Friday, January 06, 2012

পাগমার্ক




নজমুল আলবাব শুকনো মুখে বেরিয়ে আসে জঙ্গল ছেড়ে। তারপর হাঁটু পর্যন্ত কাদা ঠেলে এসে নৌকায় ওঠে হাঁচড়ে পাঁচড়ে।
বলি, "ছবি তুলতে পাল্লেন কিছু?"
নজমুল আলবাব বিড়বিড় করে কী যেন বলে। সম্ভবত গালি দেয় আমাকে।
বনরক্ষী ফজলু শেখ চুপচাপ বসে ছিলো নৌকার পাটাতনে, আলবাব তাকে বলে, "ভাই পা ধুইতে হবে।"
ফজলু শেখ সংক্ষেপে বলে, "ধুয়ে ফেলেন।"
আলবাব ক্ষেপে যায়। তার মেজাজের সমস্যা ছোটোকাল থেকেই, হেডমাস্টারদের সাথে, পুলিশ ইনস্পেক্টরের সাথে, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ারের সাথে, যুগ্ম সচিবের সাথে ঝগড়া করে করে অভ্যাস তার। সে খ্যাঁক করে ওঠে সুন্দরবনের কেঁদোর মতো, "কী দিয়ে ধুয়ে ফেলবো?"
ফজলু শেখ আবারও সংক্ষেপে বলে, "ঐ যে পানি?"
নদীর ঘোলা পানি দিয়ে পায়ের কাদা ধুয়ে ফেলা যায়, এ ব্যাপারটা আবিষ্কার করে আলবাব আরো ক্ষেপে ওঠে। ক্যামেরাটা গলা থেকে নামিয়ে রক্তচক্ষু মেলে আমার দিকে তাকায়, তারপর বলে, "ক্যামেরাটা রাখেন। লেন্সে যাতে স্ক্র্যাচ না পড়ে। খুপ খিয়াল কৈরা!"
আমি ক্যামেরাটাকে নবজাতক জ্ঞান করে কোলে তুলে নিই। আলবাব ধুপ করে আবার নদীতে নামে। তারপর পা ধুতে থাকে ধুপধাপ করে।
আমি ক্যামেরাটা অন করে কী কী ছবি তোলা হয়েছে, সেগুলো দেখার চেষ্টা করি। বাঘভাল্লুকের ছবি তুলতে না পেরেই কি আলবাব এতো ক্ষিপ্ত?
আলবাব নৌকায় উঠে এসে গর্জে ওঠে, "ক্যামেরা টিপরায় কিতার লাগি? ইগু কিতা টিভির রিমোট নি? রাখেন মিয়া!"
ভয় পাই। বলি, "দেখছিলাম কী ছবি তুললেন, বাঘটাঘ ...।"
আলবাব তেড়ে আসে। "বাঘটাঘ মানে? বাঘটাঘ মানে কী?"
কিছু না বলে মাথা চুলকাই। আলবাব গলার গামছা দিয়ে হাত মোছে, তারপর ক্যামেরাটা ছিনিয়ে নেয় আমার কাছ থেকে। আর গজগজ করতে থাকে, "বাঘ! সুন্দরবনে আবার বাঘ!"
ফ্লাস্ক থেকে এক কাপ চা ঢেলে এগিয়ে দিই তার দিকে। হজ করে আসার পর লোকটার মেজাজ হালাকু খাঁর মতো হয়ে গেছে। একে মারে, তাকে ধরে। সিলেটের সাংবাদিকরা সবাই তার ইয়ারদোস্তো দেখে এখনও পেপারে নাম আসেনি, নয়তো পাড়ামহল্লায় উপর্যুপরি মস্তানির খবর কবেই রটে যেতো। সাংসদ বদিও এখন ফেল তার কাছে। সিলেটের মেয়রকে নাকি সেদিন জামে আটকা পেয়ে মোটর সাইকেল থেকে নেমে গিয়ে য়্যায়সা কড়া ধমক লাগিয়েছে, বেচারা আর অফিসেই যাওয়ার সাহস পায়নি সেদিন।
আলবাব বাঘের থাবা দিয়ে চায়ের কাপ ছিনিয়ে নিয়ে চুমুক দেয়, সুন্দরবনের অন্দরকন্দর থেকে সে চুমুকের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। কয়েকটা বাঁদর কিচকিচ করে ওঠে, দূরে পানি খেতে আসা একটা হরিণ দুড়দাড় পালিয়ে যায়।
আমি ভয়ে ভয়ে বলি, "বাকিরা কোথায়?"
আমাদের সঙ্গের আরো দুই ফটুগফুর জঙ্গলে ঢুকেছে কামানের মতো বড় বড় ক্যামেরা নিয়ে, সঙ্গে আরেক বনরক্ষী মতি সর্দার। আমি ভীতু সম্প্রদায়ের মানুষ, বনের ভেতর নামবো না বলে ফজলু শেখ আমাকে পাহারা দেয়ার জন্যে রয়ে গেছে। সুন্দরবনে নেমে কাদা মাড়িয়ে সেধে সেধে বাঘের মুখে পড়ার কোনো খায়েশ আমার নাই। আমি দূর থেকে বানর দেখেই খুশি।
আলবাব আরেকটা পিলে কাঁপানো চুমুক দিয়ে চায়ের কাপ শেষ করে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে চোখ রাঙিয়ে বলে, "বাকিরা জঙ্গলে। জঙ্গলৎ নামিয়া তারা কিতা লন্ডন যাইতোনি? তারা ছবি তুলরায়।"
আরেক কাপ চা ঢেলে দিই হতভাগাটাকে। নইলে যদি মেরে ধরে বসে?
আলবাব দ্বিতীয় কাপে চুমুকটা কয়েক ডেসিবেল আস্তেই দেয়। চোখের অগ্নিদৃষ্টির তাপও সুন্দরবন অঞ্চলে পানির স্ফূটনাঙ্কের নিচে নামে। ভরসা পেয়ে বলি, "ছবি টবি তুলতে পারলেন কিছু?"
আলবাব গোঁ গোঁ করে বলে, "তুলছি কিছু।"
আমি বলি, "কীসের ছবি তুললেন?"
