Sunday, February 05, 2012

শিকার




১.
হাসানুজ্জামান টের পায়, তার মুখে একটা হাসি ফুটে আছে। সেটা এই পরিস্থিতিতে তাকে খুব একটা সাহায্য করবে না, তা সে জানে, কিন্তু হাসিটা মুছতে গিয়ে কষ্ট হয় তার।
হাসানুজ্জামান দাঁড়িয়ে আছে জয়দেবপুর মোড় থেকে একটু পশ্চিমে, রাস্তার পাশে একটা অঘোষিত স্ট্যান্ডে। উত্তরের হিমেল হাওয়া বড় বড় কারখানার ভবনের ফাঁকে একটু খোলা জায়গা পেয়ে এসে হামলে পড়ছে তার ওপর। তবে হাসানুজ্জামানের গায়ে মোটা উলের সোয়েটার, গলায় মাফলার, কান পর্যন্ত ঢাকা টুপি, শীত তাকে কাবু করতে পারবে না। রাতের এই অন্ধকারকেও ভয় পাচ্ছে না সে, হাসানুজ্জামান নিজেও নিশাচর।
তাকে যেতে হবে এলেঙ্গা বাজার। এখন অনেক ট্যাক্সি চলাচল করে টাঙ্গাইল রোড ধরে, মাথাপিছু একটা ভাড়া দিতে হয়। বাসে চড়ার ঝক্কি পোষায় না যাদের, কিংবা কোনো কারণে ভরসা পায় না, তারাই ট্যাক্সি বেছে নেয়। আর এ চর্চাটা আছে বলেই হাসানুজ্জামান মাঝেমধ্যে হাতে কাজ না থাকলে এই সড়কে ছিনতাই করে।
তার ব্যাগের মধ্যে একটা বিদেশী পিস্তল আছে। গুলিভরা, ব্যবহারের জন্য তৈরি। তবে আজ রাতে রাস্তায় ছিনতাইয়ের জন্যে দাঁড়ায়নি সে। এলেঙ্গাবাজারে গিয়ে একটা খ্যাপ নিয়ে কথাবার্তা সারতে হবে। কালিহাতিতে এক দুর্ভাগার বডি ফেলার খ্যাপ, মক্কেল অনেক পয়সাওয়ালা লোক, আশ্বাস দিয়েছে এলেঙ্গা বাজারের পার্টি, হাসানুজ্জামানকে টাকা নিয়ে দরাদরি করতে হবে না বেশি।
সব ট্যাক্সি অবশ্য এই স্ট্যাণ্ডে থামে না। নানা হিসাবকিতাব আছে। ভেতরে মস্তান প্যাসেঞ্জার থাকলে লাইনের ট্যাক্সিও না থেমে চলে যায়। অনেক সময় লাইনের অন্য লোক ট্যাক্সি নিয়ে এসে এসব স্ট্যাণ্ড থেকে বোকাসোকা লোকজনকে তোলে, কালিয়াকৈর পৌঁছানোর আগেই কাজ হাসিল করে নির্জন কোনো জায়গায় মারধর করে নামিয়ে দেয় শিকারকে। বেশি তেড়িয়াপনা করলে বডি ফেলে দেয় অনেকেই। হাসানুজ্জামানকেও একবার ফেলতে হয়েছিলো। তবে সবকিছু সিস্টেম হয়ে গেছে এখন। ছোটোখাটো দাঁও মারলে যাত্রী-পুলিশ-সাংবাদিক কেউ গা করে না। লাইনে নতুন আসা রুস্তমরা কিছু না বুঝেই মেশিন চালিয়ে বডি ফেলে দেয়, তখন কয়েকদিনের জন্য একটু সমস্যা হয়। ঘাপলার কোনো শেষ নাই, এসব ঠেলেই কাজ চালিয়ে যেতে হয়।
পর পর দুটো লোকবোঝাই ট্যাক্সি সাঁ সাঁ করে স্ট্যাণ্ড পেরিয়ে চলে যায়। হাসানুজ্জামান শরীরের ভর বাম পা থেকে ডান পায়ে নিয়ে দাঁড়ায়। সে একটা হোটেলে মুরগি দিয়ে ভাত খেয়েছে ঘন্টাখানেক আগে, কিন্তু আবার মৃদু খিদে পাচ্ছে তার। স্ট্যাণ্ডের পাশে একটা চায়ের দোকান আছে, কিন্তু এখন সেটা বন্ধ। হয়তো দোকানী এই ঠাণ্ডার রাতে আজ একটু জলদি বাড়ি ফিরে কাঁথার নিচে ঢুকে বউকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে চায়। আর দোকানটা বন্ধ বলেই হয়তো হাসানুজ্জামানের চায়ের তৃষ্ণাটা এক লাফে অনেকখানি বেড়ে গেছে।
দূরে একটা গাড়ির আলো দেখে আবার একটু এগিয়ে দাঁড়ায় সে। আয় বাবা ট্যাক্সি, এলেঙ্গা বাজার নিয়ে যা জলদি জলদি। বাজার থেকে গরম এক কাপ চা খেয়ে পার্টির সাথে আলাপসালাপ শুরু করি।
নাহ, এটা প্রাইভেট গাড়ি। উল্কাবেগে স্ট্যাণ্ড পেরিয়ে চলে যায় গাড়িটা টাঙ্গাইলের দিকে। দামী জিনিস, হয়তো কোনো বড়লোকের ছেলে যমুনা ব্রিজের রাস্তায় বেশি জোরে গাড়ি চালানোর লোভে বেরিয়েছে।
হাসানুজ্জামানকে চায়ের জন্যে আর মনে মনে হাহুতাশ করার সুযোগ না দিয়ে এবার স্ট্যাণ্ডে এসে থামে একটা ট্যাক্সি। ইয়েলো ক্যাব, তার মানে ভেতরে যারা আছে তারা ভালো পয়সা খরচ করেই যেখানে যাওয়ার যেতে ইচ্ছুক। কালো ক্যাবে ভাড়া ইয়েলো ক্যাবের তুলনায় অনেক কম হয়, হাসানুজ্জামান যে শ্রেণীর মানুষের পরিচয় ভাঁড়িয়ে ছিনতাই করে, তারা কখনো ট্যাক্সি চড়লে কালো ক্যাবেই চড়ে।
গাড়ির ভেতর থেকে নারী কণ্ঠের চড়া প্রশ্ন শুনতে পায় হাসানুজ্জামান, "এইখানে থামাইলেন ক্যান? অ্যাই ড্রাইভার, এইখানে থামাইলেন ক্যান?"
হাসানুজ্জামান একটু ঝুঁকে নিজের গোবেচারা চেহারাটা দেখায় গাড়ির চালক আর পেছনের সিটে বসা আরোহীদের। সে দেখতে একেবারেই নিরীহ, মোটাসোটো, একটু খাটো, চোখে বিনা পাওয়ারের রূপালি ফ্রেমের চশমা, জড়োসড়ো ভীতু অভিব্যক্তি চোখেমুখে। ছিনতাই করতে বেরোলে সে শিকারের সাথে আগে গল্প জমিয়ে তার ভেতরে জমে থাকা শঙ্কাটা গলিয়ে দূর করে, নিজেকে তখন দূরের কোনো মিল বা ফ্যাক্টরির অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টোরকিপার বলে পরিচয় দেয় হাসানুজ্জামান। নানা গল্পগুজবের পর শিকার যখন একেবারে ঢিল দিয়ে দেয়, তাকে হানিসাধনে অপারগ কোনো কেরানী ধরে নেয়, তখনই ছোবল মারে সে। নিজের কাজে মন্দ নয় হাসানুজ্জামান, চড়থাপড় থেকে খুনখারাপি কোনোটাই সে মন্দ চালাতে জানে না। অ্যাকশনের সময় তার সস্তা রূপালি ফ্রেমের ওপাশে চোখদুটো সরীসৃপের চোখের মতো ঠাণ্ডা হয়ে ওঠে, সেটাই অর্ধেক কাজ সেরে ফেলে বেশিরভাগ সময়। পিস্তলটার চেহারা বাকি পঞ্চাশ শতাংশ উসুল করে নেয়। কুড়িটা ঠ্যাক দিলে একটায় হয়তো প্রতিরোধ আসে, তখন পিস্তল কথা বলে।
বিগলিত কণ্ঠে সালাম দেয় হাসানুজ্জামান, "স্লামালিকুম! ভাই কি এলেঙ্গা বাজার পর্যন্ত যাবেন?"
পেছনে নারী কণ্ঠ আবার উঁচু, চোখা গলায় বলে, "অ্যাই ড্রাইভার, আপনি এইখানে ক্যান থামাইছেন গাড়ি?"
ড্রাইভার লোকটা সাধারণ ক্যাব ড্রাইভারের মতোই দেখতে, সে পেছনে না ফিরেই বিরক্ত হয়ে বলে, "আপা, আমার এক সিট এখনও খালি। আরেকজন প্যাসেঞ্জার লমু।"
নারীকণ্ঠ আরেক পর্দা চড়ে বলে, "প্যাসেঞ্জার নিবেন মানে? আমরা আপনার সাথে চুক্তি করছি, আপনি আবার আরেকজনরে লইবেন ক্যান?"
