Saturday, January 21, 2012

আসুন, ১ মার্চ ভারত বনধ করি


প্রথমে একটা ভিডিও দেখি আমরা। এটি ইতিমধ্যেই বহুলপ্রচারিত, এক গরুচালানীকে ধরে বিবস্ত্র করে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফের কয়েক জওয়ান, তার এগারো মিনিটব্যাপী অসম্পাদিত দৃশ্য।
পশ্চিম বাংলার অনন্দবজর পত্রিকায় [১] এই ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পেছনে পাকিস্তানী গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের কালো হাত থাকার আশঙ্কা ব্যক্ত হয়েছে। খবর পড়ে নয়াদিল্লির ভাবনা যা জানা যায়, তা হচ্ছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মিষ্টি পড়শীয়া প্রেমের বৃহস্পতি যখন তুঙ্গাভিমুখী, তখন পাড়ার যমদূত মস্তান দাদা হয়ে আইএসআই এই উলঙ্গ চলচ্চিত্র ছড়িয়ে দুটি প্রেমিক হৃদয়কে আহত করার চক্রান্ত চালাচ্ছে। অনন্দবজর যুক্তি হিসেবে সীমান্তের ঐ অঞ্চলে মৌলবাদী শক্তি, বাংলাদেশের ভেতরে দৌড়ের ওপর থাকা জামাত আর কলকাতায় পাকিস্তানী হাই কমিশনার শাহিদ মালিকের আগমনকে তুলে ধরেছে।
কিন্তু অনন্দবজরের রিপোর্টে বিএসএফের এই মারধরের সমালোচনার কোনো গন্ধ নেই, তার ভিডিও ছড়িয়ে পড়া নিয়েই তাদের যত মাথাব্যথা। সুরটা এমন, নাহয় ন্যাংটা করে মেরেছেই, তাই বলে ভিডিও ছড়িয়ে দিবি রে পাগ্লা?
আমরা দুইদিন পরপরই সীমান্তে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশী নাগরিকের মৃত্যুর খবর পাই। ভারতীয় পত্রিকায় ছাপা হয় বিজিবি ও বাংলাদেশী চোরাচালানী আর আতঙ্কবাদীদের খবর। ঐসব গোলাগুলি বা মারধরের ভিডিও আমরা দেখতে পাই না বলে দুই বিপরীত মেরুর খবর নিয়ে আমরা নানা হাউকাউ করি। সেই হাউকাউ সামাজিক মিডিয়ার অলিখিত নিয়মে সূচকীয় হারে কমে আসে। একদিন, বড়জোর দুইদিন থাকে আমাদের চোটপাটের আয়ু। তারপর যেই লাউ, সেই কদু।
ভারতীয় সীমান্তসেনারা সবসময় বলে, তারা আত্মরক্ষার জন্যে গুলি ছোঁড়ে। আমাদের র‍্যাবও ক্রসফায়ারের অজুহাত হিসেবে ঐ কথাই বলে। কাণ্ডজ্ঞানের বলে আমরা এই আত্মরক্ষার অজুহাতকে অবিশ্বাস করতে শিখেছি। গরু হোক আর ফেনসিডিল হোক, সশস্ত্র বিএসএফের সাথে কিশোর-তরুণেরা লুঙ্গির নিচে কামান-বন্দুক নিয়ে চালানের মাল বাঁচাতে যুদ্ধ করবে, এই গল্প বিশ্বাস করি না আমরা। এই ভিডিওতেও আমরা দেখেছি, আরো অনেক লোক গরু নিয়ে নির্বিঘ্নে চলে যাচ্ছে, ধরা পড়েছে এক যুবক। তার লুঙ্গি বিএসএফ আমাদের খুলে দেখিয়েছে, আমরা কোনো অস্ত্রশস্ত্রের আলামত দেখিনি। আত্মরক্ষার জন্যে তাকে ন্যাংটা করে পেটাচ্ছে না বিএসএফ, পেটাচ্ছে বিশুদ্ধ ধর্ষকাম চরিতার্থ করার জন্য। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তারা ছয় সাতজন মিলে ফুটখানেক খাটো এক নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে উলঙ্গ করে সাপমারা ধোলাই দিচ্ছে।
আমাদের প্রতিক্রিয়া প্রথমেই ধাবিত হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিকে। ব্লগে-ফেসবুকে দীপু মণিকে খুব তিরস্কার করি আমরা। নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে মহাজোট সরকারকেও একচোট ধুই। ধুই না শুধু নিজেকে। এই কথা সত্য, বর্তমান সরকার ভারতের প্রতি যথোপযুক্ত দৃঢ়তার সাথে বাংলাদেশের স্বার্থ উপস্থাপনে ও চরিতার্থ করতে বিফল হয়েছে বহুবার। কিন্তু সেই বিফলতা নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজেদের দায়ভারকে হালকা করে না।
বিএসএফ কি একই ভাবে সীমান্তে কোনো চীনাকে পেটাতে পারবে? কোনো নেপালী বা ভূটানীকে? কিংবা শ্রীলঙ্কার কোনো নাগরিককে নিজের দেশের জমিতে উলঙ্গ করে মারবে? একজন আফগান বা একজন তাজিককে? এমনকি, একজন পাকিস্তানীকে?