আলবাব অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলে, "গাছপালা। বান্দর। সাপ। কাঁকড়া। আর ...।" থেমে যায় সে, চুকচুক করে চা খায়।
আমি কৌতূহলী হয়ে উঠি। বলি, "আর?"
আলবাব কেশে গলা সাফ করে। তারপর বলে, "বাঘের পায়ের ছাপ।"
ফজলু শেখ এবার কান খাড়া করে। বলে, "টাটকা?"
আলবাব মাথা নাড়ে। "হুঁ!"
ফজলু শেখ বিড়বিড় করে কী যেন বলে।
আমি বলি, "সর্বনাশ! টাটকা পায়ের ছাপ মানে? এইখানে আশপাশ দিয়ে বাঘ গেছে নাকি কিছুক্ষণ আগে?"
আলবাব চুপচাপ চা খায়। ফজলু শেখ কেমন যেন চোরা চোখে তাকায় আমাদের দিকে।
আলবাব চায়ের কাপ ফিরিয়ে দিয়ে বলে, "আরো একটা জিনিস দেখছি, কিন্তু ...।"
আমি বলি, "আরেকটা জিনিস? কী জিনিস?"
আলবাব আবারও চা ঢালার ইশারা করে। ফ্লাস্ক উপুড় করে দিই তার কাপে।
আলবাব চায়ের কাপ হাতে নিয়ে গালে ঠেকায়, তারপর বেজার মুখে একটা চুমুক দেয়। বলে, "অতি আজব জিনিস। বললে বিশ্বাস যাবেন না।"
আমি আলবাবের অর্ধেক কথাই বিশ্বাস করি না। সারাক্ষণ নিজের মস্তানির গল্প করে ব্যাটা। কবে কোন গোলটেবিলে কোন মন্ত্রীকে ধমক দেয়ার পর মন্ত্রী চুপ করে গিয়েছিলো, কক্সবাজারে সৈকতে ছবি তুলতে গিয়ে নেভির এক জাহাজের কারণে সূর্যাস্তের ছবি মনমতো পাচ্ছিলো না বলে সৈকত থেকে ধমক দেয়ার পর নেভির লোকজন যুদ্ধজাহাজের নোঙর তুলে একটু দক্ষিণ দিকে সরে গিয়েছিলো, হরতালে পেট্রল পাম্প বন্ধ থাকায় মোটর সাইকেলের ট্যাঙ্কের ভেতর হিসি করে একবার সেই জ্বালানির জোরে সিলেট থেকে মৌলভিবাজার চলে গিয়েছিলো, রাতের বেলা নৌকায় শুয়ে শুয়ে শুধু এইসব গল্প করে। তবুও ভদ্রতার খাতিরে বলি, "এটা একটা কথা বললেন? বলেন কী আজব জিনিস।"
আলবাব চায়ের কাপে আনমনা চুমুক দিয়ে বলে, "দেখছি ওনাকে।"
ফজলু শেখ চমকে ওঠে।
আমি চমকাই না অবশ্য। বাকিটা শুনতে চাই। বলি, "কোথায়?"
আলবাব তারপর বাকিটা খুলে বলে।
মতি সর্দার শুরুতেই সতর্ক করে দিয়েছিলো, সবাইকে এক সারিতে পরস্পরের কাছে থেকে চলার জন্যে। জঙ্গলের ডানে বাঁয়ে খেয়াল রাখতে, ঘন ঝোপের দিকে লক্ষ্য রাখতে, বানর পাখি এসবের ডাকাডাকির দিকে কান রাখতে, সর্বোপরি মতির তালে তাল মিলিয়ে এগোতে। আলবাব এসব এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দিয়েছে। খেয়াল রেখে লাভটা কী, যদি বাঘ সত্যই ধরতে আসে? সুন্দরবনের কেঁদো বাঘ লাফিয়ে কুঁদিয়ে কামড়াতে আসছে, এই দৃশ্য খেয়াল করে দেখে কী প্রতিকার? বাঘের সাথে দৌড় দিয়ে কি পারা যাবে? তারচেয়ে নিজের মতো করে ছবি তুলতে তুলতে এগিয়ে যাওয়াই বিবেচকের কাজ। বাঘের চিন্তায় অস্থির হয়ে সুন্দরবনে ঘোরাঘুরিটা মাটি করে লাভ নাই। মরণ তো শ্যাম সমান।
ফলে দলের অন্যেরা বেশ কিছুটা এগিয়ে যায়। আলবাব পিছিয়ে পড়ে। এতে লাভই হয়, জানায় আলবাব। ধারেকাছে থাকলে অন্যরা পাকনামি করে তার ছবি তোলার মুড খারাপ করে দিতো। জঙ্গল ধরে কিছুদূর এগিয়ে সে একটা অপূর্ব ক্যাওড়া গাছের ছবি তোলে। তারপর গাছের ডালে একটা সাপের ছবি। একটা তরুণ বানরের ছবি। সরু খালের ধারে কাঁকড়ার ছবি। তারপর এক পর্যায়ে বাঘের পায়ের ছাপ। একেবারে টাটকা, তাতে তখনও জল চুঁইয়ে ওঠেনি পুরোপুরি।
বাঘের পায়ের ছাপ অনুসরণ করে এগোতে থাকে আলবাব। ডরাইলেই ডর।
কিছুদূর এগোতেই একটা ঝোপের পাশে ডোরাকাটা একটা লেজ বেরিয়ে পড়ে থাকতে দেখে আলবাব। সে তখন একটা গাছে উঠে পড়ে হাঁচড়ে পাঁচড়ে। সুন্দরবনের গাছের ওপর এই পর্যায়ে সমূহ বিরক্তি প্রকাশ করে আরো এক কাপ চা চেয়ে বসে সে। ফজলু শেখ নতুন করে চায়ের পানি গরম চড়ায় কেরোসিনের চুলায়।
সুন্দরবনের গাছগুলোও বেয়াদব কিসিমের। জাম্বুরা গাছের মতো ভদ্র গাছ এই এলাকায় নাই। অঞ্চলটাই বিটকেলদের দখলে, আলবাবের অভিমত। সুন্দরবনের ফাঁকে ফাঁকে সরকারের উচিত কিছু জাম্বুরা গাছ লাগানো। সিলেটে ফিরে গিয়ে সে এ ব্যাপারে লেখালেখি করবে, বলে আলবাব। যা-ই হোক, একটা গাছে সে চড়ে বসে। তারপর বাঘটার কাজকারবার লক্ষ্য করতে থাকে। ঝোপের ভেতর থেকে বেরোলেই আলবাব ছবি তুলে নেবে।
বাঘটা ঝোপের ভেতর থেকে বের হয় না। বরং ঝোপের ভেতর থেকে সরু সাদা ধোঁয়ার রেখা বেরিয়ে আসতে থাকে।
ফজলু শেখ কেরোসিনের চুলার কাছ থেকে বলে, "ধোঁয়া?"
