করতে হবে নাকি?
পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকালে দেখি, সেখানে বিস্তৃত পরিসরের উপন্যাস লেখার চল বহুদিন ধরেই। সেই উপন্যাসগুলো জনপ্রিয় আর লাভপ্রদও বটে, এমনকি বাংলাদেশেও অনেকে সুনীল-শীর্ষেন্দু-সমরেশের অনেক বৃহদায়তন উপন্যাসকে ক্লাসিক জ্ঞান করে পড়েন। পশ্চিমবঙ্গে বৃহদায়তন উপন্যাস প্রকাশের পেছনেও সেখানে কাগজের কম দাম একটা বড় প্রভাবক বলে আমি মনে করি। আমাদের বইদোকানীরা কুলিকামিনের মতো করে ঐ বইগুলো পিঠে মোট বয়ে নিয়ে এনে বিক্রি করেন সারা বছর ধরে। কিন্তু যখন আমাদের বইমেলা হয়, আমাদের প্রকাশক আর লেখকেরা কোনো এক অদ্ভুত কারণে সেই পাঁচ-ছয় ফর্মার লক্ষ্মণরেখায় বন্দী হয়ে লেখেন। ব্যতিক্রম যে নেই, তা বলছি না, কিন্তু সেটা ব্যতিক্রমই।
নিচে কবিতা, গল্প, উপন্যাসিকা, উপন্যাস আর মহোপন্যাসের শব্দসংখ্যার একটা তুলনামূলক লেখ দিলাম, তুলনা করে দেখুন। নন্দিত নরকে আর পদ্মা নদীর মাঝির শব্দসংখ্যা = পৃষ্ঠা সংখ্যা x লাইনসংখ্যা x গড় শব্দসংখ্যা, এই সূত্র ধরে হিসাব করা। বাকি তিনটি একেবারে গুণে বার করা।
ওয়ার অ্যান্ড পিস বেছে নেয়ার কারণ, উপন্যাসের সম্ভাব্য একটি প্রান্তিক আকারের সাথে তুলনা করে দেখতে চেয়েছি। পনেরো হাজার শব্দ আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয় পরিসর, এই পরিসরে প্রচুর লেখা প্রকাশিত হয়। যেহেতু অনেকেই কাগজের ঈদ সংখ্যায় লেখেন, ঈদ মৌসুমে তারা এই আকারের একাধিক লেখা লিখে থাকেন এবং একাধিক পত্রিকায় প্রকাশ করেন। এগুলোর অনেকগুলোই পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। আর পশ্চিমবঙ্গে পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত লেখার সংখ্যা বেশি, সেগুলো লম্বা সময় ধরে পাঠকের সামনে থাকে এবং যখন গ্রন্থিত হয়, বেশ বড় আকার নিয়েই হয়। আমাদের দৈনিক পত্রিকার সাপ্তাহিক সাময়িকীতে ধারাবাহিক লেখা প্রকাশিত হয়, কিন্তু সেটি অল্প কয়েকটি পত্রিকায়, এবং অল্প কয়েকটি বইয়ের। লেখককে দীর্ঘ পরিসর নিয়ে লিখতে যদি পাঠক উৎসাহিত করতে না পারেন, তাহলে লেখক বড় উপন্যাস লিখবেনই বা কেন? পদ্মা নদীর মাঝির মতো আরেকটি উপন্যাস রচনা করার শ্রম কে দেবেন, কেনই বা দেবেন?