হাসানুজ্জামান একটু ঝুঁকে পেছনের সিটে আরোহীদের দেখে। ট্যাক্সিতে চড়ে এই রোডে মেয়ে নিয়ে ফূর্তিতে বের হওয়া খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তবে পেছনের সিটে যারা বসে, তাদের দেখে ঐ কেস বলে মনে হয় না। বছর তিরিশের এক যুবতী বসে, তার পাশে শান্ত শিষ্ট গোবেচারা চেহারার এক মাঝবয়সী লোক। মেয়েটার সাজগোজ বেশ্যাদের মতো নয়, বেশ মার্জিতই বলা চলে, রইস ঘরের মেয়েদের মতোই, দুইজন বসেও আছে ভদ্র দূরত্বে। অবশ্য আগে কী হচ্ছিলো তা কে জানে?
হাসানুজ্জামান সালাম দেয় আবার। "স্লামালিকুম। ম্যাডাম, আমি একটু এলেঙ্গা বাজার যাবো। আপনারা যদি পারমিশন দেন, তাহলে আপনাদের গাড়িতে একটু শেয়ারে যেতাম। আমার খুব জরুরি দরকার, ইমার্জেন্সি আছে একটা।" কথায় ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে দেয় সে সযত্নে, ভদ্রলোকের ছদ্মবেশে তুলির শেষ দাগ হিসেবে।
মহিলা তবুও একঘেয়ে চিৎকার করে, "আমরা আপনার সাথে চুক্তি করছি, আপনি তবুও রাস্তার মাঝখানে থামাইলেন ক্যান? এইসব কী?"
পাশে বসা লোকটা ভারি গলায় বলে, "সোনিয়া, থামো তো!"
ড্রাইভার বেশি কথা বলে না পেছনের আরোহীদের সাথে। হাসানুজ্জামানের দিকে তাকিয়ে বলে, "এলেঙ্গা বাজার পর্যন্ত দুইশো ট্যাকা। যাইবেন?"
হাসানুজ্জামান চোখেমুখে একটা হতাশ বিরক্ত আর অনুনয়ের মিশেল ফোটানোর চেষ্টা করে। "দুইশো টাকা? দেড়শোতে চলেন ভাই ...।" দুইশো টাকা খরচ করতে তার তেমন আপত্তি নেই, কিন্তু দরাদরি না করে উঠে পড়লে এরা সন্দেহ করবে।
ড্রাইভার মাথা নেড়ে গাড়িতে স্টার্ট দেয় আবার।
হাসানুজ্জামান হতাশ মুখে ক্যাবের দরজা খুলে ড্রাইভারের পাশের আসনে বসে। ড্রাইভার বলে, "দরজা জোরে টান দেন, লাগে নাই পুরাপুরি।"
হাসানুজ্জামান দুর্বল হাতে আবার টান দেয় দরজা। গাড়ি এবার ঢাকা-টাঙ্গাইল রোডে উঠে পড়ে।
পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে হাসানুজ্জামান বলে, "আপনাদের বিরক্ত করার জন্য খুব দুঃখিত। কিন্তু আমার একটা ইমার্জেন্সি ...।"
মাঝবয়েসী লোকটার চেহারা ক্ষণিকের জন্য একটা কারখানার সদর দরজায় জ্বলতে থাকা আলোয় দেখতে পেয়ে একটু থতমত খায় হাসানুজ্জামান। লোকটার চেহারা শান্ত, কিন্তু সে টের পায়, লোকটা নিরীহ নয়। মজবুত চোয়াল, শীতল চোখ, ঘন ভুরু। নিচু, ভারি গলায় লোকটা বলে, "আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না।"
হাসানুজ্জামান লোকটার পাশে বসে থাকা যুবতীর দিকে ক্ষমা প্রার্থনার হাসি হাসে অর্ধেক। "ম্যাডাম বোধহয় খুব বিরক্ত হয়েছেন।"
সোনিয়া নামের মহিলার চেহারা রাস্তার পাশের বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত আলোয় এক এক ঝলক দেখতে পায় সে। দেখতে ভালোই, কোনো বাড়তি সাজগোজ নেই, কিন্তু মনে হয় ক্ষেপে আছে, পিঠ সোজা করে বসে আছে, লোকটার মতো হেলান দিয়ে আয়েশ করছে না।
হাসানুজ্জামানের কথার কোনো জবাব দেয় না সোনিয়া। ড্রাইভারের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে হাসানুজ্জামান। ড্রাইভারের অভিব্যক্তি বোঝার উপায় নেই আবছা আলোয়, নিবিষ্ট মনে গাড়ি চালাচ্ছে সে। সামনের পৃথিবীর অন্ধকার কয়েক গজ দূরে ঠেলে রেখেছে হেডলাইটের আলো।
পেছনে বসা লোকটা নিচু গলাতেই বলে, "আপনি কি একাই যাচ্ছেন এলেঙ্গায়?"
হাসানুজ্জামান কিছুটা বিস্মিত হয় কথাটা শুনে। লোকটা কি ভাবছে, সে আরো সাঙ্গোপাঙ্গো ডেকে আনবে পেছন পেছন? নাকি নিতান্তই নিরীহ কৌতূহল থেকেই প্রশ্নটা করলো?
ঘাড় ফিরিয়ে হাসানুজ্জামান বলে, "জ্বি। একটা ফ্যামিলি সমস্যা। খুব ইমার্জেন্সি কাজ। তাই রাতেই যেতে হচ্ছে।"
লোকটা সিটে হেলান দিয়ে বসে ছিলো, খুব ধীর ভঙ্গিতে পিঠটা সিট ছেড়ে তুলে ঝুঁকে বসে হাসানুজ্জামানের মুখের কাছে মুখ এনে অনুচ্চ গম্ভীর গলায় বললো, "আপনার সঙ্গে আর কেউ যাচ্ছে এখন? নাকি আপনি একাই যাচ্ছেন?"
হাসানুজ্জামান বাম হাতে গোপনে নিজের ব্যাগের ভেতরে রাখা পিস্তলটার স্পর্শ নিলো একবার। এই লোক কী জানতে চায় আসলে? এরা ছিনতাই পার্টি না তো? এই লাইনে ছিনতাই করে এমন সবাইকেই সে কমবেশি চেনে, আর সাথে মেয়ে নিয়ে ছিনতাই করার মতো লোক খুব বেশি নাই এদিকটায়।
তার মুখের হাসিটা ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিলো বলেই বোধহয় লোকটা একটু আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে হাসে, কিন্তু হাসানুজ্জামানের অস্বস্তিটা দূর হয় না। সে ঘাড় ঘুরিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে বলে, "জ্বি, একাই যাচ্ছি। আর কেউ নাই সাথে।"
সোনিয়া মুখ খোলে এবার, "আপনি এত রাতে ঐ জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, আপনার ভয় লাগে না?"
স্বাভাবিক কথার দিকে আলাপ মোড় নিচ্ছে জেনে হাসানুজ্জামান একটু স্বস্তি অনুভব করে। "জ্বি ম্যাডাম, রাতের বেলা একটু ভয় তো লাগেই। কিন্তু মাঝেমধ্যে যেতে হয় তো, অভ্যাস আছে।"
সোনিয়া বলে, "আমি প্রায়ই পেপারে পড়ি, এদিকে ছিনতাই হয়।"
হাসানুজ্জামান বলে, "জ্বি ম্যাডাম। আমাকেও একবার ছিনতাই করেছিলো কয়েকজন ইয়াংম্যান। তাছাড়া ...।" নাটকীয় একটা বিরত দেয় সে।
সোনিয়া বলে, "তাছাড়া কী?"
হাসানুজ্জামান ঘাড় ঘুরিয়ে সোনিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, "এদিকে কিছু খারাপ জায়গা আছে ম্যাডাম।"
লোকটা বলে, "খারাপ জায়গা মানে?"
হাসানুজ্জামান বলে, "নানা রকম কথা শুনি স্যার! ভূতপ্রেত, জ্বিন-পিশাচ, এই সব আর কি।"
লোকটা চুপ করে যায়। সোনিয়া খনখনে গলায় বলে, "হাইওয়েতে ভূতপ্রেত থাকে নাকি? ওগুলি তো জানতাম গ্রামেগঞ্জে থাকে!"
হাসানুজ্জামান হাসে। বলে, "হাইওয়ের দুই পাশে গ্রামই তো ম্যাডাম! ভিলেজ এরিয়া।"
লোকটা বলে, "খারাপ জায়গায় কী হয়?"