আলবাব বলে, হাঁ, ধোঁয়া। দূর থেকে সে হালকা তামাকপোড়ার গন্ধও পাচ্ছিলো, তবে দুয়ের মধ্যে কোনো সংযোগ আছে কি না, সেটা সে বলতে পারছে না।
আমি বলি, "বাঘ তো ধরেন গিয়ে খুব গরম জন্তু। শুকনা ঘাসের উপর বসলে টসলে সেখানে আগুন জ্বলে উঠতে পারে না?"
আলবাব বলে, হোলেও হোতে পারে। কিছুক্ষণ সেখানে ধোঁয়া পাক খেয়ে উঠতে থাকে, তারপর ঝোপের আড়াল থেকে একটা গোঙানির শব্দ ভেসে আসে।
ফজলু শেখ কেরোসিনের চুলার কাছ থেকে বলে, "গোঙানি?"
আলবাব বলে, হাঁ। আহত ফুটবলার যেভাবে গোঙায়, অনেকটা সেরকম গোঙানি।
আমি কিছু বলার সাহস পাই না। ফজলু শেখ কেটলির মধ্যেই দুধ চাপাতা চিনি সব গুলতে থাকে সশব্দে।
আলবাব বলে, এরপর ঝোপের আড়াল থেকে রুনা লায়লার গাওয়া একটি গানের কলি ভেসে আসে পুরুষ কণ্ঠে। আমার মন বলে তুমি আসবে।
আমি সোৎসাহে বলি, "আহা, এ তো অপূর্ব গান। হৃদয়ের বসন্ত বাহারে, প্রেমের অভিসারে আসবে এ এ এ এ এ এ।"
আলবাব সন্দিগ্ধ চোখে আমার দিকে তাকায়, তারপর ফজলু শেখের বাড়িয়ে ধরা চায়ের কাপ হাতে নেয়। বাকি চা ফজলু ফ্লাস্কে ঢালতে থাকে।
আলবাব বলে, হাঁ, ঐ গানটির প্রথম কলিই ঘুরে ফিরে কিছুক্ষণ গীত হয়। আমার মন বলে তুমি আসবে, আমার মন বলে তুমি আসবে। তারপর আবার গোঙানির শব্দ ভেসে আসে।
ফজলু শেখ চোরা চোখে জঙ্গলের দিকে তাকায়।
ঝোপের আড়ালে গোঙানির শব্দ একসময় থেমে যায়। খসখস শব্দ হয় কিছুক্ষণ। তারপর কে যেন বলে, আহ!
আমি মাথা চুলকাই। বাঘের পায়ের ছাপ, ডোরাকাটা লেজের সাথে বিড়ি সিগারেট, রুনা লায়লার গান আর গোঙানির কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাই না।
আলবাব বলে, তারপর লেজটা ঝোপের আড়ালে চলে যায়। আলবাব আরো আধঘন্টা অপেক্ষা করেছে, কিন্তু ওনার আর সাড়াশব্দ পায়নি। কয়েকটা বোলতা এসে কামড়ানোর চেষ্টা করছিলো বলে সে ঐ বেয়াদব গাছ থেকে নেমে আর সামনে না এগিয়ে নৌকায় ফিরে এসেছে।
বাকিদের জন্যে চিন্তিত হয়ে পড়ি আমি। বাঘের মুখেই কি গেলো তারা? কোনো বন্দুক, কোনো গর্জন তো শোনা গেলো না এখন পর্যন্ত। স্কোর কত কে জানে?
ফজলু শেখ বিড়বিড় করে কী যেন বলে। আলবাব নদীতে পিচিক করে থুতু ফেলে বলে, "দেশটা শেষ হয়ে গেলো। কোনো ইঞ্ছাপ্নাই।"
অদূরে জঙ্গলের ভেতর নড়াচড়ার শব্দ পাই আমরা। একটু পর আমাদের বাকি দুই ফটুগফুর আর মতি সর্দার বেরিয়ে আসে। সবাই অক্ষত। আনন্দিতও বটে।
উজানগাঁ চৌধুরী আর অনুপম ত্রিবেদীর মুখে রবার্ট ক্লাইভের বাংলাজয়ী হাসি। মতি সর্দারের মুখে মীরজাফরীয় সন্তোষের মৃদু ছাপ।
নৌকায় উঠে উজানগাঁ বলে, "দারুণ এক জিনিস পাইছি!"
আলবাব বলে, "কী?"
অনুপম ত্রিবেদী বলে, "বাঘুর হাগু!"
ফজলু শেখ চমকে ওঠে।
উজানগাঁ বলে, "য়্যাকদম টাটকা। ধূমায়িত বিষ্ঠা যাকে বলে! অল্পের জন্য আমরা বেঁচে গেছি সবাই! আমরা যে পথে গেলাম, তার পাশেই এক ঝোপে, বাঘের পাগমার্ক, পুরা টাটকা!"
অনুপম বলে, "পাগমার্কের সাথে হাগমার্কও! একদম গরমাগরম! কী যে দুর্গন্ধ রে ভা্‌ই, মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে একেবারে! ম্যাক্রো লেন্স দিয়ে তুলে এনেছি ছবি!"