আমার ধারণা, তারা তা করবে না। আমাদের দেশের লোককে বিএসএফ এভাবে পেটায় বাংলাদেশীদের ব্যাপারে তাদের সামাজিক ধারণা, প্রশিক্ষণ, নির্দেশনা আর অভিজ্ঞতার ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে। বিএসএফ বাংলাদেশীদের সমপর্যায়ের মানুষ জ্ঞান করে না। পৃথিবীতে বহু বড় দেশের সাথে ছোটো গরীব দেশের সীমান্ত রয়েছে, সেখানে সীমান্ত রক্ষীরা কিশোরদের গুলি করে মারে না, যুবকদের ন্যাংটা করে পিটায় না। এই মার বিএসএফ গরুচালানীদের দিচ্ছে না, এই মার ভারতের আমলাযন্ত্র দিচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিককে। যেভাবে আমাদের দেশে কাজের লোক পিটায় কিছু মাদারচোদ আর তাদের বৌ। এই পীড়নের পেছনে সবচেয়ে বড় যে চালিকাশক্তি, সেটা যত না ঘৃণা, তারচেয়ে বেশি তাচ্ছিল্য।
এই তাচ্ছিল্য কি একদিনে তৈরি হয়েছে?
না। এই তাচ্ছিল্য তৈরি হয়েছে দশকের পর দশক ধরে। আমাদের দেশের লোক আজ মার খাচ্ছে আমাদের আত্মসম্মানজ্ঞানের সামগ্রিক অভাবের কারণে। আমরা বছরের পর বছর ধরে নির্বিকারভাবে ভারতের বাজারে পরিণত হচ্ছি আমাদের মোটা চামড়ার কারণে। ভারতের আমলাযন্ত্রের চোখে আমরা গরীব ছোটোলোক, যাদের মূল কাজ ভারতের পণ্য ক্রয় ও ভোগ। না, ভুল বললাম, গরীব প্রতিবেশীও নয়, ভারতের আমলাযন্ত্র আমাদের দেখে বারান্দার নেড়িকুকুর হিসেবে, পান থেকে চুন খসলে যাকে পিটানো বা নিধন করা যায়।
আমরা প্রচুর হাঁকডাক করি, আবার মারলে খবরাছে গোছের হুমকিধামকি দিই, তীব্র নিন্দা জানাই, সরকারকে গালি দেই, মন্ত্রীকে গালি দেই, কিন্তু নাগরিক হিসাবে আমাদের সামগ্রিক, পরিকল্পিত, দীর্ঘমেয়াদী কোনো প্রতিরোধ কি আছে? আমরা কি নাগরিক হিসেবে একজোট হয়ে ভারতের আমলাযন্ত্রকে কোনো সঙ্কেত দিয়ে জানাতে পেরেছি, যে আমরা কুকুর নই, আমরা মানুষ, প্রাপ্য সম্ভ্রম আমাদের দেখাতে হবে?
