Tuesday, January 24, 2012

পত্রিকার দৈনিক দৈন্য: ভারতীয় বিনোদনযন্ত্রে তেল দেয়া থামান


আনিসুল হক বাংলাদেশের জনপ্রিয় কলামিস্ট ও চলচ্চিত্রনাট্যকার। ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত কৌতুক দিয়ে পত্রিকার আধপাতা বোঝাই করে তিনি রাজনৈতিক স্যাটায়ার লেখার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছেন অনেকদিন ধরে। পাশাপাশি তিনি নিজেও কিছু কৌতুক সৃষ্টি করেন, সেগুলো আরো উপভোগ্য হয়। যেমন, গরুর রচনা লেখার মতো করে সবকিছুতেই তিনি নিজের প্রভুখণ্ড (মাস্টারপিসের বাংলা আর কি) "মা" উপন্যাসটির বিজ্ঞাপন করেন। মুক্তিযোদ্ধা কাজী কামাল উদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়েও আলগোছে পাঠককে জানিয়ে দেন, তাঁর "মা" উপন্যাসটি একেবারে দিল্লি থেকে ইংরেজিতে অনূদিত হচ্ছে [১]। সাথে "মা" উপন্যাস লিখতে গিয়ে কিছু বাহাইন্ড দ্য সিনস আখ্যান। জলেস্থলেঅন্তরীক্ষে সব প্রসঙ্গেই তিনি বাবা লোকনাথের মতো "মা" উপন্যাসটিকে টেনে আনতে প্রভূত পারঙ্গমতা অর্জন করেছেন। প্রথম আলোতে শাহাদুজ্জামানও আনিসুল হকের দেখাদেখি জার্নাল লেখার ছলে "ক্রাচের কর্নেল" উপন্যাসটির বিজ্ঞাপন করা শুরু করেছিলেন [৬], কিন্তু এই কাজে আনিসুল হকের মতো লম্বা ইনিংস খেলার ধৈর্য বা রুচি সম্ভবত তাঁর হয়নি, তিনি দুয়েক পশলা বিজ্ঞাপন করেই ক্ষান্ত দিয়েছেন। আনিসুল ভাইয়া "মা"-কে বিজ্ঞাপিত করছেন বছরের পর বছর ধরে। সম্ভবত এরচেয়ে মহত্তর কিছু লেখার আশা তিনি আর করেন না। প্যারিসের যেমন আইফেল টাওয়ার, নিউইয়র্কের যেমন স্ট্যাচু অব লিবার্টি, আনিসুল হকেরও তেমনি "মা"।
আমি সবাইকে আহ্বান জানাই, আপনারা "মা" উপন্যাসটি কিনুন। এটি মন দিয়ে পড়ুন। এর প্রশংসা করুন। বাংলা একাডেমী ও অন্যান্য গণ্যমান্য মুরুব্বিরা "মা" উপন্যাসটিকে পুরস্কৃত করে আনিসুল হককে বছরের পর বছর ধরে কলাম লেখার অভিনয়ে এর বিজ্ঞাপন-ঢোলটি বাজানোর খাটনি থেকে নিষ্কৃতি দিন। এতে তিনিও আত্মবিপণনের গ্লানি থেকে মুক্তি পাবেন, কলামটিকে বিজ্ঞাপনমুক্ত রেখে দেশ ও দশ নিয়ে মনোনিবেশ করতে পারবেন, কিংবা অন্যসব গুরুত্বপূর্ণ লেখার জন্যে জায়গা ছেড়ে দিতে পারবেন। উইন-উইন সিচুয়েশন পাবো আমরা।
আপনারা হয়তো ভাবছেন, আমি আনিসুল ভাইয়ার বদনাম করার জন্যেই লিখতে বসেছি। ওনার কৌশলেই দেখাচ্ছি মুরগি আর খাওয়াচ্ছি ডাল। না, প্রিয় পাঠক ও অধিকতর প্রিয় পাঠিকারা আমার! আমি আনিসুল ভাইয়াকে পছন্দ করি বাংলাদেশে ভারতীয় বিনোদনযন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘকালব্যাপী অবস্থানের কারণে। পত্রিকায় একমাত্র তাঁকেই নিয়মিত ভারতীয় চ্যানেল-সিনেমার কুপ্রভাব নিয়ে লিখতে দেখি। বাংলাদেশের সংস্কৃতির ইজারাদারের সংখ্যা কম নয়, কিন্তু ঐ কেষ্টুবিষ্টুরা এ ব্যাপারে আসমানে খোদার মতোই নীরব ও মৌনতাপ্রিয়। আনিসুল হক কিছু বি-গ্রেড সিনেমার চিত্রনাট্যকার হতে পারেন, কিন্তু তাঁর উদ্বেগ আর এ নিয়ে তাঁর সরবতা এ-গ্রেডের [২]।