মতি সর্দার আর ফজলু শেখ চোখাচোখি করে, দেখতে পাই আমি। আলবাব চুপচাপ চা খায়।
উজানগাঁ আর অনুপমের ক্যামেরায় বাঘের বিষ্ঠার ছবি দেখার আবদার করি। দুইজনই অবজ্ঞার দৃষ্টিতে আমাকে আপাদমস্তক দেখে, যার অর্থ, সুন্দরবনে এসে সারাক্ষণ নৌকায় বসে থাকে যে কাপুরুষ, তার এইসব ছবি দেখার কোনো অধিকার নাই। কিন্তু চায়ের ফ্লাস্ক আমার হাতে বলে নিমরাজি হয় তারা।
আমি ক্যামেরার ভিউ প্যানেল থেকে দেখি ছবিগুলো।
সব ছবিই বাঘের বিষ্ঠার। নানা এক্সপোজারে। রঙিন, সাদাকালো। বোকেহ করা। এইচডিআর করার জন্যে ধারাবাহিক বিবিধ আলোকসম্পাতে তোলা। বাঘটা একেবারে মন খুলে হেগেছে, ছবি দেখেই বোঝা যায়। পেল্লায় উঁচু একস্তুপ বিষ্ঠা। কিছু ছবিতে বিষ্ঠার ওপর বসা মাছির পুঞ্জাক্ষিও এসেছে।
কিন্তু ছবিগুলো দেখতে দেখতে কেমন যেন সন্দিগ্ধ হয়ে পড়ি। বলি, "আচ্ছা, এগুলো কি বাঘের গু?"
উজানগাঁর মুখ কালো হয়ে যায়। অনুপম ত্রিবেদী ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে গর্জে ওঠে, "আলবাৎ বাঘের গু! বাঘের গু না তো কীসের? বান্দরের?"
উজানগাঁ থমথমে মুখে বলেন, "আমাদের কথা বিশ্বাস না হলে মতি ভাইকে জিজ্ঞাসা করেন!"
আমি মতি সর্দারের দিকে তাকাই। মতি ভাইয়েরা যুগে যুগে বিষ্ঠা সার্টিফাই করেন, মতি সর্দার ব্যতিক্রম হলো না, বললো, "য়্যাকদম সোন্দরবনের রাজার গু। জোয়ান মদ্দা বাঘের গু।"
অনুপম ত্রিবেদী গর্জে ওঠে, "বিশ্বাস না হলে গু গুগল করে দ্যাখেন!"
আমি মিনমিন করে বলি, "জঙ্গলের মধ্যে গুগল পাবো কোথায়?"
অনুপম ত্রিবেদী তবুও গজগজ করে। হতভাগাটা।
আলবাব বলে, "নাস্তিকরা কিছুই বিশ্বাস করতে চায় না। সবকিছুতে খালি প্রশ্ন, খালি সন্দেহ। আমার চোখের সামনে পায়খানা করলেন উনি, আর উনি আসছেন যুক্তিতর্ক মারাইতে।"
উজানগাঁ আগুনঝরা চোখে আমাকে আর হাতের ফ্লাস্কটাকে দেখে শুধু।
আমি মাথা নিচু করে উজানগাঁর ক্যামেরায় বাঘের বিষ্ঠার ছবি দেখতে থাকি। একেবারে অলিম্পিক পারফরম্যান্স দিয়েছে ব্যাটা বাঘ। বাঘের খোরাক নিয়ে নানা কথা প্রচলিত আছে এই তল্লাটে, কিন্তু ঐ ওপাশের পারফর‍ম্যান্স নিয়ে কবি নীরব।
মতি সর্দার আর ফজলু শেখ আমাকে আড়চোখে ‌দ্যাখে কেবল।
কিন্তু যতই দেখি, ততই মনটা খুঁতখুঁত করে। কেমন যেন চেনা চেনা লাগে বাঘের বিষ্ঠা। ওরকম শঙ্খপাক, ফাটলসমৃদ্ধ, আকরকর্কশ, মলিনহরিদ্রাভ, সবশেষে একটি তীক্ষ্ণ ফলাযুক্ত বিষ্ঠা আগেও কোথাও দেখেছি বলে মালুম হয়। কিন্তু কোথায় দেখেছি? হেথা নয়, হোথা নয়, অন্যখানে, অন্য কোনোখানে ...।
চিন্তার সুতোটা কাটা পড়ে আলবাবের গর্জনে, "বাঘ না হাগলে কে হাগলো ঐখানে? আপনার তালুই?"
আহত হই একটু। বলি, "হরিণের গু হতে পারে না?"
মতি সর্দার প্রতিবাদ করে। হরিণের বিষ্ঠার পুঙ্খানপুঙ্খ বর্ণনা দেয় সে। ছবির সাথে তার কোনো মিল নেইকো।
তবুও আমার নাস্তিক মন ভেতর থেকে চোখ পাকিয়ে বলে, খুপ খিয়াল কৈরা। আমি মিনমিন করে বলি, "শূকর?"
ফজলু শেখ ঠাঠা করে হাসে। তারপর শূকরমলের রোমহর্ষক বিবরণ দেয়। ছবির সাথে তারও কোনো সাদৃশ্য নেই।
এভাবে একে একে বানর, কাঁকড়া, সাপ, মৌমাছি এগুলোও বাতিল হয়ে যায় এক্সপার্টদের রায়ে। উজানগাঁ আর অনুপম চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে ‌আমার আস্পদ্ধা দেখে যায় চুপচাপ।
আলবাব গর্জে ওঠে, "বলেন তাইলে এইটা বাঘের গু না, আপনার তালুইয়ের গু!"
আমার তালুইয়ের বর্জ্য দেখার দুর্যোগ আমার ঘটেনি, কিন্তু আমি আর আমার তালুই একই প্রজাতির, কতই বা ঊনিশ-বিশ হবে দুজনের? এবার আমার মনের কোণে নিজের টাট্টিযাপনের স্মৃতি টোকা দেয়, বলে, অবনী বাড়ি আছো? অবনী বাড়ির দোর খুলে বেরিয়ে এসে ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস করে পেট চুলকাতে চুলকাতে যা বলে, সেটাই আমি বলি, "এইটা বাঘের গু না রে ভাই! এইটা মাইনষের কাম!"
অনুপম ক্ষেপে ওঠে, বলে, "ফাইজলামি করার আর জায়গা পান না মিয়া! জান পাঞ্জায় নিয়া গলা পন্ত কাদা ঠেইল্যা এতডি ছবি তুলছি, আপনি বলতে চান এগুলি রহিম-করিম-সেলিমের গু? য়্যাকদম নৌকা থিকা ফালায় দিমু কিন্তু!"
উজানগাঁ গর্জে ওঠে, বলে, "প্রমাণ কী?"