বড় উপন্যাস আদৌ লেখা জরুরি কেন, এই প্রশ্নটা সামনে আসতে পারে। আমার কাছে মনে হয়, যে পরিসরটি বইমেলার অর্থনীতি, পত্রিকার কূটনীতি আর লেখক-পাঠকের যোগাযোগের অভাবের সমন্বিত ফল হিসেবে এখন জনপ্রিয় বা মান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, এই পরিসরে একাধিক চরিত্র নিয়ে বড় কোনো ঘটনাকে খুঁটিয়ে দেখা দুরূহ। কিন্তু সেই খুঁটিয়ে দেখার কাজটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য শুধু ঘন্টাখানেক সময় কাটানোর জিনিস নয়, সাহিত্য একটা সমাজের চলার চিহ্নও। যুবক যেমন দেয়ালে নিজের শিশু হাতের ছাপ ফিরে দেখার জন্যে একদিন উদভ্রান্ত হয়ে ছুটে আসে পুরনো বাড়িতে, সমাজকেও তেমনি একটা প্রজন্ম পর পেছনে তাকিয়ে অনেক কিছু খুঁজতে হয়। খুঁজে কিছু পাওয়ার প্রশ্ন পরে আসে, খুঁজতে চাওয়ার প্রবণতাটি প্রতি মুহূর্তে ধরে রাখতে হয়। এক পুরুষ পেরিয়ে গেছে, আমরা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্বৃত্ত লোকটিকে ক্ষমতা থেকে লাথি মেরে সরিয়েছি, কিন্তু পেছনে তাকিয়ে নিজেদের পায়ের ছাপ খোঁজার প্রবণতাটিকে আমাদের সাহিত্যিকেরা নির্মাণ করতে পারেননি বলে আজও অনেক তরুণ জানে না, এরশাদ কত নির্মম ভয়ঙ্কর একটি স্বৈরশাসক ছিলো, কেমন ছিলো তার থাবার নিচে বাংলাদেশ। এই ব্যর্থতার দায় আমাদের সাহিত্যিকদের, তারা সেই সময়টিকে সাহিত্যে ধরে রাখতে পারেননি। পাঁচ-ছয় ফর্মার উপন্যাসে মানুষের জীবনই ধরা মুশকিল, আর সমাজের জীবন তো দূরের কথা।
ডাব্লিউ ডাব্লিউ হান্টার ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিস্ময় প্রকাশ করে গিয়েছিলেন, এত সমৃদ্ধ একটি দেশ, অথচ এর কোনো সমাজবিবরণী নেই। এক একটি পরিবার সেখানে দ্বীপের মতো বাস করে, হিন্দু মুসলিম থেকে দূরে থাকে, ধনী থাকে দরিদ্র থেকে দূরে, অতিথি অন্দরমহলবাসিনীদের কুশল জিজ্ঞাসা করতে পারেন না, অথচ প্রতিটি ধনী বা বিদ্যোৎসাহী পরিবারের
রয়েছে নিজস্ব লিখিত পারিবারিক ইতিহাস। হান্টার পুরোনো খবরের কাগজ, সরকারী দলিল আর পারিবারিক ইতিহাস সংগ্রহ করে অ্যানালস অব রুরাল বেঙ্গল রচনা করেছিলেন, আর বার বার বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন, এ কেমন সমাজ, যে নিজের ইতিহাস লেখে না? আমরা সেই সময় ছেড়ে দূরে চলে এসেছি ঠিকই, কিন্তু বিচ্ছিন্ন দ্বীপই রয়ে গিয়েছি। আমাদের উপন্যাসগুলোও তাই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতোই, একটি বা দু'টি চরিত্র, দুয়েকটি নারী আর দুয়েকটি পুরুষের জোলো রোমান্টিক বৃত্তের ভেতরে পাঁচ থেকে ছয় ফর্মার ভেতরে আমাদের সাহিত্যের দায় নিষ্পন্ন হয়ে যাচ্ছে। সাহিত্য কি শুধু বিনোদনই দেবে আমাদের, এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ থেকে কি উদ্ধার করবে না?
প্রতিটি বইমেলাতেই আমরা হয়তো একটু একটু করে নিজেদের ইতিহাসের মুখচ্ছবি মুছে আসছি। কাগজের দামটা হয়তো শুধুই অজুহাত।
বই হোক আরো বিস্তৃত, চরিত্রঘন, ঘটনাসঙ্কুল, ইতিহাসগর্ভ। বই হোক আরো সুলভ। অফসেট-হার্ডকাভারের দামী খাঁচা থেকে তার মুক্তি যেমন প্রয়োজন, তেমনই মুক্তি প্রয়োজন একঘেয়েমি থেকে, সমাজ সম্পর্কে নিস্পৃহা থেকে। সময়ের আত্মাকে ধারণ করতে না পারলে সে বই দিয়ে সাজানো বইমেলা আরেকটা বাণিজ্যমেলাই হবে শুধু।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।