হাসানুজ্জামান এই গল্প তার অনেক শিকারের সাথেই করেছে। কিছু লোকের ভেতরে সহযাত্রীকে নিয়ে ভয় দূর হয় না, তখন তার মনে জ্বিনভূতের ভয় ঢুকিয়ে দিতে হয়। শিকার তখন গায়েবী শত্রুকে নিয়ে চিন্তিত থাকে। তখন এক ঝটকায় পিস্তল বের করে গলায় চেপে ধরে তার জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিতে হয়। মাঝেমধ্যে অবস্থা বুঝে কয়েকটা কিলঘুষি, কপাল খারাপ থাকলে গুলি। সে সোৎসাহে বহুল ব্যবহৃত গল্পগুলো বলে যায়।
"আমি চাক্ষুষ কিছু দেখি নাই স্যার। মানে, সবসময় তো লোকজন থাকে সাথে। বাসে বা ট্যাক্সিতে করে একা একা তো যাওয়া যায় না। কিন্তু শুনেছি মাঝেমধ্যে জ্বিন এসে লোক তুলে নিয়ে যায়। মানে, একা যদি পায়। আবার কিছু গাছ আছে রাস্তার পাশে, সেটাতে পিশাচ বাস করে। আশপাশ দিয়ে একা কাউকে যেতে দেখলে তুলে নেয়।"
সোনিয়া জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। লোকটা ঘোঁৎ করে একটা শব্দ করে।
হাসানুজ্জামানের ভালো লাগে এদের অস্বস্তিতে ফেলতে পেরে। লোকটা শুরুতেই একটা আচানক প্রশ্ন করে তাকে চমকে দিয়েছিলো। এখন কেমন লাগে, চান্দু?
"আমার এক কলিগের ফ্রেন্ড স্যার, এইখানেই হাইওয়ের পাশে একটা মিলে স্যার, চাকরি করত। ব্যাচেলার মানুষ স্যার, মিলের একটা হোস্টেলেই থাকতো। একদিন সে রাতে একটু হাঁটতে বের হয়েছিলো স্যার। একটু বেসামাল ছিলো আর কি ... হেঁ হেঁ হেঁ, মানে একটু ড্রিঙ্ক করেছিলো আর কি। তো তাকে স্যার একটা গাছের উপর পাওয়া যায় পরে। ডেড অবস্থায়। একদম ডেড।"
লোকটা বলে, "সোনিয়া, বাসায় বাজার আছে?"
সোনিয়া বলে, "না, বাজার করা দরকার ছিলো। করবো?"
প্রসঙ্গ থেকে এরা সরে যাওয়ায় হাসানুজ্জামান একটু মনক্ষুণ্ণ হয়, কিন্তু মনোযোগটাকে পেছনের সিটের দিকে রেখে সে ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে তাকায়। শুনতে পায়, লোকটা বলছে, "হ্যাঁ, বাজার করো। ড্রাইভার সাহেব, আমরা বাজার করবো।"
হাসানুজ্জামানের কাছে একটু অদ্ভূত লাগে কথাগুলো। এত রাতে কোথায় বাজার করবে এরা? কালিয়াকৈরের আগে তো বাজার নেইও ধারেকাছে। ড্রাইভারের অভিব্যক্তিও বোঝা যায় না অন্ধকারে, সে শুধু সংক্ষেপে বলে, "আচ্ছা।"
প্রশ্নটা হাসানুজ্জামানকে ভাবায়, এবং চিন্তায় ক্ষণিকের জন্যে ডুবে গিয়ে সে পেছনের সিট থেকে হঠাৎ ভেসে আসা কড়া মিষ্টি একটা গন্ধের প্রতি এই পৃথিবীতে যতটুকু মনোযোগ দিলে বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার মধ্যে টানা দাগটা খেয়াল করা যায়, ততটুকু মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হয়।
পেছনের সিট থেকে চুড়ি পরা একটা হাত সাঁড়াশির মতো হাসানুজ্জামানের গলা আঁকড়ে ধরে, আরেকটা হাতে ধরা রুমাল চেপে বসে তার নাকের ওপর। রুমালটা ভেজা, তাতে একটা অসহ্য মিষ্টি গন্ধ।
হাসানুজ্জামান টের পায়, যতটুকু বাধা সে দিতে পারতো, ততটুকু বাধা দেয়ার ইচ্ছা থাকলেও ক্ষমতা তার আর নেই। ক্রমশ তার কাছে ভারি হয়ে আসছে পৃথিবী, হাতের ওজন মনে হচ্ছে একশো কেজি। সে দুর্বলভাবে তার বাম হাতটা দিয়ে ব্যাগটা খোলার চেষ্টা করে, ওর ভেতরে আছে তার পিস্তলটা, গুলিভরা, শুধু সেফটি ক্যাচটা অফ করে ট্রিগারে টান দিলেই হবে। কিন্তু বাম হাতটা চলতেই চাইছে না, পৃথিবীটাও মনে হচ্ছে একটা বিরাট ঢেউয়ের ওপর ভাসছে, কানে আসছে আবছা শোঁ শোঁ শব্দ। হাসানুজ্জামান টের পায়, ড্রাইভার লোকটা বাম হাতে একটা প্রচণ্ড কিল মারে তার পাঁজরের ঠিক নিচে, ফুসফুসের সব বাতাস বেরিয়ে যায় সে আঘাতে। হাসানুজ্জামান বুক ভরে শ্বাস নেয় আবার নিজের অজান্তেই, সেইসাথে বুকে টেনে নেয় রুমালের অনেকখানি ক্লোরোফর্ম।
ঢাকা টাঙ্গাইল মহাসড়ক ছেড়ে সে তলিয়ে যায় অচৈতন্যে।
২.
ঠাণ্ডা।
চৈতন্য ফিরে পাবার পর হিমের অনুভূতিই হাসানুজ্জামানের সমস্ত মনোযোগ গ্রাস করে। অন্ধকার এসে হিমের জায়গাটা দখল করে কয়েক সেকেণ্ড পর। হাসানুজ্জামান অনুভব করে, ঠাণ্ডা আর অন্ধকার কোথাও শুয়ে আছে সে। তার চোখের সামনে একেবারে নিকষ অন্ধকার। সে কি অন্ধ হয়ে গেলো?
উদ্বেগটা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে তার রক্তস্রোতে। হাসানুজ্জামান একটা হাত দিয়ে নিজের চোখ স্পর্শ করতে গিয়ে শিউরে ওঠে ব্যথায়। তার ঘাড়ের পেশীতে প্রচণ্ড ব্যথা। কিন্তু ঘাড়ে আঘাত লাগার কথা স্মরণ করতে পারে না সে।
চোখে কোনো বাঁধন নেই। কিন্তু চোখের সামনে গাঢ় অন্ধকার। হাসানুজ্জামান নিজের আঙুল দেখার চেষ্টা করে, পারে না।
একটা চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে আসে তার গলা থেকে, অনিচ্ছাসত্ত্বেও। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে, ঘাবড়ে গেলে চলবে না। শুরু থেকে চিন্তা করতে হবে আবার। সে হাসানুজ্জামান, এলেঙ্গাবাজারে এক পার্টির সাথে দেখা করতে যাচ্ছিলো, কালিহাতিতে একজনকে মার্ডার করার ব্যাপারে। পথে ট্যাক্সিতে তার নাকে ওষুধ ঠেসে ধরে অজ্ঞান করে ফেলে সোনিয়া নামের মেয়েটা। এই কাজে ট্যাক্সি ড্রাইভার সোনিয়াকে সাহায্য করছিলো। তার মানে পেছনের সিটের ঐ লোকটা, সোনিয়া আর ড্রাইভার, তিনজন একই পার্টির লোক। তারা অজ্ঞান পার্টি, সন্দেহ নাই। বাজার করার কথা বলছিলো লোকটা। ওটাই সঙ্কেত। বাজার করতে বললেই রুমালে ওষুধ ঢেলে শিকারের নাকে চেপে ধরবে সোনিয়া।
কিন্তু সে এমন অন্ধকার জায়গায় কেন? মনে হচ্ছে এটা কোনো ঘর। অজ্ঞান পার্টির লোক তাকে রাস্তার ধারে ফেলে রেখে যাবে, এমনটাই স্বাভাবিক। সে এখন কোথায়?
হাসানুজ্জামানের শরীর কেঁপে উঠলো ঠাণ্ডায়। সে আবিষ্কার করলো, তার হাতটা নগ্ন। সোয়েটার নেই, শার্টও নেই।
হাসানুজ্জামান হাতড়ে হাতড়ে একটা কাঁথা পেলো শরীরের ওপর। একটা কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে সে। কাঁথার নিচে তার শরীর বিবস্ত্র। হাত বাড়িয়ে জাঙ্গিয়া স্পর্শ করে থেমে গেলো হাসানুজ্জামান। না, ওটা আর খোলেনি বদমায়েশগুলো। কিন্তু তার সোয়েটার, শার্ট, প্যান্ট, সবই খুলে নিয়ে গেছে। এ কেমন অজ্ঞান পার্টি? ওগুলো তো মোটেও দামী কিছু ছিলো না।
উঠে বসতে গিয়ে ঘাড়ের ব্যথাটা বিদ্যুতের গতিতে ছোবল দিলো গোটা পিঠে। এভাবে কতক্ষণ শুয়ে ছিলো সে?