এর আগেও আনিসুল হক ঢাকার বিলবোর্ডে ভারতীয় চলচ্চিত্র তারকাদের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি নিয়ে বলিষ্ঠ আপত্তি তুলেছিলেন, আমাদের দর্শকমানসের ওপর ভারতীয় চ্যানেলগুলোর কুপ্রভাব নিয়ে তিনি কিছুদিন পরপরই আমাদের কাছে অরণ্যে রোদন করেন। এই অবস্থানে তাঁর তুল্য অন্য কোনো লেখককে আমাদের পত্রিকায় সরব দেখি না। হতে পারে সেটা আমারই অজ্ঞতা, অনেক লেখকই হয়তো এসবের বিপক্ষে বলে বলে ফাটিয়ে ফেলেন, আমি হয়তো দেখতে ব্যর্থ হই, কেবল আনিসুল ভাইয়াকেই দেখি। আপনাদের সন্ধানে লিঙ্ক থাকলে আমার অজ্ঞতা দূর করবেন, এই আশা রাখি।
এই একটি কাজের জন্যে আনিসুল হককে আমি অকুণ্ঠ প্রশংসায় আক্রান্ত করতে চাই। বাংলাদেশের অসংখ্য পাতলাবই পাঠক যাঁকে ঈশ্বরজ্ঞান করেন, সেই হুমায়ূন আহমেদ পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারতীয় চলচ্চিত্র ঢোকানোর সমর্থনে কলম ধরেছিলেন [৩], আর আনিসুল হক সাহস করে এগিয়ে এসে মৃদু গলায় হলেও এ ব্যাপারে প্রতিবাদ করেছিলেন [৪]। লেখক-কলামিস্টরা প্রায়শই অনলগর্ভ সব কলাম প্রসব করেন, কিন্তু এই ইস্যুতে সবাই বিশ্বনাগরিক হয়ে যান, একটা সৌম্য ঋষিজনোচিত নীরবতা পালন করেন। ব্যতিক্রম আনিসুল হক। তাঁকে সাধুবাদ জানাই।
কিন্তু পত্রিকায় কাজ করতে গেলে সম্ভবত মাঝেমধ্যে স্ববিরোধী আচরণ করতে হয়। মুক্তিযুদ্ধে আজাদের মা-কে নিয়ে উপন্যাস লেখা আনিসুল হককেই যেতে হয় মুক্তিযুদ্ধের মুখে জুতো মারা তৃতীয় শ্রেণীর চলচ্চিত্র মেহেরজানের প্রোমোশনের অংশ হিসেবে অভিনেত্রী জয়া বচ্চনের সাক্ষাৎকার নিতে [৫]। জয়া বচ্চনের সেই সাক্ষাৎকার প্রকারান্তরে এই কদর্য সিনেমাটির ভুঁইফোঁড় নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেনের স্তুতির ছদ্মবেশ। কলম ধরতে হয় আনিসুল ভাইয়াকেই। আমি এ পর্যন্ত কোথাও একাত্তরের নির্যাতিতাদের চরম অসম্মান করে নির্মিত এই চলচ্চিত্র নিয়ে আনিসুল হকের মৃদুতম আপত্তি, সমালোচনা বা তিরস্কার দেখিনি। সিনেমাটি নিয়ে প্রথম আলো যে নজিরবিহীন প্রচারণা করেছে, একই দিনে দর্শকের সমালোচনা ও নির্মাতার জবাব ছাপিয়ে সাংবাদিকতার আলখাল্লা তুলে ভেতরের ন্যাংটা চেহারা দেখিয়ে দিয়েছে, তাতে বোঝা যায়, এর সমর্থন প্রথম আলোর উঁচু পর্যায়ে, যাকে টপকে মুক্তিযোদ্ধা আজাদের মাকে নিয়ে উপন্যাস ফেঁদে বসা আনিসুল হকের কিছু বলার সাধ্য হয়তো নেই। লেখকের নানা সীমাবদ্ধতা থাকে, তাই আনিসুল ভাইয়ার এই অক্ষমতাকে আমরা দ্রুত কার্পেটের নিচে চাপা দিয়ে দিতে চাই। দেখতে চাই, তিনি মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা আজাদের মাকে নিয়ে লেখা তাঁর উপন্যাস "মা"-এর ঘন ঘন বিজ্ঞাপন করছেন। বীরাঙ্গনাদের বিদ্রুপ করে নির্মিত মেহেরজান নিয়ে তাঁর হিরন্ময় নিস্তব্ধতাকে আমরা সহ্যসীমার ভেতরে থাকা কাপুরুষতা হিসেবে ক্ষমা করে দিতে পারি।