আমি আর প্রমাণ খুঁজে পাই না। আমতা আমতা করি।
অনুপম বলে, "বাঘের টাটকা পায়ের ছাপের পাশেই পাওয়া গেছে এই জিনিস, আর আপনি কইতেছেন এইটা মাইনষের! মিয়া ফাউল কোথাকার!"
মতি সর্দার বলে, "টাটকা পাগমার্ক, টাটকা বিষ্ঠা!"
ফজলু শেখ কিছু না দেখেই সমর্থন করে, "মানুষের হইতেই পারে না!"
আলবাব ফুঁসে ওঠে, "তখন থেকে বলতেছি আমি এই ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী! আমার চোখের সামনেই উনি এই কাম করছেন! বেটা নাস্তিক কানে পানিই তোলে না!"
অবনী আবার বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায়। আরো কিছু স্মৃতি তাকে ডাকাডাকি করে। কিন্তু অবনী আর দরজা খোলার সাহস পায় না।
ফটুগফুরেরা নিজেদের মধ্যে ছবির গুণাগুণ নিয়ে আলাপ করতে থাকে। আলবাব আমার হাত থেকে চায়ের ফ্লাস্ক বাজেয়াপ্ত করে। বনরক্ষীরা চুলায় রান্না চাপানোতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাঝি নৌকা ছেড়ে দিয়ে ফিরে যেতে থাকে বনবিভাগের অফিসের দিকে। সংলগ্ন ঘাটেই আমাদের রাত্রিযাপনের কথা।
একঘরে হয়ে পড়ে আমি বিষণ্ণ উদাস মনে সঙ্গে আনা জিম করবেটের একখানা বই পড়তে থাকি। তার পদে পদে বাঘ মারার রোমহর্ষক কাহিনী।
খিচুড়ি আর ডিমভাজা খেতে খেতে উজানগাঁ, অনুপম আর আলবাব আমাকে চোখের দৃষ্টিতে ভস্ম করে কিছুক্ষণ পর পর। মতি সর্দার আমার পাতে অন্যদের তুলনায় কম ব্যাসের ডিমভাজা তুলে দেয়। আচার আনা হয়েছে সাথে, সেটাও এক দলা কম পড়ে আমার পাতে। বিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় যুগে যুগে বহু লোককে নিপীড়নের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। আমি টের পাই, আমি হালের জিওর্দানো ব্রুনো, আমিই একবিংশ শতাব্দীর গালিলিও গালিলি। কিন্তু ডিমভাজা আর আচারের জন্য এই দুর্গম সুন্দরবনে নিজেকে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষার জন্যে আমি ব্রুনোর মতো ঘাড়ত্যাড়ামি না করে গালিলিওর দেখানো পথে উঠে পড়ি। বলি, "সচলে একটা পোস্ট দিয়েন বাঘটার কাণ্ড নিয়ে। কর্ছে কী হালায়! এইভাবে চালায় গেলে তো সুন্দরবনে নতুন চর জেগে উঠবে!"
উজানগাঁ আর অনুপমের মুখের আঁধার এক দাগ কমে আসে, আলবাব ক্রুদ্ধ চেহারা নিয়ে কচকচিয়ে খিচুড়ি খায়। মতি সর্দার একটু প্রসন্ন হয় যেন। উৎসাহ পেয়ে বলি, "বাঘের এই ব্যাপারটাও যদি বাঘের মতো ডোরাকাটা হতো, কী চমৎকার হতো চিন্তা করে দ্যাখেন?"
উজানগাঁ আর অনুপম খুশির হাসি হাসে। আলবাব গোমড়া মুখে ডিমভাজা মাখে খিচুড়ির সাথে। মতি সর্দারের হাতের চামচ ডিমভাজার তাওয়ার ওপর ভাসতে থাকে।
আমি বলি, "অল্পের জন্য আজ বেঁচে গেলাম সবাই।"
মতি সর্দার আরেকটা ডিমভাজা তুলে দেয় আমার পাতে। সাথে দুই চামচ আচার।
পেট ভরে খাই।
খেয়েদেয়ে এক কাপ চা হাতে নিয়ে উজানগাঁ আর অনুপম ল্যাপটপে নামাতে থাকে নিজেদের ছবিগুলো। আলবাব বিছানায় শুয়ে পড়ে। ফজলু শেখ রাইফেলে তেল দেয়। মতি সর্দার মিটিমিটি হাসে।
বনবিভাগের অফিসের ঘাটে নৌকা ভেড়ার পর মোবাইলে সিগন্যাল মেলে। উজানগাঁ ইন্টারনেটে ঢোকার চেষ্টা করতে থাকে। অনুপম বলে, "খাড়ান, গুগল করে দেখাই আপনাকে, অন্যান্য দেশে বাঘের গু কীরকম।"
আমি ভরাপেটে উদাস গলায় বলি, "আমাদের বাঘের মতো সুন্দর গু পিথিমির আর কোনো বাঘের নাই।"
উজানগাঁ টাইগার পুপ লিখে সার্চ দেয় গুগলে। বলে, "হিম্ভাই আপনি এইসব নাস্তিকতা একটু কমান। সব কিছুতে প্রশ্ন করা ঠিক না। আসেন, দেখে যান বাঘের গু কেমন।"
আমি উঠে যাই। মনের কোণে একটা ডোরাকাটা লেজ, তামাকের ধোঁয়া আর রুনা লায়লার আমার মন বলে তুমি আসবে দরজায় টোকা দিয়ে বলে, অবনী বাড়ি আছো?
গুগলে তিল তিল করে ফুটে ওঠে একখানা ছবি। নিচে লেখা, টাইগার পুপ।
উজানগাঁ আর অনুপমের ভুরু কুঁচকে ওঠে। গুগলের ছবির সাথে তাদের ক্যামেরার ছবির অনেক গরমিল। সেই তেজ, সেই ধোঁয়া, সেই রূপ গুগলের গুয়ে নেই।
আমি সান্ত্বনা দিয়ে বলি, "হবে কোনো মেছোবাঘের গু।"
উজানগাঁ মুখ কালো করে বলে, "না, বলতেছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ড্রপিং ইন সুন্দরবন।"
আমি সান্ত্বনা দিয়ে বলি, "তাহলে কোনো বুড়া বাঘের কলেরার ফল হবে। বিদেশী ফটুগফুরদের কপালে এরচে ভালো আর কী জুটবে? আমরা তো একেবারে জোয়ান মদ্দা বাঘের জিনিস মিলগেটের রেটে পেয়ে গেছি।"
অনুপম মুখ কালো করে বলে, "না, বলতেছে পাগমার্ক ইন্ডিকেইটস প্রেজেন্স অফ আ ফুললি গ্রৌন মেইল।"
আমি বললাম, "হয়তো ওদের বাঘটার মন খারাপ ছিলো সেদিন। আল্লার তিরিশ দিন কি একরকম যায় রে ভায়েরা? হাতের পাঁচ আঙুল কি সমান হয়? রবীন্দ্রনাথ বা ই্উনূসের ভাইয়েরা কি কেউ নোবেল বাগাতে পেরেছিলো?"