হাসানুজ্জামান টের পেলো, তার শরীরের নিচে মাটি নেই। স্বাভাবিক বিছানাও নেই। খসখস শব্দ আর খোঁচা তাকে স্মরণ করিয়ে দিলো খড়ের কথা। হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলো সে একবার, হ্যাঁ, খড়ই। খড়ের গাদার ওপর তাকে ন্যাংটো করে কাঁথা পেঁচিয়ে ফেলে রেখে গেছে অজ্ঞান পার্টির দল।
একটা ক্ষীণ গোঙানির শব্দ হাসানুজ্জামানের হৃৎপিণ্ডকে একটি স্পন্দনের অপেক্ষা করিয়ে রাখলো কিছুক্ষণ। "উঁ!"
ডানদিকে ঘাড় ঘোরাতে গিয়ে ব্যথাটা হাসানুজ্জামানের ঘাড়ের পেশীর ওপর দংশন করলো আবার। অনেক দূরে কয়েকটা কমলা বিন্দু ধিকিধিকি জ্বলছে। গোঙানির আওয়াজটা সেখান থেকেই আসছে।
অন্ধকার ইতিমধ্যে হাসানুজ্জামানের চোখে খানিকটা সয়ে এসেছে, আগুন দেখে তার মনে একটা হালকা স্বস্তি ছড়িয়ে পড়লো, যাক, তার চোখের কোনো ক্ষতি হয়নি। একই সাথে হাসানুজ্জামান টের পেলো, সে অনেক বড় একটা ঘরের মাঝে আছে। জ্বলতে থাকা আগুনটুকু ঘরের অন্ধকার দূর করার বদলে তা আরো ঘন করে তুলেছে।
বাম হাত বাড়িয়ে দিতে গিয়ে পিঠের ব্যথাটা খচ করে ঘাই দিয়ে উঠলো, কিন্তু হাতের তালুতে ঠাণ্ডা, কঠিন আর শুকনো দেয়ালের স্পর্শটা সে ব্যথার উপস্থিতিকে ম্লান করে দিলো। হাসানুজ্জামান দেয়ালে হাত বোলালো। ইঁট নয়, পাথুরে দেয়াল, একেবারে ঢালাই করা। কোনো খাঁজ নেই। বরফের মতো শীতল।
কোথায় এনে ফেলেছে ব্যাটারা তাকে?
গোঙানির শব্দটা আবার ভেসে এলো আগুনের কাছ থেকে, "হুঁহুঁ!"
হাসানুজ্জামান মুখ খুলে ডাক দিতে গিয়ে আবিষ্কার করে, কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না তার গলা দিয়ে। ঠাণ্ডা ঘরে উদোম গায়ে একটা মোটে কাঁথা গায়ে শুয়ে থাকলে গলা বসে যাওয়াই স্বাভাবিক। কেশে গলা পরিষ্কার করে নেয় সে একবার, তারপর গলা চড়িয়ে ডাকে, "কে ভাই? কে ঐখানে?"
গোঙানির শব্দটা এক পর্দা চড়ে যায় এবার, "উঁ! উঁ! উঁ!"
হাসানুজ্জামান ঘাড় থেকে কোমর পর্যন্ত বেদনা আর মনভরা অস্বস্তি নিয়ে উঠে দাঁড়ায়, কাঁথাটা ভালোমতো জড়িয়ে নেয় শরীরে, তারপর এগোতে গিয়ে চমকে ওঠে। তার পায়ের নিচে বরফের মতো শীতল মেঝে। শালারা তার জুতো আর মোজাও খুলে নিয়ে গেছে। সে আরো অনুভব করে, মাটি নয়, পাথুরে মেঝে তার পায়ের নিচে। দেয়ালের মতোই, হিম আর শুষ্ক।
অন্ধকার চোখে সয়ে গেলেও ঘরের পরিসর আন্দাজ করতে পারে না হাসানুজ্জামান। ডানে বা বাঁয়ে ঘরটা কতদূর গেছে, বোঝার উপায় নেই। শুধু বেশ খানিকটা দূরত্বে কয়লার মিটিমিটি আগুন জ্বলছে, তার পেছনে আবার গাঢ় অন্ধকার। কোনো গুদাম ঘর হতে পারে, কোনো কারখানার স্টোর হয়তো। কিন্তু আলো নেই কেন?
"কে ভাই ঐখানে?" আবার গলা চড়িয়ে ডাকে সে, তার পা বেয়ে মেঝের হিম উঠে আসে কণ্ঠস্বর পর্যন্ত। "কে আপনি?"
গোঙানির শব্দটা আগের মতোই মৃদু হয়ে ভেসে আসে, "হুঁহুঁ!"
হাসানুজ্জামান অস্বস্তিভরে দুই পা এগোয়। কী ব্যাপার? মুখ বেঁধে রেখেছে নাকি লোকটার? গোঙাচ্ছে কেন? কথা বলে না কেন? "কে? আপনি কে? এখানে কী করেন?"
এবার দূর থেকে একটা রিনরিনে, কাঁপা কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, "আমি!"
হাসানুজ্জামান চমকে ওঠে কথাটা শুনে, কারণ কণ্ঠস্বরটা নারীর। অল্পবয়স্কা কোনো মেয়ের গলা।
এখানে মেয়ে আসবে কোত্থেকে? এরা কি নারী পুরুষ সবাইকে অজ্ঞান করে নিয়ে আসে নাকি?
হাসানুজ্জামানের বুকটা আবারও ধুকধুক করে ওঠে, রক্তস্রোতে মিশতে থাকে অ্যাড্রেনালিন। ট্যাক্সির আবছায়ায় দেখা সোনিয়ার অবয়ব আর সেই লোকটার গম্ভীর চেহারা মনে পড়ে যায় তার। এরা সাধারণ অজ্ঞান পার্টি নয়।
নানা গুজবের কথা তার একসাথে মনে পড়ে। মানুষজনকে ধরে নিয়ে গোপনে অপারেশন করে কিডনি, কলিজা খুলে বিক্রি করে দেয়া হয়, এমন একটা খবর এসেছিলো না কাগজে? হাসানুজ্জামান শুনেছে, লাশও নাকি এসিডে ধুয়ে কঙ্কাল বের করে বিক্রি করে দেয়া হয়। অনেক রকম বিজনেস নাকি আছে মানুষের বডি নিয়ে। এরা কি সেরকম কোনো পার্টি? মেয়েদের ধরে ভারতে পাচার করা হয়, সে জানে, কিন্তু সেসব মেয়েদের জোর করে বা অজ্ঞান করে ধরে আনে না কেউ, তাদের নিয়ে যাওয়া হয় বেশি বেতনে কাজের লোভ দেখিয়ে, তারপর দালালের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়, সেখান থেকে মেয়েরা চলে যায় বড় শহরের বেশ্যাপাড়ায়। কিন্তু এরা কেন অজ্ঞান করে ধরে আনছে মানুষকে?
বিদ্যুচ্চমকের মতো নিজের ব্যাগটার কথা মনে পড়ে তার। পরক্ষণেই হতাশায় ডুবে যায় হাসানুজ্জামান। জামাজুতাই যেখানে খুলে নিয়ে গেছে ব্যাটারা, পিস্তলটা যে তার নাগালের মধ্যে রেখে যাবে না, সেটা তো বলাই বাহুল্য। পিস্তলটা হাতের কাছে থাকলে ভরসা পায় সে, অন্যরকম একটা সাহস পায় বুকের ভেতর। অন্ধকার, ঠাণ্ডা ঘরের ভেতর উলঙ্গ শরীরে কাঁথামুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে হাসানুজ্জামান নতুন করে দুর্বল বোধ করে।
গোঙানির শব্দটা এবার কয়েক পর্দা চড়ে, "হুঁহুঁ! হুঁহুঁ! হুঁহুঁ!"
হাসানুজ্জামান মাপা পায়ে সাবধানে সামনে এগোয়। অন্ধকারে কোনো কিছুর সাথে ঠোকর খেয়ে বা হোঁচট খেয়ে চোট পেতে চায় না সে। কিন্তু তার কেন যেন মনে হয়, এই ঘরটা একেবারেই খালি। আর কিছু এখানে রাখা নেই।
ঘরের দরজাটা খুঁজে পেতে হবে। সম্ভাবনা শতভাগ যে দরজাটা বন্ধ থাকবে, তারপরও দেখে রাখা প্রয়োজন। এক সময় না এক সময় দরজা খুলবে ব্যাটারা, তখন একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে। স্টোররুমের জানালাগুলো সাধারণত ছাদের কাছে হয়। হাসানুজ্জামান ওপরের দিকে তাকায়, কোনো জানালার আভাস তার চোখে পড়ে না।
আলো দরকার। কয়লার আগুনে কিছু খড় দিলে আগুন পাওয়া যাবে।
হাসানুজ্জামান সাবধানে এগিয়ে জিজ্ঞেস করে, "আপনি কে? এখানে কীভাবে আসছেন?"
রিনরিনে তরুণীকণ্ঠ আবার বলে ওঠে, "আমি!"
হাসানুজ্জামান সন্তর্পণে এগোয়। কয়লার মিটমিটে আগুনের পাশে একটা অন্ধকারের স্তুপ, কেউ একজন বসে আছে আগুনের পাশে।
আগুন থেকে গজ পাঁচেক দূরে থেমে যায় হাসানুজ্জামান। "আপনি কে? নাম কী আপনার? এখানে কীভাবে আসছেন?"