আমি মনে করি আমরা পারিনি।
আমাদের সিংহভাগ লোক, যারা ফেসবুকে ব্লগে পত্রিকায় টিভিতে চিৎকার করে গলার রগ ফাটাচ্ছে, তারা সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ভারতের আমলাযন্ত্রের চোখে বাংলাদেশকে ছোটো করার কাজ করে যাচ্ছে সমানে। আমরা নির্বিকারভাবে ভারতের পণ্য ভোগ করছি, ভারতের সেবা ভোগ করছি, ভারতের টিভি দেখছি, ভারতের সিনেমা খাচ্ছি, নিজেদের ঘরোয়া উৎসবে পর্যন্ত আপাদমস্তক ভারতীয় সাজে সেজে হিন্দি গানের তালে হিন্দি সিনেমায় দেখানো কৌশলে পাছা নাচাচ্ছি। আর ফেসবুকে-হাটেমাঠে বলছি এই সরকার ভারতের দালাল।
ভারতের পণ্য-সেবা-ফূর্তি কিছুই যখন আমরা বিসর্জন দিতে পারছি না, একটা দিন এই ভোগের ঢলে বিরতি দিয়ে কি আমরা ভারতের আমলাযন্ত্রকে একটা সঙ্কেত দিতে পারি, যে আমাদের ন্যাংটা করে পিটানোকে আমরা ভালো চোখে দেখি না?
সোপা-পিপার বিরুদ্ধে উইকিপিডিয়ার ডাকা উইকি বনধের উদাহরণটা দেখুন। সিনেটে সোপা-পিপার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহৃত হবে, এমন আভাস পাওয়ার পরও কিন্তু উইকি কর্তৃপক্ষ পিছিয়ে আসেনি, তারা ২৪ ঘন্টার জন্য উইকি বনধ ডেকে অহিংস মৌন প্রতিবাদ জানিয়েছে। এবং তাতে কাজও হয়েছে। সারা পৃথিবী জুড়ে লোকে টের পেয়েছে (মার্কিন আইন প্রণেতারাও), সোপা-পিপার মস্তানি চলবে না।
আমরাও একই কাজ করতে পারি। সারা দেশ জুড়ে আমরা একটি নির্দিষ্ট দিনে ভারতের পণ্য-সেবা-ফূর্তি বর্জন করে হাবিবুর রহমান নামে ঐ গরীব লোকটা, যে আপনার পাতে পরিবেশনের জন্যে গরু আনতে দারাপুত্রপরিবার ফেলে প্রাণ হাতে করে সীমান্ত টপকে ভারতে গিয়েছিলো, তাকে নগ্ন করে পশুর মতো পেটানোর প্রতিবাদ জানাতে পারি।
গরীব মার খায় দেখে আমাদের গায়ে লাগে না, কারণ আমরা নিশ্চিন্তে থাকি, আমরা ভদ্রলোক, আমাদের তো কিছু হবে না। আজ হাবিবুর গরু আনতে মার খেয়েছে, আমরা চুপ করে আছি। কাল আপনি বাবার চিকিৎসা করাতে বা বউকে নিয়ে হানিমুনে যাওয়ার পথে ভারতের মাটিতে একই রকম মার খাবেন না, সেটা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন?
হাবিবুর রহমান একজন গরু চোরাচালানী, কারণ আপনি গরু খান। হাবিবের উলঙ্গ নিতম্বে লাঠির বাড়িটা আপনার গালেও এসে পড়েছে। টের পান?
মার্চ ১ হোক আমাদের ভারত বনধের দিন। এই দিন আমরা ভারতের কোনো জিনিস কিনবো না, ভারতের কোনো সেবা নেবো না, ভারতের কোনো চ্যানেল দেখবো না। আগের আটত্রিশ দিন আসুন আমরা এই ডাক ছড়িয়ে দিই, সবাইকে জানাই। পরিচিত সবাইকে বলি, নিজেদের আত্মসম্মানের কথা স্মরণ করিয়ে দিই। আমরা কুকুর নই, আমরা মানুষ। আমাদের মানুষের মর্যাদা দিতে হবে। শুধু তা-ই নয়, এখন থেকে সীমান্তে একজন বাংলাদেশীও যদি নিহত বা আহত হয়, আমরা পরদিন বাংলাদেশে ভারত বনধ পালন করবো।
পারবেন? না পারলে প্যান্টের নিচে পাছার চামড়াটা মোটা করুন। কারণ বিএসএফের পরবর্তী ন্যাংটো ভিকটিম আপনিই।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।