উজানগাঁ আর অনুপম মুখ কালো করে গুগলে আরো বাঘের বিষ্ঠার ছবি দেখে। সবই যেন কেমন কেমন।
মতি সর্দার মুখ কালো করে তাকায় আমার দিকে। ফজলু শেখও।
ওদিকে আমাদের পরিচিত বনবিভাগের এক সেজোকর্তার নৌকা এনজিন ভটভটিয়ে এসে ভেড়ে অফিসের ঘাটে।
সেজোকর্তা হাসিমুখে আমাদের নৌকায় উঠে এসে বলেন, "আজকে আমার নৌকায় খাওয়াদাওয়া হবে। মুরগি আছে, মাছ আছে, চিংড়ি আছে, পেঁয়াজ আর কাঁচামরিচ আছে এন্তার! একেবারে হুলুস্থুলু ভুনা হয়ে যাক!"
ভালো খানা পাকানোর সুখবরে আমার মন ভালো হয়ে ওঠে। আলবাব উঠে বসে কোন পদের মাছ আছে সেই খোঁজ নিতে সেজোকর্তার নৌকায় যায়। উজানগাঁ আর অনুপম মুখ কালো করে ল্যাপটপে গুগল হাঁটকায়।
মতি সর্দার সেজোকর্তার কানে ফিসফিস করে কী যেন বলে। সেজোকর্তার ভুরু পলকের জন্যে কুঁচকে ওঠে, দেখতে পাই। তিনি তারপর আবার জোর করে কুঞ্চিত ভুরু সমান করেন। হাসিমুখে বলেন, "কেমন দেখলেন আমাদের সুন্দরবন?"
আমি বলি, "জ্বি ভাইয়া, দারুণ! সুন্দরবনের ডিমভাজাটা এতো টেস্টি, আর সুন্দরবনের আচারটাও সাংঘাতিক! সুন্দরবনের খিচুড়ির কোনো তুলনাই হয় না।"
সেজোকর্তা খুশির হাসি হাসেন। চোখ টিপে বলেন, "আইনে নিষেধ, নাহলে সুন্দরবনের ঐ ফোঁটা দেয়া খাসির গোস্তের কাবাব খাওয়া যেতো। হেহে, বুঝলেন কি না?"
উজানগাঁ আর অনুপম মুখ কালো করেই বসে থাকে।
সেজোকর্তা বলেন, "লোচন বক্সী আসেননি আপনাদের সাথে? উনি তো আগে রেগুলার আসতেন। এই তল্লাটের সব ডাকাতের সাথে ওনার ফেসবুকে দোস্তি!"
আমি মাথা নাড়ি, বলি, লোচন বক্সী পরে আসবেন, অন্য গল্পে।
সেজোকর্তা বলেন, "তা আপনারা মন খারাপ করে বসে আছেন কেন ভাইয়ারা? হরিণটরিণ পান নাই ছবি তোলার জন্য?"
অনুপম গোমড়া মুখে বলে, "না!"
সেজোকর্তা বলেন, "ভাগ্য ভালো থাকলে মাঝেমধ্যে বন্য শূকরের দেখা মেলে। অথবা ময়াল সাপ। তবে শূকর বড় ভয়ানক জীব। ছুটে এসে গুঁতা দেয়। সেই গুঁতাকে বাঘেও ডরায় রে ভাইয়ারা!"
আমি বলি, "বাঘ দেখা যায় না?"
সেজোকর্তা উদাস হেসে বলেন, "বাঘ কি যখন তখন দেখা যায় রে ভাইয়া? সে বড় ছলনাময়। আড়ালে আড়ালে থাকে, নীরবে আপনা ঢাকে, নিরমল নয়নের জলে, পাছে লোকে কিছু বলে?"
আমি বলি, "না ততোটা নিরমল সে নয় মনে হচ্ছে। আজ আমরা জঙ্গলে নেমে বাঘের বিষ্ঠা, যাকে বলে টাইগার পুপ, দেখেছি। একেবারে পল্টন ময়দানি মাল। এই য়্যাত্তো উঁচু এক ঢিবি!"
সেজোকর্তা আড়চোখে একবার মতি সর্দারের দিকে তাকান, তারপর হেসে বলেন, "জীবন যেমন, বিষ্ঠাও তেমন। বাঘের জীবন রাজাগজাদের মতো, হাগার বেলায় অন্যথা হলে চলবে কী করে, বলুন? আমরা বনে রেগুলার ডিউটি দিই, তাই তিনবেলা হরিণটরিণ খেয়েপরে ওনারা আছেন ভালোই। ল্যাটিনে তো বলছেই, মের্দা সানা ইন করপোরে সানো, সুস্থ দেহে সুস্থ মল!"
আমি বলি, "খুব ভদ্র বাঘ। মানুষ দেখলে পালিয়ে যায়।"
সেজোকর্তা মিটিমিটি হেসে বলেন, "হ্যাঁ। বাঘ আজকাল মানুষের সামনে আসেটাসে না। তাই শুধু পাগমার্ক দেখেই খুশি থাকতে হয় আর কি।"
উজানগাঁ থমথমে মুখে বলে, "এটা বাঘের গু নয়!"
অনুপম ডুকরে ওঠে, "হতেই পারে না!"