আগুনের কাছেই বসে আছে মেয়েটা। হাসানুজ্জামান দেখে, তারই মতো একটা কাঁথা জড়ানো মেয়েটার গায়ে। মেয়েটার শরীরের রেখা বোঝা যাচ্ছে, মাথায় চুল অবিন্যস্ত হয়ে আছে, মাথা নিচু করে বসে আছে মেয়েটা।
হাসানুজ্জামান আরো দুই পা এগোয়। "কী নাম আপনার? বাড়ি কোথায়?"
মেয়েটা কাঁপা গলায় কী যেন একটা নাম বলে, স্পষ্ট শুনতে পায় না সে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করে হাসানুজ্জামান, "সখিনি? আপনার নাম সখিনি?"
মেয়েটা মাথা ঝাঁকায়, "হুঁ!"
হাসানুজ্জামান মাথা নাড়ে। গ্রামের মেয়েদের এমন নাম হতো আগে, এখন গ্রামেও মেয়েদের নাম রাখে নায়িকাদের নামে। "বাড়ি কোথায় আপনার?"
মেয়েটা আবার গোঙায়, "উঁ!"
হাসানুজ্জামান টের পায়, মেয়েটা শীতে কাঁপছে। একটা সন্দেহ খেলে যায় তার মাথার ভেতর। সে গলা খাঁকরে কয়েক পা সামনে এগিয়ে মেয়েটাকে ভালো মতো দেখার চেষ্টা করে। তার মতোই একটা কাঁথা গায়ে জড়িয়ে বসে আছে মেয়েটা, কাঁথার ফাঁক দিয়ে একটা ফর্সা পা দেখা যাচ্ছে হাঁটু পর্যন্ত।
এরা কি এই মেয়েটারও জামাকাপড় খুলে নিয়েছে?
হাসানুজ্জামান একটু তপ্ত বোধ করে ভেতরে ভেতরে। অন্ধকার রাতে কাঁথা জড়ানো অপরিচিতা নগ্নিকার সান্নিধ্য তার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা।
সে অভয় দেয়ার জন্যে বলে, "আমার নাম হাসানুজ্জামান। ঢাকায় থাকি, বাড়ি মানিকগঞ্জে। আপনার বাড়ি কই, বললেন না?"
মেয়েটা একটু গুটিশুটি হয়ে বসে বলে, "এইখানেই।"
হাসানুজ্জামান হেসে বলে, "এইখানে মানে? এই জায়গাটা কোনখানে?" এবং প্রশ্নটা তার মাথায় প্রথম বারের মতো বাড়ি কষায়। কোন জায়গায় আছে তারা? ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক থেকে কোনদিকে, কতদূরে এই ঘর?
মেয়েটা প্রশ্নের উত্তর দেয় না, নড়েচড়ে বসে আবার গোঙায়, "উঁ! উঁ! উঁ!"
হাসানুজ্জামান ঘরের চারদিকে তাকায়। সবদিকেই নিকষ অন্ধকার। কয়লা জ্বলছে ঘরের আরেক প্রান্তে, একটা চুলার মতো গর্তে। গর্তটা ইঁট দিয়ে পাকা করা। মেয়েটার পেছনে আবার আস্তে আস্তে গাঢ় হয়ে গেছে অন্ধকার। ঘরটা অনেক বড়, সন্দেহ নেই।
খড় এনে কয়লার ওপর ফেললে অনেক ধোঁয়া হবে। এই ঘরের দরজা জানালা কোন দিকে, তখন একটা আন্দাজও হয়তো পাওয়া যাবে। বড় ঘর, ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হওয়ার কথা না।
হাসানুজ্জামান গলা খাঁকরে বলে, "আপনাকে কখন নিয়াসছে এইখানে? আজকে? নাকি আরো আগে?"
মেয়েটা বলে, "হুঁ! হুঁহুঁ!"
হাসানুজ্জামান মনে মনে একটু বিরক্ত হয়। কী আজব রে বাবা। মাথা খারাপ নাকি ছেমরির? একটা কথারও ঠিকমতো জবাব দিতে পারে না। নামটা শুধু বলতে পারে, কোত্থেকে আসছে, কবে আসছে কিছুই বলে না ঠিকমতো।
অন্ধকারে ফুটে থাকা মেয়েটার ফর্সা পায়ের দিকে চোখ পড়তে হাসানুজ্জামানের রাগ একটু পড়ে আসে। হয়তো কড়া কোনো ওষুধ দিয়ে অজ্ঞান করেছে মেয়েটাকে, সেটার ধকল হয়তো এখনও সামলাতে পারছে না বেচারি। কিংবা হয়তো খিদে লেগেছে তার। কয়দিন ধরে এখানে আছে কে জানে?
খিদের কথা মনে হতেই নিজের পেট মোচড় দিয়ে উঠলো হাসানুজ্জামানের। কতক্ষণ ধরে এখানে আছে সে? রাতে হোটেলে খাওয়া ভাত তো হজম হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।
কয়লার আগুনের দিকে চোখ পড়তেই হাসানুজ্জামানের মনে টোকা দিলো নতুন প্রশ্ন, আগুনটা জ্বালিয়েছে কে? কয়লায় আগুন ধরতে সময় লাগে, তবে অনেকক্ষণ ধরে জ্বলে। জ্বলতে থাকা কয়লার স্তুপ দেখে মনে হয়, অনেকক্ষণ ধরেই জ্বলছে আগুন। কেউ একজন আগুনটা জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে নিশ্চয়ই।
হাসানুজ্জামান মাথা নিচু করে বসে থাকা মেয়েটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিলো, মেয়েটাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করবে না সে। এখন যা জানার, তা তাকে নিজেরই মাথা খাটিয়ে জানতে হবে।
এই ঘরের ভেতর তারা দুইজন মানুষ যখন আছে, তার মানে ঘরের একটা দরজা আছে। দরজাটা খুঁজে বের করতে হবে। তারপর সেটা দিয়ে কীভাবে বের হওয়া যায়, তা ভেবে বার করতে হবে। আপাতত এটাই প্রথম কাজ। আর এই কাজের জন্যে লাগবে আলো। আলো পাওয়ার আপাতত একটাই উপায়, কিছু খড় এনে কয়লার আগুনে ফেলে আগুনটাকে উঁচু করা, তারপর খড় পাকিয়ে মশালের মতো বানিয়ে ঘরটা ঘুরে দেখা।
হাসানুজ্জামান গলা খাঁকরে বললো, "বসেন দেখি, কী করা যায়। আপনার কি খিদা লাগছে?"
মেয়েটা খিদের কথায় একটু যেন চমকে ওঠে। তারপর মুখ তুলে বলে, "হুঁ!"
কয়লার আগুনের আবছা আলোয় মেয়েটার মুখ দেখে হাসানুজ্জামানের বুকের ভেতরে রক্ত ছলকে ওঠে একবার। চোখ বুঁজে আছে মেয়েটা, কিন্তু তার প্রতিমার মতো সুন্দর, ধারালো চেহারাটা বোঝা যাচ্ছে। মেয়েটা অনেক ফর্সা, সন্দেহ নেই। খাড়া নাক, ভরাট ঠোঁট, সুডৌল চিবুক, কিন্তু অভুক্ত মানুষের মুখে যে ক্লিষ্ট ভাব থাকে, সেটা পুরোমাত্রায় আছে।
হাসানুজ্জামান জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট চেটে বলে, "আপনি বসেন এইখানে। আমি দেখি একটু আগুন জ্বালাই।"
মেয়েটা আবার মাথা নিচু করে গোঙাতে থাকে, "উঁ! হুঁহুঁ!"