কিন্তু ভারতীয় টিভি সিরিয়াল আর সিনেমার অত্যাচার নিয়ে আনিসুল হকের বলিষ্ঠ প্রতিবাদ তাঁর ডেস্ক থেকে কয়েক মিটার দূরে বিনোদন পাতার কাণ্ডারীদের কান জয় করতে পারছে না, কিংবা কান জয় করতে পারলেও মন জয় করতে পারছে না। দেশের সবচেয়ে বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছে যাওয়া এই পত্রিকাটিতে প্রতিদিন ভারতীয় অনুষ্ঠানের সময়সূচি আর ভারতীয় তারকাদের কিচ্ছা ছাপা হয়। এই জিনিস চলে দৈনিক। প্রতিটি দিন কোনো না কোনো ভারতীয় তারকার বগল বা পেট মুদ্রিত হয় এখানে। শুধু প্রথম আলোকেই কেন দোষ দেবো আমরা, কোনো জাতীয় দৈনিকই কি এই রুচির দৈন্য থেকে মুক্ত? আমি জানি না, আমাকে আলোকিত করুন।
পত্রিকাগুলো আমাদের বদলে যেতে বলে রোজ রোজ, আমরা কি আশা করতে পারি, তারা নিজেরা বদলানোর খুব সহজ একটা পদক্ষেপ নেবে? পত্রিকায় ভারতীয় সিনেমা-অনুষ্ঠান-তারকাদের উপস্থিতি কমিয়ে শূন্যে আনতে পারবেন তারা?
অজুহাত হিসেবে বলা যায়, দর্শক দেখে বলেই তারা এসব ছাপেন। কিন্তু সেটা নিতান্তই অজুহাত। পত্রিকার কাজ শুধু দর্শক পাঠকের চাহিদা যোগানো নয়, জনরুচি নির্মাণও পত্রিকার কাজ। জনরুচিতে দীর্ঘমেয়াদে ভারতীয় অনুষ্ঠান-সিনেমা-তারকাদের গ্রহণযোগ্যতা নির্মাণে বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলির ভূমিকা অন্যতম। আনিসুল হকের মতো কলামিস্টেরা অরণ্যে রোদন করে কুর্তা ভিজিয়ে ফেলেও লাভ নেই, যদি পরিবর্তনটা তারা নিজেদের মিডিয়া হাউস থেকে শুরু করতে না পারেন। নিজের পত্রিকায় পাতা ভরে ভারতীয় তারকা কী খায় কোথায় ঘুমায় এইসব ফালতু খবর ছাপিয়ে মানুষকে ভারতীয় বিনোদনের ব্যাপারে সংযমী আর দেশমুখী হতে বলা যায় কি? ভণ্ডামি হয়ে যায় না?
আজকের নাজুক পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি, আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে গত পনেরো বছরের ফসল আজ আমাদের ঘরে ঘরে। পরিস্থিতি পাল্টাতে হবে আপনাদেরই সক্রিয় বর্জনের মাধ্যমে। বাংলাদেশের তাবত জাতীয় দৈনিকের প্রতি করজোড়ে অনুরোধ করি, ভারতীয় বিনোদনযন্ত্রে তেল দেয়া থামান (শিরোনামে ব্লোজব লিখেছিলাম, সুরুচির স্বার্থে সেটা কেটে তেল লিখলাম, যদিও তারা যা দেন সেটা তৈলাধিক মনোরম সার্ভিস)।
আনিসুল হকের প্রতি আবারও নতশির সাধুবাদ, ভারতীয় বিনোদনযন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁর নিয়মিত প্রতিবাদী অবস্থানের জন্য।


তথ্যসূত্র:

2 comments:

  1. হিমু,
    লে-আ্‌উট এর সমস্যাটা কি ঠিক করা যায়? ডান থেকে দ্বিতীয় কলাম (প্রকাশিত বই, হিট কাউন্ট, ইত্যাদি)মূল লেখার উপরে চলে আসছে।

    ReplyDelete
  2. ঠিক করে দিলাম। বিন্যাসপ্রমাদের জন্যে দুঃখিত।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।