সেজোকর্তা ব্যস্ত হয়ে বলেন, "কই, দেখি দেখি? আমাকে দিন তো দেখি ল্যাপটপটা? উমমম? হুমমমমমমমম! বাহ দারুণ ছবি তুলেছেন তো? দেখি তো! হাঁ, সুন্দরবনের জোয়ান মদ্দা বাঘ। পাঁচ বছরের মতো হবে বয়স। নাকের ডগা থেকে লেজ পর্যন্ত নয় ফুটের কম হবে না। মনে হচ্ছে মায়া হরিণ খেয়েছে গত পরশু। হুঁ, মায়া হরিণই। চিত্রা হরিণ খেলে বিষ্ঠার টেকশ্চারটা অন্যরকম হতো, এতো স্মুদ হতো না, ফাটোফাটো দাগ থাকতো আরো ... কী বলো মতি?"
মতি সর্দার মাথা দোলায়। "আলবাৎ!"
অনুপম সন্দিগ্ধ গলায় বলে, "গু দেখেই বুঝে ফেললেন এতো কিছু?"
সেজোকর্তা উদাস হাসেন। "হাঁ ভাই! বন নিয়েই তো আমাদের কাজ, আমাদের বেঁচে থাকা। বাঘের বিষ্ঠা বনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাঘের বিষ্ঠা নিয়ে কতো এনজিওর প্রোজেক্ট আছে জানেন?"
উজানগাঁ মাথা নাড়ে। "এটা বাঘের বিষ্ঠা হতেই পারে না! আমরা গুগল করে দেখেছি। বাঘের মাল অন্যরকম। সম্পূর্ণ অন্যরকম।"
সেজোকর্তা বলেন, "আরে না রে ভাই, এটা সাক্ষাৎ বড়মামার বড় ছেলে! দেখেই তো বোঝা যায়, কী বলো শেখ?"
ফজলু শেখ মাথা দোলায়, "য়্যাকদম!"
অনুপম বলে, "উঁহুহুহু, আমরা গুগলে দেখলাম। বড়মামার বড়ছেলের চেহারাসুরত সম্পূর্ণ অন্যরকম! এই বড়ছেলে অন্য লোকের!"
সেজোকর্তা একটু উষ্মার সাথে বলেন, "আরে ভাই, চলতে ফিরতে হরদম দেখছি এই জিনিস! সুন্দরবনের বাঘকে এখন চিনতে হয় তার পায়ের ছাপ আর গুয়ের ছোপ দেখে। ও আমাদের মুখস্থ। বড় লাটের রেলগাড়িই এটা!"
উজানগাঁ আর অনুপম রাজি হয় না। রেলগাড়ির ব্যাপারে তাদের আপত্তি নেই, বগির পর বগি যেখানে ছবিতেই স্পষ্ট (শুধু বোকেহ ছবিতে আবছা), কিন্তু বড় লাটের এটা হতেই পারে না। কোনো মেজো বা সেজো লাট বড় লাটের গরম করা তাওয়ায় পরোটা ভেজে গেছে, এ-ই তাদের অভিমত।
সেজোকর্তা, মতি সর্দার আর ফজলু শেখ খুব তর্ক করতে থাকে। সেজোকর্তা ক্ষেপে গিয়ে বলে, "এটা বড় হুজুরের কোলবালিশ না হলে কার, আপনাদের তালুইয়ের?"
আলবাব সেজোকর্তার নৌকা থেকে খাবারদাবারের খোঁজ খবর নিয়ে ফিরে আসে। তর্কের গন্ধ শুঁকেই সে ক্ষেপে ওঠে, আমার দিকে আঙুল তুলে বলে, "এই নাস্তিক বদ্মায়েশটা আবার ত্যানা প্যাঁচায়? আমি বললাম উনি আমার চোখের সামনে ডেলিভারি দিছেন, তারপরও বেটা বেঙ্গলি বিশ্বাস যায় না!"
আমি আমতা আমতা করি, সেজোকর্তা গর্জে ওঠেন, "আপনারা দু'পাতা বিজ্ঞান পড়ে নিজেদের সবজান্তা শমশের ভাবেন! থাকেন ঢাকা শহরে, আর বাঘ নিয়ে তর্ক করেন আমাদের সাথে! বাঘের সাথেই আমাদের ওঠবোস, এক পুকুরের পানি খাই আমি আর বাঘ, আর বাঘের বিষ্ঠা চেনাতে এসেছেন আমাকে!"
আলবাব আমার দিকে চোখ পাকিয়ে বলে, "আমি নিজের চোখে দেখেছি, ঝোপের বাইরে ডোরাকাটা লেজ, তারপর সাদা ধোঁয়া, তারপর তামাক পোড়ার গন্ধ, তারপর গোঙানির শব্দ, তারপর রুনা লায়লার আমার মন বলে তুমি আসবে! তারপরও বেটা নাস্তিক বাটপার খালি তর্ক করে, খালি যুক্তি খোঁজে। হজ করে আসছে কে, আমি না তুই?"
সেজোকর্তা থতমত খেয়ে চুপ করে যান।
উজানগাঁ আর অনুপম অবিচল থেকে যায় নিজেদের দাবিতে, এডউইন হাবলের মতো। এটা বড় হুজুরের কোলবালিশ হতেই পারে না। এটা কোনো মেজো বা সেজো হুজুরের তাকিয়া।
আমি বলি, "ইয়ে, বড় মামা কি বিড়িটিড়ি খান?"
সেজোকর্তা আমতা আমতা করেন। বলেন, "দিনকাল তো ভালো না। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জের মুখে সুন্দরবন। এখন ইন্টারনেটে সব পাওয়া যায়, বনের মধ্যে মোবাইল নেটওয়ার্ক চলে আসছে। বড় হুজুরও বিড়িতে দুয়েকটা টান দিতেই পারেন।"
আমি বলি, "কিন্তু বড় হুজুর কি রুনা লায়লার গান গাইতে পারেন?"
সেজোকর্তা আমতা আমতা করেন। মতি সর্দার ভক্তিভরে বলে, "বনবিবির ইশারায় সকলই সম্ভব। রেডিও খুলনা তো অতি জাগ্রত! বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি?"