হাসানুজ্জামান পেছন ফেরে, তার খড়ের শয্যার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্যে। তখনই একটা আবছা আলো ছড়িয়ে পড়ে ঘরের ভেতর।
সে ঝট করে ঘুরে তাকায় আলোর উৎসের দিকে। দূরে, ছাদের কাছে একটা চৌকো অংশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। একটা জানালা, বাইরে থেকে সামান্য আলো আসছে ঘরের ভেতর।
হাসানুজ্জামান শুনতে পায়, মেয়েটা এখনও গোঙাচ্ছে।
হাসানুজ্জামান শরীরে কাঁথাটা জড়িয়ে একটি গিঁট মেরে নেয়। হারামীগুলি ভালো বুদ্ধিই বের করেছে, পালাতে পারলেও ন্যাংটা অবস্থায় বেশি দূর যাওয়ার উপায় নেই এই শীতের মধ্যে। মানুষ কত বদমায়েশ হতে পারে, তা সে ভালো করেই জানে। কিন্তু এই ধরনের বদমায়েশির সাথে সে পরিচিত নয় মোটেও।
আলোটা ঘরের অন্ধকার মোটেও দূর করেনি, কিন্তু অন্ধকারে থেকে হাসানুজ্জামানের চোখ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, তার সামনে ঘরের আকার মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে এসেছে এই আলোয়। অনেক বড় একটা ঘর, তার এক কোণায়, ছাদের কাছে জানালাটা। ঘরের দেয়াল এদিকে ইঁটের, ঢালাই করা নয়। এবং এদিকে ঘরটা পুরোই খালি। হাসানুজ্জামান চারপাশে তাকায়, আলোটা খুব বেশিদূর ছড়ায়নি, ঘরের বাকি অংশ অন্ধকারেই ডুবে আছে। কিন্তু তার মনে হয়, এটা একটা প্রকাণ্ড খালি ঘর, ওদিকেও কিছু নেই, খড়ের স্তুপ ছাড়া।
হাসানুজ্জামান দ্রুত পায়ে এগোয়। ইঁটের খাঁজে ভর করে যদি জানালা পর্যন্ত ওঠা যায়, তাহলে জানালা দিয়ে বের হওয়ার একটা রাস্তা পাওয়া যায় কি না দেখতে হবে। জানালাটা যথেষ্ট উঁচুতে, লাফ দিয়ে নামতে গেলে হাত-পা ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সেক্ষেত্রে কাঁথাটা ঝুলিয়ে নামতে হবে। কিন্তু কাঁথার দৈর্ঘ্যও তো বেশি নয়। অবশ্য মেয়েটার গায়ের কাঁথার সাথে তার কাঁথাটা গিঁট দিয়ে দিলে বেশ লম্বা একটা দড়ির মতো হবে, সেটার একমাথা কোথাও বেঁধে ঝুলে কিছু দূর নেমে বাকিটা পথ লাফিয়ে নামা যাবে।
কাঁথার নিচে মেয়েটার ফর্সা পা হাসানুজ্জামানের চোখের সামনে ভেসে উঠলো। তার শরীরের রক্ত উষ্ণ হয়ে উঠলো আবার। মেয়েটা অনেক সুন্দর।
মাথা ঝাঁকিয়ে মেয়েটার চিন্তা মাথা থেকে দূর করে দিলো হাসানুজ্জামান। এখন পালাতে হবে, সবার আগে ওটাই কাজ।
জোর পায়ে এগিয়ে ঘরের কোণায় গিয়ে দাঁড়ায় সে। মেঝে কিছুটা এবড়োখেবড়ো এখানে, ঘরের অন্য অংশের মতো সমতল নয়। জানালার আলো তির্যকভাবে পড়েছে ঘরের ভেতরে, এখানটায় অন্ধকার। ইঁটের দেয়ালে হাত বুলিয়ে খাঁজ খোঁজে হাসানুজ্জামান। হ্যাঁ, দেয়ালটাও এখানে অমসৃণ। কোথাও ইঁট সামান্য বেরিয়ে আছে, কোথাও আবার গর্ত। জানালা পর্যন্ত এরকম হলেই হয়।
লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে ওপরে তাকিয়ে জানালাটা দেখে সে, তারপর হাঁটুর উচ্চতায় দেয়াল থেকে একটু সামনে বেরিয়ে থাকা একটা ইঁটের ওপর পা রেখে সাবধানে নিজের শরীরের ভর চাপায় হাসানুজ্জামান। পুরনো দেয়ালের ইঁট হঠাৎ হড়াশ করে ভেঙে পড়তে পারে। এখন সেরকম কিছু ঘটলে নাগালের ভেতর পালানোর একমাত্র সুযোগটাও মাঠে মারা পড়বে। আর হাড়গোড় কয়টা ভাঙবে কে জানে?
পেছনে মেয়েটার গোঙানি শুনতে পায় সে আবারও, "উঁ! উঁ!"
পাত্তা দেয় না হাসানুজ্জামান। গুনগুন করুক মেয়েটা। আগে জানালায় পৌঁছাতে হবে।
একটু একটু করে ঘরের কোণে দুই পাশের দেয়ালে ইঁটের খাঁজে পা রেখে উঠতে থাকে সে। কিছুদূর উঠে সাবধানে হাত বাড়িয়ে খাঁজ খুঁজতে হচ্ছে তাকে, শরীরটাকে মিশিয়ে রাখতে হচ্ছে দেয়ালের সাথে। একটু ঊনিশ-বিশ হলেই টাল হারিয়ে নিচে গিয়ে পড়তে হবে তাকে। কত উচ্চতা হবে এই ঘরের? পনেরো ফুট? কুড়ি ফুট? এরকম উঁচু থেকে বেকায়দায় নিচে পড়লে হাত পা ভাঙবে নিশ্চিত।
হাসানুজ্জামান টের পায়, তার হাত আর পায়ের পেশীতে খিল ধরে যাচ্ছে। ইঁটের খাঁজে হাত রেখে উঠতে গিয়ে থরথর করে কাঁপছে তার বাহুর পেশী। এসব কাজের অভ্যাস নেই তার। সে মানুষ হিট করে নির্জনে বা গোপনে, সেখান থেকে শান্তভাবে নিরীহ পথচারীর মতো পিস্তল লুকিয়ে হেঁটে চলে আসে। দৌড়ঝাঁপ তাকে তেমন একটা করতে হয় না এই কাজে। দেয়াল বেয়ে ওঠা তো দূরের কথা।
হাসানুজ্জামান দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিজ্ঞা করে, এখান থেকে ভালোয় ভালোয় উদ্ধার পেয়ে গেলে সে নিয়মিত ব্যায়াম করবে, সকালে উঠে দৌড়াবে কোনো পার্কে।
ওপরে ওঠার সময় নিচের দিকে তাকাতে হয় না, কে যেন বলেছিলো, স্মরণ করতে পারে না সে। ঘাড় আর পিঠের পেশীতে ব্যথাটা আবার কামড় দিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়ে যায় তাকে। হাসানুজ্জামান দরদর করে ঘামে, পিপাসায় তার গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে, টের পায় সে। ঘরের ভেতরে কোথাও কি পানি আছে? একটু পানি খাওয়া বড় প্রয়োজন।
থেমে থেমে, বিশ্রাম নিয়ে জানালা থেকে একটু নিচে এসে হাতে মসৃণ দেয়ালের স্পর্শ পায় হাসানুজ্জামান। এবড়োখেবড়ো ইঁট আর নেই, মসৃণ ঠাণ্ডা পাথুরে সমতল দেয়াল তারপর।
একটা অসহনীয় ক্রোধ তার মাথার ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে যায়। শুয়োরের বাচ্চা, দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে গালি দেয় সে। হারামীর দল একেবারে তীরের আগে তরী ডোবানোর কায়দা করে রেখেছে!
খুব সন্তর্পণে ইঁটের শেষ খাঁজটায় পা রেখে আরেকটু ওপরে ওঠে হাসানুজ্জামান। জানালার নিচের প্রান্ত ছাড়িয়ে কোনোমতে মাথাটা ওপরে তুলতে পারে সে।
জানালার ওপারে আকাশ দেখার প্রত্যাশা ছিলো তার মনে, কিন্তু জানালার ওপাশে একটা ছোটো ঘর। ঘরটার অর্ধেক দেখা যাচ্ছে কেবল। বামে একটা সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরে, আর ডানে একটা সোফা দেখা যাচ্ছে খানিকটা। ঘরটায় আলো জ্বলছে, কিন্তু সে আলো ঘরের অন্য প্রান্তে, এখান থেকে দেখার উপায় নেই। আর জানালাটা সাধারণ জানালার মতো নয়। একটা কাঁচের পাত দেয়ালের মধ্যে বসানো শুধু, কোনো খাঁজ নেই, কব্জা নেই, কপাট নেই। হাসানুজ্জামানের হাত ইঁটের খাঁজ আঁকড়ে ধরে আছে, তার শরীরের অর্ধেক ভর তার হাতের ওপর, সে হাত আলগা করার সাহস পায় না। কাঁচের জানালায় মাথা ঠোকে সে, ঢপঢপ শব্দ হয়। সাধারণ কাঁচ নয়, টের পায় হাসানুজ্জামান।
জানালার ওপাশে দেখা ঘরটা ভালোমতো দেখার চেষ্টা করে সে। সোফায় কেউ বসে নেই, কিন্তু একটু পর পর নীলচে আলো এসে পড়ছে সোফার গদির ওপর, সম্ভবত টিভি দেখছে কেউ। সিঁড়িটার পাশে একটা সাইকেলের চাকা দেখতে পাচ্ছে সে, সাইকেলটা দেয়ালে হেলান দিয়ে রাখা। সাইকেল এত উঁচুতে ঘরের ভেতরে তুলে এনে রেখেছে কেন?
প্রশ্নের উত্তরটা তাকে চাবুকের মতো আঘাত করে। হাসানুজ্জামান হঠাৎ বুঝতে পারে, এই বিশাল ঘরটা মাটির নিচে। এটা একটা পাতালঘর।
ধারণাটা তাকে দুর্বল করে তোলে হঠাৎ। এই লোকগুলো তাকে একটা পাতালঘরে এনে ফেলে রেখেছে একটা মেয়ের সাথে। এতবড় পাতালঘর যারা ম্যানেজ করতে পেরেছে, তারা সাধারণ অজ্ঞান পার্টি নয়। এরা অনেক গভীর জলের শিকারী মাছ, সে এদের তুলনায় নিতান্তই চুনোপুঁটি। এরা নিশ্চয়ই তার ব্যাগ খুলে পিস্তলটা পেয়েছে। এরা জানে, হাসানুজ্জামান সাধারণ কেউ নয়। নিশ্চয়ই এরা যথেষ্ট তৈরি হয়েই আসবে আবার। উলঙ্গ শরীরে ক্ষুধা আর পিপাসায় কাবু হাসানুজ্জামান কাঁথা জড়িয়ে কীই বা প্রতিরোধ করতে পারবে? আক্রমণ করা তো আরো দূরবর্তী বিকল্প বলে মনে হচ্ছে এখন।
হাসানুজ্জামান হিম দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে। তৃষ্ণায় তার বুক জ্বলছে। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে, বুদ্ধি হারালে চলবে না।
আবার মাথা তুলে ঘরের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করে সে। জানালায় কোনো ভারি কিছু দিয়ে আঘাত করে সেটা ভাঙা যাবে কি? কাঁচটা অনেক মোটা, খালি হাতে আঘাত করে ভাঙার প্রশ্নই আসে না। যদি ভাঙতেও পারে সে, লোকগুলো শুনতে পাবে, পালানোর সুযোগ পাবে না সে। জানালা দিয়ে পালানো যাবে না। দরজাটা খুঁজতে হবে, যে দরজাটা দিয়ে ওরা তাকে আর সখিনিকে ভেতরে ফেলে রেখে গেছে।
সখিনির গোঙানি শুনতে পায় হাসানুজ্জামান, ধীরে ধীরে অতি সাবধানে নিচে নেমে আসতে থাকে সে। পাঁজরে বাড়ি দিচ্ছে হৃৎপিণ্ড, একটু্ পানির জন্যে চিৎকার করছে শরীরের সব কোষ। এরা ঘরের কোণে আগুন জ্বালিয়ে রেখে গেছে, একটু পানি কি রেখে যায়নি কোথাও?
লাফিয়ে নিচে নামার ইচ্ছাটা বহু কষ্টে দমন করে সাবধানে নিচে নেমে এলো হাসানুজ্জামান। মাটিটা এবড়োখেবড়ো এখানে, কোথাও কোনো ধারালো কিছুর ওপর লাফিয়ে পড়লে পায়ে চোট পেতে পারে সে। এখন খুব সাবধানে থাকতে হবে, আহত হলে চলবে না।
সখিনি আগুনের পাশেই বসে আছে। হাসানুজ্জামান কপাল থেকে ঠাণ্ডা ঘাম মোছে কাঁথার খুঁট দিয়ে। দেরি করা চলবে না। যত সময় কাটবে, তত কাবু হয়ে পড়বে তারা। মেয়েটা তো কথাই বলতে পারছে না খিদের চোটে। আগুন জ্বালিয়ে দরজাটা খুঁজতে হবে এখন।
হাসানুজ্জামান হনহন করে এগিয়ে যায় খড়ের বিছানার কাছে। দরজাটা মনে হয় এপাশেই কোথাও হবে। অন্তত উল্টোদিকে কোনো দরজা নেই, টের পেয়েছে সে। একটা দরজা থাকবে এদিকে কোথাও, তারপর একটা সিঁড়ি। দরজা খুললেই চলবে না, সেটার ওপারে কারা পাহারায় আছে কে জানে, তাদেরও ফাঁকি দিয়ে পালাতে হবে।
অন্ধকারের হাতড়ে হাতড়ে খড়ের স্তুপ খুঁজে বের করে দুই হাতে পাঁজাকোলা করে এক স্তুপ খড় তুলে নিলো হাসানুজ্জামান। খড় পাকিয়ে মশাল বানাতে হবে আগে।
দূর থেকে সখিনির গোঙানি ভেসে আসে, "উঁ!"
হাসানুজ্জামান খড়ের স্তুপ হাতে করে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় কয়লার আগুনের দিকে। এক বিপুল উদ্বেগ তার ভেতরে একটু একটু করে বড় হচ্ছে, কুলকুল করে ঘামছে তার শরীর। বিপদ, অনুভব করে সে, অনেক বিপদের মাঝে রয়েছে সে।
সখিনি চুপ করে বসে আছে, তাকে না ঘাঁটিয়ে কয়লার আগুনের ওপর সাবধানে এক মুঠো এক মুঠো করে খড় চাপায় হাসানুজ্জামান। খড়টা শুকনো, পলকেই লকলকে আগুন জ্বলে ওঠে কয়লার স্তুপের ওপর। এক মুঠো খড় হাতে নিয়ে পাকিয়ে দড়ির মতো তৈরি করার চেষ্টা করে সে, ওটাতে আগুন ধরিয়ে মশাল বানাতে হবে। শুকনো খড় খুব দ্রুত জ্বলে ওঠে, শক্ত করে পাকিয়ে নিলে পুড়তে সময় লাগবে।
আগুনটা উঁচু হয়ে উঠতেই সখিনি চমকে ওঠে, সে ছিটকে সরে যায় দূরে। সখিনির ক্ষিপ্রতা হাসানুজ্জামানকে বিস্মিত করে। মেয়েটা আগুন ভয় পাচ্ছে কেন এই শীতের মধ্যে?
বুকের ভেতর পিপাসাটা আবার টোকা দেয়, হাসানুজ্জামান সখিনিকে বলে, "এইখানে কোথাও পানি আছে? খাওয়ার পানি?"
সখিনি মাথা দোলায়। "উঁ!"
হাসানুজ্জামান বড় শ্বাস নেয়, তার ছাতি ফেটে যাচ্ছে তৃষ্ণায়। হাতের খড়-পাকানো মশালটার এক প্রান্ত আগুনে গুঁজে দেয় সে, তারপর বাকি খড়টুকু চাপিয়ে দেয় কয়লার আগুনের ওপর।
গনগনে আগুনের শিখায় অনেকখানি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ঘরের এ প্রান্ত, হাতে জ্বলন্ত মশাল নিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় হাসানুজ্জামান।
সে দেখে, সখিনি উঠে দাঁড়িয়েছে।
হাসানুজ্জামান সবিস্ময়ে দেখে, সখিনি অনেক লম্বা। তার মাথা ছাড়িয়ে আরো হাতখানেক ওপরে উঠে গেছে সখিনির মাথা। প্রায় সাড়ে ছয়ফুটের মতো লম্বা মেয়েটা, কাঁথাটা তার শরীরকে ঠিকমতো ঢাকেনি, ফর্সা একটি ঊরু অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, কাঁথার আড়াল থেকে বেরিয়ে আছে সুপুষ্ট একটি স্তনের বলয়ভাগ।
কোথাও সমস্যা আছে, হাসানুজ্জামানের মস্তিষ্ক তাকে ফিসফিসিয়ে বলে।
সখিনির পেছনে আগুনের শিখায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ঘরের অনেকখানি। ঘরটা শূন্য। কোনো আসবাব নেই, কিছু নেই, শুধু দেয়াল আর মেঝে। সেই মেঝেতে সখিনির ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে। সেই ছায়ার মধ্যে নড়ছে একটা কিছু।
মশালটা বাড়িয়ে ধরে হাসানুজ্জামান। আগুনের শিখায় সখিনির অপূর্ব মুখশ্রী উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
হাসানুজ্জামান প্রথমবারের মতো দেখতে পায়, সখিনি আসলে ফর্সা নয়। সখিনির শরীরটা ফ্যাকাসে, মৃত মানুষের মতো। মেয়েটা সটান দাঁড়িয়ে আছে, তার দীর্ঘ হাত দু'টি শিথিল ঝুলছে শরীরের দুই পাশে, কিন্তু সেই হাতের শেষ প্রান্তে লম্বা আঙুলগুলো বাঁকা হয়ে আছে থাবার মতো, আঙুলের শেষ প্রান্তে নখ। মানুষের নখের মতো নয় সে নখ, শ্বাপদের পায়ের নখের মতো।
সখিনির মুখে বিচিত্র একটা হাসি ফুটে আছে, দেখে হাসানুজ্জামান। মেয়েটার চোখ বন্ধ।
খড়গুলো পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে, আগুনের উচ্চতা একটু একটু করে নিচে নামছে, সখিনির পেছনে আস্তে আস্তে এদিকে এগিয়ে আসছে ঘরের অন্ধকার। সেই ক্রমবর্ধমান অন্ধকারে সখিনির ছায়ায় নড়তে থাকা জিনিসটা কী, সেটা বুঝতে পেরে হাসানুজ্জামানের হাঁটুর কাছটা দুর্বল হয়ে ওঠে।
একটা লেজ।
সখিনির কোমরের কাছে একবার এসে ঝাপটা মারে লেজটা, সাপের লেজের মতো।
সখিনি প্রথমবারের মতো চোখ খুলে তাকায় হাসানুজ্জামানের দিকে। মশালের আলোয় সে চোখ দেখে হাসানুজ্জামানের শরীর কেঁপে ওঠে থরথর করে। সখিনির চোখে সাদা অংশের মাঝে উল্লম্ব সরু একটা মণি, মানুষের চোখের মতো নয়, সাপের চোখের মতো।
সখিনির মুখের বিচিত্র হাসিটা ক্রমশ ভয়াল হয়ে ওঠে, হাসানুজ্জামান দেখতে পায়, ধীরে ধীরে হাঁ করছে সে। তীক্ষ্ণ দুই পাটি শ্বদন্ত বেরিয়ে আসে, তার মাঝে দুই সারি এবড়ো খেবড়ো হলদে দাঁত। মেয়েটার অনিন্দ্য সুন্দর চেহারাটাকে ঢেকে দেয় অপার্থিব জান্তব হাসিটা।
একটা খলখল হাসিতে ভরে ওঠে ঘর। সে হাসি মানুষের নয়।
একই সাথে ঘরের ছাদের কাছে জ্বলে ওঠে একটা আলো।
হাসানুজ্জামান এবার সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পায়। বিশাল একটি ঘরের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সে, তার মুখোমুখি সখিনি নামের ঐ জিনিসটা। তার শরীর থেকে কাঁথা খসে পড়েছে, ফ্যাকাসে উলঙ্গ এটা শরীর বেরিয়ে পড়েছে। শরীরটা মানুষের, দীর্ঘদেহী ফ্যাকাসে কোনো তরুণীর, কিন্তু শরীরের অনুপাত মানুষের মতো নয়। অনেক দীর্ঘ একটি উদর এই জীবটির।
সখিনি তীক্ষ্ণ, কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে ওঠে, "খিদা!"