উজানগাঁ আর অনুপমও গোঁ ধরে। আলবাব ফোঁসফোঁস করে কিছুক্ষণ, তারপর চুপ করে যায়।
সেজোকর্তা অবশেষে হার মানেন। গামছা দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলেন, "ঠিকাছে। কিন্তু আপনারা ফিরে গিয়ে কিছু বলবেন না। একদম চুপ।"
আমরা রাজি হই।
সেজোকর্তা বলেন এক আশ্চর্য কাহিনী।
সুন্দরবনে আর বাঘ জীবিত নাই। এ কোনো নতুন ঘটনা নয়, প্রায় দশ বছর আগেই সুন্দরবন থেকে বাঘ উধাও হয়ে গেছে। নিয়মিত বাঘ শিকার চলেছে তার আগে। বাঘের চামড়া, গোঁফ, নখ, দাঁত, হাড়, বিচি, সব কিছুরই চাহিদা আছে বাজারে। তাই বাঘ মেরে সাফ করে ফেলা হয়েছে সুন্দরবন থেকে।
কিন্তু সাধারণ জনগণ যাতে এসব জানতে না পারে, সেজন্য বনবিভাগের লোকেরাই বাঘের ছাল গায়ে দিয়ে মাঝেমধ্যে পর্যটকদের আশেপাশে ঘোরাফেরা করে, বাঘের পায়ের আদলের জুতো পরে। ওগুলো দিয়েই বাদার কাদায় পাগমার্ক তৈরি করা হয়, লোকে সেগুলো ‌দ্যাখে, ছবিটবি তোলে, তারপর বাঘের আলামত পেয়ে খুশিমনে বাড়ি ফিরে গিয়ে গল্প করে।
আমরা হতবাক হয়ে যাই।
সেজোকর্তা ঘাম মুছে বলেন, "এই কাজে কাদের গাজী ছিলো সবচেয়ে পাকা। সে আজ এই তল্লাটে থাকলে এমনটা হতো না।"
আমি বলি, "কাদের গাজী কে?"
সেজোকর্তা জানান, কাদের গাজী বনবিভাগের বাঘের ভূমিকায় অভিনেতাদের দলনেতা ছিলো। তার মতো করে পাকা বাঘ সাজতে পারে না আর কেউ। বাঘের ছাল, বাঘের ছাপ, বাঘের ডাক, বাঘের বিষ্ঠা, সকলই সে নিখুঁতভাবে অনুকরণ করতে পারতো। এমনকি বিদেশ থেকে বাঘের এক্সপার্টরা এসে কাদের গাজীর পিশুর গন্ধ শুঁকে বিভ্রান্ত হয়েছে, খাঁটি বাঘ ভেবে খাতায় হিজিবিজি নোট করে নিয়ে গেছে। সারা সুন্দরবনে কাদের গাজীর রেখে যাওয়া পাগমার্ক দেখে তারা হিসাব করেছে, সুন্দরবনে ৫০০ বাঘ জীবিত আছে।
আলবাব শুধায়, "সে কই এখন?"
সেজোকর্তা বিষণ্ণ মুখে জানান, কাদের গাজীর এই সীমাহীন অনুকরণ নৈপুণ্যই কাল হয়ে দাঁড়ায়। ভারতীয় সুন্দরবন থেকে সীমানাভোলা একটা বেখেয়াল মদ্দা বাঘ একবার ঢুকে পড়ে বাংলাদেশে। কাদের গাজীর ছদ্মবেশে একটাই সমস্যা ছিলো, সে ধরেছিলো বাঘিনীর বেশ। হতভাগা ইনডিয়ান মদ্দাটা তফাত করতে পারেনি, এসেই হামলে পড়েছে কাদের গাজীর ওপর। তারপর যা সচরাচর ঘটে আর কি। নারী নির্যাতন করে পালিয়ে যায় বদমাশ বাঘটা। অপমান সহ্য করতে না পেরে বাঘের ছাল খুলে ফেলে কাদের সুন্দরবন ত্যাগ করে। সে এখন চিড়িয়াখানায় মারখোরের ছাল গায়ে দিয়ে লোকজনের মনোরঞ্জন করছে বলে তিনি শুনেছেন। মদ্দা মারখোর অবশ্যই। মারখোরের খাঁচার সামনে নাকি দর্শকের ভিড় বেড়ে গেছে, লোকে বাঘের খাঁচার সামনে তেমন একটা দাঁড়ায় না আর, কাদের গাজীর এমনই কসরৎ।
আমি বলি, "আজ তবে ডিউটিতে কে ছিলো?"
সেজোকর্তা গনগনে মুখে বলেন, "তার বিস্তারিত পরিচয় জেনে আর কী হবে বলুন? কালই বিটকেলটার চাকরি নট করে দিচ্ছি। সালা বাঘের ছাল গায়ে দিবি, আর মনিষ্যির মতো হাগবি, ওসব সুন্দরবনে চলবে না!"
আমরা একে অন্যের দিকে তাকাই। আলবাব বলে, "তবে এই যে শুনি বাওয়ালি মাওয়ালিদের বাঘে ধরে, সেটা কীভাবে হয়?"
সেজোকর্তা বলেন, "ঐ বখরা নিয়ে ঝামেলা হলে মাঝেমধ্যে অভিনেতারা বাওয়ালিদের ওপর ঝাঁপায় আর কি। ইদানীং তো বাওয়ালিরা পাল্টা ফাইট করে, কাদের যখন ডিউটিতে ছিলো, তখন এসব ধ্যাষ্টামো চলতো না। কাদের কাউকে ধরলে একদম টেনে নিয়ে আদ্ধেকটা খেয়ে তবেই ছাড়তো!"
আমি মিনমিন করে বলি, "ইয়ে, বাঘ না থাকলে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম টিকবে কী করে?"
সেজোকর্তা গরম হয়ে বলেন, "আপনারা খালি বাঘ বাঘ করেন! আরে ভাই, বাঘের কাজ কী বলুন তো? হরিণ খাওয়াই তো? সে তো আমরা রেগুলার খাচ্ছি! হুদাই সালার ইকোসিস্টেমের দোহাই! কী এমন কাজ আছে যেটা বাঘ করতে পারে অথচ আমরা করতে পারি না, বলুন দেখি?"
ল্যাপটপে একটা ছবি সেই প্রশ্নের উত্তর হয়ে ফুটে থাকে। অন্য নৌকা থেকে হাঁক আসে, "মুরগির তরকারি তৈয়ার!"
[সব চরিত্র কাল্পনিক। আমি আলবাব উজানগাঁ অনুপম ত্রিবেদী লোচন বক্সী, সব। আপনিও।]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।