হাসানুজ্জামান অনুভব করে, তার মাথার পেছনের সব চুল খাড়া হয়ে উঠেছে। এক অপরিসীম আতঙ্কে তার হাত থেকে খড়ের মশালটা মেঝেতে পড়ে যায়।
সখিনি দুই পা সামনে বাড়ে, তারপর পা ফাঁক করে দাঁড়ায়। হাসানুজ্জামান সম্মোহিতের মতো দেখে, সখিনির দুই পায়ের ফাঁকে বাতাসে ছোবল দিচ্ছে লেজটা। তার হাত দুটো কনুইয়ের কাছে একটু ভাঁজ হয়ে এসেছে, আঙুলগুলো উদ্যত, তাদের প্রান্তে কর্কশ, পাথুরে নখ।
হাসানুজ্জামান অস্ফূটে বলে, "শাঁখিনী!"
সখিনি নয়। জীবটা তার আসল পরিচয়ই দিয়েছিলো তখন। শাঁখিনী। ডাকিনী-হাঁকিনী-শাঁখিনী, সেই শাঁখিনী। যারা মানুষ টেনে নিয়ে যায় মাটির নিচে, গাছের গর্তে, জলের নিচে, তারপর কড়মড়িয়ে খায়। ছেলেবেলায় অনেক গল্প সে শুনেছে বটে। ছিনতাই করার সময় শাঁখিনীদের গল্পও সে করেছে তার শিকারদের সাথে।
সখিনি, বা শাঁখিনী, আরও এক পা এগিয়ে এসে একটু ঝুঁকে দাঁড়ায়। তার ঊরুর পেশীর দিকে তাকিয়ে হাসানুজ্জামান বোঝে, লাফ দেবে জীবটা।
হাসানুজ্জামান মেঝে থেকে মশালটা কুড়িয়ে ছুঁড়ে মারে শাঁখিনীর মুখের ওপর, তারপর ঘুরে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট লাগায় ঘরের কোণের দিকে। জানালাটার কাছে পৌঁছাতে হবে, যে করেই হোক।
পেছনে একটা তীব্র আর্তনাদ শুনতে পায় সে, কিন্তু ঘুরে তাকায় না। ঘরের কোণে এবড়োখেবড়ো ইঁটের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হাসানুজ্জামান, হাত আর পায়ে খামচে ধরে দেয়াল বেয়ে উঠতে থাকে। যে করেই হোক জানালার কাছে পৌঁছতে হবে।
দেয়াল বেয়ে উঠতে উঠতে হাসানুজ্জামানের মস্তিষ্ক আবার ফিসফিস করে ওঠে। কিছু একটা ঠিক নেই।
বাজার নেই, বলেছিলো সেই লোকটা। সোনিয়াকে বলেছিলো বাজার করতে। কার জন্যে বাজার?
হাসানুজ্জামানের বুকে বাড়ি খাচ্ছে তার হৃৎপিণ্ড, হাঁপরের মতো হাঁপাতে হাঁপাতে দেয়াল বেয়ে উঠতে থাকে সে। মেঝেতে থপথপ শব্দ শুনতে পায় হাসানুজ্জামান, শব্দটা দ্রুত এগিয়ে আসছে এদিকে। পেছন ফিরে তাকায় না সে, মরিয়া হয়ে উঠতে থাকে দেয়াল বেয়ে। ইঁটের খাঁজে লেগে থেঁতলে যাচ্ছে তার হাত আর পায়ের আঙুল, কিন্তু হাসানুজ্জামান থামে না, সারা দেহের শক্তি সম্বল করে সে উঠতে থাকে।
এটা একটা পাতালঘর। এই ঘরে একটা শাঁখিনী আছে। এই ঘরে তাকে নগ্ন করে ফেলে রেখে গেছে ওরা। হাসানুজ্জামানকে তার মন ফিসফিস করে বলে, এই শাঁখিনীর জন্যেই বাজার করে এনেছে সেই লোকটা, সোনিয়া আর কালো ক্যাবের ড্রাইভার। বাজার সে নিজে। শাঁখিনীর জন্যে খাবার।
হাসানুজ্জামান দেয়ালে নখের কর্কশ আঁচড়ের শব্দ শুনতে পায়, তার শরীরের সব রোম উদ্যত হয় আতঙ্কে। দেয়াল বেয়ে উঠে আসছে শাঁখিনী, তার পিছু পিছু।
একটা কর্কশ হুঙ্কার ঘরের ভেতরটাকে কাঁপিয়ে তোলে, "খিদা!"
হাসানুজ্জামানের চোখ ফেটে জল গড়ায়, সে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে আসে জানালা বরাবর।
কাঁচের ওপাশে তিনটা শান্ত, মনোযোগী মুখ দেখতে পায় সে। সেই লোকটা, তার শক্ত চোয়াল, চোখে নির্লিপ্ত দৃষ্টি। তার বাম পাশে দাঁড়িয়ে ট্যাক্সির চালক, একই রকম ভাবলেশহীন চেহারা, কিছু একটা চিবোচ্ছে সে। পান? চুইয়িং গাম? লোকটার ডান পাশে কাঁচের জানালার সাথে কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সোনিয়া, তার পরনে রাতের পোশাক। সোনিয়ার মুখে একটা দুষ্টু হাসি, চোখে সরীসৃপের ক্রুরতা নিয়ে গভীর অভিনিবেশ নিয়ে সে দেখছে পাতালঘরের ভিতরের দৃশ্য।
হাসানুজ্জামান কপাল ঠোকে জানালায়, তারপর ডান হাত তুলে কিল মারে সে মোটা কাঁচের ওপর।
"বাঁচান!" চিৎকার করে কেঁদে ওঠে সে। "আল্লাহর দোহাই লাগে, বাঁচান আমারে! ভাই গো, বাঁচান গো ভাই! বাঁচান!"
হাসানুজ্জামানের কয়েক ফুট নিচে ঘড়ঘড়ে কর্কশ একটা রুদ্ধ অস্ফূট হুঙ্কার ঘরের কোণকে অনুরণিত করে, "খিদা! খিদা! খিদা!"
হাসানুজ্জামান শরীরের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে ঘুষি মারে কাঁচের ওপর, কিন্তু আগের মতোই শীতল, কঠিন, বিকারহীন থেকে যায় কাঁচের পাত। ওপাশে দাঁড়ানো তিনটি মানুষের মুখের অভিব্যক্তিতেও কোনো পরিবর্তন হয় না।
হাসানুজ্জামান উপলব্ধি করে, এই দৃশ্য এরা বহুদিন ধরে দেখছে। এরা জানে, এমনটা হয়। এরা জানে, এমনটাই হয়।
তিনজনই একটু ঝুঁকে আসে সামনে। সোনিয়া জিভ বের করে তার ঠোঁট চাটে, ট্যাক্সি ড্রাইভার চিবানো বন্ধ করে ঢোঁক গেলে, আর মাঝখানের লোকটার মুখে ফুটে ওঠে একটা পাতলা হাসি।
একটা ধারালো থাবা প্রচণ্ড হ্যাঁচকা টানে হাসানুজ্জামানকে খসিয়ে আনে দেয়াল থেকে। যন্ত্রণা নয়, একটা বিষাদ গ্রাস করে হাসানুজ্জামানকে, অভিকর্ষের হঠাৎ অস্তিত্ব বিষাদকেও মুছে দেয় তারপর।
তিন জোড়া চোখ ওপরে চকচক করে ওঠে, নিচে পাতালঘরের মেঝেতে হাসানুজ্জামানকে ছিঁড়েখুঁড়ে খায় শাঁখিনী।



কাজী আনোয়ার হোসেন সম্পাদিত রহস্যপত্রিকার মার্চ, ২০১৩ সংখ্যায় গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।